নেশাময় ভালোবাসার আসক্তি পর্ব-২৮+২৯

0
183

#নেশাময়_ভালোবাসার_আসক্তি
#পর্ব -২৮
#নীলাম্বরী_সেন_রাধিকা

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও পোস্ট করেন লেখিকার নাম উল্লেখ করে পোস্ট করবেন)

মেঘা বউ সেজে বসে আছে বাসর ঘরে। কিছুক্ষন আগেই সব ধর্ম বিধি ও আইন অনুসারে আদ্রিয়ান এর সাথে বিয়ে হয়েছে। মেঘার অবশ্য এই বিয়েতে খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু সে এখনও বিস্ময় থেকে উঠতে পারেনি। কি থেকে কি হয়ে গেল। যখন সে অজ্ঞান ছিলো তখন সেই জায়গায় কি হয়েছিল তার বিন্দু মাত্র ধারণা নেই। ওই নিদ্রর কি হয়েছিল তাও জানে না। আর এখানে এসে আরেকটা খবর শুনে সে চরম বিস্ময়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে যায়। মেঘার যখন জ্ঞান ফিরেছিল তখন প্রায় বিকেল। তখন সে নিজেকে নিজের রুমে আবিষ্কার করে। সে জেগে উঠার সাথে সাথে রুমে কয়েক জন মেয়ে আসে সাথে দাদীমাও। মেঘা দাদীমা কে দেখে মাথা নিচু করে ফেলে। কারণ এই মানুষটার সাথে মনে হচ্ছে অন্যায় করেছে। সকাল বেলার কান্ডটা নিয়ে তার মধ্যে গিলটি ফিল হচ্ছে। কিন্তু তারই বা কি করার ছিলো। সেতো আর জানতো না যে ওই কাঠাস বেটা নিদ্র তাকে তুলে নিয়ে যাবে। গেছে তো গেছে একদম বিয়ে করার জন্য কি কান্ডটাই না ঘটালো। কিন্তু এখন তো আরো বেশি ভয় পাচ্ছে যে আদ্রিয়ান তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসেছে। কে জানে কি করবে এখন তাকে? হয়তো কুচি কুচি করে পদ্মা সেতুর নিচে ভাসিয়ে দেবে। এসবই ভাবছিল আর নিজের প্রাণ বাঁচানোর পন্থা খুঁজছিল তখনই দাদীমা এসে পাশে বসলো। কিন্তু কোনো কথা না বলেই ওই মেয়ে গুলোকে বললো যে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। যেমনটি আদ্রিয়ান বলেছে। বেশি মেক আপ করতে বারণ করেছে কারণ এসব আদ্রিয়ান কম পছন্দ করে। আর বলেছে যাতে সুন্দর করে হিজাব করে দেই যেনো একটা চুলও দেখা না যাই। দাদীমার এরূপ কথা শুনে মেঘা শুধু তাকিয়ে থাকলো। এরপর মেয়ে গুলো এসে যখন মেঘাকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বললো তখন মেঘা তাড়াতাড়ি দাদীমা কে জিজ্ঞেস করতে লাগলো কেনো সাজানো হবে তাকে। এতক্ষন জিনিস পত্র দেখে বুঝে গেছে যে ব্রাইডাল সাজ দিবে তাকে। কিন্তু এই সাজ দিয়ে সে কি করবে? আজ তো আর বিয়ে না তার। তাই দাদীমা কে নানারকম প্রশ্ন করতে লাগলো। কিন্তু দাদীমা কোনো উত্তরই দিলো না। দরজা ঠেলে একজন সার্ভেন্ট খাবার নিয়ে এলো। মেঘা সারাদিন কিছুই খাইনি। যার জন্য হয়তো এতক্ষণে শরীর দূর্বল হয়ে পড়েছে। তার জন্য দাদিমা মেঘাকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বললো আগে। মেঘার অবশ্য মন খারাপ হয়ে গেলো দাদীমা তার সাথে ঠিক ভাবে কথা না বলাতে। তাই দাদীমার কথা মতো ফ্রেশ হয়ে আসলো। এরপর দাদীমা ভাত মেখে মেঘার মুখের সামনে ধরলো খাওয়ার জন্য। মেঘারও খুব খিদে পেয়েছিল যার জন্য আর না করেনি।

“শোনো মেঘা তুমি সকালে যে কাজ টা করেছো সেটা একদম ঠিক কাজ করনি। সেটার জন্য আমি তোমাকে কিছু বলছিনা। কারণ দোষটা তোমার একার না। ছোটো এখনও তুমি তাই অনেক কিছুই এখনও তোমার বুঝার আছে। কিন্তু এরূপ কাজ যাতে দ্বিতীয় বার না হয় সেই দিকে খেয়াল রাখবে। পালিয়ে গেলেই সব কিছুর সমাধান হয়না। যদি আজকে কোনো অঘটন ঘটে যেত তাহলে আমার নাতি টাকে কিভাবে সামলাতাম?”

দাদীমার কথা শুনে মেঘা মাথা নিচু ফেললো।

“তোমার আব্বু এসেছে। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তোমার আব্বু তোমাকে দেবে। তাই এখন মাথার মধ্যে এত কিছু ঢুকাতে হবে না। এখন তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। কিছুক্ষন পর উকিল ও কাজী আসবে।”

মেঘা আব্বুর কথা শুনে খুশি হলেও কাজী আর উকিলের ব্যাপার টা শুনে ভ্রু কুচকালো। এখানে কাজী আর উকিলের কাজ কি? আবার মনে পড়লো যে আজতো আদ্রিয়ান আর নিশুদির বিয়ে। তারা তো আসবেই। কিন্তু এর জন্য তাকে কেনো তৈরি হতে হবে? সে তৈরি হবেনা। কিছুতেই না, তার আব্বু এসেছে যখন তখন তার আব্বুর সাথেই চলে যেতে পারবে এখন। আদ্রিয়ান কে একটা সরি বলে দেবে আজকের কাজটার জন্য। যেহেতু দাদীমাও কষ্ট পেয়েছে। তাই দাদীমার দিকে তাকিয়ে

“দাদীমা আব্বু এখানে কি করে? আর তুমি এই কথা এখন বলছো? দেখি সরো সরো আমি আব্বুর কাছে যাবো। নিশ্চই আমাকে নিতে এসেছে তাইনা!!”

এই বলে মেঘা দাদীমার বাকি কথা না শুনেই দৌড়ে রুম থেকে বের হতে লাগলে কেউ মেঘার হাতের কব্জি ধরে সামনে আনে। মেঘা যেতে চাইলে বাধা পড়ে তার হাতে। তাই কে তাকে আটকিয়েছে তা দেখার জন্য ব্যাক্তি টির দিকে তাকালো। আদ্রিয়ান কে দেখে হালকা ঢুক গিললো। মনে হচ্ছে এখনই খেয়ে ফেলবে। কিন্তু সে নিজেকে সামলিয়ে আদ্রিয়ান এর দিকে চোখ তুলে তাকায় আর শাসানোর সুরে বলে

“আপনার সাহস তো কম না! আপনি আমাকে স্পর্শ করেছেন? হাত ছাড়ুন আমার”

বলেই মেঘা আদ্রিয়ান এর থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আদ্রিয়ান আরো শক্ত করে চেপে ধরে। তাতে মেঘা হালকা ব্যাথাও পাই। তবুও সে নাছোড়বান্দা ছাড়া তাকে পেতেই হবে। তানাহলে আব্বু তো তাকে রেখেই চলে যাবে। মেঘার ছটপট করতে দেখে আদ্রিয়ান সবাই কে বলে কিছুক্ষন এর জন্য বাইরে যেতে। সবাই বের হয়ে গেলে দাদিমাও উঠে দরজার দিকে গিয়ে আদ্রিয়ান এর দিকে তাকালো। এরপর মেঘার দিকে তাকিয়ে আবার আদ্রিয়ান এর দিকে তাকালো

“দাদুভাই, মেয়েটা এখনও অবুঝ। বেশি বাড়াবাড়ি করো না। এতে হিতের বিপরীত হতে পারে। তাই যা করবে ভেবে চিন্তে করবে”

এই বলেই দাদীমা বাইরে চলে যায়। আদ্রিয়ান মেঘার হাত ধরে রেখেই দরজা বন্ধ করে। এরপর মেঘাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড় করাই। প্রতিবিম্ব তে দুজনকেই ফুটে উঠে। মেঘা যখন প্রতিবিম্বের দিকে তাকাই তখন দেখে আদ্রিয়ান আগে থেকেই তার দিকে কেমন মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেঘা বেশিক্ষণ সেই চোখের দিকে তাকাতে পারলো না তাই অন্য দিকে দৃষ্টি দিলো।

“তা কি যেনো বলছিলে? তোমাকে স্পর্শ করার সাহস কোথায় পেলাম?”

বলেই আদ্রিয়ান মেঘার ঘাড় থেকে চুল সড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো। এরপর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে লো ভয়েসে বললো

“আমার সাহস টা বরাবর বেশিই। আর তোমার বেলাতে তো মাত্রাতিরিক্ত। তাই তোমাকে স্পর্শ করার জন্য এক্সট্রা সাহসের দরকার হয়না।”

আদ্রিয়ান এর এরূপ কাছে আসাতে মেঘার শরীরে কম্পন সৃষ্টি হলো। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে আদ্রিয়ান কে ধাক্কা মারলো। হঠাৎ ধাক্কাতে আদ্রিয়ান প্রস্তুত ছিলো না তাই একটু পিছিয়ে গেলো। এরপর মেঘার দিকে অবাক চোখে তাকালো।

“সমস্যা কি আপনার? বার বার কাছে আসছেন কেনো? নাকি এখন বলবো যে আপনার ক্যারেক্টারেও সমস্যা আছে। নিশুদীর সাথে বিয়ে হচ্ছে তো তাকে বিয়ে করুন। আমার পিছনে কেনো পড়ে আছেন?
নিদ্র ভাইয়ার কথাই তাহলে ঠিক! রক্ষিতা বানাতে চাইছেন আমাকে?”

মেঘার এরূপ কথাই আদ্রিয়ান তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো। নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টায় আছে।

“কি হলো? এখন চুপ করে আছেন কেনো? তাহলে কি এটাই ঠিক? আপনি আমাকে রক্ষি ,,,

উচ্চস্বরে একটি শব্দ হলো। যেই শব্দে মেঘা কেপে উঠলো। সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে কানে হাত দিলো। মেঘা চোখ খোলার আগেই আদ্রিয়ান মেঘার হাত ধরে টেনে নিচে নিয়ে গেলো। এরপর সবার সামনে এনে দাড় করালো। মেঘা সামনে তাকিয়ে দেখলো এখানে প্রায় সবাই আছে। দাদীমা, পিমনি, ফুফা, নিশু আর তার সাথে নতুন তিন জন কে দেখতে পারছে। যাদের আগে দেখেছে বলে মনে হয়না। হঠাৎ করেই বাম সোফায় চোখ পড়তেই দেখলো তার আব্বু বসে আছে। আব্বুকে দেখে সব কিছু ভুলে গেলো। আর যখনই তার আব্বুর কাছে যেতে নিবে তখনই আদ্রিয়ান ধরে ফেলে

“ওইদিকে নয় সোনা। তুমি জানতে চাইছিলে না আমি নিশুকে বিয়ে করছি আবার সেই সাথে তোমাকে রক্ষিতা বানাতে চাইছি কেনো? তাহলে সেই উত্তর আগে জেনে নাও। তারপর নাহয় তোমার আব্বুর কাছে যাবে।”

“আপনার কোনো কথা শোনার আগ্রহ নেই। আব্বু যখন চলে আসছে তখন আপনি আর আমাকে আটকাতে পারবেন না।”

“তাই নাকি? আর যদি তোমার আব্বুই তোমাকে নিতে না চাই তখন কি করবে?”

“আব্বু কেনো নিতে চাইবে না? আমার আব্বুর মেয়ে আমি। আর আমি আমার আব্বুর সাথে যেতে চাইলে অবশ্যই নেবে। তাইনা আব্বু? তুমি বসে আছো কেনো আব্বু। এখনই চলো। এখানে আমার ডোম বন্ধ লাগতেছে। আমাকে এই শয়তান টার কাছ থেকে নিয়ে যাও।”

মেঘার এরূপ কথা শুনে তার আব্বু বসা থেকে উঠে মেঘা আর আদ্রিয়ান এর সামনে আসলো। এরপর মেঘার মাথায় হাত বুলিয়ে

“কোনো বাবা কে দেখেছো আম্মু যে তার মেয়ের সংসার ভাঙতে? আমাকে কি সেই রকমের আব্বু মনে হয় আম্মু?”

মেঘার আব্বুর এরূপ কথা শুনে কিছুই বুঝলো না।

“এখানে সংসার ভাঙ্গার কথা আসছে কেনো আব্বু?”

“আমি বলছি মেঘা বনু”

হঠাৎ করে নিশুর কথাই তার দিকে তাকালো। আজ নিশুকে খুব সুন্দর লাগছে। মেজেন্ডা কালারের লেহেঙ্গা খুব সুন্দর করেই ফুটে উঠেছে নিশুর ফর্সা গায়ে। নিশুর ডাকে নিজের বাস্তবে ফিরলো

“আমি লন্ডন থেকে এসেছিলাম ভাইয়ার সাথে আরো প্রায় ২০ দিন আগে। কিন্তু সেটাও মম ডেডকে না জানিয়ে। কারণ বাংলাদেশের কথা বললে উনারা আসতে দিতো না। শুধু একটা কারণ বললেই আসতে দিতো আর সেটা হলো দাদাভাই মানে আদ্রিয়ান কে যদি বিয়ে করি তাহলে। সে যাই হোক আমি তবুও এসেছিলাম ভাইয়ার সাথে অনেক কষ্ট করে। আসলে এখানে আসার এক মাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমার প্রিয় মানুষটির সাথে দেখা করা। কারণ সে বাংলাদেশেই থাকতো। অয়ন নাম তার। আর আমাদের ফোনেই পরিচয়। আর তার থেকেই প্রণয়। ও একটা ভালো কোম্পানিতে চাকরী করে। তাই আমাদের সম্পর্ক যখন দুই বছর হয় তখন বিয়ের প্রস্তাব রাখে আমার মম ডেড এর কাছে। কিন্তু আমার মম ডেড,,,”বলেই তাচ্ছিল্য হাসলো,, এরপর আবার বলা শুরু করলো -“তারা আমাদের সম্পর্ক টাকে মেনে নেইনি। উল্টো অয়ন আর ওর মা বাবাকে অনেক অপমান করেছে। বলেছে যে টাকার লাভ আমাকে ফাঁসিয়েছে। আরো অনেক কিছু। এরপর থেকে সে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ কর দেই। অনেক চেষ্টা করেও তার খবর পায়নি। সে জন্যই আমি বাংলাদেশ আসি তার খুঁজে। আর তার খুঁজ অনেক কষ্ট জোগাড় করি। আর এই সব কিছুতে দাদাভাই (আদ্রিয়ান) আমাকে সাহায্য করে। আজকে আমার আর আদ্রিয়ান এর নয় বরং তোমার আর আদ্রিয়ান এর বিয়ে হওয়ার কথা। আর আমার সাথে অয়নের। যার পুরো আয়োজন দাদাভাই নিজে করে। কিন্তু তার মধ্যে আমাদের কিছু অভিনয় করতে হয়। সেটার কারণ কি তা আমি জানি না। হয়তো বড়ো কোনো কারণ থাকতে পারে। সেটা নাহয় দাদাভাই তোমাকে বলবে। সরি বনু এতদিন তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আর এই যে দেখছো (পাশে লম্বা একটি ছেলেকে দেখিয়ে) ও হচ্ছে অয়ন আমার প্রিয় মানুষ। অনেক কষ্টে তার সাথে আমার বিবাহ হতে যাচ্ছে। যার পুরো কৃতিত্ব দাদাভাই এর। ওর জন্যই আজ আমি আমার প্রিয় মানুষটিকে কাছে পাচ্ছি এবং সারাজীবনের জন্য নিজের নামে করে নিচ্ছি।”

বলেই মুচকি হেসে অয়নের দিকে তাকালো। আর এই দিকে মেঘা কিংকর্তব্য বিমূর হয়ে গেলো। এতো কিছু হয়েছে অথচ সে কিচ্ছুটি টের পাইনি? মেঘা যখন এসব ভাবনায় মশগুল তখন আদ্রিয়ান নিশুর উদ্দেশ্য বললো

“বোঝানোর চেপ্টার যদি শেষ হয় তো এখন তোর আদরের বনুকে বল তাড়াতাড়ি রেডী হয়ে আসতে। আমার আরো কাজ আছে। এসব আর ভালো লাগছে না।”

বলেই আদ্রিয়ান ফোন নিয়ে বাইরে চলে গেলো। আর মেঘাকে রেখে গেলো ভাবনা চিন্তার অম্বরে। হয়তো আজকে ভাবতে ভাবতেই তার দিন গুলো অতিবাহিত হবে। বা এর চেয়েও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে। নাকি এর চেয়েও মারাত্মক কিছু অপেক্ষা করছে? কি হতে চলেছে তাদের জীবনের। কোন দিকে মোড় নিবে?

#চলবে_কি?

#নেশাময়_ভালোবাসার_আসক্তি
#পর্ব -২৯ (বিবাহ স্পেশাল)
#নীলাম্বরী_সেন_রাধিকা

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদিও পোস্ট করেন লেখিকার নাম উল্লেখ করে পোস্ট করবেন)

সান্ধ্য আলোর প্রকোপ কমে এলো। আধারের আবরণের স্নিগ্ধ প্রকাশ পাচ্ছে ধীরে ধীরে। গোধূলি সময় কেটেছে অনেকক্ষন হলো। আর সেই মধুর লগ্নে বাধা পড়েছে মেঘা – আদ্রিয়ান আর নিশি – অয়ন। হ্যা কিছুক্ষন আগেই সম্পুর্ণ বিধি অনুসারে দুই জুটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। এদের মধ্যে এক জুটিকে আনন্দ উল্লাসের সাথেই তাদের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। আর আরেক জুটির মধ্যে কারো মধ্যেই সেই খুশি দেখা যায় নি। কারণ পরিস্থিতির প্রকুপে হয়তো এই বন্ধন টা এলোমেলো ভাবেই জুড়ে গেলো। কিন্তু এর মধ্যে আরেকটি সত্যির প্রকাশ ঘটলো মেঘার কাছে। আদ্রিয়ান এর সাথে সে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হলো। প্রথম বার কাবিননামায় স্বাক্ষর করে। আর দ্বিতীয় বার ধর্ম ও রেজিস্ট্রি করে। ভাবতেই অবাক লাগছে তার সে আগে থেকেই আদ্রিয়ান এর অর্ধাঙ্গিনী ছিলো। কিন্তু এসব তার কোনো কিছুই জানা ছিল না। জানবেই বা কি করে এগুলো তো আদ্রিয়ান আর তার আব্বুর কারসাজি। এর জন্য আব্বুর সাথে কথাও বলেনি। কেনো বলবে কথা? তাকে না জানিয়ে এই লোকের সাথে তাকে বিয়েও দিয়ে দিলো। তার সাথে প্ল্যানিং করে এই বাড়িতে কিডন্যাপ এর নাটক করে নিয়েও আসলো। আর তার থেকে সে অজ্ঞাত ছিলো এতদিন। দুঃখে তার এখন কান্না আসছে। রাগ করে আর খাইও নি। এখন সে নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। কারো সাথে কোনো কথা বলবে না। সব গুলোই শুধু তার থেকে সব কিছু লুকিয়ে লুকিয়ে করে। সে তো কবুলও বলতো না কিন্তু তার আব্বু এমন ভাবেই তাকে ব্ল্যাকমেইল করলো যে তার মন গলে পানি পানি হয়ে গেছে। তাই মনের কষ্ট গুলো ভেতরে রেখেই তিন কবুল বলে সবাই কে সাক্ষী রেখে হয়ে গেলো আদ্রিয়ান এর অর্ধাঙ্গিনী। আদ্রিয়ান আদ্রিয়ানো কবুল বলে হয়ে গেলো মেঘার অর্ধাঙ্গ। সব কিছুই খুব সুন্দর করেই হয়েছে। এসব যখন ভাবছিল তখন দরজাই ধাক্কানোর আওয়াজ হলো। মেঘা বেলকনি থেকে এসে শুনার চেষ্টা করলো কে এসেছে। তখন বুঝতে পারলো নিশি এসেছে। এই মেয়েটার সাথেও সে রাগ। কি সুন্দর আদ্রিয়ান এর কথাই তাল মিলিয়ে অভিনয় করে তাকে ঘোল খাওয়ালো। আর এসব দেখে আদ্রিয়ান কে কত কিছুই না বললো। এখন তো তার সামনে সব পরিষ্কার। কিন্তু এতসব আদ্রিয়ান কেনো করেছে তার যথার্থ কারণ বলেনি। এইদিকে আদ্রিয়ান। এসব ভাবতে ভাবতে দরজা খুললো কারণ নিশু কিছুক্ষন পরই বিদায় নেবে।

“কি ব্যাপার মেঘা বনু? দরজা খুলতে এতক্ষন লাগে? কি করছিলে এতক্ষন? হুমম?”

নিশু মেঘার দিকে তাকিয়ে দেখে মেঘা গাল ফুলিয়ে মুখ টা কে বেলুন করে রেখেছে। কান্না করার ফলে হালকা চোখের কাজল লেপ্টে গিয়েছে। আর এতেই মনে হয় মেঘার বধূ সাজটা সার্থক হলো। আদ্রিয়ান যদি মেঘাকে এই রূপে দেখে তাহলে হয়তো সেখানেই কয়েক টা হার্ট বিট মিস করবে। কিন্তু এই দাদাভাই টা যে কই গেলো? আজকেই কি তার জরুরি কাজ পড়তে হলো? আদ্রিয়ান যে বাড়িতে নেই সেটা মেঘা এখনও টের পায়নি।

“তুমি আমার সাথে কথাই বলো না দি! তোমার তো ফিল্মি জগতে অভিনয় করা উচিত ছিল। যে ভাবে আমাকে বোকা বানালে তোমরা দুই ভাই বোন মিলে। মনে হয় না এই জনমে এই রকম বোকা আমি হয়েছি বা হবো।”

মেঘার এরকম বাচ্চা টাইপের কথা শুনে নিশু ফিক করে হেসে দিলো। মেয়েটার অভিমানটাও মনে হয় আদরের অভিমান। এই যে এই ভাবে গাল ফুলিয়ে কথা বলছে আর মুখের ভঙ্গিমা গুলো এত্তো অদূরে লাগছে যে সে কি আর বলবে। যদি সে ছেলে হতো তাহলে এই মেয়েটা কে কক্ষনোই আদ্রিয়ান এর হতে দিতো না। সেই নিয়ে ভেগে যেতো। এসবই ভাবছিল আর মেঘাকে কাছে টেনে বুকের মধ্যে মাথাটা নিয়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে একটা চুমো খেলো।

“ধুর পাগলী। আমি কি ইচ্ছে করে করেছি নাকি? তোর বর টাইতো শর্ত দিলো যে তার কথায় যদি অভিনয় না করি তাহলে নাকি অয়নের সাথে আমাকে বিয়ে দেবে না। আর যখন ব্যাপার টা অয়ন কে নিয়ে তখন কি আমি আর রাজি না হয়ে থাকতে পারি বল সোনা”

নিশুর কথা শুনে একটু দুঃখ লাগলো যে তার শয়তান বর টা সবাইকে শুধুই ভয় লাগিয়ে তার কাজ আদায় করে। তাকেও তো কতো ধরনের ভয় লাগাতো আর তার কার্য সিদ্ধি করতো। এই শয়তান বর টাকে কিভাবে যে শায়েস্তা করবে কে জানে? তার মতো চুনো পুটি মেয়ে কি এই হাতির মত গন্ডার টাকে টাইট দিতে পারবে? উহুইউ মনে হয়না পারবে।

“এই যে ভাবনারানি! দাদাভাই ঠিকই বলে যে তুমি অতিরিক্ত তোমার ঐ ছোট্ট মাথায় বেশি প্রেসার দাও। এটা কিন্তু ঠিক না। শোনো তোমাকে কয়েক টা কথা বলি। তোমার বয়স টা হয়তো কম কিন্তু সেই তুলনায় কিন্তু যথেষ্ট মেচিউর। তাই আমার কথা গুলো মন দিয়ে শুনবা।”

নিশুর কথাই মেঘা মাথা নাড়ালো। এরপর নিশু মেঘাকে নিয়ে বেডে বসালো। মেঘার হাত দুটো নিশুর হতে মুটিতে নিয়ে

“দাদাভাই যখন কিশোর ছিল তখন মামা মামী এক ভয়াবহ গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট এ মারা যায়। দাদাভাই এর পুরো পৃথিবীটা ছিলো মামা মামী। যখন উনারা মারা যায় তখন দাদাভাই অনেক ভেঙ্গে পড়ে। এরপর নানুমাই দাদাভাই অনেক কষ্টে তাকে সামলায়। যখন দেখছে দাদাভাই আস্তে আস্তে ঠিক হচ্ছে তখন তাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেই পড়াশুনার জন্য। কারণ এখানে থাকলে সব সময় মামা মামীর কথা মনে পড়বে। এতে দাদাভাই এর ভবিষ্যত্ নষ্ট হতে পারে। তাই সেখানেই পড়াশুনা শেষ করে সাথে মামার রেখে যাওয়া বিশাল বিজনেস সামলায়। এরপর আস্তে আস্তে এভাবেই সময় যেতে থাকে। কিন্তু কখনো কোনো মেয়ের নেশা তার ছিলো না। বিদেশের মাটিতে থাকলে মেয়েদের নিয়ে মাতা কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু দাদাভাই কখনো এসব ব্যাপারে ইন্টারেস্ট দেখাতো না। শুধু একটা কথায় বলতো এসব ফালতু জিনিসের জন্য তার সময় নেই। তখন আমিও বলতাম যে যখন তোমার লাইফের সেই সন্ধিক্ষণ আসবে তখন দেখবে সব কিছুই মূল্যবান সময় মনে হবে। আর দেখো বনু আমার কথা মিলে গেলো। তোমাকে পাওয়ার জন্য দাদাভাই যে কি কি খেল দেখিয়েছে সেটা শুধু সে আর উপর ওয়ালা জানে। তোমাকে এসব বলার এক মাত্র কারণ হলো দাদাভাই তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। হয়তো তার কার্য কলাপে তুমি বুঝেছো। ওর ইজহার করার পন্থাটা হয়তো একটু অন্য রকম। কিন্তু তোমাকে সে তার জীবনের সব কিছু দিয়েও রক্ষা করতে চাই। তোমাকে কষ্ট দিয়ে সেও কষ্ট পাই। নিজেকে আঘাত করে। এমন পিয়ুর হার্ট কে কক্ষনোই অবহেলা করো না। আপন করে নাও। অনেক হয়েছে রাগারাগি। এখন এসব মান ভেঙ্গে নতুন জীবন শুরু করো। দেখবে পৃথিবীর সুখী জুটির মধ্যে তোমরাও সেরা কাপল হবে।”

এতক্ষন মেঘা মন দিয়ে সব কথা শুনলো। আর চোখের অশ্রু ঝরাতে লাগলো। নিজেকে নিজে এখন দোষারূপ করতে লাগলো। এত কিছু দেখেও সে অবুঝের মতো কতো কিছুই না করলো। আদ্র অনেক হার্ট হয়েছে। হয়তো এখন মেঘাকে আর আগের মতো ভালোবাসবে না। তাকে কি মেনে নিবে আদ্র? নাকি ঐসব কাজের জন্য তাকে দূরে ঠেলে দিবে। এসব ভেবেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো। মেঘার অবস্থা দেখে নিশুরও খারাপ লাগছে। মেয়েটা কে এখনই এসব না বললেও পারতো। কিন্তু এতে যে আদ্রিয়ান কে যে সে ভুল বুঝেই যাবে। এতে দুই জনের সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে। আর একজন মেয়ে হয়ে এসব সে কখনোই হতে দিতে পারে না।

“নিশু দি আমাকে কি উনি আগের মতো আর ভালোবাসবে না? আমার তো অনেক বড়ো ভুল হয়ে গেছে। এখন আমি কি করবো বলোনা নিশু দি? উনি হয়তো আমাকে আর গ্রহণ করবে না, তাইনা নিশুদি?”

“পাগলী একটা! তোমাকে যদি দূরেই সরিয়ে দেবে তাহলে কি এতো কিছু করে এইভাবে বিয়ে করতো? আসলেই দাদাভাই টাও না এমন ছোটো মেয়েকে আমার ভাবি বানালো যে কি আর বলমু! খুব বড়ো ভুল করলো”

“দি,,”

বলেই মেঘা ভ্যা করে কান্না করে দিলো। মেঘার হঠাৎ এমন কান্নায় নিশু ঘাবড়িয়ে গেল। ওতো মজা করছিলো। নিশু তাড়াতাড়ি মেঘাকে জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললো

“হাহাহাহা,,, বনু আমিতো মজা করছিলাম। হয়েছে হয়েছে আর কান্না করো না প্লীজ। এরপর দাদাভাই যদি টের পাই আমার জন্য তার পিচ্ছি বউটার চোখে পানি এসেছে তাহলে হয়তো আমাকে আর অয়নের সাথে পাঠাবে না। তখন কিন্তু আমিও তোমার সাথে যোগ দেবো কান্নায়।”

বলেই মুখটা কে দুঃখী দুঃখী ভাব করে ফেললো। আর মেঘা মাথা উঠিয়ে নিশুর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো। সত্যি ভাগ্য করে এমন একটা বড়ো বোন পেলো সে। আপন হলেই কি সবাই আপন হয় উহু হয়না। পরও কখনো কখনো এইভাবেই আপন হয়যে তাদের সাথে একদম মিশে যায়। যেমন টা নিশুর সাথে মেঘা মিশে গেলো। এরকম আরো কিছুক্ষন কথা বলে নিশু বিদায় নিলো। কারণ একটু পর অয়ন এর সাথে তার নতুন জীবনের সূচনা করার জন্য শ্বশুরবাড়িতে যাবে। এভাবেই মেঘার অনেক টা সময় পার হয়ে গেলো।

_______________________

বর্তমান –

মেঘা বাসর ঘরে বসে বসে এসবই এতক্ষন ধরে ভাবছিল। আর সব কিছু কিভাবে সাভাবিক করবে তা ভাবছিল। অনেক হয়েছে রাগ অভিমানের পালা। এখন সে একজন নিখুঁত অর্ধাঙ্গিনী হয়ে দেখাবে। যখনই অর্ধাঙ্গিনী জিনিস টা মাথায় আসলো তখনই লজ্জায় গাল টা লাল হয়ে গেল। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না সে আদ্রিয়ান এর অর্ধাঙ্গিনী হয়েছে। সারাজীবনের জন্য কাছের মানুষটা তার হয়ে গেলো। এতো সুখ সুখ অনুভুতি হচ্ছে যে মেঘা মনে হয় পাগল হয়ে যাবে। প্রায় অনেকক্ষন ধরেই মেঘা বসে আছে। দাদীমা আর তন্বী মিলে মেঘাকে বাসর ঘরে বসিয়ে গেছে সেই রাতের ১০ টাই। এখন বাজে রাতের ১ টা। হ্যা তন্বীও এসেছে। আদ্রিয়ান এই আসতে বলেছে। বান্ধুবিকে পেয়ে মেঘাতো ভীষণ খুশি হয়েছিল। এরপর অনেক কথা হলো তাদের। সাথে দাদীমাও যোগ দিয়েছিল। দাদীমা এখন মেঘার সাথে আবার আগের মত কথা বলছে। সাথে অনেক উপদেশও দিলো। আর তন্বী তো অনেক গভীর গভীর কথা বলেছে যে তার কান দুটো গরম হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ মেয়েটাও কি এক পিস রে বাবা। এসব ভাবতে ভাবতে যে কখন ঘুমিয়ে পড়লো খবর নেই।

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ তে মেঘার ঘুম টা হালকা হলেও চোখ জোড়া খুলতে পারলো না। আদ্রিয়ান ঢুকেই দেখলো তার রুমটা পুরো ফুলের রাজ্য করে ফেলেছে। খুব সুন্দর করে রুম টা ডেকোরেট করা হয়েছে। আদ্রিয়ান রুমে ঢুকে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বেডের দিকে তাকালো। বেড টিকেও আলিশান ভাবে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। মনে হচ্ছে পুরো একটা ফুলের বাগান। আর সেই বাগান আলোকিত করে আছে ভেতরে থাকা তার জীবনের বিশেষ ফুলটি। যে কিনা ফুলের রানী হিসেবে আছে। কিন্তু সেই রানী আপাতত ঘুম পরীর সাথে ঘুমের জগতে মিশে আছে। আদ্রিয়ান সামনে আগাতে লাগলো।এরপর বেডের ঝুলে থাকা ফুলের সারি গুলো সরিয়ে মেঘার কাছে চুপটি করে বসলো।দেখলো মেঘা বাচ্চাদের মতো করে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছে। মেঘার এই বধূ রূপটা আদ্রিয়ান এর হার্ট বিট বাড়িয়ে দিলো। এতো স্নিগ্ধ লাগছে তার পিচ্ছি বউ টা কে। হ্যা তার পিচ্ছি বউ। তার জীবনের আলো এই ফুলটি।

“আমার পরী, আমার পিচ্ছি বউ, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি আমার স্নিগ্ধ ফুল।”

#চলবে_কি?