Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-২০

অবহেলার মুক্তা পর্ব-২০

0
12

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২০

বিজলি চমকানোর সেই আলোটুকুর পর ঘরে আবার নেমে এল এক রাশ থমথমে অন্ধকার। রফিকের মুখে ‘মেনে নেও, আর বেশি ভেবে না’ কথাটা শুনে মরিয়মের বুকের ভেতরে যেন কেউ হাজারটা সুঁচ একযোগে ফুটিয়ে দিল।

রফিক শেখ যে স্পষ্ট সত্যটা তার কাছে চেপে যাচ্ছেন, তা মরিয়মের বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু কেন? যে পুরুষ ডাকাতদের ভয় পায় না, যে পুরুষ সারা গ্রামের সামনে বিচারে সত্যের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরে সেই রফিক শেখ নিজের বোনের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে এত ব্যাকুল, এত ভিতু হয়ে পড়ছেন কেন?

মরিয়ম আর কথা বাড়াল না। কোলের রাফি কচি হাত দুটি ছুড়ে সামান্য উসখুস করতেই সে ফিসফিস করে দুরুদ পাঠ করতে লাগল। রফিক খাটের পাশ থেকে ধীরপায়ে উঠে গিয়ে জানালার খিলটা কষে আটকে দিল। তারপর গায়ের সুতির গামছাটা দিয়ে কপালের কালঘাম মুছে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে রইল। ওর শক্ত চোয়াল, আর জানালার দিকে অপলক দৃষ্টি স্পষ্ট বলছিল পীরপুরের আকাশে যে ঝড়টা কাল রাতে শুরু হয়েছিল, তা থেমে যায়নি।

পরদিন সকাল হতেই শেখ বাড়ির উঠোনে এক অদ্ভুত নীরবতা নামল। সূর্য উঠলেও বাতাসের আর্দ্রতায় কেমন যেন এক ভারী বিষাদ আর আতঙ্কের গন্ধ।

সুরাইয়া রান্নাঘর থেকে বড় মাটির পাতিলে দুধ-পিঠা নিয়ে হাসতে হাসতে বারান্দায় উঠে এল। ওর পরনে লাল-হলুদ ছাপা সুতির শাড়ি, মুখে চাটুকারিতার হাসি যেন থামছেই না।

“ও ভাবিজান! ও রফিক ভাই! দ্যাখো, সকাল সকাল তোমাদের জন্য গাঁয়ের গাভীর দুধ দিয়ে পিঠা বানিয়ে আনলাম!” সুরাইয়ার গলা যেন কাঁচের গুলির মতো ঠনঠন করে বাজল।

রাবেয়া বেগম উঠোনের এক কোণে বসে সুপারি কাটছিলেন। সুরাইয়ার পিঠার পাতিল দেখে তিনি হাতের জাঁতিটা একটু শক্ত করে চেপে ধরলেন। উনার মুখের চামড়া কুঁচকে গেল, চোখ দুটো মাটির দিকে নামিয়ে নিলেন।

মরিয়ম দরজার ফাঁক দিয়ে সবটা লক্ষ্য করছিল। সুরাইয়া যখন পিঠার থালা হাতে বড় ঘরের দরজার দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই উঠোনের বাঁশের ফটক ঠেলে জাহিদ ঘরে ঢুকল। জাহিদের মুখে আজ সকাল থেকেই এক অদ্ভুত আতঙ্কের ছাপ। সে সদরের হাট থেকে মাত্রই ফিরেছে।

“রফিক ভাই! ও রফিক ভাই!” জাহিদের গলার আওয়াজ কাঁপছিল।

রফিক বড় ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ওর পায়ে ওষধি পাতার ব্যান্ডেজ জড়ানো, হাতে মোটা বাঁশের লাঠি। “কী হয়েছে জাহিদ? এত হাঁপাচ্ছিস কেন?”

জাহিদ রফিকের কাছে এসে ফিসফিস করে বলতে চাইল, কিন্তু উঠোনে সুরাইয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে একদম থেমে গেল। জাহিদের দৃষ্টি সুরাইয়ার দিকে পড়তেই সুরাইয়া এক গাল হেসে বলল, “কী রে জাহিদ? ছোট বোনটারে দেখেই কথা পেটে ঢুকে গেল নাকি? এত সকালে সদরে গিয়ে কী খবর নিয়ে আইলি?”

জাহিদ ঢোক গিলল। ওর চোখের মণি দুটো থরথর করে কাঁপছিল। সে চোখ সরিয়ে রফিকের দিকে তাকিয়ে শুকনো মুখে বলল, “রফিক ভাই,,,, উত্তর পাড়ার জমিল কাকার ল-াশের খবর শুনে আইলাম। ওনার পেটের অংশটা নাকি পুরো কেটে ফেলে রাখা হয়েছিল,,, আর আজ সকালে নদীর ধারে আরও একটা অচেনা লাশের পা পাওয়া গেছে! সদরের পুলিশ আইছে গ্রামে। পুরো পীরপুর নাকি ঘিরে ফেলবে!”

কথাটা শোনামাত্রই উঠোনে যেন বরফ ঝরে পড়ল!
রাবেয়া বেগমের হাত থেকে জাঁতিটা কাদায় পড়ে গেল। তিনি হাহাকার করে উঠে নিজের কপাল চাপড়াতে লাগলেন, “ও আল্লাহ রে! আমার গ্রামে এ কী পৈশাচিক অভিশাপ নামল রে! মানুষের শরীর কেটে মা-ংস নিয়ে যাচ্ছে পিশাচেরা!”

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সুরাইয়ার মুখে ভয়ের কোনো লেশমাত্র ফুটল না। সুরাইয়া পিঠার পাতিলটা বারান্দার কাঠের পিঁড়িতে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে বলল, “আহা! দুনিয়াটা কত খারাপ হয়ে গেছে! তা রফিক ভাই, পুলিশের ঝামেলায় না গিয়ে তুমি কি ভাবিজান আর বাচ্চার দেখভাল করবে না? পুলিশ এলেই তো ঘরের মানুষকে আগে জেরা করে, কাল রাতে তো তোমার ঘরেই ডাকাত পড়েছিল!”

রফিক সুরাইয়ার দিকে ধীরেনজরে তাকাল। ওর চোখ দুটি যেন সুরাইয়ার ভেতরের আসল চেহারাটা চিরে দেখতে চাইছিল।

“পুলিশ যাকে জেরা করার, তাকেই করবে সুরাইয়া,” রফিকের স্বর চাবুকের মতো শোনালো। “আর যারা নিজের র*ক্ত বিক্রি করে গ্রামে পিশাচদের পথ দেখায়, তাদের বিচার পুলিশ আসার আগেই এই পীরপুরের মাটিতে হবে।”

সুরাইয়ার চোখের হাসির রেখাটা মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। কিন্তু সে চট করে সামলে নিয়ে বলল, “তা তো বটেই ভাই! অন্যায়কারী তো সাজা পাবেই। তা আমি একটু বড় ঘরের ভেতরে গিয়ে ভাইপোটাকে কোলে নিই? কতক্ষণ আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব?”

সুরাইয়া পা বাড়াতেই রফিক ওর বিশাল শরীর দিয়ে দরজার মুখটা আগলে দাঁড়াল।

“না।” রফিকের এক শব্দের উত্তর পুরো উঠোনকে স্তব্ধ করে দিল। “মরিয়ম আর রাফি এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। ঘরে এখন কারো ঢোকার দরকার নেই।”

সুরাইয়া এক মুহূর্তের জন্য যেন নিজের রাগটা চেপে রাখতে পারল না। ওর চোখের মণি দুটো হঠাৎ হিংস্র ও বিষাক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই এক মিষ্টি ছদ্মবেশী হাসি ফুটিয়ে বলল, “ঠিক আছে রফিক ভাই, তুমি যা ভালো মনে করো। আমি তাহলে রান্নাঘরে যাই, দুপুরের খাসির মাংসটা চড়িয়ে দিই।”

সুরাইয়া চলে যেতেই রফিক জাহিদকে ইশারা করে উঠোনের পেছনে ডেকে নিয়ে গেল। মরিয়ম জানালার পাশে এসে কান পেতে রইল।

“রফিক ভাই,,,,” জাহিদের গলার স্বর কান্নায় অবরুদ্ধ, “সদরে গিয়ে আমি একটা ভয়ংকর কথা শুনে আইছি ভাই! কাল রাতে যেই ডাকাত দলটা আমাদের ঘরে হামলা করেছিল, সদরের হাটে এক কাবুলিওয়ালা তাদের সাথে কাকে যেন কথা বলতে দেখেছে! উনারা নাকি বলাবলি করছিল ‘শেখ বাড়ির ছোট মেয়ে পথ পরিষ্কার করে রাখছে, আজ রাতে আসল কাজ সারতে হবে’!”

রফিক শেখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

“আমি জানি জাহিদ,” রফিকের কণ্ঠ ছিল একদম জমাট বরফের মতো ঠান্ডা। “সুরাইয়া একা এই কাজ করছে না। ওর পেছনে মূল শয়তান লুকিয়ে আছে। যে পীরপুর গ্রামের ভেতরে বসে বড় ডাক্তার আর হাসপাতালের পাচারকারীদের সাথে হাত মিলিয়েছে, সে আমাদের এই বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চির খবর রাখে।”

“তাহলে সুরাইয়াকে পুলিশে সোপর্দ করছেন না কেন ভাই?” জাহিদ আকুল হয়ে প্রশ্ন করল।

রফিক জাহিদের কাঁধে হাত রাখল, ওর চোখ দুটো বিষাদে ভরে উঠল, “কারণ সুরাইয়াকে এখনই ধরলে সেই আসল মাস্টারমাইন্ড সতর্ক হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা,,, সুরাইয়া যদি একবার নিজের মুখ খোলে, তবে শেখ বাড়ির এমন এক অতীতের কালো সত্য বাইরে আসবে, যা আমাদের মাকে জ্যান্ত মে*রে ফেলবে জাহিদ!”

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মরিয়মের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ধক করে উঠল!

‘শেখ বাড়ির অতীতের কালো সত্য?’ তবে কি সুরাইয়ার এই ফিরে আসা আর অঙ্গ পাচারকারী চক্রের সাথে শেখ বাড়ির কোনো পুরোনো অন্ধকার ইতিহাস যুক্ত হয়ে আছে? রাবেয়া বেগম কেন সুরাইয়াকে দেখে এত ভয় পাচ্ছেন? আর রফিক কেন সততার বড় প্রতীক হয়েও এই সত্যটা মাটির নিচে চাপা দিতে চাইছেন?

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। পীরপুর গ্রামের আকাশে আবার কালচে মেঘ জমা হতে লাগল। বাতাসে আশ্বিনের সেই কনকন করা ঠান্ডা হাওয়া।

মরিয়ম বিছানায় বসে রাফিকে সুতির তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে রাখছিল। রাফি ছোট্ট কচি হাত দুটো মুখের কাছে এনে চুষছিল।

ঠিক সেই সময় বড় ঘরের পেছনের বারান্দার শিক দিয়ে একখানা চিঠি ভেতরে এসে পড়ল!

চিঠিটা ছোট এক টুকরো লাল সুতো দিয়ে বাঁধা। মরিয়ম চমকে গিয়ে খাটের ওপর থেকে নেমে সাবধানে চিঠিটার দিকে এগোল। রফিক তখন মাতব্বর ইদ্রিস আলীর সাথে দেখা করতে বাইরে গেছে, জাহিদও হাটে। ঘরে রাবেয়া বেগম ঘুমাচ্ছেন, আর সুরাইয়া রান্নাঘরে।

মরিয়ম কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটি কুড়িয়ে নিল। লাল সুতোটা খুলতেই সুতির কাগজের ওপর বিশ্রী, লাল রঙের কালিতে লেখা কয়েকটা লাইন ফুটে উঠল

“মরিয়ম,
তুই যাকে স্বামী ভেবে আকড়ে ধরে আছিস, সেই রফিক শেখ কোনো ধোঁয়া তুলসী পাতা নয়। সাত বছর আগে শেখ বাড়ির যে রক্ত ঝরেছিল, আর আজ গ্রামের মানুষের শরীর কেটে যে ব্যবসা চলছে তার চাবি রয়েছে এই বড় ঘরের মেঝের সিন্দুকের ভেতর! যদি নিজের সন্তানের প্রাণ চাস, তবে রফিককে না জানিয়ে সিন্দুকের পেছনের ছোট বাক্সে হাত দিয়ে দেখিস। সত্য জেনে যাবি,,,, কিন্তু খবরদার, রফিককে বললে তোর রাফির লা*শ নদীর ঘাটে মিলবে!”

চিঠিটা পড়া শেষ হতেই মরিয়মের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল! পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল।

কাদের চিঠি এটা? সুরাইয়ার? নাকি সেই গোপন অঙ্গ পাচারকারী চক্রের মাস্টারমাইন্ডের?

মরিয়ম ধীরপায়ে ঘরের পেছনের মাটির সিন্দুকটার দিকে তাকাল। সেই সিন্দুক, যেখানে কয়দিন আগে শিউলি র*ক্তমাখা গামছা রেখেছিল! কিন্তু তার পেছনে আবার কিসের বাক্সের কথা বলা হচ্ছে? রফিক শেখ কি সত্যিই এই অন্ধকারের সাথে কোনোভাবে যুক্ত, নাকি উনাকে ফাঁদে ফেলার জন্য অন্য কেউ এই চাল চালছে?

হঠাৎ করে দরজায় এক হালকা করাঘাত হলো।
মরিয়ম তড়িঘড়ি করে চিঠিটা নিজের শাড়ির আঁচলের ভেতর গুঁজে ফেলল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সুরাইয়া! ওর হাতে এক বাটি গরম দুধ। ওর মুখে আবার সেই মায়াবী, মিষ্টি হাসি, কিন্তু চোখ দুটি জানালার শেডের মতো অন্ধকার।

“ভাবিজান? একা একা পেছনের সিন্দুকের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছ?” সুরাইয়া ফিসফিস করে বলল। ওর হাঁটার শব্দে যেন এক বিষাক্ত সাপের আভাস! “রফিক ভাই তো ঘরে নাই। আমি কি একটু ভাইপোটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারি?”

মরিয়ম এক পা পিছিয়ে গিয়ে রাফিকে নিজের শরীরের সাথে আগলে ধরল। ওর চোখের দৃষ্টি এখন আর ভয়াতুর নয়, বরং এক সত্যানুসন্ধানী মায়ের মতো তীক্ষ্ণ!

“সুরাইয়া আপা,” মরিয়ম বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “আমার বাচ্চার কাছে আসার আগে আপনার হাতের বিষটা ধুয়ে আসুন। কারণ রফিক ভাই যা-ই লুকাক না কেন, এই মরিয়ম তার বাচ্চার ওপর কোনো শয়তানের আঁচ লাগতে দেবে না!”

সুরাইয়ার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য শয়তানি রাগে বিকৃত হয়ে গেল, উনার হাতের দুধের বাটিটা সামান্য কেঁপে উঠল।

বাইরে তখন ঝুমঝুম করে আবার বৃষ্টি নামল।

চলবে,,,,,