#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১১
⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
রাত তখন গভীর।কোলাহল থিতিয়ে এসেছে বহুসময়। বেলকনির গ্রিল ধরে চুপচাপ বসে আছে দিয়া। তার দু’চোখ স্থির এক ধ্যানমগ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে দূর আকাশের দিকে। হয়তো কোনো গভীর ভাবনা তার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে! যা তাকে এই নিস্তব্ধ রাতেও ঘুমোতে দেয়নি। খোলা চুলগুলো দখিনা বাতাসের নরম ছোঁয়ায় উড়ে যাচ্ছে, কখনও কপালে এসে পড়ছে, কখনও বা কাঁধের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে পিঠের দিকে।
চুলেদের দখিনা বাতাসে খেলা করা আর দূর আকাশের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকা সব মিলিয়ে দিয়া যেন এই মুহূর্তে এক রহস্যময় এবং একাকী প্রতিমূর্তি। ও নীরব কিন্তু ওর এই নীরবতাই যেন হাজারও অব্যক্ত কথা বলছে।
হঠাৎই নির্ণয়ের ঘুম ছুটে গেলো, পাশে হাত বাড়াতেই অনুভব করলো দিয়া পাশে নেই, তড়িঘড়ি করে উঠে লাইট জ্বালিয়ে চোখ বুলালো সারা ঘরে দিয়া নেই। হঠাৎই নির্ণয়ের খেয়াল এলো মেয়েটা তখন উঠে বেলকনিতে গিয়েছিল এখনো আসেনি? একবার দৃষ্টি ঘোরালো দেয়াল ঘড়িটাই- রাত দুটো এখনো বেলকনিতে কি করছে মেয়েটা? বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো দিয়ার পেছনে গুরু গম্ভীর গলায় বললো–
—“এই মেয়ে এতো রাতে এখানে কী? কয়টা বাজে খেয়াল আছে?
দিয়া একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নির্ণয়ের দিকে, ফের দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো আকাশের দিকে নির্ণয়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো-
—“নদী কেনো ফিরে এলো এতদিন পর? আপনি কি জানেন? নাকি আপনিই তাকে ফিরিয়ে এনেছেন?
নির্ণয়ের ভাবভঙ্গি অতি স্বাভাবিক, সে পকেট হাতড়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটে ধরলো। কোনো ভনিতা ছাড়াই বলে উঠলো-
—“তা তোমার কেনো মনে হচ্ছে আমিই নদী কে ফিরিয়ে এনেছি?
বলতে বলতেই নির্ণয় আলুথালু হয়ে বসে থাকা দিয়ার পাশে আসতে করে বসে পড়লো। দিয়া ফিরেও তাকালো না সেদিকে। দৃষ্টি দূর আকাশে নিবদ্ধ রেখেই বললো-
—“জানিনা তবে মনে হচ্ছে তাই বললাম” সত্যিই আপনি জানেন না ও কেনো ফিরে এসেছে?”
—“জানলেই কী তোমাকে বলতে হবে?”
—“হেঁয়ালি করছেন?”
—“করলে করছি” ওদিকে তাকিয়ে কী দেখছো? আমার দিকে তাকাও।”
নির্ণয়ের কথায় গুরুত্ব দিলো না দিয়া আগের ন্যায় বলে উঠলো-
—“না আপনি আমাকে পছন্দ করেন- না আমি আপনাকে পছন্দ করি! তাহলে আমাদের এভাবে এক সাথে থাকার মানে কি? চলেন ডিভোর্স নিয়ে নেই”
নির্ণয় ঠোঁট এলিয়ে হাঁসলো। দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে নাকচ করে বললো-
—“প্রশ্নই উঠে না” তোমাকে মরার আগ পর্যন্ত আমার সাথেই থাকতে হবে”
দিয়া এবার নির্ণয়ের দিকে ঘুরে বসলো, চোখে চোখ রেখে বললো-
—“কেনো? ভালোবাসেন আমায়?”
—“উঁহু’ ওসব ভালোবাসা টালোবাসা আমার ধারা হবে না”
—“তাহলে ডিভোর্স দিতে সমস্যা কোথায়?”
—“ম্যালা সমস্যা, ওসব তোমার জেনে কাজ নেই” চলো ঘুমাবে অনেক রাত হয়েছে!”
—“আপনি ঘুমান গিয়ে আমার ঘুম পাচ্ছে নাহ”
—“কেনো? তোমার ঘুম আবার কে হারাম করলো?”
দিয়া জবাব দিলো না। ফের আকাশের দিকে মুখ করে বসলো। নির্ণয় বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বললো-
—“তুমি কি নিজের ইচ্ছায় যাবে? নাকি আমি কোলে তুলে নিয়ে যাবো?”
দিয়া তড়িঘড়ি করে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরে যেতে যেতে বললো-
—“আল্লাহ আমার দুটো পা-দিয়েছে আমি সেগুলো দিয়ে হেঁটে হেঁটেই যেতে পারি। আমায় কাউকে কোলে তুলে নিয়ে যেতে হবে না।”
নির্ণয় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে দিয়ার পেছনে পেছনে গেলো। দিয়া পায়ের কাছ থেকে কাঁথা টেনে গাঁয়ে জরিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। নির্ণয় ও আর কথা বাড়ালো না চুপচাপ শুয়ে পড়লো দিয়ার পাশে।”
___________________
পূর্ব আকাশে সোনারঙ ছড়িয়ে সূর্য সবে উঠেছে। স্নিগ্ধ শীতলতা কেটে গিয়ে প্রকৃতিতে নেমে এসেছে এক সতেজ উষ্ণতা। পাখির কিচিরমিচির আর দূরবর্তী মোরগের ডাকে ঘুম ভেঙেছে গ্রামের। চারিদিকে ব্যস্ততা শুরু। কৃষকেরা কাঁধে লাঙল নিয়ে হেঁটে চলেছে মাঠের দিকে। কলসি কাঁখে নারীরা চলেছে নদীর ঘাটে। মাটির উনুন থেকে সদ্য রান্না শুরুর ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে মিশছে ভোরের বাতাসে। চারদিকে সবুজ আর নির্মল আনন্দ। দিন শুরুর এই কোলাহলটুকু বড়োই মধুর।
সকাল তখন বেশ কিছুটা এগিয়েছে। গ্রামের পুকুর পাড়ের শ্যাওলা পড়া ভিজে মাটিতে আনমনে বসে আছে নদী। তার চোখে এখনো এক গভীর অবসাদ, যদিও মুখমণ্ডলে রয়েছে মুক্তির ছাপ। নদী কাল রাতেই হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। ডক্টররা যদিও প্রথমে তাকে এতো তাড়াতাড়ি ছাড়তে চাননি, তবে নদীর জোরাজুরিতে শেষমেশ তারা তাকে ছুটি দিতে বাধ্য হন।
রুহানি বেগম মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে পুকুর পাড়ে এসে দেখলেন নদী মনমরা হয়ে বসে আছে। তিনি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলেন মেয়ের পাশে! মেয়েটা যে তার খুব শখের তাই তো এতো কিছু হওয়ার পরেও, চাইলেও মেয়েকে ঘৃণা করতে পারছেন না। তিনি যে মা”
—“এখানে কি করছো?”
নদীর কথায় রুহানি বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় শুধালেন-
—“তুই এখানে কি করছিস? ঘুম থেকে এতো সকাল সকাল উঠেছিস যে?”
নদী মৃদু হেঁসে বললো-
—“ঘুম ভেঙ্গে গেছে তাই ভাবলাম একটু এখানে বসে সকাল টা উপভোগ করি”
রুহানি বেগম মেয়ের কথায় হালকা হাসলেন। বললেন-
—“চল’ বাড়ি চল এখানে বসে থাকতে দেখলে তোর বাপে আবার রাগ করবে।”
নদী ভাবলেশহীন গলায় বললো-
—“তুমি যাও আমি আসছি”
রুহানি বেগম উঠে দাঁড়ালেন চলে যেতে নিয়েও কি ভেবে যেন থমকে দাঁড়ালেন। নদীর উদ্দেশ্যে বললেন-
—“যা হয়েছে সব ভুলে যাহ! আর নির্ণয়ের পিছু ছুটিস নাহ, ভুলে যাস না ও কিন্তু এখন তোর ছোট বোনের হাসবেন্ড।”
নদী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মায়ের দিকে। রুহানি বেগম ফের বললেন-
—“এমন কিছু করিস না যেটাতে তোর বোন কষ্ট পায়”
নদী কেমন করে যেন হাঁসলো! তবে কোনো প্রতিউত্তর করলো না। রুহানি বেগম চলে গেলেন বাড়ির দিকে। নদী ফের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পুকুরের ঘোলাটে পানির দিকে। বিড়বিড় করে বললো-
—“আমার জীবনটাও ঠিক যেন এই পুকুরের ঘোলাটে পানির মতো। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবটাই অস্বচ্ছ এবং ঘোলাটে। এই ঘোলা পানি কিছুতেই স্বচ্ছ হতে চায় না, কারণ জীবনের গভীরে জমে থাকা হতাশা আর অব্যক্ত দুঃখগুলো কোনো আলো বা আশা ঢুকতে দেয় না। পুকুরের এই ঘোলাটে ভাব যেমন তার গভীরের কোনো কিছুই স্পষ্ট হতে দেয় না, তেমনই আমার জীবনের সঠিক পথ বা ভবিষ্যৎটাও সবসময়ই অন্ধকার আর অস্পষ্ট থেকে যায়। আমি তো এমন জীবন চায়নি কখনো।
_________________
সকাল তখন বেশ কিছুটা গড়িয়ে গেছে; প্রায় দশটার দিকে ঘুম ভাঙল দিয়ার। চোখ খোলার পরও কিছু সময় সে বিছানায় স্থির হয়ে শুয়ে রইল। পাশ ফিরতেই তার দৃষ্টি গেল বিছানার অন্য প্রান্তে। সেখানে নির্ণয় নেই। বিছানাটি একদম খালি। তবে এই অনুপস্থিতি নিয়ে দিয়ার মনে কোনো কৌতূহল বা অস্থিরতা সৃষ্টি হলো না। তাতে তার কিছু যায় আসে না, কারণ নির্ণয়ের অনুপস্থিতি তার দৈনন্দিন জীবনের এক স্বাভাবিক অংশ।
একরাশ উদাসীনতা নিয়েই দিয়া উঠে গিয়ে ফ্রেশ হলো। নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো শেষ করে দেখল, বাসার ম্যাড তাকে ঘরে খাবার দিয়ে গেছেন। দিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো, সম্ভবত নির্ণয় ম্যাড কে বলে গেছেন খাবার ঘরে দিয়ে যেতে। দিয়া বেশি কিছু ভাবলো চুপচাপ খাবার টা শেষ করলো। এরপর প্লেটগুলো ম্যাডকে দিয়ে হাঁটা ধরলো ছাদের দিকে। ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে ভেতরটা কেমন ছটফট করছিল, তার মনে হলো ছাঁদে গেলে বোধহয় একটু শান্তি পাবে। তাই ছুটলো ছাদের দিকে।
দিয়া ছাদের দিকে খানিক এগোতেই কানে এলো কেউ গান গাইছে আর গিটার বাজাচ্ছে। এই অপ্রত্যাশিত শব্দ তার মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে আকর্ষণ করল। দিয়া কৌতূহলী হয়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলো সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিটি ধাপ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দের উৎস তার আরও কাছে আসতে লাগল। যতই কাছে যাচ্ছে, সুরটা আরো তীব্র হচ্ছে, যা তার ভেতরের ছটফটানিকে ছাপিয়ে এক নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করছিল।
সুরের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছালো, তখন দিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ছাদের গেটের সামনে। কৌতূহল দমাতে না পেরে দরজা কিছুটা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো……
#চলবে
#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১২
⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
সুরের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছালো, তখন দিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ছাদের গেটের সামনে। কৌতূহল দমাতে না পেরে দরজা কিছুটা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলো নির্ণয় মনের সুখে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। দিয়া বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ভাবলো’ লোকটা সবকিছুতেই একদম পারফেক্ট শুধু মনের দিক দিয়ে একটু কমতি আছে তবে সেটা সবার ক্ষেত্রে নয় শুধু দিয়ার ক্ষেত্রেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ওকে দেখে নির্ণয়ের গিটার বাজানো হাতটা থেমে গেলো।
নির্ণয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো, প্রশ্ন করলো-
—“ছাঁদে কী? এখানে কেনো এসেছো?”
দিয়া কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো ছাদের রেলিং ঘেঁষে। ছাঁদ থেকে গ্রামের দৃশ্যটা বেশ মনকাড়া লাগছে দিয়ার নিকট, ও মনমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে চেয়ে দেখছে সেই দৃশ্য।
—“কি হলো জবাব দিচ্ছো না কেনো?”
নির্ণয়ের কথায় দিয়ার কোনো হেলদোল নেই, ও চুপচাপ গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করতে ব্যাস্ত। নির্ণয় বসা থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো দিয়ার পিছনে। ঠান্ডা স্বরে বললো-
—“কী? সমস্যা কী? কথা কানে যায় না? কি দেখছো ওভাবে?”
—“নাহ যায়না”
দিয়ার ভাবলেশহীন উত্তর শুনে নির্ণয় চোখ গরম করে তাকালো ওর দিকে। খপ করে দুই হাতে কোমর আঁকড়ে ধরে শয়তানি হেঁসে বললো-
—“ফেলে দেই এখান থেকে? দেই ফেলে?
দিয়াও কম যায় না’ আগের ন্যায় বলে উঠলো-
—“দেন ফেলে দেখি কেমন পারেন” আমিও দেখি আপনার কলিজায় কতটুকু সাহস আছে”
নির্ণয় দুই হাতে দিয়া কে শূন্যে তুলে বসিয়ে দিলো রেলিংয়ের ওপর। দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো নির্ণয়ের দিকে, নির্ণয় হেঁসে বললো-
—“কলিজায় কতটুকু সাহস আছে দেখবি?”
দিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো, ওপর নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ছোট্ট করে বললো-
—“হ্যাঁ”
ঐ
দিয়ার বাক্য শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ওকে ছাঁদ থেকে ধাক্কা মারলো নির্ণয়’ তবে খানিক নিচে পড়তেই খপ করে ধরে ফেললো দিয়ার হাত। বাঁকা হেঁসে বললো-
—“এখন বল!”
দিয়া শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নির্ণয়ের দিকে। মেয়েটার মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই মিটিমিটি হাঁসছে। দিয়ার হাঁসি দেখে নির্ণয় রেগে গেলো কি-না বুঝা গেলো না! সে টেনে দিয়া কে ওপরে তুললো। রেলিংয়ের সাথে চেপে ধরে গাঁ হিম করা ঠান্ডা স্বরে বললো-
—“তোকে এভাবে একে বারে মেরে ফেললে চলবে না বুঝলি। তোকে আমি এতো কষ্ট দিবো’ এতো কষ্ট দিবো যে তুই নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে চাইবি। আর তখনই আসবে আসল মজা।”
দিয়া হাসলো আগের ন্যায়! নির্ণয়ের শার্টের ওপরের বোতাম দুটো লাগাতে লাগাতে গম্ভীর গলায় বললো-
—“আমি নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে চাইবো? হাউ ফানি”
একটু থেমে’ নির্ণয়ের শার্টের কলার চেপে ধরে নিজের দিকে খানিক ঝুঁকিয়ে হেঁসে বললো-
—“সেই দিন কোনোদিন আসবে না মিস্টার” কারণ মানুষ আঘাত পেয়ে ভেঙে পড়ে আর আমি আঘাত পেয়ে শক্ত পাথর হয়”
—“তাই নাকি?
—“হ্যাঁ ঠিক তাই!”
নির্ণয় হাঁসলো’ বললো-
—“তুমি যদি শক্ত পাথর হও, তবে আমি হবো হাতুড়ি-তোমাকে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দিবো নিমিষেই।
নির্ণয়ের বাক্য শেষ হতেই ওর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো দিয়া’ বললো-
—“দেখা যাক কে কাকে ভাঙে”
আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না দিয়া, ধুপধাপ কদম ফেলে নেমে গেলো ছাঁদ থেকে। লোকটার সামনে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। নির্ণয় দিয়ার যাওয়ার পানে তাকিয়ে দুষ্টু হাঁসলো! দিয়াকে একটু জ্বালানোর জন্য গলা ছেড়ে গান ধরলো-
“চাঁদের কন্যা চাঁদ কুমারী হেলিয়া দুলিয়া যায়”
“রুপ যেন তার মনেরও গাঙে ঢেউ তুলিয়া যায়”
“বুকেরি পাঁজর ভাঙ্গিয়া মনটা কাঁড়িয়া নিলো হায়”
“বন্ধু তোরা বলনা আমার কি হবে উপায়”
নির্ণয়ের এমন গান শুনে পেছন ফিরে একবার তাকালো দিয়া, কিছু বললো না’ শুধু মুখটা খানিক বাঁকালো। দিয়ার মুখ বাঁকানো দেখে নির্ণয় শব্দ করে হেঁসে উঠলো। বিড়বিড় করে বললো-
—“মেয়ে তুমি খুব তাড়াতাড়ি আমার জালে আটকা পড়বে” এমন ভাবে আটকাবে যে সেখান থেকে আর বেরোতে পারবে না কোনো কালেই”
__________________
নদী চেয়ারের উপর পা তুলে বসে আছে আয়েশ করে। নেওয়াজ মোল্লা বেশ কিছুক্ষণ ধরে নদী কে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন তবে নদী উনার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছে না। নেওয়াজ মোল্লা বেশ রেগে আছেন মেয়ের ওপর, তবুও তিনি শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন-
—“কেনো ফিরে এসেছো? আমার মুখে চুনকালি মাখিয়ে তোমার শান্তি হয়নি? এবার কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ফিরে এসেছো?”
নদী নেওয়াজ মোল্লার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো! বললো-
—“তোমার কি মনে হচ্ছে আব্বু?
নেওয়াজ মোল্লা যতটুকু সম্ভব নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে” তবে পারছেন না নদীর এমন গাঁ ছাড়া ভাব দেখে।
—“যার সাথে পালিয়ে গিয়েছিলে সে কোথায়?”
—“গাড়ির নিচে চাঁপা পড়ে মরে গেছে”
নেওয়াজ মোল্লা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না তিনি রাগে গর্জে উঠে বললেন-
—“এ বাড়িতে তোমার কোনো যায়গা নেই’ তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে”
নদী হেঁয়ালি করে বললো-
—“সময় হলে চলে যাবো তোমার বলতে হবে না”
নেওয়াজ মোল্লার রাগ এবার সপ্তম আসমান ছুঁয়েছে। তিনি রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। রুহানি বেগম পেছন ডাকলেন কত তবে তিনি ফিরেও চায়লেন না। রুহানি বেগম এগিয়ে এসে সজোরে এক চড় মারলেন মেয়ের গালে, এতটাই জোরে মারলেন যে নদী দু কদম পিছিয়ে গেলো। নদী গালে হাত দিয়ে রুহানি বেগমের দিকে ছলছল চোখে তাকালো। রুহানি বেগম রাগে দুঃখে চিৎকার করে উঠলেন-
—“একবার সবার মানসম্মান খেয়ে শান্তি হয়নি? আর কী বাকি আছে? এবার কি আমাদেরও খায়তে চাস নাকি?
মায়ের কথা শুনে নদীর চোখ দিয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, চোঁখের পানির বিন্দু আঙুলের ডগায় এনে তাচ্ছিল্য হাঁসলো। রুহানি বেগম একনাগাড়ে বলে চলেছেন। নদী একটা কথার কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ চলে গেলো নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরে”
_________________
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে- দিয়া বসে আছে নিজের ঘরে কিছু ভালো লাগছে না মোটেই। মনটা কেমন কু ডাকছে, যেন অশুভ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। দিয়া ছটফট করছে আর সারাঘর পায়চারি করছে, এমন সময় ঘরে এলো নির্ণয় দিয়া কে ওমন ছটফট করতে দেখে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো-
—“কি হয়েছে? এমন ছটফট করছো কেনো? শরীর খারাপ লাগছে?”
দিয়া নির্ণয়ের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আকুল গলায় বললো-
—“আপনার ফোনটা একটু দিন না প্লিজ, আমার কিছু ভালো লাগছে না কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে’ আব্বুর কাছে ফোন দিয়ে কথা বললে বোধহয় ভালো লাগবে।”
নির্ণয় চোখ ছোট করে তাকালো দিয়ার দিকে” তবে কিছু বললো না, চুপচাপ পকেট থেকে মোবাইল বের করে দিয়ার হাতে দিলো। দিয়া এক সেকেন্ড ও দেরি করলো না। ফোন লাগালো নেওয়াজ মোল্লার নাম্বারে।
খানিকক্ষণ রিং হয়ে কল কেটে গেলো তবে ওপাশ থেকে কেউ রেসপন্স নেই। দিয়া আরো ভয় পেয়ে গেলো। লাগাতার কয়েকবার কল করলো নেওয়াজ মোল্লার নাম্বারে তবে নেওয়াজ মোল্লা এবার ফোনটাই বন্ধ করে দিয়েছেন। দিয়া নেওয়াজ মোল্লা কে ফোনে না পেয়ে এবার কল করলো বাড়ির নাম্বারে। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর কল টা রিসিভ হলো, ওপাশ থেকে ভেসে এলো রুহানি বেগমের কান্নারত কন্ঠস্বর-
—“হ্যালো নির্ণয় বাবা?”
দিয়া মায়ের কান্নারত কন্ঠস্বর শুনে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল-
—“কি হয়েছে আম্মু? তুমি কাঁদছো কেনো?”
মেয়ের কন্ঠস্বর শুনে রুহানি বেগম ঠুকরে কেঁদে উঠলেন। কোনো রকমে ভাঙ্গা গলায় বললেন-
—“তোর বাপ রাগ কইরা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে। কখন থেকে কল দিতাছি ধরতাছে না। এখন ফোন বন্ধ কইরা রাখছে”
দিয়া আতঙ্কে উঠলো’ বললো-
—“কখন বের হয়েছে?”
—“দুপুরের দিকে”
দিয়া নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো। নির্ণয় দৌড়ে এসে মুখটা দুই হাতের আজলায় এনে বেকুল কন্ঠে বললো-
—“এই মেয়ে কাঁদছো কেনো? কি হয়েছে? আমাকে বলো। কান্না থামাও আমাকে বলো কি হয়েছে।”
দিয়া চোখ তুলে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। কান্না করতে করতে বললো-
—“আব্বু…
—হ্যাঁ আব্বুর কি হয়েছে?”
—“আব্বু রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় আছেন কেউ জানে না, ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। আমার আব্বু কোথায় গেলো?”
নির্ণয় শান্ত স্বরে বললো-
—“আমি আছি তো সব ঠিক করে দিবো” কান্না থামাও! আমি খোঁজ লাগাচ্ছি। তুমি শান্ত হও কান্না করো না।”
#চলবে

