শুধু তোমারই জন্য পর্ব-১২+১৩

0
1052

#শুধু_তোমারই_জন্য
#পর্ব_১২
#Ornisha_Sathi

–“আপনি?”

–“হ্যাঁ আমি।”

–“কখন এলেন?”

–“এইতো ঘন্টা দুই আগে।”

–“ওহ আচ্ছা।”

এইটুকু বলেই থেমে গেলো আনিতা। আবারো আকাশের দিকে তাকালো। আর এদিকে আহিয়ান এক দৃষ্টিতে আনিতার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু আগের আসা সেই মানুষটা আর কেউ না আহিয়ান। হঠাৎ আহিয়ানকে দেখে বেশ চমকে গিয়েছিলো আনিতা। তবুও সেটা বাইরে প্রকাশ করলো না।

আহিয়ানের “পিচ্ছি পাখি” বলে ডাকাটা বেশ ভাবাচ্ছে আনিতাকে। আহিয়ান তো ওকে বরাবরই ধানী লঙ্কা বলে ডাকে। তাহলে এবার এর ব্যাতিক্রম হলো যে? একই নামে তো অনেকেই ডাকতে পারে। এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে? নাকি আদৃতই প্রথম এই নামে ডেকেছিলো বলে এখন আহিয়ান ডাকাতে একটু অন্যরকম লাগছে? এসবই ভাবছে আনিতা। আহিয়ান বেশ ক্ষানিকটা আনিতার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলে,

–“আচ্ছা ম্যাডামের কি মন খারাপ?”

–“উঁহু।”

–“মিথ্যে বলছো কেন? দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।”

–“তো দেখেই যেহেতু বুঝতে পারছেন তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছেন কেন?”

–“তার মানে সত্যিই মন খারাপ?”

আনিতা একবার আহিয়ানের দিকে তাকালো। ক্ষানিক বাদেই আবার চোখ সরিয়েও নিলো আহিয়ানের থেকে। কিন্তু কিছুই বলল না। আনিতা মনে মনে ভাবছে,

–“আমার মন খারাপ হওয়াটা যার বোঝার কথা সেই তো বুঝে না। আপনার আর বুঝে কি হবে?”

কথাটা মনে মনেই ভাবলো আনিতা। আহিয়ানকে জিজ্ঞেস করার সাহসটা আর হয়ে উঠলো না। কি দরকার সব মন খারাপের গল্প অন্যকে বলার? বাকীরা তো আমার ফিলিংসটা বুঝবে না। তারা নিতান্তই মজা নিবে।

আনিতাকে বেশ ক্ষানিকটা সময় চুপ করে থাকতে দেখে আহিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। আহিয়ান বুঝলে আনিতা এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। তাই আহিয়ানও এই ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। বেশ ক্ষানিকটা সময় দুজনেই নিরব রইলো। শেষে নিরবতা ভেঙে আনিতাই বলে,

–“আপনি কি একাই এসেছেন?”

–“উঁহু ফাইয়াজও এসেছে সাথে।”

–“সেটা জানি। ফাইয়াজ ভাইয়ার বাসায় যদি সেই না আসে আপনার একা আসাটা অন্যরকম দেখায় না? আমি তন্ময় ভাইয়ার কথা মিন করেছিলাম।”

–“হ্যাঁ তন্ময়ও এসেছে। সাথে আরো দুজন ফ্রেন্ড এসেছে।”

–“ওহ আচ্ছা।”

–“হুম। তো পড়াশোনা কেমন চলছে?”

–“ওই তো একইরকম।”

আহিয়ান কিছু বলবে তার আগেই তন্ময় এসে উপস্থিত হয় সেখানে। তাই আহিয়ান কিছু বলল না। তন্ময় আহিয়ানের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে,

–“কি ব্যাপার মামা? এসেই শুরু হয়ে গেলো তাই না?”

–“চুপ একদম উল্টাপাল্টা বুঝবি না বলে দিলাম।”

আহিয়ানের কথায় তন্ময় ক্ষানিকটা হাসলো। আহিয়ানের ব্যাপারটা হচ্ছে “পেটে ক্ষুধা মুখে লাজ” এটাই মনে করে তন্ময়। তন্ময় আহিয়ানকে ছেড়ে আনিতার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

–“কেমন আছো কিউটিপাই?”

–“আলহামদুলিল্লাহ ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?”

–“এইতো ছোট্ট বোনের দেখা পেয়েছি এখন আরো বেশি ভালো আছি।”

তন্ময়ের কথায় আনিতা হেসে উঠলো। তন্ময় এর সাথে আনিতার বন্ডিংটা বেশ ভালো। মাঝে মাঝে তন্ময়কে ওর নিজের বড় ভাই মনে হয়। তন্ময়ও আনিতাকে নিজের ছোট বোনের চোখেই দেখে।

একটু পর ছাদে ফাইয়াজ সহ আরো দুজন ছেলে এসে দাঁড়ালো। ফাইয়াজ আনিতার মাথায় গাট্টা মেরে বলে,

–“কিরে বুড়ি কেমন আছিস?”

–“উফস ভাইয়া কতবার বলেছি আমাকে বুড়ি বলবে না।”

–“তো কি বলবো?”

–“কেন আমার আব্বু আম্মু যে এত সুন্দর একটা নাম রেখেছে আমার সেটা তোমার মাথায় থাকে না?”

–“মামা মামির দেওয়া নামে আমি ডাকতে পারবো না। আমি তোকে বুড়ি বলেই ডাকবো।”

এভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফাইয়াজ ওর বাকী দুই বন্ধুর সাথে আনিতার পরিচয় করিয়ে দেয়। একজনের নাম আদনান ও অপরজন এর নাম আরহান। আরহান নামটা শুনেও আনিতা ক্ষানিকটা অবাক হয়। আদৃতের বেস্ট ফ্রেন্ড এর নামও আরহান।

পরক্ষণেই আবার নিজের বোকামির কথা ভেবে হাসলো আনিতা। একই নাম তো দুজন মানুষের হতেই পারে। এটা আর এমন অস্বাভাবিক বিষয় কি? আরো বেশ কিছুক্ষণ সকলে মিলে আড্ডা দিয়ে নিচে নেমে গেলো।

সন্ধ্যার পর আনিতা অনলাইনে গিয়েও আদৃতকে পেলো না। এমন কি এখন অব্দি দুটো নাম্বারই অফ। আনিতার মনটা বেশ খারাপ হলেও সেদিকে পাত্তা দিলো না। আনিতা ঠিক করে নিয়েছে আর ভেঙে পড়বে না। এখন থেকে নিজেকে শক্ত রাখবে। তাই তো আজকে একবারের জন্যও কাঁদে নি। আগের আনিতা হলে এতক্ষণে কেঁদে কেটে অস্থির একটা অবস্থা তৈরী করে ফেলতো।

রাতের খাবার খেয়ে আনিতা আর অনিমা শুয়ে আছে। আনিতার ফোনে গান চালিয়ে গেমস খেলছে অনিমা। আর আনিতা পাশে শুয়ে মনোযোগ সহকারে গানটা শুনছে। গান শুনে যেন আনিতার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কান্নাগুলো সব দলা পাকিয়ে গলায় আটকে আছে। তাড়াতাড়ি উঠে বারান্দায় চলে গেলো আনিতা৷ অনেক কেঁদেছে ও আর কাঁদতে চায় না।

বেশ অনেকটা সময় যাবত আনিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হালকা চাঁদের আলোয় বাহিরের চার পাশটা আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। আনিতা এক দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। আর ফাইয়াজের বারান্দায় থেকে আহিয়ান দেখছে আনিতাকে। আনিতা এখনো আহিয়ানকে দেখেনি। হুট করেই আনিতার আহিয়ানের উপর চোখ পড়তেই ও তড়িঘড়ি করে রুমে চলে আসে। আনিতার এভাবে চলে যাওয়া দেখে আহিয়ান বেশ অবাক হয়।

রাত এগারোটা বাজে আনিতার এখনো ঘুম আসছে না। কিছুক্ষণ আগেই আরেকবার আদৃতের নাম্বারে ডায়াল করেছিলো। কিন্তু এবারেও বন্ধ। আজ ওদের সম্পর্কের এক বছর পূর্ণ হলো আর আজই আদৃত এমন করছে। অন্যান্য সময় এমন করলে মানা যায়। কিন্তু আদৃত তো জানে আজকের দিনটার জন্য আনিতা কত এক্সাইটেড ছিলো। কত স্পেশাল ছিলো আজকের দিনটা আনিতার জন্য। বেছে বেছে আজকের দিনটাতেই আবারো এমন করলো আদৃত? আনিতার ভিতর থেকে চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

ঘুম আসছে না বিধায় আনিতা আবারো বারান্দায় গেলো। রাত যত গভীর হচ্ছে চাঁদের আলোটাও যেন ততটাই বাড়ছে। এমনই মনে হচ্ছে আনিতার। তখনই ফাইয়াজের বারান্দায় থেকে কেউ একটা কাগজ ছুড়ে মারলো আনিতার দিকে। কাগজটা সোজা এসে আনিতার কাঁধে লেগেছে। প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেলেও পরে নিজেকে সামলে নিলো। ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে কাগজটা হাতে তুলে নিলো। আনিতা কাগজটা খুলে দেখে তাতে লেখা আছে,

–“আনি বুড়ি একটু ছাদে আয় তো। আমি যে গ্রামে এসেছি এটা তাসকিয়া জানে না। সারপ্রাইজ প্ল্যান করবো ওর জন্য। তোর থেকে কিছু একটা প্ল্যান দরকার। প্লিজ ছাদে আয় একটু।”

লেখাটা পরে আনিতা মুচকি হাসলো। তাসকিয়া খুবই লাকি। ওর ভাইটা যে তাসকিয়া কে বড্ড বেশিই ভালোবাসে। আনিতা রুমে গিয়ে উড়নাটা গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলে পা টিপে টিপে ছাদে চলে আসলো।

আনিতা ছাদে গিয়ে কাউকে দেখতে পেলো না। একটুখানি ভয় লাগতে শুরু করলো আনিতার। এতরাতে ও ছাদে একা আছে তাই ভয় লাগছে। কিছুক্ষণ বাদেই ফাইয়াজদের ছাদ থেকে কেউ লাফিয়ে আনিতাদের ছাদে আসলো। আচমকা এমন শব্দে বেশ ঘাবড়ে গেলো আনিতা। পরে যখন একটা অবয়বকে এগিয়ে আসতে দেখলো তখন একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল আনিতা।

অবয়বটা ধীরে ধীরে আনিতার সামনে এসে দাঁড়াতেই আনিতা অবাক হলো বেশ। আহিয়ান? আহিয়ান এসময় ছাদে কেন? এখন তো ফাইয়াজের আসার কথা তাহলে আহিয়ান কি করছে এখানে? তবে কি কাগজটা আহিয়ানই ছুড়ে মেরেছিলো? মনে মনে এসব ভেবে আনিতা বলে,

–“আপনি এখানে?”

–“প্রথমেই সরি মিথ্যে বলে তোমাকে এখানে আনার জন্য। আসলে কিছু কথা ছিলো৷ কিন্তু আমি যদি তোমাকে এখানে ডাকতাম তাহলে তুমি আসতে না। তাই এই পথ বেছে নিতে হলো।”

–“ইট’স ওকে। বলুন কি বলবেন।”

–“আনিতা ওইদিনের সেই কথাটার জন্য আমি সত্যিই সরি। আসলে তুমি ওসব বলাতে আমি এমনিতেই জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমাকে ‘যে তুমি আমাকে ভালোবাসবে কিনা?’ তুমি আবার কিছু মনে করোনি তো?”

–“না না আমি আবার কি মনে করবো? আচ্ছা আসি তাহলে এখন?”

এই বলে আনিতা চলে আসতে নিলেই আহিয়ান ওর হাত চেপে ধরে। হাতে টান পড়াতে আনিতাও থেমে যায়। আহিয়ান আনিতার কিছুটা কাছে গিয়ে বলে,

–“আমার একটা কথা রাখবে আনিতা?”

-“কি কথা?”

–“কিছুক্ষণ সময় কাটাবে আমার সাথে? আই মিন আমার সাথে কিছুক্ষণ ছাদে থাকবে তুমি?”

–“কেন? কি করবেন ছাদে থেকে?”

–“কেক কাটবো।”

–“মানে বুঝলাম না ঠিক।”

–“আমার জন্য খুব স্পেশাল একটা দিন আজকে। আর এই দিনটাকে সেলিব্রেশন করতে চাচ্ছি আমি। আর সেলিব্রেশন করার মতো কেউ নেই আপাতত।”

–“কেন আপনার বন্ধুরা?”

–“বন্ধুরা কেমন তা তো তুমি জানোই। আমি ওদের এই কথা বললেই ওরা আমার পিছু লাগতে শুরু করবে। তাই আমার মনে হলো এই দিনটা তোমার সাথেই সেলিব্রেট করি।”

–“সরি আমি থাকতে পারবো না।”

–“প্লিজ? আর কখনো কিচ্ছু চাইবো না। এবারের জন্যই প্লিজ?”

আনিতা বেশ অবাক হলো। এই আহিয়ানের হয়েছে কি হঠাৎ করে? আহিয়ানের মতিগতি কিচ্ছু বুঝতে পারছে না ও। আহিয়ানের জন্য আজকে স্পেশাল একটা দিন। আর আনিতার জন্যও সেম। আনিতা তো বুঝে স্পেশাল দিনটা নষ্ট হয়ে গেলে কতটা কষ্ট হয়। তাই আজকে আহিয়ানের স্পেশাল দিনটা সেলিব্রেট করার জন্য রাজি হয়ে গেলো আনিতা। ওর এখানে থাকাতে যদি মানুষটা তার স্পেশাল দিন সেলিব্রেট করতে পারে তাহলে ক্ষতি এখানে থাকতে? আনিতা মনে মনে এসব ভেবে নিলো। তারপর আহিয়ানের দিকে তাকালো। আহিয়ান উত্তরের আশায় এখনো ওর দিকে তাকিয়ে। আনিতা মুচকি হেসে বলে,

–“আচ্ছা রাজি আমি।”

আনিতার কথায় আহিয়ান হাসলো। তারপর ফাইয়াজদের ছাদের কাছে গিয়ে ওখান থেকে একটা বক্স নিয়ে আবার আনিতার কাছে এসে দাঁড়ালো। আহিয়ান বক্স থেকে ছোট্ট একটা কেক বের করে রেলিঙের উপর রাখলো। আনিতা তাকিয়ে দেখলো হার্ট শেইপের একটা চকলেট কেক। তাতে ইংলিশে লিখা, “ওয়ান ইয়ার সেলিব্রেশন” এটা দেখে আনিতা বেশ অবাক হলো। কিসের ওয়ান ইয়ার সেলিব্রেশন করছে আহিয়ান?

আহিয়ান আনিতার দিকে নাইফ এগিয়ে দেয়। অবাক চোখে তাকায় আনিতা। আনিতা নাইফ নিচ্ছে না বলে আহিয়ান বলে,

–“কি হলো? ধরো নাইফটা।”

এই বলে আহিয়ান নিজেই আনিতার হাতে নাইফ দেয়। তারপর আহিয়ান আনিতার হাত ধরে দুজনে একসাথে কেক কাটে। আহিয়ান কেক কেটে ছোট্ট একটা কেকের টুকরো হাতে নিয়ে আনিতাকে খাইয়ে দেয়। আহিয়ান আনিতাকে বলে,

–“আমাকে খাইয়ে দিবে না?”

আনিতা এখনো অবাক চোখে আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা কি করছে এসব? আহিয়ান আবারো আনিতাকে ডাকে। কিন্তু এবারেও আনিতার হুশ নেই। আহিয়ান আনিতার কাঁধে হাত রাখতেই আনিতা চমকে তাকায় আহিয়ানের দিকে। আহিয়ান বলে,

–“কি হলো আমাকে খাইয়ে দিবে না?”

আনিতা কিছু না বলে এক টুকরো কেক নিয়ে আহিয়ানকে খাইয়ে দিলো। আনিতার অগোচরেই আহিয়ান মুচকি হাসলো। তারপর আনিতাকে বলে,

–“আচ্ছা অনেক হয়েছে এবার যাও তুমি। পরে কেউ দেখে ফেললে উল্টাপাল্টা ভাববে।”

আনিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চলে আসতে নেয় ছাদ থেকে। আহিয়ান আবারো হাত টেনে ধরে থামিয়ে দেয় আনিতাকে। আনিতা পিছু ঘুরে তাকালো। আহিয়ান একটা শপিং ব্যাগ আনিতার হাতে দিয়ে বলে,

–“এটা তোমার জন্য।”

–“কি আছে এতে?”

–“খুলেই দেখে নিও।”

–“কিন্তু আমি এটা নিতে পারবো না।”

–“প্লিজ। আমার এত স্পেশাল দিনটাকে সেলিব্রেট করতে তুমি হেল্প করলে আর তোমাকে আমি কিছু দিবো না? তা কি করে হয় বলো তো?”

–“আমার কিছু লাগবে না।”

–“প্লিজ আনি__মানে আনিতা রাখো এটা। তুমি যদি এটা রাখো তাহলে আমি সত্যিই খুব খুব খুশি হবো। প্লিজ।”

আনিতা আর কিছু না বলে ব্যাগটা হাতে নিয়ে নিচে নেমে যায়। আহিয়ান আনিতার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মুচকি হাসে। তারপর আহিয়ান নিজেও ফাইয়াজদের ছাদ দিয়ে নিচে নেমে যায়।



চলবে।

#শুধু_তোমারই_জন্য
#পর্ব_১৩ (ধামাকা পর্ব)
#Ornisha_Sathi

কেটে যায় আরো কয়েকটা দিন। আদৃতের ফোন এখনো বন্ধ। না অনলাইনে এসেছে আর না নাম্বার অন করেছে। আনিতাও আর চেষ্টা করেনি রাতুল বা আরহানের মাধ্যমে আদৃতের সাথে কথা বলার। সারাদিন খুব ভালোভাবেই কাটায় সবার সাথে। কিন্তু দিনশেষে রাতে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ধরে রাখতে পারে না নিজের চোখের পানিগুলো।

আদৃতের জন্য কিনে রাখা গিফটগুলো কলেজ ব্যাগ থেকে বের করলো আনিতা। আদৃতের জন্য একটা পাঞ্জাবিও কিনতে চেয়েছিলো সাথে কিন্তু মাপ না জানায় কিনতে পারেনি। এ ক’দিন গিফটগুলো ওর কলেজ ব্যাগেই ছিলো। বের করেনি আর। আজকে বের করলো আলমারি তে তুলে রাখার জন্য। এভাবে তো আর সবসময় কলেজ ব্যাগে নিয়ে ঘুরা যায় না। যেই ভাবা সেই কাজ শপিং ব্যাগটা নিয়ে আনিতা আলমারি তে তুলে রাখলো।

আলমারি আটকানোর সময় হঠাৎ করেই আহিয়ানের দেওয়া সেই ব্যাগটা চোখে পড়ে আনিতার। এতদিনেও সেটা একবারের জন্যও খুলে দেখেনি ও। সেদিন ছাদ থেকে নেমেই আলমারিতে তুলে রেখেছিলো আনিতা। খোলার প্রয়োজন মনে করেনি আর। হাত দিয়ে ব্যাগটা ছুঁয়ে দিলো আনিতা। হুট করেই ব্যাগের ভিতর কি আছে তা জানার জন্য বেশ কৌতূহল জাগলো আনিতার মনে। ব্যাগটা বের করে আনিতা আলমারি আটকে দিলো।

আজকে আনিতা কলেজ যায়নি। ঠিক করেছে ক’দিন কলেজ যাবে না ও। এসময় কেউ আসবে না। অনিমা স্কুলে আর আম্মুও রান্না করছে। তবুও আনিতা দরজা লাগিয়ে নিবে ভাবলো। বলা তো যায়না কখন কে চলে আসে। শপিং ব্যাগটা বিছানায় রেগে দরজা আটকে দিলো আনিতা। এবার দেখা যাক এই ব্যাগে কি আছে।

আনিতা ব্যাগটা খুলে দেখে তাতে, সিলভার কালারের দু জোড়া ঝুমকো আর দু মুঠো চুড়ি, আর সাথে খুবই সিম্পল একটা ব্রেসলেট আছে। ব্রেসলেট খুব সিম্পল হলেও ডিজাইনটা একদম ইউনিক। খুবই সুন্দর। ব্রেসলেটটা আনিতার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবলো আহিয়ান হঠাৎ এসব কেন দিলো ওকে?

আমি যে উনার সাথে সত্যি কালকে থাকবো এটা তো উনি নিশ্চিত ছিলো না। তাহলে এগুলো কখন কিনলো? তবে কি আগে থেকেই কিনে রেখেছিলো? কিন্তু আমার জন্য আহিয়ান এসব কেন কিনবে? তবে কি অন্য কারো জন্য কিনে রেখেছিলো? কিন্তু অন্যের জন্য কিনে রাখা জিনিস আমাকে কেন দিবে? উফস ভাবতে পারছি না আর। এসব ভেবে আনিতা দু হাতে মাথা চেপে ধরলো।

হাটুতে দু হাত রেখে তাতে মাথা রাখলো আনিতা। একমনে ভেবে চলেছে সব কিছু। আহিয়ানের প্রথম এখানে আসা। আদৃতের ওর সাথে পরিচয়। অবাক করা বিষয় হলো দুজনের সাথে ওর একই দিনে পরিচয় হয়েছে। আর মাঝে মাঝে আহিয়ানকে কেমন যেন অদ্ভুত লাগে আনিতার কাছে। আর হুট করেই আহিয়ান চলে আসলো কালকে। ফাইয়াজ তো গ্রামে আসার আগে সবসময় জানায় আনিতাকে তবে এবার কেন জানালো না? আসার আগেরদিনও তো আনিতার ফাইয়াজ তন্ময় দুজনের সাথেই কথা হয়েছে এরা তো কিছুই বলল না। কাল তো আদৃতের আসার কথা ছিলো। কিন্তু হঠাৎই ফোন দিয়ে বলে জরুরী কাজ পড়ে গিয়েছে আসতে পারবে না। কাল তো আনিতা আর আদৃতের সম্পর্কের এক বছর হলো৷ কিন্তু আহিয়ান কালকে কিসের ওয়ান ইয়ার সেলিব্রেশন করলো? তাও আবার আনিতার সাথেই৷ সে চাইলে তো অন্য কারো সাথেও সেলিব্রেশন করতে পারতো। তাহলে আনিতার সাথেই কেন? তবে কি আদৃত আর আহিয়ান দুজনে একই মানুষ?

পরক্ষণেই এসব উদ্ভট চিন্তাধারার কথা ভেবে আপন মনেই হাসলো আনিতা। আদৃত আর আহিয়ান দুজনে কেন একই মানুষ হতে যাবে? দুজনেই আলাদা আলাদা মানুষ।

আহিয়ানের দেওয়া গিফটগুলো আবার তুলে রাখলো আলমারিতে। আর মনে মনে ভাবলো পরে একসময় আহিয়ানকে জিজ্ঞেস করে নিবে এসব কি শুধুই কাল রাতে ওর সাথে ছিলো বলে? নাকি এর পিছনে অন্য কোনো কারন আছে।

অনেকটা সময় যাবত দরজায় কড়া নারার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো আনিতার। আড়মোড়া ভেঙে শোয়া থেকে উঠে বসলো। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে দুইটা সাইত্রিশ বাজে। বিছানা থেকে নেমে চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। দরজা খুলতেই দেখে অনিমা দাঁড়িয়ে আছে। আনিতা দরজা খুলতেই অনিমা রুমে ঢুকে পড়লো। আনিতাও হাই তুলতে তুলতে কাবার্ড থেকে জামা বের করে গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে গেলো।

বেশ ক্ষানিকটা বাদে চুলে টাওয়াল পেঁচিয়ে বের হয়ে এলো আনিতা। এখন আর ছাদে উঠতে ইচ্ছে করলো না তাই বারান্দায়ই ভেজা কাপর গুলো শুকানোর জন্য মেলে দিলো। চুল থেকে আর টাওয়াল খুলল না আনিতা ওভাবেই ডাইনিংয়ে চলে গেলো খাওয়ার জন্য। খাবার খেয়ে আবারো রুমে চলে এলো আনিতা।

কানে ইয়ারফোন গুজে “এই অবেলায়” গানটা শুনছিলো আনিতা। হুট করেই আনিতার স্মৃতিচারণে আদৃত ধরা দিলো। আদৃতের কথা মনে হতেই চোখ খুলে ফেলল আনিতা। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে আনিতা। আদৃতের কথা হাসি আদৃতের বলা ভালোবাসি এমন কি প্রত্যেকটা কথা একে একে মনে হতে লাগলো আনিতার৷ চোখ আবারো জলে ভরে উঠছে। কিন্তু আনিতা খুব করে চাইছে চোখের পানিগুলো যাতে বের না হয়।

যে মানুষটা এভাবে হুট করে ওর লাইফ থেকে কোনো কারন ছাড়াই হারিয়ে যেতে পারে তার জন্য ও আর কান্না করবে না। আজ নয় দিন হলো আদৃতের সাথে আনিতার কথা হয় না। এর মাঝে একবারো আদৃত ফোন অন করেনি আর অনলাইনেও আসেনি। আরহান আর রাতুলের সাথে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছিলো আনিতার। আদৃতের খোঁজ ঠিকই ওদের থেকে নিয়েছে আনিতা। কিন্তু একবারের জন্যও বলেনি আদৃতকে ওর সাথে কথা বলতে। আনিতা আর চায় না আদৃত জোরপূর্বক ওর সাথে কোনো সম্পর্কে থাকুক। তাই তো সব পাগলামি করা ছেড়ে দিয়েছে এখন আনিতা। কিন্তু পাগলামি ছেড়ে দিলেও কি আর ভুলা যায়? ভুলে থাকা যায় নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে?

যে মানুষটার কাছে আনিতার কোনো মূল্য নেই সেই মানুষটার জন্য আর কাঁদবে না ও। আর ফিরিয়ে আনতে চাইবে না নিজের লাইফে। এতদিনে আনিতার বোঝা হয়ে গিয়েছে আদৃত যদি সত্যি ওকে ভালোবাসতো তাহলে এভাবে অন্তত ওকে কষ্ট দিতে পারতো না। একবারের জন্য হলেও ওর খোঁজ নিতো। ওর সাথে এতদিন কথা না বলে কিছুতেই থাকতে পারতো না।

“কিন্তু আমার কি দোষ ছিলো? আমি তো আদৃতকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। ওর সবটা মেনে ওকে ভালোবাসতাম। ওর সব অবহেলা ইগনোর ওর দেওয়া মানসিক যন্ত্রণা সব সবটা সহ্য করেও শুধু ওকেই ভালোবেসেছিলাম। সেই ভালোবাসার প্রতিদান ও এভাবে দিলো?”

নিজের মনেই কথাগুলো বলে চোখ আবারো বন্ধ করে নিলো আনিতা। সাথে সাথেই চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আনিতা আর ভাবতে পারছে না কিছু। সবকিছু কেমন যেন অসহ্য লাগছে ওর কাছে। দিনে দিনে কেমন যেন ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে ও। কিছুই ভালো লাগছে না , কারো ভালো কথাটা অব্দি সহ্য হচ্ছে না ওর। অল্পতেই রিয়্যাক্ট করে ফেলছে। এভাবে তো চলতে পারে না। এসব থেকে ওর বের হতে হবে। নিজেকে আরো শক্ত করে তুলতে হবে ওর। আর কিছুতেই ভেঙে পড়বে না ও। মনে মনে এসব ভেবে চোখের কোনের পানিটা মুছে নিলো আনিতা। ফোন হাতে নিয়ে গান বন্ধ করে দিয়ে ইয়ারফোন খুলে বালিশের পাশে রাখলো। তারপর পা বাড়ালো ছাদের দিকে।

—-

ফাইয়াজ ছাদে দাঁড়িয়ে তাসকিয়ার সাথে ফোনে কথা বলছিলো। ফাইয়াজের কোনো বন্ধুকেই দেখা যাচ্ছে না এখানে৷ হুট করেই ফাইয়াজের চোখ আনিতার দিকে গেলো। আনিতা রেলিং ধরে একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। আনিতাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাসকিয়াকে বাই বলে ফোন রেখে দিলো ফাইয়াজ। ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ওদের ছাদ থেকে লাফিয়ে আনিতাদের ছাদে আসলো ফাইয়াজ।

আনিতা এখনো একমনে সামনের মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। সেখানে ছোট ছোট বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে। আর বাচ্চাদের সাথে সেখানে আহিয়ানও খেলছে। মাঠের এক সাইডে তন্ময় আদনান আরহান বসে আছে। ফাইয়াজ আনিতার কাঁধে হাত রাখতেই আনিতা পাশ ফিরে তাকালো। ফাইয়াজ বলে,

–“এখান একা একা দাঁড়িয়ে আছিস যে?”

–“এমনি ভালো লাগছিলো না। তাই ছাদে এলাম।”

–“আনি বুড়ির কি মন খারাপ?”

–“নাহ ভাইয়া। তোমার বন্ধুরা তো ওই মাঠে আছে তুমি ছাদে একা কি করছো?”

–“কি আর করমু বল? তোর বান্ধুবীর সাথে কথা বলছিলাম।”

–“ওহ আচ্ছা।”

এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে থাকে দুজনে। তাসকিয়া যেমন ফাইয়াজকে পাগলের মতো ভালোবাসে তেমনি ফাইয়াজও। ওদের দুজনের ভালোবাসাটা আনিতার কাছে খুব ভালো লাগে। আনিতা আবারো মাঠের দিকে তাকালো। আহিয়ান এখনো বাচ্চাদের সাথে খেলছে। হঠাৎ করেই আনিতা মুচকি হাসে ওদিকে তাকিয়ে। তা দেখে ফাইয়াজ বলে,

–“কিরে বুড়ি ওদিকে তাকিয়ে এভাবে হাসছিস কেন?”

–“তোমার বন্ধুকে দেখো বাচ্চাদের সাথে কিভাবে খেলছে।”

–“আহিয়ান বরাবরই এমন।”

আনিতা কিছু বলবে তার আগেই ফাইয়াজের ফোন বেজে উঠে। আনিতা ভেবেছিলো তাসকিয়ার ফোন তাই ও কেড়ে নিলো। কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে দেখে আহিয়ানের ফোন। তাই ফোনটা আবার ফাইয়াজের হাত দিয়ে বলল,

–“লাউডে দিয়ে কথা বলো তো।”

ফাইয়াজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

–“কেন?”

–“এমনি তন্ময় ভাইয়া কথা তো অনেকবার শুনেছি। কিন্তু আহিয়ান ভাইয়া তো কখনো কথা বলেনি আমার সাথে। তাই তার ভয়েসটা শুনতে চাইছিলাম আর কি। দেখতাম আর কি এত মেয়েরা তোমার বন্ধুর কি দেখে প্রেমে পড়ে? ”

ফাইয়াজ হেসে দিলো আনিতার কথা শুনে। ততক্ষণে ফোন কেটে গিয়েছে। ফাইয়াজ হেসেই আহিয়ানের নাম্বারে ডায়াল করলো। আহিয়ান ফোন রিসিভ করতেই ফাইয়াজ লাউডে দিয়ে কথা বলতে শুরু করলো।

আহিয়ানের কন্ঠ শুনে আনিতা চমকে উঠলো। অবিকল আদৃতের মতো ভয়েস। তবে কি আহিয়ানই আদৃত? হঠাৎই আনিতার সকালের কথা মনে পড়ে যায়। সকালেও একবার আনিতা ভেবেছিলো আদৃত আর আহিয়ান একই মানুষ। আহিয়ানের বিহেভিয়ার গুলো এবারে একটু অন্যরকম লাগছে। আনিতা ভাবতে পারছিলো না আর কিছু। হাত পা অসার হয়ে আসছিলো ওর। আচ্ছা আহিয়ানের ফুল নেম কি? ফাইয়াজ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করবো একবার? মনে মনে এসব ভাবছে আনিতা। তারপর একপ্রকার ঘোরের মাঝেই জিজ্ঞেস করে

–“আচ্ছা ভাইয়া তোমার বন্ধুদের ফুল নেইম কি?”

ফাইয়াজ ফোন পকেটে রেখে দিলো। আনিতার প্রশ্নে কপাল কুঁচকে তাকালো একবার ওর দিকে। তারপর আবার বলল,

–“কেন বল তো?”

–“না এমনি জিজ্ঞেস করছিলাম আর কি।”

–“তন্ময় এর ফুল নেম তো জানিসই। আর আরহানের ফুল নেম তো আরহান নিজেই সেদিন বলল তোকে। বাকি রইল আহিয়ান আর আদনান।”

–“হুম। আদনান আর আহিয়ান ভাইয়ার ফুল নেম কি?”

–“আহিয়ান আদৃত আর রাতুল আদনান।”

চমকে তাকালো আনিতা। তারমানে ওর ভাবনাটাই সত্যি? আহিয়ান আর আদৃত কেউই আলাদা আলাদা মানুষ নন? দুজনেই এক? রাতুল আরহান সবাই ওকে মিথ্যে বলল? সব থেকে বড় কথা আদৃত মিথ্যে বলল ওকে? আর তন্ময় ভাইয়া? তন্ময় ভাইয়াকে তো নিজের ভাই ভেবেছিলাম। সেই ভাইও এভাবে মিথ্যে বলল? এভাবে ঠকালো সবাই মিলে? আনিতার ভালোবাসা, বিশ্বাস সব এভাবে ভেঙে চুরমার করে দিলো আদৃত? আনিতা আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। কিচ্ছু না। মাথাটা অসহ্য যন্ত্রণা করছে।

তখনই আনিতাদের ছাদে আসলো আহিয়ান ওরা। আনিতা টলমলে চোখে একবার তাকালো আহিয়ানের দিকে। আনিতার এমন চাহনি দেখে আহিয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। সাথে সাথেই চোখ সরিয়ে নিলো আহিয়ান। আনিতা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলো। একমাত্র আনিতাই চুপচাপ সবটা শুনে যাচ্ছিলো। ফাইয়াজের ফোন বেজে উঠে। তাকিয়ে দেখে তাসকিয়ার ফোন। তাই ফাইয়াজ আনিতাদের ছাদ থেকে নিজেদের ছাদে চলে গেলো ফোন রিসিভ করে। তন্ময় আরহান আদনান উফস সরি আদনান না রাতুল ওরা তিনজনে কথা বলছে। আহিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে আনিতার দিকে তাকাচ্ছে।

বেশ কিছুটা সময় চুপ থাকার পর আনিতা আহিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আহিয়ান চোখ তুলে তাকায় একবার আনিতার দিকে। আনিতার চোখদুটো কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। আনিতা আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,

–“কেন এমনটা করলেন আপনি আমার সাথে?”

অবাক চোখে তাকায় আহিয়ান। আনিতার কথা শুনে তন্ময় রাতুল আরহান ওরাও কথা থামিয়ে অবাক চোখে তাকায় আহিয়ান আর আনিতার দিকে। আহিয়ান কিছুটা অবাক হয়েই বলে,

–“মানে? কি করলাম আমি? তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না আমি।”

আহিয়ানের কথা শুনে চোখে একরাশ রাগ নিয়ে তাকায় আনিতা ওর দিকে। তারপর হুট করেই আহিয়ানের শার্টের কলার চেপে ধরে কিছুটা চিৎকার করেই আনিতা বলে,

–“বুঝতে পারছেন না? নাকি বুঝতে চাইছেন মিস্টার আহিয়ান আদৃত?”

আনিতার মুখে আদৃত নামটা শুনে চমকে তাকায় আহিয়ান। সাথে ওরা তিনজনও চমকে যায়। আহিয়ান ভাবছে কি করে জানলো আনিতা এটা? ওর তো জানার কথা নয়। তাহলে আনিতা এসব বলছে কিভাবে? আহিয়ানকে চুপ করে থাকতে দেখে আনিতা আবারো চিৎকার করে বলে,

–“কি হলো? উত্তর দিন বলছি। কেন এমনটা করলেন আপনি আমার সাথে? কি ক্ষতি করেছিলাম আপনার? কেন এভাবে আমার লাইফটা শেষ করে দিলেন আপনি?”

……….

–“সেদিন মজা করেই রাইসার সামনে ওমন বিহেভিয়ার করেছিলাম বলে? সেদিন আমার জন্য রাইসার সাথে আপনার সব সম্পর্ক শেষ হয়েছিলো বলে এমনটা করলেন আপনি? তার শোধ আপনি এভাবে তুললেন?”

–“আনি তুমি ভুল বুঝছো___”

–“খবরদার বলছি একদম ওই নামে ডাকবেন না আপনি আমাকে। আমাকে ওই নামে ডাকার কোনো অধিকার নেই আপনার।”

–“আমার কথাটা শুনো তুমি যা ভাবছো তা ঠিক নয়।”

–“কি শোনার বাকি রেখেছেন আপনি? অস্বীকার করতে পারবেন আপনি আমার সাথে খেলেন নি? অস্বীকার করতে পারবেন আপনি আমার সরলতার সুযোগ নেননি? অস্বীকার করতে পারবেন আপনি আমার বিশ্বাস নিয়ে খেলেননি?”

আনিতার কথায় চুপ করে রইল আহিয়ান। সাথে ওর বন্ধুরাও। আহিয়ান ভাবেনি এভাবে সবটা আনিতার সামনে এসে যাবে। ও ভেবেছিলো নিজে আর কিছুটা সময় নিয়ে সবটা জানাবে আনিতাকে। কিন্তু তার আগেই আনিতা সবটা জেনে গেলো। আহিয়ানকে চুপ থাকতে দেখে আনিতা আবারো চিৎকার করে বলে,

–“বলুন অস্বীকার করতে পারবেন আপনি?”

–“আ্ আমি স্বীকার করছি যা করেছি ভ্ ভুল করেছি। ত্ তোমার বি্ বিশ্বাস ভেঙেছি আমি। কিন্তু বিশ্বাস করো রাইসার জন্য তোমার উপর থেকে কোনো শোধ নেইনি আমি। ভালোবাসি না আমি রাইসাকে। ইভেন তখন কাউকেই ভালোবাসতাম না আমি।”

–“হ্যাঁ জানি তো আপনি কাউকে ভালোবাসেন না। কিন্তু আমার সাথেই কেন এমন করলেন? আমি তো কোনো ক্ষতি করিনি আপনার। তাহলে কেন আমার ভালোবাসা নিয়ে খেললেন আপনি?”

–“তো্ তোমার ভালোবাসা নিয়ে আমি খেলিনি আনি। আ্ আমিও ভা্ ভালোবেসে ফেলেছি তো্ তোমাকে।”

–“চুপ একদম চুপ। অনেক মিথ্যে তো বলেছেন আর কতো? আর একটা মিথ্যেও আমি আপনার থেকে শুনতে চাই না।”

–“আমি মিথ্যে বলছি না আনিতা।”

–“আই হেইট ইউ। আই রিয়েলি হেইট ইউ। ঘেন্না করি আমি আপনাকে বুঝতে পেরেছেন?”

এই বলে আনিতা আহিয়ানের থেকে সরে দাঁড়ালো। পেছাতে পেছাতে একসময় ছাদের রেলিঙের সাথে আটকে গেলো আনিতা। পরে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিলো ও। তন্ময় কিছুটা এগিয়ে এসে বলে,

–“আনিতা সাবধানে পরে যাবে তো।”

তন্ময়ের কথাতেও হাসলো আনিতা। একপা দুপা করে এগিয়ে গেলো তন্ময় আরহান রাতুল ওদের সামনে। তারপর কিছুটা চিৎকার করেই বলে,

–“মিথ্যেবাদী। আপনারা সবাই মিথ্যেবাদী। সব্বাই মিলে ঠকিয়েছেন আমাকে।”

মাথা নিচু করে নিলো ওরা। এই মেয়েটার সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো কোনো কাজ ওরা করেনি। ওরা সকলেই জানতো আনিতা আহিয়ানকে কতটা ভালোবাসে। তারপরও ওরা সবটা লুকিয়ে গিয়েছে আনিতার থেকে। সত্যিটা জানায়নি ওকে। আনিতার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস হচ্ছে না ওদের।

আনিতা তন্ময় এর দিকে তাকিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলো। তন্ময় মুখ তুলে তাকালো আনিতার দিকে। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে আনিতা। তন্ময়ের চোখে অপরাধবোধ স্পষ্ট। আনিতা ছলছলে চোখে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

–“তুমিও মিথ্যে বললে আমাকে তন্ময় ভাইয়া? আমার নিজের ভাই নেই তোমাকে আমি নিজের ভাইয়ের জায়গাটা দিয়েছিলাম। তুমিও তো আমাকে বোনই ভাবতে তাই না? তাহলে কি করে পারলে বোনকে এভাবে ঠকাতে?”

তন্ময় কিছু বলল না। কি ই বা বলার থাকতে পারে ওর? আনিতা হাসলো ক্ষানিকটা। আনিতা একবার আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে আবারো চোখ ফিরিয়ে নিলো। তারপর তন্ময়কে বলে,

–“রাতুল আরহান ওদের কথা বাদ দিলাম। আহিয়ান তার কথা আর কি বলবো বলো? তার তো কাজই এটা। মেয়েদের ইমোশনস নিয়ে খেলা করা। এটা করতেই সে ভালোবাসে। তাকে ভালোবেসে মেয়েরা যে কাঁদে তার জন্য পাগলামি করে তার একটু ভালোবাসা পাবার জন্য মেয়েরা তার কাছে হাতজোর করে আকুতি মিনতি করে এসব তোমার বন্ধু উপভোগ করে। সেজন্যই তো এসব করে বেরায়। কিন্তু তুমি? তুমি তো আমাকে নিজের বোন বলেছিলে তুমি কিভাবে আমাকে একটা বছর যাবত এভাবে ঠকালে? এসব করতে বিবেকে বাধেনি তোমাদের একবারের জন্যও?”

চোখ তুলে তাকালো আহিয়ান। এগিয়ে আসছিলো আনিতার দিকে। আহিয়ান কিছু বলতে যাচ্ছিলো আনিতাকে। কিন্তু তন্ময় চোখ দিয়ে ইশারা করে না বলে। আহিয়ানও থেমে যায় সেখানেই। আর কিছুই বলে না। তন্ময় আনিতাকে বলে,

–“আগে আহিয়ান এমন ছিলো আমি মানছি সেটা আনিতা। কিন্তু বিশ্বাস করো তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর ও আর একাধিক সম্পর্কে জড়ায়নি। সবাইকে ছেড়ে দিয়েছিলো সব কিছু ছেড়ে দিয়েছিলো। শুধুমাত্র তোমার জন্য। #শুধু_তোমারই_জন্য আহিয়ান নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে নিয়েছে।”

–“অনেক হয়েছে ভাইয়া। আর নিজের বন্ধুর হয়ে সাফাই গাইতে হবে না।”

–“সাফাই গাইছি না আনিতা। মানলাম আমাদের সকলের ভুল হয়েছে। অন্যায় করেছি আমরা। কিন্তু তোমার প্রতি আহিয়ানের ভালোবাসাটা মিথ্যে নয় আনিতা। ও সত্যি____”

–“আর কিছু শুনতে চাইছি না আমি। প্লিজ এই বিষয়ে আর কিছু বলো না আমাকে।”

এই বলে আনিতা আবার আহিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আহিয়ান অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে আনিতার দিকে। আহিয়ানের চোখে স্পষ্ট অসহায়ত্বের ছাপ। আনিতা চোখের পানিটা মুছে নিয়ে মলিন হেসে বলে,

–“আজকের পর থেকে আদৃত যে আনিতা কে জানতো সেই আনিতা মরে গিয়েছে। মরে গিয়েছে আদৃতের পিচ্চি পাখি। মরে গিয়েছে।”

এই বলে আনিতা দৌড়ে ছাদ থেকে নেমে গেলো। আহিয়ান বেশ কয়েকবার ডেকেছে আনিতাকে। কিন্তু আর শুনেনি এমনকি পিছু ফিরেও তাকায়নি। তন্ময় এসে আহিয়ানের কাঁধে হাত রাখতেই আহিয়ান বলে,

–“ভুল বুঝলো ও আমাকে। বিশ্বাস কর রাইসার সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার জন্য আমি ওর সাথে এমনটা করিনি। আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি ওকে। ওর মন নিয়ে ভালোবাসা নিয়ে খেলিনি আমি।”

–“আমি জানি আহিয়ান। আমাকে বলতে হবে না এসব।”

–“শুরুতে আমার পরিচয় লুকিয়েছিলাম আমি। কারন আমি কখনো ভাবিনি এভাবে ওকে ভালোবেসে ফেলবো। আমি জাস্ট ফ্রেন্ডলি কথা বলতে চাইছিলাম ওর সাথে। আর আনিতা সেসময় আমাকে মানে আহিয়ানকে একদমই পছন্দ করতো না। তাই আদৃত হয়েই কথা বলেছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস কর যদি জানতাম এমন একটা পরিস্থিতি চলে আসবে। এমন একটা সময় চলে আসবে যে ওকে আমি ভালোবেসে ফেলবো তাহলে কখনোই ওকে শুরুতে মিথ্যেটা বলতাম না আমি।”

–“বুঝেছি ইয়ার। এখন এসব কথা রেখে ভাব কি করে ওর রাগ ভাঙাবি। আমার বোনটা কিন্তু খুব রেগে গিয়েছে। কষ্টও পেয়েছে খুব।”

তন্ময় এর কথায় আরহান রাতুল দুজনেই সহমত প্রকাশ করে। আর এটাও জানায় যে আনিতা তো ভালোবাসে ওকে তাই বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না। ওদের কথায় আহিয়ান বলে,

–“ওর রাগ তো ভাঙাবোই আমি। আনিতা ছাড়া যে আমার একদমই চলবে না। তাই যতদিন না ওর রাগ ভাঙাতে পারছি ততদিন এখান থেকে কোত্থাও যাচ্ছি না।”



চলবে