Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-১৩+১৪

মন কেমনের মরশুম পর্ব-১৩+১৪

0
380

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ১৩

চট্টগ্রাম থেকে সোজা মোটরসাইকেল নিয়েই এসেছে আরশাদ আর ইরা। যখন তারা কদমতলী পৌঁছায় তখন সূর্য কেবলই অস্ত যাওয়ার আয়োজন করছে। গোধূলির রাঙা আলো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশ জুড়ে।
আরশাদ বাইক থামিয়ে দেয় হঠাৎ।

“আমরা কি চলে এসেছি?”
আরশাদ কিছুক্ষণ কি যেনো ভেবে বললো,”তুমি কি খুব ক্লান্ত?”
প্রায় সাড়ে চার ঘন্টার ভ্রমণে ইরা আসলেই একটু ক্লান্ত। বিশ্রাম নিতে পারলে ভালোই হতো। কিন্তু আরশাদের সামনে তা প্রকাশ করেনা।

“না আমি ঠিক আছি।”
“তাহলে চলো, আগে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে আসি। সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত, এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বোধহয় পৃথিবীতে আর হয়না। আমি যতোবার এখানে এসেছি, হোটেলে যাওয়ার আগে সমুদ্রে ছুটেছি। সমুদ্র আমাকে ভীষণ টানে।”
ইরা কিছুটা অবাক হয়ে বললো,”এতোটা রাস্তা বাইক চালিয়ে এসে ক্লান্ত হয়ে যাননি আপনি?”
“সমুদ্র দেখলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। তুমি যেতে চাও?”
ইরা ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বললো,”চলুন।”


হতভম্ব হয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে ইরা। এই প্রথম সামনাসামনি সমুদ্র দেখা। এই বিশাল জলরাশি এতো সুন্দর? ইরার নিজেকে পাগলের মতো মনে হয়। বরফ শীতল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার পায়ের কাছে, শরীর ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ইরা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে উপভোগ করে।
পশ্চিমাকাশ টকটকে লাল। মনে হচ্ছে সূর্যটা বুঝি সমুদ্রের মধ্যেই ডুবে যাচ্ছে। এ কি সৌন্দর্য, এ কি রূপ প্রকৃতির? ইরার ইচ্ছা করে নিজেকে এই সুনীল ঊর্মির মাঝে বিলিয়ে দিতে। মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তার।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে আরশাদ, তার দুই হাত বুকে গুঁজে রেখেছে। মেয়েটা চাপা স্বভাবের বোধহয়। কিংবা তা না, শুধু তার সামনেই এমন থাকে। কিন্তু তার উচ্ছলতা কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারছে না। জীবনে প্রথম বারের মতো সমুদ্র দেখলে আসলেই মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয় কিছু সময়ের জন্য। নিজেকে বড্ড তুচ্ছ মনে হয় এই বিশালতার সামনে। ‘কে আমি? কি আমার পরিচয়? সমুদ্র তুমি কি তা বলতে পারো?’ এমন অনুভূতি হয়।

“ইরা…”
ইরা যেনো অন্য জগতে চলে গিয়েছিলো কিছু সময়ের জন্য। সে কিছুটা চমকে আরশাদের দিকে তাকায়। পরনের আকাশী শাড়িটার আঁচল উত্তাল হাওয়ায় উড়ছে। খোঁপা খুলে গেছে তার। এলোমেলো চুলগুলো পাল্লা দিয়ে উড়ছে। গোধূলির লাল আলো পড়ছে তার চোখে, মুখে, বুকে, সারা শরীরে। তাকে ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনো অজানা রূপবতী কন্যা লাগছে। যার চোখেমুখে এক আকাশ সমান অপার বিস্ময়।

“সমুদ্রস্নান করবে? ইচ্ছা হয়?”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”না।”
“না কেনো?”
“পানির খুব কাছাকাছি যেতে ভীষণ ভয় পাই। খুব ছোট থাকতে একবার পুকুরে ডুবতে বসেছিলাম। মারাই যেতাম হয়তো। হঠাৎ দেখি কোথা থেকে মা ছুটে এলো। আমার আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখি আমি ঘরে, আমার মা কাঁদছে আমার পাশে বসে। আমি নাকি অনেক পানি খেয়ে ফেলেছিলাম। বহু কষ্টে সেই পানি বের করা হয়েছিলো। এরপর থেকে পানিভীতি শুরু হয় আমার। সাঁতারটাও শেখা হয়নি ভয়ের জন্য। সমুদ্র আমার কাছে দূর থেকেই সুন্দর।”
“কিন্তু আমার তো ভীষণ ইচ্ছে করছে। এই অথৈজল দেখলে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। পানিতে শরীর না ভেজাতে পারলে মাথা ঠিক হয়না।”
ইরা শান্ত গলায় বললো,”তখন কি ক্যাফেইন দরকার হয়?”
ইরার সূক্ষ্ম ঠাট্টাটা ধর‍তে পারে আরশাদ। অন্য দিকে তাকিয়ে হাসে ঠোঁট কামড়ে।

“না ক্যাফেইন প্রয়োজন হয় আরো বিশাল সমুদ্র দেখলে। এতোটুকুতে না হলেও চলে।”
“এরচেয়েও বিশাল সমুদ্র?”
“হ্যা, আমি রোজ দেখছি।”
ইরা কিছুটা দমে যায়। আবারও নজর দেয় সামনের দিকে। কি বিশাল ঢেউ আসছে। ইরার ছুটে মিশে যেতে ইচ্ছা করে সেই ঢেউয়ের সাথে।

“আচ্ছা তাহলে তুমি এখানে থাকো। আমি একাই যাই। আর যদি তুমি মনে করো আমিও তোমার মায়ের মতো অথৈ জলরাশি থেকে বাঁচিয়ে আনতে পারবো তাহলে যেতে পারো। এটুকু বিশ্বাস কি করা যায়? জোর করবো না।
ইরা ম্লান হেসে বললো,”এই মুহুর্তে ইরার জীবনে একমাত্র বিশ্বাস বলতে আপনি। এ ছাড়া আমার কাছে আর কোনো বিকল্প আছে? কিন্তু এখন যেতে ইচ্ছা করছে না।”
এই বলে ইরা আশেপাশে তাকায়। কয়েকটা ছেলে দলবেঁধে সমুদ্রে নেমেছে। ইরার অস্বস্তির কারণ আরশাদ বুঝতে পারে।

“আচ্ছা তাহলে আমিও যাবোনা, চলো হোটেলে যাই।”
“অসুবিধা নেই, আপনি যান। আমি আরেকটু থাকতে চাই এখানে, যদি আপনার অনুমতি থাকে। জীবনে এই প্রথম সমুদ্র দেখলাম। আরেকটু এই অবাধ ঢেউয়ের সাক্ষী হতে বড্ড ইচ্ছা করছে। আপনি ততক্ষণে সমুদ্রস্নান করে আসুন।”
“বেশ…”

আরশাদ অবশ্য বেশিদূর যায়না ইরাকে একা রেখে। সমুদ্রে নেমে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে কি ভীষণ রহস্যময়ী লাগছে। মনে হচ্ছে উপন্যাসের জগৎ থেকে লুকিয়ে বাস্তবে চলে আসা কোনো নীল পেন্সিলে আঁকা চরিত্র। এক্ষুনি পালিয়ে আবার উপন্যাসে পাড়ি জমাবে।


কিন্তু হোটেলে ঢুকতে না ঢুকতেই আরশাদ বুঝতে পারে কতো বড় একটা ভুল সে করে ফেললো। এমনিতেই ঠান্ডা লেগেছিলো বৃষ্টিতে ভেজার পর। আবার এই অবেলায় সফেদ সমুদ্র ফেনা দেখে লোভ না সামলাতে পেরে ভয়ানক কান্ড বোধহয় ঘটিয়েই ফেলেছে। শরীর কাঁপছে তার। চোখ জ্বালা করছে ভীষণভাবে। তপ্ত শ্বাস জানান দিচ্ছে শরীরের উদীয়মান তাপমাত্রা। ঘুরতে এসে কিনা জ্বর বাঁধিয়ে বসলো?

“আপনি ঠিক আছেন? আপনাকে এমন লাগছে কেনো?”
ইরার কণ্ঠ কাঁপে।
আরশাদ কোনোমতে ভেজা কাপড় পাল্টেই শুয়ে পড়েছে, ভেজা চুল না মুছেই। ইরা বুঝতে পারে না কি করবে।

“কি হলো? শুয়ে পড়লেন যে। শরীর খারাপ লাগছে বেশি?”
আরশাদ অস্ফুটে কি যেনো বলে চুপ করে যায়। ইরার অসহায় লাগে।

বেশ কিছুক্ষণ পর ইরা ইতস্তত করে আরশাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কপালে আলতো করে হাত রাখতেই শিউরে ওঠে। ঝাঁকি দিয়ে ওঠে শরীর তার।
গা পুড়ে যাচ্ছে আরশাদের। ইরার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে আরশাদ চোখ মেলে তাকায়। চোখ দু’টো রক্তের মতো লাল বর্ণ ধারণ করেছে। ঠোঁটজোড়াও ঈষৎ লাল।

“আপনার তো ভয়াবহ জ্বর। কীভাবে হলো? আমি এখন কি করবো?”
আরশাদ কি যেনো বলে, কিছু বোঝা যায়না। ইরা শক্ত ধাঁচের মেয়ে। সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার। কিন্তু আজ কেনো যেনো নিজেকে ভীষণ দূর্বল লাগে তার। এই অচেনা অপরিচিত জায়গায় একা কি করবে সে?

আরশাদকে কোনোরকমে উঠে বসায় ইরা। আশেপাশে কিছু না পেয়ে নিজের শাড়ির আঁচল দিয়েই আরশাদের মাথা মুছে দেয়। আরশাদ রক্তবর্ণের সেই চোখজোড়া দিয়েই ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাদকতায় ভরা সেই দৃষ্টি। ইরা তাড়াতাড়ি আবার শুইয়ে দেয় আরশাদকে। শরীরের তাপমাত্রা যেনো মিনিটে মিনিটে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরা কোনোকিছু না ভেবে আরশাদের বাম হাত দুই হাতে আঁকড়ে ধরে। হঠাৎ এই মানুষটার জন্য বুকের কোথাও কি যে একটা টান অনুভব করে, নিজেকে সামলাতে পারেনা।

“আপনি শক্ত থাকুন, আমি আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ইরাকে ভীষণ ঝাপসা দেখাচ্ছে। আরশাদ ইরার হাতে হালকা চাপ দেয়, রক্তিম ঠোঁটে স্মিত হাসে। তপ্ত শ্বাস জড়িয়ে যায় ইরার শ্বাসের সাথে।


খাটে আধশোয়া হয়ে বসে আছে নীলু। রাত বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। পাশেই থাকা টেবিল ল্যাম্প একবার জ্বালাচ্ছে, আরেকটা নেভাচ্ছে। সে খবর পেয়েছে আরশাদ তার বউকে নিয়ে সমুদ্রবিলাশ করতে গেছে। তার কষ্ট আরো বাড়ছে।

নীলু তড়িৎবেগে উঠে আলমারি খোলে। বিশাল এক অ্যালবাম বের করে মেলে ধরে বিছানার উপর। পরিবারের সাথে অনেকবার সমুদ্রে যাওয়া হয়েছে তার। পরিবার বলতে বড় খালা, আরশাদ, আশা, খালু আর তার বাবা, সবাই মিলে। কিসব দিন ছিলো, অসাধারণ কিছু মুহুর্ত কাটিয়েছে তারা। মুঠোবন্দি করে রেখেছে সব স্মৃতি, যা ঠাঁয় পেয়েছে এই অ্যালবামে।

নীলু খুঁজে খুঁজে আরশাদের ছবিগুলো বের করে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে। শুধুমাত্র আরশাদ যে ছবিগুলোতে আছে ওগুলো তুলে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়, সাথে একটা দিয়াশলাই। যে মানুষটা তার অন্তর জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে তার কোনো স্মৃতি সে রাখবে না। স্মৃতি গুলোকেও জ্বালিয়ে দিবে সে, সব শেষ করে দিবে সব।

দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। শুধু ছবিগুলো না, পুড়ছে তার হৃদয়টাও। কিন্তু সে অটল। তার চোখের সামনে তার ভালোবাসার সব স্মৃতি পুড়ছে, নিজেকে ধরে রাখা কঠিন। তবুও সে বিন্দুমাত্র দূর্বল হয়ে পড়ছে না। কেনো হবে? কার জন্য হবে? ওই মানুষটার জন্য? যে কিনা তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর সাথে মধুচন্দ্রিমা করছে? সমুদ্রবিলাশ? তার জীবন তো সে গুছিয়েই নিয়েছে। মাঝখান থেকে নীলু কেনো তার জীবনটা শেষ করে দিবে? আরশাদকে নীলু দেখিয়ে দিবে সে-ও ভালো থাকতে পারে, তারও ভালো থাকার অধিকার আছে। কিন্তু এ সে মানব মন, সবসময় কি বাধানিষেধ মানে?

হঠাৎ দরজায় করাঘাত শুনে কিছুটা অবাক হয়ে নীলু। বাড়িতে সে আর তার বাবা বাদে কেউ নেই। তার বাবার রুটিন খুব গুছানো। রাত দশটার মধ্যেই খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে যায় সে। এখন বাজে রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। তাহলে কি বাবা ঘুমায়নি?

ছাইচাপা আগুন ওভাবে রেখেই নীলু ছুটে আসে। দরজা খুলতেই স্তম্ভিত হয়ে যায় সে। বাবা দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। তার মুখ সামান্য নীল বর্ণ ধারণ করেছে। বুকের বামপাশে হাত চেপে ধরে রেখেছে।

নীলু ‘বাবা’ বলে চিৎকার করে ওঠে।
“মা রে, শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে। এমন কেনো লাগছে বল তো। শ্বাস নিতেও যেনো কষ্ট হচ্ছে।”
নীলুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দ্রুত বাবাকে ঘরে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিজাম হোসেন ঘামছে ভীষণ, শরীর ভেজা ঘামে।

“বাবা, ও বাবা। আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?’
নিজাম হোসেন গোঁ গোঁ শব্দ করতে থাকে। পকেট থেকে একটা ডায়রি বের করে অনেক কষ্টে।

“নীলু মা, এই ডায়রিতে একটা নাম্বার আছে। নাম রোশান চৌধুরী। অনেক বড় ডাক্তার। আমার পরিচিত। ওকে একটা ফোন দে। দেখ যদি আসতে পারে।”
“বাবা তোমাকে হাসপাতালে নিতে হবে। ওখানের ডাক্তাররা দেখবে। আমি অ্যাম্বুলেন্স ডাকছি।”
“যা বলছি তাই কর। আমি ঠিক আছি।”
নীলু হতভম্ব হয়ে যায়। কি করবে ভেবে পায়না। এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি সে।


বাবার শিয়রের কাছে বসে আছে নীলু। কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ ফুলিয়েছে সে। ডাক্তার রোশান ইতোমধ্যে স্যালাইন লাগিয়েছে নিজাম হোসেনকে। অনেকদিন থেকেই নিজাম হোসেনকে চিনে সে। আবাসিকে একসাথে হাঁটে দুইজন সকালে। সেখানেই পরিচয়, ভালো সম্পর্ক। নিজাম তাকে অনেকবার বাড়িতে আসতে বললেও ব্যস্ততায় আসতে পারেনি। পঁয়ত্রিশোর্ধ রোশান এই বয়সেই ডাক্তার হিসেবে অনেক সুনাম করেছে।

“আমার মনে হয় আপাতত আমার কাজ শেষ। আপনি শুধু ওষুধ গুলো নিয়ম মেনে খাওয়াবেন।”
নীলু দৌড়ে আসে রোশানের দিকে। আসার পর থেকে একবারও তাকায়নি নীলুর দিকে। এখনো অন্যদিক ফিরে আছে।

“হাসপাতালে নিতে হবে না বাবাকে? বাবার অবস্থা যে….”
“হাসপাতালে নেওয়ার দরকার হলে আমি নিজেই বলতাম মিস। তেমন মারাত্মক কিছু নয়। এই বয়সে এগুলো খুবই স্বাভাবিক। শুধু শুধু হাসপাতালে নিয়ে মানুষটার মনোবল আরো কমিয়ে দিবেন কেনো?”
নীলুর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বাবাকে এভাবে দেখার অভ্যাস নেই তার। তার উপর সে একা। চাইলেই বড় খালা বা খালুকে জানাতে পারে। কিন্তু কেনো যেনো ইচ্ছা করছে না।

“দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকুন। আপনার এখন আপনার বাবাকে সাহস দিতে হবে। আপনি ভেঙে পড়লে কীভাবে হবে?”
নীলু ক্ষীণ গলায় বললো,”যদি আবার ব্যথা বাড়ে? আমার একা খুব ভয় করছে। আপনি কি আর কিছুক্ষণ বসতে পারবেন না?”
রোশান হাসে ছোট্ট করে।

“মিস আমি ডিউটি থেকে কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছি। মাত্রই খেতে বসেছিলাম। স্যারের কথা শুনে খাওয়া ফেলেই ছুটে এসেছি। যদিও ডাক্তারদের কাছে খাওয়া বা বিশ্রাম নেওয়া বড় কিছু নয়। আমরা রোগীর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিই। যদি আমার মনে হতো এখানে আমাকে এখন দরকার আমি অবশ্যই থাকতাম। আপনি আছেন তো, অসুবিধা নেই। শুধু সময়মতো স্যালাইনটা খুলে দিবেন। আশা করি ঘুমিয়ে যাবেন না।”
“কি বলছেন? বাবার এই অবস্থায় আমি ঘুমাবো? অসম্ভব।”
“আচ্ছা আমি চলি তাহলে? যতো রাতই হোক, স্যারের কোনো দরকারে আমাকে ডাকতে একটুও দ্বিধাবোধ করবেন না। আমি যে অবস্থায় থাকি, চলে আসবো।”
নীলু কিছুটা ইতস্তত করে বললো,”আপনার ভিজিটটা কতো?”
রোশান একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,”আমি স্যারের কাছে চেয়ে নিবো পরে, আপনি ভাববেন না। আপাতত আপনার বাবার দিকে মনোযোগ দিন। আসছি।”
“তবুও….”
নীলুকে কথা শেষ করতে দেয়না রোশান। নিজাম হোসনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত বেগে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে।
নীলু কাঁপা কাঁপা পায়ে আবার এসে বসে বাবার পাশে। বাকি কিচ্ছু মনে নেই এখন তার। সব ধ্যানধারণা বাবার দিকেই নিবদ্ধ। বাবার বাম হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে আঁকড়ে রাখে শক্ত করে।

“বাবা তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই, কেউ না। আমাকে একা ফেলে যেও না। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আমি শুন্য তোমাকে ছাড়া।”
নীলুর ফিসফিস আওয়াজ কানে যায়না নিজাম হোসেনের। সে ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। শুধু নীলু পার করে একটু দুশ্চিন্তাময় বিনিদ্র রাত।


খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায় আরশাদের। চোখ খুলতে যেয়েই কেঁপে ওঠে। চোখের পাতা ভার হয়ে আছে ভোঁতা যন্ত্রণায়। মাথার দুই পাশেও প্রবল ব্যথা। কিন্তু জ্বরটা নেই মনে হচ্ছে।
হঠাৎ হাতে চাপ মনে হওয়ায় আরশাদ ঘুরে তাকায়। হাতের উপর মাথা দিয়ে ইরা ঘুমিয়ে আছে। মেঝেতে বসেই খাটের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে সে। আরশাদ স্তব্ধ হয়ে যায় তাকে দেখে। ইরাকে দেখে মনে হচ্ছে সুনামি বয়ে গেছে তার উপর দিয়ে।

আদতেই একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো রাত কাটিয়েছে ইরা কাল। আরশাদ মাঝরাতে হঠাৎ প্রায় বেহুঁশ হয়ে যায় জ্বরে। তাপমাত্রা শুধু বাড়ছে হু হু করে, কমার নাম নেই। জ্ঞানই ছিলো না বলতে গেলে। ইরা তখন জলপটি দিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু কোনো লাভ নেই।

মাথা খারাপ হয়ে যায় ইরার। আগপিছ না ভেবে ঘর খুলে বেরিয়ে যায়, সোজা নিচে। ভাগ্য ভালো হোটেল ম্যানেজার জেগেই ছিলো। ইরা পাগলের মতো তাকে কিসব যেনো বলে। শুধু বলে ওষুধ যোগাড় করে দিতে। এরপর কীভাবে কি হয়, একদম স্বপ্নের মতো। ওষুধ যোগাড় হয়, আরশাদকে জ্ঞানহীন অবস্থাতেই খাওয়ানো হয়। তবুও জ্বর যায়না। ইরা সারারাত ওভাবেই দৌড়াদৌড়ি করেছে। উষ্ণ গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দিয়েছে বারবার।

ভোরের দিকে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে আরশাদের। আরশাদ তখন গভীর ঘুমে তলিয়ে। ইরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। নিজের শরীরটাও ক্লান্তিতে নুইয়ে যাচ্ছিলো তার। পুরো খাট জুড়ে আরশাদ উবু হয়ে ঘুম। বাধ্য হয়ে ইরা মাটিতে বসে খাটে হেলান দেয়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই জানেনা।

আরশাদ ইরার মাথায় হাত রাখে। বুকে একটা কম্পন অনুভব করে সে সাথে সাথে। রাতের বেশিরভাগ কথা তার মনে নেই। শুধু হালকা মনে পড়ছে ইরার উদ্বেগ ভরা মুখে ছুটোছুটি আর তার কান্নাভেজা চোখ। মাঝরাতে একবার তার চোখের পানি টুপটুপ করে আরশাদের মুখে এসে পড়েছে। ইরা তখন জলপটি দিতে ব্যস্ত ছিলো। ব্যস! আরশাদের আর কিছু মনে নেই।

ইরার মাথায় ছোঁয়া পড়তেই ধড়ফড় করে উঠে বসে সে। তার চোখের নিচে এক রাতেই কালি পড়েছে। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। যেনো ঝড়ে পড়া এক আহত ছোট্ট চড়ুই।

“কি হয়েছে? কি হয়েছে? জ্বর এসেছে আবার?”
আরশাদ ভাঙা গলায় বললো,”রিল্যাক্স ইরা, শান্ত হও। আমি এখন সুস্থ।”
ইরা কাচুমাচু হয়ে উঠে বসে বিছানায়। এতোদিন যে মেয়ে কাঁদেনি, যাকে কান্নায় ভেঙে যেতে আরশাদ দেখেনি সেই মেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। আরশাদ দূর্বল শরীরে উঠে বসার চেষ্টা করে।

“ইরা আমি সুস্থ হয়ে গেছি তো। কেঁদো না।”
“আপনি জানেন আমি কতোটা ভয় পেয়েছিলাম রাতে। মনে হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো….”
“আরশাদ খাটে হেলান দিয়ে ইরার দিকে তাকায়, তার ঠোঁটের কোণে সেই হাসি!

“কি মনে হচ্ছিলো? আমাকে হারিয়ে ফেলবে? মারা যাবো আমি?”
ইরা ঝট করে ঘুরে তাকায়। কি আশ্চর্য! এই লোক হাসছে? হাসছে? গত রাতে কি অবস্থা ছিলো। ইরার দম বের হয়ে যায় যায় অবস্থা। আর এখন? আসলেই গুণীজনেরা ঠিকই বলে, কয়লা ধুইলে ময়লা যায়না।

ইরা কঠিন গলায় বললো,”সামান্য জ্বরে কেউ মরে না।”
“তাহলে কি হলে মরে? তৃষ্ণা হলে?”
“ধুর অসহ্য…..”
ইরা রাগ করে উঠে যেতে গেলেই আরশাদ তার হাত টেনে ধরে। ইরা থমকে যায়।

“কোথায় যাচ্ছো?”
“আজকাল দেখছি হাত ধরার আগে অনুমতি নিচ্ছেন না। ব্যাপারটা কি?”
“তুমি যে কাল সারারাত অনুমতি ছাড়াই আমার পুরো শরীর ছুঁয়ে দিয়েছো, আমি কিছু বলেছি?”
ইরা রাগে কাঁপে। লোকটা এতোটা বাজে? ছি ছি!

“আমি মোটেই আপনার পুরো শরীর ছুঁয়ে দিইনি। যেটুকু দরকার ছিলো। পুরো শরীর ছুঁতে যাবো কেনো?”
আরশাদ ইরার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে দেয়। ইরাবতী ফেঁসে গেছে। তার অপ্রস্তুত মুখটা দেখার মতো একদম।

ইরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”এজন্য কারো উপকার করতে নেই। আপনার মতো এমন ধূর্ত শিয়ালদের তো একেবারেই নয়। ভুল হয়েছে আমার, বড় ভুল হয়েছে।”
ইরা কথা শেষ করেই ছুটে বারান্দায় যেয়ে দাঁড়ায়। বারান্দা থেকে সমুদ্রের একাংশ দেখা যাচ্ছে। এখান থেকেই যেনো সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছে সে। মনটা একটু ফুরফুরে হয়ে যায়।
কিন্তু তা স্থায়ী হয়না। বাজে লোকটা আস্তে আস্তে উঠে এসে দাঁড়ায় তার পাশে। ইরা রাগে সরে দাঁড়ায় অন্য দিকে।

“উফফফ ক্যাফেইন দরকার। খুব বিশ্রীভাবে দরকার।”
“এখানে এখন কফি পাবো কোথায়?”
“কফি লাগবে না। অনুমতি পেলে একটা সিগারেট ধরাই? একটাই…”
ইরা কথা না বলে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আরশাদ সিগারেট ধরিয়ে দুই টান দেয়। যথাসম্ভব চেষ্টা করে ইরার দিকে যেনো ধোঁয়া না যায়।

“আচ্ছা ক্যাফেইন কি শুধু পুরুষদের দরকার হয়?”
“মানে?”
“আমাদেরও তো দরকার হতে পারে। আমাকে দিন, আমিও দুই টান দিই। দেখি কি সুখ আছে ওতে।”
আরশাদ অবাক হয়ে বললো,”তুমি সিগারেট খাবে?”
“কেনো নয়? এতে নাকি আপনারা ভালো থাকেন। তো ভালো থাকার অধিকারটা কি দুনিয়ায় শুধু আপনাদেরই? আমাদের না?”
আরশাদ চমৎকৃত হয়। মেয়েটার কথাবার্তা ক্ষুরধার, অসাধারণ।

আরশাদ সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ইরা সেদিকে একবার তাকায়, কিছু বলেনা।

“বললে না তো।”
“কি?”
আরশাদ গ্রিলে হেলান দিয়ে ইরার মুখোমুখি দাঁড়ায়।

“রাতে কি মনে হচ্ছিলো?”
“জানিনা।”
“জানো না?”
“না।”
“কিন্তু আমি তো জানি।”
“ঘোড়ার ডিম জানেন আপনি।”
“জানি জানি। বলবো?”
“চুপ করুন দয়া করে। কথা বলবেন না।”
আরশাদ হাতে হাতে ঘষতে ঘষতে বাইরের দিকে তাকায়। রোদ ঝলমল করছে আজ। শুধু তার বালিকা বধূটির মুখে আষাড়ের মেঘ জমে আঁধার হয়ে আছে।

“এখন অনুমতি ছাড়াই একটা কাজ করতে ইচ্ছা করছে। করবো?”
ইরা গোল গোল চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে বললো,”কি?”
আচমকা আরশাদ ইরার কোমর চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে সরিয়ে আনে।

ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে যায় যায় ইরা। শিরশির করে ওঠে তার শরীর। হৃৎপিণ্ডটা যেনো গলার কাছে এসে ধকধক করে ওঠে।

“কি হচ্ছেটা কি?”
“যেটা ইচ্ছা করছে।”
“ছাড়ুন।”
“উহু, থাকো এভাবে কিছুক্ষণ।”
“ভালোবাসা ছাড়া শরীর ছোঁয়া পশুপাখির ন্যায়, আপনিই বলেছিলেন। ভুলে গেলেন?”
“আর যদি ভালোবাসা হয়?”
ইরা জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় আরশাদের শক্ত বাঁধন থেকে। শুধু কফি খেয়ে এমন শক্তি বানিয়েছে? দূর্বল শরীরেও কি জোর!

“এভাবে নয়, আগে প্রমাণ করুন। তারপর….”
“কি প্রমাণ লাগবে?”
“আপনার এ টান জন্ম নিয়েছে আমি গত রাতে পাগলের মতো আপনার সেবা করেছি তাই। এটা ভালোবাসা নয়। আগে নিজে নিজের কাছে প্রমাণ করুন। বাকি প্রমাণ আমার কাছে করবেন।”
ইরা রহস্য ঘেরা একটা হাসি দিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে চলে আসে। সমুদ্রে যাবে সে এখন। আরশাদ না গেলে সে একাই যাবে। কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসবে উত্তাল নীলজলের সাথে।

আরশাদ পকেট থেকে আবার সিগারেট বের করে। প্রচুর ক্যাফেইন দরকার এখন, প্রচুর।

(চলবে…..)

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব ১৪:

‘কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে তোমার পাষাণ হৃদয়ে পেয়েছিলাম আমি ঠাঁই। যা আমাকে করেছিলো পৃথিবীর সবথেকে সৌভাগ্যবতী কিংবা দুর্ভাগা নারী।’
ডায়রিতে এতোটুকু লিখে নীলু থামে। অনেক আগে থেকেই তার ডায়রি লেখার অভ্যাস। কিন্তু ইদানীং দুই লাইনের পর আর কিছু লিখতে পারেনা। শরীর অবসাদে ছেয়ে আসে।

“নীলু, মা…”
বাবার ডাক শুনে ডায়রি বন্ধ তড়িৎবেগে উঠে দাঁড়ায় নীলু।
“বাবা কি হয়েছে তোমার? আবার শরীর খারাপ লাগছে?”
নিজাম হোসেন নিজেই সুন্দরমতো হেঁটে নীলু সামনের চেয়ারে বসে। নীলুর মুখটা আতঙ্কিত এখনো।

“কি হলো বাবা? কিছু বলছো না কেনো?”
“তুই বোস তো আমার সামনে শান্ত হয়ে। আমি ঠিক আছি।”
“তাহলে তুমি উঠে এলে কেনো? তোমার বিশ্রাম দরকার। কিছু লাগলে আমাকে ডাকতে পারতে।”
“আরে কি মুশকিল! এতো অস্থির হয়ে যাস না তো। এতো তাড়াতাড়ি আমাকে অসুস্থ, বিছানায় পড়া রোগীদের কাতারে ফেলে দিস না। এখনো শরীরে অনেক শক্তি। নাতিনাতনিদের কাঁধে নিয়ে ঘুরতে পারবো। তার জন্য হলেও আমাকে আরো কিছু বছর সুস্থ থাকতে হবে।”
নীলু কিছু না বলে বসে। তীক্ষ্ণ চোখে বারান্দা থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“হ্যা রে, ভালো কথা। জিজ্ঞাসা করবো মনেই নেই। রোশানকে গত রাতে কিছু খেতে দিয়েছিস? বেচারা কি অবস্থায় এসেছে কিছুই জানিনা।”
নীলু শান্ত গলায় বললো,”আমি তোমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় শেষ। নাশতা দেওয়ার কথা মাথাতেও আসেনি।”
“সে কি রে? এই প্রথমবারের মতো ছেলেটা বাড়িতে এলো। এর আগে কতো করে বলেছি আসতে। বলেছে যাবো সময় করে একদিন। অথচ এমন ভাবে আসা হলো। নাহ বড্ড অপরাধবোধ হচ্ছে।”
“অপরাধবোধের কিছুই নেই বাবা। গত রাতে উনি ডাক্তার হিসেবে এখানে এসেছেন, অতিথি হিসেবে নয়। উনি নিজেও কিছু খেতে পারতেন ওই অবস্থায়? একদিন অতিথি হিসেবে নিয়ে এসো, ভালোমন্দ খেয়ে যাবে। হয়েছে শান্তি?”
মেয়ের গলার উত্তাপ টের পেয়ে নিজাম আস্তে আস্তে বললো,”হ্যা রে, ঠিকই বলেছিস। একদিন দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে হবে ছেলেটাকে। একা থাকে, কি খায় না খায়।”
নীলু ভ্রু কুঁচকে বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,”একা থাকে কেনো? উনার পরিবার কোথায়?”
“পরিবার বলতে ওর কেউ নেই। ও খুব ছোট থাকতে ওর বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। ওর বাবা আমেরিকা চলে যায়, ওখানেই বিয়েশাদি করে থিতু হয়েছে। ওদের খোঁজ নেয়নি আর। ও ওর মায়ের কাছেই বড় হয়েছে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। ও মেডিকেলে পড়াকালীনই ওর মা মারা যায় হঠাৎ। ও একা হয়ে পড়ে। একটা সময় আত্মীয়রা ওর বিয়ের ব্যবস্থাও করে। চার বছরের সংসারও ছিলো। কিন্তু বলা নেই কওয়া নেই, মেয়েটা হঠাৎ ওকে ছেড়ে আর কারো সাথে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে ও মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনা। একবার নিজের বাবা আরেকবার স্ত্রীর কাছ থেকে ঠকে ও শিক্ষা পেয়েছে। এরপর থেকে জীবনে আর কাউকে জড়ায়নি, একাই আছে।”
“ওহ!” নীলু আর কিছু বলেনা। আসলেই কতো মানুষ অদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকে। একজনের কষ্ট আরেকজনের চেয়ে বেশি গভীর।

কলিংবেলের আওয়াজে সচকিত হয় দুইজনই। সকালেই বুয়া চলে আসে বাড়ি। দরজা সে-ই খোলে। নিজাম হোসেন আর নীলু দুইজনই তাকিয়ে থাকে কে এসেছে দেখার জন্য। বড় খালারা ছাড়া আর কে আসবে? কিন্তু নীলু তাদের কিছু জানায়নি, ইচ্ছা করেনি।

তাদের অবাক করে দিকে রোশান ঢোকে সেখানে। এপ্রোন, স্টেথোস্কোপ সাথেই। বোঝাই যাচ্ছে হাসপাতালে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছে।

“স্যার কেমন আছেন?”
রোশানের মুখে চিরাচরিত বুদ্ধিদীপ্ত হাসি। নিজাম হোসেন উঠে যেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।

“ইয়াং ম্যান, এসেছো তুমি।”
“না এসে কীভাবে পারতাম স্যার? যেভাবে দেখে গেলাম আপনাকে। আমার তো সারারাত ঘুম হয়নি। তাই খুব সকাল সকাল উঠে একবারে তৈরি হয়েই বেরিয়ে এলাম। আপনাকে দেখে তো বেশ ভালোই লাগছে।”
“বোসো রোশান, এখানে বোসো।”
নীলু উঠে যেয়ে দাঁড়ায় এক কোণে।

“আপনি তো আপনার মেয়েকে ভয়-ই পাইয়ে দিয়েছিলেন।”
নিজাম হোসেন মুচকি হাসে মেয়ের দিকে তাকিয়ে।

“বাবা তোমরা গল্প করো, আমি আসছি।”
নীলু বেরিয়ে যায়। অন্তত এক কাপ চা তো খাওয়ানোই যায় উনাকে। গতরাতে খেতে বসে উঠে এসেছে। তার মাথাতেও ছিলো না কিছু খেতে দেওয়ার কথা।


নীলু চলে যাওয়ার পর রোশান সানগ্লাস খুলে নিজাম হোসেনের হাতে হাত রাখে আলতো করে।
“কি নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করছেন স্যার? আপনার মেয়ের সামনে না বললেও আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি আপনি ভীষণ চিন্তা করছেন কিছু নিয়ে।”
নিজাম হোসেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যায়।

“দেখুন স্যার, আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি ঢুকতে চাইনা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে আপনি কিন্তু দ্রুত সুস্থ হতে পারবেন না। বারবার এগুলো হতেই থাকবে।”
“রোশান কি বলি তোমাকে। মেয়েটা আমার ভীষণ সংবেদনশীল। অল্পেই খুশি হয় আবার অল্পেই কষ্টে ভেঙে পড়ে। ওর কথা ভেবেই দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবিনি কখনো। মা নেই, কোনো ভাই বোন নেই। এতোদিন চিন্তা করার প্রয়োজন হয়নি। ওর বড় খালা, তার পরিবারের সাথে বেশ সখ্যতা ছিলো মেয়েটার। খুব খুশি থাকতো ওদের সাথেই। আমাকে চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু একটা ছোট্ট অসুবিধা হয়ে গেছে। মেয়েটা ও বাড়িতে আর যাচ্ছে না, ওদের সাথে যোগাযোগও করছে না। আমি রোজ রাতে টের পাই ও কাঁদছে। একাকীত্ব ওকে গ্রাস করছে। আমি ওর মন ভালো করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি কিন্তু ফলাফল শুন্য। কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না। আমি ছাড়া তো এই মুহুর্তে খুব আপন বলতে ওর কেউ নেই। আমি না থাকলে ওকে কে দেখবে?”
রোশান চেয়ারে হেলান দিয়ে বললো,”সবই বুঝতে পারছি কিন্তু এই চিন্তাগুলো তো আপনাকে আরো ভয়ানক রোগের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।”
“চাইলেই কি দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলা যায় রোশান? মেয়েটাকে বিয়ে দিতে হবে। যে ওকে বুঝবে, ও যে ভীষণ স্পর্শকাতর এটা উপলব্ধি করবে। কিন্তু কাকে বিশ্বাস করবো? আমি মানুষকে বিশ্বাস করতে খুব ভয় পাই।”
রোশান চুপ করে থাকে। মানুষকে অবিশ্বাস, এটা সে ছাড়া আর কে বুঝবে? বারবার ধাক্কা খেয়েছে যে সে এক জীবনেই।

“রোশান তোমার তো কতো মানুষের সাথে ওঠাবসা। অনেক মানুষকে চিনো তুমি। তোমার পরিচিত ডাক্তারদের মধ্যে কাউকে খোঁজো না, যাকে বিশ্বাস করা যায়। মেয়েটার এই একাকীত্ব আমি সহ্য করতে পারছি না।”
“আপাতত এই দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন স্যার। ওষুধ গুলো নিয়মিত খান। আপনার কথা আমার মাথায় থাকলো। আমি অবশ্যই খুঁজবো আপনার মেয়ের জন্য যোগ্য কাউকে।”
নিজাম হোসেন আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। এ যে বড় দুশ্চিন্তা, চাইলেই কি বাদ দেওয়া যায়?

রোশান উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে। সানগ্লাসটা পরে নেয় আবার।
“আজ আসছি স্যার। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আপনি আবার হাঁটতে যাবেন কবে সেই অপেক্ষায় থাকবো।”
“না না এভাবে তোমাকে যেতে দিতে পারিনা। গতরাতেও খালি মুখে বিদায় নিয়েছো। মেয়েটা আসলে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলো। অন্য কিছু মাথাতেও ছিলো না। কিন্তু আজ এভাবে তোমাকে যেতে দিবো না। আমি নিজেও নাশতা করিনি, একসাথে করবো চলো।”
“স্যার শান্ত হোন। গতরাতে আমি কিছু খেতে এখানে আসিনি। উনি যেটা করেছেন খুব স্বাভাবিক বিষয়। বরং আপনাকে ফেলে আমাকে খেতে বললে সেইটাই অস্বাভাবিক হতো। কিন্তু আজও হবে না, ক্ষমা করবেন। খুব দেরি হয়ে গেছে, তাছাড়া আমি নাশতা করেই এসেছি। অন্য কোনোদিন এসে আপনার সাথে চা নাশতা করে যাবো, ভাববেন না। আপনাকে এই অবস্থায় দেখে খারাপ লাগছে। মাঝে মাঝেই আসবো আমি আপনাকে দেখতে।”
“ঠিক আছে। কিন্তু তোমার ভিজিট টাও নাওনি। নীলু বললো তুমি নাকি আমার কাছ থেকে নিবে তাই….”
রোশান মুচকি হেসে বললো,”রেখে দিন, পরে নিবো। আসি তাহলে? স্টে স্ট্রং অলওয়েজ।”
নিজাম হোসেনকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় রোশান।

চা, নাশতা নিয়ে নিজেই আসছিলো নীলু। অসাবধানতার ধাক্কা খায় রোশানের সাথে। চা ছুটে যেয়ে রোশানের সাদা শার্টে পরে কিছুটা। হকচকিয়ে যায় নীলু সাথে সাথে।

“ইশ এটা কি হলো? কীভাবে হলো….”
রোশান শার্টের বুকের কাছে একবার তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে।
“রিল্যাক্স মিস, এতোটা অস্থির হওয়ার কিছু হয়নি।”
“কিন্তু আমি আসলে…”
“ঠিক আছে, আমি পরিষ্কার করে নিবো। আপনি ঠিক আছেন তো?”
নীলু অপরাধী মুখে মাথা নাড়ে। সারারাত ঘুম না হওয়ায় এমনিতেই কেমন টাল লাগছে তার। তাছাড়া লোকটাও কেমন ঝড়ের বেগে ছুটে আসছিলো। কীভাবে বুঝবে সে?

রোশান ট্রে থেকে কাপটা উঠিয়ে নেয়, অল্প কিছু অবশিষ্ট আছে এখনো কাপে। ওটুকুই এক নিঃশ্বাসে খেয়ে নেয় সে।

“চা’ টা খুব ভালো হয়েছে। ধন্যবাদ।”
নীলুর অপরাধবোধ কাটে না। কি থেকে কি হচ্ছে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সে।

“আপনি বসুন আমি আবার বানিয়ে আনছি।”
রোশান এপ্রোনটা বুকের উপর টেনে বললো,”পরে একদিন এসে খাবো। আজ ওটুকুই থাক।”
“আর নাশতা…”
“ওটাও পরে। আজ আসি কেমন?”
নীলু ওভাবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। রোশান বেরিয়ে যায়। ট্রে হাতে বোকার মতো দাঁড়িয়ে নীলু ভাবে, সে কি দিন দিন বোকা হয়ে যাচ্ছে? কীভাবে এই কাজটা হলো? অন্তত একটা রুমাল তো দিতেই পারতো সে মুছতে। তা না করে, ধুর…..


মেরিন ড্রাইভের রাস্তায় ছুটে চলছে একটা বাইক, হু হু গতিতে। বাইক চালাচ্ছে আরশাদ, পিছনে ইরা।

“ইরা ধরে বসো আমাকে, পড়ে যাবে।”
ইরা কঠিন গলায় বললো,”পড়লে পড়বো, আপনাকে ভাবতে হবে না। পরে তো আবার বলবেন আপনার শরীর ছুঁয়েছি।”
আরশাদ একটু হেসে গতি বাড়িয়ে দেয় বাইকের। যেনো রাস্তায় চলছে না, হাওয়ায় উড়ছে। ইরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়।

“আরে পাগল নাকি! এতো জোরে চালাচ্ছেন কেনো? পড়ে যাবো তো।”
“তুমিই তো বললে পড়ে গেলে যাবে, তাও আমাকে ধরবে না।”
ইরার ইচ্ছা করে নেমে যেতে বাইক থেকে। এই লোক একটা বদমায়েশ, কড়া বদমায়েশ। ইরা আলতো করে হাত রাখে আরশাদের কাঁধে। তাতেও লাভ হয়না, ভীষণ জোরে ছুটছে বাইক। ইরার অভ্যাস নেই। সে আরশাদের কোমরের দিকের শার্ট চেপে ধরে। আরশাদ সেদিকে একবার তাকিয়ে হাসে। ইরা পিছন থেকেই স্পষ্ট টের পায় সেই হাসি। রাগে গা জ্বলে যায় তার।


এতো সুন্দর রাস্তায় ইরা কখনো আসেনি। মনে হচ্ছে স্বর্গের কাছাকাছি কোথাও চলে এসেছে। সে অবাক হয়ে দুই পাশে তাকাচ্ছে। এক পাশে বিশাল পাহাড়, আরেকপাশে সমুদ্র। মাঝে মাঝে সাম্পান নৌকার দেখা মিলছে সমুদ্রপাড়ে। কি স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। একেই বুঝি বলে অপার সৌন্দর্য। শান্ত সমুদ্র হঠাৎ অশান্ত রূপ নেয়, কি এক অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টি সৃষ্টিকর্তার।
এই রাস্তার নাম মেরিন ড্রাইভ, আরশাদ বলেছে। যদিও আজ তার বেরোনোর একদম ইচ্ছা ছিলো না। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছিলো। তাছাড়া সদ্য জ্বর থেকে ওঠা আরশাদ। যদি আবার জ্বর আসে?
কিন্তু কে শোনে কার কথা। আরশাদ একবার যেটা জিদ ধরবে, করবেই। এই শরীরে এমন ভাবে বাইক ছুটিয়ে যাচ্ছে যেনো পক্ষীরাজ ঘোড়ায় উঠেছে।

“এখান থেকেই তো সব সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। আরো দূরে কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“সব বীচ পয়েন্টে পর্যটক ঢুকতে পারেনা। আমরা যাচ্ছি ইনানীতে, তুমি চাইলে এরপর পাটুয়ারটেক যাবো, এরপর টেকনাফ। নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাবো বলেছিলাম না? আজ সারারাত আমরা সমুদ্রে ঘুরবো। রাতের উত্তাল সমুদ্র দেখবো। রাজি আছো?”
ইরা কিছুটা ভয় পায়। সারারাত? নির্ঘাত জ্বর হয়ে মাথাটা আরো বিগড়েছে এই লোকের।

“সারারাত বাইরে থাকার কি দরকার?”
“কেনো? ভয় পাচ্ছো?”
ইরা উত্তর দেয়না। উত্তর দিয়ে লাভও নেই। সে জানে, আরশাদ একবার যখন ঠিক করেছে তারা সারারাত বাইরে থাকবে, তো থাকবেই। যেনোতেনো উপায়ে ইরাকে রাজি করিয়ে ফেলবে। খুবই ধূর্ত এই লোক।


ইনানীর সৌন্দর্যে হতভম্ব ইরা। এ যে পুরো নীল, যেদিকে চোখ যায় শুধু নীলে নীলাক্ত। নীল নাকি বিষাদের রঙ। কে বলেছে?
এই নীল যে মুগ্ধতার রঙ, ভালোবাসার রঙ। ওই দূরে যেনো আকাশ স্পর্শ করেছে সমুদ্রকে। ইরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক পা, এক পা করে এগিয়ে যায়। যেনো সে আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে ওই দূরে যেয়ে।

“জানো ইরা, ইনানী আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। আমি যে কতো অসংখ্যবার এখানে এসেছি কোনো হিসাব নেই। ছাত্রজীবনে মন খারাপ হলেই বাইক চালিয়ে সোজা চলে আসতাম এখানে। নিজের সমস্ত খারাপ লাগা সমুদ্রের কাছে বন্ধক রেখে যেতাম।”
ইরা বাঁকা চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। তার এলোমেলো দৃষ্টি সামনের দিকে। তার চোখ লাল হয়ে আছে। আচ্ছা সে কি কাঁদছে? তার কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ছে? নীলুর কথা ভাবছে সে?

“নীলু আপাও নিশ্চয়ই এসেছে আপনার সাথে।”
আরশাদ হতবাক হয়ে ইরার দিকে তাকায়। ইরার মুখ থমথম করছে।

“কি বললে তুমি?”
“অস্বীকার করবেন? আমি ছবি দেখেছি স্টোররুমে।”
“হ্যা এসেছে, আমরা পুরো পরিবার এসেছি। বাবা, মা, আশা, নীলুর বাবা তারাও এসেছে। শুধু ওর কথা আসছে কেনো এখানে?”
“আমি এনেছি তাই এসেছে।”
আরশাদ দাঁড়িয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে। হঠাৎ ঝড়ের বেগে কিছুটা দূরে যেয়ে দাঁড়ায় ইরার থেকে। পকেট থেকে সিগারেট বের করে টানতে থাকে একের পর এক। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সামলাচ্ছে সে।

বেশ কিছুক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরেও আরশাদ স্বাভাবিক না হওয়ায় ইরা এগিয়ে যায়। সে নিজেই জানেনা সে কেনো বারবার আরশাদকে এতোটা রাগিয়ে দিচ্ছে? যাতে আরশাদ আরো আঁকড়ে ধরে তাকে? আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে? এ কি বেহায়া চাওয়া?

“ক্যাফেইন লাগবে না আপনার?”
আরশাদ উত্তর দেয়না। এই নিয়ে চারটা সিগারেট ধরিয়েছে। দুই/তিন টান দিয়েই ফেলে দিচ্ছে একেকটা। উত্তপ্ত শ্বাস পড়ছে।

“রাগ করেছেন?”
আরশাদ তখনও চুপ।
ইরা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,”আজ আমাকে ভালোবাসলে এভাবে রাগ করে থাকতে পারতেন না। ভালোবাসার মানুষের উপর কি রাগ থাকে?”
আরশাদ অবাক হয়ে ইরার দিকে তাকায়। ইরা যেনো কিছুই হয়নি এমন ভাবে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। এর আগে ইরাকে এমন হালকা কথা বলতে শোনেনি আরশাদ। হজম করতে কষ্ট হয় তার।

“আমি মনে হয় ভুল কিছু শুনলাম।”
“কেনো? আপনার কানে কি পোকা ঢুকেছে?”
আরশাদ মাতাল চোখে ইরার দিকে তাকায়। মাত্রাতিরিক্ত সুন্দর লাগছে আজ মেয়েটাকে। একজন জীবন্ত, জ্বলজ্যান্ত ক্যাফেইন।

আরশাদ সিগারেট ফেলে ইরার দিকে ঘুরে তাকায়। আচমকা ইরার দুই বাহু চেপে ধরে। ইরা চমকে ওঠে।

“কি করছেন?”
“ভালোবাসার প্রমাণ চাও? কি করলে প্রমাণ পাবে ভালোবাসার?”
ইরা চুপ করে থাকে।
“কি হলো? এতোক্ষণ যে কতোকিছু বলছিলে। এখন চুপ কেনো? তাকাও আমার দিকে। ভয় পাচ্ছো?”
“ভয় পাবো কেনো? কিসের ভয় পাবো?”
“যদি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ হয়ে যায়, সেই ভয়।”
ইরা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো,”আমি আপনাকে ভালোবাসি কে বলেছে?”
“গতকাল যে বললে আমাকে ছাড়া এই মুহুর্তে আর কাউকে বিশ্বাস করোনা তুমি।”
“বিশ্বাস করলেই কি ভালোবাসা হয়?”
“যেখানে বিশ্বাস সেখানে ভালোবাসা। এখন আমার দিকে তাকিয়ে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসোনি।”
“না বাসিনি।”
“সত্যি বলছো?”
“একশবার।”
“তাহলে বারবার নীলুর কথা কেনো উঠাও? নিশ্চিত হতে চাও এই হৃদয় শুন্য আছে নাকি এখনো কারো অস্তিত্ব আছে?”
“থাকলে থাকবে, আমার কি?”
“তোমার কিছুই না?”
“না আমার কিছুই না।”
আরশাদ ইরাকে ছেড়ে দেয়। চুপ করে কিছুক্ষণ কি যেনো ভাবে সে।

“হোটেলে ফিরে চলো।”
“কেনো? আজ না আপনি সারারাত সমুদ্রবিলাশ করবেন?”
“না করবো না। হোটেলে যেয়ে সব গুছিয়ে বাড়ি ফিরবো, আজই। এসেছিলাম নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করতে। কিন্তু তুমি যখন ভালোবাসবেই না, এটা ঠিক করেই নিয়েছো তবে এ চেষ্টা বৃথা। চলো ফিরে যাই।”
ইরা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,”আপনি ভালোবাসেন?”
আরশাদ চাপা গলায় বললো,”তোমার কাছে উত্তর চাচ্ছি। তুমি কি উপলব্ধি করছো?”
“ভালোবাসতে এক জনম লাগেনা, কিছু মুহুর্তেই যথেষ্ট। আবার অনেক সময় জনম জনম চলে গেলেও ভালোবাসা হয়না। যদি জানতে চান আপনি কাউকে ভালোবাসেন কিনা, তাহলে এতো কাছাকাছি থেকে নয়। দূরে যেতে দিন তাকে। দেখুন তার অনুপস্থিতি আপনাকে যন্ত্রণা দেয় কিনা। তাকে এক নজর দেখতে পাওয়ার তৃষ্ণা আপনাকে অস্থির করে তুলছে কিনা। তাকে পাশে না পেয়ে আপনার মনে যন্ত্রণার প্রলয় উঠছে কিনা।”
ইরা থামে। আরশাদ হতভম্ব। এই কথাগুলো বড্ড চেনা মনে হয় তার। মনে হয় এমন কিছু আগেও শুনেছে সে। কোথায় শুনেছে মনে করতে পারেনা।

“তাহলে চাচ্ছো আমি তোমার থেকে দূরে সরে যাই?”
“এমনটা তো বলিনি। যতো যা-ই হোক, আমরা মানুষ, ফেরেশতা নই। আদিম প্রবৃত্তি আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। পাশাপাশি বিছানায় শুয়েও অনেক স্বামী-স্ত্রী এখনো জানেই না তারা আদৌ তাদের বিপরীত মানুষটাকে ভালোবাসে কিনা। হতে পারে আপনি যাকে ভালোবাসা ভাবছেন, তা আপনার মোহ। শুধুমাত্র মোহ।”
আরশাদ ঘোলাটে চোখে ইরার দিকে তাকায়। মেয়েটা এতোটুকু বয়সে এমন সব ভারী কথা কীভাবে বলতে পারে? আরশাদ কি তাকে একটু বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলছে? এবার কি সময় এসেছে তার কষ্ট কমিয়ে দেওয়ার? কিন্তু এভাবে কাপুরুষের মতো নয়, সুপুরুষের মতো। নাহলে ইরার মনে আজীবন একটা কথাই থাকবে, তা হলো আরশাদ তাকে ভালোবেসে স্পর্শ করছে, নিছক মোহ থেকে।

“আমরা কি আজ সারারাত সমুদ্রবিলাশ করবো না? টেকনাফ যাবো না?”
আরশাদ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,”যাবো।”

ইরা কিছুটা এগিয়ে যায়। খোলা গলা ছেড়ে দেয়, সমুদ্রে যেনো প্রতিধ্বনিত হয় ইরার কণ্ঠ।

“আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দু’জনে
আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দু’জনে
চলো না ঘুরে আসি অজানাতে
যেখানে নদী এসে থেমে গেছে
আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দু’জনে।

ঝাউবনে হাওয়াগুলো খেলছে
সাঁওতালি মেয়েগুলো চলছে;
লাল লাল শাড়ীগুলো উড়ছে
তার সাথে মন মোর দুলছে ।
ঐ দুর আকাশের প্রান্তে,
সাত রঙা মেঘ গুলো উড়ছে।
ঐ দুর আকাশের প্রান্তে,
সাত রঙা মেঘ গুলো উড়ছে।
চলো না ঘুরে আসি অজানাতে,
যেখানে নদী এসে থেমে গেছে।
আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দু’জনে…”

আরশাদ ঠিক ওই মুহুর্তে বোধহয় বুঝতে পারে সে আসলেই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলছে। যে ভালোবাসা নিখাঁদ, পবিত্র। শারীরিক টানের থেকে বড় যেখানে শুভ্র প্রেম, যা মোহ নয়।

(চলবে….)