Home "ধারাবাহিক গল্প ভালোবাসার মৌসুম ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১৩

ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১৩

0
285

#ভালোবাসার_মৌসুম
#aroshi_jahan_isha
পর্ব ১৩

ধরুনি জুড়ে সন্ধ্যা নামার পূর্বাভাস,পশ্চিমা আকাশে হেলে পড়েছে সূর্যীমামা,আকাশটা তখন লাল বর্ণ ধারণ করেছে।পাখিরা নিজ গৃহে যাচ্ছে। প্রকৃতি জুড়ে বিষন্নতা,

ফাবিহা, মেয়েটা বড্ড চতুর ছিলো, দেখতে আহামরি সুন্দরী ছিলো না, শ্যাবর্ণের টানা চোখের শ্যামকন্যা ছিলো,মেয়েটা তখন সবে ভার্সিটিতে ওঠেছিলো বাবা আর মা এর চাপে পড়ে আহির মির্জা কে বিয়ে করেছিলো,তবে হৃদয় মাঝারে ঠাই দিতে পারে নি।দিবে কেমন করে তার হৃদয়ে যে অন্য কারো রাজত্ব। তবে মেয়েটা ছিলো বেশ শক্ত পোক্ত বিয়ে করেছে সংসার করেছে আহির কে স্বামীর অধিকার দিয়েছে তবে দেয় নি মন।তবে সময় বহমান কেটে যায় ২ বছর দু’বছরে বদলে যায় সবকিছু। জন্ম নেয় ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান,সেদিন ছিলো বর্ষনের দিন।প্রকৃতি জুড়ে তখন তুমুল বর্ষন। সৃষ্টি কর্তা বোধহয় সেদিন ভিষন খুশি ছিলেন তাইতো ছোট্ট আহ্লাদী সেদিন দুনিয়ার আলো দেখতে পেয়েছিলো।আহির বড্ড ভালোবেসে মেয়েটার নাম দিয়েছিলো আহ্লাদী।

আহ্লাদী যখন তিন মাসের বাচ্চা একটা মেয়ে, ফাবিহা তখন পাষাণ মানবী হয়ে ছোট্ট মেয়েটাকে ফেলে সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যু কে।আহির সেদিন কাঁদে নি একটুও কাঁদে নি।

“বরং মৃদু হেসে ফাবিহার লাশের পাশে দাড়িয়ে বলেছিলো,শুনছো ফাবিহা তোমার মতো মা যেনো এই পৃথিবীর কোনো আহ্লাদী”র না হয়।তবে তোমার মতো প্রেমিকা যেনো প্রতিটা মেয়ে হয়।যে তার প্রেমিকের জন্য নিজেই মৃত্যু কে গ্রহণ করে।ভালো থেকো পরপারে। আর হ্যাঁ আঁখি”রাতে আবার আমার আহ্লাদী কে নিজের মেয়ে বলে দাবি করো না কেমন। ও শুধুই আমার মেয়ে, আমি ওর মা আমিই ওর বাবা।

ফাবিহার লাশের পাশে ছোট্ট একখানা নীল চিরকুট পেয়েছিলো,আহির আজও সেই চিরকুট খানা রেখে দিয়েছে।

অপ্রিয় আহ্লাদী” র বাবা

অপ্রিয় কেনো বললাম জানেন,কারণ আমার প্রিয় তো নেই, সে তো আমার উপর অভিমান করে চলে গেছে কবরে।জানেন আহ্লাদী”র বাবা আমি খুব পাষাণ যেই মেয়েটাকে জন্ম দিলাম তার জন্যও মায়া লাগলো না।লাগবে কেমন করে যেই গর্ভে আমার প্রিয় পুরুষের সন্তান ঠাই পায় নি,সেই গর্ভে আপনি আহির মির্জার সন্তান ঠাই পেয়েছিলো।তাই হয়তো মায়া লাগে নি।তবে হ্যাঁ মেয়েটার চেহারা দেখলে বুকটা মুচড়ে ওঠে, তাতে অবশ্যই আমি পাত্তা দেই নি।আমাকে ক্ষমা করবেন আমি আপনাকে ভালোবাসতে পারি নি।আর আহ্লাদীর মুখ দেখলে আমার বড্ড কষ্ট হতো,আমার প্রিয় পুরুষের সন্তান ঠাই পায় নি আমার গর্ভে অথচ আহ্লাদী পেয়েছিলো।খুব রাগ হতো বাচ্চা মেয়েটাকে দেখলে তবে কেমন যেনো লাগতো মেয়েটার মুখপানে চাইলে,
যাইহোক আসল কথায় আসি।

এবার আমায় যেতে হবে,আমার মিরাজ যে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।জানেন কতোদিন মানুষ টা কে দেখি না।তার মুখে ভালোবাসি ফারাহ্ পাখি শুনি না।তার বুকের বা পাঁজরের গন্ধ নাকে পাই না।খুব মনে পড়ে তাকে।জানেন আহির আমার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে মানুষ টা নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছে,অথচ আমি দুই বছর ধরে সংসার করছি।মিরাজ না খুব রাগ করেছে,আমি বরং জলদি যাই তার রাগ ভাঙাতে হবে তো নাকি।আর হ্যাঁ আপনি ভালো থাকবেন আহির আপনি খুব ভালো,আর হ্যাঁ আহ্লাদী”র জন্য ভালো দেখে একটা মা নিয়ে আসবেন।আমি তো ভালো মা হতে পারলাম না🥹

আমি খুব খারাপ মা খুব খারাপ বউ।কিন্তু শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা, না শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা না, নয়তো কেনো আমার প্রেমিক আজ বেঁচে নেই।আমি বোধহয় ব্যর্থ মানবী।তাই না আহির?

ইতি,
ফারাহ্

আহিরের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, রাগে মাথা তরতর করে কাঁপছে, জলন্ত সিগারেট খানা হাতে পিসে ফেললো,পকেট থেকে গ্যাস লাইটার খানা বের করে পুড়িয়ে দিলো নীল চিরকুট খানা।মৃদু বাতাসে উড়িয়ে দিলো ছাই হয়ে যাওয়া চিরকুট খানা।

পাপা!

শান্ত শিথিল কক্ষে ছোট্ট আহ্লাদী”র কন্ঠে আহির পিছু ফিরে চাইলো, ছোট্ট মেয়েটার গায়ে পিচ কালারের একখানা ফ্রগ, কাধ সমান চুল গুলো ঝুঁটি করা।চোখে তার রাজ্ব্যের ঘুম। মেয়েটা আবারও ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো,

পাপা তুমি ঘুমাও নি?

আহির ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে,আহ্লাদী কে কোলে তুলে নিলো,মেয়েটা বাবার কাঁধে মুখ গুছে ফিসফিস করে বললো,পাপা আমার আম্মু চাই,তুমি আমাকে মা এনে দিবে না!

আহির ফের কিছু বলতে যাবে,তবে বললো না মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে।গা টা কেমর গরম গরম হয়ে আছে আহির চিন্তিত হয়ে মেয়েটাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। জ্বর আসছে, আহির জলপট্টি দিয়ে দিলো,মেয়েটা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো,

ধরুনি জুড়ে আলো ফুটছে, পাখিরা সব আকাশ জুড়ে নেচে বেড়াচ্ছে। পূর্ব আকাশে সূর্য মামা উঁকি দিচ্ছে।

মাইরা ফ্রেশ হয়ে তানিশা রুমে গেলো,মেয়েটা বোধহয় মাএ ঘুম থেকে ওঠেছে।বিছানায় বসে আছে চুপচাপ।

তানিশা,

হু,তুমি মাইরা”

“হ্যাঁ আমি ফ্রেশ হয়েছো?

হু

খাবে চলো,আজ কলেজ যেতে হবে।পরশু থেকে পরিক্ষা কিন্তু।

তানিশা চুপচাপ শুনলো সব কিছু বললো না।

কি হয়েছে তানিশা তোমার শরীর খারাপ লাগছে,

না আমি ঠিক আছি মাইরা,তুমি যাও! আর আমি যাবো তো আজ কলেজে।তোমার সাথে নিবে আমাকে?

মাইরা ফ্যাফ্যাল করে চেয়েছিলো, মেয়েটাকে আজ অন্য রকম লাগছে,মাইরা ঘাটলো না হু বলে নিজ রুমের দিকে পা বাড়ালো।

___আপা তুই এভাবে সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস?

নীলিমা চোখে কাজল দিতে দিতে বললো,কলেজে।
আচ্ছা এবার বল আমাকে কেমন লাগছে,

নূরানি চাইলো নীলিমার পানে,গাড়ো নীল জর্জেট গাউন তার সাথে লম্বা চুল গুলো বিনুনি করা।মুখে ক্রিতিম সাজ।

নূরানি স্কুলের ব্যাগে বই রাখতে রাখতে মুখ টিপে হেঁসে বললো, হায় আমি যদি তোর মতো জামাই সহ রেডিমেড বাচ্চা পেতাম।

চুপ করবি তুই!

না করবো না,আপা তুই চালিয়ে যা আমি তোর পাশে আছি।জানিস আপা তোর না হওয়া মেয়ে মানে,তোর পেটে যাওয়ার আগেই তোর সতিনের পেটে চলে যাওয়া মেয়েটা কিন্তু হেব্বি কিউট,দেখলেই চুম্মা দিতে মন চায়।

নূর,চুপ করবি।

” ছেহ আপা তুই সত্যি বোকা রে নয়তো এখনো ক্রাস কে পটাতে পারলি না!

নূর উনি আমার ক্রাস নয়,ভালোবাসা।

“সে তুই যাই বলিস না কেনো দ্রুত বিয়ে করে বাড়ি থেকে বের হ।

চুপ একদম আমার পেছনে লাগবি না,নয়তো তোকে পেট উচু টাকলু মামার কাছে বিয়ে দিবো।

-আহারে আমার টাকলু মামাকে একবার বাড়িতে এনে তো দেখো সোনা।

নীলিমা মুখ বাকিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হাটা ধরলো,

____

Are you okay,

হুম ঠিক আছি,

পড়লে কিভাবে?

মাইরা তন্ময়ের পানে চাইলো, এই তো কিছুক্ষণ আগে তানিশার রুম থেকে আসার সময় মেঝেতে পা পিছলে সটান হয়ে পড়ে গেলো,

ঠিক আছো তুমি? দেখি কোথায় লেগেছে!

নাহ,লাগে নি। আমি যাচ্ছি আমার কলেজ আছে।

মাইরা কিছু শুনলো না,দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দড়জা ভিরিয়ে দিলো।

ইশ কোমরের হাড্ডি গুড্ডি বোধহয় ভেঙ্গে গেছে,তখন৷ তন্ময়ের সামনে ভাব দেখাতে বলেছে লাগেনি এখন হারে হারে ব্যথা টের পাচ্ছে।

মাইরা কিছুক্ষণ কোমর ডলতে ডলতে ওয়াশরুমে গিয়ে কলেজ ড্রেস পরে নিলো,সাদা ড্রেসের সাথে ব্লু ক্রস বেল্ট লাগিয়ে, চুলে বিনুনি করে নিলো।অতঃপর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তানিশা কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা ধরলো কলেজের দিকে।

সময় টা তখন মধ্যাহ্নের লগ্ন কলেজের মাঠে মাইরা,নীলিমা বসে আছে নরম দুর্বা ঘাসে। তানিশা খানিকটা দূরে বসে বই পড়ছে।

নীলিমা হাসতে হাসতে মাইরার কাঁধে মাথা রেখে বললো,

এই মারু একটা ড্রামা দেখবি!

কিসের ড্রামা।

আগে দেখ তো নাকি,নীলিমা ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কল করলো কাউকে।

কিরে কাকে কল দিচ্ছিস?

আরে চুপ চুপ কথা বলিস না।

কিছুক্ষণের মাধ্যেই কল রিসিভ করলো,আহির,

নীলিমা মুখে ওড়না চেপে সালাম দিলো,

আহির গম্ভীর কন্ঠে সালামের উত্তর দিলো।

কেমন আছো জানে মান?

নীলিমার এহেম প্রশ্নে আহির খানিকটা অবাক হলো বোধহয়, গম্ভীর কন্ঠে বললো,

Who are you?

কোল স্যা,সরি সরি ফিউচার জামাই কোল।মাথা ঠান্ডা করুন।এতো দ্রুত রেগে গেলে হবে আগে শুনুন তো নাকি!

“Just Shut Up”

নীলিমা খানিকটা ভয় পেলো,বুকে থুতু দিলো,মাইরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।

বলছিলাম কি জান তুমি দেখতে হেব্বি কিউট, তোমার হাইটা মাশা-আল্লাহ, যদিও ভার্জিন নয় এতে আমার সমস্যা নেই।আর আহ্লাদী তো আমার মেয়ে তাই না।

নীলিমা হয়তো আরও কিছু বলতো,তার আগেই পেছন থেকে কারো শক্তপোক্ত কন্ঠ ভেসে এলো,

তারপর কি মিস নীলিমা?

নীলিমা চমৎকালো,ভরকালো অবাক হয়ে আহিরের পানে চাইলো, অতঃপর মাইরার হাত ধরে দৌড়ে চলে গেলো,

আহির হাত মুষ্টি বদ্ধ করে রেখেছে, রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। মাথার রগ গুলো কাপছে, কতো বড় অসভ্য মেয়ে নিজের টিচার্স কে কল দিয়ে আজেবাজে কথা বলে।

নীলু কি হয়েছে দৌড়াচ্ছিস কেনো,আর আহির স্যার তোকে কি বললো,

নীলিমা হাঁপাতে হাঁপাতে সব খুলে বললো,মাইরা কে মাইরা চুপচাপ মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছ,

পাঁজি মেয়ে আর মানুষ পেলি না শেষমেশ বিয়াইত্তা বেডার প্রেমে পড়লি?

“আরে বউ নেই তো,তো এখন তো ওনি আন মেরিড নাকি।

মাইরা নীলিমার কাঁধে হাত দিয়ে কিছু বলবে তার আগেই কারো চিৎকারে আত্মা কেঁপে ওঠলো।

পিচ ঢালা রাস্তায় শুভ্র কামিজ পড়া মেয়েটা শরীরটা আপাতত রক্তাক্ত।

মাইরা থমকালো,দু পা পিছিয়ে গেলো,মস্তিস্ক এলোমেলো হয়ে গেলো।দৌড়ে রক্তাক্ত মেয়েটার কাছে গেলো,কি আশ্চর্য খানিকক্ষণ আগে চুপচাপ বসে থাকা মেয়েটা এখন চোখ বন্ধ করে আছে।

এই চোখ খুলো তানিশা,প্লিজ তানিশা চোখ খুলো, প্লিজ!

নীলিমাও তানিশার হাত ধরে বার কয়েক ডাকলো না মেয়েটার সারা শব্দ নেই,

মাইরা কাঁদতে কাঁদতে বললো,নীলু তানিশা চোখ কেনো খুলছে না।কি হয়েছে ওর,

নীলিমা হুট করে তানিশার হাত ছেড়ে দিলো,কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, কাঁদিস না মাইরা,ও আর বেচে নেই।

মাইরা চিৎকার দিয়ে ওঠলো, সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারালো,

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,