নোলক পর্ব-০১

0
237

#নোলক
পর্ব১
#তানিয়া_মেধা

বাইরের বজ্রপাতে কেঁপে উঠে পদ্ম। ভীতু ভীতু চোখে তাকায় পাশে বসে থাকা লোকটার দিকে। এই লোকটাকে বর হিসেবে কবুল করেছে কিছুক্ষণ আগে। লোকটা গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। পদ্ম দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে জানালার দিকে তাকায়। অজোরে বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে পদ্ম সেদিক তাকিয়ে ভাবতে থাকে কেমন হবে তার নতুন জীবন। তার শ্বশুর বাড়ি তাকে মেনে নিবে তো। অবশ্য বিয়েতেই যে হট্টগোল করল ও বাড়িতে কি করবে তার সাথে এটা ভেবেই সেটিয়ে গেল সে।

পদ্মর পাশে বসে থাকা শুভ্র সব দেখছে কিন্তু সে কোনো কিছু বলছে নাহ। পদ্ম এসব কথা ভাবতে ভাবতে গাড়ি এসে থামে বিরাট রাজমহলের সামনে। পদ্ম গাড়ি থেকে নেমে হা করে তাকিয়ে থাকে বাড়ির দিকে। বিশাল বড় এই বাড়ি অনেকটা জায়গা নিয়ে করা। শুভ্র গম্ভীর গলায় বলে, ‘ আমার সাথে আসো।’

শুভ্র পদ্মর হাত ধরে তাকে ভিতরে নিয়ে যেতে থাকে। পদ্ম চমকে বলে, ‘ কি করছেন!’

শুভ্র কিছু বলে নাহ সে চুপচাপ সামনে এগোতে থাকে। যখন সে বাড়ির দরজা পাড় হয়ে ভিতরে ঢুকতে যাবে তখনই শুভ্র মা মুনিরা বলে, ‘ দাড়াও।’

পদ্ম এতোক্ষণ চারদিকের পরিবেশ দেখলেও এখন সে দেখছে সামনে সদর দরজার সোজা একটা বড় সিংহাসনে বসে থাকা মহিলাকে। গায়ে তার হরেক রকম ভারী ভারী গয়না। পড়নে খয়েরী রঙের শাড়ি। নাকে একটা বড় নোলক। শুভ্র তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ মা নোলকটা পড়িয়ে দাও পদ্মকে৷ ‘

শুভ্র এ কথা বলতেই মুনিরা হুংকার দিয়ে উঠে বলে, ‘ তুমি ভাবলে কি করে এই ফকিন্নির মেয়েকে আমি নিজের নাকের নোলক পড়াবো।’

শুভ্র জানতো মুনিরা এই ব্যবহার করবে তাই কিছু নাহ বলে পদ্মর হাত ধরে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। শুভ্র যাওয়ার সময় মুনিরা চিৎকার করে বলে, ‘ মনে রাখিস এই মেয়ে কখনো আমার নোলক পাবে নাহ। এই বাড়ির ছোট বউয়ের নোলক সে কখনো পাবে নাহ সেই সম্মানের যোগ্য না এই মেয়ে।’

শুভ্র মায়ের কথায় পাত্তা দেয় নাহ চলে আসে নিজের রুমে৷ পদ্ম নিচের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। মুনিরার কথা শুনে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তাই কাঁদছে। শুভ্র রুমে এসে এক পলক পদ্মর দিকে তাকিয়ে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। পদ্ম তখনও কাদছে। সে গরিব বলে কি সে মানুষ নাহ। পদ্ম রুমের সাথে লাগানো বারান্দায় চলে যায়। একটা চেয়ারে বসে টেবিলের উপর মাথা হেলিয়ে দেয়। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে বলতেই পারে না সে।

শুভ্র ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে পদ্ম রুমে নেই। বারান্দায় গিয়ে দেখে সেখানে টেবিলের উপর ঘুমিয়ে গেছে সে। শস্তির শ্বাস ছাড়ে সে। শুভ্র মনযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তার শখের নারীকে। সকল বাধা খাটিয়ে আজ সে নিজের করে নিয়েছে। পদ্ম এখন তার বউ, তার অর্ধাঙ্গিনী। এটা ভাবতেই শুভ্র ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ভাসে।

পদ্ম ঘুম থেকে উঠে দেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে। বুঝতে পারে শুভ্র এনেছে তাকে। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ১১ টা বাজে। সারাদিনের বৃষ্টিতে এখন ঠান্ডা লাগছে বেশ। পদ্ম উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়।

পদ্ম ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখে শুভ্র দুটো খাবার থালা নিয়ে বসে আছে। পদ্মকে দেখে হালকা হেসে বলে, ‘ বসে খেয়ে নাও।’

শুভ্র হাত ধুয়ে খেতে বসে পড়ে। পদ্মরও ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে তাই সেও আর কোন বনিতা নাহ করে বসে পড়ে খাবার থালা নিয়ে খেতে। খেতে খেতেই পদ্ম শুভ্রকে বলে, ‘ আপনার ফ্যামিলির কেউ হয়তো আমাকে পছন্দ করে নাহ।’

শুভ্র মনযোগ দিয়ে খাচ্ছিল আচমকা পদ্মর প্রশ্নে খাবার থামিয়ে পদ্মর দিকে তাকায়। তারপর আবার খাবর খেতে খেতে বলে, ‘ কিছু মানুষের সামনে নিজের কোমলতা আর দুর্বলতা প্রকাশ করতে নেয়। হাজার দুর্বল হলেও কিছু পরিস্থিতিতে কঠোর হয়ে সামাল দিতে হয়।’

পদ্ম আর কিছু বলে নাহ। বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন পদ্ম খুব সহজেই বুঝে যায় তার এখানে লড়াই করে বাঁচতে হবে। খাবর শেষে এটো প্ল্যাট ধুয়ে হাত ধুয়ে চলে আসে শুভ্র ঘুমিয়ে গেলেও পদ্ম ঘুমাতে পারে নাহ।

***
মুনিরা রাগে ফুঁসছে আর ঘরে পায়চারি করছে। বিছানায় বসে দিলোয়ার স্ত্রীর এমন অস্থিরতা দেখছিলেন। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার খবরের কাগজ পড়তে মন দেয়। তার কাছে স্ত্রীর রাগ অর্থহীন মনে হচ্ছে কারণ পদ্ম নিতান্তই ভালো মেয়ে। পদ্মকে তার বেশ পছন্দ যদি তার হাতে অধিকার থাকত তাহলে সেই গিয়ে পদ্মকে নোলক পড়িয়ে দিতো। কিন্তু এই বাড়ির নিয়মই এটা যে নিজ পুত্রবধূদের শ্বাশুড়িই নোলক পড়াবে আর বউয়ের মর্যাদা দিবে।

মুনিরা স্বামীর দিকে তাকিয়ে আরও বিরক্ত হন। তেজি গলায় দিলোয়ারকে বলেন, ‘ আপনি কিছু বলতে পারলেন নাহ যখন ঐ ফকিন্নি কে শুভ্র বিয়ে করছে। ঐ ফকিন্নিকে দেখলেই আমার গা গুলিয়ে আসে।’

দিলোয়ার মুনিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ তুমিও খুব বড়লোক বাড়ির মেয়ে ছিলে নাহ।’

ব্যস দিলেয়ারের এই কথাটায় আগুনে ঘি ডালার মতো কাজ করে। মুনিরা নেকা কান্না শুরু করে। দিলোয়ার বিরক্ত হয়ে চলে যায় রুম থেকে।’

দিলোয়ারের দ্বিতীয় স্ত্রী সাবানা বসে ছিল নিজের রুমে। হঠাৎ স্বামীকে নিজের রুমে দেখে চমকে উঠে। অবাক নয়নে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ আপনি হঠাৎ এখানে! ‘

দিলোয়ার ইতস্ততবোধ করে এলোমেলো চোখে তাকিয়ে বলে, ‘ এমনি আজ রাত এখানে ঘুমাবো।’

সাবানা বুঝতে পারে মুনিরার সাথে তার ঝগড়া হয়েছে। চুপচাপ বিছানা করে দেয় স্বামীকে। দিলোয়ার বিছানায় বসতেই সাবানা মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে। দিলোয়ার বলেন, ‘ এমা তুমি নিচে শুয়েছো কেন?’

সাবানা হালকা হেসে বলে, ‘ আপনার সাথে শুয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বড় বউ নোলক খুলে নিয়েছে আর আপনি তো ঝগড়া হলেই এ ঘরে আসেন এক রাতেরই তো ব্যাপার মানিয়ে নিবো।’

দিলোয়ার আর কিছু বলে নাহ। সাবানাকে সে বড্ড অবহেলা করছে কিন্তু কি করবে সে নিরুপায়। দিলোয়ার ঘুমিয়ে পড়েন। সবানা মেঝেতে শুয়ে হালকা মাথা উঁচু করে তার মনের মানুষকে দেখতে থাকে।

****
শুভ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আর পদ্ম তার দিকে তাকিয়ে তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। লোকটা গায়ের রং শ্যামলা, খাড়া নাক, নাকের মাঝে একটা তিল আছে, ঠোঁট দুটো মুটা। চুল গুলো ছেট ছোট করে খাটা দেখতে তার বর মাশাল্লাহ। আনমনে হাসে পদ্ম।

কিছু কথা মনে পড়তেই পদ্মর হাসি গায়েব হয়ে যায়।

সকাল ৭ টা বাজে পদ্ম ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়। গোসল করে একটা মেরুন রঙের সুতির শাড়ি পড়ে নেয় বেশ মানিয়েছে তাকে। নিজের চোখের নিচ থেকে কাজল নিয়ে কানের নিচে লাগিয়ে নেয়। তখনই পিছন থেকে শুভ্র বলে উঠে, ‘ তোমার রুপে তুমি নিজের নজরই সামলাতে পারছো নাহ আমি কি করে সামলাই বলো?’

পদ্ম চমকে উঠে পিছন ঘুরে তাকিয়ে দেখে শুভ্র ঘুম থেকে উঠে ঘুম ঘুম চোখে পদ্মর দিকে তাকিয়ে আছে। পদ্ম লজ্জা পায় শুভ্র হাসে। শুভ্র এগিয়ে আসে পদ্মের কপালে চুমু খেয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। পদ্ম সেখানেই জমে যায়। কিছুক্ষণ সেভাবেই দাড়িয়ে থাকে। কি করলো তার সাথে শুভ্র ভাবতেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেলো।

পদ্ম সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সাবানা তাকে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে এসে বলে, ‘ বাহ খুব মিষ্টি দেখতে তো?’

পদ্ম সাবানার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, ‘ ধন্যবাদ। কিন্তু আপনাকে তো চিনলাম না? ‘

সাবানা হেসে বলতে যাবে কিছু তখনই পিছন থেকে মুনিরা পিছন থেকে এগিয়ে এসে বলে, ‘তোমার মতোই এই বাড়ির আশ্রিতা।’

সাবানার চোখ দুটো চলচল করে উঠে। পদ্ম তার শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ ও তাই নাকি শ্বাশুড়ি মা?’

মুনিরা আগুনের মতো উত্তাপ নিয়ে বলে, ‘ একদম শ্বাশুড়ি মা বলবে না।’

পদ্ম শয়তানি হেসে বলে, ‘ওকে শ্বাশুড়ি।’

মুনিরা চোখ পাকিয়ে তাকায়। পদ্ম মুনিরাকে চোখ টিপ দিয়ে চলে যায় সেখান থেকে।

চলবে।