#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_17
ক্লারা তার তিনতলার ছোট ডর্ম রুমের মাঝখানে কাঠের পুরোনো মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে অফ-হোয়াইট রঙের একটা সাধারণ উলের সোয়েটার, পরনে সুতির ডার্ক ট্র্যাকপ্যান্ট। দুই হাত দিয়ে সে এক কাপ হালকা আদা চা শক্ত করে ধরে রেখেছিল, যার থেকে মিহি ধোঁয়া উঠে তার চশমার কাঁচ দুটোকে বারবার ঝাপসা করে দিচ্ছে। সে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে চশমার কোণাটা আলতো করে মুছে জানালার কাঁচের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
নিচে, সেই পাতাঝরা মরা গাছটার নিচে কিন্তু কেউ নেই। ক্লারা এক মূহুর্তের জন্য নিজের চোখের ভুল ভেবে চশমাটা নাক থেকে এক হাত দিয়ে খুলে ভালো করে মুছে আবার পরল। ল্যাম্পপোস্টের ছায়ায় সেই উঁচু, চওড়া অবয়বটা সত্যি সত্যিই গায়েব হয়ে গেছে। ক্লারার বুকের ভেতরে বড্ড অজানা এক ভয় ছড়াতে শুরু করল। যে ছেলেটা এতক্ষণ বরফে ভিজছিল, পকেটে এক সেন্টও নেই, সে হঠাৎ এভাবে গায়েব হয়ে গেল কোথায়? বোস্টনের এই মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াসের রাতে কোনো আশ্রয় ছাড়া খোলা রাস্তায় এক ঘণ্টা থাকা মানে তো সোজা হাসপাতালের আইসিইউতে যাওয়া! ঠিক তখনই নিচতলার কাঠের প্রধান সিঁড়ি বেয়ে কারো খুব ধীর পায়ের জুতো ঘষার শব্দ ওপরেু উঠতে শুরু করল। শব্দটা আস্তে আস্তে তিনতলার এই সরু, অন্ধকার করিডোরটার দিকে এগিয়ে আসছে। ক্লারা ডাইনিংয়ের ছোট টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা এক প্রকার আছড়ে রাখল। তার নিজের অজান্তেই হাত দুটো কেমন যেন কাঁপছে। সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই তার ৩০৪ নম্বর ডর্ম রুমের শক্ত চেরি কাঠের দরজায় তিনবার মেপে মেপে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ক্লারা কম্পিত হাতে দরজার ভেতরের পিতলের পুরোনো লকটা ঘোরাল। দরজাটা সামান্য ফাঁক করতেই হুড়মুড় করে ভেতরেু ঢুকে এলো বাইরের হিমশীতল এক দলা বরফ-বাতাস। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাক্সন মিলার।
তার কালো জ্যাকেটের কাঁধ আর কলার জুড়ে সাদা বরফের পুরু আস্তরণ জমে আছে। এলোমেলো বাদামী চুলগুলোর ডগায় বরফের ছোট ছোট কণা কাঁচের মতো জ্বলজ্বল করছে। তার ঠোঁট দুটো ঠাণ্ডায় নীলচে হয়ে এসেছে, কিন্তু হাত দুটো এখনো পকেটের ভেতরেু গুঁজে রাখা। ক্লারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো কথা মুখ দিয়ে বের করতে পারল না। তার নীল চোখ দুটো চশমার আড়াল থেকে স্রেফ অবাক হয়ে জ্যাকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাক একটু নিচু হয়ে ক্লারার চোখের দিকে তাকাল। তার ধূসর চোখের ওপর রাতের সেই অলস আলো। সে তার ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া ঠোঁট দুটো কোনোমতে একটু বাঁকিয়ে বলল, “ভেতরে আসার অনুমতি দেওয়া যায়, নাকি ডর্ম রুমের কড়া রুলসের বাহানায় এই বরফের ভেতরের মরা গাছটার নিচে রূপকথার কোনো বরফ-মানব বানিয়ে রেখে দেবে, মিস ক্যালকুলেটর?”
ক্লারা দরজার হ্যান্ডেলটা আরও কিছুটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। সে একদম দরজার একপাশে সরে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল, “ভেতরে আসুন।”
জ্যাক ঘরে ঢুকেই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ডর্ম রুমটা খুব ছোট। একটা মাত্র সিঙ্গেল কাঠের খাট, তার পাশে একটা খুব ছোট রিডিং টেবিল, দুটো কাঠের পুরোনো চেয়ার, আর দেওয়ালের এক কোণায় তিন তাকের একটা ছোট বুকশেলফ। এত ছোট ঘরে কোনোদিন দুই ফুট দূরত্বেও দাঁড়ায়নি বোস্টনের শীর্ষ কোটিপতির একমাত্র ওয়ারিশ। জ্যাক তার পা থেকে স্নো-বুট জোড়া খুলতে চাইল, কিন্তু ঠাণ্ডায় জমে আঙুলগুলো সাড়হীন হয়ে যাওয়ায় সে বুটের ফিতে খুলতে পারছিল না। তার এই অসহায়ত্বটা ক্লারার নজর এড়ালো না। ক্লারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে নিজে হাঁটু গেড়ে জ্যাকের সামনে বসে পড়ল।
“আপনি সোজা হয়ে দাঁড়ান, আমি খুলে দিচ্ছি।” ক্লারা খুব শান্ত গলায় বলল। জ্যাক এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সে নিচু হয়ে দেখল, অনাথ আশ্রমের সেই আত্মসম্মানী মেয়েটা তার অহংকারী বরের ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া বুটের ভিজে ফিতেগুলো খুব যত্ন করে একটা একটা করে আলগা করছে। “তোমাকে আমার পায়ে এভাবে হাত দিতে হবে না, ক্লারা। আমি পারব।”
ক্লারা বুট জোড়া খুলে ঘরের এক কোণায় রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে সরাসরি জ্যাকের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “পায়ের জুতোর ফিতে খুলে দিলে কারো সম্মান কমে যায় না, মিস্টার মিলার। আর আপনি তো এখন আমার ডর্ম রুমের মেহমান, তাই না?”
জ্যাক তার জ্যাকেটের জিপারটা খুলে ওটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখল। জ্যাকেটের ভেতরের কালো টি-শার্টটাও আর্দ্রতায় কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। সে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল। এত ছোট ঘর সে তার এত বছরের জীবনে সম্ভবত কখনো দেখেনি। পেন্টহাউসের বাথরুমের সাইজও বোধহয় এর চেয়ে দ্বিগুণ বড়। “মেহমান?” জ্যাক একটু হাসল। সে ঘরের মাঝখানের সেই কাঠের ছোট্ট চেয়ারটায় ধীর পায়ে বসে নিজের দু-হাত একসাথে ঘষে একটু ওম নেওয়ার চেষ্টা করল। “আমি তো ভাবলাম তুমি আমাকে বলবে মিলার বংশের অহংকারী ছেলেটাকে তার বাবা রাস্তা না দেখালে এই সস্তা ঘরে অন্তত আসার ভাগ্য হতো না।”
ক্লারা ডাইনিং টেবিল থেকে নিজের চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বলল, “আপনি চা খাবেন? আমার কাছে লিকার চা ছাড়া কোনো দামী ক্যাফেটেরিয়ার ওয়াইন বা ব্ল্যাক কফি নেই।”
“সব চলবে।” জ্যাক সোজা হয়ে বসে বলল। “তবে চায়ে চিনি একটু বেশি দিও। এই বরফঝড়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমার শরীরের ভেতরের ব্লাড সুগার সব জিরো হয়ে গেছে।”
ক্লারা ইলেকট্রিক কেটলির বোতামটা টিপে দিয়ে কিচেন কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনটা ভেতরেু ভেতরেু ঝড়ের মতো তোলপাড় হচ্ছে। এই ছেলেটা সত্যিই এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বের হয়ে এসেছে! কিন্তু কেন? স্রেফ অনাথ আশ্রমের লিজ বাঁচানোর জন্য? নাকি লরেঞ্জো ফ্যামিলির সেই কুৎসিত ডিভোর্স পেপারে সই না করার অহংকারে? সে চায়ের কাপে গরম জল ঢালতে ঢালতে পেছন ফিরে না তাকিয়েই খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনার বাবা সত্যিই আপনাকে একদম বের করে দিয়েছেন?”
জ্যাক টেবিলের ওপর রাখা ক্লারার একটা ফিনান্সের বইয়ের পাতা আলতো করে উল্টাতে উল্টাতে বলল, “বের উনি করেননি, আমি নিজে চাবি আর ক্রেডিট কার্ডগুলো উনার টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে এসেছি। রাজপ্রাসাদের চাবি ফেরত দিয়ে ভালোই করেছি, অন্তত নিজের মাথার অহংকারটা কারো কেনাবেচার আইটেম হতে দিইনি।”
গরম চায়ের কাপটা জ্যাকের সামনে রাখতেই জ্যাক দুটো হাত দিয়ে কাপটা এমনভাবে চেপে ধরল যেন এক চিলতে আগুনের ওম পাওয়ার জন্য সে উন্মুখ হয়ে ছিল। সে এক চুমুক চা খেয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। খুব ধীর গলায় বলল, “চা-টা কিন্তু সত্যি দারুণ বানিয়েছ, ক্লারা। আমার মনে হচ্ছে পেন্টহাউসের ওই লাক্সারি কফি মেকারের চেয় এই সাধারণ কেটলির চা অনেক বেশি জ্যান্ত।” ক্লারা কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের হাত দুটো সোয়েটারের পকেটে পুরে খাটের এক কোণায় গিয়ে বসল। এখন সবচেয়ে বড় সমস্যাটা এসে দাঁড়িয়েছে এই ঘরের জায়গা নিয়ে। ঘরে একটাই সিঙ্গেল কাঠের খাট, আর মাত্র দুটো চেয়ার। বাইরের ঝড় দিন দিন তীব্র হচ্ছে, জানালা কাঁপছে থরথর করে। আজ রাতে জ্যাকের এই ঘরে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। জ্যাক চায়ের শেষ চুমুকটা দিয়ে কাপটা রাখল। তারপর অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে খাটের দিকে পা বাড়াল। ক্লারা সাথে সাথে এক ঝটকায় খাট থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে পেছনেু সরে গেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠেছে। “আপনি… আপনি খাটে আসছেন কেন?”
জ্যাক খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। “কেন? এটা তো তোমার আমার মাঝখানের সেই বালিশের বর্ডার দেওয়া পেন্টহাউসের খাট নয়, ক্লারা। এটা তোমার একটা মাত্র তিন ফুটের সিঙ্গেল খাট। এখানে ঘুমাতে হলে তো কোনো বর্ডার দেওয়ারও স্পেস নেই।”
“আপনি এই খাটে একদম শোবেন না!” ক্লারা প্রায় ধমকে উঠল। “আমি আপনাকে এই ডর্ম রুমে আশ্রয় দিয়েছি তার মানে এই নয় যে আপনি যা খুশি তা-ই করবেন। আপনি ওই পাশের চেয়ার দুটো জোড়া দিয়ে ঘুমান, নয়তো আমি নিজেই মেঝেতে পাপোশ দিয়ে শুয়ে পড়ছি।” জ্যাক এক পা এগিয়ে এসে ক্লারার এত কাছাকাছি দাঁড়াল যে ক্লারার চশমার কাঁচের ওপর আবার জ্যাকের নিঃশ্বাসের উত্তাপ এসে পৌঁছাল। সে ভারী গলায় বলল, “তুমি মেঝেতে শোবে? আর বোস্টন শহরের গোল্ডেন বয় হয়ে আমি খাটে ঘুমাব? এত বড় পাষাণ কিন্তু আমাকে বানিও না, মিসেস মিলার। তার চেয়ে ভালো, চলো এই ছোট খাটটাতেই আমাদের এডজাস্টমেন্টের প্রথম চ্যাপ্টার শুরু করা যাক।”
ক্লারা রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে নিজের চশমাটা নাকের ওপর সোজা করে শক্ত গলায় বলল, “আমি আপনার কোনো কথার ফাঁদে পা দেব না। বিয়ের কাগজের শর্তগুলো মনে আছে তো? আপনি আমার অমতে আমাকে ছুঁতেও পারবেন না।”
জ্যাক একটু হাসল। সে খাটের একদম কিনারায় গিয়ে বসল এবং নিজের জ্যাকেটটা ভাজ করে বালিশের মতো বানাল।
“আমি ছুঁব না, ক্লারা,” জ্যাকের গলায় এবার এক পরম মায়াবী ওম। সে একপাশে চেপে শুয়ে পড়ে খাটের অর্ধেকের বেশি জায়গা ক্লারার জন্য খালি করে রেখে বলল, “আমার এই তিন ফুটের খাঁচায় তুমি সুরক্ষিত। আমি স্রেফ চাই তুমি এই পাশে শান্ত হয়ে শুয়ে পড়ো। বাইরে যে ঝড় চলছে, তাতে মেঝেতে শুলে কাল সকালেই ডবল নিউমোনিয়া হবে। আর তোমার খেয়াল রাখাটা এখন আমার একমাত্র দায়িত্ব, কারণ আমার পকেটের কুড়ি ডলার ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো সম্পদে আমার এখন আর কোনো অধিকার নেই।”
–
ঘরটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে গেল। টেবিলের ওপরের টিমটিমে স্টাডি ল্যাম্পের লালচে আলোটা দেয়ালে এসে পড়ছে। ক্লারা প্রায় পাঁচ মিনিট ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে ঝড়ের গর্জন আর হিটারের হালকা টুংটাং শব্দ। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে, ক্লারা খুব ধীর পায়ে খাটের কাছে এলো। সে নিজের গায়ের অতিরিক্ত শালটা গায়ে পেঁচিয়ে খাটের একদম অন্য প্রান্তের কাঠের বর্ডারের সাথে গা ঘেঁষে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। তাদের দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক ইঞ্চির এক অদৃশ্য দেয়াল। জ্যাক একপাশে কাৎ হয়ে শুয়ে ছিল। সে অন্ধকারের মধ্যে ক্লারার এই আড়ষ্ট ভাব দেখে নিচু স্বরে হাসল।
“তুমি কি কাঠের সাথে ফ্রেম হয়ে গেছ নাকি, ক্লারা? একটু এপাশে সরো, তা না হলে শেষমেশ খাট থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়বে।”
ক্লারা পিঠটা কাঠের ফ্রেমে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “আমি একদম ঠিক আছি। আপনি নিজের দিকে মুখ করে ঘুমান। আমার দিকে তাকানোর কোনো দরকার নেই।”
জ্যাক নিজের এক হাত কপালে রেখে খুব সহজ, সাবলীল গলায় বলল, “বাবার ওই ষাট তলার ম্যানশনের চেয়ে এই তিন ফুটের কাঠখানা অনেক বেশি আরামদায়ক লাগছে জানো? সেখানে চারপাশে শুধুই হিসাব-নিকাশ আর টাকার গন্ধ ছিল। আর এখানে একটা পরিচিত চায়ের সুবাস, আর একজন বড্ড জেদি চশমা পরা মেয়ে।”
“কম কথা বলুন, মিস্টার মিলার,” ক্লারা জানালার দিকে মুখ করে বলল। “সকালে উঠে আপনাকে বাস ধরে ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে। এখন আর আপনার সামনে কোনো ব্যক্তিগত প্রাইভেট ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না।”
জ্যাক এবার বড্ড জোর করে একটু হেসে উঠল। “বাস ড্রাইভার?” সে বলল। “আমি বাস্কেটবল কোর্টের ক্যাপটেন, ক্লারা। বাস চালানো বা লোকাল বাসে চড়া আমার জন্য কোনো রকেট সায়েন্স নয়। তবে কাল সকালে কিন্তু তোমাকে আমাকে পাঁচ ডলারের সস্তা কফি খাওয়াতে হবে। কারণ আমার পকেটের ওই কুড়ি ডলার আমি অনাথ আশ্রমের পরবর্তী কিস্তির জন্য জমিয়ে রাখব।”
ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। এই ছেলেটা আজ রাতে নিজের সমস্ত অহংকার, টাকা, গাড়ি হারিয়ে স্রেফ কুড়ি ডলার পকেটে নিয়ে শুয়ে আছে। অথচ তার মাথায় এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের লিজের টাকার কথা! ক্লারা অন্ধকারের মধ্যে অলক্ষ্যেই নিজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে তুলল। মনের বরফ গলতে শুরু করার প্রথম মুহূর্তটাই তো বোধহয় এটা। সে খুব নিচু গলায় বলল, “কাল সকালে আমি আপনাকে নিজের হাতে কফি বানিয়ে দেব। আপনাকে কোনো পাঁচ ডলার খরচ করতে হবে না।”
জ্যাক কোনো উত্তর দিল না। স্রেফ তার নিয়মিত ও শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। সে ইতিমধ্যেই ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
–
রাত তখন গভীর। ঝড়ের দাপট কিছুটা কমে এলেও বাইরে ঝিরঝির করে জমাট বরফ পড়ছে। ক্লারা ঘুমোতে পারছিল না। সে ধীর পায়ে অন্ধকারের মধ্যে ঘুরে শুলো। স্টাডি ল্যাম্পের সেই হালকা আলোয় জ্যাকের ঘুমন্ত মুখটা দেখা যাচ্ছিল। এই প্রথম ক্লারা এত কাছ থেকে এই ছেলেটাকে দেখছে যেখানে কোনো অহংকার নেই, কোনো জেদ নেই, কোনো ডমিনেটিং চাউনি নেই। স্রেফ একটা অবাধ্য ছেলের মতো সে কপালে এলোমেলো চুল ফেলে ঘুমাচ্ছে। তার ডান হাতটা খাটের মাঝখানে আলতো করে রাখা। ক্লারা নিজের হাতটা বাড়াল। সে খুব সাবধানে, একদম নিঃশব্দে জ্যাকের কপালে পড়ে থাকা অবাধ্য বাদামী চুলগুলোর একটা গোছা আঙুল দিয়ে আলতো করে সরিয়ে দিল। জ্যাকের গায়ের ওমটা যেন এক মূহুর্তে ক্লারার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবল এই ছেলেটা এত দিন যা করেছে, তা কি সত্যি শুধুই রাগ আর জেলাসি থেকে? নাকি এই হিংস্রতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসীম, ব্যাকুল ভালোবাসা? যে ভালোবাসা নিজের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে অলিগলির এই ডর্ম রুমে এক কাপড়ে এসে আশ্রয় নিতেও এক সেকেন্ড দ্বিধা করে না? জ্যাক ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠল। সে কোনো সচেতনতা ছাড়াই ক্লারার হাতটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় আলতো করে চেপে ধরল। সে কিন্তু ক্লারাকে নিজের দিকে টেনে আনল না, স্রেফ হাতের তালুতে সেই চেনা ছোঁয়াটুকু ধরে রেখে এক গভীর প্রশান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ক্লারা তার হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না। সে চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। চশমা ছাড়া তার নীল চোখ দুটোতে তখন শুধুই গভীর সমর্পণের আলো। বাইরে তখন ভোরের হালকা আলো ফোটার অপেক্ষা, আর ভেতরে দুই পূর্ণ সত্ত্বার শান্তির ঘুমের পালা।
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_18
বোস্টনের সকালটা আজ একদম ঝকঝকে নীল আকাশে ঢাকা, তবে বাতাসে তুষারঝড়ের সেই কনকনে কামড়টা এখনো পুরোপুরি থেকে গেছে। ডর্ম রুমের জানালার কাঁচ বরফে অস্পষ্ট হয়ে আছে।
ক্লারা ভোরেই উঠে পড়েছিল। তার পরনে একটা সাধারণ নীল ডেনিম সোয়েটার। সে কিচেন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে খুব মন দিয়ে ইলেকট্রিক কেটলিতে জল ফুটিয়ে দুটো সস্তা মগে কফি গুলে নিচ্ছে। ঘরের ভেতর কফির হালকা তেঁতো সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে।
খাটের ওপর জ্যাক তখনো চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। সকালের সোনালী রোদ এসে তার ফর্সা কপালে আর এলোমেলো বাদামী চুলে পড়েছে। সে চোখ না খুলেই একটা লম্বা আলমোড়া ভেঙে খুব ধীর, ভারী গলায় বলল, “এই কফির গন্ধটা কিন্তু পেন্টহাউসের ইতালিয়ান কফি বিনসের থেকে একদম আলাদা। গন্ধেই বোঝা যাচ্ছে এটা কোনো সস্তা পাঁচ ডলারের সুপারমার্কেটের কফি।”
ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে এক কাপ কফি তার টেবিলের সামনে রাখল। খুব শান্ত গলায় বলল, “দামী কফি খাওয়ার দিন তো কাল রাত থেকেই শেষ হয়ে গেছে, মিস্টার মিলার। এখন এই সস্তা কফিতেই অভ্যাস করুন, নয়তো পুরো দিন আপনাকে স্রেফ ফুটপাতের ঠান্ডা জল খেয়ে কাটাতে হবে।”
জ্যাক খাট থেকে উঠে বসল। তার পরনে সেই কালকের স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া কালো টি-শার্ট। সে কফির মগটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর একটু মুখ কুঁচকে বলল, “চিনি এত কম কেন? আমাকে কি তোমার ফিনান্সের ক্লাসের মতো কফিতেও কঞ্জুসি শেখাচ্ছ নাকি?”
“কঞ্জুসি নয়, হিসেব।” ক্লারা নিজের চায়ের কাপটা নিয়ে টেবিলের ওপাশে বসল। “আমার ডর্মে যেটুকু চিনি ছিল, ওটাই শেষ। আর রিফিল করার মতো টাকা আপাতত ক্যাফেটেরিয়া কার্ডে নেই।”
জ্যাক একদৃষ্টে ক্লারার দিকে তাকাল। তার ধূসর চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত অলস আলো। সে মগটা টেবিলে রেখে খুব সহজ গলায় বলল, “তোমার ক্যাফেটেরিয়া কার্ডে টাকা নেই মানে? আমি কি আজ থেকে তবে অনাহারে থাকব, নাকি বোস্টন ইউনিভার্সিটির সামনে থালা নিয়ে বসব?”
ক্লারা চশমার আড়াল থেকে চকচকে চোখে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। “বসা যেতেই পারে। বাস্কেটবল টিমের স্টার প্লেয়ার ভিক্ষা চাইছে দেখলে মিডিয়া অন্তত আরও এক সপ্তাহ ভ্যালেরিয়াদের ট্রোল করার সুযোগ পাবে।”
জ্যাক বড্ড শান্তভাবে একটু হাসল। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন এই মেয়ের সাথে তার লাগতে ভালোই লাগে। ওইযে মনের শান্তি হলো বড় শান্তি।
–
সকাল সাড় আটটা। ডর্মের গেট থেকে ইউনিভার্সিটির মেইন ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় দুই মাইল। এতদিন জ্যাক এই পথটুকু নিজের ক্রিমসন রঙের দামী রোলস রয়েসে বসে মাত্র পাঁচ মিনিটে পার করত। কিন্তু আজ তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হলো ১৭ নম্বর লোকাল বাস স্টপেজে। রাস্তায় বরফ জমায় বাস আসতে বেশ কিছুটা দেরি করছিল। জ্যাক তার পকেটে হাত দিয়ে জ্যাকেটের কলার উঁচূ করে দাঁড়িয়েছিল। চারপাশের সাধারণ স্টুডেন্টরা আর সাধারণ মানুষজন তাকে দেখে ফিসফিস করছিল। বোস্টনের শীর্ষ কোটিপতি আজ লোকাল বাস স্টপেজে লাইনে দাঁড়িয়েছে এই দৃশ্য দেখার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বাসটা এসে থামতেই একদল মানুষ একসাথে ভেতরেু ঢোকার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করল। বোস্টনের এই লোকাল বাসগুলোতে সকালের দিকে ভিড় বড্ড বেশি থাকে। ক্লারা ভিড়ের মধ্যে ক্যাবের সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে হুট করে বরফে পা পিছলে যেতে নিয়েছিল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর আগেই একজোড়া শক্ত, চওড়া হাত তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। ক্লারা চোখ খুলে দেখল, জ্যাক তাকে একহাতে পুরোপুরি আগলে ধরে নিজের শরীরের আড়ালে নিয়ে এসেছে। জ্যাকের বুকের ধুকপুক শব্দটা ক্লারার কানের খুব কাছে এসে বাজছে। বাসের ছাদটা নিচু, চারপাশে ভিজে কোটের বিশ্রী একটা গন্ধ। লোকজনের ঠেলাঠেলিতে তারা দুজন বাসের রডের হ্যান্ডেল ধরে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইল। জ্যাক ভিড়ের দিকে অত্যন্ত বিরক্ত আর হিংস্র চোখে তাকাল। যে লোকটা ক্লারার ধাক্কা দিয়ে ওপরে উঠেছে, জ্যাক তার দিকে এক চোখ ছোট করে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “আর এক ইঞ্চি এপাশে সরলে কিন্তু পরের বাসটা তোমাকে হাসপাতালে গিয়ে ধরতে হবে, বাডি।”
লোকটি ভয়ে এক পা পেছনে সরে গেল। ক্লারা একটু নিচু গলায় বলল, “মিস্টার মিলার, বাসে এমন ভিড় থাকবেই। আপনি শান্ত থাকুন।”
জ্যাক ক্লারার কানের কাছে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, “আমার এই ভিড়ের প্রতিটা ছোঁয়াকে ঘৃণা হচ্ছে, ক্লারা। ওরা জানেও না যে আমি তোমাকে কতটা শক্ত করে ধরে রাখতে পারি।”
ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। বাসের দোলাচলের সাথে সাথে জ্যাকের কড়া সুবাস আর বুকের উষ্ণা তার পুরো অস্তিত্বকে কেমন যেন এক অজানা জালে জড়িয়ে ফেলছে।
–
ইউনিভার্সিটির সেন্ট্রাল ক্যাফেটেরিয়া। দুপুরের দিকে চারপাশের চেনা ফিনান্সের বন্ধুরা যখন দামী স্টেক আর স্প্যানিশ ওয়াইন নিয়ে ডাইনিং টেবিলগুলোতে আড্ডা দিচ্ছিল, তখন ক্যাফেটেরিয়ার একদম সাধারণ স্টুডেন্টদের লাইনে দাঁড়িয়েছিল জ্যাক আর ক্লারা। ক্লারা তার কার্ডটা পাঞ্চ করে দুটো তিন ডলারের সস্তা ট্রে তুলে নিল। ট্রে-তে ছিল এক বাটি পাতলা ভেজিটেবল সুপ, দুটো ড্রাই ব্রেড, আর সামান্য কিছু বয়েল করা কিছু শস্যদানা। তারা কোণার এক কাঠের ভাঙা টেবিলে এসে বসল। জ্যাক ট্রে-টার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। প্রোটিন শেক, দামী লবস্টার আর ইতালিয়ান পাস্তা ছাড়া যে ছেলেটা কোনোদিন কিছু মুখে তোলেনি, তার সামনে আজ তিন ডলারের এক বাটি ঠান্ডা সুপ। ক্লারা অপরাধবোধে ভুগে খুব নিচু গলায় বলল, “আপনার যদি খেতে কষ্ট হয়, তবে খাবেন না। আমি বাইরের কোনো ফুড ব্যাংক থেকে কিছু জোগাড় করার চেষ্টা করি?”
জ্যাক চামচটা সুপের বাটিতে ডুবিয়ে এক চামচ সুপ মুখে দিল। তার মুখে কোনো বিরক্তির রেখা ফুটল না। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আমার নিউট্রিশন দরকার, ক্লারা। খাবারটা দামী রেস্টুরেন্টের না হতে পারে, কিন্তু ওটার চেয়ে এই সুপটা অনেক বেশি জ্যান্ত। আর তুমি আমার পাশে বসে আছো, ওটাই আমার আসল প্রোটিন।” ঠিক তখনই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভ্যালেরিয়ার দুই চেনা বান্ধবী তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের একজন খুব তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “আহা! আমাদের বাস্কেটবল ক্যাপটেনের লাঞ্চ ট্রে-টা তো দারুণ দেখাচ্ছে! তিন ডলারের সুপ? লরেঞ্জোদের সাথে শত্রুতা করার মাশুলটা তো বড্ড সুন্দরভাবে দিচ্ছেন, মিস্টার মিলার!”
ক্লারা মুখ খুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জ্যাক তার হাতটা টেবিলের নিচ দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। জ্যাক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ওই মেয়ে দুটোর দিকে এক পরম অবজ্ঞার চোখে তাকাল। খুব সহজ গলায় বলল, “আমার প্লেটে তিন ডলারের সুপ থাকুক বা বিষ থাকুক ওটা আমার যোগ্যতায় কেনা। তোমার বাবার মতো অন্যের পা ধরে কেনা দামী স্টেক নয়। এবার আমার খাওয়ার সময় ডিস্টার্ব না করে নিজের মেকআপটা ঠিক করতে পারো। কুত্তার ব্যাকসাইটের মতো দেখতে লাগছে।”
মেয়ে দুটো অপমানে লাল হয়ে মুখ ঘুরিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। ক্লারা চমকে উঠে জ্যাকের দিকে তাকাল। নিঃস্ব হয়েও এই ছেলের কথার ধার এক সেন্টও কমেনি!
–
বিকেল চারটে। ইউনিভার্সিটি ছুটি হওয়ার পর জ্যাক ক্লাবের একটা পুরোনো লোকাল জিম সেশনে গিয়েছিল নিজের ফিটনেস ধরে রাখার জন্য। সেখানে আজ ট্রেনার নেই, কোনো স্পেশাল এনার্জি ড্রিংক নেই। সে স্রেফ নিজের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে পুশ-আপ আর ডাম্বেল তুলছিল। তার গা বেয়ে ঘাম ঝরছিল। ক্লারা তখন তার পার্ট-টাইম টিউশন আর লাইব্রেরির এসিস্টেন্ট জবের বকেয়া পাওনাটুকু তুলতে ইউনিভার্সিটির একাউন্টস সেকশনে দাঁড়িয়েছিল। হাতে এসেছে মাত্র চল্লিশ ডলার। সে ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের একটা ছোট ফল সপে গিয়ে দাঁড়াল। তার নিজের জন্য খরচ করার অভ্যাস নেই, কিন্তু সে জানে জ্যাক একজন এথলিট। প্রোটিন আর ভিটামিন ছাড়া তার শরীর কিন্তু দু-দিনের মধ্যে ভেঙে পড়বে। সে নিজের গচ্ছিত চল্লিশ ডলারের মধ্যে ত্রিশ ডলার খরচ করে চারটে বড় বড় তাজা লাল আপেল আর কিছুটা পিনাট বাটার কিনে ফেলল। বাকি দশ ডলার রাখল আগামীকালের বাস ভাড়ার জন্য। মেয়েরা সাধারণত নিজের টাকা দিয়ে মেকআপ বা জামা কেনে, কিন্তু ক্লারা আজ নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে এক ঝুড়ি তাজা ফল নিয়ে ডর্মের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। যখন সে ডর্ম রুমে ফিরে এল, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। জ্যাক ঘরে ফিরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছিল। সে ডাইনিং টেবিলে রাখা ফলের প্যাকেটটা দেখে থমকে দাঁড়াল।
“এগুলো কোথা থেকে এলো, ক্লারা?” সে গামছাটা ঘাড়ে ফেলে খুব গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বইয়ের ব্যাগটা নামিয়ে রাখল। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “আমার পার্ট-টাইম জবের টাকা থেকে কিনেছি। আপনি একজন বাস্কেটবল প্লেয়ার, মিস্টার মিলার। আপনার শরীর ঠিক রাখাটা জরুরি। ওই সুপ খেয়ে আপনি কাল প্র্যাকটিসে নামতে পারবেন না।”
জ্যাক ফলের থলেটার দিকে আর একবার তাকাল।
যে ছেলেটার বাবা কোটি কোটি টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ করে দিয়েছিল, যে ছেলেটার জন্মদিনের পার্টিতে লক্ষ টাকার ট্রাফেল কটেজ আনা হতো সে আজ এক অনাথ মেয়ের কষ্টের উপার্জনের ত্রিশ ডলারের চারটে লাল আপেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জ্যাকের সেই একরোখা মুখটা এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠল। তার ধূসর চোখ দুটোয় আর্দ্রতা দেখা দিল। সে ধীর পায়ে ক্লারার এত কাছাকাছি এসে দাঁড়াল যে তাদের চারপাশের বাতাসটাও থমকে গেল। সে ক্লারার দু-কাঁধ নিজের শক্ত দু-হাতে চেপে ধরে খুব নিচু, কাঁপানো গলায় বলল, “তুমি কেন আমার জন্য এত করছো, ক্লারা? আমি তো তোমাকে জোর করে এই খাঁচায় এনে আটকে রেখেছিলাম। আমি তো তোমার কাছে স্রেফ একটা নিষ্ঠুর ডেভিল ছাড়া আর কিছু ছিলাম না।”
ক্লারা চশমার কাঁচের আড়াল থেকে সোজা জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। সে কিন্তু নিজের চোখ সরাল না। “আমি কারো দয়া বা উপকারের ধার রাখি না, মিস্টার মিলার,” ক্লারা সাবলীল গলায় বলল। “আপনি আমার অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলোর মাথার ওপর থেকে ছাদ কারতে চেয়েছিলেন আবার আপনিই আমার বাচ্চাদের আশ্রম বাঁচানোর জন্য নিজের পুরো সাম্রাজ্য বাবার পায়ে ছুঁড়ে দিয়ে এসেছেন। আপনার ওই জেদি হিংস্রতার নিচে যে একটা মন আছে, ওটা আমি জানি। এখন চুপচাপ একটা আপেল খান, বেশি লেকচার দেওয়ার দরকার নেই।”
জ্যাক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ক্লারাকে নিজের বিশাল বুকের মধ্যে টেনে নিল। এবার আর কোনো হিংস্রতা বা জোর ছিল না। সে স্রেফ ক্লারার সুতির সোয়েটারে মুখ লুকিয়ে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা গরম জল ক্লারার কাঁধের কাপড়ে এসে পড়ল।
ক্লারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে অনুভব করল বোস্টনের অলিখিত রাজা আজ তার এই ছোট তিন ফুটের ডর্ম রুমে এসে, তার বুকের কাছে মাথা রেখে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছে। সে আলতো করে নিজের দুটো হাত বাড়িয়ে জ্যাকের শক্ত পিঠটা জড়িয়ে ধরল। ডর্মের জানালার বাইরে তখন বরফ পড়া বন্ধ হয়ে এক চিলতে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। আর ঘরের ভেতরে দুই বিপরীতমুখী মনের ভেতরের জমাট বরফটা গলে তৈরি হচ্ছে চিরন্তন অনাবিল ভালোবাসা।
চলবে?

