গোধূলি বিকেলে তুমি আমি পর্ব-৪৫+৪৬

0
554

#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪৫
________________

‘ কি হলো আপনি ওভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’

হঠাৎই আদ্রিজার মুখে এমন কথা শুনে নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসলো অভ্র। খানিকটা বিলম্বিত কন্ঠে বললো,

‘ না ভাবছি তোমায় এখন কি করা যায়?’

অভ্রের কথা শুনে চোখ বড় বড় করে বললো আদ্রিজা,

‘ কি করা যায় মানে কি করবেন আপনি?’

‘ সেটাই তো ভাবছি। এই রাতের বেলা তোমায় নিয়ে ঢাকা ফিরবো আর ইউ ক্রেজি।’

আদ্রিজা খানিকটা নিশ্চুপ রইলো অভ্রের কথা শুনে। কি বলবে বুঝতে পারছে না। সত্যি তো এই রাতের বেলা কিভাবে ঢাকা বেক করতে পারে তাঁরা। কিন্তু আদ্রিজাও বা কি করবে এখন। আদ্রিজা আশেপাশে তাকালো রুমে চারিদিকে থাকা জানালারগুলোর সবগুলোই খোলা, বাহিরের ঘনকালো অন্ধকারটা পুরোই চোখের সামনে ভাসছে তাঁর। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আঁতকে উঠলো আদ্রিজা। খানিকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

‘ আপনি এইভাবে দরজা জানালা খুলে রেখেছেন কেন জানেন না রাতের বেলা এইভাবে দরজা খুলে রাখতে নেই।’

বলেই হতভম্ব হয়ে চটজলদি রুমের সমস্ত জানালা বন্ধ করে দিতে লাগলো আদ্রিজা। বাহিরে তাকায় নি আর মোটেও প্রচন্ড ঘাবড়ে আছে কি না। আগে এসব জানলে জীবনেও এখানে আসতো না আদ্রিজা।’

এদিকে অভ্র,

আদ্রিজার কান্ডে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। আদ্রিজা মেয়েটা যে মাঝে মাঝে এত ভীতু হয় কেন? এটাই বুঝতে পারে না অভ্র। আরে যেগুলোতে ভয় লাগে সেগুলো দেখা বা শোনার কি দরকার। যদিও আজকের বিষয়েটায় পুরোপুরি আদ্রিজার দোষ দেওয়া যায় না। ওই তুষারটার জন্যই তো হলো ওসব। কি দরকার ছিল আদ্রিজাদের এসব বলার। আর ওগুলো সব পুরনো ঘটনা এখন আর আছে নাকি। অভ্র জোরে নিশ্বাস ফেলে ডাকলো আদ্রিজাকে বললো,

‘ আমি নিচে যাচ্ছি তুমি কি যাবে আমার সাথে ব্ল্যাকবেরি?’

সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে রুমের সমস্ত জানালা বন্ধ করে অভ্রের সামনে এগিয়ে এসে বললো,

‘ হুম যাবো তো চলুন তাড়াতাড়ি।’

বলেই অভ্রকে রেখেছি চলে যেতে লাগলো আদ্রিজা। আর অভ্রও বেশি না ভেবে ডানদিকের কপালটা হাল্কা চুলকে এগিয়ে যেতে লাগলো আদ্রিজার পিছু পিছু। সাথে পুনরায় আবার উঠল,

‘ ভীতু কাঠবিড়ালি একটা!’

____

রাত সাড়ে ন’টার মাঝেই সবাই ডিনার সেরে যে যার রুমে চলে যায় ঘুমানোর জন্য। এ বাড়ির দাদুর একটা নিয়ম আছে সেটা হলো রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো। আর এমনিতেও গ্রামের দিকের মানুষগুলো প্রায় তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়ে। যার দরুন গ্রামীণ পরিবেশ রাত দশটা এগারোটার মধ্যেই পুরো নিরিবিলি আর সুনসান হয়ে যায়।’


রান্নাঘরে অভ্রের মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিজা। বর্তমানে শাশুড়ী মা আর আদ্রিজা ব্যতীত কেউ নেই সেখানে। সবাই যার যার রুমে চলে গেছে অভ্রের মাও যাবে এখন। হঠাৎই অভ্রের মা সেলিনা বেগম বলে উঠল আদ্রিজাকে,

‘ তুই এখনো আমার পিছন পিছন ঘুর ঘুর করছিস কেন? যা রুমে যা।’

প্রতিউওরে খানিকটা ঘাবড়ানো ফেস নিয়ে বললো আদ্রিজা,

‘ বলছিলাম কি মা আজ আমি তোমার সাথে ঘুমাই।’

আদ্রিজার কথা শুনে খানিকটা অবাক হয়ে বললেন সেলিনা বেগম,

‘ আমার সাথে ঘুমাবি মানে?’

‘ না মানে হয়েছে কি,

আদ্রিজা কিছু বলার আগেই বলে উঠলেন সেলিনা বেগম,

‘ অভ্রের সাথে ঝগড়া হয়েছে তোর,

শাশুড়ী মায়ের কথা শুনে খানিকটা চমকে উঠে বললো আদ্রিজা,

‘ এমা না না ওনার সাথে ঝগড়া হবে কেন।’

আদ্রিজার কথা শুনে ভ্রু-জোড়া খানিকটা কুঁচকে বললেন সেলিনা বেগম,

‘ তাহলে আমার সাথে ঘুমাতে চাইছিস কেন?’

‘ আসলে হয়েছে কি মা,

এরই মাঝে অভ্রের বাবা ডাকলো সেলিনা বেগমকে। রাতের খাওয়ার ঔষধ খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। আদ্রিজা এতে খানিকটা ভীত হলো সে তো ভুলেই গিয়েছিল শাশুড়ী মা একা নয় শশুড় মশাইও আছে ওনার সাথে। এখন এদের সাথে কি করে ঘুমাতে পারে আদ্রিজা। ভেবেছিল আরুদের সাথে ঘুমাবে কিন্তু সবাই বিষয়টা কিভাবে নিবে এটা ভেবে আর কিছু বলে নি আদ্রিজা। তাই ভেবেছিল সবাই চলে গেলে চুপিচুপি শাশুড়ী মাকে বলবে ঘুমানোর কথা। কিন্তু শাশুড়ি মায়ের সাথে শশুর বাবাও আছে ভুলে গিয়েছিল আদ্রিজা। আদ্রিজা খানিকটা ভীত স্বরে বললো,

‘ বাবা ডাকছে তোমায়।’

‘ হুম দেখছি তো। ওটা বাদ দে আগে বল তুই আমার সাথে ঘুমাতে চাইছিস কেন?’

খানিকটা ভীতু স্বরে বললো আদ্রিজা,

‘ না মা কিছু না। জাস্ট মজা করে বলেছিলাম কথাটা শুনে তোমার রিয়েকশন দেখার ছিল জাস্ট।’

প্রতি উওরে শুধু এতটুকুই বলে সেলিনা বেগম,

‘ ওহ!’

___

নিজেদের রুমের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিজা। ভয়ে গা ছমছম করছে তাঁর। আদ্রিজা আশেপাশে তাকালো পুরোই চুপচাপ আর নিরিবিলি চারপাশ। উপর তলায় শুধু সে আর অভ্রই থাকে। বাকি সবাই নিচে। আদ্রিজা আশেপাশে আর একবার চোখ বুলালো ঝিঁঝি পোকা ডাকছে চারপাশে, গাছের পাতাও নড়ছে গুনগুনিয়ে, হুট করেই যেন নুপুর বাজার শব্দ কানে ভেসে আসলো আদ্রিজার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আরো আঁতকে উঠলো সে। ভিতরে যাবে নাকি নিচে যাবে এটাই বুঝচ্ছে না সে। অভ্র নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। ধুর! মায়ের কাছে আবদার না করে তখনই যদি অভ্রের সাথে রুমে এসে ঘুমানোর চেষ্টা করতো তাহলে আর এমন হতো না।’

আদ্রিজা ভয়ে ভয়েই রুমের দরজা খুললো সাথে মনে মনে প্রার্থনা করলো অভ্র যেন সজাগ থাকে। রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই ভীতু হয়ে যাওয়া মনটায় ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটলো আদ্রিজার৷ কারন অভ্র সত্যিই ঘুমায় নি। হাতে ফোন নিয়ে কি যেন করছে সে। আদ্রিজা বুঝলো না অভ্র ফোন পেল কোথায় পরক্ষণেই হাতের মোবাইলটার দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বুঝলো আদ্রিজা এটা তুষার ভাইয়ার ফোন নিশ্চয়ই উনি চেয়ে এনেছেন। অতঃপর আদ্রিজা বেশি না ভেবে জোরে নিশ্বাস ফেললো। তারপর রুমে দরজাটা আটকে অভ্রের দিকে যেতে যেতে বললো সে,

‘ আপনি এখনও ঘুমান নি কেন?’

প্রতিউওরে শুধু এতটুকুই বলে অভ্র,

‘ এমনি।’

‘ ওহ!’

বলেই বিছানায় বসলো আদ্রিজা। কিছুক্ষনের চুপচাপ নেমে আসলো দুজনের মাঝে। চারপাশ যেন একটু বেশিই নিরিবিলি। মাথার উপর থাকা সিলিং ফ্যানটার শব্দ শোনা যাচ্ছে কানে, জানালার ধারে বন্ধ দরজার ভীড়ে সাদা পর্দাটা হাল্কা নড়ে উঠছে কিছুক্ষন পর পর। আদ্রিজা ঘন ঘন চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে। হুট করেই দেয়াল জুড়ে থাকা একটা টিকটিকি বলে উঠল,

‘ ঠিক ঠিক ঠিক।’

সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে আঁতকে উঠলো আদ্রিজা। আদ্রিজার কান্ডে মুখ চেপে হাসলো অভ্র। তবে কিছু বললো না। আদ্রিজা অন্যদিকে ঘুরে থাকায় অভ্রের হাসিটা চোখে পড়লো না তাঁর। হঠাৎই অভ্রের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসলো একটা। আদ্রিজার ভয় মাখা মুখটাকে আর একটু ভয় দেখালে মন্দ হয় না যতই হোক বেশি সাহসীকতা দেখানোর একটু শাস্তিও তো দেওয়া উচিত তাই না।’

অভ্র তাঁর হাতের ফোনটা পাশে রেখে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে লাগলো আদ্রিজার দিকে।’

অন্যদিকে,

আদ্রিজা ভাবছে অন্যকিছু মাথার ভিতর তুষার ভাইয়ার বলা সব কথাগুলো ঘুরছে বার বার। সেই বিশাল পুরনো বাড়ি, একলা একটা মেয়ে, পায়ে নূপুরের শব্দ, হুট করেই মারা যাওয়া। সবকিছু ভাবতেই ভয়ে জরর্জিত আদ্রিজা। বুক কাঁপছে দক দক করে, ভীষণভাবে ভিতর থেকে কান্না আসছে তাঁর। কি দরকার ছিল তুষার ভাইয়ার কথাগুলো শোনার। এরই মাঝে অভ্র আদ্রিজার কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিস ফিস করে বললো,

‘ ব্ল্যাকবে…

সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে কেঁপে উঠে অভ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আদ্রিজা। সাথে কাঁপা কাঁপা গলায় কান্না ভেজা কন্ঠ নিয়ে বলে উঠল সে,

‘ আজ রাতের মতো আমায় হেল্প করুন না প্লিজ, আমি কথা দিচ্ছি আর জীবনে কোনোদিন আপনার মানা করা জিনিসের ওপর আগ্রহ দেখাবো না। আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে অভ্র। চারপাশ ছমছমে লাগছে। কানে কেন যেন নূপুর বাজার শব্দ আসছে। হয়তো আমার ভিতরের ভয়ের জন্যই এমন হচ্ছে। আমার ভীষণ জোরে কান্না পাচ্ছে অভ্র। আমার না ছোট বেলা থেকেই ভূতে ভীষণ ভয়। হরর মুভির থেকেও এসব প্রাচীনকালীন ভূত-প্রেত আত্মার ভীষণ ভয়। আমাদের গ্রামেও এমনই কি যেন ঘটেছিল একবার। আমার নানাভাই বলেছিল তখন থেকেই এসবে আমার ভীষণ ভয়। আমি বুঝতে পারি নি তুষার ভাইয়া এমনই সত্য জনিত কিছু বলবে। প্লিজ আমায় একা রেখে কোথাও যাবেন না অভ্র। নয়তো আমি আজ ভয়েই শেষ হয়ে যাবো।’

পুরো একাধারে কথাগুলো বলতে লাগলো আদ্রিজা। কথা বলতে বলতে গলা জড়িয়ে আসছিল তাঁর। আদ্রিজার আচরণে পুরোই চমকে উঠলো অভ্র। সে ভাবে নি আদ্রিজা এইভাবে হুট করেই তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্না ভেজা কন্ঠে কিছু বলে উঠবে। অভ্র শুনলো আদ্রিজার কথা। শেষের কথাটায় যেন সে নিজেও আঘাত পেল। অভ্রেরও যেন কি হলো হুট করে আদ্রিজাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো সে। তারপর শীতল ভেজা কন্ঠ নিয়ে বলে উঠল,

‘ হুস! চুপ থাকো ব্ল্যাকবেরি। শেষ হতে যাবে কেন অভ্র থাকতে আদ্রিজা শেষ হতে পারে নাকি। আর এত ভয় পাওয়ার কি আছে আমি তো আছি তোমার সাথে নাকি। ভয়কে বেশি গুরুত্ব দিও না ব্ল্যাকবেরি। কেননা ভয়কে যতটা গুরুত্ব দিবে ততই সে তোমাকে আঁকড়ে ধরবে। তাই ভয়কে জয় করতে শিখ। এতটা ভীতু হলেও চলে নাকি। আর তাছাড়া এসব ভূত-প্রেত বলে কিছু হয় না। এগুলো নিছোকি আমাদের মনের ভুল। তাই মনকে শান্ত করো জোরে নিশ্বাস ফেলো। দেখবে ভয় কেটে যাবে।’

আদ্রিজা শুনলো অভ্রের কথা তবে অভ্রকে ছাড়লো না। এমনভাবে জড়িয়ে রইলো যেন অভ্রকে ছাড়লেই অভ্র ছুট্টে পালিয়ে যাবে তাঁকে ছেড়ে। আদ্রিজা তাঁর চোখ বন্ধ করে নিলো। অভ্রকে জড়িয়ে ধরে থাকতে বিন্দুমাত্র সংকোচ ফিল হচ্ছে না তাঁর। কেন হচ্ছে না তা সে নিজেও জানে না। হয়তো ভয়ে সংকোচ শব্দটাই ভুলে গেছে আদ্রিজা।’

অভ্রও ছাড়লো না। চুপচাপ আদ্রিজাকে ধরেই বসে রইলো চুপচাপ।’

নিকষ কালো অন্ধকারে ঘেরা চারপাশ। গা ছমছমে পরিবেশ। বাহিরে হিমশীতল বাতাস বইছে খুব। চাঁদ উঠেছে আকাশ ছুঁয়ে, তারা জমেনি তেমন। যদিও সেই চাঁদটাকে, সাথে অল্প কিছু জমানো তারাগুলোকে দেখতে পাচ্ছে না অভ্র। কারন রুমের দরজা জানালা যে আজ বন্ধ সব। আর এসবের ভিড়েই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে আদ্রিজা আর অভ্র।’

বেশ কিছুক্ষন পর,

হঠাৎই অভ্র ডাকলো আদ্রিজাকে। বললো,

‘ ব্ল্যাকবেরি শুনছো,

প্রতি উওরে জবাব আসলো না আদ্রিজার। আদ্রিজার নিশ্চুপতায় আবারও বললো অভ্র,

‘ তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমার কথা?’

এবারও জবাব আসলো না। অভ্র বুঝলো আদ্রিজা হয়তো তাঁকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। অভ্র আরো কিছুক্ষন বসে রইলো ওইভাবে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের থেকে ছাড়ালো আদ্রিজাকে। আদ্রিজা সত্যি সত্যিই তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অভ্র বেশি ভাবলো না। আনমনাই আদ্রিজাকে শুয়ে দিল সে বিছানায় বালিশ পেতে। তারপর সুন্দর মতো গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে রইলো অভ্র ঘুমন্ত আদ্রিজার মুখের দিকে। তারপর বললো,

‘ তুমি বড্ড বেশি মায়াবিনী কাঠবিড়ালি। হয়তো তোমার মায়াবিনীতেই ধীরে ধীরে আঁটকে পড়ছি আমি। আমার হৃদয়টাও যেন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হচ্ছে তোমার ছোঁয়ায়। তোমাকে ভিতর থেকে চাইছে খুব। তবে কি সত্যি নিজ অজান্তেই তোমায় আমি ভালোবেসে ফেলেছি ব্ল্যাকবেরি?’

আনমনায় কথাগুলো বললো অভ্র। তবে উওর যেন মিললো না আজ।’

‘ কে দিবে এই প্রশ্নের উত্তর আমি, তুমি নাকি আমার নিস্তেজ হওয়া মন!’

#চলবে….

#গোধূলি_বিকেলে_তুমি_আমি❤️
#লেখিকা:#তানজিল_মীম❤️
— পর্বঃ৪৬
________________

ভোরের শিশির ভেজা শীত শীত ভাব। সূর্য উঠেছে ঠিকই তবে রোদের ছিটেফোঁটা নেই রুমে। রুম জুড়ে থাকা দেয়ালের কর্নারের শুকনো কাঠের ফাঁকের ভিড়ে খানিকটা সূর্যের আলোক রশ্মি আসছে মাত্র। ফুড়ফুড়ে আমাজে দেয়াল ঘেঁষে থাকা বিশাল আম গাছের পাতারা নড়ছিল খুব। পাখি ডাকছিল কিচির মিচির শব্দ করে। খানিকটা শীতে গায়ের কাঁথাটা আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আদ্রিজা। তারপরও শীত কমলো না যেন। পরক্ষণেই নিজেকে অবস্থান করলো কারো শীতল বুকের পাটির ওপর। ঘুমের ভিড়ে পাশের ব্যক্তিকে একহাতে আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আদ্রিজা। পরমুহূর্তেই পুরো দমে হুস আসতেই চোখ খুলে তাকালো সে। চোখের সামনেই নিজেকে অভ্রের এতটা কাছাকাছি দেখে খানিকটা হকচকিয়ে উঠলো আদ্রিজা। তবে সরলো না ভাবতে লাগলো কাল রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা। সে যে নিজ থেকেই অভ্রকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিল বিষয়টা মনে পড়তেই লজ্জায় মাথায় হাত দিতে ইচ্ছে হলো তাঁর। ছিঃ কাল রাতে নিশ্চয়ই অভ্র তাঁকে নির্লজ্জ উপাধিতে বর্ধিত করে ছিল। আদ্রিজা আস্তে আস্তে অভ্রের থেকে সরে আসলো। ধীরে ধীরে যেন সেও অভ্রের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। কারনে অকারনে হুট করেই কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে দুজন।’

সেদিন রাতের ড্রিংকিং করার বিষয়গুলো মাথায় আসতেই গা গুলিয়ে আসছে আদ্রিজার। যদিও খুব বেশি তেমন কিছু মনে নেই। তবে ভুলভাল যে কিছু একটা হয়েছিল তাদের মাঝে সেটা আদ্রিজা নিজের অবস্থা দেখেই বুঝেছিল। আর ধীরে ধীরে সবটা খোলাসা হচ্ছিল। ভাগ্যিস অভ্রের কিছু মনে নেই না হলে লজ্জায় কি বলতো সে। আদ্রিজা দীর্ঘ শ্বাস ফেললো যতই হোক অভ্রের প্রতি আসক্ত হওয়া চলবে না তাঁর। যে ভালোবাসার আঘাত আদ্রিজা পেয়েছে সেই আঘাত অভ্রকে কিছুতেই পেতে দিবে না। যতই হোক কারো ভালোবাসার বাঁধা হতে চায় না আদ্রিজা। আদ্রিজা আর ভাবলো না কেন যেন অভ্রকে ছেড়ে যাওয়ার কথাটা মাথায় আসতেই মনটা ভয়ংকর ভাবে খারাপ হলো তাঁর। আদ্রিজার বেশি কিছু না চটজলদি চলে যায় ওয়াশরুমের দিকে। তারপর শুভ্র রঙের একটা শাড়ি পড়ে নিলো সে গায়ের শাড়িটা বড্ড বেশি অগোছালো হয়ে গেছে। আদ্রিজা আশেপাশে তাকালো তাঁরপর সামনের টেবিলটা থেকে একটা কলম আর একটা ছোট্ট কাগজের টুকরোতে কিছু একটা লিখে সেটাকে অভ্রের বালিশের পাশে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।’

আদ্রিজা যাওয়ার কয়েক মুহূর্তের মাঝেই অভ্রের ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশে আদ্রিজাকে না দেখে খানিকটা অবাক হয়েছে সে। সামনের জানালাগুলোও খোলা হয়তো আদ্রিজা খুলে গিয়েছে নিচে। অভ্র সামনের দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো সবেমাত্র সাড়ে ছয়টা বাজে। অভ্র আধমরা হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষন। আজ যেন খুব তাড়াতাড়িই ঘুমটা ভেঙে গেল তাঁর। হঠাৎই অভ্রের চোখ গেল আদ্রিজার রেখে যাওয়া চিরকুটের দিকে। অভ্র হাত দিয়ে উঠালো সাথে দেখলো। আদ্রিজা লিখে গেছে কিছু,

‘ কাল আমাকে সামলানোর জন্য এতত্তোগুলো ধন্যবাদ ঘুমন্ত রাজকুমার। সামনাসামনি বলতে পারবো না বলে চিরকুট লিখে গেলাম আপনি আবার জিজ্ঞেস করতে আসবেন না কিন্তু। আমি কিন্তু বড্ড লাজুক পদের তাই প্লিজ লজ্জা দিবেন না আর। লজ্জার জন্যই এই চিরকুট লেখা। আমি কালকের জন্য সত্যি লজ্জিত। পরিশেষে বলবো ‘শুভ সকাল ঘুমন্ত রাজকুমার। আজকের দিনটা আপনার ভালো কাটুক।’

~ ইতি আদ্রিজা।’

আদ্রিজার লিখে যাওয়া চিরকুট দেখে আনমনাই হাসলো অভ্র। উষ্ণ ঠোঁটে হেঁসে বললো,

‘ লজ্জাবতী কাঠবিড়ালি একটা!’

____

‘ এখানে কি করছো ব্ল্যাকবেরি?’

আচমকাই পিছন থেকে অভ্রের কন্ঠ শুনতেই পিছন ফিরে তাকালো আদ্রিজা। মাত্রই বাড়ির পিছন দিকটায় হাঁটতে বেরিয়েছিল সে। রান্নাঘরেও গিয়েছিল কিন্তু শাশুড়ীসহ চাচিরা কিছুই করতে দেয় নি তাঁকে তাই বাধ্য হয়ে বাড়ির পিছন দিকটায় হাঁটতে বেরিয়ে ছিল আদ্রিজা। গাছে পাখি ডাকছে ‘বউ কথা কও’ বলে। আদ্রিজা পাখির সেই সুরেলা কন্ঠটাকে আরো কাছ থেকে শোনার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল সামনে এরই মাঝে অভ্র হাজির। আদ্রিজা খানিকটা লজ্জা মাখা নিয়ে বললো,

‘ না তেমন কিছু না হাল্কা একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।’

প্রতি উওরে বলে অভ্র,

‘ ওহ, চলো তবে একসাথে হাঁটি।’

আদ্রিজাও সম্মতি জানালো। অতঃপর অভ্র আদ্রিজা পাশাপাশি হেঁটে এগিয়ে যেতে লাগলো সামনে। শীত শীত ভাব পড়েছে সারা গ্রাম জুড়ে। দূর সীমানাগুলোকে কুয়াশায় ঘিরে ধরেছে ঘাপটি মেরে। যেন জানান দিচ্ছিল শীতল ভেজা এই ফুড়ফুড়ে কুয়াশা ঘেরা পরিবেশটা,

‘ কনকনে শীতের ভাব আসছে কিন্তু। তোমরা প্রস্তুত তো শীত নামক জোড়ালো শীতলের স্পর্শ পেতে।’

আদ্রিজা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ডানহাতের অংশটাকে ভালোভাবে ঢেকেঢুকে নিলো। শুধুতে শীত শীত ভাবটা তাকে অতটা গ্রাস করতে না পারলেও এখন বেশ শীত শীত করছে তার। অভ্র বুঝলো আদ্রিজার দিকটা খানিকটা বিলম্বিত কন্ঠে বললো,

‘ শীত করছে খুব বাড়ি ফিরে যাবে কি?’

প্রতি উওরে শান্ত দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে বললো আদ্রিজা,

‘ না আমি ঠিক আছি।’

আদ্রিজার কথার উওর হিসেবে অভ্র কিছু বললো না চুপচাপ হাঁটতে লাগলো সামনে। সোনালী রূপালি রঙে রাঙিত চারপাশ। দুইধারে কোলা আর মাঝপথে রাস্তা। রাস্তার কর্নার দিয়ে চিকন মোটা মিশ্রিত গাছপালা। খেজুর গাছও আছে। তবে আপাতত রসের হাড়ি লাগানোর সময় আসে নি। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বাড়ির পিছন পেরিয়ে সরু রাস্তায় চলে আসলো এটাই বুঝতে পারলো না আদ্রিজা আর অভ্র। হঠাৎই অভ্র প্রশ্ন করলো,

‘ চা খাবে ব্ল্যাকবেরি?’

খানিকটা হকচকিয়ে উঠলো আদ্রিজা। নিশ্চুপ দৃষ্টিতে অভ্রের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ এখানে?’

‘ হুম সামনে একটা টং দোকান আছে যাবে তুমি?’

আদ্রিজা বেশ অবাক হলো অভ্রের কথা শুনে। তার যতদূর মনে পড়ে অভ্র সেইভাবে খোলা আকাশ পথে বসে চা খাওয়া পছন্দ করে না। যদিও তাঁর সাথে এর আগে দু’বার খাওয়া হয়েছিল অভ্রের। অভ্র যে চা খাওয়া পছন্দ করে না এটা তখন জানতো না অাদ্রিজা। আপাতত বেশি ভাবলো না আদ্রিজা। আনমনাই বললো সে,

‘ হুম চলুন!’

মুচকি হাসলো অভ্র। তারপর এগিয়ে চললো দুজন সামনের টংয়ের দোকানের উদ্দেশ্যে।’

প্রভাত বেলা। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে সাতটা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি টং দোকানে বসে চা খাচ্ছে অভ্র আর আদ্রিজা। চায়ের স্পর্শে এখন মোটামুটি নিজেকে ফুড়ফুড়ে লাগছে আদ্রিজার। শীত শীত ভাবটা এখন আর নেই। আদ্রিজা চারপাশে চোখ বুলালো দূর দূরান্তের বিশাল কোলার দিকে তাকিয়ে আছে আদ্রিজা। দূর সীমানায় এখনো কুয়াশা ঘেরা আছে সেখানে। আদ্রিজার দৃষ্টি বর্তমানে সেখানেই। দূর কুয়াশার ভিড়ে এক চিলতে সূর্যের আলোক রশ্মি চোখ পড়লো আদ্রিজার। এই রশ্মিটা শুরু থেকেই তাদের সাথে লেপ্টে আছে। তারাও যেখানে যায় সেও সেখানে তাদের পিছু পিছু হাঁটে। আবার তারা যখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সেও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। ব্যাপারটা দারুণ! আনমনা হাসলো আদ্রিজা। আদ্রিজার হাসি মাখা মুখ দেখে অভ্রও হাসলো কেন যেন অজানা এক প্রশান্তি কাজ করছে নিজের মাঝে।’

অভ্র আদ্রিজাদের চা খেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে যায়। অভ্র আদ্রিজা একসাথে ছিল বেজায় কেউ কোনো প্রশ্ন করে নি তেমন।’

____

বিকেলে জরুরি তল্লব আসাতেই অভ্র আদ্রিজাকে চলে আসছে হয় সিলেট থেকে। বিগত একদিন অভ্রের ফোনে হাজার চেষ্টা করেও ইউনুস কনটাক্ট করতে পারে নি। শেষে বাধ্য হয়ে অভ্রের বাবার নাম্বারে ফোন করে জানায় সব। অফিসে একটা বিষয়ে গড়মিল ঘটেছে কিছু নিয়ে ফোনে সব বলা যাচ্ছিল না বেজায় বিকেলেই অভ্রকে যেতে হয় সিলেট থেকে। আদ্রিজাকে থাকার জন্য থাকতে বললেও থাকে না। যতই হোক দিনটা যেমন তেমন রাতটা তার জন্য বড়ই তীক্ষ্ণ!’

অভ্রের বাবা মা আর আরুও কাল সকালে যাবে বলে দিয়েছে। এখানে একটা মজার বিষয় হলো। আদ্রিজা সেদিন অভ্রের কোন কাজিনের বিয়ের কথা শুনে এসেছিল এখানে। মুলত সেটা সাজানো বিষয় ছিল একটা যাতে অভ্র আর আদ্রিজাকে এখানে আনা যায়। তাঁরা জানতো কাজ শেষ হলেও অভ্র কোনো না কোনো বাহানা নিয়ে ঠিক থাকতো আর আসতো না এখানে। তাই এমন মিথ্যে কথা। যদিও বিষয়টা আদ্রিজা বুঝতে না পারলেও অভ্র ঠিকই বুঝেছিল। তারপরও সে এসেছে এখানে, তাঁর মা বিয়ের কথা না বললেও আসতো সে, কারন আদ্রিজার যে একা বাড়িতে ভালো লাগছিল না।’

অতঃপর সবাইকে বিদায় জানিয়ে অভ্র আদ্রিজা বেরিয়ে পড়লো গাড়ি করে। ঠিকভাবে থাকতেও পারলো না দুজন। তবে অভ্র বলেছে নেক্সট কাজটা শেষ হলে সে আবার আসবে আদ্রিজাকে নিয়ে সাথে অনেকটা সময় এখানে একসাথে কাটাবে দুজন। অভ্রের কথায় অভ্রের দাদা-দাদিও মেনে নিয়েছে সবটা! সেইভাবে তো কথাই হলো না তাদের সাথে আদ্রিজার৷ মনটা বেজায় খারাপ ছিল তাঁর জন্য কিন্তু পরিস্থিতি কি আর মন খারাপের বায়না শোনে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চলে গেল সবাই ভিতরে। আরুও চলে গেল রুমে ব্যাগ গোছাতে হবে তাঁকে। অনেকদিন হলো বন্ধুমহলের সাথে কনটাক্ট বন্ধ তাদের। মাঝে একবার সবার সাথে ভিডিও কলে কথা হলেও আর খোঁজ নেই। এখানে নেটওয়ার্কে খুব সমস্যা কি না। দিনে যাও একটু থাকে রাতে একদমই নেই। আশিককে খুব মিস করছে আরু, আশিকের ফালতু কবিতা কতদিন শোনা হয় না তাঁর,

আরুর ভাবনার মাঝেই আরুর ফোনটা বেজে উঠলো উপরে আশিকের নাম্বার দেখে চরম অবাক হলো সে। কতদিন পর ফোন দিলো আশিক। আরু বিস্ময়তা নিয়ে ফোন তুললো। কিছু বলতে যাবে এরই মাঝে অপরপাশে আশিক গলা খাগাড়ি দিয়ে বলে উঠল,

‘ নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে,
আজ আমার আরু ছুনা ফোন তুলেছে
উফ! বুকের ব্যাথাটা যেন একটু থেমেছে!’

আশিকের ফোন আসাতে যতটা না খুশি হয়েছিল আরু। পরক্ষণেই আশিকের কবিতা শুনে চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠল,

‘ তোর থার্ডক্লাস কবিতা বলা বন্ধ করবি আশিক।’

উওরে আশিক বলে উঠল,

‘ আমার বাড়ি তোমার গাড়ি
কবে ফিরবা আরু ছুনা কও তাড়াতাড়ি?’

চোখ মুখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস ফেললো আরু। কতক্ষণ আগে যে কেন সে ভাবতে গেল আশিকের থার্ডক্লাস কবিতাগুলোকে সে মিস করছে।’

____

গাড়িতে চুপচাপ বসে আছে আদ্রিজা আর অভ্র। সিলেটের সেই দেখে যাওয়া চা বাগানটার দিকে তাকিয়ে আছে আদ্রিজা। বড্ড বেশিই খারাপ লাগছে এখন। তাঁরা কাল এলো আর আজই চলে যাচ্ছে? তবে ভালো হয়েছে যতই হোক এখানে ভূতের উপদ্রব আছে। এখানে থাকা যায় না।’

#চলবে…..