#এক_বরষায় [৪]
জেরিন আক্তার নিপা
ছুটির দিন ছিল। কোচিং প্রাইভেট সব বন্ধ। সেদিন সকালে জেসমিন আপুর সাথে বেরিয়েছিল। উদেশ্য নয়ন ভাইদের বাড়ি যাবে। আপু সচরাচর নয়ন ভাইয়ের বাড়িতে যেতে চায় না। যদিও নয়ন ভাইয়ের বড় বোনের সাথে আপুর সম্পর্ক বেশ ভালো। কাল নয়ন ভাই তাকে বড়সড় একটা ট্রিট দিয়েছে। তাই আজ জেসমিন নয়ন ভাইয়ের কথা মতো আপুকে ওদের বাড়িতে যেতে রাজি করিয়ে ফেলেছে। এই রাজি করানোর পেছনেও কত ইতিহাস আছে। বললে পুরো দিন লেগে যাবে। ওরা গেট থেকে বেরিয়ে সামনে তাকাতেই একটা মাল ভর্তি পিকাপ দেখতে পেল। ঠিক তাদের বাড়ির সামনে এসেই দাঁড়িয়েছে। জেসমিন ধারার পাশে সরে গিয়ে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
‘আজ কয় তারিখ রে আপু?’
‘বছরের শেষ দিন। কেন?’
‘আমাদের ভাড়াটে এসেছে।’
‘এটা?’
‘হুম।’ জেসমিনকে খুশি খুশি দেখাচ্ছে। যেন অচেনা কোন ভাড়াটে না তার খুব কাছের কোন আত্মীয় এসেছে। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এলো। ছেলেটাকে দেখে সঠিক বয়স আন্দাজ করা যাচ্ছে না। কিন্তু এই ছেলের বয়স কোনোভাবেই ষোল সতেরোর বেশি হবে না। দেখেই কেমন শিশু শিশু লাগছে। জেসমিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে গাড়ি থেকে আরও কেউ নামবে। কিন্তু ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটা ছাড়া আর কেউ নামলো না৷ ওরা দু’জন নেমে হাতাহাতি করে গাড়ি থেকে মাল সামান নামাতে লাগল। জেসমিনের কপাল কুঁচকে গেল। বাবা এই শিশুকে ঘর ভাড়া দিয়েছে!
যেহেতু তাদের বাড়ির সামনে এসেই জিনিসপত্র নামাচ্ছে। তাই ধারা ধরে নিল এটাই নতুন ভাড়াটে। সে ছেলেটার দিকে এগিয়ে এলো। এসে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমিই কি আমাদের বাড়িতে উঠেছ?’
ছেলেটা ধারাকে দেখল। ওকে দেখে লজ্জা পেল নাকি কে জানে। মুখটা লাল হয়ে গেল ওর।
‘জি।’
গলাটা কিশোরদের মতো মোটা। একটা সময় আছে যখন ছেলেদের গলার স্বর পাল্টায়। এই ছেলেটাও সেই সময় পার করছে। এর বয়স অনুমান করল ধারা। পনেরো? ষোল এর বেশি হবে না। ধারা আবার জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি একাই এসেছ?’
‘জি।’
‘মানে তুমি একাই থাকবে? তোমার সাথে পরে আর কেউ আসবে না?’
‘না আপু।’
কেনই যেন এই ছেলের মুখে আপু ডাকটা শুনে ধারার এর জন্য মায়া হলো। আহা বেচারা! এটুকু বয়সে বাবা মা ছেড়ে একা থাকতে এসেছে। জেসমিন কটমট চোখে এতক্ষণ বোনকে দেখছিল। এমনিতে তো কারো সাথে কথা বলে না। এই ছেলের সাথে এত খাতির লাগাচ্ছে কেন?
ধারা জেসমিনের কাছে এসে দাঁড়ালে জেসমিন চাপা গলায় বলল,
‘বাবা এই পুচকে ছেলেকে ঘর ভাড়া দিয়েছে?’
ধারা বোনকে দেখল। ও যে খুশি হয়নি এটা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ধারা মনে মনে হাসল। আহা বেচারি! সুদর্শন সুপুরুষ ভাড়াটের আশায় ছিল। তার জায়গায় এখন এই বয়সে ছোট ছেলেকে দেখে শক খেয়েছে।
‘বাবা ভালো কাজই করেছে। আমাদের থেকে বাবার বুদ্ধি যে বেশি এটাই প্রমাণ।’
‘ভালো কাজ করেছে না কচু করেছে। একটা দুধের শিশুকে বাড়িতে জায়গা দিয়েছে।’
‘এই ছেলে তোর থেকে ছোটই হবে মনে হচ্ছে।’
‘দূর! ভাল্লাগে না।’
জেসমিন রাগ দেখিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল। ধারাও গেল। আজ আর রোজী আপুেদর বাসায় যাওয়া হবে না। দুপুরে এই ছেলে তো ওদের সাথেই খাবে। বাবা ওকে কী বলে এনেছে কে জানে। এই ছেলে নিশ্চয় নিজে রান্না করে খাবে না।
******
একটা পিকাপ জিনিসপত্র নিয়ে ধারাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দোকানে বসে এই দৃশ্যটি দেখল নয়ন। ধারা মাত্র গেট থেকে বেরিয়েছিল। জেসমিন ওকে তাদের বাড়িতেই নিয়ে যেত। কিন্তু এই ভাড়াটে ক্যাচাল লাগিয়ে দিয়েছে। পিকাপ থেকে একটা ছেলে নেমেছে। নয়নকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়ে ধারা এগিয়ে গিয়ে ছেলেটার সাথে কথা বলছে! শুধু সে বাদে ধারা পৃথিবীর সবার সাথেই কথা বলে। তাকে দেখলেই শুধু মুখের চেহারা ঘুটঘুটে অন্ধকার করে ফেলে। পারভেজ নয়নের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে,
‘ভাই আপনি কইলে ছেলেটারে এইখান থেইকাই আবার ফেরত পাঠাই দিমু।’
‘না থাক। তোদের কিছু করতে হবে না।’
‘ঠিক আছে ভাই। কিন্তু আপনি চিন্তা কইরেন না ভাই।’
নয়ন ভাবছে এবার যেভাবেই হোক মা’কে রাজি করিয়ে ধারাদের বাড়ি পাঠাতেই হবে। কিন্তু মা’কে যে কীভাবে রাজি করাবে এটাই মাথায় আসছে না।
তাছাড়া বড় আপারও তো এখনও বিয়ে হয়নি। বড় বোনকে রেখে সে আগে বিয়ে করে ফেলবে!
‘আগে বড় আপার জন্য ছেলে খুঁজতে হবে।’
‘কিছু কইলেন ভাই?’
‘না।’
****
আতিফ এখানকার স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছে। এই বাড়িতে উঠার ব্যবস্থা তার এক দূরের মামা করে দিয়েছে। এখানে থেকেই পড়াশোনা করবে। মালপত্র সাথে যা যা এনেছিল ড্রাইভার লোকটা সবকিছু ঘরে তুলে দিয়ে গেছে। এই বাড়ির বড় মেয়েও বেশ ভালো। তাকে হাতমুখ ধুয়ে খেতে যেতে ডেকেছে।
ধারা স্বভাবত প্রথম পরিচয়ে কারো সাথে এত কথা বলে না। কিন্তু এই ছেলেটাকে তার অপরিচিত মনে হচ্ছে না। তাই টুকটাক অনেক কথাই জিজ্ঞেস করছে সে।
‘তোমার নাম কী?’
‘আতিফ আহমেদ।’
‘বাড়িতে কে কে আছে তোমার?’
‘মা আর আমি। আমরা মামার বাড়িতে থাকি।’
‘ওহ।’ ওর কথায় বুঝতে পারল ছেলেটার বাবা নেই। ধারার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
‘এবার কোন ক্লাসে উঠেছে তুমি?’
‘ক্লাস নাইনে ভর্তি হবো।’
‘তুমি তাহলে আমার বোনের থেকেও ছোট। ও এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে। তুমি কি ওর স্কুলেই ভর্তি হবে নাকি। এইটে কী পয়েন্ট পেয়েছিলে?’
‘জিপিএ ফাইভ।’
জেসমিনের বিরক্তির শেষ রইল না। আপুটা আজ এত বাচাল হয়ে গেছে কেন? এই ছেলের সাথে এত কথা বলার তো কোন মানে হয় না।
****
পরের দিন নতুন বছর। জেসমিন আজ শাড়ি পরে সেজেগুজে বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে যাবে। সাজতে তার বরাবরই ভালো লাগে। আজও অনেক সেজেছে। আফসোস তার একটা স্মার্ট ফোন নেই। ছবি তুলতে পারবে না। বান্ধবীদের আছে। বাবাকে সে ফোন কিনে দেবার কথা মরে গেলেও বলতে পারবে না। আপু ভার্সিটিতে পরে আপুই এখনও ফোন চালায় না। বাবা একটা কিনে দিয়েছিল অবশ্য। ওটা তো তার হাত থেকে পড়েই ভেঙেছে। তারপর আপুই না করে দিয়েছে তার ফোনের প্রয়োজন নেই৷ আপটা যে কী ক্ষ্যাত। এই যুগের কোন মেয়েটা আপুর মত জীবন কাটায়!
নয়ন ভাইয়ের থেকে চাইতে হবে। নয়ন ভাইয়ের ফোনটা কত বড়। আর কী সুন্দর ছবি উঠে। নয়ন ভাইয়ের কাছে চাইলেই দিবে। সে কিছু চাইবে আর নয়ন ভাই দিবে না এমনটা হতেই পারে না। আপুর জন্য হোক বা যে কারণেই হোক নয়ন ভাই তাকে স্নেহ করে। নয়ন ভাইয়ের ভয়েই তো আজ পর্যন্ত কোন ছেলে তাকে বিরক্ত করতে পারেনি। সবাই জানে জেসমিন নয়নের বোন।
‘আপু আমি বেরুচ্ছি।’
‘এই দাঁড়া, দাঁড়া। কোথায় যাচ্ছিস তুই?’
জেসমিন বিরক্ত হলো। বড় বোন থাকাই জ্বালা। সবকিছুর জবাবদিহিতা করতে হয়।
‘তোকে না বলেছিলাম।’
‘কোত্থাও যাবি না তুই। দেখো সাজ যে দিয়েছে। যেন যাত্রা দলের সর্দারনী। মুখ ধুয়ে ঘরে যা। যা বলছি।’
‘বছরের প্রথম দিনও আমি ঘরে বসে কাটাব নাকি!’
‘হ্যাঁ কাটাবি।’
‘কক্ষনো না। আমার বন্ধুরা আজ হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে। চাঁদা তুলে টিকেট কাটা হয়েছে। আমিও সমান চাঁদা দিয়েছি। না গেলে আমার টাকা লস যাবে।’
‘যাক। তবুও যাবি না তুই। আমার কথা না শুনে যদি যাস তাহলে বাবাকে বলতে বাধ্য হবো আমি।’
‘এ কেমন জ্বালা। আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে। তুই আজ আমার মা’র ভূমিকা পালন করছিস কেন? আমি কি আজ নতুন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাচ্ছি নাকি? আগেও তো কত গেছি।’
‘আগে গেলেও আজকের কথা ভিন্ন। পাড়ার সব বাউণ্ডুলে ছেলেরা আজ বাইরে থাকবে।’
জেসমিন হেসে বলল,
‘এইজন্য ভয় পাচ্ছিস তুই! নয়ন ভাই যতদিন এই পাড়ায় আছে ততদিন কারো কলিজায় সাহস আছে আমাকে কিছু বলার! নয়ন ভাই ওদের জিভ ছিড়ে ফেলবে। তুই তো জানিস না, নয়ন ভাইয়ের বোন আমি। সব ছেলেরা আমাকে ভয় পেয়ে চলে।’
******
আতিফ ছেলেটাকে ধারার সত্যি অর্থেই ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কত মিষ্টি করে আপু ডাকে। ওর সব কাজ করে দেয়। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ধারার কাছাকাছি থাকে। জেসমিন তার আপন বোন হয়েও কখনো রান্নার কাজে তাকে সাহায্য করতে আসেনি। আর এই ছেলে সেদিন তাদের বাড়িতে এসেছে। এটুকু সময়ের মধ্যে কত আপন হয়ে গেছে। রান্নাঘর পর্যন্ত চলে যায় এই ছেলে। বটি নিয়ে সবজি কাটতে বসে যায়। কিছু বললে বলে, মামী যদি পারত আমাকে দিয়ে রান্নাটাও করাতো। আমি সব পারি আপু। এখন তো আতিফই বাজার করে। প্রথম কয়েকদিন বাবার সাথে গিয়েছে। বাবা কীভাবে বাজার করে দেখতে দেখতে নাকি শিখে ফেলেছে। ধারা আগে বাড়িতে একা থাকত। জেসমিন তো সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। আতিফ আসায় তার একজন কথা বলার সাথী হয়েছে।
‘তোমার মা’কে যে মামার বাড়িতে একা রেখে এসেছ তোমার কোনরকম লাগে না?’
‘লাগে। মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। কিন্তু তোমার কাছাকাছি থাকলে মনে হয় আমি মা’র কাছেই আছি। মা-ও আমাকে তোমার মতোই আদর করে।’
ছেলেটা এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে ধারার চোখে পানি এসে যায়। সে কি সত্যিই কাউকে আদর করতে পারে? জেসমিন তো সবসময় বলে, জন্মের পরে তোর মুখে একটু মধু দিলে এত তিতা কথা বলতি না তুই। তোর জবান তো জবান না যেন নিমপাতার রস।
ধারার দিন ভালোই কাটছে। দাদী আগের থেকে অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছে। অসুখবিসুখ লেগেই থাকে। আতিফের সাথে জেসমিনের সম্পর্ক সাপে নেউলে। কেন যে ছেলেটাকে পছন্দ করে না ও।
আতিফ ওকে আপু ডাকলে জেসমিন ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে,
‘এই তোমার আপু কে হ্যাঁ? আমি তোমার আপু কবে হলাম? একদম আমাকে আপু ডাকবে না। আপু ডেকে খাতির জমাতে আসা হচ্ছে।’
ওর এত কড়া ধমক খেয়েও ছেলেটা মন খারাপ করে না। উল্টো ওকে রাগিয়ে দিয়ে দিনে একশো বার আপু ডাকে। দরকার না থাকলেও আপু ডেকে এটাসেটা জিজ্ঞেস করে।
চলবে