#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪১
________________
সূর্যের প্রখর তেজ তখন। সুইমিংপুলের পানিগুলো রোদের আলোতে চকচক করছিল খুব। সুইমিংপুলের চারদিকে ঘিরে থাকা বড় বড় নারকেল গাছগুলোর পাতারাও নড়ছিল ভীষণ। সুইমিংপুলের পানিতে স্রোতের তেজ চলছিল অল্প। আর সুইমিংপুলের কাছ থেকে অল্প খানিকটা দূরত্বে থাকা বাড়িটার জানালা জুড়ে মেরুন রঙের পর্দাটা নড়ছিল বারংবার। আর এসবের ভিড়েই বিছানায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে ছিল অভ্র আর আদ্রিজা। হঠাৎই কাল রাতের অভ্র আদ্রিজাকে কোলে তুলে নেওয়া, আদ্রিজা অভ্রের গালে কিস করার দৃশ্যটা ভেসে আসলো আদ্রিজার চোখের সামনে। এতে খানিকটা নড়েচড়ে উঠলো আদ্রিজা। ধীরে ধীরে চিন্তা ভাবনাগুলো যেন আরো প্রখর হচ্ছিল খুব সাথে সাথে আদ্রিজার ঘুমটা ভেঙে গেল আশপাশে চোখ বুলালো একবার। হঠাৎই নিজেকে অভ্রের বাহুডোরে দেখে ছিটকে দু’কদম পিছনে চলে গেল আদ্রিজা। পরক্ষণেই নিজের অবস্থা দেখে আরোই যেন আঁতকে উঠলো সে। সাথে মাথার ভিতর বার বার প্রশ্ন ভাসছিল আদ্রিজার,
‘ এসব কি করে হলো?’
আদ্রিজা মাথায় হাত দিল। ভয়ংকর খারাপ লাগা কাজ করছে তাঁর মাঝে। কিছুতেই মাথায় আসছে না কাল রাতে কি হয়েছিল তাঁর। আদ্রিজা আর ওখানে বসে থাকতে পারলো না। তক্ষৎনাত এলেমেলোভাবে নিচে পড়ে থাকা শাড়ি তুলে চলে গেল সে ওয়াশরুমের দিকে। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তাঁর।’
বেলা ১২ঃ০০টা।’
সুইমিংপুলের সামনে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিজা। ভুল শব্দটা যেন মাথায় জিকে বসেছে তাঁর। আদ্রিজা আবার ভাবতে চাইলো কাল রাতে ঠিক কি হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু মাথা আসছিল না তাঁর। আদ্রিজা ভাবলো সে কি নিজে গিয়েছিল অভ্রের কাছে নাকি অভ্র? আর ভাবতে পারছে না আদ্রিজা। নিজের ভুলের জন্য নিজের কাছেই ছোট মনে হচ্ছে তাঁর। লাবণ্যের কথা মনে পড়ছে খুব। এমন সময় অাদ্রিজার কাঁধে হাত রাখলো অভ্র। বেশ স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো সে,
‘ ব্ল্যাকবেরি?’
আদ্রিজা কেঁপে উঠলো, ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠলো। পিছন ফিরেই বললো সে,
‘ জ্বী বলুন,
উওরে আদ্রিজার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালো অভ্র। সাথে বললো,
‘ এখানে কি করছো?’
‘ না তেমন কিছু না। আমরা কি আজ ফিরবো?’
‘ হুম বিয়ে হবে আরো দু’সপ্তাহ পর।’
‘ ওহ, তাহলে চলুন বাড়ি যাই।’
‘ হুম।’
অভ্রের উত্তর শুনেই যেতে নিলো আদ্রিজা। এরই মাঝে বলে উঠল অভ্র,
‘ ব্ল্যাকবেরি শোনো?’
আদ্রিজা দাঁড়িয়ে পড়লো অভ্রের চোখের দিকে তাকিয়েই বললো সে,
‘ জ্বী বলুন,
‘ কাল রাতে আমাদের মাঝে কি কিছু হয়েছিল? আসলে সকালে,
অভ্রের পুরো কথা শেষ আগেই বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ কই না তো কি হবে?’
‘ কিছুই হয় নি।’
‘ না কি হবে? আপনি আমি সবার সাথে ডিনার করলাম তারপর সুইমিংপুলের এখানে বসলাম দেন রুমে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়লাম।’
‘ কিন্তু,
‘ এখানে আবার কিন্তু কিসের।’
‘ না আসলে,
আদ্রিজা এবার খানিকটা বিষন্ন মাখা মুখ নিয়ে বলে উঠল,
‘ কিছু হয় নি ট্রাস্ট মি। আর তাছাড়া আপনার আমার মাঝে কোনোদিনও কি কিছু হওয়ার ছিল নাকি, আমি জানি আপনার আমার সম্পর্কটা হলো জাস্ট নিয়তির কিছু অংশমাত্র তাই বেশি ভাববেন না চলুন বাড়ি যাই। এখানে ভালো লাগছে না।’
বলেই আর না দাঁড়িয়ে চলে গেল আদ্রিজা। আর অভ্র তাকিয়ে রইলো আদ্রিজার যাওয়ার পানে। হয়তো সত্যি কিছু ঘটে নি এছাড়া এটা তো ঠিক তাঁর আর আদ্রিজার মাঝে কিছু সম্ভব নয়। কিন্তু অসম্ভব কিছু কি?’ যতই হোক আদ্রিজা তাঁর বিয়ে করা বউ আজ নয় কাল কিছু তো হবেই।’
এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎই অভ্রের চোখ গেল সুইমিংপুলের পাশে পড়ে থাকা তাঁর মোবাইলটার দিকে। অভ্র এগিয়ে গেল, তাঁর মানে আদ্রিজাই ঠিক ছিল কাল তাঁরা সুইমিংপুলের পাশে বসে ছিল। কিন্তু অভ্র বুঝচ্ছে না কাল রাতের কিছু মনে নেই কেন তাঁর।’
অভ্র বেশি না ভেবে তাঁর ফোনটা নিচ থেকে উঠালো ফোনটা অন করতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে ডেকে উঠলো আদ্রিজা। বললো,
‘ অভ্র?’
আচমকা এমনটা হওয়াতে খানিকটা চমকে উঠলো অভ্র। হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল সুইমিংপুলের ভিতর। আকস্মিক এমন কান্ডে আদ্রিজা দৌড়ে আসলো তক্ষৎনাত। বিস্মিত কন্ঠ নিয়ে বললো,
‘ এটা কি করলেন ফোনটা ফেলে দিলেন?’
উওরে অভ্র গম্ভীর কণ্ঠ নিয়ে বললো,
‘ ফেলেদিলাম কই পড়ে গেল তো আর তোমার জন্যই তো পড়ে গেল,
‘ আমি কি করলাম,
‘ তুমি কি করলে মানে আচমকা ডাক দিলে বলেই না হাত ফসকে ফোনটা পড়ে গেল।’
‘ এইডা কোনো কথা।’
‘ এটাই কথা।’
‘ আচ্ছা ঠিক আছে আমার জন্যই যখন পড়েছে তখন আমি উঠিয়ে দিচ্ছি দাঁড়ান।’
বলেই আশেপাশে তাকালো আদ্রিজা। যা দেখে বললো অভ্র,
‘ কোনো দরকার নেই তোমার উঠানোর আর ফোনটা এমনিতেও পুরোনো হয়ে গেছে আমি নতুন আর একটা কিনে নিবো।’
‘ কিন্তু অভ্র,
‘ কোনো কিন্তু নয় আমি সেদিনের হোটেলের সামনের সুইমিংপুলের পড়ে যাওয়ার কথা আজও ভুলি নি। তাই আমি চাই না আমরা আবার সুইমিংপুলের পানি খাই।’
‘ আরে এমন কিছু হবে না।’
‘ তোমায় বললাম না লাগবে না।’
‘ আপনি দাঁড়ান আমি একাই উঠিয়ে দিচ্ছি।’
‘ তুমি কি একটা কথা একবার বললে বুঝো না।’
‘ আরে ফোনটার ভিতর আপনার কতকিছু আছে, আপনার সিম,
‘ সিমও আমি নতুন উঠিয়ে নিবো তুমি চলো এখান থেকে,
‘ আপনি তো ভাড়ি অদ্ভুত মানুষ আমায় দু’মিনিট সময় দিন আমি আনছি ফোনটা।’
‘ তোমায় এক সেকেন্ড সময়ও দিবো না, চলো তুমি,
বলেই আদ্রিজার হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো অভ্র। আর অভ্রের কান্ডে হতভম্ব হয়ে বললো আদ্রিজা,
‘ আপনি বুঝতে কেন পারছে না,
সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা থামিয়ে দিয়ে পিছন ঘুরে নিজের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বললো অভ্র,
‘ হুস। আর একটাও কথা নয়।’
অভ্রের কান্ডে থমকে গেল আদ্রিজা। তবে কিছু বলতে পারলো না।’
অতঃপর নিজের ফোন আর লাবন্যের মেসেজ না দেখেই চলে গেল অভ্র। কতদূর গিয়ে বলে উঠল অভ্র,
‘ তা তুমি কি বলার জন্য ডাকলে আমায়?’
উওরে আদ্রিজা বললো,
‘ শাশুড়ি মা ফোন করেছিল আমায় বললো আপনার কাজ শেষ হলে সিলেটের ওখানে যেতে। আপনার কোন কাজিনের নাকি বিয়ে?’
আদ্রিজার কথা শুনে অভ্র আর কিছু বললো না। চুপচাপ এগিয়ে যেতে লাগলো সে আদ্রিজার হাত ধরে।’
____
গাড়িতে মুখ গোমড়া করে বসে আছে আদ্রিজা। ফোনটার জন্য বড়ই আফসোস হচ্ছে তাঁর। অভ্র এমন কেন করলো এটাই বুঝলো না আদ্রিজা। সত্যি কি ফোনটার প্রয়োজন নেই তাঁর। ভাড়ি অদ্ভুত মানুষ তো? আরে বাবা একবার সুইমিংপুলের ভিতর পড়ে গেছিল বলে কি? দ্বিতীয় বারও পড়তো নাকি। সত্যি! আজগুবি সব চিন্তাভাবনা।’
অন্যদিকে অভ্র,
গাড়ি ড্রাইভ করছে আর কিছুক্ষন পর পর আদ্রিজার দিকে তাকাচ্ছে, সে বুঝতে পেরেছে তখনকার বিষয়টা নিয়েই হয়তো মুখটা ভার করে আছে আদ্রিজা। অভ্রের কেন যেন ফোন উঠাতে একদমই ইচ্ছে করছিল না কেন করছিল না তা সে নিজেও জানে না। তবে এটা তো ঠিক ফোনটায় অনেককিছুই ইমপোর্টেন্স জিনিসপত্র ছিল তাঁর, তাহলে? উওর মিললো না অভ্রের।’
অভ্র বেশি ভাবলো না আর গাড়ি ড্রাইভ করতে থাকলো চুপচাপ। হঠাৎই বলে উঠল সে,
‘ মুখ ভাড় করে আছো কেন?’
উওরে স্ট্রেট জবাব আদ্রিজার,
‘ মুখ ভাড় করে কেন থাকবো।’
‘ ও বাবা ম্যাডাম দেখি অনেক গরম হয়ে গেছে।’
অভ্রের কথা শুনে ভ্রু-জোড়া কুঁচকে তাকালো আদ্রিজা অভ্রের দিকে। যা দেখে অভ্র হেঁসে বললো,
‘ তোমায় ভ্রু-কোচকালে তো দারুণ লাগে।’
‘ ফ্লাট করছেন আমার সাথে,
আদ্রিজার কথা শুনে বিস্ময়কর কন্ঠ নিয়ে বললো অভ্র,
‘ ফ্লাট করতে যাবো কেন?’
‘ আপনি বড্ড খারাপ অভ্র।’
‘ যাহ বাবা এখানে খারাপের কি করলাম।’
‘ মোবাইলটা কেন উঠাতে দিলেন না আমায়?’
‘ তুমি এখনো সেই মোবাইল নিয়ে পড়ে আছো, আচ্ছা ধরো আমি তোমায় মোবাইলটা উঠাতে দিতাম। তুমি আবার সেই পাইপ দিয়ে টেনে আমার মোবাইল উঠাতে যেতে, কিন্তু পারতে না তারপর আমায় বলতে হাতটা ধরতে আমিও বাধ্য ছেলের মতো ধরতাম তোমার হাত তারপর কি হতো তুমি নিচের দিকে ঝুঁকে যেতে, তোমার ঝুঁকে যাওয়ার কারনে আমাকে ঝুঁকতে হতো আর এভাবে ঝুঁকতে ঝুঁকতে তুমি আমি ধপাস। এটাই চাইছিলি তাই না তুমি।’
অভ্রের কথায় চরম অবাক হয়ে বললো আদ্রিজা,
‘ আপনি আগেই এতকিছু কেন ভাবছেন এমনটা যে সত্যি ঘটতো তাঁরও বা কি গ্যারান্টি আছে। আর সেদিন তো আপনার আংটি ছিল তাই চিকন পাইপ দিয়ে উঠিয়েছিলাম। পাইপটা ছোট ছিল বলে আমরা পড়ে গেছি। কিন্তু আজও চিকন পাইপ দিয়ে উঠাতাম এটা কে বললো আপনায়?’
‘ আমরা কিন্তু রুহুলদের বাগান বাড়ি থেকে অনেকদূর চলে এসেছি ব্ল্যাকবেরি তাই এসব নিয়ে কথা না বলাই ভালো।’
‘ এখন তো বলবেনই যাইহোক আপনার ফোন গেছে আমার কি?’
বলেই জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে চুপচাপ বসে রইলো আদ্রিজা। আর আদ্রিজার কান্ডে অভ্র মুচকি হাসলো। সত্যি এই মেয়ে যেন একটু বেশিই পাগল।’
অভ্র প্রশ্ন ছুড়লো আবার। বললো,
‘ এখন বলো কোথায় যাবে ঢাকায় নাকি সিলেটে বিয়ে খেতে।’
অভ্রের কথা শুনে বিস্মিত গলায় বললো আদ্রিজা,
‘ সে তো আপনি জানেন, কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা সিলেট কি করে যাবো জামাকাপড় তো কিছু আনি নি।’
‘ ওহ তাও ঠিক তাহলে চলো আগে শপিং মলে যাওয়া যাক।’
‘ বাড়ি গেলেই তো হয় শপিং লাগে নাকি।’
উওরে বিড়বিড় করে বললো অভ্র,
‘ হুম বাড়ি যাই আর তুমি সব ব্ল্যাক শাড়ি, ব্ল্যাক সেলোয়ার-কামিজ, ব্ল্যাক চুড়িদারে ব্যাগ ভরে নেও।’
অভ্রের বিড়বিড়ানিটা ঠিক বুঝতে না পেরে বললো আদ্রিজা,
‘ আপনি কি কিছু বললেন অভ্র?’
‘ না কি বলবো? আসলে এখান থেকে বাড়ি দূরে সিলেট কাছে আছে তাই আর কি?’
অভ্রের কথা শুনে শুধু এতটুকুই বলে আদ্রিজা,
‘ ওহ।’
‘ জ্বী ম্যাডাম।’
অভ্রের এবারের কথা শুনে হেঁসে ফেলে আদ্রিজা।’
___
কতক্ষণ গাড়ি ড্রাইভ করেই অভ্র তাঁর গাড়ি থামালো একটা বড় শপিংমলের সামনে। তারপর নিজের গাড়ির সিটব্লেটটা খুলতে খুলতে বললো সে,
‘ নামো,
আদ্রিজাও শুনলো অভ্রের কথা। তক্ষৎনাত নিজের সিটব্লেটটা খুলে নেমে পড়লো সে। তারপর অভ্র আদ্রিজা চললো একসাথে শপিং করার উদ্দেশ্যে। সাথে রাস্তার এক সাইডে রেখে গেল অভ্রের সাদা রঙের গাড়িটা,,
#চলবে….
#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪২
________________
শপিংমলের চেইঞ্জিং রুমের বাহিরে পেপার হাতে একটা সোফাতে বসে আছে অভ্র। আর তাঁর সামনেই কতক্ষণ পর পর একটার পর একটা ড্রেস পড়ে বাহিরে আসছে আদ্রিজা। কিন্তু অভ্রের একটাও পছন্দ হচ্ছে না। কখনো লাল, কখনো সাদা, কখনো গ্রীন, কখনো ব্লু নানা কালারের ড্রেস পড়ে সামনে আসছে আদ্রিজা। কিন্তু অভ্রের একটাও পছন্দ হচ্ছে না। পাক্কা একঘন্টা যাবৎ শুধু আদ্রিজা চেইঞ্জিং রুমে যাচ্ছে আর আসছে। এতে আদ্রিজা চরম বিরক্ত কিন্তু তারপরও অভ্রের মুখের ওপর কিছুই বলতে পারছে না সে। হঠাৎই অভ্র নিজের হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললো,
‘ ব্ল্যাকবেরি তোমার কি হয়েছে? আমাদের যেতে হবে তো?’
আদ্রিজা কোনো সাড়াশব্দ করলো না। এতে বেশ হতাশ হলো অভ্র। অভ্র বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এখানে আর বসে থাকতে ভালো লাগছে তাঁর। এরই মাঝে সামনের চেইঞ্জিং রুমের দরজা খুলে বের হলো আদ্রিজা। ফট ফট কন্ঠ নিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বললো সে,
‘ এটাই লাস্ট চয়েস ভালো লাগলে লাগলো না লাগলে নাই।’
বলেই এলেমেলো চুলে খয়েরী রঙের একটা সিল্কি শাড়ি পড়ে বের হলো আদ্রিজা। হুট করেই আদ্রিজার ভয়েস কানে আসতেই চোখ তুলে সামনে তাকালো অভ্র। খয়েরী শাড়ি, এলেমেলো চুল, মুখে হাল্কা সাজ, ঠোঁটে হাল্কা লাল লিপস্টিক,
চোখে কাজল বিহীন যেন অনেক বেশিই সুন্দর লাগছে এখন আদ্রিজাকে। এতক্ষণ ধরে আদ্রিজাকে যেমনভাবে দেখতে চেয়েছিল অভ্র। তেমন ভাবেই যেন সামনে এলো আদ্রিজা। পলকবিহীন তাকিয়ে রইলো অভ্র আদ্রিজার মুখশ্রীর দিকে। অভ্রকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে একপলক অভ্রের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল আদ্রিজা,
‘ কথা বলছেন না কেন? এটা চলবে তো তবে শুনে রাখুন এটা না চললেও আমি আর কিছু পড়তে পারবো না। এটা পড়েছি, এটাই কিনে দিবেন আর এটা পড়েই আপনার সাথে যাবো। বাপ রে বাপ আমি বাপের জন্মে আজ পর্যন্ত এতবার জামাকাপড় পাল্টাই নি শপিং মলে এসে। আরে বাবা একটা ড্রেস পড়লেই তো এত ভালো লাগার আছে অদ্ভুত তো!’
এই রকম নানা কিছু বক বক করে বলতে লাগলো আদ্রিজা। আর আদ্রিজার কান্ডে অভ্র এগিয়ে আসতে লাগলো আদ্রিজার দিকে। আদ্রিজার বকবকানিটা ঠিক এই মুহূর্তে মেনে নিতে পারছে না অভ্র। আদ্রিজা বক বক করছে, এখনো বক বক করছে। নিজের বকবকানিতে এতটাই বিভোর ছিল সে যে অভ্র যে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে এটাই খেয়াল করে নি আদ্রিজা।’
অভ্রকে এখনও চুপচাপ থাকতে দেখে সামনের দিকে তাকালো আদ্রিজা। কিন্তু তাঁর সামনে অভ্রকে না দেখে হতভাগ গলায় বলে উঠল সে,
‘ যা বাবা উনি গেল কই?’
বলেই পিছন ঘুরতেই হকচকিয়ে উঠলো আদ্রিজা। কারন অভ্র তাঁর পিছনেই ছিল। আদ্রিজা প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল,
‘ আপনি এ..
আর কিছু বলার আগেই আদ্রিজার ঠোঁটে আঙুল দিলো অভ্র। হুট করেই অভ্রের এমন কান্ডে হকচকিয়ে উঠল আদ্রিজা, সাথে বিস্মিত হলো খুব। আদ্রিজার রিয়েকশন দেখে শীতল ভেজা কন্ঠ নিয়ে বলে উঠল অভ্র,
‘ হুস! এত কথা বলে না। জানো না কিছু কিছু মুহূর্তের সময় বেশি বক বক করতে নেই।’
আদ্রিজা অবাক হলো, চরম অবাক হলো। এই অভ্র কোন মুহূর্তের কথা বলছে এখন। আদ্রিজার ভাবনার মাঝেই আবারও বলে উঠল অভ্র,
‘ আর শোনো তোমায় আর চেঞ্জ করতে হবে না। যেটা পড়েছো সেটাতেই ভালো লাগছে, এটাই কিনে দিবো আর এটা পড়েই তুমি আমার সাথে যাবে। ঠিক আছে।’
বলেই আদ্রিজার ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে চলে গেল অভ্র। আর আদ্রিজা জাস্ট হা হয়ে তাকিয়ে রইলো অভ্রের যাওয়ার পানে যেন অভ্র কি বললো আর অভ্র কি করলো সব তাঁর মাথার উপর দিয়ে গেল।’
অতঃপর আদ্রিজা অভ্র আর কতক্ষণ সময় নিয়ে নিজেদের জন্য কিছু শপিং করে বিলমিটিয়ে বেরিয়ে আসলো শপিং মলের ভিতর থেকে। আদ্রিজা খয়েরী রঙেরই শাড়ি পড়ে বেরিয়েছে এখন। আর এই শাড়ি পড়েই যাবে সে সিলেট। তবে সিলেট যাওয়ার আগে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে লান্সটা সেরে নিলো অভ্র আর আদ্রিজা।’
____
পুনরায় গাড়ি ড্রাইভ করে এগিয়ে চলছে আদ্রিজা আর অভ্র। এই মুহূর্তে এদের মূল উদ্দেশ্য হলো সিলেট যাওয়া। হঠাৎই আদ্রিজা বলে উঠল,
‘ একটা কথা বলবো?’
উওরে অভ্র গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলে উঠল,
‘ হুম বলো,
‘ না কিছু না।’
‘ আরে বলো না,
‘ না তেমন কিছু না কিটির কথা মনে পড়ছিল ও বাড়িতে একা আছে আসলে আমি যে আমার কিটিটাকে মায়ের কাছে রেখে এসেছিলাম এটা ভুলে গেছিলাম।’
প্রতি উওরে শুধু এতটুকুই বললো অভ্র,
‘ ওহ!’
___
দুপুর পেরিয়ে বিকেল হবে হবে এমন। রূপালি রোদ্দুরেরা চিক চিক করছিল গাছের পাতার কর্নার দিয়ে। আর সেই রোদ্দুরের ছোঁয়ার আড়াল দিয়েই সিলেটের চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য্যে ঘেরা পথ পেরিয়ে এগিয়ে চলছিল অভ্র আর আদ্রিজা। মাত্রই সিলেটের চা বাগানের এই দিকটায় ঢুকেছে তাঁরা। অভ্র সিলেটে অনেকবার আসলেও আদ্রিজার এই প্রথম। এর আগে কখনো সিলেটে আসা হয় নি তাঁর। আদ্রিজাদের আত্মীয়দের মধ্যে তেমন কেউ সিলেট থাকে না। পলকবিহীন তাকিয়ে আছে আদ্রিজা বাহিরের প্রকৃতির দিকে। সবুজে ঘেরা চারপাশ, উঁচু উঁচু পাহাড় সমতল জায়গা জুড়েই ঘিরে আছে সিলেটের চা বাগান। গাড়ির জানালার সাথে ভর দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে আদ্রিজা। চোখ যেন তাঁর সরতেই চাইছে না। মন মাতাল করা শীতল বাতাস বইছে চারপাশে, বাতাসের তীব্র ছোঁয়ায় আদ্রিজার মাথার অবাধ্য চুলগুলো এলেমেলো ভাবে উড়ে চলছে আনমনে। আকাশ পথ বেয়ে উড়ে চলছে এক ঝাঁক মুক্ত পাখি আদ্রিজা দেখলো তাদের মুচকি হাসলো আনমনে তারপর নিমিষেই চোখদুটো বন্ধ করে নিলো আদ্রিজা। ফিল করতে লাগলো আশপাশের প্রকৃতি পাখি ডাকছে, গাছের পাতা নড়ছে, এক মিষ্টি মাখা সুভাস ভেসে আছে নাকে কিন্তু সুভাসটা আসলে কিসের এটাই বুঝচ্ছিল না সে। সিলেটের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আর এক এক করে সিলেটের বিখ্যাত চা বাগানের গাছেদের পিছনে ফেলে এগিয়ে চলছিল অভ্র আর আদ্রিজা। কারো মুখেই কোনো কথা ছিল না তেমন, একদম চুপচাপ আর নিরিবিলি চারপাশ।’
বেশ কয়েকঘন্টা পর অভ্রের গাড়ি এসে থামলো এক বিশাল আলিশান বাড়ির সামনে এটাই অভ্রের দাদুর বাড়ি। অভ্রের ছোট বেলা থেকেই এখানে আসা যাওয়া যদিও পার্লামেন্টভাবে এখানে থাকা হয় নি কখনো। অভ্রের যখন দু’মাস বয়স তখন তাঁরা এই বাড়ি ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। আর তখন থেকেই ওখানেই বসবাস তাদের। অভ্র আর বেশি ভাবলো না বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ ব্ল্যাকবেরি আমরা চলে এসেছি চলো যাই?’
উওরে কোনো সাড়াশব্দ করলো না আদ্রিজা। যা দেখে অভ্র পাশ ফিরে তাকিয়ে বললো,
‘ কি হলো তুমি কোনো কথা বলছো না কেন?’
বলেই থেমে যায় অভ্র। কারন আদ্রিজা ঘুমিয়ে পড়েছে, গাড়ির সিটে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। অভ্র বুঝলো না এই মেয়েটা ঘুমালো কখন কতক্ষণ আগেও তো সজাগ ছিল। অভ্র আনমনাই তাকিয়ে রইলো আদ্রিজার ঘুমন্ত মুখের দিকে। তারপর কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো,
‘ আচ্ছা ব্ল্যাকবেরি তোমার আমার সম্পর্কটা ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে বলো তো। আমি না সত্যি বুঝে উঠতে পারছি না তুমি আসলে আমার কি হও। বউ! আমি কি তোমায় কোনোদিন ভালো বাসতে পারবো না। সত্যি বলতে কি আমি সত্যি বুঝতে পারছি না কি চলছে আমার মাঝে। হুট করেই কেন তোমার কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে হয় আমার। এটা কি ঠিক? আমি তো লাবণ্যকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু ও কাছে না থাকার বা তোমায় বিয়ে করেছি ওকে আর পাবো না এমনটা ভাবলেও আমার খারাপ লাগে না। কেন লাগে না বলো তো? বিয়ের প্রথম রাতে তো লেগেছিল তাহলে এখন আর লাগে না কেন আমার সাথে লাবণ্যের যোগাযোগ বন্ধ তাও তো কমদিন হয় নি তাহলে ওর শূন্যতা ফিল কেন করি না আমি। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বোধহয় কোনোদিন লাবন্যকে ভালোই বাসি নি। আচ্ছা যদি লাবণ্যকে ভালো না বাসি তাহলে কাকে ভালোবাসি আমি। নাকি আমি এখন পর্যন্ত কারো প্রেমেই পড়ে নি। ধুর! মাথাটা বোধহয় গেছে কিসব আবোল তাবোল বকছি আমি। আর কার সাথে বকছি যে কি না ঘুমিয়ে আছে? আমার কোনো কথাই যার কান অবদি যাচ্ছে না।’
অভ্র ভেবে পাচ্ছে না এখন কি করবে সে। আদ্রিজাকে ডাকবে নাকি। কিন্তু না ডাকলেও তো হচ্ছে না। অভ্র অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো আদ্রিজাকে ডাকবে। তাই করলো বেশি না ভেবে বলে উঠল অভ্র,
‘ ব্ল্যাকবেরি ওঠো জলদি আমরা এসে পড়েছি কিন্তু?’
উওরে আদ্রিজার কোনো হেলদোলই পেল না অভ্র। যা দেখে অভ্র বুঝলো ‘এই মেয়ে গভীর ঘুমেই মগ্ন হয়েছে এখন।’
অভ্র আরো কিছুক্ষন চুপচাপ বসে রইলো এমন। আদ্রিজাকে ডাকতেও যেন মন চাইছে না তাঁর। মেয়েটাকে শুরু থেকেই অন্যরকম লাগে অভ্রের। কেমন লাগে তা সে নিজেও জানে না। তবে খারাপ লাগে এতটুকু জানে অভ্র।’
নানান সব ভাবনায় মগ্ন ছিল অভ্র। এরই মাঝে নড়েচড়ে উঠলো আদ্রিজা। চোখ খুলতেই সামনে অভ্রকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো সে,
‘ কি হলো আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’
উওরে স্বাভাবিক কন্ঠতে বলে উঠল অভ্র,
‘ না দেখছি তুমি কতক্ষণ এই থেমে যাওয়া গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকতে পারো?’
‘ থেমে যাওয়া গাড়ি মানে আমাদের গাড়িটা কি নষ্ট হয়ে গেছে?’
‘ না। আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছি কিন্তু আপনার ঘুমের জন্য গাড়ির বাহিরে যেতে পারছি না।’
অভ্রের কথা শুনে ফট করেই ঘুম পাখি উড়ে গেল আদ্রিজার। ভরাট গলায় বললো সে,
‘ কি সত্যি আমরা চলে এসেছি?’
‘ জ্বী ম্যাডাম। ওই দেখুন ওই যে সামনের বিশাল বাড়িটা দেখছেন ওই বাড়িটার মাঝেই যাবো আমরা।’
আদ্রিজা সামনে তাকালো পরক্ষণেই বললো,
‘ আমায় ডাকবেন না?’
বলেই তক্ষৎনাত নিজেকে ঠিক করে গাড়ি থেকে নামতে নিলো আদ্রিজা। যা দেখে অভ্র বললো,
‘ আরে আরে কোথায় যাচ্ছো আমরা গাড়ি নিয়েই ভিতরে ঢুকবো দাঁড়াও।’
বলেই নিজের ফোন খুঁজতে নিলো অভ্র। পরক্ষণেই সেটা যে রুহুলদের সুইমিংপুলের ভিতর ফেলে এসেছে কথাটা মাথায় আসতেই বলে উঠল সে আদ্রিজাকে,
‘ তোমার ফোনটা দেও তো?’
অভ্রের কথা শুনে খানিকটা অবাক হয়ে বললো আদ্রিজা,
‘ আমার ফোন?’
‘ হুম আরুকে একটা ফোন করো বললো বাড়ির সামনের বড় গেটটা খুলতে আমরা এসেছি।’
আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা। নিজের ফোনটা বের করে ডায়াল করলো সে অারুর নাম্বারে আরু ফোন তুললেই ফোনটা অভ্রকে দেয় আদ্রিজা। তারপর যা বলার অভ্রই বলে।’
আরুর সাথে কথা বলার ২ মিনিটের মাথাতেই অভ্রদের বাড়িতে ঢোকার কালো গেটটা খুলে গেল। গেট খুলতেই অভ্র সোজা গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতরে। বিশাল মাঠ সম্পন্ন ঘেরা এক আলিশান বাড়ি। যার চারদিকেই ঘিরে গাছপালা। আদ্রিজা পুরো জায়গাটার আশপাশে একবার চোখ বুলালো। অভ্রের দাদুরা যে এত বড় বাড়িতে থাকে এটা ভাবে নি আদ্রিজা।’
___
মাথায় ঘোমটা দিয়ে অভ্রের পাশ দিয়ে বাড়ির ভিতরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিজা। তাঁর সামনেই ঘিরে আছে সবাই অভ্রের দুই চাচা চাচি, আরু, অভ্রের বাবা মা, তুষার ভাইয়া সহ আরো দুটো মেয়ে এছাড়াও আরো কিছু লোকজন। তবে এত লোকের ভিড়েও অভ্রের দাদা-দাদি নেই এখানে।’
খানিকটা ঘাবড়ে আছে আদ্রিজা না জানি অভ্রের দাদা দাদি তাঁকে দেখে কেমন রিয়েকশন দেয়? ওনারা তো আদ্রিজা অভ্রের বৌভাতের অনুষ্ঠানেও আসে নি। যদিও কি কারণে আসে নি তা জানে না আদ্রিজা?’
এরই মাঝে হাতে লাঠির খটখট শব্দ করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল অভ্রের দাদু,
#চলবে….
[ভুল-ত্রুটি ক্ষমার সাপেক্ষ। গল্প কেমন লাগলো অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবে।]
#TanjiL_Mim♥️