#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৩৯
________________
গোধূলি বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামবে কিছুক্ষনের মাঝে। চারপাশে গা ছমছমে হিম শীতল বাতাস বইছিল খুব। বাতাসে গাছের পাতারা কিছুক্ষন পর পর কেঁপে উঠছিল যেন। জানালা জুড়ে থাকা সাদা পর্দাটাও নড়ছিল বারংবার। আর এসবের ভিড়ে বিছানায় চুপচাপ বসে ছিল আদ্রিজা। আর তাঁর সামনেই খানিকটা চিন্তিত মাখা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে অভ্র, সে ঠিক বুঝচ্ছে না আদ্রিজাকে কিভাবে শিখালে আদ্রিজা গিটার বাজাতে পারবে। হঠাৎই অভ্রের মাথায় কিছু একটা আসলো। অভ্র গিয়ে বসলো আদ্রিজার পিছন দিয়ে। তারপর পিছন থেকে আদ্রিজার বাহু আঁকড়ে ধরলো আদ্রিজার বাম হাত। হুট করেই অভ্রের এমন কান্ডে খানিকটা চমকে উঠলো আদ্রিজা। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে পিছন ঘুরে বলতে নিলো সে,
‘ অ..
সঙ্গে সঙ্গে অভ্র বলে উঠল,
‘ হুস কথা বলে না গিটার বাজাতে হলো ফোকাস করো গিটারে,
আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা পুনরায় মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সে গিটারের সামনের তারের দিকে। এরই মাঝে অভ্র তাঁর চিবুক রাখলো আদ্রিজার ঘাড়ে। খানিকটা কেঁপে উঠলো আদ্রিজা। এই প্রথম যেন সজ্ঞানে অভ্র এতটা কাছাকাছি চলে এসেছে আদ্রিজার। এরই মাঝে অভ্র আদ্রিজার ডান হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গিটারের তারে ছোঁয়াল। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন শব্দ করে বেজে উঠল তার। আচমকা এমনটা হওয়াতে পুরো কেঁপে উঠলো আদ্রিজা। অভ্রের স্পর্শে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে আদ্রিজা। বুকের স্পন্দন কয়েকশো বেগে বেড়ে চলছে তাঁর। বুকের ভিতর দক দক করে শব্দ হচ্ছে উচ্চস্বরে যেন কেউ কান পাতলেই শুনতে পেত এমন। আদ্রিজা ঘামছে, শরীর মস্তিষ্ক সব যেন একসাথে দৌড়াচ্ছে তাঁর। এক অদ্ভুত ফিলিংস হচ্ছে আদ্রিজার। এমনই এক ফিলিংস যা এর আগে কখনো ফিল করেনি আদ্রিজা। আদ্রিজার ইচ্ছে করছে এক্ষুনি অভ্রকে বলতে,
‘ শুনুন না আপনার কাছাকাছি হওয়াটা আমি কেন যেন নিতে পারছি না। আমরা গিটারটা কাল শিখি?’
কিন্তু আফসোস আদ্রিজার এই কথাগুলো পেটে আসলেও মুখে আসছে না। আর যাও বলবে তাও মনের কথাটা যেন এই মুহূর্তে ভয়ংকরজনক বলে মনে হচ্ছে আদ্রিজার।’
কিছুক্ষন সময় থাকলো ওমন আদ্রিজা আর অভ্র। অভ্র পিছন থেকে আদ্রিজার হাত ধরে শেখাচ্ছিল গিটার বাজানো আর আদ্রিজা যেন অভ্রের বাহুডোরে আটকা পড়ে হিমশীতল ছোঁয়ায় থর থর করে কাঁপছিল। কিছু যে বলবে তাও পারছে না।’
এরই মাঝে অভ্রের বিছানার ওপর বালিশের পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিজাকে ছেড়ে দিয়ে বললো অভ্র,
‘ এক মিনিট।’
বলেই অভ্র চলে যায় তাঁর ফোনটা তুলতে। মা ফোন করেছে। আদ্রিজা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সাথে খানিকটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
‘ আমি ছাঁদে কাপড় শুকাতে দিয়েছিলাম আপনি কথা বলুন আমি ওগুলো নিয়ে এক্ষুনি আসছি।’
বলেই একপ্রকার দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল আদ্রিজা। আর অভ্রও তেমন কিছু না ভেবে ফোনটা তুলে বললো,
‘ হুম বলো মা,
____
পুরো বাড়ি ভেঙে চুড়ে একপ্রকার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে এসে থামলো আদ্রিজা ছাঁদের মাঝখানে। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেললো কয়েকশো বার। ভাগ্যিস ফোনটা এসেছিল না হলে আজ দম বন্ধ হয়েই মারা পড়তো সে। আদ্রিজা তাঁর বুকে হাত দিলো এখনও ভয়ংকরভাবে লাফাচ্ছে হৃদয়টা। আদ্রিজা নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
‘ বাপরে বাপ কি অনুভূতি রে?’ আর একটু হলেই তো যেতাম আমি। ভাগ্যিস ফোনটা এসেছিল নয়তো,
ভেবেই জোরে দম ফেললো আদ্রিজা।’
পশ্চিমা আকাশটায় তখন সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। আশপাশের পুরো প্রকৃতি হয়ে গেছিল লালচে। বিশাল আকাশটা দেখাচ্ছিল লাল রঙা বিশাল আয়তক্ষেত্রের মতো। যদিও আকাশটা আসলে কোন আকৃতির গোল, নাকি চারকোনা এটা জানে না আদ্রিজা। আদ্রিজা তাকিয়ে রইলো আকাশপথে বললো,
‘ আজ আমার এমন লাগলো কেন? এ কেমন অনুভূতি হলো অভ্রের কাছে আসার? এর আগেও তো একবার অভ্রের কাছাকাছি গিয়েছিল আদ্রিজা। সেদিন যখন ব্রিজের ওপর ওঠার সময় পা স্লিপ কেটে পড়তে নিয়েছিল সে আর অভ্র টান মেরে বুকে টেনেছিল তাঁকে। তখনও কাছাকাছি গিয়েছিল অভ্র আর আদ্রিজা। কিন্তু কই তখন তো আজকের মতো অনুভতি হয় নি। তাহলে আজ হুট করে এমন ফিলিংস কেন হলো আমার?’
প্রশ্ন তো করলো আদ্রিজা। কিন্তু উত্তর যেন মিললো না আর।’
এরপর মাঝখানে কেটে গেল একদিন। সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সাথে আদ্রিজাও খানিকটা কাজের বাহানা নিয়ে আর গিটার ধরতে চায় নি। অভ্রও জোর করে নি আর।’
___
‘ সন্ধ্যা ৭ঃ০০টা!’
আজ অভ্রের এক বিজনেস পার্টনারের এনগেজমেন্ট। যার দরুন অভ্রের ওয়াইফসহ সেখানে যেতে বলেছে রুহুল। বিজনেস পার্টনারের নাম। অভ্র একবার বারন করেছিল কিন্তু শোনে নি রুহুল। আর এই কারণেই বর্তমানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এনগেজমেন্টে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে অভ্র। একটু দূরেই জায়গাটা যার দরুন আজ রাতে সেখানে থাকার পরিকল্পনাও আছে অভ্রের। সাদা কোট, প্যান্ট, হাতে ঘড়ি আর চুলগুলো সুন্দর মতো গুছিয়ে গলার টাইটা আটকাতে আটকাতে বললো অভ্র,
‘ তোমার কি হয়েছে ব্ল্যাকবেরি? এখন তো বের হতে হবে আমাদের।’
উওরে পাশের রুম থেকে অভ্রের সাথে মেচিং করে ওয়াইট শাড়ি পড়েছে আদ্রিজা, খোলা চুলে একদিকে সুন্দর সাদা রঙের দুটো গোলাপ লাগানো, মুখে মেকাপ, চোখে আইলাইনার, মাসকারা, কাজল, ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক লাগিয়েছে সে, হাতে দিয়েছে বাহারি সব সাদা রঙের চুড়ি যতই হোক অভ্রের বিজনেস পার্টনারের এনগেজমেন্ট বলে কথা। যদি তাঁকে দেখে কেউ খারাপ বলে তখন, আজ আদ্রিজা চোখে লেন্স লাগায় নি, চশমা লাগাতে চেয়েছিল কিন্তু আবার লাগায় নি। আজ প্রথমবার নিজে নিজে এতটা সেজেছে আদ্রিজা। অবশ্য আরু তাঁকে হেল্প করেছে। আরুকে ভিডিও কল করেছিল আদ্রিজা। আর আরুর মতামত অনুযায়ী সেজেছে সে। শাড়িটাও আরুর। বহুবছর আগে অভ্র তাঁকে কিনেদিয়েছিল কিন্তু কখনো পড়ে নি আরু। আরুই বলে আদ্রিজাকে তাঁর আলমারি থেকে এই শাড়িটা বের করে পড়তে। আদ্রিজাও শোনে। এতক্ষণ আদ্রিজা আরুর রুমে বসে, আরুর সব জিনিসপত্র দিয়েই সেজেছে। আদ্রিজা পর পর কথাগুলো ভেবে শাড়ির কুঁচি ধরে অভ্রের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
‘ এই তো আমি তৈরি, একটু দেখে বলুন তো আমায় ভালো লাগছে কি না। আসলে একা একা সেজেছি তো খানিকটা নার্ভাস লাগছে।’
হাতে পারফিউম নিয়ে নিজের গায়ে লাগাতে ব্যস্ত ছিল অভ্র। এরই মাঝে আদ্রিজার ভয়েসটা কাছ থেকে আসতেই পাশ ফিরে তাকালো অভ্র। আদ্রিজার দিকে তাকালো সে, খুব গভীর ভাবেই তাকালো। একদমই অন্যরকম লাগছে আদ্রিজাকে। যেন সাদা পরী। অভ্রের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অাদ্রিজাকে বলতে ইচ্ছে করছে,
‘ এই যে মিসেস ব্ল্যাকবেরি, কালো বাদ দিয়ে এইসব কালারও তো পড়তে পারো সবসময়। কালো তে যে কি পেয়েছো তুমি এটাই মাঝে মাঝে বুঝি না আমি।’
অভ্রের ভাবনার মাঝেই আবারও বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ কি হলো আপনি কথা বলছেন না কেন?’
খানিকটা ভড়কে গেল অভ্র। বললো,
‘ কি বলবো?’
‘ এটাই যে আমায় ভালো লাগছে কি না।’
উওরে শুধু এতটুকুই বলে অভ্র,
‘ হুম ভালো লাগছে।’
____
গাড়ি করে পাশাপাশি বসে এগিয়ে চলছে অভ্র আর আদ্রিজা। খানিকটা নার্ভাস ফিল করছে আদ্রিজা। না জানি তাঁকে দেখে সবাই কেমন রিয়েকশন দেয়। আদ্রিজার অবস্থা বুঝতে পেরে বলে উঠল অভ্র,
‘ কিছু কি হয়েছে?’
‘ না কি হবে।’
‘ তোমায় খুব নার্ভাস লাগছে। আরে তুমি কোনো পরীক্ষার হলে যাচ্ছো না যে নার্ভাস ফিল হতে হবে। আর আমি আছি তো তোমার সাথে।’
অভ্রের কথা শুনে মুচকি হাসলো আদ্রিজা। তবে কিছু বললো না।’
অতঃপর বেশ কিছুক্ষনের পথ অতিক্রম করে আদ্রিজা আর অভ্র পৌঁছে গেল রুহুলের গেস্ট হাউজের কাছে। ওখানেই অনুষ্ঠিত হবে রুহুলের এনগেজমেন্ট। খুব বড়সড় করেই বন্দবস্ত করা হয়েছে সবকিছু। আদ্রিজা আর অভ্র গাড়ি থেকে নামলো। সামনেই লাইটিং এর আলোতে আলোকিত পুরো পরিবেশ। আদ্রিজা তাকালো সামনে লাইটিং এর পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়েছে সে। হঠাৎই অভ্র তাঁর ডান হাতটা এগিয়ে দিয়ে বললো আদ্রিজাকে,
‘ তাহলে যাওয়া যাক। আর হ্যাঁ ডোন্ট বি সো নার্ভাস ব্ল্যাকবেরি আমি আছি তো।’
বলেই মুচকি হাসলো সে। আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা সাথে এগিয়ে দিল নিজের হাত। অতঃপর আদ্রিজা অভ্র সামনের গেটটা পেরিয়ে ধীরে ধীরে মাথা উপর সাজানো লাল নীল বাতির ভিড়ে এগিয়ে যেতে লাগলো ভিতরে। আদ্রিজা ভিতরে যত যাচ্ছে ততই যেন নার্ভাস লাগছে তাঁর বার বার মনে হচ্ছে আজ কিছু একটা গন্ডগোল হবে এখানে?’ কিন্তু এমনটা কেন লাগছে এটাই যেন বুঝচ্ছে না আদ্রিজা।’
___
এনগেজমেন্ট পার্টিতে কালো কোট প্যান্ট পড়ে ড্রিংক হাতে দাঁড়িয়ে ছিল শ্রাবণ। হঠাৎই ঢক ঢক করে পুরো ড্রিংকটা শেষ করে আবারও ডাকলো ওয়েটারকে। বললো,
‘ ওয়ান মোর?’
#চলবে….
#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪০
________________
পুরো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আদ্রিজা শ্রাবণের মুখের দিকে। সে কল্পনাও করতে পারে নি এই মুহূর্তে এই এনগেজমেন্ট পার্টিতে এসে শ্রাবণের সাথে দেখা হয়ে যাবে তাঁর।’
কতক্ষণ আগেই অভ্রের হাত ধরে ভিতরে আসে আদ্রিজা। তাঁরা আসতেই রুহুল এগিয়ে আসে তক্ষৎনাত পরিচিত হয় ওদের সাথে এরই মাঝে হঠাৎই চোখ যায় আদ্রিজার কালো কোট প্যান্ট পরা শ্রাবণের দিকে। আদ্রিজা ভুল করেও ভাবে নি এখানে কোনোভাবে শ্রাবণ থাকতে পারে। অভ্র এখনও রুহুলের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত তাই এখনও দেখে নি সে শ্রাবণকে।’
অন্যদিকে,
আদ্রিজার মতো শ্রাবণও খেয়াল করেছে আদ্রিজাকে যদিও ওটা যে আদ্রিজা এটা বুঝতে প্রথমে একটু অসুবিধা হয়ে ছিল শ্রাবণের। সেই চোখে চশমা পড়া, অলওয়েজ একদিকে বেনুনী করা আন্টি টাইপ মেয়েটাকে যেন আজ পুরোই অন্যরকম লাগলো শ্রাবণের কাছে। তাঁর যেন বিশ্বাসই না এটা আদ্রিজা। সাদা সিল্কি শাড়ি, খোলা চুল, চোখে চশমা ব্যতীত যেন দারুন লাগছে আজ। শ্রাবণ কিছু একটা ভেবে এগিয়ে যেতে লাগলো আদ্রিজার দিকে।’
শ্রাবণকে নিজের দিকে আসতে দেখেই বুকটা কেঁপে উঠলো আদ্রিজার। এখন কি হবে? আদ্রিজা অভ্রের কাছাকাছি এগোলো হাতটা শক্ত করে ধরলো আনমনে। হুট করেই আদ্রিজার হাতে স্পর্শটা শক্ত হতেই অভ্র তাকালো আদ্রিজার মুখের দিকে। এরই মাঝে অভ্রের দিকে নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে বললো শ্রাবণ,
‘ হ্যালো বস। আমি শ্রাবণ। হাউ আর ইউ?’
হুট করেই কারো ভয়েস কানে আসতেই অভ্র তাকালো সামনে। চোখের সামনে আদ্রিজাকে ঠকানো ভার্সিটির সেই ছেলেটা ওরোফে শ্রাবণকে দেখে পুরোই অবাক হলো অভ্র। নিজের হাত এগোলো না সে। এরই মাঝে রুহুল মুচকি হেঁসে বললো,
‘ হি ইস মাই শালা অভ্র? অর্থাৎ আমার ওয়াইফ তন্নির ছোট ভাই।’
উওরে সৌজন্যতার খাতিরে নিজের হাতটা শ্রাবণের দিকে এগিয়ে বললো অভ্র,
‘ হ্যালো ভালো ইউ?’
অভ্রের কথা শুনে আদ্রিজার দিকে একপলক তাকিয়ে জবাব দিলো শ্রাবণ,
‘ হুম ভালো।’
বলেই শ্রাবণ আদ্রিজার দিকে নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘ হ্যালো নাইস টু মিট ইউ, আর ইউ?’
উওরে আদ্রিজাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আদ্রিজার দিক থেকেও নিজের হাতটা বারিয়ে দিয়ে শ্রাবণের সাথে হাত মিলিয়ে বললো অভ্র,
‘ ও আমার ওয়াইফ মিসেস আদ্রিজা মাহাবুব।’
অভ্রের কান্ডে শ্রাবণ যেন বিস্মিত হলো খুব, পাল্টা কিছু বলবে এরই মাঝে অভ্র আদ্রিজার কাঁধে হাত দিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো,
‘ একচুয়ালি আমি চাই না আমার ওয়াইফ অপরিচিত কোনো পুরুষের সাথে হাত মেলাক। সো নেভার মাইন্ড।’
অভ্রের কথায় যেন গা জ্বলে উঠলো শ্রাবণের। তবে বেশি কথা না বাড়িয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
‘ খুব ভালো। বউয়ের ওপর আপনার এই ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছি আমি। আই লাইক ইট।’
বলেই আদ্রিজার দিকে একপলক কড়া নজরে তাকিয়ে ‘আমি একটু আসছি’ বলেই চলে গেল শ্রাবণ।’
শ্রাবণ যেতেই অভ্র আদ্রিজার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
‘ ডোন্ট ওয়ারি ব্ল্যাকবেরি আমি আছি তো। আর ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয় নি। বিকজ তোমার হাসবেন্ড তোমার পাশে আছে সবসময়।’
অভ্রের কথা শুনে মুগ্ধ হলো আদ্রিজা। মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে রইলো সে অভ্রের দিকে। এই ছেলেটাকে সে যত দেখছে ততই যেন অবাক হচ্ছে। শ্রাবণ তো তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক ছিল তারপরও অভ্র? একরাশ শ্রদ্ধা এসে ভর করলো আদ্রিজার মাঝে অভ্রের জন্য।’
এরই মাঝে রুহুলকে ডাকলো তাঁর বাবা আর কিছুক্ষনের মধ্যে রুহুল আর তন্নির এনগেজমেন্ট শুরু হবে। রুহুল অভ্রের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ বাবা ডাকছে অভ্র আপনারা থাকুন এখানে কোথাও যাবেন না কিন্তু আপনাদের জন্য আমি স্পেশাল রুমের এরেঞ্জ করে রেখেছি। আজ কিন্তু এখানে থাকার কথা দিয়েছিলেন আপনি।’
উওরে অভ্রও হাল্কা হেঁসে বললো,
‘ ঠিক আছে যান আপনি?’
রুহুল খুশি হলো। বললো,
‘ ঠিক আছে। ভাবিও থাকেন।’
উওরে শুধু মুচকি হাঁসে আদ্রিজা তবে কিছু বলে না।’
অতঃপর রুহুল আদ্রিজা অভ্রকে রেখেই এগিয়ে গেল সামনে। আর আদ্রিজা অভ্রও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো পাশাপাশি।’
আর এদিকে,
শ্রাবণের রাগ হচ্ছে, ভীষণ রাগ হচ্ছে। আদ্রিজার পাশে ওই ছেলেটাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে। অভ্রের তখনকার কথায় যেন অপমানজনক কিছু ফিল করেছে শ্রাবণ। যদিও অভ্র তেমন কড়াভাবে কিছুই বলেনি তাকে তারপরও যা বলেছে তাই যেন শুনতে চাইছিল না শ্রাবণ। টেবিলের ওপর থাকা ড্রিংকের গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরলো শ্রাবণ। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে তাঁর বিয়ের ওই প্ল্যানটা না করলেই ভালো হতো। না সে আদনানের সাথে আদ্রিজার বিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করতো আর না আজ অভ্র আদ্রিজার হাসবেন্ড হতো। কথাগুলো ভাবলেই যেন শ্রাবণের রাগটা আরো বেশি হচ্ছে।’
___
কতক্ষণের মাঝেই একে অপরের আঙুলে আংটি পড়িয়ে এনগেজমেন্টের মূল চিত্রটি উপস্থাপন করলো রুহুল আর তন্নি। সবাই হাতে তালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো তাদের। হঠাৎই রুহুল বলে উঠল,
‘ এবার শুরু হবে কাপল ড্যান্স?’
অতঃপর মিউজিক বাজতে শুরু হলো। সবাই যে যার পার্টনারকে সাথে নিয়ে মেতে উঠলো সেই মিউজিকের সাথে পাল্লা দিয়ে কাপল ড্যান্স করতে। রুহুল আর তন্নি এগিয়ে গেল অভ্র আর আদ্রিজার দিকে সাথে অনুরোধ করলো অভ্র আর অাদ্রিজাকে কাপল ড্যান্স করতে। অভ্র শুরুতে বারন করলেও শোনেনি তন্নি আর রুহুল। হাত ধরে নিয়ে যায় স্টেজের মাঝখানে। অভ্র খানিকটা বিস্মিত হয় এতে, কারন সে নাচতে পারে না আর আদ্রিজাও এর আগে কাপল ড্যান্স করেছে বলে তো তাঁর মনে হয় না। অভ্র তাকালো আদ্রিজার দিকে তারপর বললো,
‘ এখন কি করবো ব্ল্যাকবেরি আমি কখনো এইসব কাপল ড্যান্সে নাচিনি। কিভাবে নাচতে হয় তাও জানি না।’
অভ্র শুনলো অাদ্রিজার কথা সাথে কিছুক্ষন চুপ থেকে আদ্রিজা তাঁর শাড়ির আঁচলটা কোমড়ে আঁটকে বললো,
‘ কোনো ব্যাপার না আপনি আমায় অনেকবার অনেক হেল্প করেছেন এবার না হয় আমি কিছু করলাম।’
বলেই নিজের হাত এগিয়ে দিলো আদ্রিজা অভ্রের দিকে। আদ্রিজার কাজে অভ্র খানিকটা অবাক হয়ে বললো,
‘ কিন্তু আমি তো,
অভ্র আরো কিছু বলার আগেই বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ ডোন্ট ওয়ারি আমি আছি তো।’
অভ্র অবাক হলো, ভয়ংকর ভাবে অবাক হলো। তাঁর বলা ডায়লগই আদ্রিজা দিলো তাঁকে। অভ্র আর বেশি ভাবলো না নিজের হাতটা এগিয়ে দিল। আদ্রিজা অভ্রের একহাত নিজের কোমড়ে আর অন্যহাত অভ্রের হাতে রেখে বললো,
‘ আমার ছোট বেলা থেকে ড্যান্সিং এর ওপর খুব আকর্ষণ ছিল। একটা ড্যান্স স্কুলেও ভর্তি হয়েছিলাম আমি। তবে শেষ পর্যন্ত যাই নি, নানাবিদ কারনে বন্ধ হয়ে যায় সেটা। তাই বেশি ভাববেন না আমি যেভাবে বলছি জাস্ট সেইভাবে ফলো করবেন অভ্র। ব্যস তাইলেই হয়ে যাবে।’
অভ্র আদ্রিজার কথা শুনে সত্যি অবাক হয়েছে খুব। সে ভাবে নি আদ্রিজার ড্যান্সের মতো একটা শক্তপক্ত জিনিসে পারদর্শী হবে।’
অতঃপর আদ্রিজার কথামতোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাপল ড্যান্স করতে লাগলো আদ্রিজা আর অভ্র। যদিও অভ্রের খানিকটা প্রবলেম হচ্ছে। কিন্তু আদ্রিজা সামলে নিচ্ছে তাঁকে। চারপাশে লাউডে গান বাজছে। আর সেই গানটাকে ফিল করেই কাঁপল ড্যান্স করছে পাঁচ ছয়টা জুটি আর এদের সবার মাঝখানে আদ্রিজা আর অভ্র। আর বাকি সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে এদের কাপল ড্যান্স।’
অন্যদিকে,
অভ্র আর আদ্রিজাকে এতটা কাছাকাছি গিয়ে ড্যান্স করতে দেখে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে শ্রাবণ। কোথাও এক জায়গায় খারাপ লাগা কাজ করছে তার মাঝে। শ্রাবণ আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না চলে গেল কোথাও? কোথাও যেন নিজের কাজের জন্য নিজেই অনুতপ্ত ফিল করছে সে।’
__
পর পর দুটো গানে ড্যান্স করে থামলো একেকজন করে। অভ্র আর আদ্রিজাও থেমে গেল এতক্ষণ যেন তাঁরা দুজনে কোনো এক ঘোরে আঁটকে গিয়েছিল। তাঁরা থামতেই সবাই হাতে তালি দিল। সবার রিয়েকশন দেখে, মুচকি হাসলো অভ্র আর আদ্রিজা। অভ্র আদ্রিজার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
‘ থ্যাংক ইউ।’
উওরে শুধু অভ্রের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো আদ্রিজা। এরই মাঝে সবাইকে ডিনার খাওয়ার জন্য ডাকলো রুহুল। আদ্রিজা অভ্রও এগিয়ে গেল তাদের দিকে। তারপর পুরো হই হুল্লোড়ের সাথে ডিনার সারলো সবাই। আজ ডিনারের পাশাপাশি এলকোহল মেশানো ড্রিংকেরও ব্যবস্থা করেছিল রুহুল। যেটা আদ্রিজা আর অভ্র জানতো না। তাই ডিনারের পাশাপাশি সবার চক্করে পড়ে তাও খেয়ে ফেললো আদ্রিজা আর অভ্র। অভ্র প্রথমে বিষয়টা খেয়াল না করলেও পরে জিনিসটা বুঝতে পেরে আদ্রিজাকে খেতে বারন করবে তাঁর আগেই কয়েকগ্লাস এলকোহল মেশানো ড্রিংক খেয়ে ফেলেছে আদ্রিজা। কারন জিনিসটা তাঁর বেশ লেগেছে। মাথাটা চক্কর মেরেছিল ঠিকই তবে ভালো লেগেছে।’
_____
মাতাল হয়ে রুহুলের বলা তাদের এক বাগান বাড়ির পিছনের একটা সুইমিংপুলের মাঝ বরাবর জায়গায় পানির মাঝে পা ঝুলিয়ে পাশাপাশি বসে আছে অভ্র আর আদ্রিজা। অভ্রের বুকে মাথা দিয়ে আছে আদ্রিজা। আর তাঁকে একহাতে জড়িয়ে ধরে আছে অভ্র। অভ্র খানিকটা সজ্ঞানে থাকলেও আদ্রিজা পুরোই গেছে। নেশা হয়ে গেছে তাঁর।’
কতক্ষণ আগেই অভ্র আদ্রিজার নেশা হয়ে গেছে জিনিসটা বুঝতে পেরে রুহুলকে বলে তাদের কোথায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটা জেনে তক্ষৎনাত নিয়ে আসে এখানে। রুমে নিয়েই যেতে চেয়েছিল অভ্র। কিন্তু আদ্রিজা দৌড়ে এখানে চলে আসে। আর বসে পড়ে সুইমিংপুলে পা ঝুলিয়ে। অভ্র জোর করেছিল আদ্রিজাকে নিয়ে যেতে কিন্তু পারে নি শেষমেশ বাধ্য হয়ে সে নিজেও বসে পড়ে আদ্রিজার পাশ দিয়ে। আর সে বসতেই অভ্রের বুকে মাথা রাখে আদ্রিজা। রাতের আকাশটা তখন ঝলমলে তারার আলোতে আলোকিত ছিল। সুইমিংপুলের অপরপ্রান্তে থাকা বড় বড় নারকেল গাছদের ভিড়ে যেন বিরাজ করছিল তাঁরা। হঠাৎই আদ্রিজা আকাশটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
‘ আজকের আকাশটা খুব সুন্দর তাই না অভ্র?’
উওরে অভ্রও বললো,
‘ হুম।’
‘ জানেন অভ্র তখন ওই কাঁচের গ্লাসের কিসব খাওয়ার পর থেকেই মাথাটা কেমন যেন গোলমেলে লাগছে।’
‘ আরে বুদ্ধু ওগুলো এলকোহল মেশানো ড্রিংক ছিল।’
‘ সেটা কি?’
‘ সেটার একটা হলো তোমার মাথা আর একটা হলো আমার মাথা।’
অভ্রের কথা শুনে হেঁসে ফেলে আদ্রিজা। অভ্র হেঁসে ফেলে। কারন এতক্ষণ নেশা জিনিসটা তাঁকে পুরোপুরি গ্রাস করতে না পারলেও এখন পেরেছে। তাই তো নেশার ঘোরে ভুলভাল বকছে এখন।’
বেশ কিছুক্ষন ওইভাবে ভুলভাল বকে বলে উঠল অভ্র,
‘ আজ কি এখানেই থাকবে রুমে যাবে না ব্ল্যাকবেরি?’
উওরে অভ্রের বুক থেকে মাথাটা সরিয়ে বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ আচ্ছা অভ্র আপনি আমায় ব্ল্যাকবেরি কেন ডাকেন?’
আদ্রিজার কথা শুনে ফট করেই বলে ফেলে অভ্র,
‘ কারন তোমায় পুরো কালোজামের মতো দেখতে ব্ল্যাকবেরি।’
অভ্রের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বলে আদ্রিজা,
‘ এ্যাঁ,
উওরে অভ্র আদ্রিজার নাকটা টেনে দিয়ে বললো,
‘ এ্যাঁ নয় হ্যাঁ।’
___
কিছুক্ষন ওভাবে থাকলো দুজন। এরপর হঠাৎই অভ্র আদ্রিজাকে কোলে তুলে নিলো। বললো,
‘ চলো রুমে যাই এতরাতে এখানে থাকলে ভূত চলে আসবে।’
ভূতের কথা শুনতেই খানিকটা আঁতকে উঠলো আদ্রিজা। অভ্রের গলা জড়িয়ে ধরে বললো সে,
‘ তাহলে চলুন যাই আমার আবার ভূতের ভীষণ ভয়।’
হাসলো অভ্র। অভ্রের হাসির মাঝে আবারও বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ জানেন অভ্র আপনি না খুব ভালো সবসময় আমায় হেল্প করেন, আমার বিপদে পাশে থাকেন, আজও তো ছিলেন। আপনি ভীষণ ভালো অভ্র।’
বলেই অভ্রের গালে চুমু একে দিলো আদ্রিজা। আর আদ্রিজার কান্ডে অভ্র চোখ বড় বড় করে বললো,
‘ এটা কি হলো?’
উওরে একগাল হেঁসে বললো আদ্রিজা,
‘ আপনার গিফট।’
অভ্র হেঁসে দিলো। সাথে বললো,
‘ তুমিও তো আজ আমায় হেল্প করলে এবার কি তবে আমাকেও গিফট দিতে হবে?’
‘ অবশ্যই দিতে হবে।’
‘ ঠিক আছে ঘরে চলো নিশ্চয়ই গিফট দিবো।’
বলতে বলতে আদ্রিজাকে নিয়ে চলে অভ্র রুমে।’
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সুইমিংপুলের পাশে থাকা অভ্রের ফোনটায় মেসেজ আসলো লাবণ্যের সে লিখলো,
‘ খুব শীঘ্রই আমি আসছি অভ্র?’
#চলবে…..
[ভুল-ত্রুটি ক্ষমার সাপেক্ষ। গল্প কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবে। সরি ফর লেট]
#TanjiL_Mim♥️