#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_2
সেন্ট মেরি অনাথ আশ্রমের ল্যান্ড লিজের ফাইলটা জ্যাকের বাবার কোম্পানির টেবিলে আছে এই একটিমাত্র বাক্য ক্লারা বেনেটের ভেতরের সব শক্তি যেন এক মুহূর্তে শুষে নিয়েছে। লাইব্রেরির চারতলার সেই নির্জন কর্নারের বাতাসটা তখনও গুমোট। টেবিলে ছড়ানো ফিনান্সিয়াল জার্নালগুলোর দিকে ক্লারা তাকিয়ে আছে বটে, কিন্তু অক্ষরের বদলে সে দেখছিল মিউনিখের সেই আশ্রমের ছোট ছোট বাচ্চাদের মুখগুলো। যেখানে তার শৈশব কেটেছে। যেই আশ্রম ছিল বলেই আজ সে এই অবস্থানে দাড়িয়ে আছে। জ্যাক একটা ফোন করলেই ওরা সবাই এই কনকনে শীতে গৃহহীন হয়ে পড়বে। জ্যাক অলস ভঙ্গিতে আবার চেয়ারটায় বসল। তার মুখের হাসিটা এখন আরও চওড়া। সে তার সোয়েটারের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে ক্লারার ল্যাপটপের দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করল।
“কী হলো মিস ক্যালকুলেটর? ওভাবে পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলে কেন? আমাদের তো গত পাঁচ বছরের ট্রেন্ড অ্যানালিসিসটা শেষ করতে হবে। জ্যাক নিচু গলায় বলল। ‘মিস ক্যালকুলেটর’ শব্দটা ক্লারার কানে তপ্ত সিসার মতো লাগল। ক্লারা নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটো শক্ত করে মুঠো পাকাল। সে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে বসল। তার নীল চোখ দুটোতে এখন আর ভয় নেই। সে স্পষ্ট গলায় বলল, “আপনি নিজেকে বড্ড ক্ষমতাবান ভাবেন, তাই না মিস্টার ডাম্পস্টার? একটা অনাথ আশ্রমের ওপর নিজের জোর খাটিয়ে বীরত্ব দেখাচ্ছেন? ছিঃ! আপনার এই নোংরা মানসিকতা আপনার ওই দামি পারফিউমের সুবাস দিয়েও ঢাকতে পারবেন না।”
‘মিস্টার ডাম্পস্টার’ নামটা শুনে জ্যাকের চোখের মণি দুটো এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। করিডোরের পর আজ আবার এই মেয়ে তাকে ডাস্টবিন বলে ডাকল! কিন্তু জ্যাক নিজের রাগটা প্রকাশ করল না। সে কপালে এসে পড়া চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে সরিয়ে বলল, “আমি আগেই বলেছি মিস ক্যালকুলেটর, দুনিয়াটা একটা বিজনেস। এখানে যার হাতে চাবি থাকে, নিয়মটা সেই বানায়। আর এই খেলায় চাবিটা আমার হাতে। সো, চুপচাপ নিজের কাজ করো।”
ক্লারা আর একটা শব্দও খরচ করল না। সে তার ল্যাপটপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে খটখট শব্দে কিবোর্ডে আঙুল চালাতে লাগল। সে মনে মনে নিজেকে বলল, ‘শান্ত হও ক্লারা। এই শয়তানটার সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না। ও তোমাকে একটা ক্যালকুলেটর ভাবছে? ভাবুক। এই ক্যালকুলেটরের হিসেবের জোরেই এই লোকের পতন নিশ্চিত।
জ্যাক ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ডাটা ইনপুট দিচ্ছে। কিন্তু তার অবচেতন মন বারবার ক্লারার দিকে চলে যাচ্ছে। ক্লারার নাকের ডগায় নেমে আসা চশমা, রাগে লাল হয়ে যাওয়া গাল আর তার অবাধ্য একগুচ্ছ চুল যা বারবার তার কপালে এসে পড়ছে। এই সবকিছু জ্যাকের চেনা হাই-সোসাইটির মেয়েদের চেয়ে একদম আলাদা। ক্লাবের মেয়েরা সবসময় তার সামনে নিজেদের নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা করে, আর এই মেয়েটি নিজের সমস্ত অবিন্যস্ত রূপ নিয়েই জ্যাকের অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। বাতাসে তখনো মিলার অ্যারোমাটিকসের নিজস্ব ব্ল্যাক ওড আর হোয়াইট মাস্কের কাস্টম ব্লেন্ডের তীব্র গন্ধ ভাসছে। এই সুগন্ধটা ক্লারার মগজে অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করছে। সে বারবার বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু প্রতিবারই এই সম্মোহনী সুবাস তার ফুসফুসে ঢুকে তাকে অবশ করে দিতে চাইছে। এখানে দেখছি তার বসে থাকা সত্যি এখন দায় হয়ে উঠবে!
লাইব্রেরির এই কোণটা বড় বেশি নির্জন। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে আপন নিয়মে, অথচ মনে হয় সময় এখানে এসে থমকে গেছে। চারপাশটা কেমন যেন চুপচাপ। শুধু কিবোর্ডের খটখট শব্দ আর জ্যাকের শরীর থেকে আসা কড়া ব্ল্যাক ওডের গন্ধটা মিলেমিশে একটা মায়াজাল তৈরি করেছে। হঠাৎ করেই ক্লারার আঙুলগুলো থেমে গেল। একটা জটিল ফিনান্সিয়াল মডেলের হিসেব মেলাতে গিয়ে সে আটকে গেছে। কপালে তার চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। জ্যাক ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ক্লারার দিকে। তারপর খুব ধীর পায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার বিশাল শরীরটা যখন ক্লারার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল, ক্লারা নড়ল না। কিন্তু জ্যাক মানুষটা অন্যরকম। সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ক্লারার একদম পেছনে এসে ঝুঁকে পড়ল। তার চওড়া বুকটা প্রায় ছুঁয়ে গেল ক্লারার পিঠ। ক্লারা সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করতেই জ্যাক তার দীর্ঘ দুটো হাত টেবিলের ওপর রাখল ক্লারার দুপাশ ঘেঁষে। এক মুহূর্তের মধ্যে ক্লারা বন্দি হয়ে গেল জ্যাকের দুহাতের খাঁচায়। ঘাড়ের ওপর জ্যাকের উষ্ণ নিশ্বাস লাগতেই ক্লারা শিউরে উঠল। তার পুরো শরীরে একটা মৃদু কাঁপুনি বয়ে গেল। জ্যাকের কাস্টম ব্লেন্ড পারফিউমের গন্ধটা এত কাছ থেকে তার ফুসফুসে ঢুকল যে মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল।
“এখানটায় ভুল করছ, মিস ক্যালকুলেটর।” জ্যাকের গলাটা নিচু। ক্লারার কানের লতি ঘেঁষে কথাগুলো যেন বসন্তের বাতাসের মতো ভেসে এল। জ্যাক তার বড়, শক্ত ডান হাতটা বাড়িয়ে ক্লারার ঠাণ্ডা হাতটার ওপর রাখল। মাউস ধরে থাকা ক্লারার হাতটা যেন জমে বরফ হয়ে গেল সেই ছোঁয়ায়। জ্যাক নিজের নিয়ন্ত্রণে মাউসটা ঘুরিয়ে স্ক্রিনের ভুলটা ঠিক করে দিল। ক্লারা সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জ্যাকের শরীরের অনমনীয় বাঁধন তাকে একটুও জায়গা দিল না। অপমানে আর রাগে ক্লারা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এত জোরে আছাড় খাচ্ছে যে, তার ভয় হতে লাগল। জ্যাক বুঝি সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ক্লারার মনে প্রথমবারের মতো একটা তীব্র ভয়ের জন্ম হলো। এই লোকটা শুধু তার অনাথ আশ্রমের ভাগ্যই মুঠোয় রাখেনি, সে চাইলে যেকোনো মুহূর্তে ক্লারার পুরো অস্তিত্বকে ওলটপালট করে দিতে পারে। ডাটাটা ঠিক করে দিয়ে জ্যাক কানের কাছে মুখ এনে আরও ফিসফিসিয়ে বলল, “হিসেবটা সবসময় নিখুঁত হওয়া চাই। ওটাই তো তোমার একমাত্র অস্ত্র। তাই না?” হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল জ্যাক। তার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ক্লারার ভেতরের ভয় আর কাঁপনটা সে খুব ভালোভাবেই উপভোগ করেছে। ক্লারা আর এক সেকেন্ডও সেখানে বসল না। রাগ, অপমান আর ভেতরের ভয়ের তীব্রতায় তার দম আটকে আসছে। সে দ্রুত ল্যাপটপটা বন্ধ করে ব্যাগে পুরল। খাতা-কলমগুলো কোনোমতে ব্যাগে গুঁজে নিয়ে চেয়ারটা সশব্দে পিছিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো তখন জলে ছলছল করছে, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত রাখল। জ্যাকের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরা গলায় বলল, “আপনার এই নোংরা ছোঁয়া যেন আমাকে আর কোনোদিন স্পর্শ না করে, মিস্টার ডাম্পস্টার!” ব্যাগটা কাঁধে চেপে প্রায় দৌড়েই লাইব্রেরির সেই কোণ থেকে বেরিয়ে গেল ক্লারা। কাঠের মেঝেতে তার বুটের খটখট শব্দটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। জ্যাক দুই হাত পকেটে পুরে শান্ত ভঙ্গিতে জানালার বাইরে তাকাল। বাতাসে তখনো তার দামি সুবাসের সাথে মিশে আছে ক্লারার ফেলে যাওয়া এক টুকরো রাগ। জ্যাকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা একটু চওড়া হলো। সে মৃদুস্বরে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি বড্ড বেশি ছটফট করছ, মিস ক্যালকুলেটর। কিন্তু দিনশেষে হিসেবটা আমার খাতার সাথেই মিলবে।”
–
বিকেল সাড়ে পাঁচটা। লকার রুমে তখন বাস্কেটবল টিমের ছেলেদের শোরগোল। কেউ জুতো খুলছে, কেউ তোয়ালে দিয়ে পিঠ মুছছে। শুধু জ্যাক এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। তার শরীর থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। আজকের প্র্যাকটিসটা ভয়াবহ খারাপ হয়েছে। চার-চারটে ফাউল। কোচ লুইসের চিৎকার এখনো কানে বাজছে, “মিলার! মন কোথায় তোমার? লকার রুমে রেখে এসেছ?”
মন লকার রুমে ছিল না। মন ছিল সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সেই আধো-অন্ধকার কোণটায়। যেখানে একটু আগে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেয়েটার নাম ক্লারা বেনেট। ধবধবে ফর্সা মুখ, আর চোখ দুটো আশ্চর্য রকমের নীল। যার নীল চোখে আছে তার জন্য অসম্ভব ঘৃণা। জ্যাক তার অফ-হোয়াইট সোয়েটারটা এক ঝটকায় খুলে লকারের হুকে ছুড়ে মারল। লকারটা লোহার, একটা বিকট শব্দ হলো, খটাশ! করে। কোল তার কিট ব্যাগটা গোছাতে গোছাতে আড়চোখে জ্যাককে এতক্ষণ দেখছিল। সে একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল, “কী রে জ্যাক? আজ কোর্টে তোকে দেখ মনে হচ্ছিল তুই বাস্কেটবল খেলছিস না, ক্ষেতে কোদাল কুপাচ্ছিস! পাসগুলো সব জঘন্য ছিল। লাইব্রেরির সেই ‘মিস ক্যালকুলেটর’-এর সাথে কিছু হয়েছে নাকি?”
জ্যাক কোনো কথা বলল না। সে একটা ধূসর তোয়ালে কাঁধে ফেলে লকারের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোল একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, “ইউনিভার্সিটির সব মেয়ে তোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, আর তুই ওই জার্মান চশমাওয়ালীর পেছনে লেগেছিস। ঘটনা কী বল তো?”
জ্যাক কোলকে এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “তোর কৌতুহল ইদানীং একটু বেশি বেড়ে গেছে, কোল। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খা।”
“মেয়েটার চোখ দুটো কিন্তু মারাত্মক, কী বলিস?” কোল হাসল। “তবে সাবধান। ও ডিন ডক্টর মরিসনের খুব প্রিয় স্টুডেন্ট। মরিসন সাহেব লোক ভালো, কিন্তু রেগে গেলে কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তোর বাবার ট্রাস্টি মেম্বারশিপের তোয়াক্কা ও করবে না। সোজা সাসপেন্ড করে দেবে।”
জ্যাক এবার কোলের দিকে তাকাল। তার ধূসর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল, “ডিন মরিসন কী করবেন না করবেন, তা নিয়ে আমার ভাবতে ভালো লাগছে না। আর শোন, কিছু জিনিস নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটু জোর খাটাতে হয়। আমি সেটাই করছি।”
“তুই একটা ডেভিল, জ্যাক,” কোল মাথা নাড়ল। “একেবারে আস্ত একটা ডেভিল।”
জ্যাক কোনো জবাব না দিয়ে শাওয়ার রুমের দিকে হেঁটে গেল। ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। পানির প্রতিটি ফোঁটা যেন ক্লারার সেই শেষ কথা কটা মনে করিয়ে দিচ্ছে, “আপনার এই নোংরা ছোঁয়া যেন আমাকে আর কোনোদিন স্পর্শ না করে, মিস্টার ডাম্পস্টার!” জ্যাক্সের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। নোংরা ছোঁয়া? এই শহরের সবচেয়ে রূপসী মেয়েরা তার একটা ছোঁয়ার জন্য চাতক পাখির মতো বসে থাকে। আর এই সামান্য মেয়েটা তাকে ডাম্পস্টার বলে গেল! মেয়েটার অহংকার বড্ড বেশি। এই অহংকারটা ভাঙা দরকার। খুব দরকার। শাওয়ার শেষ করে যখন সে লকার রুমে ফিরে এল, তখন কোল চলে গেছে। ঘরটা একদম নিঝুম। বেঞ্চের ওপর রাখা তার আইফোনটা তখন ভাইব্রেট করছে। একটা মেসেজ এসেছে। তার বাবার পিএ-র পাঠানো।
*’আজ রাত আটটায় দ্য রিটজ-কার্লটন হোটেলে অফিশিয়াল ফ্যামিলি ডিনার। স্পেনের লরেঞ্জো পরিবার উপস্থিত থাকবে। মিস্টার আর্থার মিলার আপনার উপস্থিতি কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে বলেছেন।’ মেসেজটা পড়ে জ্যাকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। লরেঞ্জো পরিবার! তার মানে ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জোও থাকবে। তার বাবা তাকে একটা সোনার খাঁচায় বন্দি করার বন্দোবস্ত পাকা করছেন। ব্যবসার খাতিরে বিয়ে। জ্যাক তার ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েসের চাবিটা হাতে নিল। লকার রুমের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভেজা চুলের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আপনারা সবাই মিলে আমাকে খাঁচায় ভরতে চান, তাই না? কিন্তু জ্যাক্সন মিলার কোনো খাঁচায় বন্দি হওয়ার পাত্র নয়। ডিনারটা আজ জমবে ভালো।” সে হনহন করে করিডোর দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। আকাশটার রঙ ঠিক ক্লারার চোখের মতো নীলচে হয়ে আসছে। জ্যাকের হঠাৎ মনে হলো, আজকের সন্ধ্যাটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
–
রাত তখন ঠিক আটটা। বোস্টনের আকাশটা আজ কুচকুচে কালো, ঠিক যেন কারো মনের ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকার। ‘দ্য রিটজ-কার্লটন’ হোটেলের প্রাইভেট ডাইনিং হলরুমের আবহাওয়াটা অবশ্য একদম আলাদা। চারপাশের দেয়ালে গোল্ডেন ফয়েলের কাজ, ওপর থেকে ঝুলছে বিশালাকার ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। টেবিলের ওপর রুপোর পাত্রে সাজানো স্প্যানিশ ওয়াইনের বোতল। টেবিলের একপাশে বসে আছেন আর্থার মিলার। তার চেহারা পাথরের মতো শক্ত। তারই একপাশে জ্যাকের মা লুসিয়ানা মিলার। পাশেই আছেন আর্থার মিলারের মা, লেডি এলিনর মিলার। এলিনরের পিঠ সোজা, দেখলেই মনে হয় একেবারে বনেদি পরিবারের মেয়ে তিনি। তাদের ঠিক উল্টো পাশে স্পেনের বিজনেস টাইকুন মিস্টার লরেঞ্জো এবং তার স্ত্রী। মাঝখানে বসে আছে ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জো। ভ্যালেরিয়াকে দেখতে সত্যিই রূপকথার রাজকন্যার মতো লাগছে। পরনে লাল রঙের ডিজাইনার গাউন, গলায় জ্বলজ্বল করছে লক্ষ ডলারের হীরার নেকলেস। ঠিক আটটা বেজে দশ মিনিটে হলের ভারী ওক কাঠের দরজাটা খুলে গেল। কোনো শব্দ হলো না, শুধু একটা শীতল হাওয়ার ঝাপটা যেন ভেতরে ঢুকল। জ্যাক ভেতরে ঢুকল।
আজ তার পরনে ব্ল্যাক থ্রি-পিস স্যুট, ভেতরে ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট। স্যুটের ল্যাপেলে মিলার অ্যারোমাটিকসের গোল্ডেন লোগোটা চাঁদের আলোর মতো চকচক করছে। সাধারণত জ্যাকের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ঝুলে থাকে। আজ সেটা নেই। মুখটা গম্ভীর, থমথমে। তার শরীর থেকে ভেসে আসছে ব্ল্যাক ওড আর হোয়াইট মাস্কের তীব্র, অভিজাত সুগন্ধ। গন্ধটা এতই কড়া যে, মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের দামি খাবারের সুবাসকে এক ঝটকায় ম্লান করে দিল। জ্যাক এসে অলস ভঙ্গিতে ভ্যালেরিয়ার পাশের খালি চেয়ারটায় বসল। একটা আলগা, আনুষ্ঠানিক হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলল, “গুড ইভনিং এভরিওয়ান। রাস্তার ট্রাফিকটা আজ বড্ড অবাধ্য ছিল। একটু দেরি হয়ে গেল।”
মিস্টার লরেঞ্জো হা হা করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে আন্তরিকতার চেয়ে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব বেশি। তিনি বললেন, “কোনো ব্যাপার না, জ্যাক। আমরা মাত্রই তোমার বাস্কেটবল ক্যারিয়ার আর আমাদের নতুন পারফিউম প্রজেক্ট ‘স্প্যানিশ রোজ’ নিয়ে কথা বলছিলাম। আর্থার আমাকে বলছিল, এই প্রজেক্টের লঞ্চিংয়ের দিনই নাকি তোমাদের এনগেজমেন্টের অ্যানাউন্সমেন্টটাও সেরে ফেলা হবে।”
ভ্যালেরিয়া সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে তার হাতটা জ্যাকের চওড়া হাতের ওপর রাখল। চোখের পাতা অলসভাবে কাঁপিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আই অ্যাম সো এক্সাইটেড, জ্যাক। আমি স্পেনে থাকতেও ল্যাপটপে তোমার বাস্কেটবল ম্যাচের প্রতিটা ক্লিপ দেখতাম। ইউ আর জাস্ট আমেজিং।”
জ্যাক ভ্যালেরিয়ার হাতের দিকে তাকাল। হাতটা বড্ড বেশি নরম। এই হাতে কোনোদিন একটা রুক্ষতার দাগ লাগেনি। জীবনের কোনো ঝোড়ো হাওয়া এই মেয়েকে ছুঁয়ে যায়নি। হাই-সোসাইটির আর দশটা পুতুলের মতোই ও শুধু টাকা, ক্ষমতা আর স্ট্যাটাসের পেছনে ছোটে। হুট করেই জ্যাকের মগজের ভেতর একটা ওলটপালট কাণ্ড ঘটে গেল। তার মনে পড়ে গেল বিকেলের সেই দৃশ্যটা। লাইব্রেরির সেই আধো-অন্ধকার কোণ। ক্লারা বেনেটের সেই লড়াকু হাত, যা তার হাতের শক্ত মুঠোয় এসে জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল। ভ্যালেরিয়ার এই কৃত্রিম মিষ্টি হাসির চেয়ে, লাইব্রেরির সেই টেবিলে ক্লারার চোখের তীব্র ঘৃণার আগুন আর রাগে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো জ্যাকের মনকে অনেক বেশি তোলপাড় করে দিচ্ছে। ওই মেয়েটার মধ্যে একটা জেদ আছে, একটা জীবন আছে। আর ভ্যালেরিয়া যেন একটা দামি মোমের পুতুল। জ্যাক ভ্যালেরিয়ার হাত থেকে নিজের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। যেন কোনো বিষাক্ত কিছু ছুঁয়ে ফেলেছে। সে টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর গ্লাসটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “এনগেজমেন্টের ডেটটা নিয়ে মনে হয় আমাদের আরও একটু ভাবা উচিত, মিস্টার লরেঞ্জো।”
পুরো ডাইনিং টেবিলে এক মুহূর্তে এক বরফ-ঠান্ডা নীরবতা নেমে এল। ঝাড়বাতির আলোটাও যেন হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। মিস্টার লরেঞ্জোর মুখের হাসিটা এক ঝটকায় মিলিয়ে গেল। ভ্যালেরিয়া চরম অপমানিত বোধ করে নিজের হাতটা কোলের ওপর সরিয়ে নিল। তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠছে। আর্থার মিলার টেবিলের ওপর হাত চাপড়ালেন। খুব জোরে নয়, কিন্তু শব্দটা শোনাল চাবুকের মতো। তিনি নিচু কিন্তু ভয়ংকর গলায় বললেন, “জ্যাক্সন! তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কী কথা বলছ ভুলে যেও না। এই বিয়েটা অলরেডি ডিসাইডেড।”
জ্যাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চওড়া অবয়বটা ডাইনিং টেবিলের সবার ওপর মানসিক চাপ তৈরি করল। সে তার স্যুটের মাঝখানের বোতামটা আটকে অনমনীয় গলায় বলল, “আমি আমার ডিসিশন জানিয়ে দিয়েছি, বাবা। বিজনেস ডিল আপনারা অন্যভাবেও করতে পারেন, তার জন্য আমাকে পার্টনারশিপের খাঁচায় ইনভল্ভ করার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রেমের কোনো ভ্যালু আমার কাছে কোনোদিন ছিল না, আজকেও নেই। আজকের মতো আমার ডিনার এখানেই শেষ। আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে।”
জ্যাক আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। লেডি এলিনর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জ্যাকের হাঁটার গতি মন্থর হলো না। সে হলরুম থেকে বের হয়ে সোজা চলে এল হোটেলের খোলা পার্কিং লটে। বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। আকাশে একটা ফ্যাকাশে চাঁদ। চাঁদের আলোয় পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকা তার সেই ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়িটাকে রক্তের মতো লাল দেখাচ্ছে। সে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনটা এক ভয়ংকর গর্জন তুলে জেগে উঠল, যেন কোনো বন্দি খাঁচা থেকে খাঁচার বাঘ মুক্তি পেল। গাড়িটা যখন বোস্টনের রাতের হাইওয়ে দিয়ে তীরের মতো ছুটে যাচ্ছে, তখন জ্যাকের মনে হলো আজ বিকেলে লাইব্রেরিতে ক্লারার ওপর যে নিয়ন্ত্রণ সে খাটিয়েছিল, নিজের জীবনের ওপর সেই একই নিয়ন্ত্রণ সে ফিরে পেতে চায়। সে তার ফ্যামিলির এই সোনার খাঁচাকে লাথি মেরে চলে এসেছে, শুধু নিজের জেদ ধরে রাখতে। সে গাড়ির ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনে ক্লারার ডর্ম রুমের লাইভ লোকেশনটা ট্র্যাক করল। স্ক্রিনের লাল বিন্দুটা জানান দিচ্ছে, ক্লারা তখনো তার ডর্ম রুমেই আছে। জ্যাকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা আবার ফিরে এল। সে এক্সিলারেটরে আরও জোরে চাপ দিল। গাড়িটা রাতের অন্ধকারে বন্য এক পশুর মতো ছুটে চলল ক্লারার ডর্মের উদ্দেশ্যে। আজ রাতে একটা ফয়সালা হওয়া দরকার।
–
রাত তখন এগারোটা। বাইরে হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। বোস্টনের এই কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়াটা যখন জানালার কাচ ভেদ করে ঘরের ভেতর ঢুকতে চায়, তখন অদ্ভুত শাঁ শাঁ শব্দ হয়। ক্লারা বেনেট জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। সে নিজের ধূসর সোয়েটারটা গায়ে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল। শরীরটা কাঁপছে, তবে এই কাঁপুনি সর্দির জন্য নয়, ভেতরের গভীর ট্রমার কারণে। লাইব্রেরির সেই অভিশপ্ত ঘটনার পর থেকে প্রতিটা মুহূর্ত তার কাটছে এক তীব্র যন্ত্রণার ভেতর। যখনই সে চোখ বন্ধ করছে, তখনই তার হাতের ওপর জ্যাকের সেই শক্ত, গরম হাতের স্পর্শটা অবিকল টের পাচ্ছে। কানের কাছে ভেসে আসছে সেই ভারী, কর্কশ ফিসফিসানি। অপমানে আর নিজের অসহায়ত্বে ক্লারার চোখ দিয়ে আবার দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে তো কোনোদিন কারো ক্ষতি করেনি। জার্মানির সেই ছোট্ট শান্ত শহরটা ছেড়ে এই দূর দেশে এসেছিল শুধু পড়াশোনা করতে। তবে কেন এই মিস্টার ডাম্পস্টার তার জীবনটাকে একটা জীবন্ত নরক বানিয়ে তুলছে? মানুষটা কি আসলেই একটা শয়তান? ক্লারা জানালার ধার থেকে সরে নিজের ছোট পড়ার টেবিলে ফিরে এল। টেবিলের ওপর তার ব্যক্তিগত ডায়েরিটা খোলা পড়ে আছে। টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলোয় পাতার ওপর একটা হালকা ছায়া পড়েছে। সে কলমটা হাতে নিল। নিজের ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ আর প্রতিজ্ঞার কথাগুলো কাগজের বুকে ঢেলে না দিলে আজ রাতে সে ঘুমাতে পারবে না। ক্লারা তার চেনা জার্মান ভাষায় দ্রুত হাতে লিখতে লাগল,
“আজ আবার ওই শয়তানটার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। জ্যাক্সন মিলার। একটা মানুষ এত অহংকারী, এত নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারে? ও আজকে আমাকে স্পর্শ করার সাহস দেখিয়েছে। ও ভেবেছে ওর ওই অর্থ আর ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে ও আমাকে পুরোপুরি কব্জা করে নিয়েছে। কিন্তু আমি ওকে এই জয় এত সহজে পেতে দেব না। অনাথ আশ্রমে সিস্টার মার্থা বলতেন, অন্ধকারের শক্তি যতই বড় হোক, আলোর একটা ছোট বিন্দুর সামনে তাকে একদিন হার মানতেই হয়। আমি পড়াশোনা শেষ করবই, আর এই মিস্টার ডাম্পস্টারের অদৃশ্য খাঁচা ভেঙে ওকে একদিন নিজের ভুল বুঝতে বাধ্য করব। আমি হার মানব না।” লেখা শেষ করে ক্লারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডায়েরিটা সজোরে বন্ধ করে সে টেবিল ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল। পুরো ঘরটা এক মুহূর্তে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। ক্লারা জানে না, এই ডর্ম রুমের জানালার ঠিক বাইরে, রাস্তার ওপাশে কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়ি। ইঞ্জিনের শব্দ নেই, হেডলাইটও নেভানো। গাড়ির কালো কাচের ওপাশে বসে এক জোড়া ধূসর চোখ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ক্লারার জানালার নেভে যাওয়া অন্ধকারের দিকে।
জ্যাক স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে চুপচাপ বসে আছে। তার আঙুলগুলো অবিন্যস্তভাবে নড়ছে। বিকেলের সেই কান্নায় ভেজা নীল চোখ দুটো আজ রাতে তাকেও ঘুমাতে দিচ্ছে না। সে সারাটা জীবন যা চেয়েছে, তা-ই পেয়েছে। কিন্তু এই মেয়েটা তাকে দুপায়ে মাড়িয়ে চলে যেতে চায়। সে জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “তুমি আমাকে যত বেশি ঘৃণা করবে ক্লারা বেনেট, আমার তোমাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জেদ ততটাই বাড়বে। জ্যাক্সন মিলারকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তোমার নেই।”
জ্যাক গাড়ির গিয়ার পরিবর্তন করল। স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথেই চাকার একটা কর্কশ শব্দ হলো। রাতের নির্জন বোস্টনের রাস্তায় সেই শব্দটা ভয়ংকর প্রতিধ্বনি তৈরি করে ডার্ক ক্রিমসন গাড়িটা অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে গেল। জানালার ওপাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ক্লারা শুধু চাকার সেই দূরগামী শব্দটা শুনতে পেল, কিন্তু সে জানতেও পারল না শয়তানটা তার দরজার কতটা কাছাকাছি এসে ঘুরে গেছে।
চলবে?

