Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৩+১৪

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৩+১৪

0
681

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৩

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

নির্ণয়ের আশ্বাসে একটু স্বস্তি পেলো দিয়া, কান্না থামিয়ে নিম্ন স্বরে বললো-

—“আমিও যাবো আপনার সাথে’ প্লিজ না করিয়েন না।”

দিয়ার কথাটা রাখলো নির্ণয়’ না করলো না। শুধু ছোট্ট করে বললো-

—“আসো” আমি নিচে অপেক্ষা করছি।”

দিয়াও ভালো মেয়ের মতো বোরখা পরে তৈরি হয়ে নিচে এলো। নিচে ড্রয়িং রুম সবাই বসে আছে। দিয়া খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। নির্ণয়ের মা আশা বেগম দিয়া কে কাছে ডেকে প্রশ্ন করলেন-

—“কি হয়েছে বাড়িতে?

দিয়া কাঁচুমাচু মুখে বললো-

—“ওই…..

বাকি কথা শেষ করতে দিলো না নির্ণয়। আশা বেগমের উদ্দেশ্যে বললো-

—“ওর বোনের শরীরটা ভালো না, কল করেছিলো তাই ভাবলাম একটু দেখা করিয়ে নিয়ে আসি।”

—“সে কি কথা? মেয়েটা না গতকালই হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ হয়ে বাড়ি ফিরলো।”

—“হ্যাঁ,

—“তাহলে ফের কি হলো?”

—“আহা এতো জেরা করছো কেনো? ওর যাক গিয়ে দেখে আসুক।”

আশরাফুল খাঁনের মুখের ওপর আর কোনো কথা বললেন না আশা বেগম। নির্ণয় নিচু স্বরে বললো-

—“তাহলে আমরা আসি”

আশা বেগম ছোট্ট করে বললো-

—“তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, ও বাড়িতে থাকার প্রয়োজন নেই।”

দিয়া বুঝলো আশা বেগম কেনো এ কথা বললেন। নদী কে নিয়ে তিনি খুব চিন্তিত থাকেন। মেয়েটার মতলব সুবিধার লাগছে না উনার কাছে। নির্ণয় মেকি হেঁসে বললো-

—“আচ্ছা ঠিক আছে”

বেরিয়ে পড়লো দু’জন নেওয়াজ মোল্লাকে খোঁজার উদ্দেশ্যে।

______________

সেই সন্ধ্যা থেকে নেওয়াজ মোল্লাকে খুঁজে চলেছে নির্ণয় ও তার ছেলেপেলেরা। তবে কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। দিয়া কেঁদে কেটে একাকার। এক ফাঁকে বাড়ি গিয়ে নদী কে আচ্ছা মতো জেরে এসেছে মেয়েটা। বাবা যে তার জান, উনার কিছু হয়ে গেলে ওরা যে বেঁচে থেকেও মরে যাবে।”

রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি। দিয়া গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে’ তার থেকে কিছুটা দূরে বসে নির্ণয় সিগারেট ফুঁকছে আর ফোন ঘাঁটছে’ হঠাৎ ফোন বেজে উঠতেই নির্ণয় তড়াৎ করে রিসিভ করেই ফোনের ওপাশের লোকটির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লো-

—“কোনো খোঁজ পেয়েছিস?”

ফোনের ওপাশ থেকে কি বললো শোনা গেলো না, তবে নির্ণয় তড়িঘড়ি করে এসে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে দিয়ার উদ্দেশ্যে বললো-

—“গাড়িতে উঠে বসো’ হারিআপ”

দিয়া কোনো বাক্যব্যয় করলো না। গাড়িতে উঠে বসেলো! ভাঙ্গা গলায় প্রশ্ন করল-

—“কে ফোন করেছিলো? আব্বুর কোনো খবর দিলো?”

নির্ণয় দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করতে করতে ছোট্ট করে উত্তর দিলো-

—“হ্যাঁ”

—“কোথায় আছে? ঠিক আছে তো উনি?”

নির্ণয় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকালো দিয়ার মুখের দিকে, শান্ত স্বরে বললো-

—“এতো কিছু বলেনি।”

—“ওহ্ আচ্ছা”

কিছুক্ষণ এভাবেই চললো, নিরব রইলো দু’জনেই কোনো কথা বললো না। তবে দিয়া চুপ থাকতে পারছে না কিছুতেই, ফের নির্ণয় কে বললো-

—“আর কতক্ষন লাগবে? একটু স্পিডে চালান না প্লিজ”

নির্ণয় নিশ্চুপ শান্ত ভঙ্গিতে গাড়ি চালাচ্ছে। হঠাৎই গাড়িটি এসে থামলো একটা টং দোকানের সামনে। নির্ণয় দিয়ার উদ্দেশ্যে বললো-

—“নামো!”

দিয়া প্রশ্ন করতেই যাচ্ছিলো কেনো? কিন্তু দোকানের বেঞ্চের ওপর বসে থাকা নেওয়াজ মোল্লা কে দেখে থেমে গেলো। তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেলো নেওয়াজ মোল্লার সামনে। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো-

—“কোথায় ছিলে সারাদিন? ফোন বন্ধ করে রেখেছো কেনো? এমন কেউ করে বলো?”

বলতে বলতেই মেয়েটা হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো নেওয়াজ মোল্লার সামনে। নির্ণয় পেছনে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছে সকল কিছু। নেওয়াজ মোল্লা পরম মমতায় হাত রাখলেন মেয়ের মাথায়। মৃদু হেঁসে বললেন-

—“দেখো দেখো পাগলি মেয়ে কাঁদছো কেনো? বাবা ঠিক আছি তো কান্না থামাও।”

দিয়া হেঁচকি তুলতে তুলতে বললো-

—“তুমি এমন কেনো করো আব্বু? একটুর জন্য আমার জানটা বেরিয়ে যাচ্ছিলো”

নেওয়াজ মোল্লা ফের হাসলেন। পেছন ঘুরে নির্ণয় কে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বললেন-

—“তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেনো বাবা?”

নির্ণয়ের ধ্যান ভাঙল, মৃদু হেঁসে এগিয়ে আসতে আসতে বললো-

—“এমনি দেখছিলাম আর কি!”

বলেই নেওয়াজ মোল্লার পাশে এসে বসলো নির্ণয়। নেওয়াজ মোল্লা দিয়া কে টেনে দাঁড় করিয়ে নিজের পাশে বসালো। দোকানদারের উদ্দেশ্য বললো-

—“ভাই তিন কাপ চা দেন তো কড়া করে”

দোকানদার মৃদু হেঁসে বললেন-

—“আইচ্ছা”

তিন জন জমিয়ে কতক্ষন আড্ডা দিলো। বাড়ি ফিরার জন্য যখন নির্ণয় গাড়ি নিয়ে এলো, নেওয়াজ মোল্লা উল্লাসিত কন্ঠে বললেন-

—“সবসময় তো গাড়ি দিয়েই চলাচল করো, আজ না হয় হেঁটেই চলো।”

নির্ণয় একবার তাকালো দিয়ার দিকে। তারপর গাড়ির চাবিটা দোকানদার কে দিয়ে কল লাগালো রফিকের নাম্বারে। কিছুক্ষণ রিং হতেই রিসিভ হলো ভেসে এলো রফিকের গলার স্বর-

—“হ ওস্তাদ কন”

নির্ণয় গম্ভীর গলায় বললো-

—“গাড়ির চাবিটা দোকানদার চাচার কাছে রেখে গেলাম, এসে গাড়ি নিয়ে যাহ‌।”

—“আইচ্ছা ওস্তাদ”

নির্ণয় কলটা কেটে ফোন পকেটে ঢুকালো, দোকানদারের উদ্দেশ্য বললো-

—“চাচা কালা লম্বা কইরা একটা পোলা আইবো ওরে গাড়ির চাবিটা দিয়া দিয়েন।”

দোকানদার মৃদু হেঁসে বললেন-

—“আইচ্ছা”

—“তাহলে এবার জাওয়া যাক”

নেওয়াজ মোল্লার কথায় মাথা নাড়লো নির্ণয় সম্মতি দিয়ে বললো-

—“চলেন”

হাঁটা ধরলো তিন জন অন্ধকার রাস্তা ধরে। দিয়ার এক হাত ধরে আছেন নেওয়াজ মোল্লা, অন্য হাত ধরে আছে নির্ণয়, দুই পাশে দু’জন মাঝখানে দিয়া। বিষয়টি বেশ ভালো লাগলো দিয়ার। দিয়া মুচকি মুচকি হাঁসছে! একবার মাথা নিচু করে তাকাচ্ছে বাবার হাতের দিকে, আরেকবার নির্ণয়ের হাতের দিকে। নির্ণয় তা খেয়াল করে বললো-

—“হাঁটতে কি সমস্যা হচ্ছে তোমার?”

দিয়া দুই পাশে মাথা নাড়লো,
—“না’ সমস্যা হচ্ছে না”

নির্ণয় ঠোঁট প্রশারিত করে হাঁসলো! ফের মজে উঠলো শ্বশুরের সাথে গল্পে। দিয়া শুধু চুপচাপ শুনে গেলো তাদের কথা।

_________________

রাত সাড়ে দশটা তিনজন সবে বাড়ি ফিরেছে। রুহানি বেগম স্বামীকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। নেওয়াজ মোল্লা দুপুর থেকে কিচ্ছুটি খাননি বোধহয়। তাই রুহানি বেগম তাড়াহুড়ো করে বললেন-

—“তোমরা হাত মুখ ধুয়ে এসে বসো আমি খাবার বাড়ছি।”

দিয়া মলিন মুখে বললো-

—“তুমি শুধু আব্বুর জন্য খাবার বাড়ো’

—“ওমা সে কি কথা? জামাই এসেছে না খেয়ে যাবে নাকি?”

দিয়া কিছু বলতেই যাচ্ছিলো তবে নির্ণয় ওর হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বললো-

—“আজ থাকবো আমরা আম্মু। আপনি খাবার বাড়েন ওর কথায় কান দিয়েন নাহ।”

নির্ণয়ের কথায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন রুহানি বেগম। আজ মেয়ে এ বাড়িতে থাকবে ভাবতেই আনন্দে মনটা নেচে উঠলো। তিনি খুশী হয়ে বললেন-

—“বসো আমি খাবার দিচ্ছি” দিয়া তুই ও বস ওদের সাথে।”

দিয়া কথা বাড়ালো না চুপচাপ বসে পড়লো নির্ণয়ের পাশে। নির্ণয় এদিক সেদিক তাকিয়ে রুহানি বেগমের উদ্দেশ্যে বললো-

—“নদী কে তো দেখছি না? কোথাও কি গিয়েছে?”

রুহানি বেগমের মুখটা কালো হয়ে গেলো। কপাল কুঁচকে বিরক্ত নিয়ে বললেন-

—“নিজের ঘরেই আছে বোধহয়! আবার কোন ছক কষছে কে জানে।”

নির্ণয় মৃদু হেঁসে বললো-

—“ওরে ডাকেন এক সাথেই খায়!”

—“কেনো ও কি আপনার মুখে তুলে খাইয়ে দিবে?”

দিয়ার কথায় ওর দিকে তাকালো নির্ণয়। দেখলো দিয়া ওর দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে অপলক। নির্ণয় অপ্রস্তুত হেঁসে বললো-

—“আরেহ তেমন ক….

আর কিছু বলতে পারলো না নির্ণয় কেননা ইতিমধ্যেই দিয়া খাবার ছেঁড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে। নেওয়াজ মোল্লা মেয়েকে হাত ধুতে দেখে বললেন-

—“খাবারটা শেষ করে যাও” খাবার ছেড়ে এভাবে উঠে যেতে নেই।”

দিয়া কথা শুনলো না। যেতে যেতে ছোট্ট করে বললো-

—“পেট ভরে গেছে। খুদা লাগলে পরে এসে খেয়ে নিবো!”

নেওয়াজ মোল্লা আর কিছু বললেন না। নির্ণয় শুধু ভ্যাবলার মত তাকিয়ে রইলো দিয়ার যাওয়ার দিকে। আসলে নির্ণয় বুঝে উঠতে পারছে না, দিয়া কেনো এমন করলো।” তাই নিজেও উঠে গেলো দিয়ার পিছু পিছু-

—“এই মেয়ে দাঁড়াও বলছি!”

দিয়া কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ হাঁটছে বাড়ির পেছনের দিকে। নির্ণয়ের ওপর তার রাগ হয়েছে। কেন হয়েছে জানে না, তবে হয়েছে খুব।

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৪

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

“এই মেয়ে কোথায় যাচ্ছো এতো রাতে? দাঁড়াও বলছি”

কে শোনে কার কথা? নির্ণয়ের কথায় দিয়ার কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। মেয়েটা হেঁটেই চলেছে সামনের দিকে। নির্ণয় পিছু ডাকছে বারংবার তবে দিয়া থামলো না। একেবারে পুকুরের ঘাটে এসে থামলো। শেওলাপড়া সিঁড়ি তে আসতে করে বসলো। নির্ণয়ও বসলো ওর পাশে-

—“কি সমস্যা কী তোমার?

দিয়া পুকুরের ঘোলাটে পানির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো-

—“কিসের সমস্যা? আমার কোনো সমস্যা নেই”

নির্ণয় ভ্রু যুগল হালকা নাচালো-

—“ওহ্ রিয়েলি”

—“হ্যাঁ”

নির্ণয় দিয়ার বিরশ মুখের দিকে তাকিয়ে ফের বলে উঠলো-

—“জ্বলে?

দিয়া কপাল কুঁচকে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে বললো-

—“আমি আর জেলাস হুঁহহ”

নির্ণয় দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ক্রু হাঁসলো! মেয়েটা কে জ্বালাতন করতে তার বেশ লাগে। তাই তো আরেকটু জ্বালানোর মেয়েটার একদম নিকটে গিয়ে গাঁ ঘেঁষে বসলো। এরপর খানিকটা জোরে গেঁয়ে উঠলো-

—“আমি কারো হলে তোমার কেনো জ্বলেরে বন্ধু? তোমার কেনো জ্বলে?
—“আমার কেমন লেগেছিল” আমার কেমন লেগেছিল তুমি যখন অন্যের হয়েছিলে! তোমার কেনো জ্বলে?”

নির্ণয়ের এমন অদ্ভুত গান শুনে দিয়া কটমটিয়ে তাকালো ওর দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো-

—“আজব আপনার মাথায় কী গ্যাস্ট্রিক আছে নাকি? থাকলে ডক্টরের কাছে জান এখানে কি? যত্তসব”

বলেই চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই নির্ণয় খপ করে চেপে ধরলো দিয়ার হাত। আকস্মিক টানে দিয়া ফের বসে পড়লো আগের যায়গায়। নির্ণয় আলগোছে দিয়ার কোলে মাথা রেখে শুলো শেওলাপড়া সিঁড়িতে। চাঁদের হাল্কা আলোয় অনিমেষ চেয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। নির্ণয়ের এমন চাহনিতে দিয়া অপ্রস্তুত হলো। চোরের মত দৃষ্টি ঘোরালো এদিক সেদিক-

—“কী দেখছেন এভাবে?”

নির্ণয় মৃদু হেঁসে মুগ্ধ কন্ঠে শুধালো-

—“তুমি এতো সুন্দর কেনো ডোডো?”

দিয়া অবাক চোখে তাকালো নির্ণয়ের দিকে। এই প্রথম লোকটার মুখে এমন কথা শুনে বেশ অবাক হলো। দিয়া কে নিজের দিকে ওভাবে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে নির্ণয় ফের হাঁসলো। দিয়ার আদুরে গাল টেনে দিয়ে বললো-

—“হয়েছে এতো ভাবতে হবেনা আপনার”

দিয়া চোখ সরিয়ে নিল নির্ণয়ের দিক থেকে। নির্ণয় খানিক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। এরপর হিসহিসিয়ে বললো-

—“এই খোলা আকাশের নিচে বা সর টা সেড়ে ফেললে কেমন হয় বলোতো ডোডো?”

দিয়া এক ঝটকায় চেপে ধরলো নির্ণয়ের মুখ-

—“আপনার কি মিনিমাম সরম টুকুও নেই?”

নির্ণয় ভনিতাহীন বলে উঠলো-

—“সরম লজ্জা দিয়ে কী কেউ বড়লোক হয়েছে?

দিয়ার রাগ লাগলো লোকটা সত্যিই লাগামহীন বেলাজা।

—“হোক বা না হোক তাতে কী যায় আসে”

—“যায় আসে কারনেই তো বললাম”

—“কী যায় আসে শুনি”

নির্ণয় কথা ঘুরিয়ে ফের আগের ন্যায় বলে উঠলো-

—“বউ প্লিজ চাঁদের আলোয় বা সর টা সেড়ে ফেলি সত্যি বলছি মজা আসবে।”

লজ্জায় দিয়ার কান গরম হয়ে উঠলো। নির্ণয় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বললো-

—“আচ্ছা শুনো তোমাকে দু’টো অপশন দিচ্ছি। নাম্বার এক- হয় ঘরে গিয়ে চুপচাপ খাবার খাবে” দুই- নয়তো এখানে বা সর করবে” এখন তুমি বলো কোনটা বেটার?”

দিয়া তড়িঘড়ি করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। এক মুহূর্ত তাকালো নির্ণয়ের মুখের দিকে এরপর শাড়ির কুঁচি ধরে দিলো এক ভৌ দৌড়” দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচিয়ে বলে উঠলো-

—“ঘরে গিয়ে এক প্লেট ভাত খাবো’ তবুও এখানে ছিঃ কখনোই না”

নির্ণয় এবার উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠলো’ ও মূলত দিয়াকে ভাত খাওয়ানোর জন্যই এমনটা বলেছে, নয়তো ম্যাডাম ভাত খেতো না আজ। নির্ণয় হাত দিয়ে চুল গুলো পেছনে ঠেলে নিজেও ছুটলো দিয়ার পিছু।

______________

নদী বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুক্ষ্ম চোখে দেখলো সবকিছু। বুকটা কেমন হাহাকার করে উঠলো। তার ও তো এমন একটা সুন্দর সংসার হতে পারতো, তবে তা আর হলো কই? তার ভাগ্যে তো অন্যকিছুই লেখা ছিলো। নদীর চোখ দুটো পানিতে টয়টম্বুর তবুও মেয়েটা হেঁসে উঠলো।

চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো অবলিলায়। তবুও নদী হাঁসছে উন্মাদের মতো হাসছে। নিজের জীবনের এমন দশা দেখে তাঁর বড্ডো হাঁসি পাচ্ছে। হাঁসতে হাঁসতে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো এরপর শব্দ করে কেঁদে উঠলো।

কাঁদতে কাঁদতে ফের হেঁসে উঠলো! এমন অবস্থায় যদি মেয়েটাকে কেউ দেখতো? নির্ঘাত বলে বসতো মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। নদী হাঁতড়ে একটা ব্লেড বের করলো। নতুন চকচক করছে ব্লেডটা আজকেই বোধহয় দোকান থেকে কিনে এনেছে। নদী দাঁরালো ব্লেড টার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

ওর বারবার মনে হচ্ছে ব্লেড টা ওকে ডেকে বলছে-

“কেঁটে ফেল” হাতের রগটা কেঁটে ফেল শান্তি পাবি! এমন জীবন থেকে চিরজীবনের জন্য মুক্তি পাবি। এমন জীবন রেখে কী করবি? মরে যাহ কেটে ফেল”

নদীর কানে সুইয়ের মতো বিঁধছে কথা গুলো। পিড়া দিচ্ছে খুউব, সহ্য করতে পারলো না। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্লেড টা নিয়ে থামলো হাতের রগের কাছে, কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলো। এরপর ব্লেড টা দিয়ে হাতের কয়েক যায়গা ছিন্নভিন্ন করে ফেললো। তাজা রক্ত ছিটকে এসে পড়লো চোখে মুখে। সেই রক্তে হাত দিয়ে পরম আনন্দে চোখ বুজে রইলো।

এই মুহূর্তে নদীকে দেখে কোনো স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হলো না। বরং তাকে যেন এক রক্তপিপাসু সত্তা বা হিংস্র দানবের মতো দেখাচ্ছিল।

_______________

দিয়া খাবার টেবিলে বসে আছে সামনে তার এক প্লেট ভাত। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন রুহানি বেগম। আর সামনের চেয়ারে নির্ণয় বসে শান্ত ভাবে খাচ্ছে। দিয়া শুকনো ঢোঁক গিলে নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বললো-

—“এই যে শুনছেন?”

নির্ণয় বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠলো-

—“আবার কি সমস্যা?”

—“এই সবগুলো ভাত কী খেতে হবে?”

—“হ্যাঁ” তুমি বলেছিলে না এক প্লেট ভাত খাবে? নাও শুরু করো।”

দিয়া ছলছল চোখে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে মিনমিনে গলায় বললো-

—“দিয়া তুই মাইনকা চিপায় পড়ে গেছিস, এবার তোর কি হবে?

—“হা কিছু বললে?”

নির্ণয়ের কথায় দিয়ার রাগ হলো। তবুও নিজেকে সংবিরন করে মেকি হেঁসে বললো-

—“কই? আমি তো কিছু বলিনি”

নির্ণয় মাথা নিচু করে প্লেটের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাঁসছে। দিয়ার এমন অবস্থা দেখে ওর বেশ মজা লাগছে। দিয়া খাচ্ছে চুপচাপ’ ওর কাছে এক প্লেট ভাত মানে অনেক কিছু। কীভাবে শেষ করবে সেই চিন্তায় মেয়েটার বেহাল দশা। নির্ণয় তা দেখে হাঁসিটা কোনো রকমে আটকে গম্ভীর গলায় রুহানি বেগমের উদ্দেশ্যে বললো-

—“আম্মু ওরে আর কয়টা ভাত দেন। এগুলো তে ওর পেট ভরবে না।

বলেই আড় চোখে তাকালো দিয়ার দিকে। দিয়া রাগে গোখরা সাপের মতো ফুসফুস করছে। তবে নির্ণয়ের তাতে কিছু যায় আসে না সে দিয়া কে জ্বালাতে পেরে মিটিমিটি হাঁসছে’ তার আজ ঈদ ঈদ ফিল আসছে। ওদের কান্ড দেখে রুহানি বেগমও ঠোঁট টিপে হাঁসছে।

—“আর কইটা ভাত দিবো মা?”

রুহানি বেগমের মস্কোরা দেখে দিয়া বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালো রুহানি বেগমের দিকে। কাঁদো কাঁদো গলায় রাগ দেখিয়ে বললো-

—“পাতিলে যত ভাত আছে সবগুলো বেরে দেও। আজ সারারাত ভাতই খাবো”

—“আচ্ছা”

রুহানি বেগমের এহেন উত্তর শুনে নির্ণয় শব্দ করে হেঁসে উঠলো। রুহানি বেগম ও হাঁসছে। এসব দেখে দিয়া রাগে দুঃখে কেঁদেই ফেলেছে। ও ভাত রেখে উঠে যেতে যেতে বললো-

—“আমি এই বাড়ির কেউ না। তোমরা কেউ আমায় ভালোবাসো না। সবাই শুধু আমার উপর জুলুম করো। আমি আল্লাহর কাছে তোমাদের সবার নামে বিচার দিবো।”

থেমে’ এঁটো হাত জোড়া করে মোনাজাতের মতো ধরে জোরে জোরে বলে উঠলো-

—“হে আল্লাহ তুমি তো সবই দেখছো ওরা আমার মতো অবলা নারীর উপর কীভাবে অত্যাচার জুলুম করছে তুমি এদের বিচার করিও। আল্লাহ ওই দুর্নীতিবাজ নির্ণয়ের একটু বেশি করে বিচার করিও” ওর বউ যেন না থাকে’ ওর সংসারে যেন আগুন লাগে’ ওর যেন একশো টা বাচ্চাকাচ্চা হয়, আমিন।”

নির্ণয় ও রুহানি বেগম পেছন থেকে শব্দ করে বলে উঠলো-

—“সুম্মা আমিন”

#চলবে