অন্তরালের অনুরাগ পর্ব-২০+২১

0
1451

গল্পঃ #অন্তরালের_অনুরাগ
লেখনীতেঃ #নাহিদা_নীলা
#পর্বঃ ২০

নীলাদের আজ বাংলাদেশে ফিরবার দিন। কিন্তু ফ্লাইটের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা সৌন্দর্যে ঘেরা দার্জিলিয়ের আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখল।
সিঙ্গালিয়া ন্যাশনাল পার্ক, শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেল্প সেন্টার, আভা আর্ট গ্যালারি, শতবর্ষের প্রাচীন দিরদাহাম টেম্পল, গঙ্গামায়া পার্কসহ দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের মার্কেটে তারা টুকটাক কেনাকাটা করল। এখানে শীতের পোশাক, হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ লেদার জ্যাকেট, নেপালি শাল এবং শাড়িসহ অ্যান্টিক্স ও গিফট আইটেম লেদার সু, সানগ্লাস ইত্যাদি পাওয়া যায়।
তাদের সবাইকে চমকে দিতে সাদিদ রাতের খাবারের সময় আরও একটি কথা বলে উঠেছিল। তারা যাবার সময় মিরিকও দর্শন করবে।
সেটাতে প্রবলেম ছিল না। কিন্তু একটা কথায় তানবীর-অর্ণব বারবার তুলেছিল যে, সময় কুলিয়ে উঠতে পারবে কি-না? কিন্তু সাদিদও এককথায় বলেছিল,

— ‘ দেখি না কতটুকু সম্ভব হয়। দার্জিলিং শহরটাই তো এমন। আমরা ১৫ দিনের ভ্রমণে আসলেও যাবার সময় মনে হবে সময়টা কম হয়েছিল। এককথায় দার্জিলিং ঘুরে দেখার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হচ্ছে সময়। কেননা এখানে এতএত দেখার জিনিস রয়েছে যে ঘুরে শেষ করা সময়সাপেক্ষ। তাই আমাদের এই অল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু ওদেরকে দেখাতে পারি ততটুকুই লাভ। ‘

সাদিদের এই কথার পর তারা আর দ্বিমত করেনি। তারাও তো আবারও একবার সৌন্দর্যে ঘেরা মিরিক দেখতে আগ্রহী। যেহেতু তাদের ফ্লাইট সন্ধ্যায় তাই তাড়াতাড়ি রউনা দিলে ঘুরে দেখা হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি আগ্রহী তাদের সাথের বাকি তিনজন মেয়ে। তারা ইতিমধ্যে দার্জিলিয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছে। এখন আবার মিরিক। তাদের তো রীতিমতো খুশি প্রকাশে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আনন্দে-উৎসাহে দিশেহারা।
কিন্তু দার্জিলিং শহরকে ছেড়ে আসার সময় নীলার চক্ষু অশ্রুজলে টইটম্বুর। সাদিদ তার অবস্থা দেখে তাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলো। মাথায় চুমু দিয়ে বলল,

— ‘ পাখি, মন খারাপ করে না। আমরা আবারও দার্জিলিং আসব। তখন আরও বেশি সময় হাতে নিয়ে আসব। নতুন অনেক কিছু দেখতে পারবে। এখন আর মন খারাপ করে না। ‘
— ‘ ইচ্ছে করে করছি না। এমনিতেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ‘

সাদিদ নীলার কথায় হাসল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার মনটা ভালো করার চেষ্টাতে লাগল। আসলেই দার্জিলিং জায়গাটাই এমন যে ছেড়ে যাবার সময় না চাইতেও মন খারাপ হতে বাধ্য।

দার্জিলিং থেকে মিরিকের দূরত্ব ৪৯ কিমি (৩০ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে। সাদিদরা মিরিকে এসে গাড়ি থেকে নামল। মিরিকের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে সুমেন্দু লেক। সাদিদরা সেখানে যাবে বিধায় পাশের হোটেলে রুম বুক করল। কেননা তারা একেবারে দার্জিলিয়ের হোটেল থেকে চেক আউট করে বেড়িয়ে গিয়েছে।
সাদিদরা এখানে বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু যতটুকু সময় আছে নিজেদের ব্যাগপত্রগুলো রাখার জন্যই মূলত হোটেল রুম বুক করা। সুমেন্দু লেকের অপরপ্রান্তে অনেকগুলি হোটেল ও রেস্তোরাঁ আছে। তাই রুম নিয়ে সমস্যা হলো না। নীলার মনটা এতক্ষণ খারাপ থাকলেও মিরিকের সৌন্দর্য দেখে তাতে ভাটা পড়ল।
তারা সবাই অল্প সময়ে মিরিকের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে লেগে গেল। সাদিদ-নীলা সামনে মাঝখানে অর্ণব-প্রিয়তী আর তার পিছনে হাঁটছে তানবীর-শান্ত।
শান্ত আশেপাশে দেখতে দেখতে সামনের একটা ইটের টুকরোর সাথে হুঁচট খেল। হালকা ব্যাথায় সে মৃদু ব্যাথাজনক আওয়াজ করল। তানবীর তার পিছনেই আসছিল। তাই দ্রুত শান্তর দিকে এগিয়ে আসলো।

— ‘ কি হয়েছে? ‘

শান্ত ততক্ষণে ব্যাথায় মাটিতে বসে গিয়েছে। তানবীরও এবার হাঁটু ভাজ করে শান্তর সাথে মাটিতে বসে পড়ল। শান্তর পায়ে হাত দিতে গেলেই সে দ্রুত সরিয়ে নিলো।

— ‘ কি করছেন? ‘
— ‘ দেখছি কতটা ব্যাথা পেয়েছ। ‘
— ‘ তেমন কিছু হয়নি। আপনি পায়ে হাত দিবেন না। ‘

তানবীর বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে নিলো। শান্ত-তানবীরকে মাটিতে বসতে দেখে সাদিদরাও পিছিয়ে আসলো।

— ‘ কি হয়েছে তানবীর? ‘
— ‘ আমি নিজেই তো জানি না কি হয়েছে। এই ন্যাকা মেয়ে দেখতেই তো দিচ্ছে না। ‘
— ‘ দেখছেন আমি ব্যাথা পেয়েছি। আর আপনি এখনও আমার সাথে ঝগড়া করছেন? ‘
— ‘ কিছু লোকের জন্ম-ই হয় ঝগড়া করা এবং সহ্য করার জন্য। তুমিও তাদের দলের-ই লোক। ‘

শান্ত ভ্রুজোড়া বাঁকা করে তানবীরের দিকে তাকালো। চোখ-মুখ তার রাগে-বিরক্তিতে তেতে আছে। তানবীর সেসবকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে জোরপূর্বক তার পা টেনে ধরল। শান্ত আবারও বাধা দিতে চাইলে সে এবার চোখ গরম করে তাকালো। তার চোখে কিছুতো একটা ছিল যার ধরুন শান্ত বাধা দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু কি ছিল?
অধিকারবোধ? কিন্তু কি জন্য? শান্তর উপর তার কিসের অধিকার!
নীলাও শান্তর পাশে বসে পড়েছে। ব্যাথা বেশ ভালোই পেয়েছে। বুড়ো আঙ্গুলের নখটা উল্টে গিয়েছে।

— ‘ ওর ড্রেসিং লাগবে। তোরা লেকের পাড় ঘুরে দেখ। আমি তাকে নিয়ে হোটেলে ফিরছি। সেখানে ড্রেসিয়ের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ‘

শান্তর আসলেই অনেক যন্ত্রণা হচ্ছে। তাই তানবীরের কথার পিঠে আর কিছু বলতে পাড়ল না। তানবীর তাকে উঠার জন্য সাহায্য করল। নীলাও তার পিছু যেতে চাইলে সাদিদ তাকে বাধা দিলো। নীলা অবাক চোখে তাকালো।

— ‘ আমি যাব তো। হাত ছাড়ুন। ‘

সাদিদ নিচের ঠোঁট কামড়ে হাসল। নীলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

— ‘ ওদেরকে একা ছেড়ে দাও। তাদের মধ্যে যাওয়া উচিত হবে না। ‘
— ‘ কেন? শান্ত ব্যাথা পেয়েছে। আর আপনি বলছেন আমি যাব না? ‘
— ‘ বোকা মেয়ে, যেতে মানা করছি না। কিন্তু এখন যেতে বারণ করছি। আর তাছাড়া তানবীর তো সাথে রয়েছে। শান্তর কোনোরকম সমস্যা সে হতে দিবে না। এটুকু আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলছি। ‘

নীলা নিচের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সাদিদের কথাটা সে মানতে চাইছে। কিন্তু বোন সমতুল্য বান্ধবীর জন্য হৃদয়ে নিশপিশ করছে। সাদিদও তার প্রাণপাখির মন বুঝতে সক্ষম। কিন্তু তার এখন হাসিও পাচ্ছে। নীলা এত অবুঝ কেন? সাদিদ শিউর না হয়ে তাকে কিছু জানাতে চায় না৷ কিন্তু সাদিদের মন এবং মস্তিষ্ক বলছে তার অনুমানটাই সঠিক হবে। কিন্তু তারপরও সে আগে তানবীরের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক। তাই সে নীলাকে আগলে বুকে নিয়ে আসলো। তার থুতনিতে ধরে মুখটা উঁচু করে বলল,

— ‘ মন খারাপ? ‘
— ‘ না ঠিক আছি। ‘
— ‘ কিন্তু মুখতো অন্য কিছু বলছে। ‘

নীলা উত্তর না দিয়ে নতজানু হতেই সাদিদ হাসল। তাকে একহাতে জড়িয়ে নিয়ে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— ‘ আমার উপর বিশ্বাস রাখ। শান্তকে নিয়ে চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তার খেয়াল তানবীরের থেকে বেশি আর কেউ রাখতে পারবে না৷ ‘

সাদিদের কথাটাতে আত্মবিশ্বাসের কমতি ছিল না৷ তাই নীলাও এবার স্বাভাবিক হলো। সাদিদের সাথে পা মিলিয়ে মিরিকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে লাগল।

_______________

তানবীরের দিকে তাকাতেই শান্তর লোমকূপ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। একটু আগে কি করল সে? শান্ত নিজের শরীরের দিকে তাকাতেই আবারও একদফা কেঁপে উঠল। সে একহাতে কোমড় স্পর্শ করল। হ্যাঁ ঠিক এই জায়গাটাতেই তো তানবীর বলিষ্ঠ হাতে চেপে ধরেছিল। বুনেছিল শান্তর পাগলাটে মনে শত নাম না জানা অনুভূতির খেলা।
তখন শান্ত একপা উঁচু করে সামনের দিকে হাঁটছিল। কিন্তু বেসামালভাবে পড়ে যেতে ধরতেই তানবীর দ্রুত তাকে ধরে ফেলেছিল। ব্যালেন্স রাখতে গিয়ে একহাতে ধরেছিল শান্তর কোমড়। দুইজনের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ একে অপরের ছিল খুব নিকট। যার ফলে দুইজনই জর্জরিত হয়েছিল নতুন ভিন্ন এক অনুভূতিতে।
তানবীরের খেয়াল আসতেই সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছিল। তারপর হোটেল রুমের বাকি রাস্তাটুকু সে শান্তকে একহাতে জড়িয়ে নিয়েই এসেছে। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত শান্ত চোরা দৃষ্টিতে তানবীরকে দেখছে। চলমান পরিস্থিতিতে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তাই মাথা নিচু করে সে অনবরত নখ দিয়ে বিছানার চাদরে আঁকিবুঁকি করছে।
অপরদিকে তানবীরের সেসবে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই৷ সে নিজের পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শান্তর পায়ে ভায়োডিন লাগিয়ে ড্রেসিং করছে। হঠাৎ পায়ে ব্যাথা লাগতেই শান্ত চোখ-মুখ কুঁচকে মুখ দিয়ে ব্যাথাজনক শব্দ করল। তানবীর দ্রুত হাত থামিয়ে মুখ এগিয়ে ফুঁ দিতে লাগল।

— ‘ ঠিক আছ? ‘
— ‘ জ্বি। ‘

বলেই শান্ত আবারও নতজানু হলো। তানবীরের দিকে সত্যিই আর তাকানো যাচ্ছে না। লজ্জারা এসে আচমকাই তাকে ঘিরে ধরেছে।
তানবীর শান্তর পায়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হোটেলের স্টাফদের থেকে সুবিধা করে সে ব্যাথানাশক ঔষধও নিয়ে নিয়েছে। তাই ঔষধ এবং পানির গ্লাসটা শান্তর দিকে এগিয়ে দিলো।

— ‘ খাও। ‘

ব্যস এতটুকুই। কিন্তু শান্ত বিনাবাক্য ঔষধ খেয়ে নিলো। সবসময় এই ছেলেটার সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা মেয়েটা আজ পুরোপুরি চুপসে গিয়েছে। লজ্জারা তার ঝগড়ুটে মনোভাবকে পরাজিত করেছে। শান্তকে ঔষধ খাইয়ে তানবীর নিজের ফোন হাতে নিলো।

— ‘ হ্যাঁ কই তোরা? ‘
— ‘ _____________
— ‘ আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তোরা ঘুরে দেখে নে। আমরা রুমেই আছি। ‘
— ‘ ______________
— ‘ না এখন ব্লিডিং অফ হয়েছে। কিন্তু হাটাহাটি করলে ব্যাথা পেতে পারে। তাই রুমে থাকলেই ভালো হবে। ‘
— ‘ ______________
— ‘ আচ্ছা প্রয়োজন হলে জানাব। ‘

তানবীর ফোন রেখে শান্তর দিকে তাকাতেই তার ভ্রুজোড়া কুঁচকে এলো। কেননা শান্ত চোখ বড় বড় করে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। ভাবটা এমন যে, যেন সে সাক্ষাৎ ভূত দেখেছে। তানবীর ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল,

— ‘ কি হয়েছে? এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছ কেন? ‘
— ‘ আমি এখনই বাহিরে চলে যাব। ইচ্ছে হলে আপনি রুমে বসে থাকেন। আর ইচ্ছে হলে ঘুমিয়েও থাকতে পারেন। ‘
— ‘ বেশি কথা বললে আছাড় মেরে সুমেন্দু লেকে ফেলে দিব৷ ‘
— ‘ আমি বোধহয় চেয়ে চেয়ে আপনার মুখ দর্শন করব? আছাড় না দিতে পারি ধাক্কা মেরে অবশ্যই ফেলে দিব। ‘
— ‘ ওহ তাই? আচ্ছা তাহলে দেখাই যাক কে কাকে ফেলে। ‘

বলেই তানবীর জ্যাকেটের হাতা গুটিয়ে সামনে এগিয়ে আসতেই শান্ত কিছুটা পিছিয়ে বসল। শুকনো ঢুক গিলে দ্রুত বলে উঠল,

— ‘ প্লিজ, প্লিজ না। আপনি এমন করছেন কেন? আমরা আজকেই চলে যাব। তাই মিরিকের মতো এমন একটা জায়গায় এসে কি বসে থাকা যায়? প্লিজ একটু বুঝার চেষ্টা করুন৷ আমি মিরিকটা ঘুরে দেখতে চাই। ‘

তানবীর বোধহয় এবার কিছুটা দমল। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ভ্রু কুঁচকে ভাবতে লাগল। খানিক সময় পর চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল,

— ‘ তুমি পারবে? কষ্ট হবে না? ‘
— ‘ আমি পারব। প্লিজ যেতে দিন। ‘
— ‘ আচ্ছা। তাহলে তোমার কথায় রাজি হতে পারি। কিন্তু আমার একটা শর্ত রয়েছে। ‘
— ‘ আমি সব শর্তে রাজি। ‘

শান্তর চোখে-মুখে খুশি দেখে তানবীরেরও ভালো লাগল। তার ঠোঁটের কোণেও ফুটে উঠল হাসির রেখা।
শান্ত হাসিমুখে রাজি হলেও তার ঠোঁটের কোণে সেটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কেননা তানবীর এমন আজব একটা শর্ত দিয়েছে যেটা শান্তর ভাবনার বাহিরে। সে দাঁতে দাঁত চেপে তানবীরের হাত ধরে রয়েছে। আর তানবীর একহাতে তার পিঠ জড়িয়ে সামনে হেঁটে যাচ্ছে। সে শান্তর চোখ-মুখের ইতস্ততবোধ লক্ষ্য করেছে। কিন্তু সে নিরুপায়। শান্তকে সে এই অবস্থায় কোনোভাবেই একা চলতে দিবে না৷ তাদেরকে আসতে দেখে এবার সাদিদরাও উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ দুই কাপল যুগল লেকের পাশেই বসে সময় কাটিয়েছে। তানবীরকে এভাবে শান্তর সাথে দেখে সাদিদ অর্ণব একে-অপরের দিকে তাকালো। কেউ হয়তো তাদের দুজনের হাসিমুখের কারণ বুঝতে পাড়ল না। কিন্তু দু’জনের মুখেই ছিল বর্ণনাবিহীন মিষ্টি হাসি।

তারা সবাই এবার সামনের পথে পা বাড়াল। প্রিয়তী-অর্ণব সামনে সাদিদ-নীলা মাঝে এবং তানবীর শান্তকে নিয়ে পিছনে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে৷ আর সে তীক্ষ্ণ চোখে বারবার শান্তর হাঁটার রাস্তা পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ভাবটা এমন যে আবারও কোনোরকম ব্যাথাজনক যন্ত্রণা তানবীর তাকে সহ্য করতে দিবে না। তারা সবাই-ই নিজস্ব জায়গা থেকে মিরিকের সৌন্দর্য উপভোগ করছে।
মিরিক মূলত ভ্রমণপিপাসুদের মানচিত্রে নিজের জায়গা করে নিয়েছে তার আবহাওয়া, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং যাতায়াতের সুব্যবস্থার জন্য। সুমেন্দু লেক এখানকার প্রধান আকর্ষণ। ৫,৮০০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ি শহরের বুক চিতিয়ে শুয়ে আছে এই সুমেন্দু হ্রদ। যার একদিক বাগান এবং অন্যদিক পাইন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। সুদীর্ঘ পাইনের বনানী আর তার ছায়া এসে পড়ে লেকের টলটলে জলে। দেখে মনে হবে যেন একটা মায়াঘেরা জায়গায় এসে পড়েছি।
এই দুটিকে একসঙ্গে যুক্ত করছে পায়ে হাঁটা খিলান সাঁকো ইন্দ্রেনি পুল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট। লেকটিকে ঘিরে থাকা সাড়ে তিন কিমি লম্বা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সূদূর দিগন্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ ভ্রমণার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। লেকের জলে নৌকাবিহার এবং টাট্টু ঘোড়ায় চেপে লেকের চারপাশ প্রদক্ষিণ করায় আছে এক অনাবিল আনন্দ।
সাদিদরা লেকটা ঘুরে দেখে নৌকায় উঠার প্ল্যান করল। নীলাতো সেই খুশি। কেননা সে বরাবরই পানি পাগল।
তারা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে লেকের পানিতে নৌকায় চড়ল। তারা যেহেতু ঘোড়ায় চড়বে না তাই তারা নিজেদের পরবর্তী প্ল্যানের পথে হাঁটল।
তানবীর হাঁটতে হাঁটতে আবারও বলল,

–‘ ব্যাথা করছে? ‘

শান্ত চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তাকালো। কেননা সে আর কতবার এই একই প্রশ্নটার উত্তর দিবে? সে বুঝতে পাড়ছে না এই ঝগড়ুটে ছেলের তার উপর হঠাৎ এতে কেয়ার কিভাবে জেগে উঠল!
শান্তর উত্তর না পেয়ে তানবীর হাঁটা থামিয়ে দিলো৷ আবারও বলল,

— ‘ বলছ না কেন? ব্যাথা করছে? ‘
— ‘ আর কয়বার বলব? ‘
— ‘ আমি যতবার জানতে চাইব৷ ‘

ইশশ কি নির্লিপ্ত উত্তর। শান্ত রাগীভাব নিয়ে হেঁটে যেতে নিতেই তানবীর এসে তার হাত টেনে ধরল।

— ‘ শর্ত কি ভুলে গিয়েছ? ‘
— ‘ আমার কিন্তু এবার সত্যিই ইচ্ছে করছে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিতে। ‘
— ‘ ভালোই হবে। তোমার মতো ঝগড়ুটের সাথে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি। খানিকটা রিলেক্স হওয়া যাবে। ‘
— ‘ আপনি একটা অসহ্য। ‘
— ‘ তোমার লেবেল ক্রস করা পসিবল নয়। তুমি মাত্রাতিরিক্ত। ‘
— ‘ নিজে মেয়েদের মতো পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেন। অথচ আমাকে আবার ঝগড়ুটে বলেন? ‘
— ‘ আমি খুবই ভালো ছেলে। সঙ্গ দোষে বদ হয়ে যাই৷ ‘
— ‘ আপনি কি কোনোভাবে আমাকে বদ বলছেন? ‘
— ‘ আমি কখনোই এমনটা বলিনি। কিন্তু তুমি বোধহয় এমনটা শুনতে চাও। বলব নাকি, বদের হাড্ডি? ‘

শান্ত রেগে ঝাড়া মেরে তানবীরের হাতটা সরিয়ে দিলো। তানবীর নিঃশব্দে হেসে আবারও তাকে আগলে ধরল। শান্ত রাগ মাথায় নিয়েই তার সাথে হাঁটতে লাগল। বলে যেহেতু লাভ নেই, তাই আপাতত চুপ থাকা শ্রেয়।
সাদিদরা সুমেন্দু লেক ছাড়িয়ে দূরে পাহাড়ের মাথায় চলে আসলো। এখানেই রামেতি ভিউপয়েন্ট। মেঘ না থাকলে এখান থেকেই দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। আজকের আকাশ মেঘমুক্ত। বেশ রৌদ্র ঝলমলে। তাই তারা সবাই এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য দেখা থেকে বাদ পড়ল না।
কি অপূর্ব দৃশ্য! না দেখলে বিশ্বাসই করা যাবে না যে প্রকৃতি আপন খেয়ালে নিজের রূপ-রং-গন্ধ কী ভাবে বদলাচ্ছে। দুপুরের শেষভাগের সোনারোদ চলকে পড়ছে সেই পবিত্র শিখরচুড়োর শরীরে। এই অপরূপ শোভা যে কারও মন ভরিয়ে দেবে। আর পাহাড়ের গায়ে মখমলি সবুজ চা বাগানের ঢেউ যেন এক কথায় অনবদ্য।
নীলা আবেগপ্রবণ হয়ে আনন্দে মুখে হাত চেপে ধরল। সাদিদ হেসে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রাখল। পাশ থেকে নীলার আনন্দ অশ্রু দেখে হাসতে হাসতে বলল,

— ‘ বউ, এত চোখের জল কোথায় থেকে আসে? ‘

নীলা মাথা নিচু করে লাজুক হাসল। আঙ্গুল দিয়ে চোখের জলটা মুছিয়ে নিয়ে বলল,

— ‘ কি করব বলেন? মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ হয়ে যাই৷ সবকিছু এত মনোমুগ্ধকর কেন? এত সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ কেন? ‘
— ‘ যার চোখ সুন্দর তার কাছে সবই সুন্দর দেখতে হয়। যার মন সুন্দর তার কাছে সবই মনোমুগ্ধকর মনে হয়। ‘
— ‘ আপনি কি জানেন? আপনি একজন মারাত্মক লেবেলের চাপাবাজ? ‘
— ‘ ইশশ বউ, কিসব বলছ? তোমার হাসবেন্ডের মতো সাদাসিধা, ভুলা-বালা ছেলে তুমি আর একটাও জগতে পাবে? ‘
— ‘ নিজের ঢোল নিজেই বাজান! ‘
— ‘ কি করব? কেউ না বাজালে নিজেকেই তো বাজাতে হয়। ‘

নীলা এবার উচ্চ স্বরে হেসে ফেলল। সঙ্গে তার হাসিতে সাদিদও মৃদু হাসল।
রামিতে ভিউ পয়েন্ট থেকে তারা এবার আসলো টিংলিং ভিউপয়েন্টে। এখান থেকে চা-বাগানগুলির ৩৬০ডিগ্রী প্যানারমিক ভিউ পাওয়া যায়। মিরিকে এবং এর চারপাশে অনেকগুলি চা বাগানে বিখ্যাত ‘দার্জিলিং চা’ এর চাষ হয়। বলাবাহুল্য চায়ের বাগানের এমন মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য হলেও দার্জিলিং টুঁ মারা উচিত। এককথায় অপূর্ব এক দৃশ্য, বর্ণনাহীন!
কমলালেবুর বাগিচার জন্যও মিরিক খ্যাত। মিরিকে খুব উচ্চমানের কমলালেবুর চাষ হয়। মিরিক বস্তি, মুরমা ও সৌরেনি বস্তি অঞ্চলে কমলালেবুর ফলন হয়। সাদিদরাও কমলালেবুর বাগিচা দেখতে গেল। তারা সাথে করে কিছু কমলা কিনেও আনলো। এতো সুন্দর বাগানে এসে এমন খালি হাতে আসা যায় কি করে? তারা সাথেসাথেই কমলা ছিলে খেয়ে দেখল।

— ‘ ইশশশ! খুব মিষ্টি। ‘

সাদিদ আশেপাশে একপলক তাকিয়ে নীলার দিকে ঝুঁকে আসলো। নীলা কমলা খাওয়ায় ব্যস্ত। সাদিদ তার হাতের কমলার কোয়াটা নিজের মুখে পুরে নিলো। তারপর নিচুস্বরে বলে উঠল,

— ‘ তোমার থেকে কম। আমিতো এই মিষ্টির পরিমাণ নির্ধারণ পর্যন্ত করতে পারব না। এত মিষ্টি কেন তুমি? আমিতো রোগে আক্রান্ত হয়ে যাব৷ ‘

নীলা মৃদু ধাক্কা দিয়ে সাদিদকে দূরে সরাল। মুখ ঘুরিয়ে আপন মনে লাজুক হেসে বলল,

— ‘ অসভ্য একটা। ‘

মিরিকের জনপ্রিয়তা যেন সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরও একটি জিনিসের জন্য বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক ফুলের বাজারের অন্যতম দামি অর্কিড সিমবিডিয়াম চাষের জন্য মিরিকের জলবায়ু খুবই উপযোগী। মিরিকে সিমবিডিয়াম অর্কিডের বাগান রয়েছে যার নাম “দার্জিলিং গার্ডেন্স প্রাইভেট লিমিটেড”। সাদিদরা অল্প সময়েও অর্কিড বাগানটা পর্যবেক্ষণে গেল। এত কাছে এসে এই জিনিসটা মিস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
মিরিকের থেকে বাগডোগরা বিমানবন্দরের দূরত্ব প্রায় ৫২ কিমি(৩০ মাইল)। তাই সাদিদরা এবার ফিরে যাবার উদ্দেশ্য টেক্সিতে বসল। ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই আর লেইট করলে হবে না।
টেক্সি ডাইভার সাঁই সাঁই করে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল বাগডোগড়ার দিকে।
প্রত্যেকের মুখটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও মলিন। সবারই একটা কথা মনে হচ্ছে, সময়টা বোধহয় খুব দ্রুতই কেটে গেল।
আসলে এমনটাই ঘটে যখন প্রিয়মুখগুলো আমাদের পাশে থাকে। তারউপর সাথে থাকে এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
নীলা সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদ তাকে একহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে রয়েছে।

— ‘ শুনছেন? ‘

সাদিদ চোখ নিচু করে নীলার দিকে তাকালো। নীলার নাকে নাক ঘষে দুষ্টু হেসে বলল,

— ‘ এমন করে বলে না পাখি। খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। ‘
— ধ্যাত। ‘

নীলা বাহিরে তাকিয়ে লজ্জারাঙা মুখ লুকাতে ব্যস্ত। সাদিদ পিছন থেকে তার পেট জড়িয়ে ধরল। নীলা তার উষ্ণ স্পর্শে মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। সে কিছু বলবে তার আগেই সাদিদ বলল,

— ‘ বলো। ‘

নীলা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো। সাদিদের মিষ্টি মুখটা দেখে প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো। মিষ্টি হেসে বলল,

— ‘ না, কিছু না। ‘

সাদিদও মৃদু হাসল। নিঃশব্দে নীলার কপালের একপাশে চুমু খেল। তারপর সিটে হেলান দিয়ে তাকে টেনে নিজের বুকে আনলো। দুইহাতের বাহুবন্ধনে তাকে শক্ত করে আবদ্ধ করল। নীলাও তার জীবনের পরম উষ্ণতার জায়গাটুকুতে মুখ গুঁজল। একধ্যানে শুনলে লাগল ভালোবাসার মানুষটির বুকে, তার নামের ছন্দে তোলা হৃদকম্পন।

#চলবে…

গল্পঃ #অন্তরালের_অনুরাগ
লেখনীতেঃ #নাহিদা_নীলা
#পর্বঃ ২১ 💑❤💑

সাদিদরা ঢাকা এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত অনেক। তাই তারা সকলেই ক্যাব বুক করে বাসার পথে রউনা দিলো। প্রিয়তীকে অর্ণব পৌঁছে দিবে আর নীলাকে সাদিদ। আর শান্তকে তার বাসায় পৌঁছে দিবে তানবীর। সে আছে বিধায় সাদিদ ইচ্ছে করে নিজেকে এর মধ্যে জড়ালো না। তানবীরও বোধহয় তার এই সিদ্ধান্তে খুশি। কেননা তার চোখে-মুখে নামহীন হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক।
সবাই সবার থেকে বিধায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। বলাবাহুল্য এই কয়েকটা দিন একত্রে কাটিয়ে এখন সবার-ই যাবার সময় খারাপ লাগছে। কিন্তু তারপরও যেতে তো হবেই।
গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে নীলার মিরপুরের বাসার উদ্দেশ্য। সে জানালার বাহিরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সাদিদ তাকে এমন চুপচাপ দেখে বলল,

— ‘ কি ম্যাম, এমন চুপচাপ কেন? ‘
— ‘ এমনি। ‘

নীলাকে আবারও চুপ করে থাকতে দেখে সাদিদ একহাতে তাকে জড়িয়ে ধরল। সাদিদের অল্প উষ্ণতায় যেন নীলার চেপে রাখা কান্নাগুলো উপচে পরে বেড়িয়ে আসতে লাগল। সে সাদিদের বুকে মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগল। কান্নাটা নিঃশব্দের হলেও সাদিদ তার শরীরে বহমান কাঁপুনি অনুভব করতে পাড়ছে। তাই সাদিদ তার গালে হাত রেখে মুখটা উঁচু করল। ইশারায় বলল চোখের জল না ফেলতে। কিন্তু নীলার চোখের অশ্রুরা যে বাঁধনহারা। তারা কোনো বাধা-নিষেধ মানতে নারাজ। সাদিদ সামনে ডাইভিয়ে ব্যস্ত চালককে একপলক দেখে নিয়ে নীলার কপালে নিঃশব্দে আদর দিলো। তারপর ভীষণ মায়ায় জড়ানো কন্ঠে বলে উঠল,

— ‘ আর না পাখি। তোমার চোখের অশ্রুজল আমি সহ্য করতে পারি না। ‘
— ‘ সরি, কিন্তু আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে কেন? ‘

সাদিদ এবার মৃদু হাসল। তার কাছে উত্তরটা বিশুদ্ধ জলের ন্যায় পরিষ্কার। কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলল না। কেননা সে এই মধুর শব্দটা নীলার মুখ থেকেই শুনতে আগ্রহী। তাই তাকে বুকে আগলে নিয়ে বলল,

— ‘ আমি সকালেই বাবা-মার সাথে আমাদের বিষয়ে কথা বলব। নিজের প্রাণপ্রিয় বউকে বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও দূরে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। খুব শীঘ্রই নিজের ব্যক্তিগত পাখিকে নিজের ভালোবাসায় বাঁধানো খাঁচায় নিয়ে আসব। কোথাও যেতে দিব না। ‘

শেষোক্ত কথাটা বলতে নিয়ে সাদিদ নীলাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এমন একটা ভাব যেন ছেড়ে দিলেই সে চলে যাবে। যা সাদিদ হতে দিবে না।
গাড়ি নীলাদের বাসার সামনে পৌঁছাতেই সাদিদের হুঁশ আসলো। এতক্ষণ যে নীলাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল সেদিকে তার খবর ছিল না৷ না ছিল নীলার। গাড়ির ডাইভারের হর্ণের আওয়াজ শুনেই তার হুঁশ ফিরেছিল। চালক সাদিদের সমবয়সী হবে। এতক্ষণ পিছনে খেয়াল না করলেও শেষের দিকে ডাক দিতে গিয়ে সে লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। সে দ্রুত সামনে মুখ করে বসে গাড়ির হর্ন দিলো। তাতেই সাদিদ নীলাকে ছাড়ল। নীলাও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে লজ্জিত। সে মাথা নিচু করে রয়েছে। সাদিদ হালকা গলা কেশে গাড়ির দরজা খোলে বাহিরে আসলো। অপরপাশে গিয়ে নীলার পাশের দরজাটা খোলে দিলো। রাত অনেক হওয়া সত্ত্বেও সাদিদ ক্যাব ভাড়া মিটিয়ে তাকে বিদায় করে দিলো।
নীলার হাঁটার গতি ধীর। সাদিদ পিছন থেকে তার হাত টেনে ধরল। নীলা মাথা নিচু করে রয়েছে। চোখ তোলে তাকালে যে সাদিদের কাছে ধরা খাবে। যেটা নীলা এইমুহূর্তে চায় না।
কিন্তু সাদিদ তো নিজের প্রাণপাখির অবস্থা বুঝতে সক্ষম। তাই গালে হাত দিয়ে নীলার মুখটা উঁচু করল। একধ্যানে তাকিয়ে থাকল নির্নিমেষ। নীলার ছোট ছোট করে রাখা চোখগুলোতে অশ্রুকণারা এসে ভিড় জমিয়েছে। সাদিদ বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে তার দুই চোখ মুছিয়ে দিলো।

নিস্তব্ধতা তাদের ঘিরে রয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোলাহলযুক্ত যায়গাটাও এখন নীরব পল্লিতে রূপান্তর হয়েছে। সাদিদ একপা এগিয়ে নীলার শরীর ঘেঁষে দাঁড়াল। তার গাল থেকে একটা হাত এনে তার কোমড়ে রাখল। সাদিদের এহেন ছোঁয়ায় নীলার শরীর কম্পিত হলো। কিন্তু সাদিদ তাতে থামল না। বরং তার কোমড়ে নিজের একহাতে জড়িয়ে মাটি থেকে তাকে সামান্য উপরে তোলে নিলো। নিজেকে এমন ভাসমান দেখে নীলা এবার খানিকটা চমকিত দৃষ্টিতে সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদের চোখ-মুখ পুরোপুরি নরমাল। সে একদৃষ্টিতে নীলার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখের নড়চড় একবারে সামান্য। সাদিদ নীলাকে এনে নিজের সাথে মিশাল। তার একহাত এখনও নীলার গালে। সাদিদ এবার নীলার গালে আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে লাগল। ধীরে ধীরে সাদিদের চোখগুলো লাল হতে লাগল। নীলা এবার রীতিমতো কাঁপছে। কেননা সাদিদের এই দৃষ্টি তার এতদিনে বড্ড চেনা হয়ে গিয়েছে। সে এলেমেলো দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। সাদিদ নীলার একগালে হাত রেখে অপরগালে চুমু খেল। সাদিদের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে নীলা তার ঘাড় খামচে ধরল।
সাদিদ আড়চোখে নিজের ঘাড়ে রাখা নীলার হাতের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে মৃদু হাসছে। জায়গাটা রীতিমতো জ্বলছে। এই মেয়ের জন্য ভবিষ্যতে তার হয়তো স্পট রিমোভার অয়েন্টমেন্ট নিয়ে ঘুরতে হবে। তার পুরো শরীরে ইতিমধ্যে সে অগণিত খামচির দাগ বসিয়ে দিয়েছে। সাদিদ নীলার মুখের দিকে তাকাতেই তার বন্ধ আখিঁদ্বয় দেখতে পেল। সাদিদ আবারও মুখ এগিয়ে নীলার বন্ধ চোখে চুমু খেল। একে একে তার গাল, কপাল, নাকসহ পুরো মুখে অগণিত উষ্ণ আদর দিলো।
সাদিদ এবার একটু থেমে নিজের মুখটা নীলার ঠোঁটের একেবারে সন্নিকটে নিয়ে আসলো। দুই জোড়া অধর ছুঁই ছুঁই। সাদিদের তপ্ত নিঃশ্বাস নীলার মুখভাগে পরতেই তার কাঁপুনি দ্বিগুণ হলো। চোখ বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও সে বুঝতে পাড়ছে সাদিদ তার কতটা কাছে রয়েছে। তাদের মধ্যকার দূরত্বটা একেবারে নেই বললেই চলে। নীলা সেটা উপলব্ধি করে তার বন্ধ চোখজোড়া আরও খিঁচে বন্ধ করল। নীলার চোখ-মুখ, ঠোঁট অনবরত কাঁপছে। সাদিদের এই স্পর্শগুলো নীলাকে এখনও বেসামাল করে তোলে। সে কিছুতেই নিজেকে সামলে রাখতে পারে না৷ সাদিদ বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে নীলার অধর ছুঁয়ে দিলো। হালকা স্লাইড করে সাদিদ নেশাভরা কন্ঠে বলে উঠল,

— ‘ আই লাভ ইউ বেবি। লাভ ইউ লট। ‘

নীলা এবার চোখ খোলে সাদিদের চোখে চোখ রাখল। তার এই কথার পরিপেক্ষিতে বিপরীত উত্তরটা দিতে বড্ড ইচ্ছে করছে। সে বলতে চাইল। কিন্তু সাদিদের এমন নেশাক্ত চাহনি দেখে লজ্জায় চোখজোড়া নিচু করল।
এমন চাহনি কেন ছেলেটার? সে বুঝে না নীলা এই দৃষ্টি সহ্য করতে পারে না? সাদিদ নীলার মুখটা আবারও উঁচু করল। এগিয়ে আসলো নিজেদের মধ্যকার দূরত্বটা মিটিয়ে নিতে। নীলা কাঁপছে। তার কাঁপুনির পরিমাণ আরও বেড়ে গেল যখন নিজের অধরে সাদিদের অধর মিলিত হলো। সে নিজেকে সামলাতে একহাতে সাদিদের ঘাড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সাদিদ একহাতে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে অপর হাত তার গালে রেখে ক্রমাগত উষ্ণ স্পর্শ বিলিয়ে দিতে লাগল।
অনেক সময় অতিবাহিত হবার পরও যখন সাদিদের ছাড়ার নামগন্ধ রইল না তখন নীলার অবস্থা দিশেহারা। তার দম আটকে আসছে৷ সে সাদিদের বুকে মৃদু ধাক্কা দিলো। কিন্তু সাদিদ তাকে উষ্ণতা দিতে ব্যস্ত। নীলা না পেরে এবার একটু জোরেই ধাক্কা দিয়ে সাদিদের থেকে সরে আসলো। তার ধাক্কায় সাদিদের হাত ঢিলে হয়ে যায় এবং নীলার পা দীর্ঘসময় পর নিচে অবতরণ করল। সে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস টানছে। সাদিদের শ্বাসও দ্রুত গতিতে চলছে। নিজেকে স্থির করে নীলার এতক্ষণে নিজের করা বেয়াদবির খেয়াল আসলো। এত সময়েও সাদিদের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে নীলা এবার তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সাদিদের লাল লাল চোখগুলো দেখে নীলার অনুতপ্ততাবোধ হতে লাগল। সে এগিয়ে গিয়ে অপরাধী মনোভাবে নিচুস্বরে বলল,

— ‘ সরি আসলে তখন শ্বাস…

নীলাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে সাদিদ তার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরল। মাথা খানিকটা নিচু করে নীলার সমানে এসে বলল,

— ‘ ভালোবাসিতো। নিজের প্রাণপাখির এইটুকু কারণবশত সমস্যা বুঝব না? বর হিসেবে কি এতটাই খারাপ? ‘

নীলা আশ্বস্ত হলো। কিন্তু সাথে লজ্জাও পেল। সাদিদ তাকে লজ্জায় লাল হতে দেখে আচমকাই তার ঠোঁটে আবারও শব্দ করে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে নিলো। নীলা হঠাৎ এমন করাতে থতমত খেয়ে গিয়েছে। সাদিদ তার ভাবভঙ্গি বুঝতে পেরে কানের কাছে মুখ লাগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

— ‘ এনার্জি সঞ্চয় করছি। দূরে থাকার এনার্জি। আমাকে এত কষ্টে পুড়ানোর জন্য তোমাকেও কিন্তু সমানতালে পুড়াবো বউ। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করব। ‘

কথা সমাপ্তিতে সাদিদ নীলার কানের লতিতে আলতো কামড় বসাল। এবং শেষাক্ত কথাগুলো যেন সাদিদ তার কন্ঠে নেশার বিষ ঢেলে বলেছে। যা নীলার কর্ণকোহরে পৌঁছাতেই নীলার দম আটকে আসতে লাগল। শরীর তার অনবরত শিরশির করতে লাগল। তার থেমে থেমে শ্বাস নেওয়া দেখে সাদিদ এবার কামড় দেওয়া অংশে আদর দিলো।

রাত অনেক হয়েছে। নীলাকে এখন বাসায় যেতে হবে৷ সাদিদের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকা সত্বেও নীলাকে তার রেখে যেতে হচ্ছে। ভাবতেই তার কাছে বিষয়টা বিষাক্ত মনে হচ্ছে।
সাদিদ সবকিছুকে ছাপিয়ে নীলার কপালে ভালোবাসার উষ্ণ চুম্বনে এঁকে দিলো।
গালে হাত রেখে আদরমাখা কন্ঠে বলল,

— ‘ গুড নাইট পাখি, এন্ড সি ইউ ইন মাই ড্রিমস্। ‘

সাদিদ একটু থেমে নীলাার কানে আবারও চুমু খেল। এবার খানিকটা নিচু স্বরে বলল,

— ‘ আর অনেক আদর করব। ‘

ইশশ কি নির্লজ্জ এই ছেলে। নীলা লজ্জায় লাল-নীল-সবুজ সব হয়ে মাথা নিচু করল। সাদিদ তার অবস্থা দেখে নিচের ঠোঁট কামড়ে হাসতে লাগল।
নীলাকে বিদায় জানিয়ে সাদিদ তাকে বাসায় যেতে বলল। সাদিদ গেল না। নীলাকে যতক্ষণ পিছন থেকে দেখা সম্ভব সাদিদ ততক্ষণই সেই সুযোগটা চায়। এত দেখেও যেন সাদিদের তৃপ্তি মেটে না। এত ভালোবেসেও যেন দিনশেষে সাদিদের কাছে ভালোবাসায় কমতি মনে হয়। এতো কাছে থেকেও যেন সাদিদ তাকে নিজের আরও সন্নিকটে চায়। এটা কি তার কোনো সমস্যা? নাকি তার নীলার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা?
নাকি তার অনুরাগ? হৃদয়ের অন্তরালের অনুরাগের ফলাফল কি তার এই ভালোবাসাময় পাগলামি?
সাদিদ এর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে অবগত নয়। কিন্তু সে নীলাকে চায়। অসম্ভব হারে চায়। যেই চাওয়ার কোনো শেষ নেই। দিনশেষে যেই চাওয়া-পাওয়ার পরিমাণ চক্রবৃদ্ধি হারে কেবল বাড়তেই থাকে।
নীলা ধীর পায়ে গেইটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মানুষটাকে ছেড়ে যেতে তারও কষ্টে বুক ফাটছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বুকের বাম পাশে অসহ্যকর ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। দূরত্বটাকে একেবারে পিষে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। সাদিদের ভালোবাসাময় পাগলামিতে নীলাও আজ পুরোপুরি আসক্ত। তাইতো দিনশেষে এত লজ্জাবাণের পরও তার শুধু সাদিদকেই চায়। ঘুমাতে-জাগতে সবসময়। সেও যে অন্তরালের অনুরাগের রোগে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। যেখান থেকে এখন নিস্তার পাওয়া দুঃসাধ্য। নীলা হাঁটা থামিয়ে পিছনে ফিরে তাকালো। সাদিদ নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। যেটা দেখে নীলার এতক্ষণের চেপে রাখা কষ্টটা আরও বেড়ে গেল। সাদিদ ঠোঁটের কোণায় জোরপূর্বক হাসি টেনে নীলাকে ইশারায় ভিতরে যেতে বলল।
নীলাও বুকে পাথর চেপে সাদিদের মুখটা শেষবারের মতো দেখে ভিতরে পা রাখল।
নীলা চোখের আড়াল হতেই সাদিদ অনুভব করল তার চোখজোড়া অসহ্যকর যন্ত্রণায় জ্বলছে। সে মৃদু হাসল। মেয়েটা তাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে মেরেছে। মানুষ হিসেবেও একদন্ড রহম করেনি। সাদিদ আবারও একপলক নীলা বিহীন গেইটের দিকে তাকিয়ে পিছিয়ে আসলো। রিক্সা নিতে মন চায়ছে না। সবকিছুতেই কেমন যেন শূন্যতা বিরাজমান। সাদিদ চুলগুলোকে কপাল থেকে ঠেলে পিছনে ফেলল। সামনের মোড়ে গিয়ে গাড়ি নিবে। আপাতত সে প্রিয়তমাবিহীন ভারাক্রান্ত হৃদয়ের প্রেমিক হয়ে রাস্তাটুকু শেষ করতে চায়।

চাঁদের আলোয় নীরব রাস্তাটা ঝলমল করছে। রাতের ঠান্ডা শিরশিরানি বাতাশ সাদিদের শরীর-মন ছুঁয়ে দিচ্ছে। সে অনেকটা পথ হেঁটে পেরিয়ে আসতেই পিছনের দিক থেকে কারও দৌড়ানির আওয়াজ পেল। শব্দটা প্রকট থেকে প্রকটতর হতেই সাদিদ কৌতূহলবশত পিছনে ফিরল।
একি! সে এটা কি দেখছে?

নীলার সাদা-সবুজটা ওড়নাটা বাতাশের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত দুলছে। সবুজ রঙটাকে চাঁদের আলোয় সাদিদের কাছে কালো মনে হচ্ছে। নীলার হালকা করে বেঁধে রাখা চুলগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের স্বাধীনতা লাভ করে নিয়েছে। নীলাকে এমন এলোকেশী কন্যার ন্যায় পাগলের মতো ছুটে আসতে দেখে সাদিদ প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখনই বিষয়টা তার মাথায় আসলো সে একপা সামনে আগালো। দুইকদম সামনে হেঁটে সে নিজের পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলো। সাদিদের গতির সামনে নীলার জন্য পথের দৈর্ঘ্যটা নিমিষেই কমে গেল।
সাদিদ নিজেদের সবটুকু দূরত্ব মিটিয়ে নীলাকে শূন্য তোলে নিলো। কাঙ্ক্ষিত মানুষের স্পর্শে এসে নীলাও সাদিদের গলা জড়িয়ে ধরল। ক্রমাগত লম্বা শ্বাস টেনে সে একদমে বলে উঠল,

— ‘ ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি। ‘

জীবনের অতি মধুর কাঙ্ক্ষিত এই শব্দটা আচমকা শুনে সাদিদ চমকিত হলো। কতদিন, কতবছর, কত নির্ঘুম রাত সাদিদ হয়তো এই শব্দটা শুনার জন্য অপেক্ষা করেছে। যার হিসাব করতে গেলে কষ্টকর হয়ে যাবে। সাদিদ নীলার কোমড় জড়িয়ে তাকে নিজের বরাবর করল। তাকে শূন্য ভাসিয়েই বলে উঠল,

— ‘ আবার বলো প্লিজ। ‘
— ‘ ভালোবাসি। ‘
— ‘ ওয়ান্স মোর বেবি। আই ওয়ান্ট টু হেয়ার দিস ওর্য়াড এগেইন এন্ড এগেইন। ইট’স লাইক এ ম্যাজিক। টোটালি আনডিক্সক্রাইবল। ‘

নীলা মাথা নিচু করে লাজুক হাসল। সাদিদের কথায় তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে আবারও বলতে লাগল,

— ‘ ভীষণ ভালোবাসি। বলতে দ্বিধা নেই এই মানুষটাকে আমি ভালোবাসি। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ আপনি। আর ইনশাআল্লাহ শেষ। আমি সাদিদ নামের এই ছেলেটাকে সীমাহীন ভালোবাসি। এই নির্লজ্জ-অসভ্য পুরুষটাকেও ভালোবাসি। ভালোবাসি আমি, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত মানুষটাকে। আমি ভালোবাসি সাদিদ নামক আমার জীবনসঙ্গীকে। আমি ভালোবাসি পুরো এই মানুষটাকেই। ভীষণ ভালোবাসি। ‘

সাদিদ পুরোটা সময় নীলার মুখের দিকে একধ্যনে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে-মুখে তৃপ্তি। মুগ্ধতায় ছেয়ে আছে পুরো মুখমন্ডল। চাঁদের আলোয় যা অতি স্নিগ্ধকর। নীলা প্রাণভরে সাদিদের এই মুগ্ধতায়ভরা খুশি মুখটা দেখছে। সে স্বার্থক। সাদিদের মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল দেখে নীলার মুখেও তৃপ্তিকর হাসি ফুটে উঠল।
সাদিদ নিজের অব্যক্ত খুশিগুলোকে নিজের মধ্যে বন্দি করে নীলাকে কাছে টানল। নীলার উন্মুক্ত চুলের পিছনে হাত দিয়ে সাদিদ তার নরম অধরযুগল নিজের অধরের মধ্যে পুরে নিলো। তাকে এতটা তৃপ্তি দেবার জন্য বিনিময়ে ভালোবাসাময় উপহার দিতে লাগল। নীলা আচমকা সাদিদের এমন স্পর্শে থমকে গিয়েছিল। চোখগুলো তার মুহূর্তেই বড় বড় হলো। কিন্তু সাদিদের অতিরিক্ত মধুময় ভালোবাসার সামনে নীলার চোখগুলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই আবেশে নীলার আখিঁদ্বয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসলো। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাদিদের ভালোবাসার শিহরণ বয়ছে। সে কাঁপা হাতগুলো দিয়ে সাদিদের পিঠ আঁকড়ে ধরল। নিজেকে সামলাতে সাদিদের পিঠের জামা খামচে ধরল।
দীর্ঘ ভালোবাসাময় মুহূর্ত কাটিয়ে সাদিদ নীলাকে ছাড়ল। নীলা চোখ বন্ধ করে ক্রমাগত কাঁপছে। সাদিদ নীলার গালে এক হাত রেখে নিজের ভেজা ঠোঁটে তার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ আঁকল। নীলা শিহরিত হয়ে সাদিদের হাতের উপর নিজের হাত রাখল। সাদিদ নীলার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মুগ্ধতাভরা কন্ঠে বলে উঠল,

— ‘ আমার জীবনটা রাঙিয়ে তোলার জন্য সাদিদ তার প্রাণপাখির কাছে কৃতজ্ঞ। ভালোবাসি প্রিয়তমা। খুব বেশি ভালোবাসি। ‘

________________

তানবীর শান্তকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে আরও আগেই৷ কিন্তু সে এখনও তার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেন দাঁড়িয়ে সেটা সে নিজেও বুঝতে পাড়ছে না৷ কয়েকবার যেতে চায়লেও তার পা একজায়গাতে স্থির। নিজের এমন পাগলামিতে তানবীর এবার মহা বিরক্ত। সে ভ্রুজোড়া বাঁকা করে কপাল কুঁচকে নিজের বিরক্তি প্রকাশ করছে।
তার মন বলছে উত্তরটা তার জানা। কিন্তু মস্তিষ্ক উত্তরের বিপরীতে হাজারও নাবোধক উত্তর এনে দাঁড় করাচ্ছে। এককথায় তানবীর নিজের মনকে সাইডে রেখে নিজের তৈরি করা কথা দিয়ে নিজেকেই স্বান্তনা দিচ্ছে।

সে রাস্তার একটা ইটের টুকরোকে পায়ে আঘাত করে দৌড়ে সরাল।
শান্ত এতক্ষণ মা-বাবার নানারকম প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। পায়ের ব্যাথায় জন্য বকাও খেয়েছে। এতসব বকাবকি-আদরের পর তার রুমে আসার অনুমতি মিলল। রুমে এসেই সে ওয়াসরুমে ঢুকল। পা না ভিজিয়ে ফ্রেস হয়ে নিলো।
চুলগুলোও হালকা ভিজিয়ে বেড়িয়ে আসলো। রাত অনেক হয়েছে। এবার ঘুমানো দরকার। কিন্তু কি মনে করে সে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। নিস্তব্ধতায় ঘেরা রাতের পরিবেশ দেখতে ভালো লাগছে। শান্ত দৃষ্টি এদিক-ওদিক করে মুগ্ধতা নিয়ে চারপাশ অবলোকন করছে।
কিন্তু আচমকা নিচে চোখ পরতেই শান্তর ভ্রুজোড়া অটোমেটিকলি কুঁচকে এলো। সে চোখগুলো হাত দিয়ে ঢলে আবারও তাকালো। না সে চোখে ঠিকই দেখছে। কিন্তু সে এখানে কেন?

তানবীরকে ফাঁকা রাস্তায় বাচ্চাদের মতো ইটের টুকরোর সাথে ফুটবল খেলতে দেখে শান্তর চোখগুলো প্রায় বেড়িয়ে আসার উপক্রম। তাদের দুইতলার ছাঁদ থেকে সোডিয়ামের আলোতে রাস্তায় তানবীরকে শান্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তাকে ঢেকে কিছু বলতে পাড়ছে না৷ কেননা পাশের রুমে মা-বাবা। তারউপর রাতের নিস্তব্ধতায় হালকা শব্দও ভয়ংকর শোনা যায়। শান্ত এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাত কচলাতে লাগল। সে না পেরে মৃদু স্বরে আওয়াজ করল,

— ‘ শুনছেন? ‘

এত আস্তে বলেছে যে বোধহয় শান্তর কানেই কথারা যায়নি। সেখানে তানবীর কিভাবে শুনবে?
শান্ত পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে উপায় খোঁজতে লাগল। মাথায় কিছু আসতেই সে দ্রুত রুমে এসে লোশনের বোতলটা হাতে নিলো। আবার দ্রুত পায়ে বারান্দায় এসে সেটা ছুঁড়ে মারল রাস্তায়। এমনভাবে মেরেছে যেন তানবীরের উপর না পরে। কিন্তু তারপরও এত দূর থেকে ব্যালেন্স রাখতে পারেনি। ঢিলটা এত জায়গা রেখে সোজা গিয়ে তানবীরের পিঠে পড়ল।
দূর থেকে আসায় গতি বেশি ছিল। এবং লোশন বোতলের একতৃতীয়াংশ থাকাতে সেটা বেশ জোরেই লাগল। তানবীর চোখ বাঁকিয়ে মুখ দিয়ে বিশ্রি শব্দ উচ্চারণ করল,

— ‘ কোন হালা*** রে? শালা…

তানবীর পিঠ ঢলতে ঢলতে পিছনে ফিরতেই দূরে দাঁড়ানো একটি মেয়ের হাত নাড়ানো দেখে থেমে গেল।
শান্ত কানে হাত দিয়ে সরি সরি বলছে।
তানবীর মুখ ফিরিয়ে মৃদু হাসল। এই মেয়ের অপর নাম সংঘর্ষ হলেও মন্দ হবে না। সবসময় যেন তানবীরের সাথে সংঘর্ষের বাহানায় থাকে।
কথা বলা যাচ্ছে না। তারপরও শান্ত হাত নাড়িয়ে ইশারায় বুঝাতে চাইল এখানে এখনও কেন? বাসায় যায়নি কেন?

তানবীর খুব সহজেই শান্তর ইশারা বুঝে গেল। কিন্তু তারপরও সে কোনোরূপ প্রতিউত্তর জানালো না। শান্তকে ধোয়াশায় রেখে সে সামনে পা বাড়াল।
শান্ত পুরোপুরি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। কি হলো এটা?
অপরদিকে তানবীরের এবার অস্থিরতাটুকু কেটে গিয়েছে। তার মন বলছে শান্তকে একপলক দেখার জন্যই ছিল তার এই অস্থিরতা। এতক্ষণের এই পাগলামো। কিন্তু মস্তিষ্ক সেটা মানতে নারাজ।
সে নিজের মনকে কয়েকটা বিশ্রিজনক গালি দিলো। তারপরও নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাল।

— ‘ মাইয়া মানুষ মানেই ভেজাল। হেইগুলো নিজেরা যেমন ভেজাল, তেমনি আমাগো মতো ভালা পুলাগোর কাছে আইসা হেইগুলোর ভেজালের বিজ বপন কইয়া যায়। শালার ভেজালময় লাইফ। ‘

তানবীর নিজের মনে মেয়েদের খারাপ গুণকীর্তন করে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। মেয়েদের এত বকাঝকা করে মন হালকা করলেও সে যে মেয়েদের ব্যবহার্য জিনিস-ই নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে সেটা সে মানতে নারাজ। লোশনের বোতলটা হাতে নিয়ে সে একপলক দেখল।

— ‘ ভেসলিন বডি লোশন। ভালোই, দামি কোম্পানি। তাই সাথে নিয়া নিলাম। অযথা টাকা নষ্ট কইয়া লাভ কি? বাসার কাজের বুয়ারে দিলে বরং খুশি হইব।
আমি দয়ালু, মহৎ দয়ালু। তাই জন্য এটা আমার হাতে। অন্য কোনোরকম কারণ দাঁড় করাতে আসবি না। শুনছিস কি বললাম?
হারামি মনের বাচ্চা মন, তোকেই বলছি৷ কান খোলে শুনে রাখ। আমি এমনটাই ভেবে এটা নিয়েছি। আর কিছু বলতে আসলে চিবিয়ে তোকে খেয়ে ফেলব। ‘

#চলবে…