স্রোতস্বিনী পর্ব-০২

0
281

#স্রোতস্বিনী
#মুগ্ধতা_রাহমান_মেধা
পর্ব ০২

গাড়িতে পিনপতন নীরবতা,চলছে নিজ গন্তব্যে।গন্তব্য স্রোতের বাসা।স্রোত বাহিরে তাকিয়ে আছে।দেখে মনে হচ্ছে সে এই ব্যস্ত শহর,শহরের মানুষ,যানবাহন গুলোকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে।কিন্তু তার মনোযোগ অন্যদিকে।সে ভাবছে তার কি করা উচিত।আজকে এটা বুঝে গিয়েছে যে বিয়ে তাকে করতে হবে,আর এই বদলোকটাকেই করতে হবে।তখনই মেহরাদ গলা ঝাড়ি দিয়ে স্রোতের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো।স্রোত একটু নড়েচড়ে বসলে মেহরাদ বললো,

“আপনাকে লজ্জা পেলে কিন্তু দারুণ লাগে, স্রোতস্বিনী।ইচ্ছে করে ছুয়ে দিই।আচ্ছা স্রোত,আমি যদি তোমাকে একটু ছুয়ে দিই,তুমি কি বেশি রাগ করবে?”

শেষের কথাটায় যেনো কিছু ছিলো,স্রোত থমকে গেলো।মেহরাদ কি তাকে “তুমি” বলে সম্বোধন করলো?সবাই তো স্রোত বলে ডাকে,কই কখনো তো এমন লাগে নি।নেশাক্ত কিছু মেশানো ছিলো নাকি ঐ কন্ঠে?

“কি ভাবছেন?স্রোতকে অন্যমনস্ক দেখে মেহরাদ জিজ্ঞাসা করলো।
স্রোতের ধ্যান ভাঙ্গতেই আমতা আমতা বললো,
” কই কিছু না।”

স্রোত নিজেই নিজের কান্ডে অবাক,যে স্রোত কোনোদিন কাউকে পাত্তা দেয় নাই,সে কিনা এই লোকের কথায় গলে যাচ্ছে,হারিয়ে যাচ্ছে,স্ট্রেঞ্জ!
গাড়ি থামলো স্রোতের বাড়ির সামনে।স্রোত নামতে নিলেই মেহরাদ বললো,
“আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না”
“কোন প্রশ্ন?”
“আমি আপনাকে ছুয়ে দিলে কি আপনি রাগ করবেন?”
স্রোত এই প্রশ্নটা আবার আশা করে নি হয়তো।সে রাগী চোখে তাকিয়ে বললো,
“অ সভ্য লোক”
মেহরাদ জোরে জোরে গা দুলিয়ে হাসতে শুরু করলো।স্রোত চোখ ছোট ছোট করে মেহরাদের হাসি দেখছে, মানুষের হাসির শব্দও এতো সুন্দর জানা ছিলো না।পরে নিজের ভাবনায় নিজেই বিরক্ত হয়ে “ধ্যাত” বলে বাড়ির ভিতরে চলে গেলো।তারপর মেহরাদও বাড়ির উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলো।

সিরাজ সাখাওয়াত এবং লায়লা সাখাওয়াতের ২ মেয়ে।বড় মেয়ে স্রোতস্বিনী আর ছোট মেয়ে মান্ধবী। স্রোতস্বিনী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের স্টুডেন্ট আর মান্ধবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষের স্টুডেন্ট। ৪ বছর আগে ওদের মা লায়লা সাখাওয়াত লিভার কেন্সারে আক্রান্ত হয়ে মা রা যান।সিরাজ সাখাওয়াত বদমেজাজি মানুষ ছিলেন।উনার মতে মেয়েদের জন্মই শুধু ঘর সংসারের কাজ করা।স্রোতস্বিনী আজকে এই জায়গায় তার সম্পূর্ণ ক্রেডিট তার মায়ের।তার মায়ের ইচ্ছে ছিলো ২ মেয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে।স্রোত যখন ১ম বর্ষে তখন তার মা মারা যায়।তখন থেকেই তার সাথে তার বাবার দূরত্ব বাড়ে।সে মনে করে তার বাবার জন্যই মা বেশিদিন বাঁচতে পারেনি।সিরাজ সাহেবি স্ত্রীর মৃত্যুর পর বদলে গেছেন। চুপচাপ থাকেন,কারো সাথে রাগারাগী করা তো দূরের কথা প্রয়োজনের বেশি কথাই বলেন না,নিজের মতো থাকেন,মেয়েদেরকে সাপোর্ট করেন।কিন্তু স্রোত উনার থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।মান্ধবী পরেছে ঝামেলায়,বাবা-মেয়ের এই নিরব যুদ্ধে সে সেতুর মতো কাজ করে।সে বুঝে বাবা বদলে গেছেন।

[অতীত]
গত পনের দিন আগে স্রোত তার বান্ধবী রিমা আর নুড়ির সাথে কলেজ যাচ্ছিলো।তার চোখের সামনেই একটা সিএনজি এসে একজন মহিলাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। মহিলাটি রাস্তায় পড়ে যায়।স্রোত দৌড়ে উনার কাছে গিয়ে দেখে উনি সেন্সলেস হয়ে গেছেন। মহিলার বয়স পঞ্চাশোর্ধ হবে।পরনে দামী শাড়ী,গলায় মুক্তোর মালা,কানেও ম্যাচিং মুক্তোর দুল,স্রোত বুঝলো উনি একজন ভালো উচ্চবিত্ত ফ্যামিলির সদস্য।স্রোত আর ওর বান্ধবীরা মিলে উনাকে ওদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেয়।উনার জ্ঞান ফিরতে দেরী হবে শুনে ওরা চলে যায় ক্লাসে।আড়াই মাস পরে প্রফ,এখন খুবই ব্যস্ততার সময় যাচ্ছে ওদের।ইম্পোর্টেন্ট একটা ক্লাস করে স্রোত হসপিটালে চলে আসে।ক্লাসে ওর মন বসছিলো না,ঐ মহিলার জ্ঞান ফিরলো কিনা।তাই সে চলে আসছে।ক্লাস নোটস অন্যদের থেকে রাতে নিয়ে নিবে। হসপিটালে এসে জানতে পারে ঐ মহিলার জ্ঞান ফিরেছে,মাথায় আর হাতে ব্যান্ডেজ করা।স্রোত উনার কাছে গেলে নার্স বলে,
“কোথায় গেছিলেন আপনি?জ্ঞান ফিরে কি জ্বালানোটাই জানাচ্ছিলেন। উনি নাকি বাড়ি যাবেন।এই অবস্থায় কিভাবে একা বাড়ি যাবেন।অনেক কষ্টে শান্ত করে ঘুম পাড়িয়েছি।নাহয় মাথায় আরো প্রেশার পড়তো। ”
“আচ্ছা,আপনি যান।আমি আছি এখানে।” বলে মহিলাটির পাশে বসে পড়লো স্রোত।
মহিলাটির মুখের দিকে তাকি রইলো স্রোত।কি মায়াভরা চেহারা উনার,ঠিক স্রোতের মায়ের মতোন।উনাকে দেখে স্রোতের তার মায়ের কথা মনে পড়লো।লায়লা বেগম সহজ সরল, হাসিখুশি মানুষ ছিলেন।জীবনে দুঃখ কষ্টকে তিনি পাত্তা দিতেন না।বলতেন,”একদিন সব ঠিক হয়ে যাবো”
স্রোত তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে বিড়বিড়িয়ে বললো,
“মা,সব তো ঠিক হলো,কিন্তু তুমি দেখে যেতে পারলে না”

“এই মেয়ে কাঁদছো কেনো?”মহিলাটি জিজ্ঞাসা করলো।
মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে স্রোত খেয়াল করে নি উনার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে।চোখের পানি মুছে হেসে বললো,
” না আন্টি তেমন কিছু না।মায়ের কথা মনে পড়ছিলো।তো আপনি কেমন আছেন এখন?কি জন্য রাস্তার মধ্যে যাচ্ছিলেন বলুন তো।আরেকটু এদিক ওদিক হলে কি না কি হয়ে যেতো।”
মহিলাটি যেনো স্রোতের শেষের কথা শুনলেনই না।জিজ্ঞাসা করলেন,
“তোমার মা নেই?”
“নাহ,চার বছর আগে আমাদের ছেড়ে অচিনপুরে চলে গেছেন,যেখান থেকে আর কখনো ফিরবেন না।”
“বাসায় কে কে আছে তোমার?”
“বাবা,ছোট বোন আর আমি।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্রোত উত্তর দিলো।
কথোপকথনে জানা গেলো মহিলার নাম বনলতা চৌধুরী। উনি ঐখানে কোনো এক কাজে এসেছিলেন। উনার স্বামী শাহজাহান চৌধুরী একজন ডাক্তার ছিলেন,গত হয়েছেন ১০ বছর আগে।উনার এক ছেলে এক মেয়ে।ছেলে বড়,মেহরাদ সাদাফ চৌধুরী , বাংলাদেশ আর্মিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত,চট্টগ্রামে।আর মেয়ে মাহিরা হাসবেন্ডের সাথে কানাডাতে সেটেল্ড। উনাদের বাড়িতে উনি এখন একাই থাকেন,উনার দেখাশুনা করার জন্য একটা মেয়ে থাকে। স্রোত উনার থেকে বাড়ির লোকের নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করে।কথার ছলে মহিলাটিও স্রোত সম্পর্কে ডিটেইলসে সব জেনে নিলেন।স্রোতের মনে হলো বনলতা আন্টি তার প্রতি একটু বেশিই আগ্রহ দেখিয়েছেন।পরে আবার ভাবলো হয়তো সে উনাকে সাহায্য করায় জানতে চেয়েছে।তাই এতো পাত্তা দেয় নি। এক পর্যায়ে স্রোত উনার ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে দিলো,খাইয়ে দিলো।তারপর অনেক্ষণ গল্প করে। এর মধ্যে বনলতা চৌধুরীর ভাই নোলক সাহেব আর উনার ওয়াইফ মাধবী বেগম আসেন।সন্ধ্যা হয়ে গেলে স্রোত ওনাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় আর বলে কালকে আবার আসবে।মাথায় আঘাত পাওয়ায় ডাক্তার বলেছেন আরো দুই একদিন হাসপাতালে থাকতে।
স্রোত চলে গেলে বনলতা চৌধুরী উনার ভাইকে জিজ্ঞাসা করেন,
“মেয়েটাকে কেমন লেগেছে তোমাদের?”
“আমরা যা ভাবছি তুমিও কি তাই ভাবছো?”হেসে জিজ্ঞাসা করলেন নোলক সাহেব।
” একদম,খুব মানাবে ওদের তাই না?”
“খাপে খাপ” বলে হেসে ফেললেন নোলক সাহেব।
মাধবী বেগম পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই জমজ ভাই বোনের কান্ড দেখে যাচ্ছেন।এরা যেকোনো অবস্থাতেই মজা করবেন।কে বলবে ওদের এতো বয়স আবার একজন অসুস্থ?

#চলবে…