গোধূলির শেষ আলো পর্ব- ০৭ +০৮

0
500

৭+৮
গোধূলির শেষ আলো?
#পর্ব ০৭
writer Tanishq Sheikh Tani

তানির পুষ্পাদের বাড়ি ঢোকার কিছুমাত্র পরেই বাড়িতে লোকারণ্য হয়ে উঠলো। পুষ্পার বাবা কাছের আত্মীয় স্বজন বন্ধু সবাইকেই দাওয়াত দিয়েছেন মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে।অতি অল্প সময়ে যতটা সম্ভব আয়োজন করার পুষ্পার পরিবার করেছে।যদিও ছেলেপক্ষ এতোকিছু করার তাগিদ তাদের আগে থেকেই দেয় নি।খালিদ বলেছে মেয়ের পরিবার কে বিয়ের অনুষ্ঠান করা লাগবে না।তারা শুধু তাদের মেয়েকে আশির্বাদ সহ ছেলের হাতে তুলে দিলেই হবে।পুষ্পাকে তিনদিন পর যখন উঠিয়ে নেয়া হবে তখন সজিবদের বাড়িতেই বউ ভাত করবে আর তার খরচ সম্পূর্ণ সজিব বহন করবে।কথাটা শুনে পুষ্পার বাবা ভাই সহ পরিবারের অন্যান্যরা যথেষ্ট অবাক হয়।কারন এমন ছেলে বা পরিবার তারা কখনোই হয়তো পেতো না যে কি না শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সংকট বোঝে।হ্যাঁ সজিব পুষ্পার বাবার আর্থিক অবস্থা বুঝেই খালিদের সাথে পরামর্শ করে উক্ত প্রস্তাবটা করে।পুষ্পার বাবা এমন ভালো মেয়ে জ্বামাই পেয়ে স্বভাবতই আল্লাহ পাকের কাছে শুকরিয়া জানায়।তার মেয়েকে যে সৎ পাত্রে দান করতে পারলেন তাতেই তিনি খুশি। এই খুশির উচ্ছ্বাসে সামর্থের বাইরে গিয়েও আজ খরচ করেছেন তিনি।৫কেজি গরুর গোশত, ৩কেজি খাসির গোশত,বড় বড় দুটো রুই মাছ,বাড়িতে দেশাল মুরগি ছিল তাই বাজার থেকে কেনা লাগে নাই,শ্রীপুর বাজারের দই,তিন চার পদের মিষ্টি সহ আরো অনেক কিছুই এনেছেন মেহমান আপ্যায়নের জন্য।পুষ্পার মা অবশ্য কিছুটা নিষেধ করেছিল এতো খরচ না করতে তার বদলে জ্বামাইকে গলার চেনের সাথে আরো একটা বড় কিছু দিলে ভালো হতো।পুষ্পার মায়ের ধারনা জ্বামাই খুশি তো মেয়ে খুশি।এজন্য জ্বামাইকে সব কিছু দিয়ে খুশি রাখা উচিত।কিন্তু পুষ্পার বাপের কথা”মাইয়্যে আমার এটটাই।আমার যট্টুকু সামর্থ্য আল্লাহ দিছে আমি আমার মাইয়্যের বিয়েতে করবো।গরিব বলে কি সাধ আহ্লাদ নাই আমাগের পুলকের( পুষ্পার ভাই) মা।টাহা থাকলি সারা গিরাম জানাইয়েই বিয়ে দিতাম।কিন্তু নাই তেমন টাহা পয়সা, তাতে কি যা আছে তা দিয়েই মাইয়্যেরে আমি সসম্মানে পার করবো।খাওনদাওনে কোনো কির্পিনপানা করবো না।জ্বামাইরেও চেইন, হুন্ডা সব দেবো।দরকার হলি মাঠের ৩শতক জমি বেঁচে ফেলবো।”

“- কও কি? জমি জিরেত বেচবা কিত্তি? আছে কি জমিদারি তোমার? জমি মোটে তো ১বিঘের একটু বেশি।ও বেঁচে দিলি খাবান কি আমরা।

“- তুমি এতো চিন্তে করতেছো ক্যা কও দিনি পুষ্পার মা? আমি কি বুড়ো হয়ে গিছি।দরকার হলি আবার মাঠে খাইটে আরো জমি কিনবো।তবুও মাইয়্যে আমি গরিবি হালে বিদেয় করবো না।

পুষ্পার মা স্বামীকে বুঝিয়েও বোঝাতে পারে নি।তার স্বামী বরাবরই একগুয়ে প্রকৃতির লোক।যখন কোনো কিছু তার মাথায় ভর করে তখন সেটা তিনি করেই ছাড়েন।
পুষ্পার বাবা জমানো টাকা সহ ধার দেনা করে মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো কমতি রাখে নাই।নতুন জ্বামাইয়ের জন্য ১ভরির একটা চেন পুষ্পার মা আগেই একটু একটু করে টাকা জমিয়ে বানিয়ে রেখেছেন।তা দিয়েই জ্বামাই বরণ হবে।এটা বাঙালি বিয়ের প্রথা হয়ে দাড়িয়েছে। কিছু না কিছু দিয়ে জ্বামাই বরণ করতে হয় স্বর্ণের চেইন, আংটি মাষ্ট বি থাকবেই।নগদ হাজারখানেক টাকা তো গোনা ধরেও না।স্বর্ণ অবশ্য মুসলিম জ্বামাইরা পড়ে না সচরাচর। ভালো জ্বামাই হলে বাসর রাতে কিংবা পরে বউকেই দিয়ে দেয় আর জ্বামাই একটু পরিবার পালিত হলে অবিবাহিত বোন কিংবা মাকেই দিয়ে দেয়।তাতে নতুন বউয়ের মনে কষ্ট থাকলেও কিছু বলার থাকে না।

তানি পুষ্পার ঘরে খাটের এককোনে বসে গরুর মাংস দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছে। তানি যে খেয়ে আসে নাই সেটা পুষ্পা জেনে ভাবিকে দিয়ে ভাত আনিয়ে বান্ধবীকে খাওয়াচ্ছে।কিন্তু বান্ধবী মুখ ফুলিয়ে রয়েছে পুষ্পার উপর।তানি ভাত খাচ্ছে আর পুষ্পার দিকে করুন নজরে তাকিয়ে আছে।তানির মনে হচ্ছে পুষ্পা যেন সে নজর দেখেও উপেক্ষা করছে।সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত পুষ্পা।
এরমধ্যেই বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেলো বর এসেছে বর এসেছে।
গলার খাবার যেন গলাতেই আটকে গেলো তানির।প্লেট টা হাতে নিয়ে এটো হাতেই খাটে ঠেস দিয়ে মুখ ফুলিয়ে দাড়িয়ে রইলো।চোখে মুখে বিষাদের ছায়া। পুষ্পার ঘরে এখন তানি ছাড়াও অনেক মেয়ে।বাচ্চারা কৌতূহলি চোখে পুষ্পাকে এসে এসে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।নতুন বউদের দেখলে বাচ্চাদের মনে দারুন আনন্দ অনুভূত হয়।ভীর ঠেলে এককোনে দাড়িয়ে থাকা তানির দিকে কেউ এগিয়ে এলো।

“- কি রে তুই আইটে হাত শুকিয়ে এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন? তোর প্লেটে যে মাছি ভনভন করছে খেয়াল কি আছে সেদিক?

তানি পুষ্পার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে কথা বলা মহিলাটির দিকে তাকাতেই ফোঁপাতে লাগলো।জড়িয়েই ধরতে চাইছিল কিন্তু মাঝখানের এটো প্লেটটা তাতে বাদ সাধলো।

“-ফুফু!কান্নার সুরে খাদিজা বেগমের সামনে ফুঁপিয়ে উঠলো তানি

“- এই পাগলী মেয়ে এমন করে কাদতিছিস কেন? বিয়ে তো তোর না পুষ্পার হচ্ছে

“- তুমিও মজা করেতেছো ক্যা?এবার জোরে করেই কেঁদে ওঠে।

“- আচ্ছা চুপ কর এখন। চল আমার সাথে।আয়।তানির হাতটা টেনে বাইরে নিয়ে আসে।
কলপাড়ে নিয়ে এসে তানির হাত মুখ সব ধুয়ে নিজের পরিষ্কার নতুন শাড়ীর আঁচলে মুছে দেয়।তানি তখনও ফুঁপিয়ে যাচ্ছে

“- হ্যা রে তানি! এতো ছেলেমানুষী কেন তোর মধ্যি? বান্ধবীর বিয়ে হলি কেউ কি এমন করে? সবাই তো খুশিই হয়।তাছাড়া পুষ্পাও তো খুশি।চোখের পানি মুছে ওর পাশে গিয়ে বয় গে।ওর মনে ভরসা আসবি তালি।

“-ভরসা না ছাই আসবি।ও কতো খুশি? তুমি কি তা জানো? জানো না?খুশিতে এখনই আমারে ভুলে গেছে। সব দোষ তোমার ছেলের বুঝলে আস্তো বদ একটা।

“- কে বদ! ( মুখটিপে হেসে)

“- তোমার ছাওয়াল। খালিদ নাম্বার ওয়ান বদ,ছ্যাঁচড়া।তুমি দেখো ফুপু তোমার ছোটো ছেলের কপালে কেমন উড়নচণ্ডী বউ জোটে।যে ওর জীবনডা ভাইজে ভাইজে ত্যাজপাতা করে দিবে।

“- হুমম! আমিও তাই ভাবছি।কি কপাল আমার ছাওয়ালডার? ভেবে দ্যাখ খালিদ! এখনও কিন্তু সময় আছে।

ফুপুর কথা শুনে তানি চোখ বড় করে ঢোক গিলে আস্তে করে পেছনে ঘুরতেই ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে।কালো শেরওয়ানি পড়া তালগাছের মতো লম্বা খালিদ ওর সামনেই দাড়িয়ে আছে রাগী চেহারায়।তানির মনে চাচ্ছে নিজের মাথায় নিজেই বারি দিতে।এই খাদিজা ফুপুও ওকে জমের দুয়ারে দাড় করিয়ে দিলো শেষমেশ। কান্না পায় কথাটা ভাবতে ভাবতে তানির।কিন্তু কাঁদে না তানি।

“- মা তোমাকে পুষ্পার মা ডাকছে।তানির দিকে তাকিয়েই বলে খালিদ।

“- আচ্ছা আমি যাচ্ছি। তানি তুই আয়।খাদিজা বেগম মুচকি হেসে সামনে হেঁটে চলে গেলো।
তানি ফুপু ফুপু বলে খাদিজার আঁচল ধরতে যাবে তখনি খালিদ খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলে।

“- কি যেন বলছিলে আমার ব্যাপারে? তানির হাতটা ধরে বলে

“- কককই। কিছুই বলি নি। বিশ্বাস করেন?

“- বিশ্বাস তাই না? এটা কি বলো তো? শান্ত গলায় বললেও খালিদের চোখে মুখে স্পষ্ট রাগের ছাপ।

তানির হিচকি উঠে যায় খালিদের হাতে নিজের মোবাইলটা দেখে।হাত ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করছে।খালিদের মুখের দিকে তাকাতেই ভয় পেয়ে যায় তানি।রেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে আছে।হাসার বৃথা চেষ্টা করে মোবাইলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,

“- এটা আমার মোবাইল। আপনি কোথায় পেলেন?

“- তোমার বিছানার বালিশের নিচে।তুমি তখন কি বলে ছিলে? আগের মতোই রেগে আছে খালিদ

“- ওহ! চার্জ ছিলো না তো তাই কল কেটে গেছে।তানির কথাটা শেষ হবার আগেই খালিদ টেনে তানিকে অন্ধকারে সেই আমগাছটার নিচে নিয়ে আসলো।

“- আমাকে মিথ্যা বলার সাহস কোথায় পাও তুমি? আমি বলেছিলাম না মিথ্যা বলবে না।এখন শাস্তি হবে তোমার কঠিন শাস্তি।

তানি শাস্তির কথা শুনে ঘাবড়ে যায়।ভাবে হয়তো সারারাত এই অন্ধকার আমগাছে বেধে রেখে যাবে।নয়তো ঐ পুকুরে চুবাবে।ঠান্ডায় পুকুরে নামলে সোজা পটল তুলতে হবে তানিকে।পুকুরের দিকে তাকিয়েই করুন চোখে ভাবছিল। হঠাৎই খালিদ এমন একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললো যার আশংকা তানি স্বপ্নেও করে নাই।দুঠোট যখন খালিদের ঠোঁটের দখলে তখনও তানির ঘোর কাটে নি।হার্টবিট দ্রুত চলছে।তানির কেন যেন মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ওর।সমস্ত শরীর নিস্তেজ হতে লাগলো।খালিদের নিঃশ্বাস এতো কাছে থেকে পেয়ে সত্যিই তানি সেন্সলেস হয়ে পড়ে।

যখন জ্ঞান ফেরে তখন নিজেকে নিজের ঘরের বিছানায় আবিষ্কার করে।মাথা ধরে উঠতেই শাড়ির আঁচল টা চোখে পড়ে।নিজের দিকে তাকাতেই অবাক হয়।লাল বেনারসি শাড়ি গহনা গায়ে।তানি চোখ ডলে ঘরটা দেখে নেয়।না! এটা ও ওরই ঘর।জ্ঞান হারানোর আগে তো থ্রি পিছ পড়া ছিল তাহলে এই শাড়ি কোথা থেকে আসলো? জ্ঞান হারানোর কথা মনে পড়তেই খালিদের ঠোঁটের স্পর্শের কথা মনে পড়ে।জিহ্বা পর্যন্ত ছুঁয়েছিল খালিদ।লজ্জায় বিছানা খামচে ধরে।ঠোঁটে আস্তে করে হাত দিয়ে স্পর্শ করতেই কান্না পায়।”এমন টা কেন করলো উনি?মিথ্যা বলার শাস্তি এভাবে কেউ দেয়?”
রাগ লাগে তানির খুব।খালিদের উপর রেগে তানি লাল বেনারসির রহস্য ভুলে গেলো।
হঠাৎ পুষ্পা বধূসেজে তানির ঘরে ঢুকে তানিকে বিছানায় বসতে দেখে আবার দৌড়ে বাইরে চলে যায়।তানি লজ্জায় মাথা নত করে হাটুতে মুখ ঠেকিয়ে বসে আছে।পুষ্পার আসা বা যাওয়া কোনোটাই খেয়াল করলো না তানি।

“- আসুন! আসুন!
পুষ্পা সহ আরো দুতিন জন তানির ঘরে ঢুকতেই পুষ্পা তাড়াতাড়ি তানির শাড়ির আচল দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে দেয়।

ঘরে এতো লোক দেখে ভ্রুকুচকে তাকায় তানি।পুষ্পার হাতে চিমটি দিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে।

“- চিমটি চুমটি কম মারেক।একটু পর সব বরকে মারিস।আমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে কতো দুঃখ না তোর? নে এবার তোরও বিয়ে হবে।
মুচকি হেসে ফিসফিসিয়ে বলে পুষ্পা।

তানি কিছু বলতে যাবে দাত কটমট করে তার আগেই কাজি বিয়ের কাবিন পড়া শুরু করলো।তানি তো হতবিহ্বল হয়ে গেলো।কি হচ্ছে টা কি? যার বিয়ে তার খবর নাই আর কাজি এসে কাবিন পড়াচ্ছে? সামনে দাড়ানো বড় ভাই, কাকা,চাচাতো মামাতো ভাই বোন দের দিকে তাকিয়ে আছে।সবার মুখেই হাসি।কেউ তানির কৌতুহলী চোখের দিকে তাকাচ্ছে না।সবাই অপেক্ষা করছে তানির মুখ থেকে কবুল শোনার জন্য।

“- এই এভাবে হা করে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে আছিস ক্যা? বউ মানুষ নিচে তাকাতি হয়।নিচে তাকা? পুষ্পা জোর করে তানির চোখ নিচে নামাতে বাধ্য করালো।

“- পুষি কি হচ্ছে এসব? আমি তো কিছু বুঝতে পারতিছি না?

“- বিয়ে হচ্ছে তোর।না বোঝার কি হলো? কবুল বলেক তো।

“- পাগল হয়েছিস তুই? আমি কবুল টবুল বলবো না।সর আমি উঠে যাবো।

“- আরে করছিস টা কি? বোন না ভালো চুপচাপ কবুল বল।নয়তো তোর বাপের মান সম্মান থাকবি নে খালিদ ভাইয়ের ও না।

“-আমি ওসব কিছুই শুনতি পারবো না।সর তুই।আমি এ বিয়ে করবো না।আমি মেয়ে বলে কি কোনো মূল্য নাই আমার ফয়েজ ভাই।বলা নেই কওয়া নেই এভাবে বিয়ে দিচ্ছিস? আমার মতামতের কি কোনো প্রয়োজন নাই তোগের কাছে।এতো বোঝা হয়ে গেছি আমি যে এভাবে বিয়ে দিচ্ছিস?করবো না বিয়ে আমি।আজই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।

তানির কথা শুনে কাজী সহ সবাইত তাজ্জব বোনে যায়।সবাইকে ঠেলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসলো নতুন বউ সাজা তানি।তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে বসলো তাকে না জানিয়ে তার পরিবার এমনটা কেন করলো বলতে বলতে। এ বাড়িতে সে এক মিনিট থাকবে না যেখানে একটা মেয়ের কথার দাম নেই।তানির মা বাবা মেয়েকে বুঝিয়েও কুলাতে পারছে না।তানির জেদ সম্পর্কে তাদের ধারণা আগে থেকেই ছিল।কিন্তু এতোটা সাংঘাতিক জেদ হবে এটা ফজিলা বেগম ভাবে নাই।মেয়েকে নিজেদের মান সম্মানের কথা বুঝি সুঝিয়ে বিয়ে দেবে জোর করে এই মতলব এঁটেই এগিয়েছিলেন তিনি।তানি যে এতো আত্মসম্মানী মেয়ে হয়েছে সেরা ফজিলা কল্পনাও করে নি।মেয়েকে বোঝাতে বোঝাতে তিনি ফিট হওয়ার পর্যায় চলে গেছেন কাঁদতে কাঁদতে কিন্তু তানির এক কথা তার পরিবার কি করে এতো বড় ডিশিসন নিলো তার অনুমতি ছাড়া? এতোটাই কি সে বোঝা তাদের কাছে যে বিদায় করতে পারলেই বাঁচে? তবে আজই বিদায় হবে সে এ বাড়ি থেকে দুচোখ যেদিক যায় চলে যাবে।তবুও বিয়ে সে করবে না।ফজিলা বেগম রাগে হুশ হারিয়ে মেয়ের গালে এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড় মেরেছেন এইটুকু মেয়ে এতো বড় কথা কেন বলছে তাদের।তারা বাবা মা তারা যা করবে সন্তানের মঙ্গলের জন্যই তো করবে।তানি মায়ের হাতে মার খেয়ে বাড়ি থেকে সত্যি সত্যি রাত বিরাতে বেরিয়ে পড়ে।বাড়ির থেকে কিছুদূর যেতেই কেউ টেনে ধরে তানিকে।

“- কোথায় যাচ্ছ তুমি আমাকে ফেলে?

তানি পেছনে তাকাতেই দেখে খালিদ ওর হাত ধরে মলিন মুখে দাড়িয়ে আছে।

“- যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকে।ছাড়েন আপনি আমাকে।কাঁদতে কাদতে জবাব দেয় তানি

“- কেন যেতে যাও তানি তুমি?

“- কিসের আশায় থাকবো বলেন? আমার পরিবার তো গোয়ালের গরু মনে করে আমারে।মানুষ হিসেবে আমার কি দাম তাদের কাছে? এমন জীবন আমার চাই না আমি মরে যাবো তবুও ও বাড়ি আর না।

“- তোমার যেমন জীবন চাই তেমন জীবনই আমি তোমাকে দেবো তানি।সম্মান, গুরুত্ব,কথা বলার অধিকার সব পাবে আমার কাছে।

“- আপনি এসব কি বলছেন? আপনি কেন দিতে যাবেন ওসব আমাকে?

“- কারন আমি যে তোমাকে ভালোবাসি তানি।বড্ড বেশি ভালোবাসি।তুমি চলো আমার সাথে।আমার তানিকে কোনোদিন আমি অসম্মানিত হতে দেবো না। কোনোদিন না।আমার যেটুকু আছে সবটুকু উজার করে সমম্মানে বউ করে রাখবো তোমায়।নিজের বুকে উপর টেনে দুবাহুডোরে জরিয়ে নেয় তানিকে খালিদ।

তানি থমকে গেলো।খালিদের বুকের উপর মাথা রেখে চুপটি করে দাড়িয়ে রইলো নিষ্পলক চোখে। খালিদ যে কাঁদছে তানি বুঝতে পারছে।এতো রাগ, এতো একগুয়েমি সব নিমেষেই ভুলে শান্ত চুপচাপ হয়ে গেলো তানি।এই মুহুর্তে খালিদের বুকটাকেই নিরাপদ ও স্থায়ী সম্মানের স্থান লাগছে তানির কাছে।অনেকটা সাহস নিয়ে নিজের দু’হাতে খালিদকে জড়িয়ে ধরে লজ্জায় চোখ বন্ধ করলো মৃদু হেসে।

চলবে,,,গোধূলির শেষ আলো?
#পর্ব ০৮
Writer Tanishq Sheikh Tani

চারিদিকে নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে তাছাড়াও সামান্য কিছু আত্মীয় স্বজনের শোরগোল এখনও বিদ্যমান বাড়িতে।তানি জড়োসড়ো হয়ে বিছানায় ঘোমটা দিয়ে বসে আছে।কি থেকে কি হয়ে গেলো জীবনে।জীবনের গতিপ্রকৃতি সত্যি বিচিত্র।কোন পথ হঠাৎ কোথায় বাক নেয় কেও টের পাই না।তানি গতকাল মা বাবার কথায় নিজের জীবনের গতিপথ পরিবর্তনের কিছুটা আভাস পেলেও সেটাকে ততটা আমলে নেয় নি কিন্তু সকাল শেষে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো সত্যি তানির জীবন হঠাৎ বিস্তর পরিবর্তিত হয়ে গেলো।অবিবাহিত কিশোরী থেকে এখন সে বিবাহিত নারী।খালিদের কথায় তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঠিক এসে বিয়ের আসরে বসে দ্বিধান্বিত মনেই কবুল বলে তানি।খালিদ কে মনে মনে উল্টো পাল্টা যত কিছুই বলুক না কেন আদৌতে সম্মানের স্থানে সবসময়ই রয়েছে খালিদ। খালিদের মুখে এমন প্রেমনিবেদন তানি কখনোই আশা করে নি।বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে ছিল অনেকক্ষণ খালিদের বুকে তানি।লজ্জায় মুখ তুলে একটিবার তাকিয়েও দেখে নি খালিদ কে তানি।খালিদ এখন সম্মানীয় স্যার থেকে স্বামীতে পদন্নতি পেয়েছে সেকথা ভাবতেই কেমন যেন অনুভূতি হতে লাগলো তানির।তানির ভাবনা ভঙ্গ করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো তানির মা, শ্বাশুড়ি, কাকি চাচাতো ভাবী বোনরা।
মাকে আসতে দেখে মুখটা বেজার হয়ে গেলো তানির।মুখটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে ফিরে তাকালো।মেয়ের রুষ্টতা দেখে ফজিলা বেগম কষ্ট পেলো।শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে কান্না নিবারন করার বৃথা চেষ্টা করেন।মেয়েকে যত উৎসাহে বিয়ে দিয়েছিলেন এখন তারচেয়ে দ্বিগুণ বেগে কান্না জুড়ে দিলেন নববিবাতিত মেয়েকে বধূসাজে দেখে।মায়ের কান্না দেখে খারাপ লাগলেও নির্বিকার বসে আছে তানি।

“- কি রে মা? ওমন গোস্সা করে বসে আছিস কেন?
তানির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন খাদিজা বেগম।

“- কিছু না ফুপু।

“- দ্যাখ তোর মা ডা কেমন কানতেছে? একটু কাছে যা।

“- কি দরকার? সে তো ইচ্ছে করেই দূরে সরাই দিছে আমারে।এহন এতো নাকে কান্না ক্যা তার।তারে থামতে বলো। আমার মাথায় ব্যথা উঠতেছে তার কান্নার আওয়াজে।

“- ছি! মা।এমনে কি কেউ কয় মারে? মা কি খারাপ চাই তোর ক?

“- জানি না আমি।তারে এখান থেকে যাতি কও।না হলি আমিই উঠে যাচ্ছি।

মেয়ের মুখের কথা শুনে ফজিলা বেগম উউউ করে কাদতে কাঁদতে এ ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আঁচলে মুখ ঢেকে।

“- এমন করলি ক্যা রে? কষ্ট পালো না তোর মা ডা।

“- আমি তো কাওরে কষ্ট দিতে চাইনেই ফুপু। তবুও কেউ সেধে সেধে কষ্ট পালি আমার কি দোষ? ফুপু তোমাগের বাড়ি কবে যাবো আমি? আমার এহানে এক মিনিট ভালো লাগে না আর।

“- রাগ করিস নে মা।একটু বড় হ তালি পরে বুঝবি মা হওয়ার কি কষ্ট? নিজের বুকের ধন রে কেউ কি খুশিতে পরের হাতে দেয় রে মা? যেদিন মেয়ের মা হবি সেদিন বুঝবি।
এহন কয়ডা খেয়ে নে।দুইদিন পর নতুন বাড়ির কাজ হয়ে গেলিই একবারে ঐবাড়িই নিয়ে যাবো তোরে।

তানিকে কয়েকবার খাবার সাধলেও সে খায় নি।পোলাও, গরুর মাংস,রুইমাছ,ডিম, দই সাজানো প্লেটটা ফিরিয়ে দিয়েছে।তানির এমন ব্যবহারে ফজিলা বেগম ও তার স্বামীর বুকটা কষ্টে খা খা করে।মেয়েকে কি তাহলে বড় রকমের দুঃখ দিয়ে ফেললেন তারা? মেয়ে কি আর কথা বলবে না আগের মতো? খাদিজা বেগম ধর্মের পাতানো ভাই তমিজ ও তার স্ত্রীকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হোন।খালিদ শ্বশুর শ্বাশুড়ির অনুমতি নিয়ে মাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাই।যদিও খাদিজা বেগম ছেলের এমন কাজে বাধা দেন তবুও খালিদ মাকে একা ছাড়ে না।খালিদ মাকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর উপস্থিত প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজন মহিলা মন্ডলি এ নিয়ে নানা কথা বলে।বিয়ে করা বউকে রেখে মায়ের আঁচল ধরে যাওয়াটা মোটেও তাদের পছন্দ হয় নি।কয়েকজন তো এ নিয়ে তানির কাছে এনিয়েবিনিয়ে বলে।তানির সেকথা অসহ্য লাগে।রেগে চুপ করে থাকে।

রাত ১০ টার দিকে খালিদ শ্বশুরবাড়ি ফেরে।মাকে ওষুধ খাইয়ে গোছগাছ করিয়ে তারপর এসেছে তাতে একটু সময় লেগে গেছে আরকি।খাওয়াদাওয়া আগেই করেছিল তাই শ্বশুর শ্বাশুড়ি ও শ্যালকের সাথে অল্পবিস্তর প্রয়োজনীয় কথা বলেই তানির ঘরে ঢোকে খালিদ।তানির ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে বিছানার দিকে তাকাতেই দেখে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে তানি।
খালিদ গায়ের শেরওয়ানি টা খুলে পাশে রাখা আলনায় রেখে খাটে গিয়ে বসলো।

“- তুমি নাকি রাতে খাও নি?

“- নিশ্চুপ

“- আমি জানি তুমি জেগে আছো।মিথ্যা মিথ্যি ঘুমের অভিনয় করো না।

খালিদের কথা শুনে চোখ মেলে একদৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকে।

“- কথা বলবেনা আমার সাথে? কোনো অপরাধ করে ফেলেছি নাকি আমি?

“- হ্যাঁ করেছেন।আপনি আমার আব্বা আর মায়ের সাথে যুক্তি করে আমাকে মিথ্যা ভালোবাসার কথায় ভুলিয়ে কবুল বলিয়েছেন।ঠিক বলেছি নে বলেন?

“- হুমম।অনেক বড় ঠিক বলেছো তুমি।তোমার ঠিক মার্কা কথা শুনে থাপ্পড় দিয়ে তোমার দাঁত ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে আমার।বোকা মানুষকে নিয়ে চলা যায় কিন্তু বেশি বোঝা মানুষকে নিয়ে চলা খুব মুসকিল।

“- তো চলছেন কেন? কে বলেছে? ছেড়ে দ্যান।

খালিদ রাগে লাল হয়ে তানির মুখের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে চুপচাপ অন্যদিক ফিরে শুয়ে রইলো।খালিদের রাগে মাথা ফেটে যাবে মনে হচ্ছে।” এই মেয়েকে লজ্জা শরম ভুলে ভালোবাসি বললাম আর কি দারুন প্রতিদান দিল? ভালোবাসার আর মানুষ পেলি না খালিদ।”

খালিদের চুপচাপ থাকা দেখে তানির দমে থাকা রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।মায়ের উপরের সব রাগ খালিদের উপর ঝাড়ার প্রস্তুতি নিল।মাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার একটা উপায় বের করে ফেলে তানির অপরিপক্ব অল্পশিক্ষিত ব্রেন।কিছুসময় আগেও যাকে নিরাপদ আশ্রয় ভেবেছিল এখন সেই নিরাপদ আশ্রয়কে হাতের মুঠোয় পেয়ে অবহেলা আর কটুভাষায় জর্জরিত করে তুলছে।

“- চুপ থাকা সম্মতির লক্ষণ জানেন তো? আপনি চুপ করে আছেন তার মানে আমার কথায় ঠিক।আপনি আমারে ভালোবাসেন নি।সব নাটক করেছেন।মিথ্যে বলে বিয়ে করেছেন আমারে।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলো তানি।

খালিদ একটু নড়লো না তানির কথা শুনে।দাত কামড়ে শুয়ে আছে আগের মতোই।
খালিদের চুপচাপ শুয়ে থাকা দেখে তানি আরো কড়াস্বরে বলতে লাগলো,

“- এতো নোংরা লোক আপনি। এই ছিল আপনার পেটে পেটে? ছি!

তানির ধিক্কার শুনে আর চুপ থাকতে পারলো না খালিদ।দাড়াম করে উঠে বসে তানির মাথার পেছনে হাত দিয়ে চেপে ধরে একদম নিজের মুখের কাছে তানির মুখটা নিয়ে আসলো।

“- আজ বলেছিস মাফ করে দিলাম।এরপর আমাকে যদি এসব উল্টো পাল্টা কথা ফের বলবি তো আমি ভুলে যাবো তুই কি আমার? তোকে কি বলে বিয়ে করেছি? সম্মানের সাথে তোকে রাখবো তাই না?

“- হ্যাঁ দিচ্ছেন তো সম্মান। এই তো আপনাদের সম্মানের ধরণ।তানি চোখ বন্ধ করে ভয়ে ভয়ে বলে ফেললো।

তানির কথায় তৎক্ষণাৎ লজ্জিত হয় খালিদ।রাগ এক নিমেষেই উবে যায়।এতো তাড়াতাড়ি রাগাটা সত্যি ঠিক হয় নি।

“- তুমি কেন এমন করছো আমার সাথে কেন? কি করেছি আমি?কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছো তানি। তোমাকে ভালোবাসি বলেছি তাই? তাহলে তখনই ফিরিয়ে দিতে আমায়।বুকে নিয়ে সেই বুকে ছুরি কেন চালাচ্ছ তুমি? আচ্ছা কি করলে বিশ্বাস করবে তোমাকে আমি ভালোবাসি বলো?

“- এক্ষুণি এ বাড়ি থেকে চলে গেলে বিশ্বাস করবো।পারবেন যেতে?

খালিদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না।তাই তো অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তানির মুখোমুখি বসে।সেই দৃষ্টিতে জল নামিয়ে আনার মতো আবার বজ্র কন্ঠে বললো তানি,

“- কই গেলেন না।প্রমাণ করেন আপনি আমাকে ভালোবাসেন।চলে যান এক্ষুণি

“- তুমি মজা করছো তাই না?

“- একদমই না।আমি আপনার ভালোবাসার সত্যতা দেখতেছি।

“- খুব খারাপ হচ্ছে কিন্তু তানি।এমন পরীক্ষা নিও না দোহায় লাগে।ভেঙেচুরে ফেলো না আমায়।এই অন্ধকার রাতে কোথায় যাবো আমি। কেউ দেখলে কি বলবে?

“- শুরু হয়ে গেল অজুহাত আপনের? ভালোবাসেন? এই বুঝি তার নমুনা।এতোটুকু কষ্ট সয়তে পারছেন না?

“- এই যে দূরে ঠেলে দিলে এর কারনে পস্তাতে হবে তোমায়।আমাকে যতো খুশি দাও কষ্ট। আমি সব নিরবে সয়ে যাবো।অভিনয় করেছি তাই না আমি? ঠিক আছে তাহলে তাই। এটাই ভেবে থেকো তুমি।এতো নিষ্ঠুর কেন হলে তুমি?আমার মন ভেঙে কি সুখ পেলে তানি?

তানি খালিদের কথার গুরুত্ব না দিয়ে চুপচাপ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে রইলো। খালিদের সাথে সে কেন এমন করলো সে নিজেও জানে না?মায়ের উপর রাগটা সে সম্পূর্ণ খালিদের উপর প্রয়োগ করলো।আচ্ছা খালিদ কি সত্যি ওর কথা রাখতে চলে যাবে?তানির বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়।
খালিদ যদি রেগে বউ হিসেবে আর না মানে? না মানলেই ভালো হবে।ফজিলা বেগমের শিক্ষা হবে। মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার মজা বুঝবে।

খালিদ ভেবেছিল করুন কথায় মন গলবে তানির কিন্তু না একটুও মন গললো না।এই একরোখা উঠতি বয়সি যুবতি বউকে সে কি করে নিজের ব্যথা বোঝাবে ভেবে পায় না।বাসর রাতে যে স্ত্রী তার স্বামীকে বাইরে চলে যেতে বলে তার কাছে ভিন্ন কিছু আশা রাখার সাহস পায় না খালিদ।এই বিশেষ রাতের জন্য কতো প্রতিক্ষা ছিল খালিদের অথচ আজ সব প্রতিক্ষা শেষ হয়েও হলো না শেষ।
একবুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিল খালিদ।।তানির মন পরিবর্তন হতে দেখে বড় কষ্ট পেলো খালিদ

সকালে ঘুমের আড়মোড় ভেঙে ঘুরতেই তানি দেখলো পাশের বিছানা শূন্য। খালিদের কাপড়ও আলনায় নেই।তার মানে খালিদ চলে গিয়েছে।রাতের কথা মনে পড়তেই খারাপ লাগলো কিন্তু মাকে শিক্ষা দেওয়ার মোক্ষম উপায় খালিদকে আঘাত দেওয়া।মায়ের আদরের জ্বামাইকে জ্বালিয়ে পুরিয়ে শেষ করে দেওয়া পণ করে তানি।মাকে তানি কোনোমতেই জিততে দেবে না।নিজের জেদের কাছে সম্মানের মানুষটার সম্মানের কথা বেমালুম ভুলে গেলো তানি।

শাড়ির আঁচল ঠিক করে বিছানা ছেড়ে উঠে চুল টুল আচরে বাইরে বের হয়।ব্রাশ করে রান্নাঘরে নিজে হাতেই খাবার বেড়ে খেতে বসে।এক লোকমা মুখে দিতেই মা এসে হাত ধরে ফেলে তানির।

“- এই তুই গোসল করে খাতি বয় যা।

“- গোসল করার মতো কিছুই হয় নি। সরো খাতি দাও তো
মেয়ের এমন ঠোঁটকাটা কথা শুনে লজ্জা পায় ফজিলা বেগম।সাথে রাগও ওঠে।

“- কি বলছিস তুই এসব?মুখে লাগাম দিতে পারিস না। তুই কি খালিদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিস রাতে?

“- হ্যাঁ করেছি।আরো করবো।সে যতদিন আমাকে তালাক না দেবে ততদিন এমন করবো।

ফজিলা বেগম ঠাস করে মেয়ের গালে দুটো চড় বসিয়ে দেয়।
“- এইজন্য খালিদ এতো সকালে উঠে বাড়ি চলে গেছে তাই নে?এমন অলক্ষুণে কাজ কি জন্যি করতেছিস তুই?

“-হ্যাঁ গেছে।আর যাতে না আসে তারে বলে দিও।তুমি যেমন নাটক করে বিয়ে দিয়েছো আমিও তেমন নাটক করে ছেড়ে দেবো তারে।সোজা কথায় সে আমারে না ছাড়লি কি করে ছাড়াতে হয় সে তোমার মেয়ে ভালোই জানে।বলেছিলাম বিয়ে দিও না দিলে তো? এবার পস্তাবে হাড়ে মাংসে মনে রেখো।
খাবারের থালটা সরিয়ে উঠে ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে তানি।

ফজিলা বেগমের মাথায় মনে হয় বাজ পড়েছে মেয়ের কথা শুনে।মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে মেয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তাজ ঘুমিয়ে নিজের আর তানির বিয়ের স্বপ্ন দেখছিল।হঠাৎ বাইরে কারো গলার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো।পাড়ার মহিলা গুলোর গলায় এতো তেজ কেন তাজ বুঝে উঠতে পারে না।মেজাজ বিগড়ে যায় যায় সকাল সকাল সুন্দর ঘুমটা ভাঙিয়ে দেবার জন্য। দরজার দিকে যেতে যেতে মহিলার কথা গুলো শুনে পা থামিয়ে দাড়িয়ে রয়।মাথা ভনভন করে ঘুরছে তাজের।চোখের কোনে পানি চিকচিক করছে।স্বপ্নভঙ্গের জোয়ারের পানি উপছে পড়ছে চোখের কিনারে।মহাপ্রলয়ের ধ্বংসের ঢেউ রূপে একটু একটু তৈরি হচ্ছে সে নেত্রধারা।

চলবে,,,,