নিশুতি রাতের কান্না ৩য় পর্ব এবং ৪র্থ পর্ব

0
840

#নিশুতি_রাতের_কান্না
#৩য়_পর্ব_৪র্থ_পর্ব
#অনন্য_শফিক




নেহাল প্রথম দুবার ডাকার সময় সাড়া দিলো না। কিন্তু তৃতীয় বার ডাকার সময় শু’য়া থেকেই এক হাত দিয়ে আমার চুল এতো শক্ত করে টেনে ধরলো যে গোঁড়া থেকে একেবারে চুলগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছিল মনে হলো। আমি ওর দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে কান্নামাখা গলায় বললাম,’শুনুন না! আপনাকে তো আমি নামাজের জন্য ডাকছিলাম।’
নেহাল এবার তার দাঁত মুখ খিঁচে বললো,’তোর নমাজের গোষ্ঠী কিলায়! এই তোকে অত বড় সাহস কে দিয়েছে আমার ঘুম ভাঙাবার?’
আমি বললাম,’স্ত্রীর দায়িত্ব তার স্বামীকে ডেকে নামাজের কথা বলা।’
কথাটা শুনে নেহাল আরো শক্ত করে টেনে ধরলো আমার চুল। তারপর বললো,’এভাবে তোকে ধরে রাখবো সারাদিন।দেখবো তোর নমাজ কে করে!’
আমি রাগে ঘৃণায় বললাম,’আপনি এতো নোংরা আমি কল্পনাও করতে পারছি না।আপনি শুধু আপনার স্ত্রীর কাছে খারাপ নন, আপনার আল্লার কাছেও খারাপ!’
নেহাল আমার কথায় পাত্তা দিলো না।সে যেভাবে ধরে রেখেছিল সেভাবেই ধরে রাখলো। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো যে খানিক পরেই সে ঘুমে ঢলে পড়লো আর ফজরের ওয়াক্ত তখনও শেষ হয়ে যায়নি।ওর কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে আমি তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নামাজে দাঁড়ালাম। নামাজ শেষ করে দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে আমার সব অভিযোগ পেশ করে বললাম,’মাবুদ গো,ও মাবুদ, তুমি যদি ওমরের মতো কাফেরকে তোমার রহমতের নূর দ্বারা তোমার প্রিয় করে নিতে পারো তবে তুমি তো নেহালকেও পারো উত্তম চরিত্রবান আর মোমেন করে গড়ে তুলতে। আমি ওর থেকে পাওয়া আঘাত গুলোর জন্য দুঃখ করি না। আমার দুঃখ এখানে সে কেন তোমার হুকুম নিয়ে গাফেলতি করবে।’

দোয়া শেষ করে আমার মাথায় শীতল একটা হাতের স্পর্শে আমি চমকে উঠলাম। ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখি আমার শাশুড়ি মা। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে তার দু হাত দিয়ে আমার চোখ মুছে দিয়ে বড় মায়া মাখা গলায় বললেন,’মাগো,নিয়তি।নিয়তি হলো সবচেয়ে বড় বিষয়। এই যে আমার বাপ মায়ের সবচেয়ে আদরের বস্তু ছিলাম আমি। কিন্তু এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে ধুঁকে ধুঁকে মরছি। বাইরে থেকে এই বাড়ির পুরুষ মানুষ গুলোকে মানুষেরা মনে করে এরা বুঝি অনেক ভালো,সৎ। কিন্তু বাস্তবতা তো তুমি দেখলেই। আমিও সেই শুরু থেকেই দেখে আসছি। তোমার শশুরের অত‍্যাচার সয়ে সয়ে অতিষ্ঠ হয়েছি।তার হঠাৎ মৃত্যুর পর ভেবেছিলাম এই বুঝি আমার মুক্তি মিলেছে। কিন্তু ভাগ্য এমন,ছেলেরা হয়েছে তার বাবার মতো। এদের অন‍্যায় আচরণ,চরিত্রহীনতা আমায় কষ্ট দেয়। আমি বাঁধা দিতে গেলে ওরা আমায় মানে না।বলে, আমাদের বংশে নারীদের কথা পুরুষেরা শোনে না। আমি যে মা, আমার কথাও শোনা যাবে না! তুমি বুঝতে পারছো তো আমার কষ্ট টা। তবুও আশায় বুক বেঁধে বেঁচে আছি। মনে মনে ভাবি, একদিন সুদিন আসবে। আমার ছেলেরা মানুষের মতো মানুষ হবে। কোন এক দৈব চয়নে তারা ধর্ম এবং সভ‍্যতার পথে ফিরে আসবে।’
আমার শাশুড়ির কথাগুলো শুনে আমার চোখ আবার জলে ভিজে উঠলো। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,’আম্মা, আমার ধৈর্য্য আপনি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমিও অপেক্ষা করবো এমন সুদিনের জন্য। আমার সবটুকু শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যাবো আপনার ছেলেকে মনুষ‍্যত্বের পথে ফিরিয়ে আনতে!’

খানিক আগেও মনে হয়েছিল নেহালের সাথে ঘর সংসার করা আমার সম্ভব না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আজ যদি আমি ওকে ছেড়ে চলে যাই তবে কেউ না কেউ তো তার ঘরে বউ হয়ে আসবে। সংসার করবে।কষ্ট পাবে।অন‍্য একটি মেয়েকে কষ্ট পেতে দিবো না। সংসার জীবনের তিক্ত স্বাদ ওকে পেতে দিবো না। আমি কষ্ট পেয়ে হলেও ওকে আলোর পথ দেখাবো।দেখিয়েই ছাড়বো।

আমি শাশুড়ি মার কাছে জেনে নিলাম নেহালের প্রিয় আর ভালো লাগার জিনিস গুলোর বিষয়ে।
শাশুড়ি মা বললেন,’ও বিকেল বেলা গান শুনতে পছন্দ করে।খালি গলায় রবীন্দ্রনাথের গান।আর পছন্দ করে বৃষ্টি।আর ঘুম ভাঙার পর এক গ্লাস ঠান্ডা পানি।’
‘আরো কিছু?’
‘না।আগে এইগুলো করে দেখো কী হয়!’
‘আচ্ছা।’
আমি মনে মনে ঠিক করে নিলাম আজ থেকে আমার যত কষ্টই হোক না কেনো নেহালকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনার ভ্রত নিবো আমি।

নেহাল সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারে না। কারণ সে ঘুমোতেই যায় শেষ রাতে।সে ঘুম থেকে উঠে দুপুর বেলা।আজ যখন সে দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠলো তখন আমি —-

#চলবে

#নিশুতি_রাতের_কান্না
#৪র্থ_পর্ব
#অনন্য_শফিক




আজ যখন নেহাল দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠলো তখন আমি ও কিছু না বলতেই ওর কাছে এক গ্লাস পানি নিয়ে গেলাম।ওর বোধহয় প্রচন্ড তেষ্টাই পেয়েছিলো।তাই আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়েই সে গপগপ করে গ্লাসের সবটুকু পানি খেয়ে নিলো। তারপর গ্লাসটা আমার হাতে তুলে দিতেই আমি বললাম,’আরো পানি দিবো?’
নেহাল বললো,’দেও আরেক গ্লাস।’
আমি চট করে ওর জন্য আরেক গ্লাস পানি নিয়ে এলাম। নেহাল আমার কাছ থেকে পানি নিয়ে সেই পানি পান করে বললো,’ধন‍্যবাদ।’
ওর মুখ থেকে তৃপ্তির বাণী শুনে সত‍্যিই আমার সীমাহীন আনন্দ হলো। আমি এবার টেবিলের উপর গ্লাস রেখে ওর জন্য সাবান তোয়ালে নিয়ে এলাম। তারপর নেহাল কে বললাম,’সাবান, তোয়ালে আর প‍্যান্ট বাথরুমে রেখে আসছি।আপনি গোসল করে নিন।’
আমি ভেবেছিলাম নেহাল বোধহয় আমার এইসব আধিক্ষেতায় রাগ করবে! কিন্তু এবার আর রাগ করলো না।সে শুধু মৃদু হেসে বললো,’ঠিক আছে।’
তারপর নেহাল বিছানা থেকে উঠে গোসলে যাওয়ার সময় আমায় জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো।
আমি মনে মনে বললাম,’অষুধে কাজ দিচ্ছে তাহলে।’

বিকেল বেলা নেহাল যখন কাপড় চোপড় পরে ঘর থেকে বের হয়ে যাবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার জন্য, তখন আমি বারান্দার এক পাশে দাঁড়িয়ে গুণগুণ করে গাইতে লাগলাম,
‘ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো
তোমার মনেরও মন্দিরে।
আমার পরাণে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো
তোমার চরণও মন্দিরে।’

আমাকে অবাক করে দিয়ে নেহাল তখন বাইরে গেলো না।সে এসে বসলো আমার পাশে। তারপর কাজের মেয়েটিকে ডাকলো চা দেয়ার জন্য। আমি বললাম,’ না কাজের মেয়ের চা দিতে হবে না। আমি আপনার জন্য চা করবো।’
নেহাল বললো,’তুমি চা করতে গেলে গান গাইবে কে?’
আমি হেসে বললাম,’আমি গাইবো।চা করতে করতে গাইবো।আপনি রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে সেই গান শুনবেন।’
কী অদ্ভুত ব্যাপার।রাতের সেই পাষাণ এবং নিকৃষ্ট মানুষটি আজ দিনের বেলায় এতো পরিবর্তন হয়ে গেল কীভাবে? এই যে আমি যা বলছি তাই শুনছে!
আমি চা করতে করতে এবার গাইছি,

‘এই কথাটি মনে রেখো
তোমাদের এই হাসি খেলায়
আমি যে গান গেয়েছিলাম
তা মনে রেখো
জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় মনে রেখো।’

আমার গান শুনে নেহাল আমার দিকে বুভুক্ষের মতো তাকিয়ে রইল। আমি চা করে ওর হাতে চায়ের কাপ তুলে দেয়ার সময় সে খপ করে আমার হাতটা ধরে ফেলল। তারপর আমায় টেনে তার কাছে বসিয়ে বললো,’অসাধারণ গলা তোমার!’
আমি হেসে বললাম,’বেশি বেশি বলছেন!’
সে এবার আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,’না সত‍্যি বলছি। তুমি আমায় মুগ্ধ করে ফেলেছো। ‘
আমি মনে মনে হেসে বললাম,সবে তো শুরু।
তারপর সেদিন সারাটা বিকেল নেহাল ঘরেই কাটালো। সন্ধ্যা বেলায় নেহাল ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর আমি শাশুড়ি মার কাছে গিয়ে বললাম,’আম্মা, আপনার ছেলেকে অষুধে ধরেছে।’
শাশুড়ি মা তখন হেসে বললেন,’শুনো রাতে নেহাল ফেরার পর সরাসরি ওকে খেতে বলবে না। বরং ও এসে যখন দরজায় টোকা দিবে তখন তুমি তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে দিয়ে ওর হাতে এক গ্লাস শরবত ধরিয়ে দিবে। দেখবে তখন আর ওর মাথা গরম হবে না।’
আমি মৃদু হেসে বললাম,’আচ্ছা।’

নেহাল ঘরে ফিরলো অনেক রাত করে।সে ফেরার আগেই আমি কলাপাতা রঙের শাড়িটা পরলাম। তারপর চোখে কাজল মেখে, কপালে সরু নীল টিপ পরে নিলাম।আর পায়ে মেখে নিলাম আলতা। নেহাল এসে দরজায় টোকা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি দ্রুত হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। তারপর ও এসে বসার সাথে সাথেই ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম এক গ্লাস শরবত।
নেহাল শরবত পেয়ে এতো খুশি হলো!
সে গ্লাসের সবটুকু শরবত খেয়ে গ্লাসটা আমার হাতে তুলে দিতে দিতে আমার দিকে তাকালো। আমি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছিলাম।তাই একটু নিচু করে ফেললাম চোখ।সে এবার মৃদু হেসে বললো,’তোমাকে না পরীর মতো লাগছে এখন!’
আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম।
এবার সে বললো,’এবার ছবির মতো।ছবির মেয়েদের মতো লাগছে তোমায়।’
আমি এবার ওর পাশে এসে বসলাম। তারপর ওর শার্টের বোতাম খুলে দিতে দিতে বললাম,’একেবারে ঘেমে ভিজে চুপসে গেছেন!’
তারপর নেহালের শার্ট খুলে আলনায় রেখে দিয়ে ওর কাছে এসে হাত পাখায় ওর শরীরে বাতাস করতে করতে বললাম,’আজ কী খাবেন বলুন?’
নেহাল আমার দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে বললো,’চুমু খাবো। তোমায় চুমু খাবো।’
আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম তখন।সে বসা থেকে উঠে আমার কাছে এসে বললো,’তুমি এতো সুন্দর !’
আমি অভিমানী গলায় বললাম,’যদি সত‍্যিই সুন্দর হতাম তবে তো আপনি আপনার স্ত্রী হিসেবেই মেনে নিতেন আমায়!’
নেহাল এবার একটু ইতস্তত করে বললো,’তুমি তো আমার স্ত্রীই।মেনে না নেয়ার কথা এলো কেনো এখানে?
নেহাল এবার আমার কাছে এসে পেছন থেকে আমায় জড়িয়ে ধরলো। আমি ওর একটা হাতের আঙ্গুল নিয়ে খেলতে খেলতে বললাম,’মেনে নিলে কী আর আপনি আমায় বাঁদী ডাকতেন?’
নেহাল—

#চলবে