Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২৬

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২৬

0
627

#প্রনয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৬

ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরের দুই নম্বর টার্মিনালের অ্যারাইভাল ক্যানোপির লোহার গ্রিলটা আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াহিদ। চারপাশে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় আর হইহুল্লোড়। একটু পর পরই কাঁচের স্লাইডিং দরজাটা খুলছে আর ভেতর থেকে একঝলক শীতল বাতাস তেড়ে আসছে বাইরের ভ্যাপসা গরমের দিকে। ওয়াহিদের চোখ জোড়া সেই দরজার মুখে আঠার মতো লেগে আছে।

একে একে অনেক যাত্রী ট্রলি ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ঠিক তখনই ভিড়ের একদম মাঝখানে সেই ব্যক্তিকে দেখতে পেল ওয়াহিদ। ট্রলি ঠেলে ধীরপায়ে সে এগিয়ে আসছে। তবে সবার নজর কেড়ে নিচ্ছে ট্রলির ওপর বসে থাকা চার বছরের সেই ছোট্ট মেয়েটি। ফ্রক পরা মেয়েটি দুই হাতে ট্রলির হাতল ধরে অবাক চোখে চারপাশ দেখছে।

ব্যক্তিটি যখন ভিড় ঠেলে ক্যানোপির একদম শেষ মাথায় এসে দাঁড়াল ওয়াহিদের সাথে চোখাচোখি হলো। সে ট্রলি থামিয়ে পাশে বসা মেয়েটির মাথায় আলতো হাত বুলালো। মেয়েটি বড় বড় চোখে ওয়াহিদের দিকে তাকিয়ে আছে মূলত সে ওয়াহিদ কে চেনার চেষ্টা করছে। তবে সে ব্যর্থ, তাই ঘাড় ঘুরিয়ে একবার মায়ের দিকে তো একবার ওয়াহিদের দিকে তাকাচ্ছে।

তা দেখে ওয়াহিদ মিষ্টি করে হাঁসলো, দুই হাত মেলে ধরে ছোট্ট করে ডাকলো-

“মামা জান..!!

ছোট্ট পরিটা বোধহয় এবার চিনল ওয়াহিদ কে তাই তো ট্রলির উপর থেকে উঠে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে দৌড়ে ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওয়াহিদের বুকে-

“মামা জাননননন..

পুঁচকে মেয়েটা তার ছোট্ট ছোট্ট হাত গুলো দিয়ে আদর করে দিল ওয়াহিদ কে। ওয়াহিদ আলতো করে চুমু খেলো কপালে। দুই হাতে কোলে তুলে নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বেক্তির উদ্দেশ্যে বলল-

“তোকে তো চেনাই যাচ্ছেনা রে। তোকে দেখলে বোধহয় কেউ চিনবেই না সহজে।”

“হ্যাঁ মাম্মা অনেক সুন্দরী হয়ে গেছে। মাম্মা কে দেখে তো যে কেউ ফিদা হয়ে যাবে”

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী মেমেটা ঠোঁট প্রশারিত করে হাঁসলো। পুঁচকে টার গাল টেনে বলল-

“বড্ড বেশি পাকনা হয়ে গেছ দেখছি।”

“ওহ্ মাম্মা এভাবে গাল টেনো না তো, গাল ছিঁড়ে যাবে।”

ওয়াহিদ শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল-

“এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি বাসায় ও যেতে হবে?..

মেয়েটা মৃদু হেঁসে বলল-

“চলো….

_________________

খাঁন বাড়িতে আজ যেন ঈদের দিন। চারদিকে মানুষ জনের হই হুল্লোড়। আত্মিয় স্বজনদের ভিড়। পুরো বাড়ি যেন আনন্দে আত্মহারা। জোর দমে চলছে বাহারি রকমের রান্না।

আর এই আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে হলো নির্ণয় ও আরিয়ান। আরিয়ান দীর্ঘ চার বছর পর আজ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরছে। আর নির্ণয় ও বাড়ি ফিরেছে ভাইয়ের ফেরার খবর শুনে।

আর কত দিন এভাবে চলবে? আর কত কষ্ট দিবে নিজেকে? তাই তো সব ভুলে যাওয়ার পন করেছে নির্ণয়। নিজেকে ভালবাসা হয়না বহুদিন, ইশশ্ কি হাল করেছে নিজের অবহেলা অযত্নে, তাই তো এখন নিজেকে ভালোবাসার ভালোরাখার দায়িত্ব নিয়েছে।

নির্ণয়কে আজ বহুদিন পর ঠিক আগের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে এই তো সেই নির্ণয়, যে আজ থেকে চার বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। পাঞ্জাবি-প্যান্ট পরে ভীষণ পরিপাটি হয়ে বেরিয়েছে নির্ণয়। দাড়িগুলো ছোট করেছে, তবে চুলগুলো বাবরি রেখেছে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় সবাই মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছে সেই পুরনো নির্ণয়কে।

সবাই কে নিজের দিকে ওভাবে তাকাতে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলো নির্ণয়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল-

“আমি কী সার্কাসের কোন জোকার নাকি? যে এভাবে তাকিয়ে আছ সবাই?…

আশা বেগম এগিয়ে এসে ছেলের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললেন –

“ওমা সে কি কথা? তোমাকে জোকার লাগবে কেন? মাশ আল্লাহ আমার ছেলেকে আজ খুউবই সুন্দর লাগছে। থু কারো যেন নজর না লাগে…!

“মা’ করছ টা কি? আমি কী এখন ও ছোট নাকি যে থু দিচ্ছ..?

আশা বেগম মৃদু হেঁসে বললেন-

“মা-বাবার চোখে সন্তান রা কখনো বড় হয়না রে বাপ।”

“হ্যাঁ বুঝেছি, এবার ছাড়ো লেট হয়ে যাচ্ছে।”

বাক্য শেষ করে আর দাঁড়ালো না নির্ণয় ছুটলো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। আশা বেগম পেছন থেকে ডেকে বললেন-

“সাবধানে যাইস বাপ’ তাড়াহুড়ো করিস না..!

নির্ণয় ও আশা বেগমের মতই গলা ছেড়ে বলল-

“আচ্ছা ঠিক আছে…

****************

আজ বহুদিন পর নির্ণয় নিজের রোলস রয়েস টা নিয়ে বেরিয়েছে। মনটা বেশ ফুরফুরে। সেই যে কবে মন খুলে হেঁসে ছিল তার মনে নেই। তাই আজ হাঁসছে সে। কোনো কারণ ছাড়াই হাঁসছে’ হুঁ হাঁ করে হাঁসছে। কেউ যদি নির্ণয় কে এভাবে হাসতে দেখে সে নির্ঘাত বলে বসবে- “ছেলেটা পাগল….

তবে নির্ণয়ের তাতে কিছু যায় আসে না বললেই চলে‌। সে কারো কথার ধার ধারে না- ভেবেই ঠোঁট এলিয়ে হেঁসে গলা ছেড়ে গান ধরলো-

“বট বৃক্ষের তলে আইলাম ছায়া পাইবার আশেএএএ….. বট বৃক্ষের তলে আইলাম ছায়া পাইবার আশে!

“ডাল ভাঙ্গিয়া রৌদ্র ওঠে আমার কর্মদোষে… হায়রে ডাল ভাঙ্গিয়া রৌদ্র ওঠে আমার কর্মদোষে- বন্ধু তোর লাইগা রেএ!

“বন্ধু তোর লাইগা রে’ আমার তনু জড়জড়! মনে লয় ছাড়িয়ারে যাইতাম থুইয়া বাড়িঘর! বন্ধু তোর লাইগা রেএএ…

হঠাৎ কিছু একটা দেখে ফুল স্পীডে চলা গাড়িটা সেকেন্ডে ব্রেক করল নির্ণয়। হঠাৎ ব্রেক করায় পেছনে আশা গাড়ি গুলোর ড্রাইভার রেগে মেগে কয়েকটা অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। তবে নির্ণয় সেদিকে দ্যান দিল না।

সে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে এদিক সেদিক ছুটলো। ও মূলত দিয়াকে দেখেছে রাস্তার ওপারে। তবে মূহুর্তে কোথায় চলে গেল? কোথাও দেখতে না পেয়ে নির্ণয় ফের গাড়িতে উঠে বসল, নিজের মনের ভুল ভেবে ফের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ছুটলো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।

__________________

নেওয়াজ মোল্লা বারান্দার পুরনো কাঠের চেয়ারটায় চুপচাপ বসে আছেন। বিকেলের ম্লান আলো এসে আছড়ে পড়েছে তার চোখে মুখে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তিনি অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছেন দূরের দিগন্তের দিকে। আজ মনটা বড্ড বিষন্ন, বুকের ভেতরটা যেন কোনো এক গভীর হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।

বারান্দার এই কোণটা তার বড্ড প্রিয়, অথচ আজ এখানেই বসে তার সবচেয়ে বেশি একা লাগছে। ঘুরেফিরে কেবল দিয়ার কথাই মনে পড়ছে। দিয়া আর নেই, ভাবতেই শরীরের ভেতর একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। দিয়ার সেই চপলতা, সারা বাড়ি মাথায় করে রাখা হাসি হাসি মুখ, সবকিছু এখন কেবলই ঝাপসা স্মৃতি। অথচ আজ এই পড়ন্ত বিকেলে মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনও দিয়া তার পায়ের কাছে বসে কত গল্প করল, কত আবদার জানাল।

দিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে এই বাড়িটা যেন এক নিথর জঙ্গল হয়ে গেছে। নেওয়াজ মোল্লা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়ের মৃত্যুর এই অমোঘ সত্যটা তিনি কিছুতেই মানতে পারেন না। শূন্য বারান্দার দিকে তাকালে তার বারবার ভ্রম হয়, মনে হয় এই বুঝি দিয়া তাকে পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরবে বলবে, “বাবা, একা একা বসে কী ভাবছ?” কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতার কষাঘাত তাকে মনে করিয়ে দেয়, দিয়া আর কোনোদিন ফিরবে না। দিয়ার অভাবটা আজ এই গোধূলিলগ্নে বিষের মতো নীল হয়ে বিঁধছে তার হৃদয়ে।

নেওয়াজ মোল্লা শূন্যে দৃষ্টি ফেলে শব্দ করে হেঁসে উঠলেন। তিনি তো সেদিনই মারা গেছেন যেদিন দিয়ার খন্ড খন্ড লাশের টুকরো গুলো দেখেছেন’ এখন তো শুধু দেহটা দাফন হওয়া বাকি।

********

উঠোনের উনুনে রান্না বসিয়েছে নদী। সামনেই চেয়ার পেতে বসে আছেন রুহানি বেগম। তিনি এখন সুস্থ তবে এখন আর বাড়ির কাজ করতে হয়না তাকে। সব কাজ নদীই করে। পুরো সংসার সামলায় একা হাতে। মেয়েটা কে কত করে বললেন বিয়ে করে নে আর কতদিন এভাবে চলবে?

তবে নদী সাফ সাফ না করে দিয়েছে। সে আর বিয়ে করতে চায় না। বাকি জীবনটা এভাবেই কাটাতে চায়। অনেক বুঝিয়েও যখন কোনো লাভ হলো না তখন থেকে রুহানি বেগম বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।

মেয়েটাকে আর জোর করতে চাই না। জোর করে তো অনেক কিছুই করেছেন ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। তাই মেয়েটাকে নিজের মত ছেঁড়ে দিয়েছেন। বাকি জীবনটা না হয় নিজের মতো করেই বাঁচুক।

______________

তখন প্রায় সন্ধ্যা মাগরিবের আজান পড়েছে মাত্র। প্রিয়া বায়না ধরেছে নির্ণয়ের কাছে তাকে শপিং এ নিয়ে যেতে হবে এক্ষুনি। নির্ণয় না করতে চেয়েও পারেনি। আজ কতদিন বোনদের নিয়ে শ‌পিং এ যাওয়া হয়না। তাই নির্ণয় আর মানা করল না মৃদু হেঁসে বলল-

“পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে আসতে পারলে নিয়ে যাব পাক্কা।”

নির্ণয়ের কথাটা বলতে দেরি হলেও প্রিয়ার নিজের ঘরের দিকে ছুটতে দেরি হলো না। মেয়েটা ছুটতে ছুটতেই চেঁচিয়ে বলে উঠল-

“তুমি এখানেই দাঁড়াও কিন্তু। আমি এই যাব এই আসবো। শুধু দুই মিনিট ওকেই।”

প্রিয়া কে এভাবে ছুটতে দেখে নির্ণয় শব্দ করে হেঁসে উঠল। গলা ছেড়ে উচ্চ স্বরে বলল-

“সাবধানে পড়ে যাবি কিন্তু..!

“আসছি এক্ষুনি..!!

নির্ণয় ফের হাঁসল। আজ কতদিন পর এই মানুষ গুলোর সাথে একটু কথা বলছে মন খুলে। নির্ণয়ের ভাবতেই অবাক লাগে এই মানুষ গুলোর থেকেই সে চার চারটা বছর দূরে থেকেছে।

“চলো….

নির্ণয়ের ভাবনার সুতো ছিঁড়ল প্রিয়ার কন্ঠ স্বরে। প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল-

“তুই রেডি?”

প্রিয়া এক গাল হেঁসে বলল-

“কোনো সন্দেহ আছে?”

নির্ণয় দুই পাশে মাথা নেড়ে না বলল। প্রিয়া সুন্দর করে হাঁসল। বলল-

“চলো’ চলো’ পরে লেট হয়ে যাবে।”

নির্ণয় কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল-

“ওদের তো আস্তে দিবি নাকি..!!

“ওদের আসতে হবেনা। তুমি আসো আমরা গাড়িতে গিয়ে বসে থাকি। আসো আসো”

নির্ণয় প্রিয়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-

“ওকে চল…

****

বেশ খানিকক্ষণ পর নিলা মিলা আরিয়ান হৃদয় সবাই এসে হাজির হলো। নির্ণয় কত করে বলল’ দুটো গাড়ি নিতে কিন্তু কে শোনে কার কথা? ওরা নির্ণয়ের গাড়িতেই যাবে’ যাবে মানে যাবে!

এই আনন্দের মূহুর্ত টা নির্ণয় নষ্ট করতে চায়না। তাই আর বাঁধা দিল না। ওরা যা বলল চুপচাপ তা মেনে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। সো সো শব্দ তুলে গাড়িটা বেরিয়ে পড়ল খাঁন বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে।

__________________

এক দেড় ঘন্টার বেশ লম্বা একটা জার্নি শেষে গাড়িটা এসে থামলো বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে। প্রিয়া খুশীতে আত্মহারা। আজ সে অনেক সপিং করবে। নির্ণয়ের পকেট খালি করার চিন্তা ভাবনা নিয়েই আজ এখানে এসেছে।

“তোরা এখানেই দাঁড়া আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”

সব গুলো এক সাথে বলে উঠলো- “আচ্ছা”

নির্ণয় চোখ পাকিয়ে তাকাতেই সব গুলো ফের চুপ হয়ে গেল। তা দেখে নির্ণয় মৃদু হাঁসল। বলল-

“এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি। যদি এক পা ও লড়েছিস তোদের খবর আছে।”

মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিতেই নির্ণয় গাড়ি নিয়ে পার্কিং এরিয়াতে চলে গেল।

“খবিশ একটা এখনো ভালো হল না। আগের মতই রাক্ষস রয়ে গে…….

বাক্যটা শেষ করতে পারল না নিলা, প্রিয়া ওর মুখটা চেপে ধরে দাঁত খিচে বলল-

“এই চুপ কর, ভাইয়া শুনলে আমাদের এখানে ফেলেই টাটা বাই বাই বলে চলে যাবে কিন্তু।”

“এই আমার মুখ ছাড় ভাইয়ের চামচা।”

“তু…….

“এইইইই তোরা চুপ করবি বা*ল? সারাক্ষণ শুধু সতিনের মতো লেগে থাকিস’ যত্তসব।”

প্রিয়ার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল শেষ করতে আর পারল না আরিয়ানের ধমক শুনে।

“ওই যে ভাইয়া আসছে চল….

_______________

ওয়াহিদরাও আজ এসেছে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে। চারদিকের ঝলমলে আলো আর মানুষের ভিড় দেখে ছোট্ট মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। ওয়াহিদের আঙুল শক্ত করে ধরে নিজের পুঁচকে পায়ের ধীর পদক্ষেপে সে এগিয়ে চলেছে। ওয়াহিদ নিচু হয়ে তাকে সব কিছু চিনিয়ে দিচ্ছে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে রঙিন সব দোকানের কাঁচের ওপাশটা। মেয়েটির চোখে এক আকাশ কৌতূহল।

হঠাৎ সামনে একটা আইসক্রিমের দোকান পড়ল। বাহারি রঙের আইসক্রিমের ছবি আর রঙিন আলো দিয়ে সাজানো দোকানটি দেখে মেয়েটি থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশে রাখা থরে থরে সাজানো বিভিন্ন রঙের আইসক্রিম দেখে তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আর এক পা-ও নড়তে চাইছে না। ওয়াহিদ তাকে নড়তে না দেখে বলল-

“কী হয়েছে পরী?”

মেয়েটা মিষ্টি করে হেঁসে বলল-

“আইসক্রিম খাব”

ওয়াহিদ কিছু বলার আগেই পেছন থেকে কেউ বলে উঠল-

“কিসের আইসক্রিম? কোনো আইসক্রিম খাওয়া চলবে না।”

আহ্লাদী মেয়েটা শব্দ করে কেঁদে উঠে জরিয়ে ধরলো ওয়াহিদের গলা। ওয়াহিদ মেয়েটা কে ধমক দিয়ে বলল-

“তোর সমস্যা কি বনু? এভাবে বকছিস কেনো ওকে?

“তো….

“তুই চুপ থাক তোকে কিছু বলতে বলেছি? ও আইসক্রিম খেতে চেয়েছে মানে ও এখন আইসক্রিম খাবে। চলো পরী মামা আছি না? মামা কিনে দিবে তোমাকে আইসক্রিম।”

“যত্তসব ঢং’ হুহহহহহ….

বাক্য সম্পূর্ণ করে পেছনে ঘুরতেই সজোরে এক ধাক্কা খেলো কারো বুকের সাথে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠল-

“চোখ কী পেন্টের পকেএএএএএ…….

বাকিটুকু আর বলতে পারল না। সামনে নির্ণয় কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা ভড়কাল। নির্ণয় কারো সাথে ফোনে কথা বলছিল ধাক্কা খাওয়া বেক্তিটির মুখের দিকে তাকাতেই তার হাত ফসকে ফোনটি আছড়ে পড়ল ফ্লোরে। থমকে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল-

“দিয়া…..

মেয়েটা বোধহয় এবার আরও বেশি ভড়কালো’ এদিক সেদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় তুতলে তুতলে বলল-

“ক……কে দিয়া?…..

ইতিমধ্যেই নিলা মিলা প্রিয়া আরিয়ান হৃদয় সবাই এসে জমা হয়েছে সেখানে। প্রিয়া মেয়েটা কে দেখে খুশি তে দৌড়ে গিয়ে ঝাপটে জরিয়ে ধরে বলল-

“ভাবি! ভাবি ত…. তুমি চলে এসেছো ভালোই হয়েছে। এখন আমরা সবাই মিলে এক সাথে শপিং করব ঠিক আছে?…

মেয়েটা নিজের থেকে প্রিয়া কে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল-

“Who is Diya?”

প্রিয়া কিছু বলার আগেই নির্ণয় এসে খপ করে চেপে ধরলো মেয়েটার হাত। কাঁপা গলায় বলল-

“অনেক হয়েছে এবার বাড়ি চলো” আর কত শাস্তি দিতে চাও?”

মেয়েটা কিছু বলার পূর্বেই ওয়াহিদ এসে ছাড়িয়ে দিল নির্ণয়ের হাত‌। কড়া গলায় বলল-

“এটা কোন ধরনের অসভ্যতা নির্ণয়? এটা পাবলিক প্লেস দেখতে পাচ্ছিস না?”

নির্ণয়ের মূহুর্তে রাগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হিংস্র থাবায় চেপে ধরলো ওয়াহিদের শার্টের কলার-

“কু……..

“এই পচা লোক তুমি আমার মামার শার্ট ধরেছ কেনো হ্যাঁ? ছাড়ো বলছি।”

বাচ্চা একটা কন্ঠস্বর শুনে মূহুর্তে নির্ণ‌‌য় থেমে গেল। মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকাতেই দেখল একটা পুতুল তার পেন্ট খামচে ধরে আছে। নির্ণয়ের শরীর জুড়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে ওয়াহিদের শার্টের কলার ছেঁড়ে দু কদম পিছিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল পুতুল টার সামনে।

সমস্ত রাগ গিলে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙ্গা গলায় বলল-

“ছ…ছ….. ছেঁড়ে দিয়েছি। দেখো দেখো ছেঁড়ে দিয়েছি… তো…তোমার আম্মু….

বাকিটা আর বলতে হলো না। পুচকেটা হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে দিল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে, বলল-

“ওই তো আমার মাম্মা’ কিন্তু তুমি কে?”

নির্ণয় হাত বাড়িয়ে বাচ্চা কে ছুঁতে নিলেই মেয়েটা এসে দূরে সরিয়ে নিল বাচ্চা কে। চেঁচিয়ে উঠে বলল-

“খবর দার আপনার ওই নোংরা হাত দিয়ে আমার মেয়েকে আপনি ছুঁবেন না।”

নির্ণয়ের এই মূহুর্তে মনে হল ওর কলিজা টা কেউ শক্ত করে খামচে ধরেছে, ও অশ্রুসিক্ত নয়নে মাথা তুলে তাকালো বাচ্চাটার দিকে। বাচ্চাটা ওর দিকেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। নির্ণয় আকুতি করে বলল-

“প্লিজ….

বলতে বলতেই কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো চোঁখের কার্নিশ বেয়ে। দিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। তবুও নিজেকে শক্ত করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। নির্ণয় ফের বলল-

#চলবে

(ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)