বন্য প্রণয় পর্ব-৩০+৩১+৩২

0
138

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_৩০
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। চারদিক মেঘে অন্ধকার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমেছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তাহমি এলো। সহন কিছু না বলে মুচকি হেসে তাহমিকে কোলে তুলে নিয়ে ছাদের দিকে এগোচ্ছে। তাহমির অন্য রকম কিছু অনুভব হচ্ছে। দীর্ঘদিন সহনের উষ্ণ ছোঁয়া থেকে দূরে ছিল সে। খানিক বাদে ছাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল সহন। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে দু’জনের গায়ে। তাহমি সহনের মুখশ্রীর দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির পানি সহনের নাকের ডগা দিয়ে বেয়ে তাহমির ঠোঁট ছুঁইয়ে যাচ্ছে। বাজ পড়লো আশেপাশে কোথাও। সেই সাথে আঁতকে উঠলো তাহমি। খানিকটা ভয় পেয়েছে মেয়েটা। সহন তাহমিকে নামিয়ে দিলো কোল থেকে। তারপর শক্ত করে জড়াল বক্ষে।
” তাহমি এভাবে বাইরে থাকা ঠিক হবে না এখন। দেশের সব জায়গায় কমবেশি কালবৈশাখী হচ্ছে। ”
” হ্যাঁ ঠিক বলেছো। চলো বাসায় চলো। পরে একদিন ভিজবো আবার। এখন শুধু বৃষ্টি না বেশ ঝড় হচ্ছে। ”
দু’জনের সম্মতিতে ছাদ থেকে নেমে গেলো দু’জন। প্রথমে তাহমি ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল সেড়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগোলো। তারপর সহন গোসল করতে ঢুকলো। তাহমিকে ডাইনিং টেবিলের দিকে আসতে দেখে ফরিদা উদগ্রীব হয়ে বললেন,
” কী রে এতক্ষণ ডাকলাম কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না কেন? ”
” ছাদে ছিলাম মামুনি। তুমি এখানও খাওনি?”
তাহমি চেয়ার টেনে বসলো। ফরিদা আগে থেকেই ছেলে ও বউয়ের জন্য প্লেটে ভাত,তরকারি বেড়ে রেখেছেন। সহনের বাবা অফিসে খাবে দুপুরে। কীসের একটা জরুরি মিটিং আছে শুক্রবারেও! বিদেশি কোম্পানির সাথে কোনো একটা চুক্তি হওয়ার কথা।
” তোদের রেখে একা একা খেতে কি ভালো লাগে! ”
” আচ্ছা তোমার ছেলেও আসবে এখুনি। ততক্ষণে তুমি শুরু করো বরং। ”
তাহমির কথার মধ্যেই সহন এসে পৌঁছল সেখানে।
” এইতো আমিও এসে গেছি। মা খাওয়া শুরু করো এখন। ”
ফরিদা খান খেতে শুরু করলেন সাথে তাহমি ও সহনও।

” মি.চৌধুরী আপনার বোনকে বিয়ে দিবেন না?”
আকস্মিক এ ধরনের প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল তৃষা। আজকে অনিকের সাথে তার চেম্বারে এসেছে তৃষা। এতদিন বিয়ে হলেও নিজের স্বামী কোথায় কাজ করে সেসব দেখা হয়নি বলেই আজকে অনিক তৃষাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিল। হসপিটালের অন্য একজন ডক্টর তৃষাকে দেখেই হুট করে প্রশ্নটি করলো। অনিক মৃদু হেসে বললো,
” এমবিবিএস ভালো ডাক্তার পেলেই বিয়ে দিয়ে দিবো।”
তৃষা চমকাল। অনিকের হাবভাব বুঝতে পারছে না। তবে সামনে থাকা লোকটার মনে যে লাড্ডু ফুটছে সে বিষয় কোনো সন্দেহ নেই তৃষার। লোকটা আগ্রহসহকারে এবার চেয়ার টেনে অনিকের সামনাসামনি বসলো।
” তাই? আজকালকার যুগে এরকম বোরকা পরে পর্দা করা মেয়ে পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। ”
” তা ঠিক বলেছেন ডা. সৌরভ। বাই দ্য ওয়ে, আলাপ করিয়ে দেই উনি ডাক্তার সৌরভ হাওলাদার,আমার কলিগ। আর সৌরভ এই মেয়েটি আমার বোন নয়,স্ত্রী। আবারও বিয়ে করেছি,তবে সেটা তেমন একটা জানানো হয়নি কাউকে। ”
ডাক্তার সৌরভ হাওলাদার বিষম খেলো। অনিক টেবিলে থাকা পানির বোতল সৌরভের দিকে এগিয়ে দিয়ে ফের বললো,
” আরে নিন নিন খেয়ে নিন মশাই। ”
সৌরভ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা হাতে পানির বোতল হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করতে লাগলো। তৃষা ঠোঁট টিপে হাসছে। অনিক যে এরকম রসিকতা করতে পারে সেটা তৃষা আজকেই আবিষ্কার করলো প্রথম। কিন্তু কোথাও গিয়ে ভয় লাগছে তৃষার। বাড়ি গিয়ে এটা নিয়ে আবার ঝামেলা করবে না তো? অনিকের ঔষধ চলছে নিয়মিত। তৃষা নিজে উদ্যোগ নিয়ে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সৌরভ পানির বোতল টেবিলে রেখে দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বললো,
” সরি ড. অনিক। ভাবী কিছু মনে করবেন না। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। তো যাইহোক, বিয়ের দাওয়াত পেলাম না একদিন ট্রিট কিন্তু চাই। ”

অনিক জোরে হাসলো, তৃষা মুচকি মুচকি হাসছে।

” আরে আমিও মজা করেছি একটু। ইট’স ওকে। নেক্সট শুক্রবার আমাদের বাসায় তোমার ইনভাইট রইলো। রিমি,খায়রুল ও সবুজকেও বলেছি।”
” ঠিক আছে। তাহলে এলাম এখন। দেখা হবে ভাবী আল্লাহ হাফেজ। ”
তৃষা জবাবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। কিন্তু কথা বললো না। অনিক যদি রেগে যায় সেই ভয়ে চুপ করে থাকে। ডাক্তার ছয় মাসের ঔষধ খেতে দিয়েছেন। সেই সাথে এই ক’মাস অনিকের মনমতো সবকিছু করতেও বলেছে। তৃষা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সবকিছু তাই মেনে নিয়েছে। ফোনের রিংটোনের আওয়াজে নড়েচড়ে উঠলো তৃষা। অনিক টেবিলের রাখা ফাইলের দিকে নজর বুলিয়ে দেখছে। আয়ান কল করেছে। দ্রুত কল রিসিভ করলো তৃষা।
” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছো তোমরা?”
বোনের আওয়াজে হৃদয় শীতল হয়ে গেছে আয়ানের। আসবে আসবে করেও এতদিন বিভিন্ন কারণে আসা হচ্ছিল না এদিকে। আজকে না বলেই চলে এসেছে তৃষাদের বাড়ি।
” আলহামদুলিল্লাহ। তোরা কেমন আছিস? আর তোরা কোথায়? আমি তো তোদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ”
তৃষা চমকাল। ভাই এসেছে তার বাড়ি! বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো তৃষা। সেটা দেখে অনিকও বুঝল গুরুত্বপূর্ণ কিছু হয়েছে।
” আমি উনার সাথে হসপিটালে এসেছি ভাইয়া। তুমি থাকো, আমি ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
” ঠিক আছে। সাবধানে আয়।”
কল কেটে দিতেই তৃষা দেখে অনিক উৎসুকভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
” ভাইয়া এসেছে আমাদের বাসায়। ”
” বাহ! চলো তাহলে বাসায় যাই। এমনিতেই রোগী কম আজকে৷ তাছাড়া অন্য ডাক্তাররা আছে। ”
” যাবে তুমি? ”
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলো অনিক।
” বারোটা চল্লিশ বেজে গেছে। জোহরের আজান দিতে তো বেশি সময় বাকি নেই। তোমাকে গিয়ে রান্না করতে হবে আবার। বাসায় তো শুধু ডাল,মাছ আর ভাত রান্না করে রেখে এসেছো। আয়ানের জন্য মাংস রান্না করবে তো।”
” আগে বাসায় যাই তারপর সেসব দেখা যাবে। ভাইয়া তো চলে যাবে না এখুনি। বিকেলে না হয় মাংস রান্না করবো।”
” ঠিক আছে। চলো। তুমি যা ভালো মনে করো তাই হবে। ”
অনিকের পিছনে পিছনে তৃষাও বাড়ির পথে এগোচ্ছে। মানুষটা এখন যেমন আছে সব সময় যদি তেমন থাকতো! দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসলো তৃষা।

ডাইনিং রুম থেকে নিজের রুমে এই নিয়ে তিন বার গেলো এলো সহন। তাহমির খাওয়া শেষ হচ্ছে না কেনো সেই নিয়ে বহুত রাগ হচ্ছে নিজের উপর। অথচ এতে নিজের সাথে রাগ করার কোনো কারণ আছে? রাগ করলে করবে তাহমির সাথে, তা না করে নিজেকে গালিগালাজ করে যাচ্ছে লোকটা। নাহ তিনবার গেলো আর একবার গিয়ে দেখবে। তাহমির কাজ শেষ হলে ভালো নয়তো সোজা ঘরে গিয়ে আজকে নিজেই বিছানা গুছিয়ে মশারী টানানোর কাজও করবে হুহ্। কপাল খারাপ লোকটার। তাহমি খাওয়া শেষ করে শ্বাশুড়ির সাথে গল্প জুড়ে বসেছে। দুপুরের অধরা রোমান্স তো পূর্ণ করতে হবে রাতে! সেসব কি মেয়েটার মাথায় নেই? সহন বিরক্ত হয়ে নিজের ঘরেই চলে গেলো। প্রথমে ভালো করে ঝেড়ে ঝেড়ে বিছানা পরিষ্কার করলো। এতো জোরে ঝাড়ছিল বিছানা মনে হচ্ছিল বিছানায় ময়লার অভাব নেই। তারপর গেলো মশারী টানাতে। মশারী টানিয়ে বালিশে মাথা রেখে সটান হয়ে শুয়ে পড়লো সে। এরমধ্যে দরজা বন্ধ করার আওয়াজ ভেসে এলো কানে। তাহমি ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকে দিলো। বিছানার দিকে দৃষ্টিপাত করতেই হাসলো একটু। এগিয়ে গিয়ে বসলো একপাশে।
” আজকে সব নিজে থেকেই করে ফেললে?”
” কথা কম, কাজ বেশি। ”
সহন তাহমিকে মশারীর বাইরে থেকে ভেতরে নিয়ে শুইয়ে দিলো। নিজে তাহমির একহাত সোজা করে তাতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। তাহমি ঠোঁট টিপে হাসছে।
” কীসের কাজ এখন?”
” কর কর ঢঙ কর। মেয়েদের কাজ তো ঢঙ করাই। তোরা বুঝবি তোদের জামাই জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে তবুও জিজ্ঞেস করবি, কী হয়েছে?

চলবে,

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_৩১
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

” কীসের কাজ এখন?”
” কর কর ঢঙ কর। মেয়েদের কাজ তো ঢঙ করাই। তোরা বুঝবি তোদের জামাই জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে তবুও জিজ্ঞেস করবি, কী হয়েছে?”

সহনের কথায় খিলখিল করে হেসে উঠলো তাহমি। সহন দিলো মুখ ভেংচি তাতে। এজন্যই বলে কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশ। সহনেরও এখন সর্বনাশ হচ্ছে আর তার বউয়ের হাসি দেখে গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে । তাহমি আহ্লাদী হয়ে বললো,
” আহারে বেচারা বর আমার! ”
” এই চুপ কর। কথা বলবি না একেবারে। গায়ের উপর উঠে বস তো আগের মতো। তারপর একটা চুমু খা ঠোঁটে।”
” ছি! কী নির্লজ্জতা, কী নির্লজ্জতা! ”
” তাহমি! বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু…. ”
সহন দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে কথাটি বললো। তাহমি আলতো করে সহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। সহন এক হাত তাহমির পিঠের নিচে ঢুকিয়ে অন্য হাত উদরে রেখে তাহমিকে নিজের শরীরের উপর তুলে নিলো। দু’জন দু’জনার দিকে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ।
” শোন!”
” হ্যাঁ বল। ”
” আজকে ঘুমাতে দে?”
তাহমির কথায় কিছু একটা ছিলো। সহন ‘না’ বলতে পারলোনা। না বলা সমস্যা যেনো চোখের ইশারায় বুঝে গেছে সে।
” ঠিক আছে। তবে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবি।”
” অবশ্যই ডিয়ার বর। ”
” ওকে। শুভ রাত্রি। ”
” মিষ্টি রাত্রি!”
তাহমি হেসে বুকে মাথা রাখল প্রিয়তম স্বামীর। সহনও তাহমিকে বুকে জড়িয়ে নিশ্চিতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

ঘুম ঘুম চোখে বালিশের পাশে হাতড়ে ভাইব্রেট হওয়া ফোনটা হাতে নিলো আয়ান। কার ফোন দেখার মতো হুঁশ না থাকায় এমনি রিসিভ করে কানে লাগাল ফোন। কিন্তু অপরপ্রান্তের থাকা মানুষটির প্রতিক্রিয়া শুনে প্রায় দশ সেকেন্ডের মধ্যে বড়ো বড়ো চোখ করে আশেপাশে তাকিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো আয়ান। বোনের বাড়ি এসেছিল দু’দিন আগে। বোন আর বোনের জামাইয়ের আবদারে থেকে গেছে এই ক’দিন।
” অনিমা কী হয়েছে তোমার? এভাবে হু হু করে কাঁদছ কেন? ”
আয়ান ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। অনিমা কোনো উত্তর না দিয়ে মরার মতো কাঁদতে ব্যস্ত এখনো। আয়ান খুব কষ্ট করে ধৈর্য ধরে চুপ করে আছে। এই মেয়েকে বারবার জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই। নিজে না বললে কান্নার কারণ আয়ানের পক্ষে ধমকে জানা সম্ভব নয়। তাই চুপ করে রইলো মিনিট পাঁচেক। ততক্ষণে অনিমার কান্নার বেগ কিছুটা কমেছে। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে অনিমা,
” আজ দুদিন হয়ে গেলো তোমাকে দেখি না,রাতে জড়িয়ে ধরি না। আমার বুকটা খালি খালি লাগে রে এএএ। আমার এখন কী হবে বলো? আমার আর ভালো লাগে না কেনো?”
খুব করে একটা ধমক দিতে ইচ্ছে করলেও সেটা পারছে না আয়ান। ছোটো মেয়ে ধমক দিলে আবার অন্য ঝামেলা। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে অসুস্থ হয়ে যাবে।
” অনিমা আমি আজকে বিকেলে রওনা হবো। রাতের মধ্যে বাসায় ফিরবো। সেই হিসেবে কালকে আমাদের দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। এবার চোখমুখ ধুয়ে এসো যাও।”
” পরশু! কালকে? না থাক, ঠিক আছে। কিন্তু দেখা হবে? আর কিছু হবে না? আমাকে জড়াবে না বুকে? ”
আল্লাহ! এই মেয়ের অদ্ভুত আচরণে অতিষ্ট হওয়ার যোগাড় হয়েছে আয়ানের। এইটুকু মেয়ের মাথায় সব আঠারো প্লাস চিন্তা সারাক্ষণ! মাঝে মধ্যে আয়ানের ইচ্ছে করে এখুনি বিয়ে করে বিয়ের সাধ ঘুচিয়ে দিতে। আয়ান লম্বা করে শ্বাস নিলো। নিজেকে শান্ত করে বললো,

” তোমার যা যা লাগে সব হবে। ওকে? এখন চুপচাপ ঘুমাও আর আমাকেও ঘুমাতে দাও।”
” ঠিক আছে। লাভ ইউ এন্ড উম্মাহহ।”
” হুম দুই।”
” দুই আবার কী? বলো লাভ ইউ টু। আর একটা পাপ্পি দাও! ”
” উম্মাহ এর চৌদ্দ গুষ্টির তুষ্টি! ”
আয়ান বিরবির করে বললো কথাটা। অনিমা শুনতে পায়নি ঠিকমতো তাই আবারও জিজ্ঞেস করলো। আয়ান চোখ বন্ধ করে কোনোরকমে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো,
” উম্মাহহহ,লাভ ইউ টু, থ্রি, ফোর। টাটা।”
” টাটা। ”
অনিমা কল কাটতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল আয়ান। দিন যত যাচ্ছে অনিমার পাগলামি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে তো তা-ও টিচার ছিলো একটু-আধটু ভয়ডর পেতো মেয়েটা। কিন্তু এখন তো সে ডোন্ট কেয়ার মুডে থাকে সব সময়। যতসব ন্যাকামি মার্কা কার্যকলাপ আছে সবকিছুই করে সে। এজন্যই দামড়া ছেলেদের নিব্বিদের সাথে প্রেম করতে নেই। মনে মনে এসব বলে নিজেকে গালিগালাজ করলো আয়ান। তারপর ফোনটা রেগেমেগে খাটের নিচে রেখে ফের ঘুমানোর চেষ্টা করলো। সকাল পাঁচটা বেজেছে সবে। এখনো ঘন্টা তিনেক ঘুমানোর প্ল্যান আছে আয়ানের। বিকেলের বাসে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিবে। বোনের সংসার বেশ ভালোই চলছে। সেজন্য মনে মনে ভীষণ প্রশান্তি অনুভব করেছে আয়ান।

স্কুল শেষে আজকে একটু বাবার বাড়ি যাবে বলে ঠিক করেছে তাহমি। শরীরটা কেমন লাগছে ক’দিন ধরে। প্রেশার কমে গেছে খুব। মা’কে দেখতে ইচ্ছে করছে হঠাৎ। আয়ান বাড়িতে নেই, মা একেবারে একা ভেবেই বিকেলে যাওয়ার প্ল্যান করেছে তাহমি। সহন একবার বলেছিল ও নিজেও অফিস শেষ করে শ্বশুর বাড়ি যাবে। কিন্তু তাহমি মানা করে দিয়েছে। সব সময় না বলতেই যেতে হবে কেন? যেকোনো জায়গায় নিজের মূল্য বজায় রেখে চলতে হয়। তাই আজকের রাতের মতো বিচ্ছেদ হয়েছে দু’জনার। আসরের আজানের কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহমি তার বাবার বাসায় পৌঁছে গেছে। আয়ানকে কল করেছিল তাহমি। জানিয়েছে সে বাসে আছে। বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত একটা কিংবা দু’টো বাজতে পারে।
” তাহমি সহন এলো না কেনো? কিছু আবার হয়নি তো?”
বসার ঘরে সোফায় বসে আছে মা ও মেয়ে। মায়ের কথায় নড়েচড়ে উঠলো তাহমি। সত্যি বলতে তো কিছু হয়নি। সেসব মাকে বলা স্বত্বেও মা একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
” কিছু হয়নি তাহলে এলোনা কেন? ঝগড়া করে এসেছিস নাকি?”
” আরে না। এমনি আসতে পারি না বলো?”
” পারবি না কেনো? কিন্তু বিয়ের পর কখনো একা আসতে পারবি না। হয় তুই এখনই বাড়ি চলে যাবি নয়তো সহনকে কল দিয়ে আসতে বলবি। মাগরিবের আজান হয়নি এখনো, আরামসে চলে যেতে পারবি তুই।”
মায়ের কথায় চমকাল, থমকাল তাহমি। উনি আসলেই ওর মা? জামাইকে সাথে আনলো না বলে ফেরত পাঠিয়ে দিতে চাইছেন! তাহমি ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললো,
” আসতে বললাম মেসেজ করে সহনকে। এবার ঘরে যাই আমার? ”
” যা গিয়ে বিশ্রাম কর। সহন এলে আমি ডেকে দিবো।”
” দিও।”
তাহমি নিজের ঘরের দিকে এগোলো। বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে আজ। তৃষার বিয়ের পর আজকেই প্রথম এ বাড়িতে এলো তাহমি। ছোটো বোনটার অনুপস্থিতি খুব পোড়াচ্ছে তাহমিকে। যদি আসার আগে কল দিয়ে কথা বলেছে তৃষার সাথে। তবুও চোখে দেখা আর ফোনে কথা বলার মধ্যে অনেক পার্থক্য!

” ভাই আজ জলদি যাচ্ছেন যে? ”
সহনকে অফিস থেকে বের হতে দেখে দারোয়ান সালমান জিজ্ঞেস করলো হেসে। সহন দাঁড়িয়ে গেলো একটু। সহাস্যমুখে বললো,
” শ্বশুর বাড়ি যাবো সালমান ভাই। তুমিও বিয়েটা করে নাও। ”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মলিন হাসলো সালমান।
” সাবধানে যেও তবে। ”
” আচ্ছা সালমান ভাই এলাম।”
সহন বেরিয়ে গেলো অফিস থেকে। সালমান চোখ বন্ধ করে হারানো প্রেয়সীর মুখশ্রী দেখে নিলো একবার। এই পৃথিবীতে সব পুরুষ প্রেয়সীকে হারিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে না। পারে না প্রেয়সীকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব ভাবতে। সালমানও ঠিক সেই ধরনের পুরুষ।

চলবে,

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_৩২
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( প্রাপ্তমনস্কদের জন্য উন্মুক্ত।)

” তৃষা! এই তৃষা! আর কতক্ষণ লাগবে তোমার? ”
” পাঁচ মিনিট! হয়ে গেছে তো।”
অনিক বসার ঘরে কখন থেকে পায়চারি করে যাচ্ছে! স্কাই ব্লু কালারের শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পরে দারুণ লাগছে লোকটাকে। শপিং করতে বেরোবে দু’জন। তৃষার রেডি হতে হতে প্রায় আধঘন্টা পেরিয়ে গেলো। তবুও রেডি হওয়া হলোনা এখনো তার। ছুটির দিন বলেই আজকে অনিকের সাথে বাইরে যাবে বলে ঠিক করেছে তৃষা। ঔষধ নিয়মিত চলছে অনিকের। আগের থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিও হয়েছে বটে। যতটুকু সমস্যা আছে ততটা তৃষা মানিয়ে নিয়েছে। চাইলে সহজেই সমস্যার অযুহাত দিয়ে তৃষা অনিককে ছেড়ে দিতে পারে কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে এতো সহজে কীভাবে ছাড়বে সে? আর যাইহোক, মানুষটা তো ভালোবাসার অভাবেই আজ এরকম হয়েছে। ভালোবাসার কাঙালের মতো বড়ো কাঙাল কি পৃথিবীতে আছে?
” তৃষা! তোমার পাঁচ মিনিট আর শেষ হচ্ছে না আধঘন্টা থেকে। ”
তৃষা হন্তদন্ত হয়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এলো। হোয়াইট এন্ড বেবি পিংক কালারের কম্বিনেশনের থ্রি-পিস পরেছে তৃষা। সাথে ম্যাচিং করে বেবি পিংক কালারের হিজাবও পরেছে। বেচারি এখনো ওড়না নিয়ে টানাটানি করছে ঠিক করার জন্য। সেটা দেখে অনিক ফিক করে হেসে দিলো। তৃষা মুখ বেঁকিয়ে বললো,
” ওমন করে হাসার কী হলো শুনি? ”
” হাসবো না বলছো? ”
” হ্যাঁ একদম হাসবেন না আমার ওড়না ঠিক করা দেখে। দুষ্ট লোক একটা। ”
অনিক তৃষার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওড়নায় হিজাব পিন মেরে দিলো।
” হ্যাঁ বউয়ের কাছে পৃথিবীর সব পুরুষই একটু-আধটু দুষ্ট তো বটেই। তা হলো মহারাণীর? হলে চলুন এগোতে হবে। ”
অনিক হাত সামনে বাড়িয়ে দরজার দিকে ইশারা করে বললো। তৃষা মাথা নেড়ে, “হু।” বলে এগোলো সেদিকে।
এমনিতে শুক্রবারে সব জায়গায় একটু বেশি ভীড় থাকে। ছুটির দিনে সবাই আসে কেনাকাটা করতে, ঘুরতে। তৃষা অনিকের সাথে কথা বলে ঠিক করেছে সামনের সপ্তাহে বাবার বাড়ি যাবে তৃষা। অনিকও যাবে সাথে। সেই জন্য বাবার বাড়ির সবার জন্য ও দিনাদের জন্যই শপিং করতে আসা আজকে। শপিংমলে ঢুকেই প্রথমে শাড়ি কিনতে দাঁড়াল তৃষা। রোগা-সোগা একজন লোক দাঁড়িয়ে, উনি দোকানী।
” মামা ইন্ডিয়ান তন্দুজ জামদানী দেখান তো।”
” ঠিক আছে। ”
দোকানী একের পর এক শাড়ি বের করলো। দেখেশুনে দু’টো শাড়ি পছন্দ করলো তৃষা। একটা নিজের জন্য আরেকটা তাহমির জন্য।
” ঠিক আছে। মামা প্রিন্ট কাঞ্চিভারাম কাতান শাড়ি দেখান কয়েকটা। মায়ের জন্য নিবো তো সুন্দর দেখে দিবেন।”
” আচ্ছা। ”
দোকানী আবারও প্রফেশনাল ভাবে কয়েকটি শাড়ি বের করলেন। যথারীতি পছন্দ করলো তৃষা। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল দামের বেলায়। দোকানদার বললো প্রিন্ট কাঞ্চিভারাম কাতান শাড়ির দাম আড়াই হাজার । তৃষা বলছে দুই হাজার! এরকম কিছুক্ষণ দামাদামি করে নিজের মনমতো দামেই শাড়িগুলো কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো তৃষা ও অনিক। গোটা সময় দোকানে দাঁড়িয়ে অনিক একটা কথাও না বলে বউয়ের দামাদামির ট্যালেন্ট দেখছিল। বাইরে আসতেই মুখ খুললো সে।

” তোমাকে শপিং করতে নিয়ে না আসলে তো জানতে পারতাম না হাজার টাকার জিনিস পাঁচশ টাকায় পাওয়া যায়! ”
তৃষা বিজয়ীর হাসি হেসে বললো, ” তাহলে এরপর থেকে সব সময় আমাকে নিয়ে শপিং করতে বের হবেন। ”
” ঠিক আছে। চলুন মহারাণী, অন্য দোকানে যাই।”

বাকি কেনাকাটা সারতে অন্য জায়গায় যাচ্ছে দু’জন।

আসবে বলার পরেও কেটে গেছে একদিন। আয়ান আসেনি গতকাল রাতে! সেই নিয়ে অনিমার মন খারাপ হয়ে গেছে খুব। রাতের খাওয়াদাওয়া শেষে মন খারাপ করে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করে আছে মেয়েটা। সামনেই রেজাল্ট দিবে এসএসসি পরীক্ষার। সেই নিয়েও একটু-আধটু চিন্তা হচ্ছে তার। তবে বড়ো টেনশনের নাম হলো আয়ান স্যার! হঠাৎ বাড়ির সামনের রাস্তায় নজর পড়লো অনিমার। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান। হাতে সাদা কাগজে কালো কালি দিয়ে লেখা, ❝ আসবো? ❞
অনিমা ভেংচি কেটে ঘরে গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখল আয়ান এরমধ্যে কয়েকবার কল করেছিল। অনিমা ফোন হাতে নিয়ে আবারও বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। কিন্তু সামনে তাকিয়ে আর আয়ানকে দেখতে পেলো না।
” অনিমা!”
হঠাৎ আয়ানকে দেখে চমকে উঠল অনিমা। আয়ান বেলকনির বামপাশে দাঁড়িয়ে আছে হাসি হাসি মুখে। এতো জলদি দেয়াল টপকে পাইপ বেয়ে কীভাবে উঠলো লোকটা?
” তুমি এতো জলদি কীভাবে এলে?”
” যেভাবে তুমি আমার মনে প্রবেশ করেছিলে ঠিক সেভাবে। ”
আয়ান এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়াল অনিমার। অনিমা মুচকি হেসে সময় নিলো না আয়ানের কোলে উঠতে। বাচ্চাদের মতো দু’পাশে পা দিয়ে জড়িয়ে, হাত দিয়ে গলা আঁকড়ে ধরে ঝুলে আছে অনিমা। আয়ান রাগ করলো না। ওভাবেই হেঁটে গিয়ে বিছানায় বসলো। অভ্যস্ত হয়ে গেছে অনিমার এই অদ্ভুত কাজকর্মে। তবুও মাঝে মধ্যে বিরক্ত লাগে কিন্তু আবার না এসেও পারে না। প্রেমের জ্বালা কী সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আয়ান। অনিমা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে। আয়ানও চুপ করে আছে ও কী করে সেটা দেখতে।
” তোমার কি আমাকে কিস করতে ভাল্লাগে না? ”
অনিমা ঠোঁট উল্টে বললো কথাটা। চেহারার অভিব্যক্তি দেখে না হেসে পারলোনা আয়ান। হাসলো মৃদু। ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো অনিমার। অনিমা তাতে টিউব লাইটের মতো জ্বলে উঠলো!
” এই তো করলাম কিস। তুমি আমার আস্ত এক ভালোলাগার রেশ। তোমার সবকিছুই ভালো লাগে। তবে মাঝে মধ্যে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ”
” মেজাজ কেনো খারাপ হবে ভালোলাগা থাকলে?”
” তা-ও ঠিক! ”
আয়ান ভাবনায় ডুবছে এমন মনে হলো অনিমার। ধপাস করে শুইয়ে দিলো আয়ানকে। বুকে নাক ডুবিয়ে ঘষতে শুরু করলো মেয়েটা। আয়ানের সমস্ত শরীরে অজানা শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। আলতো করে কোমর চেপে ধরলো আয়ান। অনিমা তার নাকের গতি বাড়িয়ে দিলো। সাথে হাত দিয়ে আয়ানের চুলগুলো দলাইমলাই করতে লাগলো। কেমন একটা ঘোরের মতো লাগছে আয়ানের। অনিমার খোলা চুলের শ্যাম্পুর ঘ্রাণে অন্য রকম কিছু ফিল হচ্ছে আজ। কিন্তু আয়ান নিজেকে সামলে নিলো। আলগা করে দিল কোমরের চাপ। অনিমা মাথা উঁচিয়ে তাকাল আয়ানের দিকে।
” কী হলো? ছাড়লে কেনো?”
” ধরাধরি ভাল্লাগে খালি? ঠিকঠাক মতো ধরলে সহ্য করতে পারবে?”
” সরো তুমি। ভাল্লাগে না বাল। সব সময় এমন করো বাল। ধুর বাল!”
অনিমার হতাশা দেখে আয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটু। আর তাতেই অনিমা গেলো আরো ক্ষেপে। হঠাৎ করে এগিয়ে এসে ঠোঁটে আলতো করে কামড়ে দিলো মেয়েটা। আয়ান বরফের মতো জমে গেছে যেনো। পুরুষ মানুষ! মেয়ে হয়ে এতো আশকারা দিলে সামলানোর ক্ষমতা থাকে কতক্ষণ?

” অনিমা কাছে আসলেই এসব না করে সুন্দর করে কথা বলতে পারো না? মাঝে মধ্যে তো গানও শোনাতে পারো?”
অনিমা উঠে বসেছে। আয়ান শুয়ে আছে। কী মনে হলো মেয়ের,হঠাৎ করে হাসতে লাগলো। আয়ান গেলো ঘাবড়ে! কে জানে এই পাগলি কীসের জন্য হাসছে।
” গান শুনবে?”
আগ্রহসহকারে জিজ্ঞেস করলো অনিমা। আয়ান শান্তভাবে বলে,
” হ্যাঁ। তবে আস্তে আস্তে। তোমার বাবা যাতে না শোনে। আমাদের এভাবে সময় কাটানো মোটেও ভালো নয়।”
অনিমা আয়ানের শেষের কথাগুলো জাস্ট পাত্তা না দিয়ে গান গাইতে শুরু করলো।

এক দিন একলে দ্য হাম-তুম
তুম মুজামেন মেন তুম্মে গাম
এক দিন আকেলে দ্য হাম-তুম
তুম মুঝামেন মেন তুম্মে গাম
মেরে কানন মে আহিস্তা সে
আস রোজ কাহা থা জো তুমনে
কিসি অর সে না ভো কেহনা
তুম মেরে হো মেরে রাহানা
তুম মেরে হো মেরে রাহানা
তুম সাথ মেরা হারদম দেনা
তুম মেরে হো মেরে রাহানা……

চলবে,