যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫২
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
সিঙ্গাপুরের ভ্যালু হোটেল থমসনের রিসেপশনে লাগেজ সহ দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ তিথি। বিয়ের একমাস হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। হানিমুন নামক রোমান্টিক সফরে সিঙ্গাপুর জায়গাটাকেই বেছে নিয়েছে তারা। হোটেল ম্যানেজমেন্ট থেকে রুমের চাবি নিয়ে স্টাফের হাতে লাগেজ দিয়ে এগিয়ে গেলো তারা। প্রশস্ত করিডোর পেরিয়ে লিফ্টে উঠলো দুজনে। নিজেদের রুমে ঢুকে তিথি সোজা ওয়াশরুমে ফ্রেস হতে গেলো। আর মুগ্ধ বিছানায় চিৎপটাং। স্টাফ এসে সব কিছু ঠিক ঠাক করে দিয়ে খাবারের অর্ডার নিতে এলে মুগ্ধ কিছুই খাবে না জানিয়ে দেয়। অন্যদিকে তিথি রাতের খাবার হিসেবে স্যুপ আর সালাদ অর্ডার দেয়। তোয়ালে তে মুখ মুছে মুগ্ধর উদ্দেশ্যে বললো,
“ফ্রেশ হবে না? অনেকটা জার্নি করেছো বলে টায়ার্ড না!”
মুগ্ধ মাথা নাড়লো। হাই তুলে বললো,
“বিমানে ঘুমানোর কোনো পর্যাপ্ত ব্যবস্তা নেই। নাহলে তখনই ঘুমটা সেরে নিতাম।”
তিথি হালকা হেসে বললো,
“এখন ঘুমাতে কে বারণ করেছে তোমায়? ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়ো!”
মুগ্ধ ঘাড় দুলিয়ে বললো,
“তা করা যেতেই পারে, যদি তুমি আমার কাজটা করে ফেলো।”
তিথি মুখ ভেঙিয়ে বললো,
“কি আবদার! নিজেরটা নিজে করবে। আমার ওতো সময় নেই!”
মুগ্ধ ওয়াশরুমে ঢুকতেই তিথির খাবার চলে এলো। তিথি স্টাফকে দাঁড় করিয়েই উচু কন্ঠে মুগ্ধকে ডেকে বললো,
“তোমার কিছু লাগলে বলো, স্টাফ আছে এখানে!”
মুগ্ধও জোড়ে বললো,
“না। কিছু লাগবে না আপাতত! ফ্রেশ হয়েই ঘুম দেবো।”
___________________
সকালে হোটেল থেকে বেড়িয়ে দুজনেই মোস্তফা সেন্টারে পৌঁছলো। সেখানের এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে ঢুকে ব্রেক ফাস্ট করে নিলো তারা। তারপর সেখান থেকে অরচার্ড রোডে গেলো। অরচার্ড রোডকে কেনাকাটার স্বর্গ বলে। কি নেই সেখানে?রাস্তার দুপাশে চোখ জুড়ানো বিল্ডিঙ, চমৎকার লাইটিং করা। গোটা রোড জুড়ে রয়েছে ফুটপাতে পয়সার বিনিময়ে বিনোদন। কেউ বাশি বাজিয়ে শ্রোতাদের থেকে টাকা নিচ্ছে তো কেউ গিটার বাজিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করছে। যার যাকে ভালো লাগছে তাকেই টাকা দিচ্ছে। কেউ আবার রোবট সেজে সামনে ছোট্ট বাক্স রেখেছে ।বাচ্চারা তাকে দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। বাবা মায়ের থেকে টাকা নিয়ে বাক্সে রেখে চলেছে। জায়গায় জায়গায় মিকি মাউজ সহ নানান কার্টুন চরিত্র সাজানো। বাচ্চা থেকে বুড়রা সবাই সেসব কার্টুনের সাথে ছবি তুলায় ব্যস্ত। বড় বড় কোম্পানির শো রুম ও আছে এখানে। তিথি মুগ্ধর হাত টেনে পাশের একটা শো রুমে ঢুকলো। উদ্দেশ্য শপিং করবে। মুগ্ধ হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো,
“তিথি! সাথে বেশি টাকা নেই, প্লিজ আজ না!”
তিথি মুগ্ধর কথার জবাবে বললো,
“যা আছে তাতেই হবে। ডোন্ট ওয়ারি বেশি কিছু কিনবো না।”
মুগ্ধ মুখ ভার করে এগুলো তার সাথে। শো রুমে ঢুকেই একের পর এক জামা গায়ে জড়িয়ে দেখছে তিথি। মুগ্ধ পকেটে হাত গুজে পিলারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি একটা ক্রপটপ গায়ে জড়িয়ে মুগ্ধর সামনে এসে বললো,
“কেমন লাগছে বলোতো?”
মুগ্ধ না তাকিয়েই মাথা দুলিয়ে বললো,
“দারুণ!”
তিথি ক্রপটপ মুগ্ধর উপর ছুড়ে দিলো। রাগে কটমট করে অন্য একটা টিশার্ট হাতে নিলো সে। মুগ্ধ তিথির ছুড়ে দেয়া ক্রপটপ চোখের সামনে আনলো। বিদঘুটে রঙটা দেখেই তার চোখ মুখ কুঁচকে গেলো। হেঙারে ঝুলিয়ে দিয়ে তিথির পাশাপাশি দাঁড়ালো সে। বিরক্তি নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো মুগ্ধ। পেছন থেকে আসা কোনো পরিচিত কন্ঠস্বরে থমকে যেতে হলো তাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে রইলো সে।
—ডু ইউ হ্যাভ দিছ টাইপ অফ স্কার্ফ ইন ইউর শপ? একচুয়েলি আই নিড ইট বেডলি!
—সরি, ম্যাম! উই ডোন্ট হ্যাভ। বাট ইউ কেন চেক আদার এজ ওয়েল। মেবি ইউ উইল ফাইন্ড এনি আদার স্কার্ফ মোর বিউটিফুল দ্যান দিছ! (শপ কিপার)
—নো নো, ইটস ওকে! সামওয়ান হ্যাজ রিকুয়েস্টেড মি টু বাই দিছ ফর হার, এন্ড শি ওনলি লাইক দিছ ওয়ান। ন্যাভার মাইন্ড, আই উইল সার্চ ইন এনাদার শপ। থ্যাঙ্ক ইউ এনিওয়ে।
—মোস্ট ওয়েলকাম! (শপ কিপার)
কথা শেষ করে পাশ ফিরতেই মুগ্ধ তিথিকে দেখে চোখ আটকে যায় আদ্রিশার। তিথি আর মুগ্ধর চোখে বিস্ময়। হুট করে এতোদিন পর এভাবে তার সাথে দেখা হবে ভাবে নি তারা। আদ্রিশাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। এক্স হাজবেন্ড কে নিউ ওয়াইফের সাথে দেখে শ্বাস আটকে যাচ্ছে তার। তিথি মুগ্ধর দিকে একপলক দেখে আদ্রিশার দিকে তাকালো। বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে গিয়ে খেয়াল হলো আদ্রিশা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে। মৃদু হেসে এগিয়ে এলো তিথি। আদ্রিশার সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বললো,
“আদ্রিশা ? হোয়াট এ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! তুমি এখানে?”
আদ্রিশা খানিক হাসার চেষ্টা করে বললো,
“হ্যাঁ। তোমরা?”
তিথি মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো। মুগ্ধ স্বাভাবিক ভাবে বললো,
“হানিমুন করতে! কিন্তু তুমি এখানে কবে থেকে?”
আদ্রিশা পড়নের জ্যাকেট টা টেনে ধরে বললো,
“বেশ কিছুদিন আগেই এসেছি। বেড়াতে।”
মুগ্ধ মাথা দুলালো। তিথি আদ্রিশার কাধে হাত রেখে বললো,
“তুমি বিয়েতে এলে না যে? আমরা সবাই স্পেশালি মুগ্ধ তোমার জন্য ওয়েট করছিলো।”
আদ্রিশা বাঁকা হেসে অভিমানী কন্ঠে বললো,
“আমি না যাওয়ায় বিয়ে তো আটকে নি তোমাদের। আমার যাওয়া না যাওয়া কোনো এফ্যাক্ট করতো না আমি জানি, তাই যাই নি।”
মুগ্ধর দিকে আড়চোখে দেখে চোখ ঘুরালো আদ্রিশা। মুগ্ধ ছোট্ট শ্বাস টেনে তিথির পাশাপাশি দাঁড়ালো। একদম আদ্রিশার মুখোমুখি। আদ্রিশাকে হঠাৎ এখানে দেখে মুগ্ধর যা প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো তা আদ্রিশার মুখোমুখি হতেই উধাও। স্বাভাবিক চেহারায় ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে সে। তিথি নিজ থেকেই বললো,
“আমরা থমসনে উঠেছি। তুমি কি এদিকটায় কোথাও থাকছো, না কি উল্টো দিকে?”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো,
“না! আমি আমার এক বন্ধুর সাথে তার এপার্টম্যান্টে থাকছি। এদিকে একটা দরকারে এসেছি।”
তিথি মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট নেড়ে কিছু বুঝালো। উত্তরে মুগ্ধ তিথিকে একপাশ থেকে জড়িয়ে বললো,
“অনেক শপিং হয়েছে চলো এখন । হোটেলে ফিরতে হবে। আসছি আদ্রিশা!”
তিথি ভড়কে গিয়ে মাথা নেড়ে না বুঝালো। মুগ্ধ তাতে পাত্তা না দিয়ে এক হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো।আদ্রিশার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। জোরপূর্বক হেসে মাথা নাড়লো সে। কেনো যেনো এসব সহ্য হচ্ছে না তার। হানিমুনে যাওয়ার আর কোনো জায়গা পায় নি না কি? হানিমুনে এসেছে বলেই যে যখন তখন রোমান্স করতে হবে তার কি মানে! ফরেন কান্ট্রীতে পাবলিকলি সব করা যেতেই পারে তা বলে, আদ্রিশার সামনে! আশ্চর্য! প্রেম উতলে পড়ছে না কি তাদের? বিয়ে করেও আয়েশ মেটে নি! কথাগুলো ভেবেই রাগ লাগছে আদ্রিশা। জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করছে সে। স্টাফ ম্যমবারের একজন আদ্রিশার দিকে একটা স্কার্ফ এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ম্যাম? লুক, ইটস যাস্ট লাইক দা ওয়ে ইউ ওয়ান্টেড! বাট দা কালার্স আর নট ম্যাচিং। ডু ইউ ওয়ানা ট্রাই দিছ?”
আদ্রিশা নিজেকে স্বাভাবিক করে স্কার্ফ হাতে তুলে নিলো। ফোনের স্ক্রিনে ছবিতে থাকা স্কার্ফের সাথে হুবুহু মিললেও কালারটা মিলছে না। আদ্রিশা মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে বেড়িয়ে গেলো শপ থেকে। টেক্সিতে উঠতে উঠতে কাওকে একটা ফোন করলো আদ্রিশা।
মুগ্ধ আর তিথিও তাদের হোটেলে ফিরছে। টেক্সিতে বসে হোটেল পৌঁছানোর আগ মুহুর্ত অব্দি আদ্রিশার সাথে কাটানো সময় গুলো ধরা দিচ্ছিলো মুগ্ধর চোখে। মিটিমিটি হাসছিলোও সে। চোখে পানি চিকচিক করছে। যেনো একটু সুযোগ পেলেই ঝড়ে পরবে অনায়াসে। ব্রেক কষতেই স্মৃতির পাতা বন্ধ হয় মুগ্ধর! হকচকিয়ে তাকাতেই তিথি রাগি লুক নিক্ষেপ করে বেরিয়ে যায় টেক্সি থেকে। মুগ্ধ ভাড়া মিটিয়ে দৌড়ে তিথির পিছু পিছু যায়। তিথিকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে খুব রেগে গেছে সে। যেভাবেই হোক রাগ ভাঙাতে হবে। হোটেল ম্যানেজারের সাথে দেখা করে এখানকার বেস্ট রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করেছে মুগ্ধ। এতে যদি তিথির রাগ পানি হয়।
চলবে,,,,,,,,,,,,,
যদি আমার হতে🌹
পর্ব – ৫৩
লেখিকা : সৈয়দা প্রীতি নাহার
হোয়াইট রঙের স্লিভলেস ড্রেস পড়ে তৈরি তিথি। কানে বড় এয়ারিং, ডান হাতে ব্রেসলেট, চুল পনিটেল করেছে। ভারি মেক আপ, হাই হিল দেখে মনে হচ্ছে কোনো রাজ্যের প্রিন্সেস সে। মুগ্ধও তিথির সাথে ম্যাচিং করে পোশাক পরেছে। ব্ল্যাক শার্টের উপর হোয়াইট ব্লেজার। হোয়াইট প্যান্ট, বা হাতে ব্রেন্ডেড ঘড়ি, চুল স্পাইক করা। দুজনকে দেখে যে কেউ বলবে রোমান্টিক কাপল হানিমুন করতে এসেছে। তিথি মুগ্ধর এক হাত জড়িয়ে ইশারায় চলার জন্য বলতেই মুগ্ধ মৃদু হেসে এগুলো। হোটেলের ক্যাব নিয়েই ডিনারের জন্য রওনা দেয় তারা।
ধানশিড়ি রেস্টুরেন্টের ভেতরের দিকে টেবিল বুক করিয়েছে মুগ্ধ। ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বলে সেরকমই সাজানো হয়েছে তাদের টেবিল। মোমবাতি, ফুলের বুকে টেবিলে সাজানো। ডিম লাইট জ্বালানো সেখানে। তাদের টেবিল থেকে কিছুটা দূরেই একটা টেবিল আছে। সেখানে একদল মেয়ে বসেছে। মুগ্ধ আর তিথি তাদের বুক করা টেবিলে গিয়ে বসলো। তিথি তো আয়োজন দেখে অবাক হয়ে আছে।
—“ওয়াও! এতো কিছু কখন আয়োজন করলে?”
—“হোটেল থেকেই সব এর্যান্জম্যান্ট করেছি ম্যাডাম। কেমন লাগছে সেটা বলো! তোমার জন্যই এতো আয়োজন।”
তিথি মিষ্টি হেসে বললো,
—“চমৎকার! তুমি যে এতো রোমান্টিক জানতাম না।”
মুগ্ধ ভাব নিয়ে বললো,
—“ভবিষ্যতে আরো জানবে!”
তিথি মুচকি হাসলো। ওয়েটার এসে খাবার গুলো টেবিলে রাখলো। সাথে ছোট্ট একটা কেক। তিথি কৌতুহল নিয়ে বললো,
—“কেক? তাও আবার চকোলেট ফ্লেভার?”
মুগ্ধ মাথা নেড়ে বললো,
—“ইয়েস মাই ডিয়ার! হানিমুন উদযাপন করবো না?”
তিথি কেকের উপর রাখা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলো। মুগ্ধকে ইশারা করতেই সে ছুড়ি টা তিথির হাতে ধরিয়ে নিজেও হাত রাখলো ছুড়িতে। একসাথে দুজনে কেক কাটার পর একে অপরকে খাইয়েও দিলো। মুগ্ধ ওয়েটারের দিকে হাত নাড়লো। সাথে সাথে সে মুগ্ধদের টেবিলের সামনে হাজির। যেনো অপেক্ষায় ছিলো সে, কখন মুগ্ধ ডাকবে। মুগ্ধ কেকটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললো,
—“প্লিজ টেইক ইট। এন্ড ডিস্ট্রীবিউট ইট এমোং ইয়োরস্যাল্ভস!”
ওয়েটার হেসে চলে গেলো সেখান থেকে। মুগ্ধ প্লেটে খাবার সার্ভ করলো। তিথি চামচে খাবার নিয়ে মুগ্ধর দিকে এগিয়ে দিলো। মুগ্ধ দুষ্টু হেসে চামচ ঘুরিয়ে তিথির মুখের সামনে ধরলো। দুজনের এই দুষ্টুমিষ্টি ভালোবাসা তারা দুজনে এনজয় করলেও দূরের টেবিলের কেউ একজন খুব ফুঁসছে। চোখের পলকটাও ফেলছে না সে। প্রচন্ড অভিমানী দৃষ্টি দিয়েই দেখছে তাদের। মুগ্ধ আর তিথির কথাবলার এক পর্যায়ে হাসা তার বুকে উথাল পাতাল ঢেউ তুলছে। তিথির মুখে উড়ে আসা চুল মুগ্ধর আলতো হাতে সরিয়ে দেয়াতেও হিংসে হচ্ছে তার। চোখ মুখ শক্ত করে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করা মুগ্ধ তিথিকে দেখছিলো আদ্রিশা। পাশের চেয়ারে বসা ফর্সা মেয়েটা বললো,
—“হোয়াট হ্যাপেন্ড? আর ইউ ওলরাইট?”
আদ্রিশা খানিক হাসার চেষ্টা করে বললো
—“ইয়াহ, অফ কোর্স!”
উল্টো দিকে আদ্রিশার মুখোমুখি বসা মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বললো,
—“ডিড ইউ নটিস হোয়াট চেন্জেস উই হ্যাভ মেইড ইন দিছ প্রজেক্ট?”
আদ্রিশা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে রইলো। মেয়েটি হাতের ফাইল বন্ধ করে শক্ত গলায় বললো,
—“আই থিংক ইউ ডোন্ট হ্যাভ এনি ইন্টারেস্ট ইন দিছ প্রজেক্ট। এন্ড ইফ আই এম রাইট, দ্যান ইউ কেন গো মিস আড্রিশা!”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে তাড়াহুড়া করে বললো,
—“নো, ইউ আর গেটিং মি রঙ! ইটস এ ওয়ান্ডারফুল প্রজেক্ট, এন্ড আই অলসো হ্যাভ ইন্টারেস্ট ইন ইট! বাট আই এম আন এবল টু কন্সোন্ট্রেইট হিয়ার!”
আদ্রিশার ডান দিকে বসা ভিলেন রুপি দেখতে মেয়েটা বললো,
—“দ্যাটস নট আওয়ার প্রবলেম এট অল! ইফ ইউ ওয়ানা ডু দ্যা জব ইউ হ্যাভটু কম্প্লীট দ্যা প্রজেক্ট।”
ছেলেদের মতো পোশাক পড়া বাঙালি মেয়ে এনি আদ্রিশার হয়ে বললো,
—“প্লিজ গাইজ, শি ইজ নিউ হিয়ার। শি ডোন্ট ইভেন নোও অল অফ আস। ইটস নরমাল। উই শুড হ্যাল্প হার।”
তারপর আদ্রিশার হাতে হাত রেখে বললো,
—“আদ্রিশা, কি হয়েছে তোমার? প্লিজ আমায় বলো। কখন থেকে দেখছি ড্যানির কথায় মনোযোগি নও তুমি। দেখো, তুমি সানির পরিচিতা বলেই আমি তোমায় এ দলে এনেছি। এখন যদি তুমি এমন করো তাহলে কি করে হবে? প্রজেক্ট কম্প্লীট না করতে পারলে জব টা হাতছাড়া হয়ে যাবে তোমার। আমাদের পাঁচ জনের মধ্যে মাত্র দুজন পাবে অফার। ট্রাই এন্ড আন্ডারস্ট্যান্ড। ইউ হ্যাভ টু ডু ইট।”
আদ্রিশা উত্তরে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো। এক মুহুর্তের জন্য মুগ্ধ তিথির থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না সে। আর তাই পাশে বসা মেয়েদের কথায়ও অমনোযোগি। এনি হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,
—“আদ্রিশা?”
আদ্রিশা মুখ কালো করে বললো,
—“আই এম সরি গাইজ। আই উইল,,,,,”
এটুকু বলেই থেমে গেলো সে। মুগ্ধ আর তিথি বেশ ক্লোজ হয়ে বসেছে। তিথিকে দেখে মনে হচ্ছে একেবারে কোলেই উঠে যাচ্ছে সে। আর মুগ্ধকে দেখে মনে হচ্ছে, কলিজার ভেতর ঢুকাতে পারলে বাঁচে। তীব্র হিংসেয় চোখ মুখ রক্তিম হয়ে উঠলো আদ্রিশার। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো,
—“আই ক্যান নট কন্সোন্ট্রেইট নাও। আই গেট এ গো! আই এম রিয়েলি ভেরি সরি। ইউ গাইজ ক্যারি অন!”
আদ্রিশা চট করে দাঁড়িয়ে পরলো। ওদিকে তাকিয়ে আবারও মুগ্ধ তিথিকে দেখে চলে যেতে নিলো সে। এনি দু তিন বার আওয়াজ দিলেও আদ্রিশা ফিরে তাকায় নি। এনি ছাড়া টেবিলে বসা বাকি তিনজন অনেকটা স্বস্তি পেলো আদ্রিশার যাওয়ায়।
রেস্টুরেন্টের বাইরে বেরিয়ে হাত ঘড়িতে বার বার সময় দেখছে আদ্রিশা। চোখ ফেটে জ্বল আসছে তার। পেছন থেকে কেউ আদ্রিশার কাধে হাত রাখলো। চমকে উঠে ঘুড়ে দেখলো তিথি। তিথি কপাল কুঁচকে বললো,
—“আদ্রিশা?”
আদ্রিশা জোরপূর্বক হেসে বললো,
—“তো,,,তোমরা?”
মুগ্ধ এগিয়ে এসে বললো,
—“কি ব্যাপার বলোতো? বার বার কারন ছাড়া আমাদের দেখা হয়ে যাচ্ছে কি করে?”
আদ্রিশা অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,
—“কি করে বলবো বলুন? আমি নিজেও শক্ড এতে। এনিওয়ে আপনি বোধ হয় আমার সাথে দেখা হওয়ায় অস্বস্তি ফিল করছেন?”
মুগ্ধ বাঁকা হেসে বললো,
—“মোটেও না। আমি কেনো অস্বস্তি ফিল করবো? আমার তো মনে হচ্ছে তুমি অস্বস্তিতে ভুগছো। ঠিক তো, আদ্রিশা?”
মুগ্ধর মুখে নিজের নাম শুনে শ্বাস প্রশ্বাস দ্বিগুন হয়ে গেলো আদ্রিশার। এক হাতে অন্য হাত খাঁমচে ধরে বললো,
—“তা কেনো হবে?”
তিথি কথা ঘুরিয়ে বললো,
—“ডিনার করতে এসেছিলে?”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো,
—“না আসলে, জব অফার ছিলো একটা। তাই প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করার ছিলো কলিগদের সাথে।”
মুগ্ধ কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
—“তুমি তো বলেছিলে বেড়াতে এসেছো? তাহলে জব অফার?”
আদ্রিশা মৃদু হেসে বললো,
—“হ্যাঁ, বেড়াতে এসেছিলাম। এখন ভাবছি এখানে স্যাটেল হয়ে যাওয়াটাই বেটার! (একটা ক্যাব এসে থামলো তাদের সামনে)এনিওয়ে আমার ক্যাব এসে গেছে, আসছি আমি।”
তিথি মজা করে বললো,
—“এদেশেই যখন থাকছো তখন এটা এখন তোমারও দেশ। আর আমরা তোমার গেস্ট! আমাদের ইনভাইট করবে না তোমার ফ্ল্যাটে?”
আদ্রিশা ইনিয়ে বিনিয়ে বললো,
—“আই এম ভ্যারি সরি তিথি আপু। এখন এটা সম্ভব না। আসলে, বলেছিলাম না ফ্রেন্ডের এপার্টম্যান্টে তার সাথে থাকছি। সো এতো রাতে দুজন গেস্ট নিয়ে গেলে তার কাছেও ভালো লাগবে না হয়তো ব্যাপারটা!”
তিথি মিষ্টি হেসে বললো,
—“আরে না! আমি তো মজা করছিলাম। এখানে কদিন আছি আরো, দেখা হবে।”
আদ্রিশা মাথা নেড়ে বললো,
—“হয়তো!”
ক্যাবের ড্রাইভার মাথা বের করে বললো,
—“ম্যাম, স্যার ইজ কলিং এগেইন। প্লিজ কাম।”
আদ্রিশা জিহ্বায় কামড় মেরে গাড়িতে উঠতে নিলে মুগ্ধ সন্দেহী কন্ঠে বললো,
—“স্যার টা কে?”
আদ্রিশা মৃদু হেসে বললো,
—“আমার বন্ধু। যার এপার্টম্যান্টে থাকছি আমি!”
তিথি চোখ বড় বড় করে বললো,
—“ও আর তুমি একসাথেই থাকো?”
আদ্রিশা ঘাড় কাত করে বললো,
—“হ্যাঁ!”
কথাটা বলেই গাড়িতে বসে পরলো সে। ক্যাবটাও ছেড়ে দিলো তারপর। মুগ্ধ চোয়াল শক্ত করে হাত মুঠো করে আছে। আদ্রিশা একটা ছেলের সাথে এক ফ্ল্যাটে থাকছে ভাবতেই অসহনীয় রাগ লাগছে তার। তিথি শুকনো ঢোক গিলে মুগ্ধর হাতে হাত ছোঁয়ালো। মুগ্ধ কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে হাসলো।হোটেলের ক্যাবে করেই হোটেল থমসনে ফিরলো তারা।
চলবে,,,,,,,,,,