Out Of Bounds পর্ব-০৭

0
5

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_7

রাত দুটো বাজে। বোস্টনের রাতগুলো এই সময়ে কেমন যেন থমথমে হয়ে যায়। ক্লাবের পেছনের দরজা দিয়ে যখন ক্লারা বের হয়ে এল, তখন কনকনে ঠান্ডা বাতাসটা চাবুকের মতো তার মুখে এসে লাগল। পুরো পার্কিং লট কুয়াশায় একদম সাদা হয়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ একজন বিশাল এক বালতি সাদা রঙের তরল চারদিকে ঢেলে দিয়েছে। দশ হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ক্লারা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। তার শরীর ক্লান্তিতে কাঁপছে, চোখ দুটো জ্বালা করছে। একটু ঘুম দরকার। তার চশমাটা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে গেছে। সে পকেট থেকে টিস্যু বের করে চশমাটা মুছতে যাবে, ঠিক তখনই পার্কিং লটের অন্ধকার কোণা থেকে হর্ন বাজল।
তীক্ষ্ণ শব্দে বোস্টনের নিস্তব্ধ রাতটা কেঁপে উঠল। সেই সাথে জ্বলে উঠল দুটো তীব্র হেডলাইট। কুয়াশার বুক চিরে সেই আলো এসে পড়ল সরাসরি ক্লারার মুখে। সে চোখ কুঁচকে হাত দিয়ে আলোটা আড়াল করার চেষ্টা করল। ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়িটি ধীরলয়ে এগিয়ে এল। গাড়ির কাঁচটা নামল মৃদু শব্দ করে। ভেতরে জ্যাক বসে আছে। স্টিয়ারিং হুইলে এক হাত অলসভাবে রাখা। অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। জ্যাক সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা বাইরের কুয়াশায় ছেড়ে দিল। তারপর অলস গলায় বলল, “কী হলো মিস ক্যালকুলেটর? নাইট ক্লাবের এই চারআনার জবে কত ডলার পাচ্ছো?”

ক্লারা কোনো কথা বলল না। সে চশমাটা আবার চোখে পরল। জ্যাক বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে বলল, “ঠান্ডায় তো কাঁপছ। আমার পেন্টহাউসে হিসাব মেলাবার একটা কাজ খালি আছে। স্রেফ একটা রাত। হিসাবটা মেলালেই তো এর চেয়ে দশ গুণ বেশি পেতে পারতে। বুদ্ধিমান মানুষেরা কষ্ট করে না, ক্লারা। গাড়িতে ওঠো।”

ক্লারা এবার আর ভয় পেল না। তার ভেতরের সমস্ত জড়তা আর দুর্বলতা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে হনহন করে হেঁটে সরাসরি গাড়ির জানালার সামনে এসে দাঁড়াল। একদম মুখোমুখি। জ্যাক একটু চমকে গেল, তবে তার মুখের হাসিটা গেল না। সে সিটে পিঠ ঠেকিয়ে বলল, “বাহ্, রাগলে তোমাকে কিন্তু বেশ দেখায়।” ক্লারা তার কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার মনে হলো ব্যাগটা জ্যাকের মুখে ছুড়ে মারে। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে শান্ত গলায় বলল, “মিস্টার জ্যাক, আপনার এই কোটি টাকার সাম্রাজ্যের নিচে আসলে একট নোংরা নর্দমা লুকিয়ে আছে, আপনি জানেন?”

জ্যাকের মুখের হাসিটা এক চিলতে থমকে গেল। সে সিগারেটের ছাই বাইরে ফেলে বলল, “কী বললে?”

“বললাম, আপনার ওই নোংরা টাকা আর অহংকারটা নিজের পকেটেই রেখে দিন। আপনি ভেবেছেন আপনি আমাকে ছোট করেছেন? না। আপনি আসলে আজকে প্রমাণ করলেন যে আপনার মতো মানুষরা দেখতেই শুধু দামি সুট পরে, ভেতরে এরা ভীষণ সস্তা।”

জ্যাক সোজা হয়ে বসল। তার ধূসর চোখ দুটো সামান্য সরু হয়ে এল। “ক্লারা, তুমি কিন্তু সীমা পার করছ। বোস্টন শহরে আমার সাথে এভাবে কথা বলার সাহস কেউ দেখায় না।”

“আমি দেখালাম। “ক্লারা একটু হাসল। তবে সে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। “আমি এই নাইট ক্লাবেই কাজ করব। নিজের উপার্জনে আশ্রমের বাচ্চাদের বাঁচাব। আর আপনার ওই বিশাল ইগোটাকে এই ক্লাবের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যাব। মনে রাখবেন মিস্টার ডাম্পস্টার, খেলাটা মাত্র শুরু হলো।” কথাটা শেষ করেই ক্লারা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। তীব্র কুয়াশার ভেতর সে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল মেইন রোডের দিকে। জ্যাক স্টিয়ারিংয়ের ওপর নিজের হাতটা সজোরে আছাড় মারল। গাড়ির ভেতরে একটা ভোঁতা শব্দ হলো। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক ভয়ংকর ক্রোধের জন্ম নিল। সে জানালার বাইরে তাকাল। কুয়াশার সাদা চাদরের ভেতর ক্লারার ছোট অবয়বটা ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে। এক সময় সেটা একদম মিলিয়ে গেল অন্ধকারের বুকে। জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো আরও ছোট হয়ে এল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “তুমি বড্ড বেশি কথা বলছ, ক্লারা বেনেট। বড্ড বেশি কথা। কিন্তু এই অন্ধকারেই তোমাকে আমার হুকুমের নিচে মাথা নোয়াতে হবে। খুব শীঘ্রই।”

পরদিন সকালের বোস্টন শহরটা দেখতে একটা মরা মানুষের মুখের মতো লাগছিল। চারদিকে ধূসর কুয়াশা, সূর্যটার কোনো তেজ নেই। মেঘলা আকাশের নিচে শহরটাকে কেমন যেন বিষণ্ণ আর অপার্থিব মনে হয়। ডর্ম রুমের ছোট বিছানায় ক্লারা যখন চোখ খুলল, তার মনে হলো তার পুরো শরীরটার ওপর দিয়ে একটা দশ চাকার ট্রাক চলে গেছে। কাল মাঝরাতের সেই কনকনে ঠান্ডা আর কুয়াশার ভেতর হেঁটে আসার খেসারত এটা। তার কপালটা আগুনে পুড়ছে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ। সে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু মাথাটা এমনভাবে ঘুরে উঠল যে সে আবার বালিশে পড়ে গেল। ক্লারা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার এই একলা জীবনে অসুখ হওয়া মানে একটা উৎসবের মতো। দেখভাল করার কেউ নেই, এক ফোঁটা পানি মুখে তুলে দেওয়ার মতো কোনো মানুষ নেই। মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই তার চোখের কোণ দিয়ে দু ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে নিজে বলল, “তুমি দুর্বল হতে পারো না ক্লারা। কিছুতেই না। ওই জানোয়ারটার সামনে তোমাকে জিততেই হবে।” ঠিক তখনই ডর্মের দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। ক্লারা সাড়া দেওয়ার আগেই দরজাটা একটুখানি খুলল। ভেতরে ঢুকল মার্কাস। তার হাতে একটা কাগজের ঠোঙা, সেখান থেকে চমৎকার গরম খাবারের গন্ধ বের হচ্ছে। মার্কাস বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। ক্লারার মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভুরু কুঁচকে ফেলল। তারপর কপালে হাত রেখেই প্রায় লাফিয়ে উঠল, “ওরে বাবা! ক্লারা, তোমার তো গায়ে প্রচণ্ড জ্বর! এ কী অবস্থা করেছ নিজের?” ক্লারা কোনোমতে একটু হাসার চেষ্টা করল। বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে পরতে পরতে তার গলা দিয়ে ভাঙা একটা আওয়াজ বের হলো, “কিছু না মার্কাস। সামান্য ঠান্ডা লেগেছে। এত হইচই করার কিছু হয়নি।”

মার্কাস ঠোঙা থেকে একটা প্লাস্টিকের বাটি বের করতে করতে বলল, “সামান্য ঠান্ডা? তুমি কি আমাকে বোকা ভাবো? ইউনিভার্সিটির বাস্কেটবল টিমের ওই গোল্ডেন বয় কাল রাতে তোমার সাথে কী করেছে, আমি সব শুনেছি।” ক্লারা চুপ করে রইল।
মার্কাস বাটিটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “লকার রুমের ওই ঝামেলার পর থেকে সে তোমাকে অনবরত হ্যারাস করছে, তাই না? ক্লারা, তুমি ডিনকে কেন বলছ না? ল ডিপার্টমেন্টের ডিন মিস্টার হ্যারিসন এই সব ব্যাপারে খুব কড়া।” ক্লারা মার্কাসের আনা স্যুপের বাটিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ধোঁয়া ওঠা স্যুপটার দিকে তাকিয়ে তার হঠাৎ করে পরশু রাতের সেই পেন্টহাউসের কিচেনের কথা মনে পড়ে গেল। অদ্ভুত একটা স্মৃতি। সেখানে সে নিজে হাতে পাস্তা বানিয়েছিল। তখন কোনো এক ফাঁকে জ্যাক খুব আলতো করে তার এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়েছিল। সেই স্পর্শটার কথা মনে হতেই ক্লারার নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলো। শরীরটা ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। কেন সেই মুহূর্তটার কথা এখন মনে পড়বে? সে মার্কাসের দিকে তাকাল। তার গলার স্বর এখন খুব গম্ভীর। সে বলল, “মার্কাস, কিছু কিছু যুদ্ধ নিজের একার লড়তে হয়। অন্য কাউকে ডেকে সেই যুদ্ধ জেতা যায় না।”

“তার মানে তুমি ডিনের কাছে যাবে না?”

“না, আমি কোনো ডিনের কাছে যাব না।” ক্লারা সোজা হয়ে বসল। “জ্যাক্সন মিলার ভেবেছে তার বাবার টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে সে দুনিয়ার সবকিছু কিনে ফেলেছে। সে আমাকে তার খাঁচায় বন্দি করতে চায়। কিন্তু মিস্টার জ্যাক্সন একটা জিনিস জানে না।”

মার্কাস অবাক হয়ে বলল, “কী জানে না?”

“সে জানে না যে খাঁচা যতই দামি হোক না কেন, খাঁচা কখনো আকাশের চেয়ে বড় হতে পারে না। আমি ওর ওই সোনার খাঁচাটা ভেঙে গুঁড়ো করে দেব। তুমি দেখে নিও।” মার্কাস কোনো কথা বলল না। সে শুধু অবাক হয়ে ক্লারার দিকে তাকিয়ে রইল। এই সাধারণ, শান্ত অনাথ মেয়েটার ভেতরে যে এত বড় একটা পাথর লুকিয়ে আছে, সে আগে কখনো টের পায়নি।

ইউনিভার্সিটির ইনডোর বাস্কেটবল কোর্টে তখন বল ড্রপ করার শব্দগুলো চাবুকের মতো শোনাচ্ছে। দড়াম, দড়াম শব্দ করে। আজ জ্যাকের খেলা দেখে টিমের বাকি মেম্বাররা ভয়ে কাঁপছিল। সে আজকে কাউকে কোনো পাস দিচ্ছে না। নিজেই বল নিয়ে ডিফেন্ডারদের ধাক্কা দিয়ে কোর্টের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। তার ভেতরের রুক্ষতা আজকে চরমে। প্র্যাকটিসের এক পর্যায়ে টিমের একজন জুনিয়র প্লেয়ার জ্যাককে আটকানোর চেষ্টা করতেই ঘটল অঘটনটা। জ্যাক তাকে এত জোরে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল যে ছেলেটা ছিটকে গিয়ে পড়ল কাঠের মেঝেতে। তার ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়তে শুরু করল। মেঝেতে কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত। কোচ চিৎকার করে উঠলেন, “জ্যাক্সন! স্টপ ইট! এটা প্র্যাকটিস ম্যাচ, কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়!” জ্যাক কোচের কথার কোনো জবাব দিল না। সে বলটা কোর্টের বাইরে ছুঁড়ে মারল। তারপর একটা তোয়ালে দিয়ে নিজের ঘাম মুছতে মুছতে বেঞ্চে এসে বসল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ঠিক তখনই তার পার্সোনাল সেক্রেটারি হ্যামিল্টন খুব নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল পাশে। ঝুঁকে পড়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “স্যার, একটা খবর আছে।”

জ্যাক তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতেই বলল, “বলো।”

“ক্লারা বেনেট আজ ইউনিভার্সিটিতে আসেনি। ডর্মের মেয়েরা বলছিল মেয়েটার তীব্র জ্বর। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না।” জ্যাকের হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল। সে তোয়ালেটা মুখ থেকে সরিয়ে হ্যামিল্টনের দিকে তাকাল। তার ধূসর চোখ দুটো কেমন যেন নিষ্প্রাণ শোনাল। হ্যামিল্টন ইতস্তত করে যোগ করল, “আরেকটা ব্যাপার আছে স্যার। ওই মার্কাস ছেলেটা… সে সকাল থেকে ক্লারার ডর্ম রুমেই আছে। মেয়েটার সেবাযত্ন করছে।” জ্যাকের চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য খুব কুৎসিত দেখাল। সে হাতের তোয়ালেটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “মার্কাস ওর ঘরে? আমার খাঁচার পাখি এখন অন্য কারও হাত থেকে দানা খাচ্ছে?” হ্যামিল্টন চুপ করে রইল। এই অবস্থায় জ্যাকের সামনে কোনো কথা না বলাই বুদ্ধিমানের কাজ। জ্যাক সেক্রেটারিকে ইশারা করে আরও কাছে ডাকল। তার গলার স্বর এতটাই নিচু যে মনে হচ্ছিল সে কোনো মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করছে। সে বলল, “ইনফার্নো ক্লাবের মালিককে এখনই ফোন করো।”

“কী বলতে হবে স্যার?”

“তাকে বলো, আজ রাতে ক্লারা বেনেট যেন ক্যাশ কাউন্টারে ডিউটি করে। তাকে আজ আসতেই হবে।”

হ্যামিল্টন আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু স্যার, মেয়েটার তো প্রচণ্ড জ্বর…”

“জ্বর দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। তাকে বলবে, সে যদি আজ রাতে না আসে, তবে মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের ল্যান্ড লিজের ফাইলটা যেন কাল সকালেই কোর্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের রাস্তা দিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা আমি করব। ক্লারা বেনেট মরতে বসলেও আজ রাতে ওই ক্লাবের কাঁচের ওপাশে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। এটাই আমার শেষ কথা।”

হ্যামিল্টন মাথা নিচু করে চলে গেল। জ্যাক বাস্কেটবল কোর্টের শূন্য গ্যালারির দিকে তাকাল। পুরো গ্যালারি খাঁ খাঁ করছে। সে একা একাই একটু হাসল। তার সেই অতি পরিচিত বাঁকা হাসি। সে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি ভাবছ সব শেষ করে দেবে, ক্লারা? খেলা তো আমি এখনো শুরুই করিনি। আজ রাতে তুমি দেখবে, বন্দিত্ব কাকে বলে। কত প্রকার ও কী কী।”

রাত ঠিক এগারোটা। ‘ইনফার্নো’ ক্লাবের বিলিং কাউন্টারের ভেতরে ক্লারা বসে আছে। তার শরীর এখনো কাঁপছে, মাথার ভেতরটা দপদপ করছে প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা ঠেকছে। কিন্তু সে আসতে বাধ্য হয়েছে। ক্লাবের ম্যানেজার মিস্টার গোমেজ তাকে সন্ধ্যায় ফোন করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন আজ রাতে সে যদি কাউন্টারে না বসে, তবে তার চাকরি তো যাবে। সাথে অন্য সমস্যা হবে। ক্লারা বোকা মেয়ে নয়। এই চালটার পেছনে কার হাত আছে, সেটা বুঝতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগেনি। সে কাউন্টারের ওয়ান-ওয়ে কাঁচের ওপাশে তাকাল। আজ ক্লাবের পরিবেশটা অন্যদিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কোনো শোরগোল নেই, ভিআইপি লাউঞ্জে কোনো চটুল নাচ-গান নেই। লাউঞ্জের ঠিক মাঝখানের সোফাটায় জ্যাক একা বসে আছে। তার পরনে একটা কালো শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। তার সামনে কোনো দামি ওয়াইনের গ্লাস নেই, শুধু একটা আস্ত হুইস্কির বোতল আর একটা খালি গ্লাস রাখা। সে গ্লাসে ড্রিংক ঢালছে না, স্রেফ বোতলটার গলা ধরে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো জ্যাকের বসার ভঙ্গি আর তার চোখের দৃষ্টি। সে ডানে-বামে কোথাও তাকাচ্ছে না। তার ধূসর, জ্বলন্ত চোখ দুটো সরাসরি ওই ওয়ান-ওয়ে কাঁচটার দিকে স্থির হয়ে আছে। ক্লারা ভালো করেই জানে, ওয়ান-ওয়ে কাঁচের বাইরে থেকে ভেতরের মানুষকে দেখা যায় না। সেখানে শুধু একটা আয়নার মতো প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠার কথা। কিন্তু জ্যাকের চাউনিটা এমন ছিল যে ক্লারার মনে হলো, জ্যাক কাঁচ ভেদ করে সরাসরি তার চোখের মণি দুটো দেখতে পাচ্ছে। ক্লারা কাউন্টারের ভেতর বসে নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতরের হার্টবিট যেন বন্ধ হয়ে আসছে। জ্যাকেরস্থির চাহনিটা একটা চাবুকের মতো। যেন সে কাঁচের ওপাশ থেকে ক্লারাকে ফিসফিস করে বলছে, ‘তুমি যতই আড়াল করো ক্লারা, আমার এই চোখ দুটো থেকে তুমি নিজেকে লুকাতে পারবে না। তুমি আমার এই খাঁচাতেই আছো।’

ক্লারা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে সে কাঁচের খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। তার জ্বর তপ্ত শরীরটা কাঁপছে, কিন্তু মনের ভেতরের জোরটা কমেনি। সে নিজের ভয়টাকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি জ্যাকের সেই কাল্পনিক দৃষ্টির দিকে চোখ রাখল। সে মনে মনে বলল, ‘জ্যাক্সন মিলার, তুমি আমাকে ভয় দেখিয়ে মাথা নোয়াতে চাও? তুমি আমার শরীরটাকে হয়তো এখানে আটকে রাখতে পেরেছ, কিন্তু আমার ভেতরের এই ক্লারাকে তুমি কোনোদিন ছুঁতেও পারবে না। কোনোদিন না।’ ঠিক তখনই কাঁচের ওপাশে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। জ্যাক হঠাৎ করেই তার হাতের হুইস্কির বোতলটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। ঠিক যেভাবে কেউ কাউকে শুভেচ্ছা জানায়। যেন সে কাঁচের ওপাশে থাকা অদৃশ্য ক্লারাকে উদ্দেশ্য করেই একটা সাইলেন্ট টোস্ট জানাচ্ছে। তার ঠোঁটের কোণে আবার ফুটে উঠল সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা। তার মানে সে জানে। সে নিশ্চিতভাবেই জানে ক্লারা ঠিক এই মুহূর্তে কোথায় দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

রাত বারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ। ‘ইনফর্নো’ ক্লাবের বিলিং কাউন্টারের ভেতরের সেন্ট্রাল এসিটা মনে হয় আজ একটু বেশিই নিষ্ঠুর। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসটা সরাসরি এসে ক্লারার ঘাড়ে বিঁধছে নাকি তার নিজের শরীরের ভেতরের জ্বরটা আবার নতুন করে উঁকি দিয়ে চামড়ার নিচে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে, সে ঠিক বুঝতে পারল না। ওয়ান-ওয়ে কাঁচের ওপাশে জ্যাক যেভাবে হুইস্কির বোতলটা উঁচিয়ে ধরেছিল, সেই কুৎসিত ভঙ্গিটা ক্লারার চোখের পর্দায় এখনো ছবির মতো লেপ্টে আছে। সে প্রতি সেকেন্ডে কম্পিউটারের স্ক্রিনে এন্ট্রি তুলছে আর হাত দুটো কাঁপছে। হঠাৎ করেই কাউন্টারের পেছনের হেভি-ডিউটি ভিআইপি এক্সেস ডোরটা শব্দহীন মেটালিক ক্লিকে খুলে গেল। ক্লারা চমকে উঠে সোজা হয়ে ঘুরে তাকাতেই তার বুকের ভেতরের স্পন্দনটা এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। দরজার মেহগনি কাঠের ফ্রেমটায় পিঠ ঠেকিয়ে অলস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং জ্যাক্সন মিলার। সে চিতা বাঘের মতো নিঃশব্দ পায়ে এক কদম ভেতরের দিকে এগিয়ে এল। ক্লারা নিজের কাঁপতে থাকা হাত দুটোকে ডেস্কের নিচে লুকিয়ে ফেলল। সে নিজের চশমাটা নাকের ডগায় শক্ত করে চেপে ধরে অত্যন্ত ঠান্ডা, গলায় বলল, “মিস্টার মিলার, আপনি বোধহয় ভুল দরজায় নক করেছেন। এটা স্টাফ এরিয়া, কাস্টমারদের এখানে আসা কঠোরভাবে নিষেধ। দয়া করে এখনই বাইরে যান, নইলে আমি সিকিউরিটিকে কল করতে বাধ্য হব।”

জ্যাক একটুও সরল না। বরং সে আরও দুই পা এগিয়ে এসে কাউন্টারের ভারী কাঠের ওক টেবিলে নিজের দুই হাত রাখল। তার বিশাল শরীরটার ছায়া নিমেষেই ক্লারার ছোট অবয়বটার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। সে ক্লারার মুখের এত কাছে ঝুঁকে এল যে তার নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকা কড়া হুইস্কির ঝাঁঝালো গন্ধ ক্লারার নাসিকারন্ধ্রে এসে আঘাত করল। জ্যাক তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা ফুটিয়ে তুলে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করল, “সিকিউরিটি? মিস ক্যালকুলেটর, তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছো যে এই ক্লাবের সায়নেজ থেকে শুরু করে সিকিউরিটি গার্ডদের স্যালারি সবকিছুর পেছনে আমার বাবার ফান্ডের সই থাকে। আর নিষেধ শব্দটা জ্যাক্সন মিলারের ডিকশনারিতে কোনোদিন ছিল না।” সে নিজের মুখটা আরও এক ইঞ্চি নামিয়ে আনল, তার চোখ দুটো ক্লারার ঠোঁটের ওপর স্থির হলো। “যে মেয়েটার হাতের সেই চিজি মাশরুম পাস্তার টেস্ট আমার জিভে এখনো লেগে আছে, তাকে স্রেফ ওয়ান-ওয়ে কাঁচের ওপাশ থেকে দেখে আমার ঠিক তৃপ্তি হচ্ছিল না। তুমি কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে কাল ভ্যালেরিয়ার সাথে আমায় খুব মন দিয়ে দেখছিলে, তাই না? কেমন লাগল?”

ক্লারা তীব্র অপমানে নিজের দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরল। তার নীল চোখ দুটোতে তখন আগুন জ্বলছে। সে বলল, “লজ্জা হওয়া উচিত আপনার। কাল রাতে একটা নাটক করলেন, আর আজ রাতে আরেকটা। আপনি একটা সস্তা, চরিত্রহীন ডাম্পস্টার ছাড়া আর কিচ্ছু নন।”

জ্যাক একটু শব্দ করে হেসে উঠল। সে হুট করেই টেবিলের ওপর থেকে এক হাত বাড়িয়ে ক্লারার চিবুকটা নিজের শক্ত বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর খাঁচায় চেপে ধরল। সে তার তপ্ত নিঃশ্বাস ক্লারার ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “চরিত্র”? চরিত্র জিনিসটা তো তোমাদের মতো দুর্বল আর গরিবদের জন্য একটা সান্ত্বনা পুরস্কার। আমি যা চাই, তা আমি স্রেফ কেড়ে নিই। কাল রাতে আমার বিছানায় ওই ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরার ঠিক এক সেকেন্ড আগে তুমি ফায়ার এক্সিট দিয়ে পালিয়েছ। ভেবেছ জ্যাক্সন মিলারের হাত থেকে বেঁচে গেছ? উঁহু। তুমি আসলে আমার খিদেটা আরও একশো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছ।”

ক্লারা ছটফট করে তার হাতটা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু জ্যাকের আঙুলগুলো লোহার সাঁড়াশির মতো শক্ত। সে এক ঝটকায় কাউন্টারের নিচু ড্রয়ারের সাথে ক্লারার কোমরটা চেপে ধরল। দুজনের শরীরের দূরত্ব এখন পুরোপুরি শূন্য। ক্লারা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “ছাড়ুন আমাকে! আমি এখনই চিৎকার করব!”

“চেঁচাও, যত জোরে পারো চেঁচাও,” জ্যাকের চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। সে ক্লারার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট আলতো করে ঘষে দিয়ে ফিসফিস করল, “তুমি চেঁচালে ক্লাবের ম্যানেজার আর বাউন্সাররা ভেতরে আসবে। তারা এসে দেখবে বোস্টনের গোল্ডেন বয় তার পার্সোনাল ফিনান্সিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টকে কাউন্টারের ওপর ফেলে আদর করছে। সমাজ বা ইউনিভার্সিটি কেরিয়ারটা কার আগে ধ্বংস হবে, তোমার ওই ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেন দিয়ে একটু কুইক ক্যালকুলেশন করে নাও, মিস বেনেট।” বলেই সে ক্লারাকে ছেড়ে হাসতে হাসতে দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেল।

রাত দুটো বাজার সাথে সাথেই ক্লাবের মেইন নিয়ন সাইনগুলো একে একে নিভে গেল। ক্লারা নিজের শিফট শেষ হতেই প্রায় দৌড়ে পেছনের স্টাফ ডোর দিয়ে পার্কিং লটের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের মধ্যে বেরিয়ে এল। বোস্টনের মাইনাস ফোর ডিগ্রির বরফ-শীতল হাওয়া যখন তার জ্বলন্ত, লাল হয়ে যাওয়া গালে এসে লাগল, সে বুক ভরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার মনে হচ্ছিল সে একটা নরক থেকে মাত্র প্রাণ নিয়ে ফিরল। কিন্তু পার্কিং লটের সেই ঘন কুয়াশার শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর আগেই, অন্ধকার একটা কোণা থেকে একটা বিশাল কালো ছায়া এসে তার পথ আটকাল। ক্লারা কিছু বুঝে ওঠার বা চিৎকার করার সুযোগ পাওয়ার আগেই, একটা শক্ত, চওড়া হাত এসে তার জ্যাকেটের কলার আর কবজি একসাথে চেপে ধরল।

“ইউ!” ক্লারার মুখ থেকে শব্দটা পুরো বের হওয়ার আগেই জ্যাক তাকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে তার ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের ওপর ছুঁড়ে দিল। ক্লারা লেদার সিটে আছাড় খেয়ে পড়তেই জ্যাক নিজে ড্রাইভিং সিটে উঠে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল এবং এক সেকেন্ডে সেন্ট্রাল লকটা অন করে দিল। ভেতরের মেটালিক লকিং সাউন্ডটা ক্লারার কানে একটা ফাঁদের মতো শোনাল। ক্লারা দরজার হ্যান্ডেলটা ধরে পাগলের মতো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চিৎকার করে উঠল, “আপনি কি পুরো পাগল হয়ে গেছেন, মিস্টার মিলার? এটা কিডন্যাপিং! আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না! দরজা খুলুন!”

জ্যাক কোনো উত্তর দিল না। সে এক্সিলারেটরে চাপ দিল, আর রোলস রয়েসের পাওয়ারফুল ইঞ্জিনটা একটা গর্জন ছেড়ে পার্কিং লটের বরফ উড়িয়ে মেইন রোডের দিকে ছুটে গেল। স্পিডোমিটারের কাঁটা নিমেষেই আশি, তারপর একশো পার করে গেল। সে স্টিয়ারিংয়ে মাত্র এক হাত রেখে অত্যন্ত অলস গলায় বলল, “চুপচাপ সিটবেল্টটা বেঁধে নিজের জায়গায় বসে থাকো, ক্লারা। তোমার এই বাচ্চাদের মতো ছটফটানি আর নখ দিয়ে আঁচড়ানোর চেষ্টা আমার বেডরুমে দেখতে ভালো লাগবে, চলন্ত গাড়িতে নয়। এক্সিডেন্ট হলে তোমার ওই সুন্দর ফর্সা মুখটা নষ্ট হয়ে যাবে, আর জ্যাক্সন মিলার তার দামী খেলনা হাতছাড়া করলেও, সেটাকে এভাবে স্ক্র্যাচ পড়তে দেয় না।”

“খেলনা?” ক্লারা তীব্র ঘৃণায় আর অপমানে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি একটা আস্ত সাইকোপ্যাথ! আপনার ক্ষমতার জোর শুধু মেয়েদের ওপরই খাটে, তাই না? কাল ক্লাবে একটা মেয়ের সাথে যা করছিলেন, তা দেখার পর আপনার এই নোংরা গাড়িতে বসতে আমার বমি আসছে।”

“ওহ! আই সি!” জ্যাক গাড়িটা হুট করেই একটা অন্ধকার, জনমানবহীন গলির ভেতর নিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষে থামাল। চাকার সাথে বরফের ঘর্ষণে একটা তীব্র শব্দ হলো। সেই ঝাঁকুনিতে ক্লারা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় সরাসরি জ্যাকের চওড়া বুকের ওপর গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল। ক্লারা নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই জ্যাক তার দুই চিবুক নিজের শক্ত আঙুলের চাপে এমনভাবে লক করে দিল যে ক্লারার মুখটা উঁচুতে উঠে এল। তার নীল চোখ দুটো এখন সরাসরি জ্যাকের ধূসর, জ্বলন্ত চোখের মুখোমুখি। জ্যাকের চোখ দুটোতে তখন পিশাচিক নেশা। সে খুব নিচু গলায় বলল, “তাহলে মিস ক্যালকুলেটরের বুকে হিংসার আগুন জ্বলেছে? ভ্যালেরিয়া একটা পুতুল, ক্লারা। ওর মতো হাই-সোসাইটির মেয়েদের আমি স্রেফ আমার বিছানার ক্লান্তি মেটাতে ব্যবহার করি আর ডিল শেষ হলে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলি। কিন্তু তোমার এই অবাধ্য, নীল চোখ দুটো কাল রাত থেকে আমাকে এক মূহূর্তের জন্যও ঘুমাতে দিচ্ছে না। তুমি পরশু রাতে আমার বিছানা অপবিত্র করে, আমাকে জানোয়ার বলে চলে গেছ। আজকে তার পুরো জরিমানা উসুল করা হবে।”

ক্লারা নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিয়ে বলল, “আমি আপনার কোনো জরিমানা দেব না। আপনি টাকা দিয়ে সবাইকে কিনতে পারেন, আমাকে পারবেন না। মেরে ফেলুন আমাকে, তাও ভালো।”

“মেরে ফেলব?” জ্যাকের আঙুলগুলো এবার ধীরলয়ে ক্লারার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের ওপর স্লাইড করতে লাগল। তার সেই রুক্ষ স্পর্শের ভেতরেও কেমন একটা তীব্র ওম লুকিয়ে আছে, যা ক্লারার পুরো মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বইয়ে দিল। জ্যাক ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে মেরে ফেললে আমার এই দীর্ঘ, একাকী রাতগুলো কাটবে কাকে ডমিনেট করে? কাকে ভাঙার পর আমি নিজের বিজয়োৎসব করব? আমি তোমাকে মারব না, ক্লারা বেনেট। আমি তোমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে আমার এই নেশায় এমনভাবে বুঁদ করব যে, তুমি নিজেই একদিন তোমার এই ঠোঁট দুটো আমার ঠোঁটের নিচে সঁপে দেবে। এটাই জ্যাক্সন মিলার চ্যালেঞ্জ করলাম। আর আমি কোনোদিন কোনো ম্যাচ হারিনি মাইন্ড ইট।”

গাড়িটা যখন আবার ডাউনটাউনের সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে এসে থামল, ক্লারার শরীর তখন তীব্র জ্বরের ঘোরে কাঁপছে। তার কপালটা পুড়ে যাচ্ছে, জ্যাকেটের ভেতরেও সে ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত চাপছে। জ্যাক গাড়ি থেকে নেমে প্যাসেঞ্জার সাইডের দরজাটা খুলে দাঁড়াল। ক্লারা নামার চেষ্টা করতেই তার পা দুটো অবশ হয়ে ভেঙে পড়তে চাইল। জ্যাক আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। ক্লারার কোনো বাধা বা পারমিশনের তোয়াক্কা না করে, সে এক ঝটকায় তাকে নিজের চওড়া দুই বাহুতে পাঁজা কোলে তুলে নিল। ক্লারা এবার আর নিজেকে মুক্ত করার জন্য পা ছুড়ল না, তার শরীরে সেই শেষ শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। সে চরম ক্লান্তিতে আর জ্বরের ঘোরে নিজের মাথাটা জ্যাকের শক্ত কাঁধের ওপর ছেড়ে দিল এবং অবচেতন মনেই জ্যাকের শার্টের কলারটা নিজের ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। জ্যাকের শরীরের উষ্ণতা এই মুহূর্তে তার বেঁচে থাকার জন্য বড্ড বেশি দরকার। প্রাইভেট লিফটের দরজা খুলে পেন্টহাউসের বিশালবেডরুমে ঢুকতেই জ্যাক ক্লারাকে বিছানার ওপর আলতো করে শুইয়ে দিল। কিন্তু এবার সে দূরে সরে গেল না। সে নিজেও বিছানায় উঠে ক্লারার দুই পাশে নিজের দুই হাত রেখে তার ওপর নিজের ভারী শরীরটার অর্ধেকটা চাপিয়ে দিল। ক্লারা তার আধবোজা চোখ দুটো কোনোমতে খুলে দুর্বল, ভাঙা গলায় বলল, “আজকে যদি আপনি… আমার এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমার ওপর জোর করেন… আমি কাল সকালেই নিজের জীবন শেষ করে দেব।”

জ্যাক ক্লারার চোখের চশমাটা এক ঝটকায় খুলে খাটের পাশের সাইড টেবিলে ছুঁড়ে ফেলল। চশমা ছাড়া ক্লারার নীল চোখ দুটো এখন সম্পূর্ণ কুয়াশাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। জ্যাক তার একটা হাত ক্লারার হুডির নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে তার কোমরের নরম, তপ্ত চামড়াটা শক্ত করে নিজের দিকে টেনে ধরল। সেই ছোঁয়াটায় ক্লারার পুরো শরীরে একটা কাঁপুনি উঠে গেল, তার ভেতরের শেষ প্রতিরোধটুকুও যেন গলে জল হয়ে যেতে লাগল। জ্যাক তার ঠোঁট দুটো ক্লারার কপালে ছোঁয়াতেই দেখল কপালটা আক্ষরিক অর্থেই আগুনে পুড়ছে। সে এক মূহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ক্লারার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ এনে বলল, “জোর? জ্যাক্সন মিলার কোনো মেয়ের ওপর জোর করে না, ক্লারা বেনেট। আমি যখন কোনো শরীর ছুঁই, তখন সেই শরীর নিজেই নিজের সব প্রতিরোধ ভুলে আমার কাছে সারেন্ডার করে। তোমার এই তপ্ত, অসুস্থ শরীরটা এখন আমার বুকের উত্তাপ চাইছে, সেটা তোমার এই ধকধক করতে থাকা বুকের স্পন্দনটাই আমাকে বলে দিচ্ছে।”

জ্যাক বিছানার পাশের ড্রয়ার থেকে একটা কড়া জ্বরের ওষুধ আর এক গ্লাস পানি বের করে ক্লারার মুখের সামনে ধরল, “চুপচাপ এই বড়িটা গিলে নাও। আর কান খুলে শুনে রাখো আজ রাতে এই বিছানায় ডান পাশ, বাম পাশ বলে কোনো সীমানা থাকবে না। আজ রাতে তুমি আমার বুকের ওপর মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে থাকবে। যদি এক ইঞ্চিও দূরে যাওয়ার বা নিচে নামার চেষ্টা করো, তবে কাল সকালের সূর্য ওঠার আগেই তোমার ওই মিউনিখের অনাথ আশ্রমের ল্যান্ড লিজের অরিজিনাল কাগজগুলো আমি নিজের হাতে পুড়িয়ে ছাই করে দেব। তখন তোমার ওই অনাথ বাচ্চারা বোস্টনের এই বরফের রাস্তায় এসে দাঁড়াবে।”

ক্লারা আর কোনো কথা বলল না। সে ওষুধের বড়িটা মুখে দিয়ে পানিটুকু গিলে নিল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে সিল্কের বালিশে মিশে গেল। জ্যাক নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে সেই অশ্রুটুকু আলতো করে মুছে নিল, তারপর তার নিজের ঠোঁট দুটো ক্লারার ভেজা চোখের পাতায় চেপে ধরল। জ্যাক রিমোটের বোতাম চেপে ঘরের সব আলো এক ঝটকায় নিভিয়ে দিল। পুরো বিশাল বেডরুমটা এখন ফায়ারপ্লেসের সেই শেষ হয়ে আসা লালচে আভায় আর অন্ধকারে ডুবে গেছে। জ্যাক ক্লারার দুর্বল, কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের চওড়া, শক্ত বুকের সাথে একদম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। ক্লারা এই শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করল। তবে খুব বেশি সময় লাগল না জ্যাকের শক্তির কাছে তার শরীরের মাথানত করতে। রাগ ও জিদে সে জ্যাকের বুকের শার্টের কাপড়টা নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরল। জ্যাক অবশ্য তাতে অবশ্য শক্ত দেখাল না। সে কেবল নিশ্বাস ছেড়ে বাঁকা হেসে চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল, “তুমি আমার গোলাপের বাগানে প্রবেশ করেছো, এখন ফুল পেতে হলে তো কাঁটার জখম সহ্য করতেই হবে মিস ক্যালকুলেটর।”

চলবে?