দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-০৩

0
211

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ৩
#লেখিকাঃদিশা_মনি

মুসকান সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। শোফায় শুয়ে থাকা আরিফের দিকে তাকাতেই গতরাতের কথা মনে পড়ে যায় মুসকানের। লজ্জায় মুসকানের মুখই লাল হয়ে যায়। মুসকান মনে মনে বলে,
“যদি উনি গতরাতের কথা সবাইকে বলে দেন তাহলে তো লজ্জায় কাউকে মুখই দেখাতে পারব না।”

মুসকান নিজের ভাবনাতে মশগুল ছিল এমন সময় খেয়াল করে রুহি ঘুম থেকে জেগে উঠে কান্না শুরু করে দিয়েছে। আলগোছে রুহিকে কোলে তুলে নেয় মুসকান। একদম মায়ের মতোই আদর করতে থাকে মেয়েটিকে। আশ্চর্যজনক ভাবে মুসকানের কোলে উঠতেই রুহির কান্না একদম থেমে যায়। রুহির কান্নার স্বরে আরিফেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠে মুসকানের কোলে রুহিকে শান্ত হয়ে থাকতে দেখে আরিফও নিশ্চিত হয়। মুসকান রুহিকে আলতো করে আদর করতে থাকে। হঠাৎ করে তার সাথে আরিফের চোখাচোখি হয়ে যায়। সাথে সাথেই একরাশ লজ্জা গ্রাস করে মুসকানকে। দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নেয় সে।

★★★
আতিকা চৌধুরী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আজ মুসকানের বৌভাতের আয়োজন করবেন। সেইজন্য সব ব্যবস্থাও করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। আশেপাশের কিছু পাড়া প্রতিবেশী এবং নিকটাত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করাও শেষ।

আতিকা চৌধুরী ড্রয়িংরুমের শোফায় বসে ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসকান রুহিকে কোলে করে নিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হয়। মুসকানকে দেখামাত্র তিনি বলেন,
“মুসকান আমার পাশে এসো। তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা রয়েছে।”

মুসকান একদম বাধ্য মেয়ের মতো আতিকা চৌধুরীর পাশে এসে বসে। আতিকা চৌধুরী বলেন,
“আজ তোমার বৌভাতের আয়োজন করেছি। আমি জানি তুমি রান্নাবান্নায় পটু নও। সেসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমাদের বাড়িতে যেই রান্নার লোক আছে সে-ই সব করবে। তুমি শুধু পায়েসটুকু করো। পারবে তো?”

মুসকান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে ওঠে,
“কেন পারব না ম্যাডাম? অবশ্যই পারব।”

মুসকানের কথা শুনে আতিকা চৌধুরী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। এরইমধ্যে হঠাৎ ড্রয়িংরুমে দুজন অচেনা মানুষের প্রবেশ ঘটে৷ মুসকান তাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়। একজন মধ্যবয়সী নারী ও একজন তরুণী। তরুণীর বয়স মুসকানের মতোই হবে। আতিকা চৌধুরী তাদের দেখামাত্রই দাঁড়িয়ে পড়েন। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন,
“আতিফা তুই এসেছিস বোন!”

মধ্যবয়সী মহিলা এগিয়ে এসে আতিকা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলেন,
“হ্যাঁ আপা। তুই ডেকেছিস আর আমি আসবো না সেটা কখনো হতে পারে।”

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী তরুণী এগিয়ে এসে আতিকা চৌধুরীকে বলে,
“কেমন আছ তুমি খালামনি?”

আতিকা চৌধুরী নিজের বোন আতিফাকে ছেড়ে দিয়ে ভাগ্নি নকশির দিকে তাকান। মৃদু হেসে বলেন,
“ভালো আছি রে মা। তুই কেমন আছিস?”

“আছি কোনরকম। তুমি তো আমাদের ভুলেই গেছ। আরিফ ভাইয়ার বিয়ে দিয়ে দিলে আর আমাদের দাওয়াত দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করলে না! এতটা পর করে দিলে আমাদের?”

নকশির কথায় অভিমানের সুর স্পষ্ট। আতিকা চৌধুরী নকশির ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে বলেন,
“তুই ভুল ভাবছিস মা। আসলে এমনভাবে সবকিছু হয়ে গেল যে…”

মুসকান তখনো বিস্ময়ের সাথে সবার দিকে তাকিয়ে ছিল। আতিকা চৌধুরী সেদিকে খেয়াল করে মুসকানকে ইশারা করে কাছে ডাকেন। মুসকান কাছে আসতেই সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন,
“ও হলো মুসকান। আরিফের স্ত্রী এবং আমার পুত্রবধূ। আর মুসকান ওরা হলো আমার বোন আতিফা আর ওর মেয়ে নকশি।”

মুসকান ভদ্রতার সহিত সালাম বিনিময় করে আতিফা বেগমের সাথে। আতিফা বেগম মুসকানের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে বলেন,
“মাশাল্লাহ, তুমি তো অনেক ভালো ছেলের বউ পেয়েছ আপা।”

নকশি মুসকানের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“হ্যালো, আমি হলাম তোমার রায়বাঘিনী ননদিনী। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগল।”

মুসকান নকশির দিকে ভালো ভাবে তাকালো। কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরিহিতা সুন্দরী এই মেয়েটির ব্যবহারও বেশ মিষ্টি ঠেকল তার কাছে। মুসকান তার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বললো,
“আমারও ভালো লাগল।”

★★★
রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে মুসকান। রান্নাবান্নায় তার দক্ষতা একেবারে শূন্যই বলা যায়। অনেক বড় মুখ করে তো আতিকা চৌধুরীকে সে বলে দিয়েছে পায়েস বানাবে। কিন্তু কিভাবে বানাবে সেটাই তো বুঝতে পারছে না।

রান্নাঘরে ঢুকেই তাই মুসকানের মাথায় হাত চলে গেল। এমন সময় হঠাৎ নকশি রান্নাঘরে চলে এলো। মুসকানকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
“কি হয়েছে ভাবি? তুমি এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছ কেন?”

মুসকানের বেশ লজ্জা করছিল রান্না করতে পারে না কথাটা বলতে। তাই সে মৌনতা বজায় রাখল। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিল নকশি। মুসকানকে আশ্বস্ত করে বলল,
“তুমি চিন্তা করো না ভাবি। আমি তোমায় হেল্প করব পায়েস তৈরি করতে।”

মুসকান যেন এতক্ষণে ধরে প্রাণ ফিরে পেল। কৃতজ্ঞতার সহিত তাকালো নকশির পানে। নকশির সহায়তায় পায়েস তৈরি করে নিল মুসকান। পায়েস তৈরি হওয়ার পর নকশি বলল,
“তাহলে আমি এখন চলি তুমি পায়েসটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে চলে এসো।”

কথাটা বলেই নকশি রান্নাঘর থেকে প্রস্থান করে। মুসকান পায়েস নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবে এমন সময় হঠাৎ আরিফ চলে আসে। সে এসেই বলে,
“রুহি হঠাৎ করে খুব কাঁদছে। ওকে আমি সামলাতে পারছি না। সকালে তো দেখলাম আপনার কোলে যেতেই ওর কান্না থেমে গেল। তাই আপনি একটু গিয়ে দেখুন তো ওকে সামলাতে পারেন কিনা।”

আরিফের কথা শুনে মুসকান পায়েস রেখেই রুমের দিকে ছুটল।

★★★
রুহিকে সামলে ডাইনিং টেবিলে সবাইকে পায়েস পরিবেশন করে মুসকান। আয়েস করে পোলাও কোরমা খাবার পর শেষ পাতে পোলাও পেয়ে সবাই খুশি হয়। কিন্তু পায়েস মুখ দিতেই সবার খুশি মিলিয়ে যায়।

আরিফ খাবার থালাতেই মুখ থেকে পায়েস উগলে দিয়ে বলে,
“ছি! এটা কি রান্না করেছেন। এতো নুনে ভর্তি।”

মুসকান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“এসব কি বলছেন আপনি? পায়েস নোনতা লাগছে মানে?”

আরিফ রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এক চামচ পায়েস নিয়ে জোরপূর্বক মুসকানের মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে,
“নিজে খেয়ে দেখুন কি রান্না করেছেন।”

পায়েস মুখে দিতেই মুসকানের বমি পেয়ে যায়। কি নোনতা আর বিশ্রী খেতে। মুসকান মুখ থেকে পায়েস ফেলে দিয়ে বলে,
“এটা এমন কিভাবে হলো? রান্না শেষ হবার পর তো আমি আর নকশি আপু টেস্ট করেছিলাম ঠিকই তো ছিল।”

“তাহলে এখন এমন লাগছে কেন?”

মুসকান নকশির দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি বলো তখন সুন্দর ছিল না?”

” হ্যাঁ, তখন তো ঠিকই ছিল। আমিও ভীষণ অবাক হয়েছি এই পায়েসটা খাবার পর।”

মুসকান আরিফের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ বিচক্ষণের মতো ভাবতে লাগল কিছু।

আতিকা চৌধুরী বললেন,
“যা হবার হয়ে গেছে। এখন আর কি করার‍! আতিফা চল আমরা গিয়ে পায়েস বানিয়ে আনি।”

আতিকা চৌধুরী ও আতিফা বেগম উঠে চলে যেতেই মুসকান আরিফকে শুধায়,
“আপনিই পায়েসে নুন মিশিয়েছেন তাই না?”

“মানে? এসব কি বলছ তুমি? আমি কেন তোমার রান্না করা পায়েসে নুন মেশাতে যাব।”

“সেটাই তো আমি জানতে চাচ্ছি। আমার সাথে কিসের শত্রুতা আপনার? এভাবে সবার সামনে আমায় অপদস্থ করলেন কেন?”

“আমি কিছু করিনি বুঝলেন আপনি?”

“চুপ, একদম চুপ। আমি জানি আপনিই আমার রান্না নষ্ট করেছেন মিস্টার আরিফ চৌধুরী আর এর শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে। আমি দেব আপনাকে এর শাস্তি।”

কথাটা বলেই এক জগ পানি এনে আরিফের মাথায় ঢেলে দেয় মুসকান। আরিফ রাগী দৃষ্টিতে তাকায় মুসকানের পানে।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨