Home "ধারাবাহিক গল্প ভালোবাসার মৌসুম ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব

ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব

0
399

#ভালোবাসার_মৌসুম
#Aroshi_Jahan_Isha
পর্ব ১৭

শেষপর্ব

টুকটুকে লাল শাড়িতে বউ সেজে বসে আছে নীলিমা।হাতে স্বর্ণের মোটা চুরি, গলায় হার,নাকে নাক ফুল।মুখে ক্রিতিম কোনো সাজসজ্জা নেই।চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক।নীলিমা সাজতে চায় নি মাইরা আর নুরানি জোর করে সাজিয়েছে।

নীলু কাঁদছিস কেনো ইয়ার….?

“নীলামা মাইরার পানে চেয়ে অভিমানী কন্ঠে বললো, তো কাঁদবো না?কে জানে বাবা কোন খাটাশ লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে! আমার খুব কান্না পাচ্ছে মাইরা,

মাইরা হতাশ হয়ে বললো,থাক সোনা কাঁদিস না,দেখবি তোর বুইড়া জামাই তোকে খুব আদর করবে।

_মাইরা চুপ করবি তুই!

আরে কুল বান্ধবী, এতো রাগীস কেনো?বুইড়া জামাইরা বউদের খুব আদর করে বুঝলি।

মাইরা,,,,,,,

তন্ময়ের ডাকে মাইরা নীলিমাকে চোখ টিপ মেরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

মাইরার পড়নে নীল জামদানী শাড়ি, মাথায় গোল্ডেন হিজাব বাধা। দু-হাতে রেশমী কাঁচের চুরি। নাকে ছোট্ট একটা নাক ফুল। ঠোঁটে নোট কালার লিপস্টিক, চোখে কাজল,কপালে ছোট্ট একটা টিপ।এতেই যেনো মেয়েটাকে অপ্সরা লাগছে।

মাশা-আল্লাহ আমার বউকে তো আজ একদম পিচ্চি পরী লাগছে।

তন্ময়ের কথায় মাইরা খানিকটা লজ্জা পেলো,তন্ময়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বললো,

স্বামীজান আমি মোটেও পিচ্চি না।

_দেখি কতোটা বড়ো হয়েছো!
বলেই মাইরার মুখের দিকে নিখুঁত দৃষ্টি দিলো তন্ময়। অতঃপর ঠোঁট টিপে হাসলো।

আচ্ছা তাহলে তুমি বড়ো হয়েছো?

হু আমি তো বড়োই,বিয়ের রাতে যদি আপনি আমাকে রেখে চলে না যেতেন তাহলে ৪ বছরে চারটা বাচ্চার মা থাকতাম আমি।

তন্ময় হেঁসে উঠলো,

মাইরা লজ্জা পেলো বোধহয় দৌড়ে যেতে গিয়েও থেমে গেলো,

এই দেখুন, মাইশা আপু আর জিহাদ ভাইয়া ”

তন্ময় তাকালো, হ্যাঁ মাইশা আর জিহাদ বোধহয় ওদের প্রেমটা হয়ে গেছে।

মাইরা মৃদু হেসে বললো, যাক এবার অন্তত মাইশা আপুর একটা পরিবার হবে।

_______

বিয়ের আসরে জামাই রুপে আহির মির্জাকে দেখে নীলিমা জ্ঞান হারালো।পুরো বিয়ে বাড়ি জুড়ে হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেছে। বর কে দেখে কনে জ্ঞান হারিয়েছে।তাও আবার যে সে ভাবে বেহুশ হয় নি।

কিছুক্ষণ আগে,

কাজী বিয়ে পড়াতে এসেছে,নীলিমা ফুপিয়ে কাঁদছে।তার সামনে তার হবু স্বামী বসে আছে,অথচ মেয়েটা একবারও তাকিয়েও দেখলো না।

ইমাম সাহেব নীলিমাকে কবুল বলতে বলায় মেয়েটা কান্না জুড়ে দিয়েছে।সে কি কান্না শাড়ির আচল দিয়ে মুখ লুকিয়ে। শেষমেশ মাইরা নীলিমার শাড়ির আঁচল সরিয়ে জামাইয়ের মুখ দেখাতেই নীলিমা ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে।হুট করেই মাইরাকে জড়িয়ে ধরে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠলো। খুশির চোটে বেচারি কথাও বলতে পারছিলো না।
একপর্যায়ে হাসতে হাসতে জ্ঞান হারালো।

সবাই বহু কসরত করে নববধূর হুস ফেরালো। তারপরে বিয়ে পড়ানো হলো।

বিদায় বেলা___

নীলিমা বাবা মা কে জরিয়ে ধরে কাঁদছে।
যতোই ভালবাসার মানুষটাকে পেয়ে যাক না কেনো,পরিবার ছাড়া থাকবে কি করে সে।নুরানিও কাঁদছে।আর কাঁদবেই বা না কেনো তার যে আপা ছাড়া আর কোনো বন্ধু নেই।

নাহিদ সিকদার আহিরের হাতে নীলিমাকে তুলে দিলো,ভেজা অশ্রু নয়নে মৃদু হেসে বললো,

“বাবা আমার মেয়েটা আমার বড়োই আদরের, ছোট বেলা থেকে যা চেয়েছে তা দিয়েছি।সবশেষে যখন জানলাম আমার পাগলী মেয়েটা কাউকে ভালোবাসে তখন কি করে তার ভালোবাসা দাফন করে অন্যকারো হাতে তুলে দিতাম।মেয়েটাকে আগলে রেখো।আমার মেয়েটা যদিও একটু দুষ্টু তবে ভিষণ ভালো,নিজের মেয়ে বলে বলছি না।

আহির মৃদু হেসে বললো,
বাবা এভাবে বলবেন না,আমি নীলিমা কে যথেষ্ট ভালোবাসবো,বিশ্বাস করুন এখন আমার পৃথিবী জুড়ে কেবল দু’জন মানুষ একজন আমার মেয়ে আর একজন আমার অর্ধাঙ্গিনী।

নাহিদ সিকদার মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন,নীলিমা ফুপিয়ে কেঁদে ওঠলো, বাবার আদুরে মেয়ে কি না।

নীলিমা মা দূর থেকে দাড়িয়ে দেখছে বাবা মেয়ের ভালোবাসা। কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলো,সময় কতো জলদি চলে যায় এই তো সেদিন ছোট্ট নীলিমা এ বাড়ি ও বাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতো।

অবশেষে নীলিমার বিধায় হলো,নীলিমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে সবাই তাকিয়ে রইলো গাড়ির দিকে।

মাইরা,তন্ময়, মাইশা,জিহাদ এরা নীলিমার সঙ্গে যাবে।আহিরের বাবা মা নেই,বলতে গেলে আপনজন নেই।
নীলিমা গাড়িতে বসে ফুপিয়ে কাঁদছে।আহির নীলিমার হাতটা ধরে শান্ত কন্ঠে বললো,

মেয়ে এভাবে কাঁদছো কেনো?চলে যেতে চাও বাবা মার কাছে?দিয়ে আসবো।

নীলিমা ভরকে গেলো, পিটপিট করে আহিরের দিকে তাকিয়ে বললো,ছেহ কি আন রোমান্টিক বর জুটলো আমার কপালে,দেখছে বউ কাঁদছ শান্তনা দিয়ে জড়িয়ে ধরবে তা না করে বলছে বাপের বাড়ি দিয়ে আসবে।

আহির ভ্রু কুঁচকে বললো, জাস্ট ওয়েট বার্বিডল একবার বাড়িতে যাই তারপর রোমান্টিক না আন রোমান্টিক বুঝিয়ে দিবো,বলেই চোখ টিপ দিলো।

নীলিমা লজ্জা পেলো,মাথা নুইয়ে নিলো।

ভালো আন্টি পাপা আর মা কখন আসবে?

মাইরা আহ্লাদী কে কোলে নিতে যাবে ওমনি তন্ময় মাইরা কে থামিয়ে দিলো, মাইরার পেটের দিকে ইশারা দিয়ে বললো,

এই বোকা ফুল আমার লিটেল কুইন ব্যথা পাবে তো।
আহ্লাদী তুমি আমার কাছে এসো,

মাইরা পেটে হাত দিয়ে মৃদু হাসলো,এই তো মাসখানেক আগে মাইরা প্রেগন্যান্ট জনতে পেরে চৌধুরী বাড়িতে সেকি আনন্দ। তন্ময় তো একেবারে মাইরাকে একা ছাড়তেই চায় না।সারাদিন চোখে চোখে রাখে।মাইরা হেঁসে উঠলো।

মাইশা বেবি চলো না বিয়ে করে নেই!

ইস বিয়ে বিয়ে করো না তো আমার লজ্জা লজ্জা পায়।

ওলে আমার লুতুপুতু লজ্জা পেও না পাখি,দাড়াও বাড়ি গিয়ে বিয়ের সানাই বাজাবো। বউ ছাড়া কি থাকা যায় বলো।ওপর ওয়ালা পাপ দেবে সুন্দরী মেয়েকে অপেক্ষা করালে।

মাইশা লজ্জা পেয়ে দৌড়ে পালালো।

_____

আজ শুক্রবার, তন্ময়ের অফিস নেই, যদিও একটা মিটিং আছে তাহসিন চৌধুরী সামলে নিবে।
আজকাল মাইরার শরীর বড্ড খারাপ যায়,
মাইরা বিছানায় আধশোয়া হয়ে আছে মাইরার এখন প্রেগন্যান্সির ৮ মাস। পেট বড়ো হয়েছে অনেকটা। মাঝেমধ্যে ছোট্ট বাবু পেটে নাড়াচাড়া করে মাইরা তা অনুভব করে।কি দারুণ মাতৃত্বের স্বাদ।

তন্ময় মাইরার পেটে মাথা গুঁজে দিলো।মাইরা তন্ময়ের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিলো।

তন্ময় মাইরার পেটে চুমু একে দিলো।

স্বামীজান এটা কি ঠিক হচ্ছে?

_বউ আমি আবার কি করলাম?

“এই যে বাবু কে চুমু দিলেন আমাকে দিলেন না!

তন্ময় অভিমানি মাইরাকে জড়িয়ে ধরলো, কপালে গালে ঠোঁটে চোখে চুমু একে দিলো।

অতঃপর শান্ত কন্ঠে বললো,

ধন্যবাদ বউজান আমার জন্য অপেক্ষা করে থেকে যাওয়ার জন্য। সৃষ্টিকর্তাকে শুকরিয়া তোমার মতো একজন কে আমার জীবনে পাঠানোর জন্য।

ভালোবাসি তৃষার আম্মু,খুউব ভালোবাসি।

মাইরা তন্ময়ের বুকে মুখ গুঁজে বললো,
” আমিও আপনাকে ভিষণ ভালোবাসি তৃষার আব্বু।

তন্ময় মাইরার উঁচু পেটে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললো,
তৃষা জলদি এসো,তোমার মাম্মা পাপা তোমার অপেক্ষায় ।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

আহ্লাদী দাঁড়া বলছি,এই দাঁড়া আমাকে দে চকলেট ”
নীলিমা আহ্লাদীর পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে কথাগুলো বলছে,

আহির বুকে হাত গুঁজে এদের কান্ডকারখানা দেখছে,আর হতাশার শ্বাস ফেলছে,

হালকা আকাশি রঙের লেহেঙ্গা পরে দুই অপ্সরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে।নীলিমা আহ্লাদীর পেছনে ছুটেছে, বেচারি নিজের চকলেট শেষ করে এখন মেয়ের চকলেটে ভাগ বসাতে চাইছে।আহির মুগ্ধ হয়ে এদের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশি লেহেঙ্গা পরে দু’জন কে একদম স্বর্গের অপ্সরা লাগছে,নীলিমার দীঘল কালো লম্বা চুল গুলো আপাতত কাধ পেরিয়ে একটু নিচে।

মাস খানেক আহ্লাদী মন খারাপ করে খাটের এক কোনে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলো।আহির কলেজে ছিলো।

নীলিমা আহ্লাদী কে জড়িয়ে ধরে বললো,

ওলে আমার জান পাখিটার মন খারাপ কেনো?

_মা তোমার চুল কত্তো বড়ো, আর আমার দেখো এতো ছোট”

আহ্লাদী”র পানে চেয়ে নীলিমা বললো,

তুমি বড়ো হলে তোমার চুলও বড়ো বুঝলে,

_আহ্লাদী গাল ফুলিয়ে বললো,

ইস বড়ো হতে হতে তোমার সব চুল পরে যাবে।তখন আমাদের দুজনের চুল একসমান থাকবে?

নীলিমা চুপচাপ শুনলো, অতঃপর কেঁচি বের করে লম্বা চুল গুলো কেচ কেচ করে কেটে দিলো।

কি এবার হলো তো সেইম সেইম।

আহ্লাদী মৃদু মন খারাপ করে বললো,মা তুমি এটা কি করলে আমার জন্য কেটে ফেললে?

আহ্লাদীর কপালে চুমু একে নীলিমা আদুরে কন্ঠে বললো,

কজ,তুমি আমার একটা মাএ মেয়ে।তোমার জন্য এটুকু কেনো জান দিয়ে দিতে রাজি।

আহ্লাদী বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে গেলো নিলাম বুকে।

বর্তমান,
পাপা মা আমার চকলেট খেয়ে নিয়েছে!
“আহির আহ্লাদী কে কোলে তুলে নিলো, আহ্লাদীর গালে চুমু একে দিলো।

আচ্ছা পাপা কিনে দিবো তোমাকে আবার ঠিকাছে ”

নীলিমা আহ্লাদী বা হাতের বাহু জড়িয়ে ধরে বললো,

আমাকে কিনে দিবেন না?

আহির নীলিমার কপালে চুমু একে বললো,

হুম দিবো তো,আপাতত বাঁদরামু বন্ধ করো।

নীলিমা চোখ ছোট ছোট করে বললো,

_মোটেও আমি বাদড়ামো করি নি,

আহির কপাল কুঁচকে বললো,
নীলিমা তুমি বাচ্চা ঠিক আহ্লাদীর মতো।আর তোমাদের দুজন কে সামলাতে গিয়ে আমার নাজেহাল অবস্থা।

নীলিমা আহ্লাদীর৷ দিকে তাকিয়ে বললো,
আহ্লাদী তোর পাপাকে বলে দে, মেয়ে মানুষ রংঢং করবে,আর পুরুষ মানুষ তা সয্য করবে।

আহির নীলিমার পানে চেয়ে হাসলো,

অতঃপর বললো,

সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ আমার জীবনে তোমাকে পাঠানোর জন্য।

নীলিমা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো।

আহির দুজন কে জড়িয়ে ধরে বললো,

নীলিমা,

নীলিমা ছোট্ট করে উত্তর দিলো
হু”

ধন্যবাদ আমার মেয়ের সাদাকালো জীবনটা রংধনুর সাত রঙে রাঙানোর জন্য।

(সমাপ্ত)