Home "ধারাবাহিক গল্প হামিদা হামিদা পর্ব-৬১+৬২+৬৩

হামিদা পর্ব-৬১+৬২+৬৩

0
377

#হামিদা(৬১)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

রাতে যে কয়েকবার রবিন চোখ মেলে তাকিয়েছিল হামিদা ওর পাশে ছিল। কিন্তু সকাল বেলা যখন চোখ মেলে তাকালো হামিদাকে কোথাও দেখল না। সেই পানির বালতিটি, পলিথিনটা নেই। মাথার কাছের মেঝে শুকনো। যেন এ ঘরে হামিদা গত রাতে আসেইনি। তবে কি জ্বরের ঘোরে বিভ্রান্ত হয়েছিল রবিন!

“জ্বর তো এখনও আছে। সফুরা, যা তো তোর জব্বার কাকাকে গিয়ে বল হারাণ ডাক্তারকে ডেকে আনতে। তার আগে বালতি ভরে পানি দিয়ে যা। ছেলেটার মাথায় পানি দিতে হবে!”

জেবুন্নেসা ছেলের কপাল ছুঁয়ে বললেন। সফুরা নাশতার ট্রেটা পাশের টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। জেবুন্নেসা ছেলের জ্বরে তপ্ত হাতটা কোলে তুলে বললেন,

“কয়েক গাল খাইয়ে দিই, আব্বা?”

মুখ খুলে কথা বলতেও ভালো লাগছে না রবিনের। জ্বরে কাতর গলায় বলল,

“গলা শুকিয়ে গেছে৷ একটু পানি দাও, মা!”

জেবুন্নেসা ছেলের ঠোঁটের কাছে পানি আনলেন। রবিন একটুখানি মুখে দিয়ে ফেলে দিলো। কী তিতকুটে! জেবুন্নেসা মর্জিনাকে ডেকে গাছ থেকে লেবু ছিঁড়ে আনলেন। লেবু পানি একটু মুখে দিতে পারল রবিন। মা খিচুড়ি মেখে ওর মুখে দিল। তারপর আরো কয়েক গাল খেতে রবিনের পেট উগলে এলো৷ আর খেতে পারে না। সফুরা বালতি ভরে পানি দিয়ে গেল। জানালো জব্বার বাড়িতে নেই। জুবিন কল করে ডাক্তারকে আসতে বলেছে।

জেবুন্নেসা ছেলের মাথায় পানি দিচ্ছেন। কথা বলছেন। রবিনের গায়ে বোধহয় জ্বর বাড়ল। মাথা যন্ত্রনা করছে। বমি পাচ্ছে।

হামিদা দরজার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। শুক্রবার দিন। কলেজ বন্ধ। জেবুন্নেসা ওকে ডাকলেন,

“দৌড়ে গিয়ে হাত ধোঁয়ার ডিশটা নিয়ে আয় দেখি!”

হামিদা ডিশটা নামিয়ে রাখতে দেরি রবিনের বমি করতে দেরি হয় না। মাথা তুলতে চুলের পানিতে ঘাড় ও বুক ভিজে গেল। জেবুন্নেসা গামছা খুঁজছিলেন। হামিদা এনে দিলো। রবিন এখনই মাথা মুছবে না। মাথায় পানি নিলে শান্তি লাগে খুব। কুলি করে ভেজা গায়ে কম্বল টেনে নেয়। জেবুন্নেসা ছেলের মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে চিন্তা করতে লাগলেন। সফুরা কি জব্বারকে পেল? এখনও খবর নিয়ে এলো না কেন?
হামিদা ফিরে যাচ্ছিল। জেবুন্নেসা বললেন,

“কাজ দেখলে দৌড় দিস কেন? রবিনের মাথায় পানি দে। আমি আসছি।”

জেবুন্নেসা চলে গেলে হামিদা তার জায়গায় বসল। মগটা হাতে নিতে রবিন বলল,

“ভোরে চলে গিয়েছিলি কেন?”

হামিদা রবিনের কপালে পানি ঢালল। পানি সারা মাথা গড়িয়ে পড়ল বালতির ভেতর। হামিদা শান্ত গলায় জবাব দিলো,

“তা হলে কী করতাম? এখানে বসে থেকে বড়োমার আসার অপেক্ষা করতাম আমি?”

রবিন চুপ করে রইল। হামিদা এসেছিল রাতে।রবিনের জ্বর মাথা হালকা লাগল। হামিদার প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেল। চোখ বন্ধ করে বলল,

“আজ রাতেও আসিস।”

“না!”

রবিন ভুরু কুটি করল। চোখ মেলে তাকালো। তারপর মগটা চেপে ধরতে পানি ছিটকে এখানে সেখানে পড়ে। রবিন মৃদু গম্ভীর গলায় বলল,

“না বললি কেন?”

দরজা খোলা। মর্জিনা উঁকি দিয়ে গেল। হামিদা মগ ছেড়ে দেয়। দুরত্ব বাড়ায়। যেন রবিনের ছায়া ঘেঁষলেও বিপদ এখন। রবিন তা বুঝে আরও রুষ্ট হলো। মগটা ফেললো মেঝেতে।

“কথায় কথায় তোর এই বোবায় ধরা স্বভাব আমি মোটেও পছন্দ করি না, হামিদা। জবাব দে!”

“আমার ভয় করে। রাতের অন্ধকার বলেন কিংবা দিনের আলো; আপনার ঘরে আসতে আমার ভয় করে। আপনার পাশে থাকলে ভয় করে। সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি এই বুঝি কেউ দেখে ফেললো। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি আমাদের এই সম্পর্ক জানাজানি হয়ে গেছে। বড়ো আব্বার লাঠি ও চাবুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি। আর কি দেখি জানেন? আপনি চুপচাপ সে দৃশ্য দেখছেন। সব জানাজানি হলে তাই তো হবে। সব দুর্ভোগ একা আমাকে পোহাতে হবে। আমি যে এ বাড়ির আশ্রিতা। কিন্তু, আপনি এ বাড়ির ছেলে। তারচেয়েও বড়ো কথা, আপনি পুরুষ। আপনাদের দোষ হয় না। তাই নিজেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজেই রাখি। আমি বুঝে গেছি, আপনার মন না ভরা পর্যন্ত আপনি আমাকে মুক্তি দেবেন না। আমি ততদিন সাবধানে থাকব। রোজ প্রার্থনা করব যেন কাল আমার ওপর থেকে আপনার মন উঠে যায়। আমার মাথার ওপর থেকে বিপদ কেটে যায়। এই অসম্মানের সম্পর্ক থেকে যেন মুক্তি পাই।”

এক নাগাড়ে বলে দম নিলো হামিদা। রবিন থম ধরে শুনলো। তারপর জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল। ভেজা মাথার পানি ঘাড়ে বেয়ে পিঠে গড়িয়ে পড়ল। শিরশির করে ওঠে বলিষ্ঠ দেহখানা। রাগত স্বরে বলল,

“রচনা বলা শেষ হলে গা ও মাথা মুছে দে আমার।”

হামিদা দাঁত পিষল। গামছা ছুঁড়ে ফেললো রবিনের মুখে,

“মুছে নেন!”

হামিদা দরজার দিকে যাচ্ছিল। আর এক পা দিলেই দরজার বাইরে। রবিন তখনই ঘাড় চেপে ধরে। দরজা ভেতর থেকে খিল এঁটে দিলো। তারপর বাহুর মাঝে জড়িয়ে ধরে। রবিনের শার্টের বোতাম খোলা। হামিদার মুখে লাগল জ্বরের তাপ।

“কী পাগলামি করছেন! মর্জিনা ঘুরঘুর করছে। দেখে ফেললে আমারই দোষ হবে!”

আতঙ্ক মুখে বলল হামিদা। রবিন মৃদু স্বরে ধমক দিলো,

“চুপ কর! কেউ দোষ দেবে না তোর। তোকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার। বলেছি না তোর মেরুদণ্ড হব।”

দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। হামিদা চুপটি করে মুখ লুকিয়ে রইল রবিনের বুকে। রবিনের মাথার পানি চিবুক বেয়ে হামিদার মুখে পড়ল। সচকিত হয়ে চাপাস্বরে বলল,

“ভিজে যাচ্ছেন তো। মাথা মুছুন নয়ত ঠান্ডা লেগে যাবে।”

রবিন মুচকি হাসে৷ তারপর হাসি গোপন করে দরজার কাছ থেকে সরে এলো। হামিদার রাঙা মুখে তাকালো। চিবুক তুলে বলল,

” সম্মান চেয়েছিলি না আমার কাছে? তোকে সম্মান দেবো আমি, হামিদা। আর ক’টা দিন অপেক্ষা কর শুধু। তারপর..!”

“রবিন, আব্বা!” জেবুন্নেসা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বন্ধ দরজার হাতল নাড়িয়ে আবার ডাকতে রবিন বলল,

“একটু ঘুমাতে দাও আমাকে, মা। পরে এসো!”

“হারাণ ডাক্তার আসবে এক্ষুণি।” তারপর জেবুন্নেসা বললেন,

“ঘুমাবি বলে কি দরজা বন্ধ করতে হবে? খোল!”

তার মনে অন্য শঙ্কা। ছেলে কি একা ঘরে? হামিদাকে যে রেখে গিয়েছিলেন। রবিন বিরক্ত গলায় বলল,

“মা, বিরক্ত কোরো না তো! যাও, ডাক্তার এলে ডেকো।”

জেবুন্নেসা তখনই গেলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মন কু গাইছে। রবিন টের পেল। চুপ করে রইল।

কিন্তু কতক্ষণ এভাবে স্থির থাকবে! ও যে স্বভাবে অস্থির! হামিদাকে বিছানায় নিয়ে এলো। বালিশের ওপর থেকে পলিথিন ফেলে দেয়। হামিদার চুল ছড়িয়ে গেল বালিশে। ভয়ে কাঠ হামিদা কেবল চোখ রাঙিয়ে প্রতিবাদ করল। রবিন কি আর শুনলো! হামিদা ঠোঁট আলগা করতে রবিন কানে কানে ফিসফিস করে বলল,

“খবরদার শব্দ করিস না। মা, দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে।”

হামিদা টু শব্দ করল না। গায়ের ভেজা শার্ট টেনে খুললো রবিন। হামিদার ওড়নায় মাথা ও গা মুছে সেই শার্টের ওপর মেঝেতে ফেললো। তারপর নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলল,

“মা কিছু বোঝে না। হারাণ ডাক্তারের ওসব ডাক্তারিতে আমার জ্বর যাবে না। আমার গায়ের তাপ একমাত্র তুই ঠান্ডা করতে পারবি, হামিদা। বিশ্বাস করলি না? চল প্রমাণ করে দিই!”

সন্দেহজনক কিছু না শুনতে পেয়ে জেবুন্নেসা সরে গেলেন ছেলের দরজার কাছ থেকে। রবিন টের পেয়েও হামিদাকে জানাল না। ওর গায়ে যে এখনও ভীষণ তাপ। হামিদার সান্নিধ্য ওকে প্রশান্তি দেয়।

রবিন বড়ো চতুর। হামিদাকে বার বার ফাঁদে ফেলে কাছে টানে৷ বোকা হামিদা বুঝেও নিরুপায় হয়। পরে রাগে ফুঁসতে থাকে ভেতরে ভেতরে। রবিন তাই দেখে বোধহয় আনন্দ পায়। একটু আগের জ্বরে কাঁপা রবিন শান্ত হয়ে শুয়ে আছে এখন। পেটের কাছে কম্বল টানা। গা খালি। শীত যে করছে না তা নয়। কিন্তু হামিদার লাজুক মুখ দেখতে সব সহ্য করে নেবে। হামিদা ওড়না জড়িয়ে দরজার কাছে গেল। দরজা খুলবে তখনই রবিন বলল,

“রাতে আসবি!”

“আবার কেন?” হামিদা কটমট করে তাকালো। রবিন কাত হয়ে এক হাতের ওপর মাথা রাখল। ঠোঁটের কোণে বুনো হাসি। হামিদা দৃষ্টি লুকালো। রবিন বলল,

“আবার কেন বললে তো শরমে লাল হয়ে যাবি। নির্লজ্জ বলে গাল দিবি। কথা বাড়াস না। রাতে দরজা খোলা রেখে অপেক্ষা করব আমি।”

হামিদা দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দেখল। কেউ নেই। তারপর ফিরে বলল,

“আপনি যথার্থই নির্লজ্জ। শুধু নির্লজ্জ নন..! ” হামিদা রাঙা হয়ে গেল। রবিন সোৎসাহে বলল,

“থামলি কেন? বল বল।”

রবিন হাসছে। হামিদা আর কথা সম্পূর্ণ করল না। দরজার বাইরে যাওয়ার আগে শুধু বলল,

“অসভ্য, ইতর কোথাকার!”

রবিন বালিশে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। হাসছে। হামিদাকে জ্বালাতে এত কেন যে ভালো লাগে!

হামিদা রবিনের ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম পা রাখতে সফুরা রান্না ঘরের বাইরে এলে। হামিদা ওকে দেখল না। সফুরা একবার ওর দিকে আরেকবার রবিনের খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। জেবুন্নেসা সেসময় বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। ছোটো ছেলের ঘরের দরজা খোলা দেখে সফুরাকে জিজ্ঞাসা করলেন,

“রবিন বের হয়েছে?”

সফুরা ঢোক গিললো। কুলো ধরা হাত কাঁপছে। অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল,

“না!”

তারপরে হনহনিয়ে ছাঁদে উঠে গেল। জেবুন্নেসা কপাল কুঁচকে ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তখনই পেছনে হারাণ ডাক্তারের গলা শুনতে পেলেন। সব ভুলে ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে চললেন ছেলের ঘরে। ঘরে গিয়ে দেখলেন সবই আগের মতো। কোথাও সন্দেহজনক চিহ্ন নেই। কম্বল মুড়ি দিয়ে রবিন ঘুমাচ্ছে।

দুদিন পর রবিন সুস্থ হয়ে বিছানা ছাড়ল। কলপাড়ে এলো গোসল করতে। ঠিক যখন দাদিজানের শাড়ি ধুতে কলপাড়ে এসে দাঁড়ায় হামিদা। রবিন ওর আসার অপেক্ষায় বসেছিল এতক্ষণ। হামিদাকে দেখতে খুশি হলো।

রবিন মিসওয়াক দাঁতে পিষে থু ফেললো কলপাড়ের নালার মুখে। তারপর বুনো চোখে তাকিয়ে রইল হামিদার দিকে। এগিয়ে এসে মগে পানি তুলে নিয়ে বসল পাশাপাশি। গড়গড় করে কুলি করল। মুখ ধুয়ে হামিদার ওড়নার আঁচল টেনে মুখ মুছে নিলো। এদিক ওদিক তাকালো হামিদা। কেউ নেই। হাঁপ ছাড়ল গোপনে ও।

রবিন যেন ছায়ার মতো ওকে অনুসরণ করছে। ধরা পড়ার ভয় কি ওকে একটুও আতঙ্কিত করে না!

সফুরা এদিকে আসছিল। ওদের দেখে থামল। হামিদা তাকালো ওর মুখে। সফুরা কিছু বুঝতে দিলো না। ফিরে গেল বাড়ির ভেতর। সফুরা কি কিছু টের পেল! হামিদার মনে খচখচ করে।

রবিন পাশে বসে বলল,

“আরমানকে দেখেছিস কোথাও?”

“না!” জবাব দিলো হামিদা। রবিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। আরমান কি সত্যি সত্যি রাগ করল! কল পর্যন্ত ধরছে না। এমন তো করে না ও।

হামিদা কাপড় ধুয়ে পানি নিংড়ে বালতিতে রেখে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু রবিন কি এত সহজে নিস্তার দেবে! দিন দুপুরে হাত ধরে বসল,

“কী করছেন! হাত ছাড়ুন!” হামিদা আতঙ্কিত মুখে বলল। রবিন বিরক্ত হয়,

“এত ভয় পাস কেন? আমি আছি না? একটু ভরসা রাখ!”

হামিদা হাত টানতে লাগল,

“মাথা খারাপ তো আমার!”

রবিন টেনে আনল বুকের ওপর। বলল,

“আমি বেঁচে থাকতে কারো সাধ্য নেই তোর ক্ষতি করে। বিশ্বাস কর আমাকে, হামিদা!”

হামিদা সভয়ে এদিক-ওদিক তাকালো। বসার ঘরে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সফুরার! রবিনের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে মিথ্যা বলল,

“আচ্ছা, বিশ্বাস করলাম। এবার ছাড়ুন!”

রবিন তবুও ছাড়ল না। কোমর জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে গাঢ় চুম্বন করল। ভয়ে একসার হামিদা। জ্বরে কি মাথা খারাপ হয়েছে রবিনের। এত দুঃসাহস কেন দেখাচ্ছে!

“হামিদা, এই হামিদা!” ভরাট কন্ঠে ডাকল রবিন।

হামিদা পলক ফেলে তাকালো ওই ধূসর বুনো চোখে। কিছুক্ষণের জন্য ও ভয় ভুলে গেল। সময় জ্ঞানও রইল না। রবিন ওর মুখ আঁজলা ভরে তুলে চাপা স্বরে বলল,

“ভয় পাস না, হামিদা৷ এই তো আমি!”

তারপর রবিনের হাতটা নেমে এলো হামিদার পেটের ওপর। গালে চুমু খেয়ে জিজ্ঞাসা করে,

“সব সঠিক নিয়মে চলে?”

হামিদা প্রথমে বুঝতে পারে না। পরে চমকে ওঠে। স্তব্ধ হয়ে যায়। ধাতস্থ হতে রবিনের কাছ থেকে ছিটকে সরে গেল। এবার আর রবিন হাত বাড়িয়ে ধরল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। জ্বর বেশ ভুগিয়েছে। শুকিয়ে গেছে মুখখানা।

হামিদা মাসের হিসাব কষলো। গত পরশু দিন ওর নিষিদ্ধ সময় শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। তার মানে কী! হামিদার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। সজোরে মাথা নাড়াল দুদিকে।

“এ হতে পারে না। আপনি কথা দিয়েছিলেন এমন কিছু ঘটতে দেবেন না!” অশ্রুরুদ্ধ গলায় বলল হামিদা। রবিন বলল,

“শান্ত হ, হামিদা!”

“প্রতারক, মিথ্যাবাদী! কেন এতবার ঠকালেন? বিশ্বাস! মরে যাব তবুও আর আপনাকে বিশ্বাস করব না।”

রবিনের ডাক উপেক্ষা করে হামিদা টলতে টলতে দাদিজানের ঘরে ফিরে গেল। রবিন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ঘাড় ঘুরাতে থমকে গেল। জব্বার ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রবিনের গলা শুকিয়ে এলো। বুক কাঁপল। কিন্তু জব্বারের সামনে হেসে বলল,

“আরে, জব্বার কাকা যে! এতদিন কোথায় ছিলে? জ্বরে বিছানায় পড়েছিলাম, একবার দেখতেও এলে না। এত নিষ্ঠুর কবে থেকে হলে জব্বার কাকা?”

জব্বার এগিয়ে এলো। বড়ো শীতল ওর চাহনি। রবিন ভয় পেল কিন্তু প্রকাশ করল না। ওর হাঁটু কাঁপল তবুও পিছিয়ে গেল না। মুখোমুখি দাঁড়াল জব্বার। বলল,

“অনেক বড়ো হয়ে গেছো, বাজান। কিন্তু এত বড়োও হওনি যে ধোঁকা দেবে আর আমি বুঝতে পারব না। জন্মের পর তোমার বাপের আগে আমি তোমারে কোলে তুলেছিলাম, বাজান। এই যে এই দু হাতে। সেই দু-হাত দিয়ে তোমার ক্ষতি করতে বড়ো কষ্ট হবে আমার। বাধ্য কোরো না। শুধরে যাও। দ্বিতীয়বার আর সতর্ক করব না!”

জব্বারের চোখ-মুখ কঠিন। অফিস ঘরের দিকে গেল। রবিন ঢোক গিললো। এতক্ষণ শ্বাস আঁটকে রেখেছিল। শব্দ করে শ্বাস নিলো এখন। জব্বার সব জেনে গেছে। সরাসরি হুমকি দিয়ে গেল। রবিন নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

“দ্বিতীয়বার সতর্ক করার সময় তোমাকে দিলে তো!”

কলপাড়ে ফিরে তাকাবে তখনই দেখল জব্বারের লুঙ্গিতে রক্ত। কল চাপতে চাপতে ওই রক্তের বিন্দু ওকে ভাবিত করল। সবে তিন মগ পানি ঢেলেছে গায়ে। আরেক মগ মাথার ওপর তুলতে থমকে গেল। বিড়বিড় করে বলল,

“আরমান কল ধরছে না। জব্বার কাকা সব জেনে গেছে। আজ জানেনি সে। আগেই জেনেছে। তার মানে!”

রবিন মগ ছুঁড়ে ফেলে ভেজা শরীরে দৌড়ে গেল ঘরে। কাপড় পালটে বেরিয়ে এলো। গা ও মাথা ভালো করে মোছেনি। চুল বেয়ে পানি পড়ছে কপালে। ঘর থেকে বের হতে হতে প্রার্থনা করছে,

“আমার ধারণা যেন ভুল হয়। আমার ধারণা যেন ভুল হয়।”

চলবে…..

#হামিদা(৬২)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

আরমান নিখোঁজ। রবিন কোথায় না খুঁজেছে প্রিয় বন্ধুকে। কিন্তু কোথাও ওর হদিস নেই। আরমানের বাড়ির লোক দিশেহারা। না বলে কয়ে কোথাও যাওয়ার ছেলে নয় তাদের। কারো সঙ্গে দ্বন্দ্বও নেই। আরমানের বাবা ও মায়ের অভিযোগের দৃষ্টি পড়ে রবিনের ওপর। আরমানের বিপরীত স্বভাবের ছেলে রবিন। নিত্যদিন এর ওর সঙ্গে বিবাদ লেগেই থাকে। চেয়ারম্যানের ছেলে বলে পার পেয়ে যায় অনায়াসে। কে জানে ওর ওপর রাগ ঝাড়তে কেউ আরমানের ক্ষতি করেছে কি না!

রবিন তাদের দৃষ্টি বোঝে। ওর মনে তখন তুফান উঠেছে। আরমানের বাবা থানায় জিডি করার কথা বলতে রবিন বলে,

“একটা দিন আমাকে দিন। ওকে আমি যেভাবেই হোক খুঁজে আনব!”

রবিন উঠে দাঁড়ায়। উদ্ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে। ওর হাত-পা কাঁপছে। আরমানের কিছু হলে নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবে না রবিন।

“রবিন ভাই!”

ঘরের পেছন থেকে দৌড়ে এলো আরমানের ছোটো বোন আয়শা। মেয়েটা সবে ফ্রক ছেড়ে থ্রি পিস পরা ধরেছে। ওড়নাটাও ঠিক রাখতে পারল না। রবিনের হাত ধরে কেঁদে ওঠে,

“ও রবিন ভাই, আমার আরমান ভাইকে আপনি এনে দেন। আমাকে বলেছিল চুল বাঁধার রঙিন ফিতা কিনে দেবে। ফিতা লাগবে না আমার। কিছু লাগবে না। শুধু আমার আরমান ভাইকে এনে দেন আপনি, রবিন ভাই।”

রবিনের বুকের ভেতর মুচড়ে কান্নার দলা গলায় এসে পাকিয়ে গেল। আয়শার দিকে তাকাতে পারল না। কাঁপা হাতে আয়শার মাথায় হাত রেখে বলল,

“এই তোর মাথা ছুঁয়ে বলছি। আরমানকে আমি ফিরিয়ে আনব। কাঁদিস না!”

রবিন আর কথা বলতে পারল না। ক্রন্দনরত আয়শাকে রেখে একপ্রকার পালিয়ে এলো। রাস্তায় কত মানুষ ডাকল। রবিন কারো কথা শুনলো না।

আর কদিন পরে ফুটবল ম্যাচ। প্রাকটিস করতে যাচ্ছে না রবিন। রাস্তায় একজন ওর পথ আটকালো। জানালো স্যার রেগে আছেন। কিন্তু রবিনকে কোনোকিছুই থামাতে পারল না আজ।

রোদ মাথায় করে ঘেমে নেয়ে বাড়িতে এলো রবিন। বসার ঘরে জুবিন বসে খা নাশতা খাচ্ছিল। সফুরা দাঁড়িয়েছিল পাশে। রবিনকে দেখে সফুরা সৌজন্যবোধে হাসল। রবিনের মুখ তেমনই গম্ভীর ও বিপন্ন রইল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“জব্বার কাকাকে দেখেছিস?”

সফুরা বলল,

“একটু আগে সরোয়ারের সঙ্গে কোথাও বেরিয়ে গেল।”

“সরোয়ার এসেছিল না কি? কেন?”

সফুরার মুখ পাংশু হয়ে গেল। জুবিন চায়ের কাপ টেবিলের ওপর রাখল। সফুরা জবাব দেওয়ার আগে বলল,

“ওকে কেন জিজ্ঞেস করছিস? তোর যদি এতই জানতে ইচ্ছে করে, তবে যা, গিয়ে আব্বাকে জিজ্ঞেস করে আয়। সফুরা, তুই তোর কাজে যা।”

জুবিনের হুকুম চুপচাপ মেনে নিল সফুরা। রবিন থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইল। সরোয়ারকে মহসিন কবির ভূঁইয়া খুব একটা পছন্দ করেন না। সম্পর্ক যা আছে তা কেবল রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি কারণে। সেই সরোয়ার হঠাৎ এ বাড়িতে কেন এলো? জব্বারের সঙ্গে কোথায় বেরিয়েছে?

রবিন অবিন্যস্ত চুলে আঙুল চালাতে চালাতে ঘরে চলে গেল। জুবিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আড়চোখে দেখল ভাইকে। ওকে আজ অন্য রকম দেখাচ্ছে। প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়া বিপন্ন পাখির মতো। জুবিনের তাতে কি কিছু এসে যায়?

জুবিন চায়ের কাপে আবার চুমুক দিলো। রবিন ওর সঙ্গে যা করেছে জুবিন কোনোদিন ভুলবে না। তাই বলে ভাইয়ের অমঙ্গল চায় না। আবার মঙ্গল চাইতেও বাধে।

জুবিন এক সময় ভেবেছিল ঘৃণা করে ভাইকে। এখন অবশ্য ঘৃণা টিনা ওর আসে না। কার জন্য ঘৃণা করবে? ওই হামিদার জন্য! যে মুক্ত হতে গিয়ে শিকারির জালে আঁটকে গেছে! জুবিন হয়ত ওকেও আর ঘৃণা করে না। ঘৃণা করার অর্থই ওর প্রতি অনুভূতি রাখা। জুবিন মৃত্যু চাইবে তবুও হামিদাকে আর চাইবে না।

হামিদার পায়ের শব্দ শোনা যায়। জুবিন চায়ে চুমুক দিয়ে পাথর হয়ে বসে রইল টেবিলে। হামিদা মাথা নুয়ে ছাঁদে উঠে গেল। জুবিন চায়ের কাপ নিচে রেখে নিঃশব্দে হাসল। কী আশ্চর্য! ও জানেও না এই হাসির অর্থ। এ কী নিজেকে কটাক্ষ করা? না কি ওর প্রতারকদের কটাক্ষ করা!

জব্বার সারাদিনে বাড়ি ফিরল না। কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারে না। সরোয়ার ওর চালের গুদামে বসেছিল। রবিন খোঁজ নিয়ে জেনেছে জব্বারের সঙ্গে ও কেবল বাড়ির গেট পর্যন্ত হেঁটেছে। জব্বার গেছে অন্য পথে। সে পথ রবিন খুঁজেও আর পেল না। সুতরাং রবিনের সামনে এখন আর একটাই পথ খোলা। পথ! পথ নয় ওই অফিস ঘর এই মুহূর্তে সিংহের গুহার সমান। কিন্তু ওই গুহায় যাওয়া ছাড়া উপায়ও যে নেই ওর।

সোজা বাবার অফিস ঘরের সামনে এলো। গলা শুকিয়ে এসেছিল রবিনের। পাছে ধরা পড়ে এই ভয়ে পা ভার হয়ে আসছিল।

অফিস ঘরে মহসিন কবির ভূঁইয়া ছিলেন না তখন। সন্ধ্যার আগে আগে বেরিয়েছেন তিনিও।

জানালার বাইরে সন্ধ্যার কুজ্ঝটিকা ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। কিন্তু এই অফিস ঘরে এত আলো। রবিন তাহলে চোখে ঝাপসা দেখছে কেন? রবিনের পা টলে ওঠে। তাড়াতাড়ি টেবিলটা ধরে চেয়ারে বসে পড়ল। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে খুব। এই ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতে দরদর করে ঘামছে। কোনোরকমে উঠে গিয়ে ফ্যানের সুইচ টিপে আবার বসল। একটানে খুলে ফেললো শার্টের বোতাম। টেবিলে মাথা রাখতে আরমানের মুখখানা ভেসে উঠল। শেষবার ওকে বলা কথা ঘুরে এসে রবিনকেই আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তোলে। রবিনের চোখ ভিজে আসে। চোখ মুছতে গিয়ে টেবিলে গুটি সাজানো দাবার বোর্ড দেখতে পেল। রবিন সোজা হয়ে বসে।

কালো গুটির হাতি এমনভাবে দাঁড়ানো যে খুব সহজে সাদা গুটির উজিরকে বোর্ড থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে। রবিন বাবার মতো দাবা খেলায় পারদর্শী নয়। এই মুহূর্তে ওর সে মেজাজও নেই।

খুব ধূর্ততার সঙ্গে পরিকল্পনা এঁটেছিল রবিন। সফলতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জব্বার সব এলোমেলো করে দিয়েছে। রবিন কিছুতেই আর গুছিয়ে ভাবতে পারছে না। এই ব্যর্থতা ওকে যারপরনাই ক্ষুব্ধ করল। রাগটা কোথাও প্রকাশ না করে স্থির থাকতে পারছে না। এই দাবার গুটি দ্বিতীয়বার ফেলার ভুলও করবে না রবিন। কিন্তু জব্বারকে শায়েস্তা করা লাগবে। সুতরাং কালো হাতির গুটিটা তুলে নিলো। এই গুটি ওর বাবার ভীষণ প্রিয়। এটা না পেলে তিনি রেগে যাবেন। আর রাগটা গিয়ে পড়বে জব্বারের ওপর। প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে গেল রবিন।

রবিন শক্ত মুষ্টিতে করে গুটিটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। হামিদা খাবার নিয়ে ঘরের দিকে যাচ্ছিল। রবিন পিছু ডাকল।

“রাতে ঘরে আসিস!”

হামিদার জবাবের অপেক্ষা না করে বাইরে গেল। আকাশে আজ ম্লান চাঁদ। জোনাকিপোকা উড়ছে না। ঝিঁঝি ডাকল না। রবিন নিঃশব্দে পুকুর পাড়ে গিয়ে থামল। শার্টের বোতাম খোলা বুকে আছড়ে পড়ছে শীতল বাতাস। মুঠো খুলে অন্ধকারে আরেকবার দেখল হাতি গুটিটিকে। তারপর ছুঁড়ে ফেললো পুকুরের মাঝে। দেখতে দেখতে ডুবে গেল ওটি।

“কে ওখানে!” বাবার গম্ভীর গলা শুনে চমকে ওঠে রবিন। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে গেল। ওই তো জব্বার দাঁড়িয়ে। রবিনকে শীতল চোখে দেখছে। দাঁতে দাঁত পিষল রবিন। কিন্তু মুখে হেসে সুবোধ ছেলের মতো বলল,

“আব্বা, আমি!”

“রাতের অন্ধকারে পুকুরপাড়ে কী করছিলি?”

মহসিন কবির ভূঁইয়া রেগে আছেন। রাগলে ছেলেকে তুই তুকারি করেন। রবিন সতর্ক হলো। বলল,

“কিছু খাবার বেঁচে গিয়েছিল। তাই পুকুরে ছুঁড়ে ফেললাম। আপনারা কোথাও গিয়েছিলেন, আব্বা?”

“হুঁ!” মহসিন কবির ভূঁইয়া এর বেশি আর বললেন না। লাঠিতে ভর দিয়ে ঘরে চলে গেলেন। জব্বার তাকে অনুসরণ করছিল। রবিন তার গেঞ্জি টেনে ধরে। মহসিন কবির ভেতরে যেতে রবিন জব্বারকে নিরালায় টেনে নিয়ে এলো। অধৈর্য গলায় বলল,

“আরমান কোথায়, জব্বার কাকা!”

জব্বার শান্ত মুখে বলল,

“আরমান কে?”

রবিন আরও অধৈর্য হয়ে ওঠে,
“নাটক করো না, জব্বার কাকা। দেখো, আমি যা করেছি তার কারণ আছে। সব বলব তোমাকে। আরমানকে ছেড়ে দাও। ও বেচারা এইসব ব্যাপারে কিছুই জানে না। একেবারে নির্দোষ!”

জব্বারের মুখ বদলে গেল। বলল,
“তাই না কি? কিন্তু ও যে আমাকে বলল বিয়ের দিন থেকে এ পর্যন্ত ওই তোমাকে সাহায্য করেছে। তোমাকে উসকেছে। আমার পা ধরে বলেছে,” জব্বার কাকা, রবিনের কোনো দোষ নেই। ও তো হামিদাকে দেখতেই পারত না। যা হয়েছে সব আমার উসকানিতে হয়েছে। আমি রবিনের ক্ষতি চেয়েছিলাম। তাই ওর বাপের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছি। সব দোষ আমার। শাস্তি আমাকে দিন।” আমি আর কী করব, বাজান। শাস্তি দিয়েছি!”

“জব্বার কাকা!” রবিন স্তব্ধ হয়ে গেল। আরমান ওকে বাঁচাতে নিজের ওপর সব দোষ নিয়েছে!

“কী শাস্তি দিয়েছ তুমি ওকে জব্বার কাকা?”

রবিন নিজের গলার স্বর চিনতে পারল না। জব্বার নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রইল রবিনের দিকে। আহত স্বরে বলল,

“আমার চোখ ফাঁকি দিয়েছ, বাজান! আমার চোখ! কত বড়ো হয়ে গেছ! নিজের বাপের সঙ্গে বিদ্রোহ করতে বুক কাঁপেনি তোমার? এত সাহস! ওই বান্দির বাচ্চাকে বিয়ে করার সময় একবার মনে পড়েনি বাবার সম্মানের কথা, মায়ের মুখটা? তোমার ওই ভাইকে এমনভাবে ঠকালে? কার জন্য আপন বাপ-মা আর ভাইকে ধোঁকা দিয়েছ, বাজান? ওই বেশ্যার..!”

রবিন খপ করে চেপে ধরল জব্বারের গেঞ্জি গলা।

“খবরদার, জব্বার কাকা!”

জব্বার বিস্ফোরিত চোখে তাকাতে রবিন গেঞ্জির গলা ছেড়ে পিছিয়ে গেল। আতঙ্কিত ওর মুখ। অপরাধী গলায় বলল,

“অপরাধ আমি করেছি। যা শাস্তি দেবে, যা ইচ্ছে বলবে আমাকে বলো। গালি দাও, মারো, কাটো। কিন্তু আরমান আর হামিদাকে রেহাই দাও। ওরা নিরপরাধ, জব্বার কাকা। ওদের কিছু বলো না। আমার সহ্য হবে না।”

জব্বার তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো। রবিন যে একটু আগে তার গেঞ্জির গলা চেপে ধরেছিল সেখানে এখনও কেউ যেন চেপে ধরে আছে। জব্বার থমথমে মুখে বলল,

“শাস্তি তো তুমি পাবা, বাজান। কিন্তু সেই শাস্তি আমি দেবো না। তোমার জন্মদাতা দেবে। যাকে ধোঁকা দিয়েছ, যার সম্মানহানি করেছ। বিদ্রোহ করেছ যার বিরুদ্ধে!”

রবিন হাত চেপে ধরল,

“আব্বাকে জানিয়ো না, জব্বার কাকা। আব্বা মেরেই ফেলবে আমাকে। তুমি মারো আমাকে। শাসন করো। আমি তো তোমার ছেলের মতো।”

জব্বারের হাত দিয়ে নিজের দু গালে চড় দিলো রবিন। জব্বারের হাত ভার হয়ে আসে। রবিন নাড়াতে পারে না। জব্বার হাত ছাড়িয়ে নিলো। বলল,

“আমি সামান্য কাজের লোক। তোমাকে শাস্তি দেওয়ার সাধ্য কি আর আমার আছে, বাজান?”

রবিনের মুখখানা করুণ হয়ে ওঠে। দিশেহারা হয়। আবার হাত ধরতে গেলে জব্বার পিছিয়ে গেল। এক হাত তুলে বলল,

“তোমারে আমি আপন সন্তানের মতো ভালোবাসছিলাম। আমরা যাদের ভালোবাসি, তাদের বেলায় দুর্বল হয়ে যাই। ভূঁইয়া সাবের মতো হয়ত নির্দয় না আমি, বাজান। তাই হয়ত তোমার করুণ মুখ দেখে বুকে মায়া জাগে। তোমার ক্ষতি করতে হাত আগাতে চায় না।”

“আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি, জব্বার কাকা। তুমি যা বলবে তাই করব। আরমানকে ছেড়ে দাও। ও সত্যি নির্দোষ। আমাকে বাঁচাতে মিথ্যা বলেছে!” রবিন করুণ গলায় বলল। জব্বার গম্ভীর হয়ে রইল। আরেকটু চুপ থাকলে রবিন বুঝি তার পায়ে পড়ত। জব্বার সময় নিয়ে বলল,

“এক শর্তে আরমানকে আমি মুক্তি দিতে পারি। মানবা শর্ত?”

রবিন বলল,

“মানবো, মানবো!”

“শর্ত না শুনেই?”

জব্বারের হাসি বড়ো শীতল। বাইরের হিম হাওয়ার মতোই। রবিন থমকালো এবার। খোলা শার্ট উড়িয়ে শীতল বাতাস ওর বুকে কামড় বসিয়ে দেয়। রবিন অজান্তেই হাত রাখল। ভীষণ ঠান্ডা! শিউরে ওঠা গলায় জিজ্ঞাসা করল,

“কী শর্ত?”

“হামিদাকে ত্যাগ করতে হবে। পারবা?”

রবিনের হাতটা যেন বুকে মিশে গেল। সারা শরীর জমে যায়। জব্বার হাসল। বড্ড ক্রুর সে হাসি। যেন রবিনকে বুঝাতে চায়, এখনও তুমি আমার চেয়ে ছোটোটিই ছেলে। লড়াইয়ে তোমার হার নিশ্চিত! জব্বার বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,

“হয় হামিদা নয়ত আরমান৷ আজ রাতটুকু সময় দিলাম। কাল ভেবে বোলো!”

জব্বার দরজার কাছাকাছি গিয়ে থামল। ঘাড়ের ওপর থেকে ফিরে বলল,

“চালাকি করতে যাইয়ো না, বাজান। তখন আরমানরে পাইলেও লাশ হিসাবে পাবা।”

সেদিন রাতভর বিছানায় ছটফট করতে লাগল রবিন। ওর বুকের ভেতর বড়ো অশান্ত। সারা রাত দরজা খুলে রাখল। রাত ভোর হলো। না এলো ঘুম ওর চোখে, আর না এলো হামিদা ওর ঘরে!

চলবে….

#হামিদা(৬৩)
লেখনীতে: তানিয়া শেখ

হামিদা ঘুম থেকে উঠে বিছানা গুছাতে গিয়ে চাদরে রক্তের দাগ দেখে থমকে গেল। ওর বুক কাঁপছে। দৌড়ে গেল বাথরুমে। একটু পর বেরিয়ে সামনের মাটির ওপর বসে পড়ল। ওর সারা শরীর অবশ অবশ ঠেকল। গত দিনগুলোতে চিন্তা ও চাপে কাহিল হয়ে গিয়েছিল হামিদা। আজ হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চাইল।

কিন্তু কোথাও মন খারাপের হাওয়া বয়ে গেল। দু বার রবিনের কারণে ও এই একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। সেবার সব ভুল ছিল। কিন্তু এইবারও ঠিক বলে মানতে নারাজ হামিদা। যেখানে নিজের সম্মান নেই, স্বীকৃতি নেই; সেখানে অনাগত নিষ্পাপ প্রাণটার কি উপায় হবে?

হামিদা খুব চেষ্টা করেছিল রবিনের কাছে ধরা না দেওয়ার। ও বড়ো দুর্বল! তাই হয়ত নিজের চারপাশে কঠিন সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারেনি। আর কতবার দেবে দুর্বলতার দোহাই! নিজেকে কষতে লাগল।

হামিদা উঠে দাঁড়ায়। ঘরে এসে মেঝেতে বিছানো খেজুর পাটির ওপর শুয়ে পড়ল। দাদিজান জিজ্ঞাসা করলেন,

” ও কী, অবেলায় শুয়ে পড়লি যে!”

“মাথা ঘুরছে!” মিনমিন করে বলল হামিদা। দাদিজান বললেন,

“উঠে আয় মাথায় তেলপানি দিয়ে দিই!”

“এখন না!”
হামিদা দু’হাতে নিজেকে জড়িয়ে পাটিতে কুঁকড়ে শুয়ে রইল। দুর্বলতার দোহাই নয় শুধু। ওর মন ও নিজেই বোঝে না। নয়ত রবিনকে “চাই না” এই বুলি আওড়ে ফের ওর ডাকে সাড়া দেয়! যাবে না পণ করেও রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে ওর ঘরে যায়! হামিদা নিজের বুকে মৃদু আঘাত করে। ব্যথায় আরো কুঁকড়ে যায়, তবুও নিজের মনের এই দোটানার সুরাহা করতে পারে না।

রবিনকে শরীর খারাপের কথা বলতে পারেনি হামিদা। একবার ইচ্ছে করছিল গিয়ে মুখের ওপর সত্যিটা বলে আসবে। হামিদার মন বলছে, রবিন বাবা হতে চায়। কিন্তু ওর কি সে যোগ্যতা আছে? বাবা হওয়ার উপযুক্ত ও? অতীত আরেকবার হানা দেয় হামিদার স্মৃতিতে। রবিনের মিথ্যা কথার জন্য কত কী-ই না সহ্য করেছিল হামিদা। দায় ওর নিজের কী কম? কী বোকা ছিল! যে সন্তানের কোনো অস্তিত্ব ছিল না তাকে ধরে রাখার চেষ্টায় কতই না চিন্তা করেছিল। হামিদা ওর মায়ের মতো স্বার্থপর হতে চায়নি। তাইতো বৈধ নয় জেনেও ওই সন্তানকে ও চেয়েছিল। মায়ের কাছে সন্তানের আবার বৈধতা বা অবৈধতা আছে না কি! সেই অতীতের নিদারুণ মুহূর্ত ভেবে রবিনের ওপর ফের ক্ষোভ জন্মে। একদা রবিন ওকে কষ্ট দিয়েছিল, কাঁদিয়েছিল। হামিদা এখন গিয়ে সত্যিটা বলে দিলে ও নিশ্চয় হতাশ হবে? রবিনের হৃদয় ইস্পাতের। ওতে দুঃখ কষ্ট কতটুকই আর আঘাত করতে পারে। তবুও হামিদার মন বলে বাবা হতে পারল না জানলে রবিন কষ্ট পাবে। ওর তীব্র ইচ্ছে হলো, ছুটে গিয়ে রবিনকে বলে আসতে। কিন্তু চুপচাপ ঘরে বসে ছিল।

রাতে খাবার আনতে গিয়েছিল রান্না ঘরে। ফেরার পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল রবিনের সঙ্গে। জ্বরে ভুগে চোখের নিচ বসে গেছে। মুখ শুকিয়েছে। বুনো দৃষ্টি বড্ড নিস্প্রভ। গম্ভীর গলায় কেবল বলল,

“রাতে ঘরে আসিস!”

হামিদা কিছু বলার সুযোগ পায়নি। রবিন উদভ্রান্তের মতো চলে গিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়ে ছিল হামিদা। রবিনের কাছে ও আসলে কী! স্রেফ একটা ভোগের উপযোগী দেহ? এই যে সারাদিন পর দেখা হলো, কই একবার তো হামিদার মনের খবর জানতে চাইল না। শুধু জানে হুকুম করতে। হামিদা ধীরে ধীরে চলতে লাগল। ওর মনটা বিষণ্নতায় ভার হয়ে এলো।

সকলের ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায় ছিল হামিদা। রবিনকে সত্যিটা বলতে হবে। নয়ত কী না কী ভেবে বসে। ভুলটা না ভাঙালেই না। সেই মুহূর্তে রবিনের কষ্ট উপভোগ করাটা মুখ্য হয়ে উঠল না। হামিদাকে সতর্ক হতে হবে। খুব সতর্ক। রবিনকে আর এক ফোঁটা বিশ্বাস করবে না। এই সতর্কবার্তা যেন নিজেকেই শোনালো বারংবার।

অপেক্ষা করছিল তখনই ঢাকা থেকে মোবাইলে কল এলো। সুরাইয়া মৌলি কল দিয়েছে। মা ও মেয়েতে কথা হলো অনেকক্ষণ। রবিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সুরাইয়া মৌলি। হামিদাকে বললেন,

“ও যা বলে শুনিস! ছেলেটা বাপ মায়ের মতো নয়। তোকে খুব ভালোবাসে। আগলে রাখবে যতন করে।”

হামিদার হাসি পেল। রবিন ওকে ভালোবাসে! এ যে অসম্ভব কথা।

কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল ভোর বেলা। দাদিজান অযুর পানি চাইছেন। হামিদা এনে রাখল দুয়ারের সামনে। দাদিজান হুইলচেয়ারে বসে অযু করে নামাজে বসলেন। হামিদা হাত-মুখ ধোয়ার অজুহাতে রবিনের দরজার সামনে এলো।
সফুরা ছাড়া কেউ ওঠেনি। এত সকালে ও কোথায় যেন গেল। হামিদা সেদিকে আর লক্ষ্য করল না। সতর্কে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দরজায় হাত রেখে ঠেলা দেয়। দরজা সরলো না। ভুরু কুঁচকে দরজার হাতল ধরল হামিদা। ভেতর থেকে বন্ধ!

ঠিক সেই সময় সফুরা ঢুকল বাড়ির ভেতর। রবিনের দরজা থেকে চট করে হাত সরিয়ে নেয় হামিদা। কিন্তু ততক্ষণে সফুরা তা দেখে নিয়েছে। আতঙ্কে ও লজ্জায় হামিদার মুখের রঙ উড়ে গেল। সফুরা ওর দিকেই আসছিল। এই ভোরবেলা রবিনের দরজায় সামনে দাঁড়ানোর কারণ জিজ্ঞাসা করলে কী বলবে হামিদা? আনত হয়ে রইল। সফুরা ওর পাশে থামল। নিচু গলায় বলল,

“এত সাহস দেখাস না, হামিদা। পরিণাম ভালো হবে না। সতর্ক হ।”

হামিদা চকিতে তাকাতে সফুরা মুচকি হাসল,

“আমি কিছু দেখিনি।”

সফুরা ওর ঘরের দিকে গেল। হামিদা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। ঘাড় ঘুরিয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকালো। তারপর ফিরে গেল দাদিজানের ঘরে।

দুপুরে কলেজ থেকে ফিরতে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল রবিনের সঙ্গে। কার বাইক ছুটিয়ে পাশ কেটে গেল। একবার তাকালো না, ফিরে দেখল না। হামিদার আনন্দ হওয়ার কথা। এই বুঝি রবিনের মন থেকে উঠে গেল ও। অবশেষে ওর প্রার্থনা কবুল হয়েছে। কিন্তু খুশি ও হতে পারে না। রবিনের আচরণের এই হঠাৎ বদল ওকে ভাবিত করে।

সেদিন সারাদিন রবিন বাড়িতে ফেরেনি। রাতেও না। পরদিন সকালে কলপাড়ে গোসল করতে এলো। পরনে নীল সাদা চেকের লুঙ্গি ও গলায় গামছা। চুল উসকোখুসকো। হামিদার উপস্থিতি টের পেয়েও ফিরে তাকালো না। মিসওয়াক শেষে মুখ ধুয়ে কলের হাতল ধরতে হামিদা বলল,

“আমি পানি চেপে দিচ্ছি!”

“ডেকেছি তোকে?” বড়ো পাষাণ স্বরে বলল রবিন। হামিদা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখল ওকে কল চেপে বালতি ভরতে। রবিন মাথায় দু মগ পানি ঢালতে হামিদা বলল,

“আপনার সঙ্গে আমার কথা ছিল!”

রবিন চুপ করে আছে। হামিদা আরেকবার বসার ঘরটা দেখল উঁকি দিয়ে। কেউ নেই। রবিন ফের গায়ে পানি ঢালতে লাগল। কলপাড়ে ঝুপঝাপ শব্দে পানি পড়ছে। হামিদা একটু জোরে বলল,

“আমি চলে গেলে খুশি হন?”

রবিন এবারো চুপ। ওর মুখে একরাশ বিরক্তি দেখতে পেল হামিদা। দাঁত পিষল। তারপর ফিরে দু কদম এগিয়ে আবার ঝড়ের গতিতে রবিনের সামনে এসে দাঁড়ায়। রবিনের সারা শরীর ভেজা। সিক্ত নেত্র পল্লবের কঠোর চাহনিতে দৃষ্টি স্থির রেখে হামিদা বলল,

“এত কাপুরুষ কেন আপনি? বুকের পাটা নেই বলার যে, মন থেকে উঠে গেছিস তুই আমার হামিদা। তোকে আর ভালো লাগে না এখন। তোর কথা পছন্দ হয় না। খবরদার আমার সামনে আসবি না। আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়বি না!”

হামিদার গলার স্বর কাঁপছে। রাগে মুখখানা রাঙা। রবিনের চাহনির কঠোরতা ম্লান হয়ে গেল। কিন্তু তেমনই নির্বাক মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখল ওকে। হামিদা শ্লেষ হাসল। বলল,

“আল্লাহ পাক যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তিনি জানতেন আপনার মনের খবর। লোকে ঠিকই বলে। আপনার মতো জানোয়ারের স্বভাব কোনোদিন বদলায় না। আল্লাহর কাছে লক্ষ কোটি শুকরিয়া তিনি আমার গর্ভে আপনার মতো অমানুষের চিহ্ন আসতে দেননি। আমি খুব খুশি। আপনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন? করেন না! আপনাকে কোনোদিন চাইনি আমি। আপনি ছেড়ে দিলে বরং খুশিই হব। অবশেষে কাঙ্খিত মুক্তি পাব আজ।”

হামিদা হাসছে। ওর চোখের পলক ঘন ঘন পড়ছে। রবিন ভেজা শীতল হাতে ওর চিবুক তুলতে হামিদা শিউরে ওঠে। ঠোঁট কেঁপে মুছে গেল হাসি। তাকালো রবিনের বুনো চোখে। টুপ করে রবিনের কপালের ভেজা চুল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল হামিদার গালে, ঠোঁটে ও চোখের পল্লবে। রবিন চিবুকটা আরও ওপরে তুললো। মুখ নামিয়ে এনে স্থির চোখে বলল,

“যা মুক্তি দিলাম!”

হামিদা স্তব্ধ মুখে চেয়ে রইল। রবিন মুখ নিয়ে এলো ওর কানের কাছে। চাপা সম্মোহনী গলায় কটাক্ষ করে বলল,

“খারাপ লাগছে? কেঁদে দিবি না কি?”

হামিদা দুহাতে খামচে ঠেলে সরিয়ে দেয় রবিনকে। ঢোক গিললো। দু হাতে খামচে ধরে জামা। হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,

“কাঁদুক আমার দুশমন!”

হামিদা দৌড় পায়ে বসার ঘরের দিকে গেল। তারপর বেরিয়ে একেবারে বাড়ির বাইরে। রবিন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোয়াল কঠিন। মগটা হাতে নিলো। বালতি থেকে পানি তুলে আনে। অনবরত ঢালতে লাগল মাথায়। কিন্তু বালতির পানি ফুড়িয়ে এলো। রাগে ক্ষোভে বালতি ও মগ ছুঁড়ে ফেললো সামনের দেওয়ালে। প্লাস্টিকের বস্তু দুটি ভেঙে টুকরো টুকরো হলো।

রবিন ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বসে রইল সেখানে। ভেজা শরীরের পানি শুকিয়ে এলো প্রায়। রবিন উঠল এবার। মাথা মুছে ঘরে এলো। শুকনো কাপড় পড়ে বের হতে জেবুন্নেসা ডাকলেন,

“সারা রাত কই ছিলি রে তুই?”

“কাজ ছিল!” রবিন বলল।

“কী এমন কাজ ছিল যে রাতে ঘরে ফিরতে পারিস নাই? এসব কথা তোর আব্বা শুনলে রেহাই দেবে আমাকে? তোদের আর কী! যা শোনার, সহ্য করার সব তো আমাকেই করতে হয়। একটাবার আমার কথা চিন্তা করিস তোরা?”

রবিনের মুখ নত হয়ে গেল। প্রধান দরজার দিকে যাচ্ছিল। জেবুন্নেসা পিছু ডাকলেন,

“ওমা, না খেয়ে এই ভর দুপুর বেলা কই যাচ্ছিস? খেয়ে যা!”

রবিন তাড়াহুড়ো বলল,

“এখন সময় নেই। বাইরে খেয়ে নেবো। চিন্তা কোরো না, মা!”

রবিন বাড়ির বাইরে এলো। জেবুন্নেসা উঠে দরজার মুখে দাঁড়ালেন,

“মায়েরা সন্তানের জন্য চিন্তা না করে পারে! হ্যাঁ, রে আব্বা, আরমানের খবর কী? বেশি আঘাত-টাঘাত পেয়েছে না কি?”

পুরো গ্রাম জানে আরমান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। চেতনা ছিল না বলে এতদিন ওর খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিন্তু রবিন জানে আসল সত্য। এই সত্য ও কাওকে বলতে পারে না। জব্বারের হুঁশিয়ারি এখনও কানে বাজে। শর্ত ভুলে গেলে রবিন নিস্তার তো পাবেই না, সঙ্গে ওর আশেপাশের সকলকে ভুগতে হবে।

রবিনের পা থামল। মিথ্যা বলল,

“আগের তুলনায় সুস্থ এখন। ডাক্তার আরও কিছুদিন হাসপাতালে রাখতে বলেছেন। তারপর বাড়ি ফিরবে।”

“যাক বাবা, ছেলেটাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। আল্লাহ তাআ’লা বাপ-মায়ের বুকের ধন তাদের বুকে সুস্থ করে ফিরিয়ে দিন। শোন, রাতের আগে ফিরে আসিস। তোর বাবার কাছে আমাকে আর অপদস্ত করিস না!”

মায়ের কথা শুনতে শুনতে বেরিয়ে এলো রবিন। কোথায় যাবে জানে না। শুধু জানে এই বাড়ি থেকে দূরে যেতে হবে। এই বাড়ির ভেতর দমবন্ধ হয়ে আসে এখন।

আরমান হাসপাতালে ভর্তি। জব্বার ওর একটা হাত ভেঙেছে, পায়ের দুটো আঙুল ভেঙেছে, বুকের হাড়ে আঘাত করেছে।

আরমানের খোঁজ পেয়ে ওকে যখন দেখতে পেল রবিন চিনতে পারেনি। সমস্ত মুখ আঘাতে ফুলে উঠেছিল। হাঁটতে পারছিল না। সোজা হয়ে বসতে পারছিল৷ ক্ষুধার্ত, মুমূর্ষু আরমান রবিনকে দেখে হাসতে হাসতে হু হু করে কেঁদে উঠেছিল। যেন ও জানত রবিন ওকে বাঁচাতে আসবে। বন্ধুর নির্জীব চোখে, ব্যথাহত মুখে তাকিয়ে রবিনের প্রাণ যেন মুমূর্ষু হয়ে গিয়েছিল। মানুষ জীবনে কয়বার মরে? রবিন বন্ধুর আঘাতে আঘাতে জর্জরিত শরীরটা জড়িয়ে ধরে মরল জীবিত অবস্থায় প্রথমবার। ওর সামনে পুরো পৃথিবীর রূপ যেন বদলে গেল। সেই নির্জন, পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতর আরমানের অচেতন শরীরের ভার আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদেছিল রবিন।

বন্ধুকে রাতের আঁধারে পিঠে বহন করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল রবিন। আরমান বেঁচে গেলেও রবিনের ভেতরের মুমূর্ষু দশা পরিবর্তন হলো না। আরমানকে এরপর ও আর দেখতে যাওয়ার সাহস পায়নি। আজও যাবে না। আরমান হাজার জনকে দিয়ে খবর পাঠালেও না।

“রবিন!”

রবিন পিছু ফিরতে মাহবুব স্যারকে দেখতে পেল। তিনি এগিয়ে এলেন। মুখে খানিক অসন্তোষ।

“তোর হয়েছে কী, হ্যাঁ? প্রাকটিসে আসিস না। আরমান হাসপাতালে ভর্তি ওকেও দেখতে যাস না। অমি, মৃদুল আমার কথা বলার পরেও দেখা করিসনি। সমস্যা কী তোর?”

“কোনো সমস্যা নেই!” উদাসীন রবিনের চাহনি। মাহবুব কাঁধে হাত রাখলেন। হাঁপ ছেড়ে বললেন,

“আরমানের ব্যাপারটা নিয়ে আপসেট? ও এখন অনেকটাই সুস্থ আছে। মানুষের জীবনে এমন কত দূর্ঘটনা ঘটে। তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। চল প্রাকটিসে যাই। তারপর একসঙ্গে আরমানকে গিয়ে দেখে আসব! না, থাক। প্রাকটিস পরে আগে আরমানকে দেখে আসি!”

রবিন আস্তে করে স্যারের হাতটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল,

“আমাকে মাফ করবেন, স্যার। আমি আর ফুটবল খেলব না।”

“রবিন!”

স্যারের হতবিহ্বল মুখ ও ডাক উপেক্ষা করে হনহনিয়ে চলে এলো রবিন। কোথায় যাবে? কোথায় গেলে একটু স্বস্তি পাবে! রবিন হাঁটতে হাঁটতে সেই নদীর পাড়ে এলো। মাচানটা এখনও রয়ে গেছে। ও উঠে বসল সেখানে। তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে ঝিম ধরে শুয়ে আছে। এখানে ও পূর্বে কতবার যে এসেছে হিসাব নেই। কিন্তু আজ কেবল হামিদার সঙ্গে কাটানো সেই স্মৃতি মনে এলো। এত মধুর ছিল সেদিন!

“হামিদা, হামিদা, হামিদা!” রবিন আপনমনে বিড়বিড় করে। ওর যন্ত্রণা কাতর বুকে হাত বুলাতে লাগল। এই নাম জপে যেন কিছুটা যন্ত্রণা উপশম হয়!

বিকেলের রোদ হেলে পড়ল। রবিনের চোখের পাতায় এসে পড়ে তীর্যক রশ্মি। চোখ জোড়া ভীষণ পুড়তে লাগল।

এক জীবনে সব পাওয়া যায় না। তাই ভেবে পরাজয় মেনে জব্বারের সামনে দাঁড়িয়েছিল রবিন। জব্বার আগের মতো পুনরাবৃত্তি করে বলেছিল,

“আরমানকে চাইলে হামিদাকে পরিত্যাগ করতে হবে, বাজান! কাকে চাও তুমি?”

রবিন আরমানকে চাইল। হামিদাকে পরিত্যাগ করবে বলে শপথ করল৷ একদিনও পার হয়নি। রবিনের বুকের ওপর পাহাড় সম ভার হয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে তোলে সেই শপথ। হামিদা সেই বুকে আরো জোরে আঘাত করেছে। মুক্তি পেয়ে সে কী আনন্দ ওর! পাষাণ নারী! একটুও বুঝল না ওকে।

রবিন ভাগ্যের ওপর দারুণ রুষ্ট। বড়ো আশায় ছিল হামিদা খুশির খবর দেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন ওর পিছু ছাড়ছে না। জীবনের এই পাশা খেলায় বার বার হারছে। এত অপারদর্শী, ব্যর্থ!

পরাজয়ের গ্লানি বয়ে বেড়ানো দুর্বিষহ। রবিনের মনে হলো এর চেয়ে মরে গেলেই ভালো হতো। কিন্তু সেটা যে কাপুরুষোচিত কাজ।

চোখ মেললো রবিন। সামনে এতবড়ো আকাশ! অথচ, রবিন পথ খুঁজে পায় না। অনিমেষ তাকিয়ে রইল ওই আকাশে রবিন। যদি কোনো পথের দিশা পেয়ে যায়! যে পথে পরাজয়ের গ্লানি নেই, একাকিত্বের পীড়া নেই, নেই পোকামাকড়ের ন্যায় জীবন!

চলবে….