#প্রনয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৭ (অন্তিম পর্ব- প্রথমাংশ)
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
“এতো বড় শাস্তি দিও না আমাকে আল্লাহর দোহায় লাগে।”
দিয়া তাচ্ছিল্যভরে একবার হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা নেই, নেই কোনো পুরনো চেনা টান; বরং একরাশ অবজ্ঞা ঝরে পড়ল। তবে নির্ণয়ের কথার বিপরীতে সে কোনো প্রতিউত্তর করল না। তার এই নীরবতা যেন নির্ণয়ের বুকে পাথর চেপে বসল।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নিলা, মিলা, আরিয়ান আর হৃদয়ের অবস্থা তখন তথৈবচ। তারা সবাই যেন পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। বিষ্ময়ে বিস্ফারিত চোখে তারা তাকিয়ে আছে দিয়ার দিকে। আরিয়ানের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানবীকে সে কীভাবে দিয়া বলে স্বীকার করবে? মানুষের কি পুনর্জন্ম হয়?
আরিয়ানের চোখের সামনে চার বছর আগের সেই বিভীষিকাময় দিনটি ভেসে উঠল। যার নিথর দেহটা নিজ হাতে কবরে শুইয়ে এসেছিল, যার দাফন কার্য সম্পন্ন করে সে নিজে মাটি দিয়েছিল। আজ এত বছর পর সেই রক্ত-মাংসের মানুষটি এভাবে জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে, এটা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা অসম্ভব।
হৃদয় বিড়বিড় করে উঠল, “এটা কি কোনো ভ্রম?
নিলা আর মিলা একে অপরের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তাদের মনে হচ্ছে তারা কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাটির চঞ্চলতা আর দিয়ার ওই শীতল চাহনি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, এটা কোনো স্বপ্ন নয়, এটাই রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু যে দিয়াকে তারা চিনত, সেই চপল মেয়েটির সাথে এই গম্ভীর আর কাঠিন্য ভরা মেয়েটির আকাশ-পাতাল পার্থক্য। দিয়া যেন ফিরে এসেছে, কিন্তু তার আত্মাটা বদলে গেছে।
নির্ণয় তখনও দিয়ার থেকে খানিকটা দূরে হাঁটু গেড়ে ওভাবেই বসে আছে। তার চারপাশের শব্দগুলো যেন আচমকা মিলিয়ে গেল। বসুন্ধরা সিটির এই কোলাহল, মানুষের আনাগোনা সবকিছুই ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মনে হচ্ছে, সে কোনো এক গভীর অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। যার জন্য চার বছর ধরে সে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করেছে, যাকে প্রতি রাতে কবরের অন্ধকারে কল্পনা করে ডুকরে কেঁদেছে, সে আজ রক্ত-মাংসের শরীরে সামনে দাঁড়িয়ে!
নির্ণয়ের হৃদস্পন্দন এখন অনিয়মিত। একদিকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আনন্দ, অন্যদিকে দিয়ার ওই ‘কানিঠ্যনতা’ তার কলিজায় বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে। নির্ণয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভাবলো “তবে কি আমি ভুল মানুষের জন্য কেঁদেছি? দিয়া কি তবে বেঁচে ছিল? নাকি এই দিয়া অন্য কেউ?” মস্তিষ্ক আর হৃদয়ের এই দ্বন্দ্বে নির্ণয় পাগলপ্রায়। সে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায়লো দিয়া কে, কিন্তু আঙুলগুলো কাঁপছে ভীষণ।
*****
বিষ্ময়ে বিমুড় আরিয়ান কয়েক পা এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে এখনও অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। সে দিয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। দিয়া আগের মতোই নির্বিকার, চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো চেনা আবেগ।
আরিয়ান ধরা গলায় ডাকল, “ভাবি? সত্যিই কি আপনি?”
দিয়া এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় ছোট্ট করে বলল- “হুঁ”
আরিয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল- “মিথ্যে বলছেন আপনি! নিজের হাতে আমি যার কাফন ছুঁয়েছি, কবরে মাটি দিয়েছি। সে মানুষটি কীভাবে ফিরে আসতে পারে?”
কিন্তু আরিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল- “আপনি যদি বেঁচেই থাকেন তাহলে আমরা যাকে দাফন করলাম সে কে?”
দিয়া তখনও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আরিয়ানের দিকে’ ঠোঁটের কোনে এক চিলতে বাঁকা হাঁসি নিয়ে বলল- “সেটাও আমি!”
আরিয়ানের সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দিয়া ঠিক কী বলছে সেটা তার বোধগম্য হচ্ছে না। সে পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে দেখছে দিয়াকে। আরিয়ান কে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কয়েক কদম এগিয়ে এসে আরিয়ানের পাশে দাঁড়াল হৃদয়। আর্তনাদ করে বলল-
“আপনি বেঁচে থাকলে আমাদের জানালেন না কেন? কেন আমাদের এই নরক যন্ত্রণায় রাখলেন?”
দিয়া এবার সরাসরি হৃদয়ের চোখের দিকে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে কোল থেকে বাচ্চাটাকে নামিয়ে দিয়ে হৃদয়ের দিকে এক ধাপ এগিয়ে এল। ফিসফিস করে বলল-
“যার মরে যাওয়াটা সবার জন্য স্বস্তির ছিল, তার ফিরে আসাটা আপনাদের কাছে ভ্রম মনে হতেই পারে। তবে মনে রাখবেন দেবর সাহেব, সব মরণ কিন্তু এক নয়, কখনো কখনো মানুষ বেঁচে থেকেও মরে যায়।আর আমি সেই মৃতদের দলে নাম লিখিয়েছি অনেক আগেই।”
দিয়ার কথাগুলো হৃদয় ও আরিয়ানের কানে সজোরে চড়ের মতো বাজল। বুঝতে পারল, এই দিয়া সেই আগের দিয়া নয়। এর ভেতরে দাফন হয়ে গেছে সেই চপল মেয়েটি, আর জন্ম নিয়েছে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। ওদের ভাবনার মাঝেই হঠাৎ দিয়ার উর্নার আঁচল টেনে ধরল বাচ্চা মেয়েটি। সে নির্ণয়কে দেখিয়ে কৌতূহলী চোখে দিয়ার দিকে তাকালো। তার কচি কণ্ঠস্বরে পুরো পরিবেশটা যেন থমকে গেল। সে আধো-আধো বোলে জিজ্ঞেস করল-
“মাম্মা, ওই লোকটা কাঁদছে কেন? ওনার কি হয়েছে?”
বাচ্চাটির এই একটি প্রশ্নে নির্ণয়ের হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে ঝাপসা চোখে তাকালো বাচ্চাটির দিকে। বাচ্চাটি আবার প্রশ্ন করল-
“এই লোক গুলো কে মাম্মা? তুমি কি ওনাদের চেনো? আর উনি ওভাবে মাটিতে বসে আছেন কেন?”
বাচ্চাটির প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সিসার মতো নির্ণয়ের কানে বিঁধতে লাগল। দিয়া নিচু হয়ে অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিল। নির্ণয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল-
“না মা, আমি ওনাকে চিনি না”
“তাহলে কাঁদছে কেনো?”
“হয়তো নিজের সব থেকে প্রিয় খেলনাটা হারিয়ে ফেলেছেন তাই কাঁদছেন! চলো মামণি, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
কথাটা বলেই দিয়া পেছনে না ফিরে ওয়াহিদের দিকে ইশারা করল। ওয়াহিদ ও সায় জানিয়ে হাঁটা ধরলো নিজেদের গন্তব্যে, নির্ণয় চেয়েও যেন আটকাতে পারল না দিয়াকে, শুধু নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো ওদের চলে যাওয়া।”
*************
নির্ণয় তখন ও ঠাঁই বসে আছে ফ্লোরে যখন হুঁশ ফিরল সে আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করল না। ছুটে গেল দিয়ার পিছু। পার্কিং লটে তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দিয়া বাচ্চাটিকে নিয়ে ওয়াহিদের গাড়িতে গিয়ে বসলো। নির্ণয় টলমল পায়ে গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তার সারা শরীরে কাঁপন। সে জানালার কাঁচে করাঘাত করে বলল-
“দিয়া একবার অন্তত আমার কথাটা শুনো, প্লিজ।”
দিয়া জানালা খুলল না। সে সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভারকে বলল, “গাড়ি স্টার্ট দাও।”
ওয়াহিদ আড়চোখে একবার নির্ণয়কে দেখল। নির্ণয়ের এই দশা দেখে তার মায়াও হচ্ছে, কিন্তু হায় সে যে চাইলেও কিছু করতে পারবে না।
গাড়িটা স্টার্ট হতেই চলতে শুরু করল, নির্ণয় সেই চলন্ত গাড়ির পেছনে দৌড়াতে লাগল। আরিয়ান আর হৃদয় তাকে আটকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু নির্ণয় তখন উন্মাদ। সে চিৎকার করে বলছে-
“দিয়া! প্লিজ যেওনা দিয়া! আমার কথাটা শুনো!”
রাস্তার মাঝখানে আছড়ে পড়ল নির্ণয়। তার সেই পরিপাটি পাঞ্জাবি আজ ধুলোয় ধূসরিত। যে নির্ণয় চার বছর পর নিজেকে সাজিয়েছিল, আজ সে আবার মুখ থুবড়ে পড়ল সেই অতল শূন্যতায়।
গাড়ির রিয়ার ভিউ মিররে দিয়া দেখল নির্ণয় রাস্তায় পড়ে আছে। তার চোখে এক পলকের জন্য অশ্রু চিকচিক করে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সে চোখ মুছে নিল, দৃষ্টি ফেলে তাকালো মেয়ের দিকে, যে এই মূহুর্তে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে পরম শান্তিতে। দিয়া আলতো করে চুমু খেলো মেয়ের কপালে! নিম্ন স্বরে বলল-
“তোমার বাবা কে খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে এনে দিব মা!”
__________________
খাঁন বাড়িতে দিয়ার বেঁচে থাকার খবরটা যখন পৌঁছাল, তখন মুহূর্তের মধ্যেই যেন পুরো বাড়ির ওপর দিয়ে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। খবরটা শোনার পর থেকে বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেন একেকটা জলজ্যান্ত পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। কারো মুখে কোনো রা নেই, কারো চোখে কোনো ভাষা নেই, সবাই যার যার জায়গায় নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আশা বেগম ড্রয়িংরুমের মাঝখানে সোফায় বসে ছিলেন, খবরটা শোনার পর তিনি ওভাবেই স্থির হয়ে আছেন। তার হাতে থাকা তসবিহটা মেঝের কার্পেটে পড়ে আছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার চাউনি শূন্য, মনে হচ্ছে তিনি এই পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো জগতে হারিয়ে গেছেন। এক অজানা আতঙ্ক আর বিস্ময় তাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে তিনি কিছু বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন।
*****
আশরাফুল খাঁন সবে’ই বাড়ি ফিরেছেন অফিস থেকে। দীর্ঘ সময়ের ক্লান্ত শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিতেই কানে এল আরিয়ানের সেই ফোন কলের খবরটা। খবরটা শোনার পর আশরাফুল খাঁনও যেন মুহূর্তেই এক জলজ্যান্ত পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন। তার গায়ের কোটটা অর্ধেক খোলা অবস্থায় ওভাবেই ঝুলে রইল, হাতের ফাইলগুলো মেঝেতে ছিটকে পড়ল এদিক সেদিক। তিনি শুধু পাথরের মতো স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন সামনের শূন্য দেওয়ালের দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই বসে রইলেন আশরাফুল খাঁন। তিনি ঠিক হজম করতে পারছেন না বেপরটা। তাই তো আজ বহুদিন পর ফোন লাগালেন নেওয়াজ মোল্লার নাম্বারে। বেশকিছু সময় রিং হওয়ার পর কল টা রিছিভ হলো। ওপাশ থেকে ভেসে এলো নেওয়াজ মোল্লার ভারিক্কি কন্ঠ স্বর-
“আসসালামুয়ালাইকুম! কে বলছেন?
আশরাফুল খাঁন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গত চার বছর ধরে নেওয়াজ মোল্লা তাকে ঠিক এভাবেই এড়িয়ে চলেছেন। তবে তিনি সে সব পাত্তা দিলেন না। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন-
“ওয়ালাইকুম আসসালাম! কেমন আছেন বিয়ায় সাহেব?
“এই তো আলহামদুলিল্লাহ ভালোই!”
আশরাফুল খাঁন নিচু স্বরে বললেন-
“আমরা কেমন আছি জিজ্ঞেস করবেন না?”
নেওয়াজ মোল্লা কটাক্ষ করে বললেন-
“জিজ্ঞাসা করে আর কী হবে? অবশ্যই ভালোই আছেন!”
আশরাফুল খাঁন নেওয়াজ মোল্লার কটাক্ষ বুঝতে পেরে কথা ঘুরিয়ে বললেন-
“আপনার সাথে জরুরী কিছু কথা ছিল আপনি কি একটু কষ্ট করে এ বাড়িতে আসতে পারবেন?”
নেওয়াজ মোল্লা শান্ত স্বরে ছোট্ট করে বললেন- “কেনো?”
আশরাফুল খাঁন কেমন কথা গুলিয়ে ফেলছেন। তবুও তিনি নিজেকে সংযত করে বললেন-
“ফোনে তো ওতো কথা বলা যাবেনা, আপনি একটু কষ্ট করে এ বাড়িতে আসলে বড় উপকার হতো।”
নেওয়াজ মোল্লা খানিক্ষণ ভেবে ছোট্ট করে বললেন- “আসছি’
আশরাফুল খাঁন তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন- “বেয়াইন ও নদী কেও সাথে নিয়ে আসিয়েন।”
নেওয়াজ মোল্লা কপাল কুঁচকে ফোনের দিকে একবার তাকালেন। অতঃপর বললেন-
“বেপার কী বলেন তো? আজ এতদিন পর সপরিবারে ডাকছেন যে?”
আশরাফুল খাঁন জোর পূর্বক হেঁসে বললেন-
“আসেন, আসলেই বুঝতে পারবেন।”
বাক্য শেষ হতেই ওপাশ থেকে টুট টুট শব্দ এলো কল কাঁটার। আশরাফুল খাঁন ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
_____________________
তখন প্রায় রাত আটটা ছুঁই ছুঁই-
নেওয়াজ মোল্লা রুহানি বেগম ও নদী এসে পৌঁছেল খাঁন বাড়িতে। এসেই দেখলেন খাঁন বাড়ির সকলে ড্রয়িং রুমে বসে আছেন নিঃশব্দে। নেওয়াজ মোল্লা ভ্রু যুগল কুঁচকে প্রশ্ন করলেন-
“আমাদের অপেক্ষায়?”
আশরাফুল খাঁন সৌজন্যমূলক হেঁসে বললেন-
“ওই আর কি! ভেতরে আসেন, বসেন। আর আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এ বাড়িতে আসার জন্য।”
নেওয়াজ মোল্লা সোফায় বসতে বসতে বললেন- “তা কিসের জন্য ডাক পড়ল এই অধমের?”
আশরাফুল খাঁন কোত্থেকে কথা শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। তাই আমতা আমতা করে বললেন-
“নিজেকে আগে একটু শক্ত করুন। তারপর না হয় বলি!”
“এত ভনিতা না করে সোজাসুজি বলেন, কী বলবেন!”
আশরাফুল খাঁন চোখ বন্ধ করে একটা বড় করে শ্বাস টেনে বললেন-
“দিয়া মা ফিরে এসেছে! ও বেঁচে আছে!”
বাক্য শেষ হতেই নেওয়াজ মোল্লা এক লাফে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। খেকিয়ে উঠে বললেন-
“ফাজলামি করার যায়গা পান না আর? মরা মানুষ ফিরে আসে কীভাবে?”
“এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো? শান্ত হয়ে বসেন, আগে পুরো কথাটা তো শুনেন।”
“আপনাদের এই ফালতু কথা শোনার ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই আমার নেই।”
আশরাফুল খাঁন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। আরিয়ানের পাঠানো ভিডিও ক্লিপ টা চালিয়ে নেওয়াজ মোল্লার সামনে ধরলেন। ভিডিও টাই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে দিয়া ও একটি ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা মেয়েকে। নেওয়াজ মোল্লা অবাক বাকহারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ধপ করে বসে পড়লেন সোফায়। মাথায় হাত দিয়ে বললেন-
“এ…..এটা কীভাবে সম্ভব? না এটা হতেই পারে না! এটা আমার দিয়া হতেই পারে না! আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।”
আশরাফুল খাঁন কিছু বলার বা বুঝে ওঠার পূর্বেই উনার হাত থেকে খপ করে ফোনটা কেড়ে নিল নদী। আরিয়ান ওখান থেকে দিয়ার একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। নদী বিস্ফোরিত নয়নে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে দৃশ্যমান মানবীকে দেখে থমকে গেল তার হৃদস্পন্দন। হ্যাঁ, এটা দিয়াই! একদম স্পষ্ট দিয়াকে দেখা যাচ্ছে। ঠিক চার বছর আগের সেই চেনা মুখ, অথচ আজ সেই চোখেমুখে এক অদ্ভুত কাঠিন্য।
নদী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; তার চোখের পাতা নড়ছে না, কেবল দু’চক্ষু বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অজস্র নোনা পানি। ফোনের স্ক্রিনে দিয়ার ছায়া ছুঁয়ে দেখার এক ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। ফিরে পাওয়ার এই তীব্র ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে রুহানি বেগম জ্ঞান হারিয়েছেন ইতিমধ্যেই। তিনি পাশেই নিথর হয়ে পড়ে আছেন।
পুরো বাড়িতে যখন নিথর নীরবতা, তখন সবার হুশ ফিরল নদীর চিৎকারে। সে রুহানি বেগমের মুখ ধরে ঝাকাচ্ছে আর পাগলের মতো ডাকছে, “মা! ও মা! চোখ খোলো! মা” ও মা”
তবে রুহানি বেগম কোনো জবাব দিচ্ছেন না। তিনি নিথর হয়ে পড়ে আছেন সোফায়। আশা বেগম ছুটে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে রুহানি বেগমের চোখে মুখে ছিটালেন। বেশ কিছু সময় পর জ্ঞান ফিরল রুহানি বেগমের। তিনি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালেন আশে পাশে। উনার জ্ঞান ফিরতেই মুহূর্তের জন্য তিনি সব ভুলে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই যখন মনে পড়ল, উনার সারা শরীর মির্গি রোগীর ন্যায় কেঁপে উঠল। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে বললেন-
“আমার মাইয়া বাইচা আছে? ও নদীর বাপ আমারে লইয়া যান না মাইয়াডার কাছে।”
রুহানি বেগমের কান্নার তোড়ে উনার কণ্ঠ দিয়ে তখন কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, কেবল বুক ফেটে এক অদ্ভুত গোঙানি বেরিয়ে আসছে। উনার এই অবস্থা দেখে আশা বেগম এগিয়ে এলেন। তিনি নিজেও বিমূঢ়, তবুও নিজেকে সামলে রুহানি বেগমকে আগলে ধরলেন। উনার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বললেন-
“হ্যাঁ, আমরা যাব দিয়াকে আনতে। আপা আগে আপনি একটু শান্ত হন।”
আশা বেগমের সান্ত্বনায় রুহানি বেগম যেন কিছুটা শান্ত হলে সবাই দ্রুত প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। আরিয়ান ওয়াহিদের নতুন ফ্ল্যাটের লোকেশন আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন ড্রাইভার কে। তারা মূলত তখনই দিয়া কে ফলো করে ওয়াহিদের ফ্ল্যাট অব্দি পৌঁছেছে, তবে ভেতরে যাওয়ার সাহস হয়নি কারো তাই তো সকল কিছু ফোন করে জানিয়েছেন আশরাফুল খাঁন কে। সবাই চটজলদি বেরিয়ে পড়লেন। যত দ্রুত সম্ভব ওখানে পৌঁছাতে হবে।
________________
তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত প্রায় দশটা। নিস্তব্ধ শহরের বুক চিরে দুই পরিবারের সবাই এসে পৌঁছাল ওয়াহিদের ফ্ল্যাটে। ড্রয়িংরুমে সোফার এক কোনে মাথা নিচু করে বসে আছে দিয়া। ঠিক চার বছর আগে যাকে সাদা কাফনে জড়িয়ে কবরে শুইয়ে আসা হয়েছিল, সেই মানুষটিই আজ রক্ত-মাংসের শরীরে জীবন্ত হয়ে তাদের সামনে। দিয়ার পরনে একদম সাধারণ একখানা শাড়ি, চুলগুলো আলগা করে পিঠে ছেড়ে দেওয়া। তার সেই চপলতা আজ আর নেই, সেখানে জেঁকে বসেছে হিমশীতল এক কাঠিন্য।
নেওয়াজ মোল্লা কম্পিত পায়ে এগিয়ে এলেন। তার পা যেন মাটি আঁকড়ে ধরছে না। তিনি বিস্ময়কর আর হাহাকার মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজের মেয়ের দিকে। চারটা বছর যে বাবা প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে মেয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন, আজ সেই মেয়েকে সামনে দেখে তিনি যেন বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের এক দোলাচলে পড়ে গিয়েছেন। তিনি অস্ফুট স্বরে ডাকলেন, “দিয়া… মা আমার?”
দিয়া মাথা তুলল না। সে আগের মতোই পাথরের মতো বসে রইল। নেওয়াজ মোল্লা ধীর পায়ে তার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার হাত দুটো কাঁপছে। মেয়ের মাথায় হাত ছোঁয়ানোর জন্য হাতটা বাড়িয়েও মাঝপথে থামিয়ে দিলেন তিনি। মনে হচ্ছে, ছুঁয়ে দিলেই বুঝি এই ভ্রমটা ভেঙে যাবে, দিয়া বুঝি আবার মিলিয়ে যাবে শূন্যতায়।
পুরো ঘরজুড়ে তখন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। নির্ণয় দরজার কাছে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, রুহানি বেগম আর আশা বেগম একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। রুহানি বেগম চেয়েও মেয়ের কাছে যেতে পারছেন না। নদী এক কোনে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কারো মুখে কোন রা নেই। কেউ কোনো শব্দ করছে না।
তা দেখে নদী কমেক কদম এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল দিয়ার পায়ের কাছে। কয়েক সেকেন্ড সেভাবেই বসে রইলো। এরপর হঠাৎই দিয়ার পা দুটো জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল-
“আমারে মাফ করে দে বইন। আমি যে আর এই পাপের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারছি না। আমি রোজ মরছি একটু একটু করে।”
দিয়া মাথা তুলে তাকালো নদীর দিকে। তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল-
“এখানে কেনো এসেছো? আমি তো তোমাদের সবার থেকে দূরেই সরে গিয়েছি তাহলে এখন এত কিছু কেনো?”
দিয়া সব কিছুই শুনেছে ওয়াহিদের থেকে। সেইদিন যে নদীর সাথে নির্ণয় না অন্যকেউ ছিল সেটাও যানে দিয়া। সব কিছু যেনে বুঝেই সে ফিরে এসেছে। আর কত? আর কতদিন মেয়েটাকে বাবার আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত করবে? মেয়েটার জন্যই তার ফিরে আসা!
“বিশ্বাস কর দিয়া সেদিন আমার সাথে নির্ণয় ছিল না। ওটা ওটা…..
“ওঠো আমার পায়ের কাছ থেকে।”
“প্লিজ আমার কথাটা শোন!”
দিয়া এবার চিৎকার করে বলে উঠল-
“উঠতে বলেছি না? কথা কানে যায় না?”
নদী ভয়ে কেঁপে উঠল। তড়িঘড়ি করে দিয়ার পায়ের কাছ থেকে উঠে দূরে সরে গেল। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে দিয়ার দিকে। তাদের মানতে একটু সমস্যা হচ্ছে যে এটা দিয়া। আশরাফুল খাঁন অনেকক্ষণ যাবত চুপ ছিলেন তবে এখন আর চুপ থাকতে পারলেন না। এগিয়ে এসে দিয়ার উদ্দেশ্যে বললেন-
“চার টা বছর তোমার কাছে খেলনা মনে হয়? একটা বারও ভেবেছ নির্ণয়ের কথা? নির্ণয়ের টা বাদই দিলাম একবারও নিজের পরিবারের কথা ভেবেছ? কীভাবে কেটেছে তাদের এই চারটা বছর তোমাকে ছাড়া?”
দিয়া শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো জবাব দিচ্ছে না। আশরাফুল খাঁন ফের বললেন-
“কেনো করলে এসব? কেনো নিজের মিথ্যে মৃত্যু সাজালে? কে ছিল ওই মেয়ে?”
ওয়াহিদ এগিয়ে এসে কিছু বলতে নিলেই দিয়া ওর হাত ধরে চুপ থাকতে বলল। তবে ওয়াহিদ আজ আর শুনলো না দিয়ার কথা। দিয়ার হাতটা নিজের হাতের উপর থেকে সরিয়ে বলল-
“অনেক তো হলো? চারটা বছর! আর কত চুপ থাকতে বলিস? এবার না হয় এই লুকোচুরির খেলা শেষ হোক!”
দিয়া আর বাঁধা দিল না ওয়াহিদ কে। ওয়াহিদ এগিয়ে এসে বলতে শুরু করল।
________________
—চার বছর আগে—
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই দিয়ার শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে, এক অসহ্য অস্বস্তি সারাক্ষণ ঘিরে ধরেছে তাকে। বার বার বমি ভাব হচ্ছে, আর মাথাটা যেন বনবন করে ঘুরছে। সকাল থেকে এক লোকমা খাবারও মুখে তুলতে পারেনি সে। খাবারের গন্ধে নাড়ি উল্টে আসছে।
দিয়ার মনে মনে খটকা লাগল, একটা জোরালো সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল বুকের ভেতর। কিন্তু এই মুহূর্তে বাড়িতে কাউকে কিছু বলা সম্ভব নয়। ভাগ্যক্রমে নির্ণয় আজ বাড়িতে নেই, ব্যবসায়িক কাজে সকাল সকালই বেরিয়ে পড়েছে। এটাই সুযোগ। নির্ণয় না থাকায় বাড়ি থেকে বের হতে দিয়ার খুব একটা বেগ পেতে হলো না।
সে দ্রুত তৈরি হয়ে একটা ওড়না ভালো করে জড়িয়ে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে এল। একটা অটো ধরে সোজা গেল তাদের পারিবারিক ডক্টর আসাদের ক্লিনিকে।
হঠাৎ দিয়াকে এভাবে একা হসপিটালে দেখে ডক্টর আসাদ বেশ অবাক হলেন। তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার দিয়া মা? একা কেন? শরীর বেশি খারাপ?”
দিয়া মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে নিজের শারীরিক অবস্থার সবটুকু খুলে বলল। ডক্টর আসাদ আর দেরি না করে তাকে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দিলেন। বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষার পর রিপোর্টটা হাতে নিয়ে ডক্টর আসাদের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। তিনি রিপোর্টটা দিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “অভিনন্দন দিয়া! তুমি মা হতে চলেছ। রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- “তুমি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।”
দিয়া কাঁপা কাঁপা হাতে রিপোর্টটা হাতে নিল। পরম মমতায় সে পেটের ওপর হাত রাখল। এই মুহূর্তের অনুভূতিটা যেন অন্য সব সুখের চেয়ে আলাদা। নিজের অজান্তেই তার চোখ দুটো ভিজে এল। সে ডক্টরের উদ্দেশ্যে বলল-
“রিপোর্টা আপনি আপাতত আপনার কাছেই রাখেন আঙ্কেল। আর হ্যাঁ এই খুশীর সংবাদ টা আমি নিজে জানাতে চাই সবাই কে, তাই প্লিজ আপনি কাউকে কিছু বলিয়েন না কেমন!”
ডক্টর আসাদ এক গাল হেঁসে বললেন- “তুমি যেটা বলো মা’ আমি কাউকে কিছু বলব না!”
দিয়া এক গাল হেঁসে বেরিয়ে পড়ল ক্লিনিক থেকে। বাড়ির বাইরে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। তাই চটজলদি বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে। সেদিন রাতে নির্ণয় আর বাড়ি ফিরেনি। তাই আর জানানোও হয়নি।
________________
শুক্রবার আজ খাঁন বাড়িতে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে নির্ণয়ও খুব ব্যস্ত। তাই দিয়া ভাবল আবার একটু পরিক্ষা করবে। তাই বাড়ির কাজের ম্যাড কে দিয়ে একটা কিট প্রেগনেন্সি টেস্ট কিট নিয়ে এসে টেস্ট করে দেখল পজেটিভ। মেয়েটার খুশী দেখে কে?
তখন সন্ধ্যা সাতটা দিয়া খুশী মনে কিট টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো ঘরে থেকে। কিন্তু নদী আর নির্ণয় কে ওমন অবস্থায় দেখে দিয়া জমে গেল। ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন এলো ওয়াহিদ। তবে দিয়া ওয়াহিদ কে কিছু বলতে না দিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। শান্ত স্বরে বলল-
“আমাকে একটা হেল্প করতে পারবে?”
“হ্যাঁ বল”
“তুমি কি আমাকে একটা লাশের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে? আমার সমবয়সী এবং মেয়েটা যেন প্রেগন্যান্ট থাকে।”
“হোয়াট? কী বলছিস? লাশ দিয়ে কী করবি? আর এক মিনিট তুই কী প্রেগন্যান্ট?”
দিয়া মাথা প্রেগন্যান্সি টেস্টের কিট টা দেখিয়ে বলল-”হ্যাঁ’
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
ওয়াহিদ চলে গেল। রাত এগারোটায় ফিরল নির্ণয়। দিয়া অনেক বার বলার চেষ্টা করেছে তবে নির্ণয় শুনলো না দিয়ার কথা। নির্ণয় রেগে সেদিন খুব মারল দিয়া কে। দিয়ার একটা কথা ও শুনল না। না শোনার প্রয়োজন মনে করল। দিয়ার মনে যে টুকু আশা ছিল সব যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। মেয়েটা পন করে নিল এই সব কিছুর শোধ সে তুলবে শোধে আসলে।
___________________
দুই দিন পর।
দিয়া বসে বসে নিজের প্লান সাজাচ্ছে সুন্দর করে। নির্ণয় কে আর জানানো হয়নি প্রেগন্যান্সির কথা। ওয়াহিদ ফোন করে জানালো লাশটার প্লাস্টিক সার্জারি সফল ভাবে হয়েছে এবং নদী কেও ওয়াহিদ জানিয়ে দিয়েছে দিয়ার প্রেগন্যান্সির কথা।
নদী যখন ফোন করে দিয়া কে ডাকল তখন ওয়াহিদ সেই স্টেশনই ছিল। দিয়া ও নদীর মাঝে যখন ঝগড়া হলো আর প্ল্যান অনুযায়ী দিয়া ট্রেন আসতে দেখে সেদিকে ছুটলো। ও পারে ছিল ওয়াহিদ এ পারে দিয়া ট্রেন প্রায় কাছে তবে সেই মূহূর্তে দিয়া চোখের পলকে ওপাশে যেতেই ওয়াহিদ সেই লাশটি ছুঁড়ে ফেলল ট্রেনের নিচে। বৃষ্টি পড়ার ধরণ কেউ খেয়ালই করল না এসব। আর দিয়ার প্ল্যান সফল হলো।”
_________________
পুরো কাহিনীটা এক্সপ্লেন করে থামলো ওয়াহিদ। নেওয়াজ মোল্লা রাগে সজোরে এক চড় বসালেন ওয়াহিদের গালে। চিৎকার করে বললেন-
“শুরু থেকেই তুই সবটা জানতি। তাহলে এত নাটক কেনো করলি?”
দিয়া এবার মুখ খলল- “ওর কোনো দোষ নেই সব প্ল্যান আমার ছিল।”
নির্ণয় নিরব দর্শক হয়ে এতক্ষণ সবটা শুনল। তবে তার এসবে কিছু যায় আসে না। সে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো দিয়ার সামনে। সবাই তখন নিশ্চুপ পাথর বনে দাঁড়িয়ে। নির্ণয় ভাঙ্গা গলায় বলল-
“অনেক তো হলো এবার না হয় আমাকে একটু শান্তি দেও। আর কত পোড়াবে?”
দিয়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কোনো জবাব দিলো না। নির্ণয় এবার দিয়ার পায়ের কাছে বসে পা দুটো জাপটে ধরে কেঁদে উঠে বলল-
“প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিওনা। আমি সয়তে পারব না আর! এই যে আমি তোমার পায়ে পড়ছি যা হবার হয়ে গেছে, আমি আর কোনোদিন তোমার গায়ে হাত তুলব না। প্লিজ ফিরে চলো।”
দিয়া কেমন ছটফট করে উঠে পিছিয়ে গেল। এই লোকটাকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য কী তার আদও আছে? দিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল-
“এভাবে আবদার করলে ফিরিয়ে দেওয়া যায় বুঝি? আর আমার ওতো সাধ্য কোথায় আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার? তবে আমি ফিরে যাব একটি সর্তে!”
নির্ণয় বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে দিয়ার দিকে। এখন আবার কিসের সর্ত? সবাই এক সাথে বলে উঠল-
“কি সর্ত?”
দিয়া উল্টো দিকে ঘুরে বলল-
“আমাকে আবার বিয়ে করতে হবে। তাহলেই আমি ওই বাড়ি যাব, নয়তো না।”
নির্ণয় চোখে পানি নিয়েও হেঁসে উঠল। বলল-
“ কবুল জান কবুল। তোমার সব সর্ত কবুল।”
#চলবে
#প্রনয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৭ [অন্তিম পর্ব শেষাংশ]
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
চারপাশে জাকজমকপূর্ণ অবস্থা। পুরো খান বাড়ি আজ সেজে উঠেছে নতুন আলোয়। পুরো চারটা বছর, কমখানি সময় নয়। এতো সময়ে আবারও যেনো এই বাড়ি নতুন করে বাঁচার দিশা পেয়েছে। মৃত বাড়িটা কেমন জেগে উঠেছে এই দিনটিতে। গত চার বছর ধরে বয়ে আসা অনুতাপ হতে আজ যেনো মুক্তি পেলো খান বাড়ির সকলে। বিশেষত–নির্ণয়। পুরো বাড়ি ঝিকিমিকি আলোয় আলোকিত। বিভিন্ন রকমের কাঁচা ফুলের সুভাস জানান দিচ্ছে নতুন কোনো পরিচ্ছেদের আগাম সূচনার। খান বাড়ির নির্ণয়ের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষে তৈরি হচ্ছে নির্ণয়। পরণে তার শুভ্র রঙা এক পাঞ্জাবি। তাকে তৈরি করছে আরিয়ান, হৃদয় সাথে ওয়াহিদ ও রয়েছে। আয়নার মাঝে নিজের প্রতিবিম্বের পানে দৃষ্টিবন্দি করে কোনো এক মতিভ্রমে ডুবে রইলো সে। তার কেমন যেনো এসব কিছুই স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। গত চার বছরে সে এতোবার এই সুখের কল্পনায় নিজেকে হারিয়েছে যে–আজ তার এসব নিছকই কোনো সুখের ভ্রম মনে হচ্ছে। যেনো এক্ষুণি সে সজাগ হবে এবং সাথে সাথেই তার এই সুখ গায়েব হয়ে যাবে কর্পূরের ন্যায়। চোখের মাঝে সামান্য উষ্ণতার উপলব্ধি করতে পেরে সহসাই চোখ ফেরালো সে আয়না হতে। হাতদুটো চোখের সামনে আগায় সে। চোখের মাঝে এক সুগভীর অপরাধবোধ যা তাকে তিলে তিলে শেষ করছিলো গত চার বছর ধরে। এই হাতেই তো দিয়াকে কত শতভাবে নির্যাতন করেছে। অথচ মেয়েটা তবু ছেড়ে যায়নি। প্রচন্ড অপরাধবোধে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার নাকমুখ বেয়ে। তখন কাধে সে আরিয়ানের হাতের অস্তিত্ব টের পেলো। নিম্ন স্বরে সে ডাকছে,
—ভাই?
চোখ তুলে চায়লো নির্ণয়। আরিয়ান বলে গেলো,
—চিন্তা করোনা ভাই, সবকিছুই ঠিক হয়ে গিয়েছে এখন। অতীতকে মস্তিষ্কে ধারণ করে রেখে বর্তমানকে নষ্ট করোনা। নিজেকে এবার ক্ষমা করে দাও, আর যন্ত্রণা দিওনা।
নির্ণয় অদ্ভুত চোখে চায়লো–যেখানো হয়তোবা মিশে ছিলো নিজের প্রতি ঘৃণা, অপরাবোধ এবং হতাশা।
পেছন থেকে বাকি দু’জনও সায় দিলো,
—আর কতকাল নিজেকে পোড়াবে? এবার সব বাদ দাও। যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে। সে-সব ভেবে এখন আর মন খারাপ করো না।
তাদের কথার মাঝেই কোথা থেকে যেনো ছুটে এলো “রিয়ানা”। এসেই নির্ণয়ের পা জড়িয়ে রইলো। হঠাৎ ধাক্কায় নির্ণয় বিচলিত হলো। তবে পায়ের কাছে চার বছরের ছোট্ট রিয়ানাকে দেখে চক্ষু শিথিল হলো তার। বক্ষপিঞ্জরে বয়ে গেলো অমায়িক এক ভালো লাগার স্রোত। মুচকি হাসলো নির্ণয়। এক হাঁটুর ওপর ভর করে রিয়ানার গালে দু’হাত রাখলো। আস্তে ধীরে বললো,
—“মা? তুমি এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছো কেনো? পরে গিয়ে যদি লেগে যেতো?
তবে এসব কথার পরিবর্তে রিয়ানা হুট করে তার ছোট ছোট হাতের সাহায্যে নির্ণয়ের বলিষ্ঠ দেহের কাধ জড়িয়ে ধরলো। অকস্মাৎ রিয়ানার জড়িয়ে ধরাতে আরও এক দফ চমকালো সে। রিয়ানা আধো আধো বুলিতে আওড়ালো,
—পাপ্পা! তুমি আমাল পাপ্পা? মাম্মা বলেছে তুমি আমাল পাপ্পা হও!
এই ডাকটায় কী ছিলো কে জানে? যা নির্ণয়ের চোখের পানি কেও আটকে রাখতে পারলোনা। রিনায়াকে আরও গভীরভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো সে। নিঃশব্দে ঝরে যাওয়া প্রতিটি পানির কণা জানে এই ছোট্ট সত্ত্বাটিকে সে কতটা ভালোবেসেছে। ঠিক কতটা কষ্ট পেয়েছিলো সে যখন সে জানতে পেরেছিলো দিয়া প্র্যাগনেন্ট ছিলো। রিয়ানার গায়ে লাল টুকটুকে এক ঘেরওয়ালা ড্রেস। মাথার ছোট ছোট চুলগুলো দু’পাশে ঝুটি করা লাল হেয়ার ভ্যান্ডের সাহায্যে। তার গায়ের রং দিয়ার মতোই ভীষণ ফর্সা। নির্ণয় এভাবে অনেকক্ষণ রইলো। শেষ পর্যায়ে রিয়ানা বিরক্ত হয়ে বললো,
—উফফ, পাপা চলো চলো। আর কতক্ষণ এভাবে জড়িয়ে রাখবে? আমি চেপ্টা হয়ে যাচ্ছি তো এবার!
উপস্থিত সবাই তৎক্ষণাৎ হেসে উঠল, আর তাদের সাতে যোগ দিল নির্ণয়ও। মুহূর্তেই পরিবেশটা আনন্দে ভরে উঠল। এরপর তারা সবাই মিলে একসাথে নিচে নেমে গেল।
___________________
অন্য কক্ষে দিয়াকে সাজানো হচ্ছে। সাজসজ্জা প্রায় শেষ, এখন শুধু ডাক পড়ার অপেক্ষা। মাত্র একটি তুচ্ছ ভুল বোঝাবুঝি দীর্ঘ চারটি বছর তাদের একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। দিয়ার মনে সংশয় জাগে- বিধাতার লিখনে যদি পুনর্মিলনই লেখা ছিল, তবে কেন এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ? কেন গত চারটি বছর তাকে একাকী কষ্টের সাগরে ভাসতে হলো?
ঠিক তখনই ডাক পড়ল তার। নদী এসেছে তাকে নিতে। দীর্ঘদিনের জড়তা কাটিয়ে নদী মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল-
—”দিয়া? বোন আমার? আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না? আমাকে কী আর একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”
দিয়া উঠে দাঁড়ালো। তার পেছনে অবস্থানরত মেয়েটার পানে চেয়ে রইলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। নদী হাসফাস করলো সেই চাহুনিতে, নুইয়ে নিল নিজের দৃষ্টি। তবে মূহুর্তেই নদীর সমস্ত কায়া কেঁপে উঠল দিয়া আচমকা তাকে জড়িয়ে ধরায়।
শান্ত গলায় দিয়া বলল-
—“নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস, এটাই অনেক। আমি তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি। অন্তত আজকের পর মনের ভেতর কোনো রাগ বা অভিমান আমি জমাট বাঁধিয়ে রাখতে চাই না।”
নদীর ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠল। দিয়ার মাথার ওড়নাটা ঠিক করে দিতে দিতে অশ্রুসজল চোখে সে বলল!
—”তাই হবে। তুই অনেক সুখী হবি। আজ তোকে কী যে সুন্দর লাগছে! আয় চল, এবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
দিয়া পা বাড়াল সামনের দিকে। তখন নীলা আর মিলাও এগিয়ে এলো তার পাশে। আজ থেকে তাদের নতুন এক যাত্রার শুরু।
__________________
— “কবুল!”
নির্ণয়ের কণ্ঠে শেষবারের মতো ‘কবুল’ শব্দটা উচ্চারিত হওয়ার পর এবার দিয়ার পালা। এর আগেও জীবনে একবার দিয়া এই শব্দটি বলেছিল, কিন্তু আজকের অনুভূতি যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক অন্যরকম অনুভুতি-তে মোড়ানো। দিয়া কিছুটা সময় নিল। চারপাশ নিস্তব্ধ, সবাই তার সম্মতির অপেক্ষায়। কাজী সাহেব মৃদু স্বরে তাড়া দিলেন!
—”মা, বলো কবুল।”
ঠিক সেই মুহূর্তে নীরবতা ভেঙে পাশ থেকে ছোট্ট রিয়ানা তার মাকে ডেকে উঠল-
—“মাম্মাআআআ, তাড়াতাড়ি বিয়ে শেষ করো আমার খুউউব ঘুম পাচ্ছে।”
রিয়ানার এই নিষ্পাপ আবদারে দিয়ার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠল। মনের সব দ্বিধা আর জড়তা কাটিয়ে এক নিশ্বাসে বলে গেলো,
—কবুল,কবুল, কবুল!
মুহূর্তের মাঝেই পুরো পরিবেশ ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল এবার।
_________________
নির্ণয়ের কক্ষের ঠিক মাঝখানে লম্বা ঘোমটা টেনে গুটিসুটি মেরে বসে আছে দিয়া। পাশে তার কোল ঘেঁষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছোট্ট রিয়ানা, সারাদিনের ক্লান্তি আর ছোটাছুটিতে সে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। নীলা আর মিলা অবশ্য চেয়েছিল রিয়ানাকে তাদের কাছে রাখতে, তবে নির্ণয় তা চায়নি। মেয়েকে সে এক মুহূর্তের জন্যও নজরহারা করতে চায়না। বাসর ঘরে ঘাপটি মেরে বসে দিয়া শুধু ভেবে যাচ্ছে। তখনই খট করে খিল দেয়ার আওয়াজ হলো। সে বুঝলে নির্ণয় এসেছে। গুটিয়ে বসলো আরও কিছুটা। নির্ণয় এগিয়ে এলো। এগিয়ে গিয়ে দিয়ার সম্মুখীন বসলে। দিয়ার পাতলা আবরণীর ঘোমটাখানা সরিয়ে চেয়ে রইলো কিছু পল। দিয়া তার মতিগতি বোঝার চেষ্টা করছে। কিছুসময় অতিবাহিত হওয়ার পর আচমকাই নির্ণয় দিয়াকে জড়িয়ে ধরল। তার কাঁধে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলো। দিয়া অবাক বনে গেলো। নির্ণয় ধরা গলায় বলতে লাগল!
—”জানো দিয়া, গত চারটে বছরে এই ঘরে আমি তোমাকে কতবার যে কল্পনা করেছি তার ইয়ত্তা নেই। কতবার ভেবেছি তুমি সামনে বসে আছো, অথচ হাত বাড়ালেই সব ধোঁয়া হয়ে যেত। আজ তোমাকে এতোটা কাছে পেয়েও আমার বিশ্বাস হতে চাইছে না যে তুমি সত্যিই আমার সামনে আছো। আমি জানি অনেক দেরি করে ফেলেছি… প্লিজ দিয়া, আমাকে মাফ করে দাও। আমি কথা দিচ্ছি, তুমি আমাকে যেমনটা দেখতে চাও, আমি ঠিক তেমনটাই হয়ে উঠব। শুধু তুমি আর রিয়ানা আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যেও না।”
দিয়াও সব বাধা আর অভিমান ভুলে নির্ণয়কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল। তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে মিশে যাচ্ছিল নির্ণয়ের গায়ের পাঞ্জাবিতে। ধরা গলায় সে বলল,
—“ক্ষমা? আপনাকে তো আমি কখনো মন থেকে ঘৃণা-ই করতে পারিনি।
নির্ণয় কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ধীর হাতে দিয়ার মুখখানা তুলে ধরল। তার নাজুক মুখশ্রীর দিকে চেয়ে থেকে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,
—“তুমি জানো দিয়া, এই চারটে বছর তোমাকে আমি ঠিক কতটা মিস করেছি? তোমার প্রণয়ের দহনে আমি কতটা পুড়ে ছাই হয়েছি, তা তুমি জানো না। বাইরের এই কঠিন ব্যক্তিত্বের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক অন্য নির্ণয় প্রতি রাতে, প্রতি ক্ষণে শুধু তোমাকেই খুঁজেছে। অথচ তুমি আসোনি। কতবার তোমাকে নিয়ে আমি হ্যালুসিনেট করেছি, কতবার নিজের করা অন্যায়ের দংশনে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি, তার খবর কি তুমি রেখেছ?”
দিয়া নির্ণয়ের চোখের দিকে তাকাল।
—“তাহলে করতেন কেনো সে অন্যায়?”
সরল প্রশ্ন দিয়ার। চোখে অজস্র অশ্রুকণা আর প্রশ্ন। নির্ণয় এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। বড় করে একটা শ্বাস টেনে বলতে লাগল-
—“প্রথম যেদিন আমি তোমায় দেখলাম কী ভিশন ভাবে যে তোমাকে আমার মনে ধরল তা বুঝাতে পারবো না। কী ভিশন মায়া তোমার ওই মুখশ্রীতে ইশশ্ মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, যেকোনো মূল্যে এই মেয়েটাকেই আমার চাই। এই মেয়ে ছাড়া আমার জীবন চলবে না, এটা আমি নিশ্চিতভাবে বুঝে গিয়েছিলাম। বাবা মা’কে জানালাম তারা তোমার বাবার কাছে তোমার বিয়ের প্রস্তাব রাখল তোমার বাবা রাজি হলেও তুমি রাজী হলেনা। মুখের উপর আমাকে রিজেক্ট করে দিলে এই বলে যে আমি বুড়ো অথচ তুমি আমাকে কখনোই দেখোনি।
আমি একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার ক্ষমতা আর পজিশন নিয়ে অহংকারের শেষ ছিল না। তোমার সেই রিজেকশন আমার ‘ইগো’তে ভীষণভাবে আঘাত করল। আমি জেদ ধরলাম- বিয়ে করলে তোমাকেই করব, আর আমাকে রিজেক্ট করার শাস্তি তোমায় আমি হাড়েহাড়ে টের পাইয়ে দেব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে রিজেক্ট করার শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হতো! ভেবেই আমি নতুন প্লান সাজালাম। বাবা-মা কে দিয়ে ফের বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম তবে সেটা তোমার জন্য না নদীর জন্য। নদীও রাজী হলো। তবে আমি আগে থেকেই জানতাম যে নদীর প্রেমিক আছে। আমি জানতাম নদী বিয়ে ভাঙ্গার জন্য আমাকে বলবে, ঠিক তাই হলো এরপর বিয়ের দিন নদী আমাকে ডাকল। আমি তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য রাজি করলাম। এরপর তোমাকে বাধ্য করলাম আমাকে বিয়ে করতে, আর পূরণ করলাম নিজের জেদ।
নতদৃষ্টিতে এতোসব বলার বলার পর আবারও দীপ্ত কন্ঠে সে বলে উঠলো,
—দিয়া, তুমি কী পুরনো সব ভুলে আবার আমার জীবনে নিজেকে ফিরেয়ে আনবে? সেই আগের তুমি? প্রণয়ের দহনে নদ জ্বালিয়ে তুমি কী আমার প্রণয়ের অন্তরমহলে প্রবেশ করে নিজেকে সারাজীবনের জন্য আমার ভালবাসার চাদরে মুরিয়ে রাখবে? কথা দিচ্ছি আর কক্ষনও তোমায় কষ্ট দিবোনা।
দিয়া সম্মতিতে মাথা নাড়ায়। অশ্রু গড়িয়ে পড়েতার কপোল বেয়ে। তখনই রিয়ানা নড়েচড়ে ওঠে। নির্ণয় সেদিকে তাকায়। ঠোঁট ছুঁয়ে দেয় ছোট বাচ্চাটির কপালে। দিয়ার পানে চেয়ে প্রশ্ন করে বসে,
—কত কষ্টই না তোমাকে পোহাতে হয়েছে আমার কারণে। সেদিন যদি তোমার কথাটুকু আমি শুনে নিতাম তাহলে বোধহয় চারটে বছর এত কষ্ট পোহাতে হত না।
একটু থেমে – “একা একা আমার মেয়েকে বড় করা, নিজের মাঝে ঠায় দেয়া। ধন্যবাদ দিয়া তোমায়, অসংখ্য ধন্যবাদ।
দিয়া নিম্ন স্বরে বললো,
—আমি মা, আমার দায়িত্ব আমার সন্তানকে সকল বিপদ থেকে আগলে রাখা। এতে ধন্যবাদের কিছু নেই।
হঠাৎ রিয়ানা কেঁদে উঠলো। দুজনের ঘোর কাটলো তখন। নির্ণয় তড়িঘড়ি করে রিয়ানাকে কোলে তুলে নেয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো রিয়ানা সাথে সাথে কান্না থামিয়ে দেয় যেনো এ স্পর্শ তার কতকালের চেনা। এটাই বুঝি বাবার আদর? দিয়া ঠোঁট চেপে কান্না আটকায়। এই-ই তো চেয়েছিলো সে। রিয়ানাকে কোলে নিয়ে সারাঘর জুড়ে হাঁটতে থাকা নির্ণয়ের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে ভাবলো,
—“আদ্রিয়ান খাঁন নির্ণয় আপনি আমাকে আজ আপনার প্রণয়ের অন্তরমহলে প্রবেশের কথা বলছেন অথচ আমি আপনার প্রণয়ের বেড়াজালে আঁটকে পড়ে নিজেকে আপনার কাছে সঁপে দিয়েছি কতকাল আগেই। ভালোবাসি আপনাকে, ভালোবাসি ভীষণ রিয়ানার আব্বুকে!”
…সমাপ্ত।

