Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-২৭+২৮

মন কেমনের মরশুম পর্ব-২৭+২৮

0
304

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ২৭

“স্যার আপনার চা।”
মহিবুল ঝট করে মুখ তুলে তাকাতেই আশা চমকে ওঠে। আগে থেকেই কাঁপছিলো সে ভয়ে। হাতে থাকা চায়ের কাপটায় তার কাঁপনের ছোঁয়া লেগে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে কাপ-পিরিচে।
মহিবুলের চোখ হালকা কাল, নেশা করেছে কিনা কে জানে। অন্যদিন তাকে দেখলে আশার ভয় হয়। আজ ভয়ের সাথে যোগ হয়েছে ঘৃণা। ছিহ কি নোংরা লাগছে ওকে। একটা মানুষ এতোটা নোংরা হতে পারে? মনে হচ্ছে মহিবুল যেনো কোনো মানুষ না, একটা জীবন্ত নর্দমার কীট। কীটটা কিলবিল করছে যেনো।
মানুষের আসল সৌন্দর্য আসলে তার চরিত্রে, মহিবুলকে দেখে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে আশা।

মহিবুল হাসে। আশার শরীরটায় ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে সে। কোনো বিপদ ঘটে যাবে না তো? মহিবুলকে দেখে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। ইরার বুদ্ধিতে কাজ হবে তো?

মহিবুল আশার হাত ধরে। বরফের মতো ঠান্ডা আশার হাত। আশা নিজের হাত মুক্ত করার চেষ্টা করে।
“এমন করছো কেনো মেয়ে? একটু পর তো আমার কাছেই ধরা দিতে হবে।”
আশা দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
“স্যার একটা কথা….”
“সব কথা পরে। আগে কাছে এসো।”
মহিবুল আশার হাত ধরে টানাটানি করে। আশা শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

মহিবুল বিরক্ত হয়ে বললো,”কি বলবে বলো তাড়াতাড়ি। আমার কি আর কোনো কাজ নেই?”
আশা তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,”আপনার কাছে আমার যে মিথ্যা ছবিগুলো আছে সেগুলো আজকের পর আর থাকবে না, তাই না?”
মহিবুল আবারও হাসে বিশ্রীভাবে।
আশা আবার জিজ্ঞেস করে,”স্যার আপনি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছেন।”
“হ্যা অবশ্যই। আমি এক কথার মানুষ।”
“তাহলে এখনই….”
“বলেছি তো থাকবে না। আর তাছাড়াও….”
“তাছাড়াও?”
মহিবুল বাকিটা মনে মনে বলে, আশার সামনে নয়।
‘তাছাড়াও একদিনের বেশি কোনো মেয়ের উপর আমার রুচি থাকে না।’

“না কিছু না, এবার কাছে এসো।”
আশা ঢোক চেপে বললো,”আগে চা খান স্যার। নিন ধরুন।”
মহিবুল ভ্রু কুঁচকে আশার হাতের চায়ের কাপের দিকে তাকায়।

“নিন না স্যার, খান।”
“খেতেই হবে?”
আশা ম্লান হাসে। বুকটা ধকধক করছে তার। যদি মহিবুল চা খেতে রাজি না হয়? ইরার পরিকল্পনা তো ভেস্তে যাবে।

“আচ্ছা দাও, আগে চা খাই।”
আশার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, সাথে সাথে মুছে ফেলে হাসিটা।

“আগে এক গ্লাস পানি এনে দাও। চা খাওয়ার পর পানি খেতে হয় আমার।”
আশা কিছুটা ইতস্তত করে বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। ঘরের বাইরেই ইরা দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতো। আশা ইরার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে। ইরাও ফিরতি ইশারা দিয়ে জানায়, ভয় নেই, আমি আছি।

একটু সময় নিয়েই পানি এনে আশা যখন ঘরে ঢোকে সে দেখে মহিবুলের চা শেষ। তার চোখগুলো কেমন যেনো অতিরিক্ত লাল। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ দু’টো। আশা মনে মনে হাসে, তার মানে প্রথম পরিকল্পনা কাজ করছে। আর একটু সময়ের অপেক্ষা।

“আশা পানি এনেছো?”
“জি স্যার।”
“কিন্তু কিন্তু…”
“কিন্তু কি স্যার?”
“আমার মাথাটা এমন করছে কেনো?”
“কেমন করছে স্যার?”
আশা যেনো কিছুই জানেনা।

“মাথাটা কেমন ঘুরাচ্ছে। চোখে অন্ধকার দেখছি। মনে হচ্ছে খুব ঘুম পাচ্ছে। হঠাৎ এমন লাগছে কেনো?”
আশা চিৎকার করে বললো,”সত্যি আপনার ঘুম পাচ্ছে? সত্যি?”
মহিবুল ছোট ছোট চোখে আশার দিকে তাকায়। আশার চোখেমুখে যেনো খুশি উপচে পড়ছে।

“কি মিশিয়েছো তুমি চায়ে? সত্যি করে বলো।”
মহিবুল কথা শেষ করতে পারেনা। মাথায় হাত দিয়ে প্রথমে খাটে আধশোয়া হয়ে বসে পড়ে। এরপর শুয়ে পড়ে।

আশা আনন্দে আরো জোরে চিৎকার করে।
“ভাবী ভাবী, কাজ হয়েছে। শয়তানের ডিমটার ঘুমেশে পড়েছে।”
মহিবুল ততক্ষণে বিছানার উপর হাত-প ছড়িয়ে ঘুম। আশা খুশিতে লাফাচ্ছে। যদিও আসল কাজ এখনো বাকি।

মুখে একটা কুটিল হাসি নিয়ে ঘরে ঢোকে ইরা। তার হাতে একটা ধারালো কাঁচি।

আশা ভয়ে ভয়ে বললো,”এবার কি হবে ভাবী? কাঁচি কেনো তোমার হাতে?”
“কাঁচি দিয়েই তো আসল কাজ হবে।”
“কি কাজ?”
“ও কিছু না। তুমি আবার রক্ত দেখে ভয় পাবে না তো?”
আশা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। ভয় তো পাবেই কিন্তু যখনই জানোয়ারটাকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখবে তখন কি যে শান্তি পাবে। এতোক্ষণ ভয় পেলেও এখন একটা সাহস ফিরে এসেছে তার মনে। যা হবে ভালোই হবে নিশ্চয়ই।

ইরা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে। তার চোখের সামনে যেনো মহিবুল রূপে তার স্কুলের সেই পিওনটা শুয়ে আছে। ভিতর ভিতর একটা লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে তার। পশুরূপী অসভ্যদের এভাবেই শাস্তি দিতে হয় যেনো পরবর্তীতে আর কোনো মেয়ের সর্বনাশ করতে না পারে।

ইরা এক পা, এক পা করে এগিয়ে যায়। সারা ঘরে পিনপতন নীরবতা। শুধু নিজেদের বুকের ঢিপঢিপ শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না তারা। আশা ইরার আঁচল চেপে ধরে রেখেছে পেছন থেকে।

ইরা মহিবুলের অনেকটা কাছে এসে ঝুঁকেছে। যে কোনো মুহুর্তে কাজ শুরু হবে। ঠিক এরকম সময় আচমকা…..

সোমবারে নীলুর কোনো ক্লাস থাকে না। ওদিন সে বাড়ি থেকে বেরও হয়না। রাবেয়া বেগম দেখতে আসে তাকে। বাড়িতেই খালার সাথে গল্প করে সময় কাটে নীলুর।
কিন্তু আজ নীলু বাড়িতে থাকবে না। গতরাতে এক ফোঁটা ঘুম আসেনি। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছে শুধু। ভোরের দিকে অল্প ঘুম এসেছে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সাতটার দিকেই উঠে গেছে আবার। মনের সাথে মস্তিষ্কের যুদ্ধ চলেছে সারারাত। বিছানায় উঠে বসেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে। মাঝে মাঝে মনকে জয়ী ঘোষণা করে দিতে হয়, নাহলে মস্তিষ্ক নিজেই অচল হয়ে যায়।

সকালেই গোসল করে ফেলে নীলু। কি মনে করে মায়ের একটা শাড়ি পরে সে, নীল বালুচরি। মায়ের শাড়ি খুব পছন্দ ছিলো। প্রায়ই শাড়ি কিনতো। নীলুরও মাঝে মাঝে মায়ের আলমারিতে হানা দিতে বেশ ভালোই লাগে।

নীল পাথরের লকেটের সাথে সরু একটা রূপোর চেইন, সাথে একই পাথরের কানের টপ। ব্যস! গহনা বলতে এতোটুকুই। বিশাল আকৃতির আয়নার সামনে বসে ভেজা চুল আঁচড়াচ্ছে আর মনের সাথে দ্বন্দ্ব চলছে। যা করছে তা কি ঠিক হচ্ছে? নিজের উপর এতোটা নিয়ন্ত্রণহীন আগে কখনো লাগেনি তার।
ধাতস্থ হয় প্রেশার কুকারের শব্দে। ভুনা খিচুড়ি চড়িয়েছে, নীলু তাড়াতাড়ি উঠে চুলা বন্ধ করে। রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার মুখে বাবার মুখোমুখি হয়। নীলু মাথা নিচু করে ফেলে। নীলুর ধারণা বাবা সব বুঝে ফেলে।

“কোথাও বের হবে নাকি? এতো সাজগোজ কিসের?”
নীলুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। নিজাম হোসেন নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

“বাবা…”
“যেখানেই যাও চেষ্টা করবে একটু তাড়াতাড়ি ফেরার। আমার ব্যাংকে কাজ আছে, বেরোতে হবে আমাকেও। তোমার খালা এসে একা একা বসে থাকবে তোমাকে না পেয়ে।”
নীলু কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। নিজাম হোসেন ঘরে চলে যায়। নীলু জানে বাবা বুঝতে পেরেছে। নিজের মাথা নিজেরই দেওয়ালে ঠুকে দিতে ইচ্ছা করছে। কেনো যে বাড়াবাড়ি করতে গেলো।

রিকশায় চুপচাপ জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে নীলু। হাতে একটা তিন বাটি ওয়ালা হটপট শক্ত করে চেপে ধরে আছে। ভীষণ গরম ওটা, সদ্য ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি তাতে।
অসম্ভব সুন্দর আবহাওয়া আজকে। রোদ উঠলেও মৃদু ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। নীলু রিকশার হুড ফেলে দেয়। আজ অনেকদিন পর বুক ভরে শ্বাস নিতে ইচ্ছা করছে। অর্ধ ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখে এসে আশ্রয় খুঁজছে। নীলু সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা। এলোমেলো জীবনটা যদি গুছিয়ে নিতে পারে, এলোমেলো চুলগুলোও পারবে বোধহয়। একটু সময় লাগবে, তবে পারবে।

নীলু হটপটটা কোলের মধ্যে রেখে দুই হাতে চেপে ধরে। মেঘহীন আকাশটা আজ এতো সুন্দর লাগছে কেনো?

“আপা হাসপাতাল তো চলে এসেছে, নামেন।”
রিকশাওয়ালার ডাকে ঘোর কাটে নীলুর। আড়চোখে হাসপাতালের দিকে তাকাতেই মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। কি আশ্চর্য! এমন করছে কেনো সে? প্রেমে তো পড়েনি আবার তার সেই কিশোরী বয়সটাও নেই এসব রঙঢঙ করার। তবুও এমন আজগুবি অনুভূতির মানে কি? নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হয় নীলু। বিরক্তি নিয়েই রিকশা থেকে নামে।
নিজেই নিজেকে সাহস দেয়। সেদিন ভদ্রলোককে শাস্তি দিয়েছে। ভদ্রলোক ভেবেছে নীলু বোধহয় রাঁধতেই জানেনা। কিন্তু তাতো সত্য নয়। নীলু যথেষ্ট ভালো রাঁধুনি, এটা ভদ্রলোককে জানতে হবে। ব্যস! এখানেই কাহিনী শেষ। এরপর আর উনার মুখোমুখি হবে না নীলু।

রিসিপশনে এসে দাঁড়ায় নীলু। একটা মেয়ে সবসময় সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে।
“ম্যাডাম কাউকে খুঁজছেন আপনি?”
নীলু কিছুটা ইতস্তত করে গলা নামিয়ে বললো,”ডাক্তার রোশান আছেন?”
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিলো আপনার?”
“ইয়ে মানে…”
মেয়েটা নীলুর আপাদমস্তক একবার দেখে। মেয়েটাকে রোগী মনে হচ্ছে না। বেশ স্নিগ্ধ, সুন্দর একটা মেয়ে সাথে সুন্দর সাজ। রোগী হলে কি কেউ এভাবে সেজে আসে?

“আপনি ব্যক্তিগত ভাবে স্যারের সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন?”
নীলু উত্তর দেয়না। এই মুহুর্তে তার ইচ্ছা করছে সব ফেলে দিয়ে চলে যেতে। কেনো যে এলো!

“স্যার উনার রুমেই আছেন। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, আপনি চলে যান।”
“জি?”
মেয়েটা মুচকি হেসে টেলিফোনে কার সাথে যেনো কথা বলে। নীলু ভেবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু বেশি বেশি হয়ে গেলো না? শাড়িটা পরার কি দরকার ছিলো? নিজেকে কেমন সঙ মনে হচ্ছে তার।

“আপনি যান, স্যার একটু পর ওটিতে চলে যাবেন।”
নীলু আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে চলে যায় সেখান থেকে। বুকটা খচখচ করছে। একবার ভাবছে বাড়ি ফিরে যায়, আরেকবার যেনো কোন টানে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি তার জীবনে আসেনি কখনো।

ধাক্কা খেয়ে খানিকটা দূরে ছিটকে পড়েছে আশা। ইরার হাত দু’টো মহিবুলের হাতের মধ্যে আঁকড়ে ধরা। ইরার হাতের কাঁচি ছুটে যেয়ে আরেকপাশে পড়েছে।
ইরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে মহিবুলের দিকে। বিশ্রীভাবে হাসছে মহিবুল। ইরা নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না কোনোভাবেই।

“কি ভেবেছিস তোরা? আমি ঘুমিয়ে যাবো? চায়ের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আমাকে অজ্ঞান করে দিবি? এতো সহজ?”
আশা ধাতস্থ হয়েই ছুটে এসে ইরাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে।

“স্যার ভাবীকে ছেড়ে দিন। আপনার টার্গেট আমি, ভাবীর কোনো ক্ষতি করবেন না।”
“তোকে তো আমি পরে দেখছি। আগে তোর ভাবীকে একটু চেখে দেখি। এমন কাউকে চেখে দেখার অনেক শখ আমার।”
ইরা এক দলা থুতু ছুঁড়ে মারে মহিবুলের মুখে। মহিবুল স্তম্ভিত হয়ে যায়।

“এই জানোয়ার মুখ সামলে কথা বল। তোকে আমি শেষ করে দিবো।”
“আগে নিজে আমার হাত থেকে বাঁচ, তারপর তো…”
মহিবুল উঠে দাঁড়ায়। শার্টের হাতা দিয়ে মুখ মোছে। ইরা কামড়ে ধরেছে একবার তার হাত। মহিবুল ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়েছে।

এক পর্যায়ে ইরাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে। আচমকা মাথার পিছনে যন্ত্রণা করে ওঠে ইরার। মনে হচ্ছে মাথা কেটে গেছে পিছন থেকে দেওয়ালে লেগে। ইরা আর্তচিৎকার করে ওঠে, সাথে আশাও।

“স্যার ভাবীকে ছেড়ে দিন না।”
মহিবুল আশার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। এক ধাক্কায় মেঝেতে ফেলে দেয় তাকে। এরপর তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,”অপেক্ষা কর, তোর পালা-ও আসছে।”
এই বলে মহিবুল দরজা আটকে দেয় ভিতর থেকে। আশা কোমরে চোট পেয়েছে। ওই অবস্থাতেই উঠে দাঁড়ায় অনেক কষ্টে।

দরজা ধাক্কায় জোরে জোরে।
“স্যার ভাবীকে ছাড়ুন। দয়া করুন স্যার।”
ভিতর থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে শুধু, ইরার মুখ চেপে ধরা হয়েছে বোধহয়। তার মুখ থেকে গোঁ গোঁ শব্দ আসছে শুধু। আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।

হতবিহ্বল আশা মাথা চেপে ধরে দৌড়াতে থাকে এদিক ওদিক। কি করবে এখন সে? দরজা খুলে নিচে নেমে যাবে? রাস্তায় যাকে পাবে তাকে ডেকে আনবে। কেউ কি নেই বিপদে এগিয়ে আসার? নিশ্চয়ই আছে, নিশ্চয়ই।

আশা দরজা খুলতেই বরফের মতো জমে যায়। নড়াচড়ার শক্তি নেই। নিশ্চয়ই এটা হ্যালুসিনেশন। নাহলে এখন কীভাবে?

আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আশার দিকে।

“এই আশা, এই। কি হয়েছে তোর? এমন লাগছে কেনো তোকে?”
আশা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,”ভাইয়া….”
“কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে?”
আশা কথা বলতে পারেনা। শুধু হাত দিয়ে ঘরের দিকে ইশারা করে। আরশাদ অবাক হয়ে তাকায় সেদিকে, কিছু দেখতে পায়না।

“কি হয়েছে ঘরে?”
“ভাবী, ভাবী….”
আরশাদ আরো একপ্রস্ত অবাক হয়।
“ভাবী মানে? ইরা বাড়িতে? ওর তো এখন কলেজে থাকার কথা।”
আশা হাউমাউ করে কি যেনো বলে। কিছু বোঝা যায়না।
হঠাৎ একটা পুরুষ কণ্ঠের চাপা চিৎকার শুনে আরশাদ হতভম্ব হয়ে যায়। কিছু বুঝতে না বুঝতেই আরশাদ ছুটে যায় সেদিকে। বন্ধ দরজায় কয়েকবার জোরে জোরে ধাক্কা দেয়।

“ইরা, তুমি শুনতে পাচ্ছো? কি হয়েছে? ভিতরে কে?”
আশা আরশাদের শার্ট চেপে ধরে পিছন থেকে।

“ভাইয়া ভাবী বিপদে পড়েছে। ওকে বাঁচাতে হবে।”
আরশাদ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। জরুরি একটা ফাইল রেখে চলে যাওয়ায় অসময়েই বাড়ি ফিরেছে সে। সে জানে ইরা কলেজে। কিন্তু ইরা বাড়িতে কেনো? কি হচ্ছে এখানে?

“বসুন।”
নীলু বেশ শান্তভাবেই বসে রোশানের সামনে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসেও নীলু ঘামছে, কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে।
রোশান টিস্যু এগিয়ে দেয় তার দিকে।

নীলু ধন্যবাদ বলে, টিস্যুটা নেয়না। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে কপাল মোছে। রোশান চেয়ারে হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। হুমায়ুন আহমেদ বুঝি এরকমই কোনো পরীরূপী নারীকে দেখে ‘রূপা’ চরিত্র লিখেছিলো। রোশান সাহিত্যিক বা কবি নয়। যদি হতো নিঃসন্দেহে এই নীলাঞ্জনাকে দেখে কবিতা লিখে ফেলতো।

“তো বলুন মিস নীলু। আজ কি শাস্তি দিতে এলেন?”
নীলুর ঈষৎ রাগ হয়। চুপ করে থাকে সে।

রোশান নীলুর হাতের দিকে তাকায়। একটা কালো বেল্টের ঘড়ি হাতে, আর কিছু না।

“একমুঠো নীল চুড়ির কি সৌভাগ্য হয়নি ওই হাতে ঠাঁই পাওয়ার?”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”তার মানে?”
“মানে কিছু না। চুড়ি ছাড়া আপনার সাজটা অসম্পূর্ণ লাগছে তাই বললাম। যদিও আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সাজগোজের ব্যাপারে মেয়েরা কারো উপদেশ শুনতে পছন্দ করে না।”
নীলু হালকা হেসে বললো,”মেয়েদের ব্যাপারে ভালোই জ্ঞান আছে মনে হচ্ছে।”
“হৃদয় নিয়েই কাজ আমাদের। মেয়েদের হোক বা ছেলেদের। এটুকু না বুঝলে হয়?”
“আপনারা হৃদয়ের চার প্রকোষ্ঠ নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু সেই চার প্রকোষ্ঠে থাকা অনুভূতি নিয়ে নয়। মেয়েদের চার প্রকোষ্ঠে চার অনুভূতি থাকতে পারে। রাগ, কষ্ট, আনন্দ আর প্রেম। এটা কি জানেন?”
রোশান হাসে।
“অসাধারণ বললেন। আমি হার মানলাম।”
“আপনাকে হার মানাতে আসিনি।”
“তাহলে কেনো এসেছেন?”
নীলু কিছুক্ষণ চুপ থেকে হটপটটা টেবিলের উপর রাখে।

“কি আছে এতে?”
“খুলেই দেখবেন। আমি উঠছি।”
নীলু সত্যিই উঠে দাঁড়ায়।

“একটু বসুন।”
নীলু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,”কেনো?”
“আমার একটা ওটি আছে। শেষ করেই ফিরে আসছি। যদি আপনার সময় আর অনুমতি থাকে তবে আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।”
“আপনার কেনো মনে হলো আমি আপনার সাথে যাবো?”
রোশান মুচকি হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চেয়ারের উপরে মেলে রাখা এপ্রোনটা পরতে পরতে বললো,”অনুরোধ জানিয়ে গেলাম। চাইলে চলেও যেতে পারেন। আর চাইলে ঘন্টাখানিক অপেক্ষাও করতে পারেন। চার প্রকোষ্ঠের অনুভূতি নেহাত কম বুঝিনা, এটা বুঝিয়ে দিতে চাই।”
নীলুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রোশান বেরিয়ে যায়।
কাঠের মতো বসে থাকে নীলু। কি করা উচিৎ এখন তার? ধুর! আসাই ভুল হয়েছে।

প্রচন্ড জোরে দরজায় কয়েকবার লাথি দিতেই দরজার ছিটকিনি খুলে যায়। আরশাদ ক্রোধান্বিত হয়ে দরজায় শেষবার লাথি মারতেই দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাথে সাথেই ঘরে ঢুকে পড়ে আরশাদ, পিছন পিছন আশা।
আর ঘরে ঢুকতেই স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে যায় দুইজন।

ইরা থরথর করে কাঁপছে এক কোণায় দাঁড়িয়ে। তার কপাল চুইয়ে রক্ত পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে। হাতে একটা পিতলের ফুলদানি শক্ত করে চেপে ধরা।
মেঝেতে মহিবুল শুয়ে কাতরাচ্ছে। তার কপাল ফাটানো হয়েছে ফুলদানি দিয়ে।

আরশাদ কিছু বুঝতে পারেনা, কিছু বোঝার মতো সময়ও নেই তার। মহিবুলের শরীরের উপর দিয়েই ডিঙিয়ে ইরার কাছে পৌঁছায় আরশাদ। ইরার শরীরটা একটানে নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে।

“ইরা কি হয়েছে? এসব কি?”
ইরা এতোক্ষণে বাস্তবে ফেরে। হাত থেকে পিতলের ফুলদানিটা মেঝেতে পড়ে ঠনঠন করে শব্দ হয়। আশাও ততক্ষণে ইরার কাছে দাঁড়িয়েছে। এলোমেলো হয়ে আছে ইরা।

“ইরা দয়া করে চুপ করে থেকো না। কি হয়েছে আমাকে বলো। আশার স্যার এখানে এভাবে পড়ে আছে কেনো? কি করেছে ও তোমার সাথে?”
ইরা আচমকা আরশাদকে শক্ত করে চেপে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তার কান্নায় আরশাদের শার্ট ভিজে যায় বুকের কাছ থেকে। উষ্ণ স্পর্শে জমে যায় আরশাদ।

“ইরা….”
আশা ঘৃণায় মহিবুলকে একটা লাথি দিয়ে তার মুখে থুতু ছুড়ে মারে।

“আশা কি হয়েছে? ওর এই অবস্থা কেনো? কি করেছে ও?”
“ভাইয়া আজ আমি তোমাকে সব বলবো। আমাকে বলতেই হবে। আমি অনেক বড় একটা অন্যায় করে ফেলেছি তোমাদের না বলে।”
আরশাদ ইরাকে এক হাতে জড়িয়ে রেখেই আশার দিকে তাকায়। মহিবুল তখনও মাথা চেপে ধরে আর্তনাদ করছে।

(চলবে…..)

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ২৮

“ধন্যবাদ আপনাকে।”
“ধন্যবাদ কেনো?”
“আমি ভাবতেই পারিনি আপনি সত্যিই আমার জন্য অপেক্ষা করবেন এতোটা সময়। আমি ওটি শেষ করে ফিরে আপনাকে দেখে যথেষ্ট অবাক হয়েছি।”
নীলু অপ্রস্তুত হয়। রোশানের পাশাপাশি হাঁটতে ভালো লাগছে না তার, আবার খারাপও লাগছে না। মিশ্র অনুভূতি বলা যায়। সে যে কেনো দেড়টা ঘন্টা রোশানের জন্য অপেক্ষা করলো তা-ও বুঝতে পারছে না।

“আপনি এভাবে বেরিয়ে এলেন। ডিউটির সময় না এখন?”
“হ্যা খুব তাড়াতাড়ি ফিরবো। আপনাকে যখন বলেছি এক জায়গায় নিয়ে যাবো, কথা না রাখলে তো হবে না।”
নীলু উশখুশ করতে থাকে। রোশান কিছুটা দূরত্ব নিয়েই হাঁটছে। তবুও অস্বস্তি হচ্ছে নীলুর।

“গাড়ি নিলেন না যে, হেঁটেই যাবো আমরা?”
“আপনার হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে? তাহলে রিকশা….”
নীলু আঁৎকে উঠে বললো,”না না আপনার সাথে রিকশায় যাবো কেনো? আপনার নিজের গাড়ি আছে এজন্যই বললাম। তাছাড়া আপনার তাড়া আছে। হাঁটতে আমার অসুবিধা নেই। আপনার জন্যই…”
রোশান নিঃশব্দে হাসে।

“কথাটা তো শেষ করতেই দিলেন না। আপনার সাথে একই রিকশায় ওঠার আমার সৌভাগ্য কিংবা আপনার দুর্ভাগ্য এখনো হয়নি। আলাদা রিকশাই নিতাম। অল্পই দূরত্ব, গাড়ি নিতে ইচ্ছা করেনি। আপনি চাইলে আমি ড্রাইভারকে জানাচ্ছি।”
“দরকার নাই।”
দু’জনের মধ্যে নীরবতা। মধ্য সকাল প্রায়, দুপুর হয়নি এখনো। তবুও বেশ ভালোই তেজী রোদ উঠেছে। একটু আগের শীতল পরিবেশ আর নেই। গরম পড়েছে বেশ। নীলু রুমাল দিয়ে কপাল মোছে। খারাপ লাগার কথা বোধহয়, লাগছে না।

“চলে এসেছি।”
নীলু কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে একটা চুড়িপট্টি। একটা সরু গলি, তার দু’পাশে অগণিত চুড়ির দোকান। ছোট ছোট খুপরির মতো দোকানগুলো সারি সারি সাজানো। সেখানে শাঁখা-সিঁদুর পরা মহিলারাই দোকানী। হাসিমুখে সবাই চুড়ি বিক্রি করছে।

“এখানে…”
“আসুন ভিতরে। আরো অনেক দোকান আছে।”
নীলু ইতস্তত করেই রোশানের সাথে গলির মধ্যে ঢোকে।

সরু, ঘিঞ্জি গলি হলেও নোংরা না মোটেই। নীলু এর আগে কখনো এখানে আসেনি। দুইপাশে থরে থরে চুড়ি সাজানো। কাঁচের, কুন্দনের, কাপড়ের উপর কড়ি কাজের সব ধরণের চুড়ির মেলা বসেছে যেনো। নীলুর হঠাৎ ভীষণ ভালো লাগে। চুড়ি এমনই এক জিনিস, বাচ্চা থেকে বৃদ্ধা সব বাঙালি নারীরই আবেগের নাম। নীলুর ইচ্ছা করে মুঠো মুঠো চুড়ি নিয়ে যেতে এখান থেকে।

রোশান হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায়, নীলু তার পিছে। হঠাৎই একটা মাঝারি ধরণের দোকানের সামনে এসে রোশান দাঁড়ায়।
দোকানী এক মধ্যবয়সী হিন্দু নারী। কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে পান চিবুচ্ছে দোকানের মাঝে বসে।

“প্রভাতীদি চলছে কেমন দিনকাল?”
প্রভাতী নামক মহিলাটি যারপরনাই অবাক রোশানকে দেখে। দুইবার চোখ কচলে নিশ্চিত হয় সে ভুল দেখছে কিনা।

“ডাক্তার দাদা আপনি? আপনি এসেছেন?”
“হ্যা এলাম তো। তো আছো কেমন? বেচাকেনা চলছে ভালো?”
প্রভাতী খুশিতে কি কি যে বলে বোঝা যায়না। কথার তুবড়ি ছোটে যেনো। পানের পিক যত্রতত্র ছড়িয়ে যায় কথার দমকে।

নীলু বেশ ভালোই অবাক। এরকম একটা জায়গায়, এমন একজন মহিলার সাথে রোশানের এতো খাতির? কীভাবে সম্ভব?

“বাকি কথা পরে। আগে বলেন কি খাবেন। একটু লুচি-ঘুগনি এনে দিই ডাক্তার দাদা?”
“না না আজ খেতে আসিনি। অন্য কোনোদিন হবে ওসব।”
“তা বললে হয় কি করে? অন্তত একটু চা বিশকুট তো খান।”
“আজ অনেক তাড়া আছে প্রভাতীদি। অন্য একদিন এসে জম্পেশ খাওয়াদাওয়া করবো। তোমার ছেলেটাকেও দেখিনা অনেকদিন। ভালো আছে সে? আর তোমার স্বামী?”
“সবাই ভালো ডাক্তার দাদা….”
প্রভাতী কথা বলতে বলতে নীলুর দিকে তাকাতেই থেমে যায়। এতোক্ষণে খেয়ালই করেনি রোশানের সাথে পরীর মতো সুন্দর একটা মেয়ে এসেছে।
প্রভাতী চোখ বড় বড় করে নীলুর দিকে একবার, রোশানের দিকে একবার তাকায়। রোশান তুলনামূলক শান্ত, নীলুর অস্বস্তি বাড়ে।

প্রভাতী গলা নামিয়ে আস্তে আস্তে বললো,”ও কে ডাক্তার দাদা? প্রতিমার মতো মুখখানা যে। সাক্ষাৎ মা লক্ষী যেনো….”
রোশান স্মিত হেসে বললো,”তুমি যা ভাবছো তা নয়। এক কাজ করো, উনাকে দোকানের সবচেয়ে সুন্দর চুড়িগুলো দেখাও। উনি যতোগুলো হাত দিয়ে ধরবেন ততগুলোই উনার। আমি একটা জরুরি কল করেই আসছি।”
প্রভাতী মুখ টিপে হাসে। ডাক্তার দাদা যা-ই বলুক, যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে তার।

“যদি দোকানের সব চুড়িতে উনি হাত দেন?”
রোশান ফিরতি হাসি দিয়ে বললো,”তাহলে দোকানের সব চুড়িই উনার।”
রোশান কিছুটা এগিয়ে যায় মোবাইল হাতে।
নীলু কাঠের মতো সটান দাঁড়িয়ে থাকে।

“ও দিদি তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? কি বলে গেলেন ডাক্তার দাদা শুনলে না? দেখো তো তোমার হাতের যোগ্য কোনো চুড়ি আছে কিনা আমার দোকানে।”
নীলু জোর করে হেসে বললো,”লাগবে না, লাগবে না।”
প্রভাতী নীলুর হাত ধরে টেনে কাছে আনে। একের পর এক চুড়ি এগিয়ে দেয় নীলুর দিকে। অস্থির লাগে নীলুর। ভীষণ পানি পিপাসা পায় হঠাৎ।

“আমাদের ডাক্তার দাদার মতো ভালো মানুষ এই শহরে দু’টো পাওয়া যাবে না।”
নীলু বাঁকা ঠোঁটে হেসে বললো,”তাই নাকি?”
“তাই না মানে? আমার ছেলেটার বুকে, ওইযে হার্টে ফুটা ধরা পড়লো। লাখ লাখ টাকা লাগবে অপারেশনের জন্য। আমি এতো টাকা পাবো কই? ছেলের বাবা তিন বছর ধরে বিছানায় পড়া অসুস্থ হয়ে। ওই সময় ডাক্তার দাদা যদি সাহায্য না করতো। আজ আমার কোল শূন্য হয়ে থাকতো। আমার গোপালটা বোধহয় আর বাঁচতো না।”
প্রভাতী চোখে আঁচল চাপা দেয়। নীলু থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

“কাঁদছেন কেনো? একি!”
“শুধু আমার জন্য না। এরকম আরো অনেকের জন্যই করেন উনি। আমাদের কাছে উনি দেবতা গো মেয়ে, দেবতা।”
নীলু জানেনা এরকম পরিস্থিতিতে কি বলতে হয়। সে অন্যমনস্ক হয়ে কিছু নীল চুড়ি হাতে নাড়াচাড়া করতে থাকে। প্লাস্টিকের চুড়ির উপর, নীল সুতো আর কাপড় পেঁচানো। তার উপর চুমকি আর কড়ির কাজ। কি যে সুন্দর। দূর থেকে তো চুমকিগুলোকে পান্না মনে হচ্ছিলো, এতোটাই চিকচিক করছে।
প্রভাতী নীলুর হাতে চুড়িগুলো পরিয়ে দেয়। নীলু হাত সরিয়ে নিতে যেয়েও পারেনা। প্রভাতী যেনো পণ করেছে আজ দোকান সহ চুড়ি এই মেয়েকে দিয়ে দিবে সে।

“কি করছেন? আমি এতো চুড়ি নিবো না তো। আজ এতো টাকা নিয়ে আসিনি। অন্য একদিন আসবো আবার।”
“চুপ করো তো মেয়ে। টাকা কে চেয়েছে তোমার কাছে? এগুলো আমার পক্ষ থেকে উপহার তোমার জন্য।”
নীলু ঢোক চেপে বললো,”উপহার মানে? কিসের উপহার?”
“ও কিছু না, নাও তো তুমি। তোমার নাম কি মেয়ে?”
“নীলাঞ্জনা।”
“কি মিষ্টি নাম গো। তুমিও যেমন নামটাও তেমন।”
কথার মধ্যেই রোশান ফিরে আসে। একদৃষ্টিতে নীলুর হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। প্রভাতী মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসে। এতোদিন পর তার ডাক্তার দাদার মন ফিরলো কোনো মেয়ের প্রতি। ভাবতেই কি যে আনন্দ হচ্ছে তার!

“আমি নিতে চাইনি। উনি জোর করে আমার হাতে…”
রোশান ছোট্ট করে হেসে মানিব্যাগ বের করে পকেট থেকে।

“প্রভাতীদি, এরকম চুড়ি সব রঙের দাও। আর কাঁচের চুড়িও দাও সব রঙের দুই বাক্স। সাথে কুন্দনের গুলোও দিয়ে দাও।”
নীলু প্রতিবাদ জানায় সাথে সাথে।

“রোশান সাহেব এগুলো কিন্তু যথেষ্ট বাড়াবাড়ি লাগছে। এরকম জানলে আমি কিন্তু কখনোই আসতাম না।”
রোশান শান্ত চোখে নীলুর দিকে তাকায়। ঘেমে চুলগুলো কপালে, গলায় লেপ্টে গেছে নীলুর। তাকে এই মুহুর্তে সদ্য দীঘিতে স্নান নেওয়া কোনো স্নিগ্ধ গুল্পলতার মতো লাগছে।

“যতোটুকু মায়া দিয়ে আপনি এতো সকালে রান্না করে, হটপট ভর্তি করে আমার জন্য খাবার এনেছেন। তার কয়েক ভাগের মাত্র এক ভাগ মায়া ফিরিয়ে দিচ্ছি। মায়ার বদলে যদি আর কিছু ফেরানো যেতো তাই দিতাম বিশ্বাস করুন। আফসোস তা যায়না।”
নীলু হকচকিয়ে যায় রোশানের কথা শুনে। রোশান প্রভাতীকে টাকা দিয়ে চুড়ির বাক্সগুলো নিজের হাতে নেয়।
ঠিক এই মুহুর্তে হঠাৎ নীলুর কেনো যেনো ভীষণ কান্না পায়, ভীষণ। নিজেকে সামলাতে যেনো খেই হারায়। জীবনের এই পরিস্থিতিতে এসে তার কি করা উচিৎ বুঝতে পারেনা। ইশ! যদি তার মা বেঁচে থাকতো……

সন্ধ্যা মিলিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। সোফায় মায়ের বুকে মাথা রেখে ফোঁপাচ্ছে আশা। রাবেয়া হতভম্ব হয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। তার ফুলের মতো কোমল মেয়েটা এতোদিন এতো বড় একটা ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো আর মা হয়ে সে কিচ্ছু বুঝতে পারেনি? মা হিসেবে সে এতোটাই ব্যর্থ যে তার মেয়ে মায়ের কাছ থেকে পুরোটা গোপন করে, কিছু মাসের পরিচিত একটা মেয়েকে সব বললো? বিয়ের আগে থেকেই একটা স্কুলের শিক্ষিকা ছিলো সে। কিন্তু আরশাদের জন্মের পর নিজের ইচ্ছাতেই চাকরি ছেড়ে দেয় সে। রাশেদুলকে বলেছিলো সে পুরোপুরিভাবে একজন মা হতে চায় শুধু। সন্তান বাদে আর কোনো কিছুতে সে সময় দিবে না।
তার কিঞ্চিৎ অহংকারও ছিলো এ নিয়ে। সে শুধু আরশাদ আর আশারই নয়, নীলুরও মা হয়ে উঠেছে।
আরশাদ তাকে না জানিয়ে বিয়ে করার পর তার অহংকার অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। বাকি অর্ধেক শেষ হলো আজ। মা হিসেবে সে কি তবে ষোলো আনাই ব্যর্থ?

এক কোণায় দাঁড়িয়ে আঁচলে আঙ্গুল পেঁচাচ্ছে ইরা। তার কপালে ব্যান্ডেজ। তার ঘরে শুয়ে বিশ্রাম করার কথা। কিন্তু সে ছটফট করছে। আরশাদ বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছে না। বদমাশটাকে নিয়ে থানায় গেছে আরশাদ আর তার বাবা। কিন্তু যাওয়ার আগে যে কাণ্ড আরশাদ ঘটালো রাগের মাথায়। পুলিশের ঝামেলা না হয় আবার!
এদিকে সবাই তাকে ভুল না বোঝে আবার, সে চিন্তা তো আছেই। মুখ ভোঁতা করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
সকালের কথা মনে পড়তেই শিউরে উঠছে বারবার। দুঃস্বপ্নের মতো একটা দিন গেলো। কি হতে পারতো আরেকটু হলে? ঘৃণায় শরীর রি রি করে ওঠে তার। নরপিশাচটা তার শরীরে হাত দিয়েছে, যদিও কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তবুও ইরার ঘৃণা করছে। মনে হচ্ছে গ্যালন গ্যালন পানি দিয়ে গোসল করলেও শয়তানটার স্পর্শ লেগে থাকবে।

“মা, ভাইয়া আর বাবা এখনো এলো না কেনো? কি হচ্ছে ওখানে? আমাকে কেনো নিয়ে গেলো না ওরা? যা হওয়ার তাতো আমার সাথে হয়েছে। আমি সবটা বলতে চাই।”
রাবেয়ার মেয়ের উপর রাগ হয়। কিন্তু প্রকাশ করেনা। সব সময় সবকিছুর জন্য নয়।

“তোকে ওরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায়না। প্রয়োজন হলে তোকে ডাকবে।”
“কিন্তু এখনো ওরা আসছে না কেনো?”
“জানিনা।”
রাবেয়া বাঁকা চোখে ইরার দিকে তাকায়। শান্ত চোখের ক্ষীপ্র মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ভাবে, কি আছে মেয়েটার মধ্যে? বারুদ? একদিকে কোমলতা, যা তার ইস্পাতের মতো কঠিন হৃদয়ের ছেলেটাকে প্রেমে ফেলেছে। অন্যদিকে বন্য সাহস। এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া তো কম কথা নয়। মেয়েটাকে চিনতে এখনো অনেকটাই বাকি।

প্রায় আধা ঘন্টা পর আরশাদ আর রাশেদুল বাড়ি ফেরে। আরশাদের চোখমুখ টকটকে লাল। বাড়ি ঢুকেই আর দাঁড়ায় না, কারো সাথে কথাও বলেনা। ইরাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। ইরা যেনো অদৃশ্য, তাকে দেখতেই পায়নি। ইরা মুখ বাঁকায়।

রাশেদুল ফিরেই ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। এক ধাক্কায় যেনো তার বয়স বেড়ে গেছে কয়েক বছর। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে টপটপ করে। আশা মাথা নিচু বসে বাবার সামনে। মাথা তোলার সাহস পায়না।
রাবেয়া কিছুক্ষণ পর নিজেই উঠে আসে, বসে স্বামীর পাশে।

“ঠান্ডা পানি খাবে?”
“দরকার নেই।”
রাবেয়া শীতল গলায় বললো,”তোমাদের এতো দেরি হলো? সব ঠিক আছে তো?”
রাশেদুল চোখ থেকে চশমা খুলে শান্ত গলায় বললো,”সব ঠিক থাকার মতো ছেলেমেয়ে হয়েছে আমার? সর্বপ্রথম ভুলটা করেছে আমার মেয়ে নিজেই। এই কথা প্রথমেই বাড়িতে বলে দিলে অসভ্যটাকে সেদিনই পুলিশে দিয়ে জেলের ভাত খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু ও তা করেনি। বোকার মতো সবটা নিজের মধ্যে রেখে দিয়েছে। আমাদের কাউকে না জানিয়ে ইরাকে জানিয়েছে। পরবর্তী ভুলটা করেছে ইরা। আমি অন্তত ওকে বুদ্ধিমতী মনে করেছিলাম।”
ইরার বুকটা কেমন করে ওঠে। কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। রাশেদুলকে এতোটা রেগে যেতে দেখেনি সে কখনো।

আশা মুখ খোলে এতোক্ষণে। বাবার দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে,”বাবা আমি ভাবীকে নিষেধ করেছিলাম৷ ভাবী আমাকে কথা দিয়েছিলো সে কাউকে বলবে না। ওর কোনো দোষ নেই।”
রাশেদুল ঠান্ডা দৃষ্টিতে আশার দিকে তাকাতেই আশা মাথা নিচু করে ফেলে আবার।

“তুমি কোনো কথাই বলবে না আমার সাথে। বুঝেছো?”
আশা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়।

“আর সর্বশেষ ভুল করেছে আমার একমাত্র ছেলে। যাকে নিয়ে কিনা আমি গর্ব করি। আমার ছেলে কোটিতে একটা। যার রাগ এতোটাই বেশি যে রাগের উপর অলিম্পিকে পুরষ্কার দেওয়ার নিয়ম থাকলে সে দেশের হয়ে স্বর্ণপদক নিয়ে আসতো।”
রাবেয়া রাশেদুলকে নিজে থেকেই রাগ কমার সময় দেয়। সে তো জানে ছেলে এই রাগ কোথা থেকে বা কার কাছ থেকে পেয়েছে!

“কি করলো তোমার ছেলে? পা দিয়ে মাড়িয়ে বদমাশটার অণ্ডকোষ থেঁৎলে দিলো? তেলাপোকা পেয়েছে তোমার ছেলে ওকে?”
রাবেয়া একটা লম্বা শ্বাস ফেলে।

“এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়েছে?”
“হয়নি মানে? যতো বড় অপরাধীই হোক না কেনো আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার তো কারো নেই। আমি কি পার‍তাম না আমার মেয়ের এতো বড় ক্ষতি করতে চাওয়া শয়তানটাকে জানে মেরে ফেলতে? এটুকু ক্ষমতা কি আমার নেই?”
রাশেদুলের চিৎকার শুনে কেঁপে ওঠে আশা। ইরা নখ খুঁটতে থাকে। কেনো যেনো ভীষণ হাসি পাচ্ছে তার। তেলাপোকার কথাটা শোনার পর থেকে বারবার চোখে ভাসছে মহিবুলরূপী তেলাপোকাটাকে। অনেক কষ্টে হাসি থামায় সে।

রাশেদুল কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে হেঁটে ইরার সামনে দাঁড়ায়। ইরার বুকটা ধকধক করে ওঠে।

“ইরা এদিকে তাকাও। ঠিক আমার চোখের দিকে।”
ইরা ইতস্তত করতে থাকে। গলা শুকিয়ে আসে তার।

“তাকাও মা। নিচে তাকিয়ে থাকা কোনো সমাধান নয়।”
ইরা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে রাশেদুলের দিকে তাকায়। ছেলের মতো তার বাবার চোখও ঈষৎ লাল।

“তুমি যে কাজটা করেছো তোমাকে প্রশংসা করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত করতে পারছি না। সাহস ভালো তবে মাঝে মাঝে দুঃসাহস বিপদের কারণ হতে পারে। আমি তোমার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। আমার মেয়েটাই তোমাকে জানাতে নিষেধ করেছিলো। তোমার কাছে নিজেদের ছোট বলেও মনে হচ্ছে। আমরা বাড়ির লোক এতোদিনেও যা বুঝতে পারিনি, তুমি মাত্র কয়েকদিনেই তা বুঝতে পেরেছো। নিঃসন্দেহে তুমি বুদ্ধিমতী। তবে বুদ্ধিটা কখন কীভাবে কাজে লাগাতে হবে এটা না জানলে বুদ্ধির কোনো মূল্য থাকে না। আজ ভয়াবহ কিছু ঘটে যেতে পারতো। ঘটেনি, কারণ তুমি বুদ্ধির সাথে সামলে নিয়েছো। কিন্তু যদি না পারতে?”
ইরা মুচকি হেসে দৃঢ় গলায় বললো,”আমি দূর্বল হতে শিখিনি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি আমি। আশার মতো আমাকে কেউ আগলে রাখেনি। ওটুকু বয়স থেকেই আমি জানি, আমার আমি বাদে আর কেউ নেই এই দুনিয়ায়। আমি নিজেকে রক্ষা করতে জানি। তবে আমি মানছি আমি যা করেছি তা ভুল। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।”
রাশেদুল আরো অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু এই মুহুর্তে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার মায়া হয়। মাথাটা খুব বাজেভাবে কেটে গেছে। যদি আরো বড় কোনো বিপদ হতো?

রাশেদুল ইরার মাথায় আলতো করে হাত রাখে। ইরা সুন্দর করে হেসে তাকায় রাশেদুলের দিকে। কি আছে এই হাসিতে? সাহসের অহংকার? নাকি নেহাতই নারীসুলভ কোমলতা?

“ডাক্তার যেভাবে ওষুধ খেতে বলেছে ওভাবেই খাবে। অনিয়ম করবে না। মাথায় যেনো চাপ না পড়ে। কেমন?”
ইরা মিষ্টি করে হেসে মাথা কাৎ করে।

“যাও এবার ঘরে যাও। সব ভয় কেটে গেছে এখন।”
ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়ায়।

ইরা কফি হাতে বারান্দায় এসে দেখে ধোঁয়ায় ভরে গেছে যেনো। আরশাদ তখন থেকে কয়টা সিগারেট ধরিয়েছে তার হিসাব নেই তার নিজের কাছেও। ইরার সাথে তখন থেকে একটা কথাও বলেনি সে।

“আপনার কফি।”
ইরা ভেবেছিলো আরশাদ কফি নিবে না।
কিন্তু সে খুব স্বাভাবিকভাবেই আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে কফির মগ হাতে নেয়। দু’টো ছোট চুমুক দিয়ে ইরার দিকে তাকায়। ইরা ব্যান্ডেজের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে চুলকানোর চেষ্টা করছে।

“কি হচ্ছে এটা?”
ইরা তৎক্ষনাৎ আঙ্গুল সরিয়ে নিয়ে বললো,”চুলকাচ্ছে।”
“তোমার আর কোথাও চুলকায় না?”
ইরা ঝট করে আরশাদের দিকে তাকায়। কিন্তু আরশাদ যেনো কিছুই বলেনি এমন ভাব করে কফি খেতে থাকে বাইরের দিকে তাকিয়ে।

“আপনাকে একটা কথা বলার ছিলো।”
“বলো শুনছি।”
ইরা চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বললো,”আমি জানি আপনি আমার উপর রাগ করেছেন৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনাকে রাগানোর কোনো ইচ্ছা ছিলো না আমার। ওই মুহুর্তে আমি আর কিছু ভাবতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে ভুল হয়ে গেছে। অন্তত আপনাকে সবটা জানানো উচিত ছিলো৷ আমি আসলে….”
হঠাৎ ইরার কোমরে টান পড়তেই ইরা সচকিত হয়ে যায়। চোখ খুলতেই দেখে আরশাদ তার কোমর জড়িয়ে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে টেনে এনেছে। ইরা চোখ বড় বড় করে তাকায় তার দিকে।

“যুদ্ধ আর প্রেম একত্রে সম্ভব নয়। প্রেম যে ঘাতককেও ক্ষমা করতে চায়। সেখানে এই অসামান্য মানবীটি তো আমার হৃদয়ের মালকিন।”
ইরার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। আরশাদ এরকম সময়ে এমন ব্যবহার করবে ইরা ভাবতে পারেনি। কেমন যেনো গোলমেলে লাগে তার।

“কি বলছেন কি?”
আরশাদ ইরার চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয়। ইরার এই মুহুর্তে নিজেকে ভেঙেচুরে আরশাদের কাছে ধরা দিতে ইচ্ছা করছে। আরশাদের নেশাক্ত দৃষ্টি তার বুকের বাম পাশের নিচটায় ঝড় তুলছে।

“রাগ করিনি, ভয় পেয়েছিলাম। স্ত্রীকে ওই অবস্থায় দেখাটা একজন পুরুষের জন্য কতোটা যন্ত্রণার একজন নারী বোধহয় কোনোদিন জানতে পারবে না।”
“আমি নিজেও প্রথমে ভয় পাচ্ছিলাম। পরক্ষণেই ভাবলাম আমি ভয় পেলেই ও আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ভয়টাই আমার দূর্বলতা। এরপর নিজেকে সাহস দিলাম। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিলাম ওকে। ও মাটিতে পড়ে গেলো। ওর ক্ষিপ্রতা বাড়ে। আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমার আর কিছু ভাবার অবকাশ ছিলো না। পাশে থাকা পিতলের ফুলদানিটা তুলে নিলাম হাতে।”
আরশাদ মুচকি হাসে ইরার দিকে তাকিয়ে।

“হাসছেন কেনো?”
“তোমাকে বিয়ে করার পর থেকে একটা জিনিসই শুধু ভাবছিলাম। আমাদের এই আকস্মিক দেখা হওয়া, বিয়ে হওয়া সবটাই কি কাকতালীয়? নাকি পূর্বপরিকল্পিত? আজ বুঝলাম সবটা কাকতালীয় নয়। তোমার এই বন্য সাহসটা দেখে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। আমার স্ত্রী হওয়ার জন্য এটুকু যোগ্যতা থাকাই যথেষ্ট।”
ইরাও মৃদু হাসে।

“দেখুন উত্তরী বাতাস ছেড়েছে। ঈষাণ কোণে সাদা মেঘ। বোধহয় বৃষ্টি হবে। আপনার তো বৃষ্টি খুব পছন্দ তাইনা?”
“কেনো তোমার পছন্দ না?”
ইরা বাইরের দিকে তাকিয়ে বললো,”আজকাল মেঘ খুব পছন্দ আমার।”
“মেঘ আবার কারো পছন্দ হয়?”
“কারণ মেঘ থেকে যে আপনার পছন্দের বৃষ্টি নামে।”
আরশাদ বারান্দার গ্রিলে হেলান দিয়ে ইরার দিকে তাকায়।

“তোমার এই গুছিয়ে কথা বলার ধরণটা আমার খুব পরিচিত মনে হয়। মনে হয় আগেও কোথাও যেনো শুনেছি। কিন্তু মনে করতে পারিনা।”
ইরা চমকে ওঠে। আরশাদ কি ভ্রমরের সাথে মেলাচ্ছে তাকে?

“ওইযে বললেন আমাদের পরিচয় পূর্বনির্ধারিত।”
আরশাদ ইরার কপালের ব্যান্ডেজে আলতো করে হাত বুলিয়ে খোলা গলায় বললো,”কি ভেবেছো রাই? তোমার বিরহে পুড়ে হবো ছাই?
আগুন তো মাটিকে শক্ত করে।
অতএব সাবধান।
তুমি যাকে পোড়াচ্ছো-
সে মাটির তৈরি আদম সন্তান।”

আরশাদ থামলেও তার গমগমে কণ্ঠ আলোড়িত হতে থাকে চারপাশে। ইরার প্রেমমিশ্রিত দৃষ্টি জড়িয়ে যায় আরশাদের আফিম নেশার দৃষ্টির সাথে।

“আমি তো আপনাকে পোড়াচ্ছি না। আপনাকে পোড়ানোর আগে আমি নিজে পুড়ে অঙ্গার হতে চাই।”
আরশাদ ইরার হাত দু’টো মুঠোর মধ্যে নিয়ে ঘ্রাণ নেয়। নাম না জানা কোনো এক ফুলের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ পায় আরশাদ।

“এ হাতে কোমলতা মানায়। তোমার সাহসকে আমি উৎসাহ দিচ্ছি কিন্তু পরবর্তীতে যে কোনো পদক্ষেপে আমাকে আগে জানাবে। বিয়ে একটি পবিত্র বন্ধন। আর এই বন্ধনের পর প্রতিটা পুরুষ তার সঙ্গীর দুনিয়ার বুকের রক্ষাকবচ। এটা মহান সৃষ্টিকর্তারই বিধান। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না। আমার কাছে তোমার বিকল্প আর নেই।”
ইরা আচমকা আরশাদের বুকে মাথা রাখে। চোখ বন্ধ করে জোরে চেপে ধরে আরশাদকে।

“আপনি আমার, পুরোটাই আমার। একবিন্দু ভাগ কাউকে দিবো না আমি।”
“কেউ কি চেয়েছে?”
“চাইলেও দিবো না।”

বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামে। এই আবহাওয়াটা কেমন অদ্ভুত। এই দুর্বিষহ গরম তো এই আবার শীতল প্রশান্তির বারি ধারা। মনটা কেমন কেমন করে এই আবহাওয়া, মন কেমনের মরশুম চলছে যেনো। এই মরশুমে কুসুম কুসুম প্রেম জমে প্রতিটা প্রেমিক হৃদয়ে। প্রকৃতির তেমনই ইচ্ছে।

“আপনার কফি তো ঠান্ডা হয়ে গেলো। আমি আবার বানিয়ে এনে দিচ্ছি।”
ইরা আরশাদকে ছেড়ে চলে যেতে পা বাড়াতেই আরশাদ তাকে আবারও টেনে কাছে নিয়ে আসে। এবার একবারে দুই হাতে পাঁজকোলা করে শূন্যে উঠিয়ে নেয়।

“এ কি করছেন?”
“আমার ভালোবাসা খেয়ে ওজন কতোটুকু বাড়লো পরীক্ষা করছি।”
লজ্জায় ইরার মুখ লাল হয়ে ওঠে।

“কিন্তু আপনার কফিটা যে ঠান্ডা….”
“অসুবিধা নেই, ক্যাফেইনটা গরম আছে। আপাতত এতেই নেশা চলবে।”
“মানে কি?”
“মানে? বলছি, আরেকটু ওজন বাড়িয়ে দিই। তারপর…..”

(চলবে…..)