#মন_কেমনের মরশুম
পর্ব: ১৭
দুপুরের পর চোখ দু’টো লেগে এসেছিলো ইরার। হঠাৎই ঘুম ভাঙে রাবেয়া বেগমের ঝাঁঝালো গলা শুনে। কারো সাথে খুব উঁচু গলায় কথা বলছে। ইরা ধড়ফড় করে বিছানায় বসে বুকে হাত দেয়। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে সন্ধ্যা এখনো হয়নি, হবে।
তার জানামতে রাবেয়া বেগমের বর্তমান একমাত্র শত্রু হলো সে, ইরা। কিন্তু এই সন্ধ্যা মুখে কার সাথে আবার চিৎকার করবে?
ইরা কৌতুহলবশতঃ উঠে আসে। পর্দার ফাঁকা দিয়ে উঁকি দেয় বসার ঘরের দিকে।
সোফায় উল্টোদিক ফিরে এক ভদ্রলোক বসা, ভালো করে দেখা যাচ্ছে না তাকে। তবে মাথা নিচু করে জবুথবু হয়ে বসে আছে বোঝা যাচ্ছে। ইরা কিছুটা অবাক হয়, কে এলো?
“আক্কেলটা কি আপনাদের? ভালোই তো মেয়েকে গছিয়ে দিয়ে দিব্বি পড়ে আছেন। আমার ছেলেটাকে ভালো মানুষ পেয়ে তার গলায় মেয়েকে ঝুলিয়ে দিলেন। বাহ।”
ইরার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। তার মানে কি বাবা এসেছে? তার বাবা?
“কথা বলছেন না কেনো? এই পরিকল্পনা কতোদিন ধরে চলছিলো?”
জালাল আলী ঘোলাটে চোখে তাকায় রাবেয়ার দিকে।
“কিসের পরিকল্পনার কথা বলছেন আপা?”
“কিসের পরিকল্পনা বুঝতে পারছেন না? এইযে বড়লোকের ভালো মানুষ ছেলে পেয়ে মেয়েকে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেন না। তলে তলে ভালোই বুদ্ধি।”
“আপা ভুল বুঝছেন আমাকে। যা হয়েছে সেখানে আমার কোনো হাত ছিলো না। কোথা থেকে কি হয়ে গেলো আমি বুঝতেই পারিনি।”
রাবেয়া বেগম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,”খুব ভালোই নাটক সাজিয়েছেন। তা এতোদিন মেয়েকে দেখতে ইচ্ছা করলো না? মেয়ে কোথায় গেলো, কেমন আছে, কীভাবে আছে। যদি ছেলেটা ভালো না হতো?”
জালাল আলী ক্ষীণ গলায় বললো,”অনেক চেষ্টা করেছি ঠিকানা খোঁজার, হন্যে হয়ে খুঁজেছি। মেয়েটা এক বুক অভিমান নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলো। ও চায়নি আমি ওকে খুঁজে পাই। অনেক কষ্ট করে ঠিকানাটা পেলাম।”
ইরার দুই পা কাঁপতে থাকে। যতো যাই হোক, মাত্র কয়েক হাত দূরেই বসে আছে তার বাবা। সমানে অপমানিত হচ্ছে। ইরার বুকটা ভার হয়ে আসে। তার কোনোদিন ইচ্ছা ছিলো না বাবা মায়ের মুখ দেখার। কিন্তু এই মুহুর্তে তার বড্ড ইচ্ছে করছে বাবার সামনে ছুটে যেতে। অভিমান যে মাঝে মাঝে বিগলিত হয়ে যায়।
“খুব ভালো করেছেন। মেয়েকে এবার সাথে নিয়ে চলে যান। এসব বিয়ে বিয়ে নাটক আর ভালো লাগছে না আমার।”
জালাল আলী চমকে উঠে বললো,”মেয়েকে সাথে নিয়ে চলে যাবো?”
রাবেয়া বেগম কিছু বলার আগেই ইরা গুটি গুটি পায়ে সেখানে এসে দাঁড়ায়। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয় নিজেকে দৃঢ় রাখার।
লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে ইরা গাঢ় গলায় ডাকে,”বাবা।”
জালাল আলী স্তম্ভিত হয়ে যায় মেয়ের ডাকে। ঝড়ের বেগে ঘুরে তাকায় পিছনে। কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ায় সোফা থেকে। তার ক্র্যাচ পড়ে যায়। ইরা রোবটের মতো সেইটা তুলে বাবার হাতে দেয়।
জালাল আলী মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলতেই যেনো ভুলে যায় কিছু সময়ের জন্য। মেয়েটা কবে এতো রূপবতী হলো? মাত্র এই ক’দিনেই এতোটা পরিবর্তন কীভাবে? কি সুন্দর জামা পরেছে, খোলা চুলে কি অপরূপ লাগছে মেয়েটাকে। রাবেয়া বেগমকে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো তার। বোধহয় মেয়েটা এখানেও সুখে নেই। কিন্তু না, এখন মনে হচ্ছে মেয়েটা বোধহয় আসলেই ভালো আছে।
“কেমন আছিস মা? আমার ইরাবতী।”
ইরা কঠিন চোখে বাবার দিকে তাকায়। তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি। যে হাসির অর্থ জালাল আলী বুঝতে পারেনা।
“যেমন দেখছো তেমনই আছি বাবা। তুমি কেনো এসেছো? কি দেখতে এসেছো? আমি কষ্টে আছি, যন্ত্রণায় আছি এটা দেখতেই তো?”
“ইরা….”
“সেই কবেই তো আমাকে এক সমুদ্র কষ্টে ফেলে দিয়েছো বাবা। নতুন করে আর কি কষ্ট হবে আমার? আমি তো যন্ত্রণা পেতে পেতে অভ্যস্ত। হঠাৎ বেশি সুখ পেলেই আমার অস্বস্তি হয়, বুক জ্বালাপোড়া করে।”
জালাল আলীর চোখের কোণে পানি চিকচিক করে ওঠে। পাঞ্জাবির কোণা দিয়ে চশমা পরিষ্কার করে সে ধীরে ধীরে।
“চলে যাও বাবা৷ দয়া করে চলে যাও। আর কোনোদিন এসো না। আমি যেমনই থাকি, তোমাকে ভাবতে হবে না। চিন্তা করো না, আমি এই বাড়িতে রাজরানী হয়ে নেই। যদি কোনোদিন আমাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় আমি সেদিন রাস্তায় থাকবো৷ তবুও তোমাকে আর তোমার স্ত্রী-সন্তানকে কষ্ট দিতে ও বাড়িতে ফিরবো না।”
ইরার প্রতিটা কথা শেলের মতো বুকে এসে বিঁধে জালাল আলীর। মেয়ে মিথ্যে না, মেয়ের এ রাগ, এ অভিমান অসঙ্গত না। সে সবই জানে, সবই বোঝে। কিন্তু সে যে অথর্ব বাবা। পায়ের দুর্ঘটনার পর থেকে সব কাজকর্ম বন্ধ তার। চলতে হয় দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাইয়ের টাকায়। এ সংসারে যে তার দুই পয়সার মূল্য নেই। তা কি ইরা জানে না?
“তোকে একটু দেখি কিছুক্ষণ? এরপর চলে যাই?”
ইরা ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে তাকায়। রাবেয়া বেগম মুখ বাঁকায়। বিরক্ত লাগে এসব তার।
“উনি বলছিলেন তোকে নিয়ে যেতে। যাবি তুই? কিছুদিন থেকে আসবি আমার কাছে, চল না মা।”
ইরা শব্দ করে হেসে দেয়। বেসামাল সে হাসি দেখে অবাক হয় জালাল আলী। হাসতে হাসতে কারো বিষাদে ছুঁয়ে যাওয়া মন দেখা যায়? যাচ্ছে তো, তার মেয়ের।
“চল না মা। আমি তোকে কথা দিচ্ছি কেউ তোকে খারাপ কিছু বলবে না। আমি বলতে দিবো না।”
ইরা ম্লান হেসে বললো,”তাই নাকি বাবা? সে ক্ষমতা যদি সত্যিই তোমার থাকতো তাহলে আমার জীবনটা এমন কচুরিপানার মতো ভাসমান হতো?”
“সব বাদ, দরকার হয় তোকে নিয়ে গাছতলায় রাখবো আমি কয়দিন। তবুও আমার কাছে থাকবি তুই। বাবার কাছে থাকবে ইরাবতী। যাবি মা?”
ইরা বুঝতে পারে তার রাগ তরল হওয়া শুরু করেছে। এ ভারী বিপদের লক্ষণ। নিজেকে সামলাতে পারছে না সে কোনোভাবে। এখন সত্যিই ইচ্ছা করছে তার এই অথর্ব বাবার সাথে অন্তত দু’টো দিন থাকতে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। কিন্তু আরশাদ……
★
দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই হতভম্ব হয়ে যায় আরশাদ। তার মুখের রেখাগুলো কঠিন হয়ে ওঠে সাথে সাথে। কাচুমাচু হয়ে জালাল আলী দাঁড়িয়ে, পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। আরশাদের সাথে একবার চোখাচোখি হতেই ইরা চোখ নামিয়ে নেয়।
“ইরা…”
ইরা কিছু একটা বলতে যেয়েও থেমে যায়। কি বলতে ভেবে পায়না। ঘন ঘন শ্বাস পড়তে থাকে তার।
জালাল আলী এগিয়ে যায় আরশাদের দিকে, আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“বাবা ভালো আছো?”
“আছি। কিন্তু আপনি এখানে?”
“মেয়েটাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছা করছিলো। ঠিকানা জানতাম না। অনেক কষ্টে যোগাড় করেছি।”
আরশাদ ল্যাপটপের ব্যাগটা সোফার উপর রেখে হাসে। বুকে দুই হাত গুঁজে জালাল আলীর দিকে তাকায়।
“এতো টান মেয়ের প্রতি। সেই মেয়েকেই একটা বৃদ্ধ, যে কিনা আপনার মেয়ের চেয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছরের বড়। তার হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছিলেন। ব্যাপারটা দারুণ তো!”
জালাল আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সবকিছু শোনা তার প্রাপ্য। কোনো উচ্চবাচ্য করেনা সে আরশাদের কথায়।
“বেশ, মেয়েকে দেখতে এসেছেন ভালো কথা। মন ভরে মেয়েকে দেখুন, খাওয়া দাওয়া করুন। আমি আসছি। ইরা এক মগ কফি বানিয়ে ঘরে এসো।”
আরশাদ ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই জালাল আলী তাকে ডাকে পিছন থেকে। আরশাদ জিজ্ঞাসু চোখে তাকায় তার দিকে।
“তোমাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
ইরা শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে থাকে। এ কয়দিনে এটুকু বুঝেছে আরশাদ অনেক বেশি যত্নশীল হলেও ভীষণ রাগী। আচ্ছা সে কি তার মায়ের মতো ইরার বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে? মনে হয়না, এটুকু বিশ্বাস তাকে করাই যায়।
“ভাবছিলাম মেয়েটাকে কিছুদিন নিজের কাছে নিয়ে রাখবো। আমি ওর ব্যর্থ বাবা তবুও বাবা তো। ছটফট করেছি এ কয়দিন ওর জন্য। কিচ্ছু করতে পারিনি এ বাদে। তুমি কি অনুমতি দিবে বাবা?”
জালাল আলী আকুতি ভরা চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। ইরা তাকাতে পারেনা। এখন নিশ্চয়ই আরশাদ রেগে যাবে, চিৎকার করবে।
রাবেয়া বেগম রাগে গজগজ করতে করতে বললো,”যদি নিতে চান নিয়ে যান না। এতো কথা কিসের?”
আরশাদ মায়ের দিকে নির্লিপ্ত চোখে একবার তাকায়। এরপর ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে সে।
“আপনি আমার অনুমতি চাচ্ছেন?”
“হ্যা বাবা, আমি অনুরোধ করছি। দু’টো দিনের জন্য হলেও। আমি নিজে ওকে দিয়ে যাবো এরপরে।”
আরশাদ ইরার দিকে তাকায়, ইরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ওড়নায় আঙ্গুল পেঁচাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর আরশাদ শান্ত গলায় বললো,”আমার অনুমতি নেই। আমি চাইনা আমার স্ত্রী ওই বাড়িতে আবার যাক। আপনি কিংবা আপনার যতো আত্মীয় স্বজন আছে তারা ইরাকে দেখতে চাইলে এ বাড়ি এসে দেখে যেতে পারবে। কিন্তু ইরা ও বাড়িতে আর যাবে না। না না এটা ভাববেন না যে আমি ওকে জোর করবো। ওর যদি ইচ্ছা হয়, ও যেতে পারবে। তবে আপনি আমার কথা যদি বলেন, তাহলে আমার তরফ থেকে একটাই উত্তর ‘না’। এখন দেখুন ইরা কি বলে। ও যদি যেতে চায় নিয়ে যান।”
ইরা ঝট করে মাথা তুলে আরশাদের দিকে তাকায়। আরশাদ এখন অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।
জালাল আলী মেয়ের দিকে তাকাতেই ইরা মৃদু গলায় বললো,”বাবা তুমি চলে যাও। আমি যেতে পারবো না।”
আরশাদ আড়চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, পরক্ষণেই হাসি মুছে ফেলে। মেয়েটাকে আজ পরিপূর্ণ বউ বউ লাগছে।
জালাল আলীও ছোট্ট করে হাসে।
“আমাকে খুব বেশি দেখতে ইচ্ছা করলে বাড়ির নিচে এসে দাঁড়াবে, খবর পাঠাবে কাউকে দিয়ে আমি দেখা করে আসবো। কেমন বাবা?”
জালাল আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”বেশ, তুই যা বলবি।”
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে ইরার দিকে তাকিয়ে বললো,”এটা কেমন কথা? উনি নিচে দাঁড়াবে কেনো? বাড়িতে কি সমস্যা?”
ইরা রাবেয়া বেগমের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে স্মিত হাসে, কিছু বলেনা।
সন্ধ্যা মিলানোর কিছু সময় পর জালাল আলী মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। খালি হাতে ফিরলেও বুকের মধ্যে এক মহাসমুদ্র প্রশান্তি। শ্বশুরবাড়িতে স্বামী মেয়েদের আসল ঠিকানা, ভরসার আশ্রয়স্থল। শৈশব, কৈশোরে একটা অথর্ব বাবা পেলেও, মেয়েটা একটা সুপুরুষ স্বামী পেয়েছে। যার মেরুদণ্ড তার বাবার মতো বাঁকা নয়, বরং টান টান উদ্দীপ্ত। সারা রাস্তা কারণে, অকারণে চোখ ভিজে ওঠে তার। ভালো লাগা আর কষ্টের অদ্ভুত এক মিশ্রণ। এই অনুভূতির নাম জালাল আলী জানেনা।
★
বারান্দার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে ইরা। বুকের বাম পাশে, একদম নিচে কেমন একটা ভোঁতা যন্ত্রণা হচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাবাকে তো সে আর দেখতেও চায়নি কোনোদিন। কিন্তু আজ সামনাসামনি ওই মুখটা দেখার পর থেকে এমন অসহ্য কষ্ট হচ্ছে কেনো তার? কেনো বারবার ওই গ্লানি মাখা মুখটা চোখের সামনে ভাসছে?
পাখি দু’টো পাশে কিচকিচ করছিলো এতোক্ষণ। এখন শান্ত হয়েছে। শুধু শান্ত হতে পারছে না ইরার অবাধ্য মনটা। আচ্ছা মনের উপর কি কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে?
হাতের মধ্যে থাকা কিছু টাকার নোট শক্ত করে চেপে ধরে ছিলো এতোক্ষণ। দূর থেকে আসা নিয়ন আলোয় হাতটা মেলে ধরে সামনে। কয়েকটা খুচরো নোট। দশ টাকা, বিশ টাকা আর পঞ্চাশ টাকার। সব মিলিয়ে পাঁচশো টাকাও হবে না। বাবা যাওয়ার সময় তার হাতে গুঁজে দিয়ে গেছে। ইরা পাথরের মতো শক্ত হয়ে ছিলো তখন। নিতে ইচ্ছা করেনি। কিন্তু ফিরিয়েও দিতে পারেনি। বাবা কষ্ট পেতো বোধহয়। টাকাগুলো হাতের মধ্যে বারবার নেড়েচেড়ে দেখে সে। বোবা কান্নাগুলো গলার কাছে আটকে আছে। না পারছে গিলতে, না পারছে উগড়ে দিতে। আচ্ছা তার জীবনটাই এমন হলো কেনো? একটা সুস্থ, সুন্দর জীবন কি তার প্রাপ্য ছিলো না? সে তো কোনো অন্যায় করেনি।
“রাগ করেছেন?”
ইরা কিছুটা চমকে উঠলেও প্রকাশ করেনা। টাকাগুলো ওড়নার কোণায় বেঁধে ফেলে।
“কেনো?”
আরশাদ গ্রিলে হাত ঠেকিয়ে দূরে তাকায়।
“এইযে বাবার সাথে যেতে দিলাম না তাই।”
ইরা ম্লান হেসে বললো,”না রাগ করিনি। আর না যেয়ে ভালোই হয়েছে। এতোদিন পর মেয়েকে দেখে বাবা আবেগ সামলাতে পারেনি। বলে ফেলেছে একটা কথা। কিন্তু এর ফল বুঝতে পারতো বাড়িতে গেলে। শুনেছি আমার মা আমাকে বিয়ে দেওয়ার কথা বলে ওই লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলো। বিয়েটা না হওয়ায় নিশ্চয়ই টাকা ফেরৎ দিতে হয়েছে। মা আমাকে কখনোই মেনে নিতো না ও বাড়িতে। বাবার সামনে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতো। বাবা কিচ্ছু করতে পারতো না, যেমনটা করতে পারেনি আমার বিয়ের সময়। শুধু শুধু মানুষটা কষ্ট পেতো। তারচেয়ে যেটা হয়েছে ভালোই হয়েছে।”
আরশাদ ইরার দিকে ফিরে তাকিয়ে গ্রিলে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত বেঁধে দাঁড়ায়। শ্বেতশুভ্র একটা সালোয়ার কামিজ পরনে ইরা, ওড়নাটা মৃদু হাওয়ায় ভাসছে। অসম্ভব রূপবতী লাগছে তাকে। গ্রীক পুরাণে দেবীদের রূপের বর্ণনা যেমন করে দেওয়া থাকে, ঠিক তেমন।
“শুধু এই কারণে গেলে না? নাকি আমি যেতে দিতে চাইনি তাই?”
ইরা রাস্তার দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ আগেই এই রাস্তা দিয়ে তার বাবা ক্র্যাচে ভর দিয়ে অসহায়ের মতো হেঁটে গেছে। ইরা দূর থেকে দেখেছে শুধু। বুক ফেটে কান্না এলেও সে কাঁদেনি। আজকাল কেনো যেনো চোখ দিয়ে পানি পড়েনা। কষ্টের মাত্রা বেড়েছে শুধু।
“কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা ভীষণ বেহায়া হয় জানেন তো? বাবার জন্য, স্বামীর জন্য আর সন্তানের জন্য। আজ বোধহয় বাবাকে খুশি করতে আমি চলেও যেতাম৷ এরপর ঘাড় ধাক্কা খেলেও কষ্ট পেতাম না।”
“তার মানে বলতে চাচ্ছো শুধুমাত্র আমার কারণেই যাওনি?”
ইরা চুলের খোঁপা খুলে দিয়ে এলোমেলো করে দেয় চুলগুলো। আরশাদ সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা কি তাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে? মোহগ্রস্ততার ফাঁদ?
“আপনি মানুন বা না মানুন, জীবনের এই মুহুর্তে আপনি আমার সবচেয়ে বড় সত্য, সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমি ভান করতে জানিনা, অতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতেও জানিনা। এটা সত্যি, আমি আপনার কারণেই যাইনি।”
“তোমার কি মনে হচ্ছে আমি তোমাকে ডোমিনেট করছি?”
ইরা দূরের কালোর দিকে তাকিয়ে গাঢ় গলায় বললো,”আই অ্যাম টায়ার্ড আরশাদ। সামটাইমস আই ওয়ান্ট টু বি ডোমিনেটেড।”
আরশাদ স্তম্ভিত হয়ে যায় ইরার কথায়। চোখ বড় বড় করে তাকায় ইরার দিকে। মনে হলো ইরা না, ইরার শরীরে ভর করে আর কেউ কথা বলছে। আরশাদের শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
“ইরা….”
ইরা ধাতস্থ হতেই চমকে ওঠে ভয়াবহ ভাবে। এ কি বলে ফেললো সে? এতো কিসের আবেগ তার? এবার কি হবে? হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধকধক করে ওঠে তার। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখের দিকে তাকানো আপাতত অসম্ভব।
“আপনি অপেক্ষা করুন, আপনার কফি নিয়ে আসছি আমি।”
ইরা ঝটিকার মতো ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় কিন্তু কীভাবে? আরশাদ ততক্ষণে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরেছে পিছন থেকে। যদিও তার ঘোর কাটেনি এখনো। ইরা কি বললো এটা? কীভাবে বললো? কিন্তু তার শক্ত বাঁধন থেকে মোচড়ামুচড়ি করেও নিজেকে ছাড়াতে পারেনা ইরা।
“ছাড়ুন, কফি নিয়ে আসি।”
“কফি লাগবে না, এদিকে এসো।”
“আপনার ক্যাফেইন দরকার হয় তো।”
আরশাদ ইরাকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে কাছে সরিয়ে আনে। ইরা কিছুক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আপ্রাণ।
“ক্যাফেইন দরকার নেই, তারচেয়েও কড়ামাত্রার নেশা লাগবে।”
ইরা চিঁচিঁ করে বললো,”নেশা করেন আপনি?”
“এতোদিন তো করিনি। এখন না করলে ওরা কষ্ট পাবে।”
ইরা কিছুটা অবাক হয়ে বললো,”আপনি নেশা না করলে কারা কষ্ট পাবে? নেশার সাথে কারো কষ্ট পাওয়ার কি সম্পর্ক?”
“আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চারা।”
ইরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আরশাদের দিকে। কিছুক্ষণ ধরে আরশাদের মাতাল চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কি বলতে চাচ্ছে সে। পরক্ষণে বুঝতে পেরেই ইরার শরীর শিরশির করে ওঠে। হাঁপাতে থাকে সে আরশাদের শক্ত বাঁধনের মধ্যে।
হঠাৎ দরজায় প্রবল ধাক্কাধাক্কির শব্দে আরশাদ বিরক্ত হয়, বাঁধন কিছুটা আলগা হয়ে আসে তার। ইরা তৎক্ষনাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে ঢোক চাপে। এই লোকটার কথাবার্তা এতো মার্কামারা, ছিহ!
“এখানেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো, আমি আসছি।”
ইরা মুখ বেঁকিয়ে পাখিগুলোর কাছে যেয়ে দাঁড়ায়। ও দু’টোও এখন প্রেম করছে বসে বসে৷ আশ্চর্য, কোথাও যেয়ে কি শান্তি নেই? সবার কি একসাথে প্রেম পেয়ে গেলো নাকি?
দরজা খুলতেই বেশ অবাক হয়ে যায় আরশাদ। রাবেয়া বেগম দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখমুখ কেমন যেনো দেখায়। ভীষণ ভয় পেয়ে আছে সে।
“মা কি হয়েছে?”
রাবেয়া ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো,”আরশাদ তোর মেজো খালুর শরীর খুব খারাপ করেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলো বাথরুমে। এখন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।”
আরশাদ বিস্ফারিত চোখে মায়ের দিকে তাকায়। ইরা ছুটে এসেছে ঘরে ততক্ষণে।
“বাবা আমাকে এক্ষুনি নিয়ে চল। নীলু একা, ওর পাশে আমাদের থাকা দরকার।”
আরশাদ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,”তুমি চিন্তা করোনা মা। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। আমাকে পাঁচটা মিনিট সময় দাও। আমি এক্ষুনি আসছি।”
আরশাদ শার্ট পরছে দ্রুত। ইরা তার হাতঘড়িটা এগিয়ে দেয় যন্ত্রের মতো।
“আমি যাবো আপনাদের সাথে?”
আরশাদ শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বললো,”প্রয়োজন নেই। তুমি বাড়িতে থাকো। আমি খুব দ্রুত ফিরে আসবো। আমার জন্য ক্যাফেইন তৈরি রেখো।”
ইরা হতবাক হয়ে যায়। এই লোকটা যে কোনো মুহুর্তে, গম্ভীর মুখে অবলীলায় যা ইচ্ছা বলে যায়। কোনো রাখঢাক নেই।
ইরার গালে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে আরশাদ বেরিয়ে যায়। ইরা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঘরের সব বাতি বন্ধ করে অন্ধকার করে ফেলে চারপাশ। বড্ড আঁধারে থাকতে মন চাচ্ছে তার, বড্ড! অদ্ভুত একটা শিহরণ বয়ে যাচ্ছে শরীর জুড়ে। এটা কি মোহ, প্রেম নাকি ভালোবাসা?
(চলবে…..)
#মন_কেমনের মরশুম
পর্ব: ১৮
হাসপাতালের করিডরে শান্ত হয়ে বসে আছে নীলু। রাবেয়া আর আরশাদ দুইজনই ভেবেছিলো নীলুকে বোধহয় খুব বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পাবে, কান্নারত অবস্থায়। কারণ ছোট থেকেই নীলু অল্পতেই ভীত হয়ে যাওয়া মেয়ে।
কিন্তু ওরা অবাক হয়ে দেখলো নীলু অতিরিক্ত চুপচাপ। একটুও কাঁদছে না। একটা মূর্তির মতো বসে আছে।
রাবেয়া বেগম ছুটে যেয়ে জড়িয়ে ধরে নীলুকে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। আরশাদ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়ায় পাশে।
নীলুর মধ্যে ভাবান্তর হয়না খুব একটা। যেনো এই মুহুর্তে রাবেয়া বা তার ছেলে আসা কিংবা না আসায় তার কিছু যায় আসেনা।
“মা রে, এসব কীভাবে হলো? আর এতো দেরিতেই বা কেনো জানিয়েছিস আমাদের?”
নীলু ক্ষীণ গলায় বললো,”আগে জানালে কি হতো খালাম্মা? বাবা সুস্থ হয়ে যেতো?”
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় নীলুর দিকে। আজ পর্যন্ত নীলু রাবেয়া বেগমের সাথে কখনো এভাবে কথা বলেনি। মেয়েটার পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো।
“একা একা কীভাবে এতোকিছু করলি তুই? কতো বড় হয়ে গিয়েছিস?”
নীলু ম্লান হাসে।
“কেউ বয়সের ভারে বড় হয়ে যায় আবার কেউ বা দায়িত্বের ভারে। আমাকে তো একাই আসতে হতো খালাম্মা। আমার তো আপন বলতে কেউ নেই।”
রাবেয়া হতভম্ব হয়ে যায় নীলুর কথা শুনে।
“তোর আপন বলতে কেউ নেই? এ কথা তুই বলতে পারলি? আমরা তোর কেউ না?”
“মাঝে মাঝে আপনের চেয়ে পরের মানুষের অবদান বেশি হয়। তারা সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আমি একা কিছুই করিনি খালাম্মা। রোশান স্যারকে জানিয়েছিলাম সাথে সাথেই। এরপর যা করার উনিই করেছেন।”
“রোশান স্যার কে?”
নীলু রাবেয়ার বাঁধন থেকে নিজেকে আস্তে করে ছাড়িয়ে নেয়।
“উনি এখানকার ডাক্তার, বাবার পূর্ব পরিচিত। এ বাদে আমার কাছে আর কোনো পরিচয় নেই উনার। আর হ্যা এভাবে কান্নাকাটি করোনা দয়া করে। এতো কান্নাকাটির কিছু হয়নি। হঠাৎ রক্তচাপ অনেকটা কমে যাওয়ায় মাথা ঘুরে পড়ে যায় বাবা। বাড়িতে থাকলেও হতো। কিন্তু আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি। আজকের রাতটা এখানে থেকে সকালেই চলে যেতে পারবো।”
নীলুর কথা গুলো ঠিক হজম হয়না ওদের। নীলু এভাবে কথা বলেনা। কেমন যেনো যন্ত্রের মতো শোনাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওর ভিতরে ও নেই, আর কেউ কথা বলছে ওর হয়ে।
“আচ্ছা আমি নিজামকে দেখে আসি। আরশাদ তুই নীলুর কাছে একটু থাক বাবা।”
আরশাদ ইতস্তত করে মাথা নাড়ে। রাবেয়া চলে যায় সেখান থেকে।
দাঁড়িয়ে উশখুশ করে আরশাদ। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি নীলুর সাথে এর আগে হয়নি তার। সেদিন হঠাৎ এমন একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেলো। আরশাদ নিজেকে সামলাতে পারেনি। এখন, এই মুহুর্তে কিছুটা অপরাধবোধ তৈরি হয় তার। যদিও নিজেকে দোষ দিতে পারেনা সে। আর কি-ই বা করার ছিলো তার তখন? নীলু এমন বেসামাল আচরণ শুরু করলো।
“নীলু।”
আরশাদ ভেবেছিলো নীলু উত্তর দিবে না।
কিন্তু আজ যেনো নীলু একদম ব্যতিক্রম। আরশাদের উপস্থিতি নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
“বলো।”
আরশাদ কি বলবে ভেবে পায়না। সহজ সম্পর্কটাকে কেমন কঠিন মনে হয়। সে জানে তার মনে কোনো পাপ নেই। তবুও কিছু বলতে গেলেই মস্তিষ্ক তাকে বাঁধা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ইরাকে ঠকানো হবে তার অনুপস্থিতিতে।
“রাতে খাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই। কিছু খেতে ইচ্ছা করলে বলো এনে দিই।”
“প্রয়োজন নেই, আমার খিদে নেই।”
আরশাদ বিব্রত হয়। বেসরকারি হাসপাতাল, চারদিকটা কেমন নিস্তব্ধ, শান্ত। দুইজনের শ্বাস ফেলার শব্দটুকু পাওয়া যাচ্ছে শুধু।
“খালুর এমন অবস্থা কেনো হলো? খুব চিন্তা করছেন কিছু নিয়ে?”
“করতে পারে, জানিনা আমি।”
নীলুর কণ্ঠ স্বাভাবিক কিন্তু কিছুটা উত্তপ্ত যেনো। বাড়তি কোনো কথা বলছে না। অবশ্য আরশাদ চায়ও না নীলু বাড়তি কোনো কথা বলুক। নীলু আর এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করুক যেখানে আরশাদকে বিরক্ত হতে হয় তার প্রতি, এমনটা আরশাদ চায়না।
কিছুক্ষণ এভাবেই দুইজনের নিস্তব্ধতায় সময় কাটে। আরশাদ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে, নীলু চেয়ারে বসে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। এক অদৃশ্য প্রাচীর তাদের মাঝে।
আরশাদ ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত প্রায় সাড়ে দশটা। ইরার জন্য চিন্তা হচ্ছে। আবার রোমাঞ্চিতও হচ্ছে বারবার।
‘সামটাইমস আই ওয়ান্ট টু বি ডোমিনেটেড’ কথাটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আচ্ছা ইরা কি আরশাদের ওর প্রতি দূর্বলতা পুরোটা বুঝে ফেলেছে? ইরা নিজেকে প্রকাশ করছে না কেনো? সে চাচ্ছে আরশাদ পুরোপুরি ভেঙেচুরে ওর কাছে আত্মসমর্পণ করুক?
বেশ, উনি যা চান তবে তাই হোক।
“আপনি নীলু ম্যাডাম?”
নীলু চমকে উঠে তাকায়। হাসপাতালের একজন স্টাফ দাঁড়িয়ে তার সামনে। আরশাদও এগিয়ে আসে।
“হ্যা আমি নীলু। কি হয়েছে? আমার বাবার কিছু হয়েছে? আমার বাবা ঠিক আছে?”
“শান্ত হোন ম্যাডাম। আপনার বাবা ঠিক আছেন। উনি তো ঘুমাচ্ছেন এখন।”
নীলু চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে।
“তাহলে কি হয়েছে? খুঁজছেন কেনো আমাকে?”
স্টাফটি হাতে থাকা বেশ বড় একটা ব্যাগ নীলুর দিকে বাড়িয়ে দেয়। নীলু জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।
“রোশান স্যার আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”রোশান স্যার? আমার জন্য কি পাঠিয়েছেন উনি?”
“খাবার আছে এখানে। উনি ব্যস্ত আছেন, তাই আমাকে দায়িত্বটা দিলেন। অবশ্য অনেক আগেই বলেছিলেন। আমি একটা কাজে আটকে পড়েছিলাম। তার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি।”
নীলু নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। রোশান চৌধুরী এগুলো কেনো করছে সে বুঝতে পারছে না। যতোটা করেছে যথেষ্ট কিংবা যথেষ্ট থেকে বেশি। এরচেয়ে অতিরিক্ত কিছু নীলু চায়না, তার প্রয়োজনও নেই।
“ম্যাডাম ধরুন এটা।”
“উনি কি উনার হাসপাতালে আসা সব রোগীর বাড়ির লোকদের জন্য খাবার পাঠান?”
স্টাফ কিছুটা থমকে যায় নীলুর প্রশ্নে।
“জি না।”
নীলু অন্যদিকে ফিরে বললো,”পাশের চেয়ারে রেখে চলে যান।”
স্টাফ নীলুর কথামতো কাজ করে চলে যায় সেখান থেকে।
আরশাদ পুরোটা সময় কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুনছিলো সবটা। কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দিলেও করেনা। সবার ব্যক্তিগত জীবন আছে। বাইরের মানুষের সেই জীবনে জোর করে ঢুকে পড়াটা অভদ্রতা। তবে আরশাদ মনে প্রাণে চায় নীলুর জীবনে এক আকাশ সমান ভালোবাসা আসুক। কেউ নিজের সম্পূর্ণটা উজাড় করে নীলুকে ভালোবাসুক। এই নীলুকে কিংবা সেদিনের নীলুকে আরশাদ চিনেনা। সে চিনে একটা মেয়ে, যে সর্বদা উচ্ছল, চঞ্চল। যার মধ্যে কোনো ভান নেই। এই মেয়েটা অনেক অনেক ভালোবাসার যোগ্য, তবে তা সঠিক মানুষের।
“আরশাদ।”
আরশাদ চমকে ওঠে নীলুর ডাকে।
“বলো।”
“অনেক রাত হয়েছে। খালাম্মাকে নিয়ে ফিরে যাও।”
“অসুবিধা নেই। তোমাকে এভাবে একা রেখে মা যাবে বলে মনে হয় না।”
“আমার জীবনে বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা ছাড়া আমি একাই। তাই আর কাউকেই আমার পাশে প্রয়োজন হবে না। আমার বাবা তো আমার কাছেই আছে।”
আরশাদ দমে যায় নীলুর কথায়। এটা ঠিক যা হয়েছে তা নীলুর জন্য কষ্টকর। অন্যায় করলে সে করেছে নীলুর সাথে। কিন্তু যে খালা নীলুকে ছোট থেকে বড় করেছে মায়ের ভালোবাসায়, মায়ের অভাব কখনো বুঝতে দেয়নি। সেই খালাকেও নীলু পর করে দিলো? এতো সহজে?
★
আরশাদ বাড়ি পৌঁছায় মাঝরাতে। রাবেয়া বেগম কোনোভাবেই নীলুকে একা রেখে ফিরবে না। সারারাত নীলুর কাছেই থাকবে।
আরশাদকেও বলেছে তার সাথে থাকতে। আরশাদ কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। বাসায় ইরা, যদিও সে একা নেই। রাশেদুলের শরীরটা ভীষণ খারাপ হওয়ায় সে আসতে পারেনি, বাড়িতেই আছে। আশাও আছে। তবুও আরশাদের মন শান্ত হচ্ছিলো না। কেমন যেনো অসহ্য সুখ সুখ যন্ত্রণা হচ্ছিলো তার। এভাবেও তবে ভালোবেসে ফেলা যায়?
আরশাদকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচায় স্বয়ং নীলুই। এমনিতেও কেবিনে এতো মানুষ থাকতে দিবে না। নীলু চাচ্ছিলো না আরশাদ থাকুক। তাই রাবেয়া বাধ্য হয় আরশাদকে বিদায় দিতে।
বেশ অনেকটা রাত করেই আরশাদ বের হয় হাসপাতাল থেকে। বেরিয়েই দেখে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে ইচ্ছা হয়না তার। ওই অবস্থাতেই বাইক সর্বোচ্চ গতিতে টেনে বাড়ি ফিরেছে সে। তবুও রাত অনেক, মাঝরাত বলা যায়।
ঘরে ঢুকতেই আরশাদ দেখে ইরা বিছানার এক পাশে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে, ঘুমিয়ে পড়েছে। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে। মেঘ ভাঙা চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। সেই অবাধ জলজোৎস্না জানালার গ্রিল চুইয়ে ঘরে ঢুকছে, ইরার চোখেমুখে পড়ছে তার কিছু অংশ। ইরাকে চন্দ্রাবতীর মতো লাগছে।
ইরার পাশে আরশাদ বসে। বেশ গভীর ঘুম, টের পায়না ইরা।
চুলগুলো খুব সুন্দর ইরার। অবাধ্য চুলগুলো মুখে এসে ভীর করেছে। আরশাদ চুলগুলো সরিয়ে দেয় আলতো করে। ইরা কিছুটা কেঁপে ওঠে ভেজা স্পর্শে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তলিয়ে যায় ঘুমে।
গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁটগুলো ভীষণ টানে আরশাদকে। আরশাদ হাত কামড়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। আচ্ছা এ টান তো অন্যায় নয়, অপরাধ নয়। সে তো ইরার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে না। যদি তাই হতো, অনেক দিন আগেই নিতে পারতো। এতোদিন তো এই অবাধ্য টান অনুভব করেনি সে। একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়েও ভালোবেসে স্পর্শ করতে ইচ্ছে হয়নি। আজ তবে কেনো বেসামাল তার শিরা-উপশিরাগুলো?
যদি ভালোবাসা না-ই থাকতো তবে ইরার অনুপস্থিতি কেনো তাকে যন্ত্রণা দেয়? কেনো তার কথা ভাবায়? ইরার মনে কি চলছে?
আরশাদ সিগারেটের প্যাকেটে হাত রাখে পকেটের উপর থেকে। হয়তো ভিজে গেছে। কিন্তু নিজেকে শান্ত করতে তার সত্যিই এখন ক্যাফেইন দরকার।
আরশাদ উঠে দাঁড়ায়। ঠিক এমন সময় আচমকা….
“ইরা তুমি ঘুমাওনি?”
আরশাদ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে ইরার দিকে। ইরা তার বাম হাতের আঙ্গুল চেপে ধরে আছে। ঘুম ঘুম চোখ, অদ্ভুত রূপবতী সে মুখখানা।
ইরা উঠে বসে। খাটে হেলান দিয়ে বসে। আরশাদের ঘোর কাটেনি। সে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইরার দিকে।
“উনি এখন কেমন আছেন?'”
“বেশ ভালো, বিপদের আশঙ্কা নেই।”
“ভেজা কাপড় না পালটে বসে আছেন কেনো? জ্বর বাঁধাতে ভালো লাগে?”
আরশাদ ইরার মুখোমুখি বসে। ঠোঁটের কোণে তার চিরাচরিত সেই হাসি। ইরা হাই তোলে ছোট্ট করে।
“জ্বর হলেই তো ভালো।”
“কেনো ভালো কেনো?”
আরশাদ কিছুটা এগিয়ে এসে বললো,”সারারাত নরম হাতের আদর… না না মানে সেবা পাওয়া যায়।”
ইরা অন্যদিকে তাকায়। আরশাদের দৃষ্টি তার চোখের সীমানা ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে যাচ্ছে।
“কখন ফিরেছেন?”
“এইতো দশ মিনিট।”
“এতোক্ষণ এভাবেই বসেছিলেন?”
“কীভাবে?”
ইরা কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। আরশাদের কণ্ঠ কেমন ভারী হয়ে এসেছে। অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে ইরা।
“কিছুদিন ধরে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো করবো ভাবছিলাম। সুযোগ পাচ্ছিলাম না। এখন করি?”
“আমাকে কিছু বলতে গেলে সুযোগের প্রয়োজন হয়?”
ইরা আরশাদের চোখে চোখ রেখে বললো,”সমুদ্রের সামনে চিৎকার করে ‘মাই লাভ’ বলছিলেন কাকে?”
আরশাদ বেশ ভালোই চমকে ওঠে। তার ধারণা ছিলো ইরা শোনেনি। তাহলে ইরা সবটা শুনেছিলো? মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষা করছিলো শুধু?
বেশ, তবে তাকেও একটু এক হাত নেওয়া যাক।
“বলেছিলাম একজনকে। খুব মনে পড়ছিলো একজনের কথা। তার স্মৃতিতেই বলা।”
“ও আচ্ছা।”
ইরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঠে দাঁড়ায় বিছানা থেকে।
“মনে হচ্ছে আপনার কফি লাগবে, এনে দিই?”
ইরা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তাকে টেনে বিছানায় ফেলে আরশাদ। ইরা ভয়ে চিৎকার করতে গেলেই তার মুখ চেপে ধরে আরশাদ শক্ত করে। ইরা ভীত চোখে আরশাদের নেশাক্ত চোখের দিকে তাকায়।
“শুধু ওটুকুই শুনলে? মাই লাভ বলার আগে যে তার নামটা নিয়েছিলাম, তা শুনলে না?”
ইরা জোর করে আরশাদের হাত সরায় মুখের উপর থেকে।
“না শুনিনি।”
“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে তুমি শুনেছো।”
“বললাম তো শুনিনি।”
“থাক তুমি না শুনলেও হবে। এক বিশাল জলরাশি, বাঁধভাঙা ঢেউয়ের সমুদ্র সাক্ষী থাকুক আরশাদের অসহায় চিৎকারের। শুধু সে-ই ঢেউগুলোই জানুক আরশাদ কতোটা কাতর হয়ে পড়েছিলো।”
“আমাকে খুঁজে না পেয়ে এতো কাতর? ভালো টালো বেসে ফেলেছেন নাকি আবার?”
আরশাদ ইরার তরল প্রেমের আভাস পায়। সে শতভাগ নিশ্চিত ইরা তার নিজের নাম শুনেছিলো সেদিন। এতোদিন নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে।
ইরার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে নিজের কাছে টেনে আনে আরেকটু। ইরা বরফের মতো শক্ত হয়ে যায় জমে। বুকে এতো জোরে ধুকপুক শব্দ হচ্ছে যে ইরা স্পষ্ট শুনতে পারছে। সেই সাথে আরশাদের ঘন নিঃশ্বাস।
“ভালোবাসি কিনা প্রমাণ পেয়েছো নাকি আরো প্রমাণ চাও?”
“কি প্রমাণ আছে শুনি?”
ইরার কপালে চুইয়ে পড়া চুলগুলো আরশাদ ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দেয়। ইরা চোখ বন্ধ করে ফেলে।
“তোমাকে একদিন বলেছিলাম, যদি সত্যি ভালোবেসে ফেলি কোনোদিন তোমাকে স্বর্গ ঘুরিয়ে আনবো। যে সুখ অপার্থিব, যে সুখের ঠিকানা এই দুনিয়ায় নয়। যদি সত্যিই সে সুখের সন্ধান পাও, তবে কি প্রমাণ পাবে?”
ইরা ঢোক চেপে তাকায় আরশাদের দিকে। আরশাদ তার খুব কাছে, খুব সামান্য দূরত্ব তাদের মাঝে। ইরা জানেনা এখন সে কি করবে। সাড়া দেওয়া ছাড়া তার কাছে আরো কোনো পথ খোলা নেই। তার নিজের প্রেমও কি প্রলয় ডাকেনি? কোনো সন্দেহ আছে তাতে?
দুই নর-নারীর প্রেম যখন খাঁটি, যখন সেই প্রেমের থাকে বৈধতা প্রকৃতি কি আরেকটু উষ্কে দেয় তাদের প্রেমকে? হয়তো তাই। নাহলে থেমে যাওয়া বৃষ্টি আবার কীভাবে ঝুমঝুম করে পড়তে থাকে? দুকূল ছাপিয়ে যাওয়া বৃষ্টি নেমেছে। মন কেমনের না, মন ভালো করার মরশুম হয়ে ধরা দিয়েছে সে ধারা।
ইরা ফিসফিস করে বললো,”আমার ভয় করছে।”
“আমাকে ভয় করছে?”
ইরা না-সূচক মাথা নাড়ে।
“তাহলে? কিসের ভয়?”
“আমি ডুবন্ত সেই সত্ত্বা, যা এক টুকরো ভালোবাসা হাতড়ে বেড়িয়েছি বারবার। আমি যাকেই ভালোবেসে আঁকড়ে ধরি সে আমাকে এক পৃথিবী সমান ভালোবাসা দিয়েই পালিয়ে যায় আমাকে ফেলে, ফাঁকি দেয় আমাকে। খুব ছোটবেলায় আমার নানাভাই, এরপর কৈশোরে আমার মা আর তারপর…”
“তারপর?”
“তারপর আপনি। আমি জানি আমার কপালে সুখ বেশিদিন সহ্য হয়না। ভালোবাসা পেয়ে হারানোর চেয়ে আজীবন ভালোবাসাহীন থাকাও ভালো। আমি তাতেই অভ্যস্ত। আমাকে এতোটা ভালোবাসবেন না। আমি ভালোবাসা পেতে ভয় পাই। আমি আপনাকে হারিয়ে ফেললে সহ্য করতে পারবো না।”
ইরা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে ওঠে।
আরশাদ মুচকি হেসে তার মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে দেয়। মুক্তোদানার মতো পানি দুই চোখ বেয়ে কানের কাছে পড়ছে। প্রচন্ড শক্ত ধাঁচের মেয়েরাও মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষটার সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। সমস্ত কষ্ট নিংড়ে বের করে। তাদের অবচেতন মন চায় সেই প্রিয় মানুষটি তার কষ্ট দূর করে দিক। কাছে থাকার প্রতিশ্রুতি দিক। তার সকল ভয়, না পাওয়ার আশঙ্কা দূর করে দিক।
আরশাদ ইরার চোখ মুছে দিয়ে গাঢ় গলায় বললো,”একান্ত নিজের করে পাওয়া নারীটিকে কষ্ট দেওয়ার জন্য পুরুষের জন্ম হয়নি। যারা দেয় তারা কাপুরষ, তাদেরকে পুরুষের কাতারে ফেলা অন্যায়।”
এরপর নিজের হাতের বাঁধন কিছুটা আলগা করে বললো,”তুমি কি সময় চাও? আমাকে আরো চেনাজানার বাকি আছে তোমার? সংশয় কাটানোর জন্য তোমার আরো সময় দরকার?”
ইরা মৃদু গলায় বললো,”আপনাকে আগেও বলেছি, আপনি এই মুহুর্তে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। সত্যিকারের চেনাজানা সময়ের উপর নির্ভরশীল নয়। দুইজন মানুষ বছরের পর বছর একই সাথে, একই বিছানায় থেকেও কেউ কাউকে ঠিক চিনে উঠতে পারেনা। তাদের মনের মধ্যে যোজন যোজনের দূরত্ব। আবার খুব কম পরিচিত কাউকেও ভালোবেসে আপন করে নেওয়া যায়।”
আরশাদ ইরার ঠোঁটের দিকে একবার তাকিয়ে চোখে চোখ রাখে।
“তবে সম্মতি দিচ্ছো?”
“বঞ্চিত করতে চাইনা।”
“শুধু আমাকে বঞ্চিত করতে চাও না বলে?”
ইরা কিছুক্ষণ থেমে আস্তে আস্তে বললো,”না আমার নিজেকেও।”
আরশাদ মুগ্ধতার রেশ না কাটাতে পেরে বললো,”ইরা….”
“দূরত্ব কি এবার কমবে? নাকি অপেক্ষা করবেন আরো?”
আরশাদ মাতাল করা কণ্ঠে বললো,”প্রতিনিয়ত ভ্রমর ধ্বংস হতে চায়, যদি ভ্রমরের পুষ্প তাকে আঁকড়ে ধরে বুকের খাঁচায়। প্রহরের শেষ আলো তবু ভ্রমর রয় নির্ঘুম। এক টুকরো ভালোবাসায় মোড়া এ মন কেমনের মরশুম।”
ইরা নিজের লেখা নিজের প্রিয় পুরুষটির মুখে শুনে আপ্লুত হয়। কিন্তু সে সুযোগ বেশিক্ষণ পায়না। তার ঠোঁটজোড়া উষ্ণতার দখলে চলে যায়।
রাত বাড়ে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে বৃষ্টির বেগ। সেই অবিরাম ঝুমঝুম শব্দের কাছে গাঢ় শ্বাস গুলো চাপা পড়ে যায়। শুধু চাপা পড়ে না একটা সরু কণ্ঠের মৃদু চিৎকার, ‘ছাড়ুন তো…..’
(চলবে…..)

