গল্পঃ #অন্তরালের_অনুরাগ
লেখনীতেঃ #নাহিদা_নীলা
#পর্বঃ ২৪
লিভিংরুমে ছোটখাটো একটা বিস্ফোরণজনিত অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দু’জন ব্যক্তি ব্যতিত উপস্থিত সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ছোট্ট শাদমানও মাথা ঘুরিয়ে এপাশ-ওপাশে তাকাচ্ছে। সবাইকে এমন চোখ বড় বড় করে রাখতে দেখে, অনুকরণ প্রিয় শাদমান নিজেও চোখ বড় করতে চাইল। কিন্তু সে ঠিকঠাকভাবে করতে পাড়ছে না। তাই সে দুইহাতের আঙ্গুল চোখের নিচে চেপে ধরে বড় চোখ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নীলা পাশ থেকে ভীতিগ্রস্ত চেহারা নিয়ে সাদিদের দিকে তাকালো। তার চোখের কার্ণিশে ইতিমধ্যে অশ্রুকণার সমাগম ঘটে গিয়েছে। সাদিদ এগিয়ে আসলো তার দিকে। হালকাভাবে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরল। সাদিদের ছোঁয়া পেতেই তার কান্নারা এবার বাঁধ ভাঙল। সে মুখ চেপে কান্না আটকানোর দূঢ় প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। সাদিদ এখন কাকে রেখে কাকে সামলাবে? এই নিয়ে দ্বিধাদন্ডে পড়ল। অবশেষে সবকিছুকে ছাপিয়ে সে নীলাকেই বেছে নিলো। কেননা এই মেয়েটার চোখের পানি সাদিদের শরীরে সুচের ন্যায় ফুটছে।
সাদিদ নীলাকে পাশের সোফায় বসিয়ে নিজে হাঁটু ভাজ করে তার সামনে মেঝেতে বসল। পানিভর্তি গ্লাসটা নীলার নিকট এগিয়ে দিলো। নীলা কাঁপা হাতে কয়েক চুমুক পানি খেল। তাকে কিছুটা স্বাভাবিক দেখে সাদিদ এবার উঠে নীলার পাশে বসল। সবার দিকে তাকাতেই আবারও তাদের চমকিত দৃষ্টি দেখতে পেল। সাদিদ দুইহাতে কপালের চুলগুলো পিছনে ঠেলে বলে উঠল,
— ‘ বিয়েটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। তোমাদের এমন রিয়েক্ট করা স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ওর চোখে পানি সহ্য করতে পাড়ছি না। তাই প্লিজ কিছুতো একটা বলো। ‘
সবাই আবারও একে অপরের দিকে তাকালো। তারা বাকরুদ্ধ হবে না তো কারা হবে?
ছেলের বিয়ে ঠিক করে এসে শুনে মেয়ে-ছেলে নাকি পূর্বেই বিবাহিত দম্পতি। তাদের ভাষার ভান্ডারে শব্দ হারিয়ে যাওয়া তো স্বাভাবিক বিষয়। শাহেদ-ই প্রথমে গলা খানিক কেশে বলে উঠল,
— ‘ আমাদের আর কি বলার আছে? এখানে কিছু বলা যায়? ‘
— ‘ প্লিজ ভাইয়া এমন করে বলো না। তোমাদের তো সবকিছুই খোলে বললাম। ‘
— ‘ হ্যাঁ বলেছিস। কিন্তু বহুত পরে। তোর উপর আমি রাগ করেছি সাদি। এইবার পায়ে ধরলেও মাফ পাবি না। ‘
— ‘ মা তুমিও…
— ‘ চুপ একটা কথাও বলবি না। এখন মুখে খই ফুটছে তাই না? এতদিন এই কথাটা বললে কি এমন ক্ষতি হতো? আমার মেয়েটাকে আরও আগেই নিজের কাছে নিয়ে যেতে পাড়তাম। শুধুমাত্র তোর জন্যই আমি এই খুশি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। খুব রাগ করেছি। ‘
শায়লা রহমানের কথা শেষ হতেই হাসিবুর রহমান-শাহেদ আওয়াজ করে হাসতে লাগল। বাবার দেখাদেখি ছোট্ট শাদমানও সামনের ছোট্ট দাঁত দেখিয়ে হাসা শুরু করল। শায়লা রহমানও মুখ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে হাসছে। তাদের এমনভাব দেখে আরিফ মাহমুদের বুক থেকে যেন পাথর নামল। এরিমধ্য উনার মনে নানারকম কু-চিন্তাভাবনা হানা দিচ্ছিল। যায় হয়ে যাক উনি তো হচ্ছেন মেয়ের বাবা। নীলা-সাদিদের এমন একটা ঘটনায় যদি উনারা কষ্ট পেতেন তাহলে তিনি বাবা হয়ে বড্ড অসহায়বোধ করতেন। তাদের এখন হাসিমুখটা দেখে উনার ঠোঁটের কোণায়ও হাসির রেখা ফোটে উঠল। তাকে দেখে নার্গিস খাতুনও চোখের কোণের পানিটা মুছে নিলেন।
মুহূর্তেই যেন এতক্ষণের গুমোট ভাবটা কেটে গেল।
শায়লা রহমান উঠে গিয়ে নীলাকে তার কাছে আনলেন। মুখটা উঁচু করে ধরে ভিজে যাওয়া গালগুলো মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন,
— ‘ তোরা তো আমাদের কাজ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছিস। এখনতো ডাইরেক্ট ছেলের বউ বরণের প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘
বলেই তিনি নিজের হাতের পরিহিত স্বর্ণের চুড়িগুলো খোলে নীলার হাতে পরিয়ে দিলো। কপালে চুমু দিয়ে বলল,
— ‘ খুব সুখি-হো। ‘
নীলা আবেগে শায়লা রহমানের বুকে মুখ গোঁজল। সত্যিই সে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেমনটা চিন্তা করেছে তেমন কিছুই হয়নি। তারা যে এতটা সহজভাবে সবকিছু মেনে নিবে সেটা নীলার কল্পনার বাহিরে ছিল।
শাহেদ এসে শক্ত করে সাদিদকে জড়িয়ে ধরল। পিঠ চাপড়ে বলল,
— ‘ আমিতো তোকে ফাস্ট ভাবতাম। কিন্তু তুইতো সেটার ডেফিনেশন চেইঞ্জ করে দিলি। ফাস্টের ফাস্টকে কি বলে? অভার ফাস্ট? ‘
কথাটা বলে শাহেদ নিজেই হাসল। সাদিদ মাথা চুলকে ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাসছে। নার্গিস খাতুন দ্রুত কিচেনে গেলেন। সবার জন্য প্লেটভর্তি মিষ্টি নিয়ে হাজির হলেন। আর কি মনে করে যেন সাথে নীলার বানানো গোলাপজামুন আর চকলেটও নিলেন।
— ‘ এই মুহূর্তে মিষ্টিমুখ না করলে হয়? ‘
— ‘ আপনি আমার মনের কথাটা বললেন বিয়াইন। দেন, আমি আজকে ডাবল খাব। এত বড় খুশির খবর বলে কথা৷ ‘
— ‘ একদম না বাবা৷ তোমার ডায়াবেটিস হাই। ‘
— ‘ তুই চুপ থাক। নিজে বিয়ে করে বসে রয়েছিস, এখন আবার আমার খাবারে ভাগ বসাতে চাইছিস? তুই একটা কথাও বলবি না। ‘
সাদিদ বাবার বাচ্চামো তে মৃদু হাসল। সে বরাবরই বিশ্বাস করে তার পরিবারের মতো পরিবার আর হয় না৷ কিন্তু আজ যেন সবাই সেই বিশ্বাসের ঢাল আরও মজবুত করে দিলো। সে একপলক সবার দিকে তাকালো। এই রকম একটা ঘটনাকে এতটা হাসিখুশি নেবার সাধ্য কয়টা পরিবারের রয়েছে?
সে নীলার দিকেও দৃষ্টি দিলো।
ইশশ সাদিদের বুকটা শীতল হয়ে যাচ্ছে। ছেলেদের ধারণা মেয়েদের অশ্রুমাখা চেহারাতে সবচেয়ে বেশি মায়াবি লাগে। তারসাথে স্নিগ্ধতা এবং সৌন্দর্যতায় পরিপূর্ণ থাকে। বেশিরভাগ প্রেমিক পুরুষকেই এই কথাটি বলতে শোনা যায়। কিন্তু সাদিদের কেন এমনটা অনুভব হয় না? নীলার অশ্রুমাখা চেহারা কেন তার বুকে সুচ ফোটায়? কেন সাদিদ নীলার তখনকার কান্নামিশ্রিত সৌন্দর্যটা উপলব্ধি করতে পারে না?
সাদিদের কাছে এর উত্তর জানা নেই। কেবল জানা সব প্রশ্নের একটাই উত্তর হচ্ছে, অনুরাগ। নীলার জন্য তার অন্তরালের অনুরাগের ফলাফল-ই তার এই ভিন্নতা।
সাদিদের এতক্ষণের ভাবনায় ছেদ ঘটে নার্গিস খাতুনের কথায়,
— ‘ গোলাপজামুনটা তোর বোন আজকে নিজে তৈরি করেছে। ‘
— ‘ তাই নাকি? পিচ্চু আর রান্না! আম্মু আমাকে একটু চিমটি দাওতো। ‘
নীলা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। সকলের সামনে মায়ের এমন করে বলাতে তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। সাদিদ লাজলজ্জা ভুলে নিধিকে বলে উঠল,
— ‘ ভাবীমণি চিমটি পরে হবে। আগে আমাকে মিষ্টি দাও। আজ বড্ড মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। ‘
সাদিদের কথায় আবারও লিভিংরুমে একটা হাসির ধুম পড়ল। নীলা একেবারে চুপসে গিয়েছে। এই ছেলেটা এত নির্লজ্জ কেন? সবার সামনে এমন করে কেউ বলে?
নিধি একটু দুষ্টু মনোভাব পোষণ করল। সে গোলাপ জামুনটা না দিয়ে পাশের থেকে স্পঞ্জের মিষ্টিটা সাদিদকে এগিয়ে দিলো।
— ‘ নাও সাদিদ। ইচ্ছে অপূর্ণ থাকতে নেই। ‘
— ‘ এটা না। গোলাপজামুনটা দাও। ‘
— ‘ কেন? এটা কি মিষ্টি না? ‘
— ‘ হয়তো বা মিষ্টি। কিন্তু আমার যে এই মিষ্টিতে হবে না৷ তাই জলদি দাওতো। ‘
— ‘ এই, তুই এমন বেশরম কবে থেকে হলি? ‘
— ‘ তোমার বোধহয় খুব শরম? সবার সামনে কিছু বলব? ‘
শাহেদ হেসে দিয়ে সাদিদের পিঠে জোরে চাপড় দিলো।
— ‘ ফাজিল। ‘
সাদিদও হাসছে। আর তাদের কান্ডে বড়রা ঠোঁট টিপে হাসছে। আর সাথে নিজেরা অন্যদিকে ব্যস্ত হবার ভান করছে। তারা যে এখানে বসে রয়েছে সেদিকে ছেলেগুলোর বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। এতটা ঠোঁটকাটা এগুলো কিভাবে হলো?
নিধি আর সাদিদকে অপেক্ষা করালো না। গোলাপজামুনের প্লেটটা সাদিদের দিকে এগিয়ে দিলো।
সাদিদ মিষ্টি হাতে নিয়েই নীলার মুখের দিকে তাকালো।
সে মাথা নিচু করে বসে থেকে সমানে নিজের দুইহাতের আঙ্গুল মোচড়ামুচড়ি করে যাচ্ছে। জীবনে প্রথম করেছে। তাই টেস্ট কেমন হবে? বা সাদিদের ভালো লাগবে কি-না? নীলা এটা নিয়েই টেনশনে রয়েছে।
অপরদিকে সাদিদ একেবারে পুরো মিষ্টিটাই মুখে পুরে নিয়েছে। তার চোখগুলো অটোমেটিকলি বন্ধ হয়ে গেল।
শাহেদ পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,
— ‘ কিরে ঘুমিয়ে গেলি না-কি? ‘
সাদিদ মুখের মিষ্টিটা শেষ করে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। আরেকটা মিষ্টি মুখে দিতে দিতে নিধির উদ্দেশ্য বলল,
— ‘ সরি টু ছে ভাবীমণি, বাট এই সবগুলো গোলাপজামুন আমার লাগবে। তোমরা সবাই বাকি মিষ্টিগুলো খেতে পার। ‘
ইশশ কি নির্লিপ্ত উত্তর। নীলার পক্ষে আর এই লজ্জাহীন ছেলের সামনে বসে থাকা সম্ভব নয়। সে সোফা থেকে উঠে প্রায় দৌড়ে বসার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলো। ইশশ সবাই কি ভাবছে? এসব মনে হতেই লজ্জায় নীলার গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে।
অপরদিকে বসার ঘরের সবাই সাদিদের লোকসম্মুখে এমন নির্লজ্জতা দেখে ঠোঁট টিপে সমানে হাসছে৷ আরিফ মাহমুদও নিঃশব্দে হাসছে। কিন্তু তাতে রয়েছে ঢের তৃপ্তি।
সাদিদ যে নীলাকে সীমাহীন ভালোবাসে এটা বুঝার তার আর বাকি নেই। আদরের মেয়ে স্বামীর সাথে সুখে থাকলে মা-বাবা হিসেবে আর কি চাওয়ার থাকে?
নীলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শায়লা রহমান বলে উঠলেন,
— ‘ মেয়েটাকে সবার সামনে লজ্জা দিয়ে কি লাভ হলো? দেখলি তো কেমন দৌড়ে চলে গিয়েছে। ‘
সাদিদ মায়ের দিকে তাকিয়ে কেবল হাসল। তারপর আবারও মিষ্টি খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। কোনো প্রতি উত্তর জানালো না। হাসিবুর রহমান-ই বললেন,
— ‘ তাহলে এখন পরবর্তী কাজ কি? আমরা তো বিয়ে ঠিক করতে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে যে মামলা উল্টো। ‘
— ‘ শাহেদের বাবা, যে যাই বলুক। আমি কিন্তু ছেলের বউকে ঢাকঢোল না বাজিয়ে বরণ করব না। ‘
— ‘ আমরাও তো এমনটাই চাই মা। দুই পরিবার থেকেই এটা শেষ বিয়ে। তাই আয়োজনে কোনো কমতি রাখতে চাই না। ‘
— ‘ আমিও একমত। ‘
— ‘ তাহলে বাড়ির বউকে আমরা ধুমধামে বরণ করে তুলব। কি বলেন মেয়ের মা-বাবা? ‘
— ‘ আমরা আর কি বলব? আপনারা যেমনটা ঠিক মনে করেন। ‘
দুই পরিবারের সম্মিলিত মতামতে সাদিদ এবং নীলার এনগেজমেন্ট সামনের শুক্রবারে ঠিক করা হয়েছে। যেহেতু কেউ তাদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিয়েটা জানে না, তাই আপাতত যেচে গিয়ে বলার ইচ্ছেটা পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দেখা গেল না। তারা পুরনো নিয়মনীতি অনুসারেই তাদের বিয়ের কার্যক্রমটা আবারও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ করবে। এবং সেটা খুব শীঘ্রই।
__________________
তানহা ঢুলতে ঢুলতে উপর থেকে নিচে নামল৷ ঘুমের ঔষধের এফেক্টটা এখনও যায়নি। তাই সে উঁচু গলায় হাঁক ছাড়ল,
— ‘ ভাবী, একটু কড়া করে ব্ল্যাক কফি দাও। ‘
তানহা মাথা চেপে ধরে রেখেছে। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালেই ঔষধগুলো খেয়ে নিয়েছিল। এতসময় অতিবাহিত হবার পরও নিধির কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তানহা এবার রাগীস্বরে চিল্লিয়ে উঠল,
— ‘ ভাবী, কখন কফির কথা বলেছি। আমার মাথা ব্যাথা করছে। ‘
তানহার রাগী কন্ঠস্বর শুনে মিনু দ্রুত টিভি বন্ধ করে দৌড়ে আসলো। সে স্টার জলসায় ভারতীয় ধারাবাহিক নিয়ে মগ্ন ছিল। দৌড়ে আসাতে সে ক্রমাগত হাঁপাচ্ছে।
— ‘ আফামণি, কিছু কইছিলেন? ‘
— ‘ তোকে না। ভাবীকে বলেছিলাম। কিন্তু তাকে তো দেখতেই পাড়ছি না। তাছাড়া বাড়ি এত নীরব কেন? ‘
— ‘ নিধি ভাবী বাড়িতে না। হে গেছে তার বাপের বাড়ি। সাথে বড় ভাইজান-ছোট ভাইজানসহ খালাম্মা-খালুও গেছে। ‘
— ‘ তা হঠাৎ এমন দলবেঁধে যাওয়ার অর্থ? ‘
— ‘ আফা আপনেরে তো খালাম্মা কতবার কইরা ডাকল। আফনি তো উঠলেন না৷ আফনে ঘুমাইয়া রইছেন বলে খালাম্মা আমারে কইয়া গেছে। ‘
— ‘ কি বলে গিয়েছে। ‘
— ‘ আপনের খাওন গরম কইরা দিতে। ‘
— ‘ সেটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর কই? বাড়িসুদ্ধ সবাই হঠাৎ একসাথে? ‘
— ‘ আসলে আফামণি…
— ‘ কি আসলে-নকলে? ‘
মিনু ঠোঁট চেপে লাজুক হাসছে। সে লজ্জামাখা কন্ঠে হেলেদুলে বলল,
— ‘ খালাম্মারা ছোট ভাইজানের লগে নীলা আফামণির বিয়ার কথা ঠিক করবার লাইগ্গা গেছে। ‘
— ‘ কি? ‘
তানহা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। সাদিদ আর বিয়ে? তাও আবার নীলার সঙ্গে!
সে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পাড়ছে না। অপরদিকে মিনু এতক্ষণ লাজুক হাসলেও এখন চমকিত চোখে তানহার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তানহা তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বাহির না করে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। রুমে এসেই সে ধপ করে বিছানায় পড়ল। চোখ-মুখ তার ইতিমধ্যে ফোলে উঠেছে। কান্না করতে করতে তার হেঁচকি উঠে গিয়েছে।
— ‘ কেন সাদি? কেন? আমার ভালোবাসায় কি এমন কমতি ছিল, যার জন্য তোকে নীলাকে বাছাই করতে হয়েছে? কি কমতি ছিল আমার মধ্যে? ‘
একা এই রুমটাতে তার কথার বিপরীতে কোনো উত্তর আসছে না। তানহা বিছানার চাদর খামচে ধরে অনবরত ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কোনো হৃদয়হীন ব্যক্তিও বোধহয় এই কান্না দেখে ঠিক থাকতে পারবে না। ভেতর থেকে ভেঙে ঘুড়িয়ে যাবে। তানহা নিজের ফোনটা হাতে তোলে নিলো। ফোনের ডিসপ্লেতে সাদিদের হাসোজ্জল একটা ছবি। তানহা সেটাতে অগণিত চুমু দিলো। আদরমাখা কন্ঠে বলল,
— ‘ আমার এতো ভালোবাসাও তোর পাথর মনটাকে নাড়াতে পাড়ল না? এতটা নির্দয় তুই? মরে যাচ্ছি সাদি। দেখ, দমটা কেমন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি বাঁচব না সাদি। তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নই। ‘
বলেই তানহা আবারও ফোনের স্ক্রিন দীর্ঘ চুমু দিলো। সাদিদের হাসোজ্জল ছবিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তানহার অশ্রুসিক্ত চোখগুলো ধীরে ধীরে লাল হতে লাগল। এতক্ষণের কান্নারত মায়াবী মুখটা এখন আর নেই৷ সেখানে এসে যেন ভিড় জমিয়েছে ধ্বংসাত্মক চাহনি। যে অগ্নি চাহনির বলে সুন্দর-হাসিখুশি পৃথিবীটা মুহূর্তেই কান্নারজলে স্নান করানো সম্ভব। যেখানে সম্ভব এক আকাশ আনন্দকে পিছু ফেলে, এক সমুদ্র কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার চূড়ান্ত লড়াইয়ে হামাগুড়ি দেওয়া।
___________________
সাদিদরা সবাই নীলাদের বাসা থেকে ডিনার করে বাড়িতে ফিরেছে। ছোট্ট শাদমানের হাতে এখনও নীলার তৈরি চকলেট। সেগুলো সে চেটেপুটে খাচ্ছে। খাবারটা যে তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সবার মুখেই হাসি লেগে রয়েছে।
আর সাদিদের অবস্থা তো ভাষায় প্রকাশ করবার মতো নয়। শাদমানকে ঘুষ-টুস দিয়ে সে একটা চকলেট নিয়ে নিয়েছে। বেচারা কেঁদে-কেটে একশেষ। সে নিজের খালামণির বানানো তৈরি চকলেট কাউকে দিবে না। কিন্তু সাদিদের যে এই চকলেট থেকে যেকোনো মূল্যে ভাগ চায়। তাই সে যতসব হাবিজাবি কথা শুনিয়ে চকলেট নিয়ে নিলো৷ আপাতত দু’জনই চকলেট খেতে ব্যস্ত। একজন বাচ্চা হয়ে চকলেট খাচ্ছে। অপরজন যেন বড় হয়েও কাজে বাচ্চা। সাদিদরা হাসিমুখে ভিতরে প্রবেশ করতেই তানহাকে লিভিং এড়িয়াতে পেল। সে তাদেরকে আসতে দেখেই হাতে তালির সাথে এগিয়ে আসছে।
— ‘ বাহ্ বাহ্ বাহ্। খুব চমৎকার দৃশ্য। ‘
সাদিদ ভ্রুজোড়া বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো। তানহাকে দেখে তার হাসিমুখটা নিমিষেই গম্ভীরে পরিণত হলো। বাকি সবাইও কিছুটা চমকিতভাব নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখগুলো তার লাল-লাল। সাথে ফোলেও গিয়েছে। শায়লা রহমান দ্রুত এগিয়ে আসলেন। গালে হাত দিয়ে জানতে চাইলেন,
— ‘ কিরে, শরীর খারাপ তোর? মুখটা এমন লাগছে কেন? ‘
— ‘ মামি আ’ম টোটালি ফাইন। ইনফেক্ট এত ভালো যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কিরে সাদি বল, তুইতো ভালো জানিস আমি কতটা ভালো আছি। ‘
সাদিদ এখনও তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে আজকে তানহাকে বাধা দিবে না। আর কতদিন পরিবারকে এর থেকে বাহিরে রাখবে? সত্যটা তো একদিন না একদিন সামনে আসবেই। তাই তানহা যদি এখন নিজেই সেটা প্রকাশ করতে চায় তাহলে সাদিদ আর তাকে বাধা দিবে না। সাদিদ সেই রকম একটা মনোভাব নিয়েই তাকিয়ে রয়েছে।
অপরদিকে সাদিদকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে তানহা হাসতে লাগল। ভাবটা এমন যে খুশিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সাদিদের কুঁচকে রাখা ভ্রুজোড়া আরও খানিকটা বাঁকা হলো। কি চাচ্ছে এই মেয়ে?
তানহা দৌড়ে এসে সবার সামনেই সাদিদকে জড়িয়ে ধরল। সাদিদ ছাড়ানোর আগেই সে এবার ছেড়ে দিলো। তারপর হাসিমুখেই বলল,
— ‘ কনগ্রচুলেশনস ইয়ার। আ’ম ভেরি হেপি ফর ইউ। ‘
— ‘ হুয়াট ডু ইউ মিন তানহা? ‘
— ‘ এখনও গোপন রাখবি? তুই এতবড় মিথ্যাবাদি কবে থেকে হয়েছিস? নীলাকে পছন্দ করিস আর সেটা আমরা কেউ জানলাম না? ‘
এতক্ষণে বিষয়টা সবার মাথায় এসেছে। আর মুহূর্তেই সাদিদ ব্যতিত সবার মুখে হাসির রেখাটা ফোটে উঠেছে। তানহা আবারও বলল,
— ‘ কিন্তু যাই বল। দিনশেষে হলেও আমি ভীষণ খুশি। আরে বন্ধুর বিয়ে বলে কথা। চুটিয়ে আনন্দ করব। পেট ভরে তোর বিয়ের খাবার খাব। ‘
— ‘ শুধু বন্ধুরটা খেলে হবে? নিজেরটা আমাদের খাওয়াতে হবে না? ফুপি কিন্তু আমাদের কাছে সব বলেছে। রায়ানকে আর কত অপেক্ষা করাবে? ‘
— ‘ আরে ভাবী তুমিও না কিসের মধ্যে কি? এত আনন্দের মতো সেই পানসোটে ছেলেকে কেন আনছ? এখন শুধু মিষ্টি কথাবার্তা হবে। অনলি মিষ্টি। ‘
তানহার কথায় সবাই আরেকদফা হাসলেও সাদিদ পাড়ছে না। বিষয়টা তার কাছে মোটেই ঠিক লাগছে না৷ এ যেন সবার জন্য তৈরি করা সুন্দর এক ছবি। কিন্তু ভেতরটা তার একেবারে নড়বড়ে।
তানহাকে সাদিদের বিয়ে নিয়ে এতটা এক্সাইটেড দেখে না চাইতেও সে খানিকটা চমকিত। তার কেন যেন বিষয়টা তানহা যতটা নরমাল দেখাচ্ছে, ততটা মনে হচ্ছে না। কোথায় যেন একটু কিন্তু রয়েছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই সাদিদ মাথা ঝাঁকাল। হয়তো তানহার এতদিনের পাগলামির জন্য হঠাৎ করে এমনটা সাদিদকে খানিকটা অবাক করছে। সাদিদ সব নেগেটিভ চিন্তা ছেড়ে পজিটিভটাই বেছে নিলো। এগিয়ে গিয়ে তানহার সামনে দাঁড়াল। মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বলল,
— ‘ আ’ম অলসো হেপি ফর ইউ। ‘
সাদিদের কথাটার অর্ন্তনিহিত অর্থ আর কেউ বুঝতে পারুক আর না পারুক, তানহার জন্য সমস্যা হলো না। সেও মিষ্টি হেসে বিপরীত প্রতিক্রিয়া জানাল। সাদিদ হাসিমুখেই সিঁড়ি বেয়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেল। তানহা সেদিকে তাকিয়ে হাসছে। আজ যে তার খুশির দিন। বড্ড খুশি। সে না হাসলে হাসবেটা কে?
_______________
এতরাতে ফোনের শব্দে শান্তর কাঁচা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটল। সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ বন্ধ রেখেই এলেমেলো হাতড়ে ফোনটা নিলো৷ কোনোভাবে রিসিভ করে বলল,
— ‘ হ্যালো। ‘
— ‘ ______________’
কিন্তু না অপরপাশ থেকে কোনোরকম আওয়াজ আসছে না৷ শান্ত আবারও হ্যালো হ্যালো করে এবার চোখ খোলল৷ অপরিচিত নাম্বার থেকে কল। কিন্তু এতরাতে এমন ফাইজলামি ভালো লাগে?
— ‘ ধুর ছাই। এতরাতে এগুলোর কোনো মানে হয়? ‘
শান্ত রাগ নিয়েই ফোন কেটে দিলো। তারপর আবারও চোখ বন্ধ করল। অপরদিকে ফোনের অপরপাশের ব্যক্তির চোখে ঘুম নেই। তার রাত নির্ঘুম কাটছে।
শান্তর রাগী আওয়াজ শুনে নিজের অজান্তেই তানবীরের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের এমন অদ্ভুত ব্যবহারের জন্য সে বিরক্ত হলো। এতরাতে এমনটা করার কোনো মানে হয়? আর সব থেকে বড় কথা সে শান্তকে কল দিলো-ই বা কি জন্য?
মন বলতে চাইলেও তানবীর সেটা শুনতে নারাজ। সে রাগ দেখিয়ে ফোনটা একটু দূরে ছুঁড়ে ফেলল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবারও নিজের হাতে নিলো। ফোনে খুব বেশি ছবি নেই। কিন্তু তাদের দার্জিলিং ট্রুরের কয়েকটা ছবি রয়েছে। তানবীর গ্যালারী ঘেটে সেইগুলো-ই দেখছে। আর আপনমনে একজনকেই তাতে খোঁজে চলেছে।
অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যক্তির মুখটা ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই তানবীরের মুখে প্রকাশ না করতে চাওয়া টুকরো হাসির রেখা ফোটে উঠল।
সে শান্তর মায়াভরা মুখটার উপর নিজের হাত স্পর্শ করল। ভাবটা এমন যে সে বাস্তবেই শান্তকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত পার হতেই তানবীর সজোরে ফোনটা দেয়ালে আছাড় দিলো। মুহূর্তেই ফোনটা ভেঙে কয়েক টুকরো হলো। আর তার সাথে টুকরো হলো জমানো স্মতিগুলো।
তানবীরের উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের মুখটা নিমিষেই লালচে বর্ণে পরিণত হলো। তার শরীরের রগগুলো যেন সব টগবগিয়ে ফোটে উঠল। সে রাগে রীতিমতো ফুঁসছে। হঠাৎ তার এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ কি?
তানবীর রাগ মিশ্রিত গলায় বলে উঠল,
— ‘ সব একরকম, সব। ‘
বলেই বিছানার বালিসগুলো মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। চাদর টেনে নিমিষেই পরিপাটি বিছানার বেহাল দশা করল।
নিজের সাথে লড়াই করে ক্লান্ত তানবীর অবশেষে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। চোখের কার্নিশ তার চিকচিক করছে। সেটা কি অশ্রুকণা? কিন্তু কেন? তানবীরের চোখে জল কেন?
তানবীর আবারও আটকে যাওয়া গলায় বলল,
— ‘ আই জাস্ট হেইট ইউ। ‘
#চলবে…
গল্পঃ #অন্তরালের_অনুরাগ
লেখনীতেঃ #নাহিদা_নীলা
#পর্বঃ ২৫ ♥🌹♥
শুক্রবার মানেই আলাদা একটা ব্যাপার। সাপ্তাহিক এই দিনটি যেন ব্যস্ততায় ঘিরে থাকা জনমানবের জন্য আলাদা একটি স্বস্তি। আলাদা একটা উৎসবমুখর আমেজ। সাদিদ-নীলা পরিবারের জন্যও এর কোনো ব্যাতিক্রম নেই। বরং আজকের শুক্রবারটি যেন তাদের জন্য দ্বিগুণ আনন্দের ঢেউ তোলবার সমান। কেননা আজকে যে সাদিদ-নীলার এনগেজমেন্টের দিন। দুই পরিবারের কাছে-ই বিয়েটা পরিষ্কার হলেও তাদের আনন্দে পালনে যেন বিন্দুমাত্র কমতি নেই। বরং সবাই জোর আয়োজনে নতুন বউ বরণের প্রস্তুতিতে লেগে রয়েছে।
নীলাকে বসে থাকতে দেখে নিধি এবার তাড়া দিলো।
— ‘ কিরে হয়েছে তোর? সবকিছু নিয়ে নিয়েছিস তো? আমাদের হাতে কিন্তু সময় থাকবে না। ‘
— ‘ হ্যাঁ এইতো শেষ। ‘
নীলা আবারও এনগেজমেন্টের ড্রেসটার উপর হাত বুলিয়ে নিলো। সাদিদ নিজে পছন্দ করে তার জন্য নিধির হাতে এটা পাঠিয়েছে। কতটুকু ভালোবাসা মিশে আছে নীলা সেটা অনুভব করতে পারে। নীলাকে তারপরও ধ্যানে থাকতে দেখে শান্ত দুষ্টু হেসে বলল,
— ‘ হেরে, তুই এতো জামাই পাগল কবে থেকে হলি রে নীল? জিজুকে ছাড়া তো দেখছি কিছু চিন্তা-ই করতে পাড়ছিস না। আমাদেরকেও একটু দেখ। ‘
নীলা মাথা নিচু করে লাজুক হেসে শান্তকে আস্তে করে চড় বসাল। নিধিও পাশ থেকে নিঃশব্দে হাসছে। প্রকাশ না করলেও বোনকে স্বামীর সাথে এতটা খুশি দেখে তার ভিতরাটাও শীতল হচ্ছে।
নীলা-নিধিরা মা-বাবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
গুলশানের নিকেতনে এসে নীলাদের গাড়ি থামল। সাদিদ আগেই নীলাসহ বাড়ির সব মেয়েদের জন্য জাহিদ খান ব্রাইডাল মেকওভারের থেকে এপয়েনমেন্ট নিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু নীলার মেকআপ করতে গিয়ে হলো আরেক বিপত্তি। নীলা বুঝে পায় না তার বরটা কি আসলেই পাগল-টাগল হয়ে গেল নাকি! নতুবা এমন একটা জায়গায় এনে কেউ এমন কথা বলে?
কেননা সাদিদ নিজে পারসোনালি নীলার জন্য মেকআপের সীমানা তৈরি করে দিয়েছে।
তার বানানো রুলসগুলো হচ্ছে, বেশি মেকআপের প্রয়োজন নেই। কোনোভাবেই যেন আর্টিফিশিয়াল কিছু ব্যবহার করে নীলার ন্যাচারালিটি নষ্ট না করা হয়। খুব সামান্য এবং সিম্পল একটা মেকওভার লুক যেন তাকে দেওয়া হয়।
আশেপাশের সবার সাদিদকে জড়িয়ে নীলার প্রতি এতটা ভালোবাসার কথা শুনে তার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। নিধি শান্তও পাশ থেকে অনবরত ঠোঁট টিপে হাসছে।
অবশেষে সাদিদের বলা কথা অনুযায়ী নীলাকে খুব সিম্পল একটা মেকওভার দেওয়া হয়েছে। তার ড্রেসের সাথে মিলিয়ে হালকা আই মেকাপ। ড্রেসটা বেশ গর্জিয়াস। তাই আউটফিটের সাথে যেন ম্যাচ করে তাই ঠোঁটে মেরুন শেডের লিপস্টিক। মুখে আর কোনো সাজ নেই। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে নিচের অংশে হালকা বাউন্সি করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাস নীলার সাজ কমপ্লিট। এনগেজমেন্ট তার হলেও সাদিদের জন্য সবার আগে তার-ই সাজ কমপ্লিট হয়ে গিয়েছে। নীলা অবশ্য এতে বেশ খুশি। কেননা তার কোনো কালেই এসব ভারি সাজসজ্জা পছন্দ নয়। সাদিদ যখন বলল এনগেজমেন্টের জন্য সে নীলাসহ তাদের সবার এপয়েনমেন্ট এখানে ফিক্সড করেছে, তখন নীলা ভেবেছিল তাকেও বেশ ভারি একটা সাজ দিতে হবে। কিন্তু না, এমন কিছুই হলো না।
দুটি মানুষ ভিন্ন হয়েও যেন তারা একি সত্তা। এসব ভাবতেই নীলার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে আবারও আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো। তার এই মুহূর্তে সাদিদের রিয়েকশনের কথা চিন্তা করেই খুব লজ্জা লাগছে। সাদিদ কি করবে? নীলাকে এমনরূপে দেখে তার কতটুকু ভালো লাগবে? নীলা মাথা নিচু করে লাজুক হাসছে।
তার ভাবনায় ছেদ ঘটে প্রিয়তীর ভয়ংকর কথা শুনে,
— ‘ একটু কম মনে হচ্ছে। আরেকটু গাঢ় করুন। আমার ড্রেসের সাথে যাচ্ছে না। ‘
নীলাসহ বাদবাকি সবাই প্রিয়তীর দিকে নজর দিলো। সাজের উপরের যদি কোনোটা থাকে প্রিয়তী তাহলে সেটাই করিয়েছে। তারপরও নাকি এই মেয়ের জন্য এটা কম মনে হচ্ছে!
মেকআপ আর্টিস্টও প্রিয়তীর দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তার কাজের এক্সপেরিয়েন্স বলছে এখন-ই বেশি হয়েছে। আর কিছু ব্যবহার করলে পুরো জঘন্য হবে। কিন্তু প্রিয়তীর চোখে সেটা পড়ছে না।
— ‘ প্রিয়তী, আর লাগায় না বোন। তোমাকে এমনিতেই খুব ভালো লাগছে। ‘
— ‘ ভাবী একটু কম…
— ‘ আরে দিদিভাই আর একটুও লাগবে না। নতুবা অর্ণব ভাইয়া কিন্তু আজ হার্ট অ্যাটাক করে ফেলতে পারে। ‘
শান্তর কথায় প্রিয়তী লজ্জা পেল। আর তাতে কাজও হলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে আপাতত সাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। নিধি-শান্তরও মেকাপ কমপ্লিট। তাই সকলেই এবার পদ্মলয়ার উদ্দেশ্য বেড়িয়ে পড়ল।
কেননা সাদিদ-নীলার এনগেজমেন্টের সকল আয়োজন পদ্মলয়াতেই করা হয়েছে।
.
সাদিদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গলার টাইটা ঠিক করছে। তার দুইপাশেই তানবীর-অর্ণব ক্রমাগত ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে যাচ্ছে। সাদিদ ঘড়ি পড়তে পড়তে এবার বলেই ফেলল,
— ‘ হোয়াটস ইউর প্রবলেম গাইস? ‘
— ‘ কোথায় প্রবলেম? আমরা তো দিব্বি আছি। ‘
বলেই দুই বান্দর আবারও হেসে হাই ফাইভ করল। সাদিদ আর কিছু বলল না। এনগেজমেন্ট পার্টির জন্য তৈরি হতে লাগল। তানবীর আর অর্ণব এবার তার পাশে এসে দাঁড়ালো। দুইজনে-ই একহাতে সাদিদের কাঁধ জড়িয়ে ধরল। সাদিদের তো অবস্থা খারাপ। মোটামোটি তাকে শক্ত করেই চেপে ধরা হয়েছে।
— ‘ এই, কি করছিস তোরা? শ্বাস আটকে যাচ্ছে তো। ‘
— ‘ ওহ্ এখন আমরা কাছে ঘেঁষলেই সমস্যা! নীলা যখন ধরে তখনতো তুমি বেশ খুশি-খুশি থাক। ‘
— ‘ ফাস্ট অফ অল নীলাঞ্জনা কখনও তোদের মতো ধরে না৷ আর দ্বিতীয়ত তার ধরা আর তোদের ধরা কি এক? কোথায় তার মোমের মতো নরম হাত, আর কোথায় তোদের কাঠের ন্যায় শক্ত! ‘
অর্ণব সাদিদের কথায় হেসে দিয়ে তার পেটে ঘুষি দিলো। সাদিদও পেট ধরে হাসছে।
— ‘ হারামি, মেরে ফেলবি নাকি? ‘
— ‘ শুধু তোকে না। তোদের দুইটা কেই মেরে ফেলা ধরকার। আমাকে এমন সিঙ্গেল দুনিয়ায় একলা রেখে তোরা দুইটা মিঙ্গেল হয়ে বসে আছিস। একজনতো এখন বিবাহিত ব্যাচেলর। আর অপরজনও দুইদিন পর বিবাহিতদের কাতারে নাম লেখাচ্ছে। ‘
— ‘ তোকে কে মানা করেছে? তুইও নাম লেখিয়ে ফেল। ‘
— ‘ শালা বাদ দে। ঐসব মেয়ে-টেয়ে আমার ভাগ্য নেই। তাছাড়া এসব উটকো মার্কা ঝামেলা আমার চাইও না। আ’ম হেপি উইথ মাই লাইফ। ‘
— ‘ সত্যি-ই? ‘
সাদিদ তানবীরের কাঁধে হাত রেখে কথাটা বলে উঠতেই সে তার দিকে তাকালো। কিন্তু পরমুহূর্তেই তানবীর চোখ সরিয়ে দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলে উঠল,
— ‘ শালা, সত্য নয়তো আর কি? আমার কি আর তোর মতো ভাগ্য হবে? আমার মতো হতভাগা মানুষ যেখানে একবার-ই বিয়ে করতে পাড়ছি না, সেখানে তুই দুই-দুইবার বিয়ের পিড়িতে বসছিস? হারামি তোর নামে তো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা উচিত। সিঙ্গেল সমাজের হৃদয় পুড়ানো কি কোনো অংশে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধের চেয়ে কম? ‘
সাদিদ মৃদু হাসল। আপাতত তানবীরকে আর ঘাটলো না। রেডি হয়ে তাদেরকে নিয়ে গার্ডেন এড়িয়াতে চলে আসলো। অনুষ্ঠানের জন্য সব আয়োজন এখানেই করা হয়েছে। সাদিদকে আসতে দেখে শায়লা রহমান এগিয়ে আসলেন। ছেলের গালে দুইহাত দিয়ে মাথাটা নিচু করে কপালে স্নেহের চুমু দিলেন।
— ‘ আমার বাবাটাকে রাজপুত্র লাগছে। ‘
— ‘ আজকেই প্রথম লাগছে? অন্য সময় বুঝি লাগে না? ‘
শায়লা রহমান আস্তে করে সাদিদের গালে চাপড় দিয়ে হেসে দিলো। সাদিদও মাকে জড়িয়ে নিয়ে হাসছে।
পাশ থেকে শাদমান এসব শুনে দৌড়ে শাহেদের কাছে এগিয়ে গেল।
— ‘ বাবা, মা কোথায়? ‘
শাহেদ ছেলেকে নিচের থেকে কোলে তোলে নিলো।ছেলের গালে আদর দিয়ে বলল,
— ‘ কেন বাবা? কিছু প্রয়োজন তোমার? মা তো একটু বাহিরে গিয়েছে। কি দরকার বাবাকে বলো। ‘
— ‘ মা চুমু দিবে। ‘
শাহেদ বাচ্চার কথা শুনে খানিকটা অবাক হলো। সে জিজ্ঞাসা দৃষ্টি নিয়েই বলল,
— ‘ হঠাৎ এই কথা কেন? ‘
— ‘ আ’ম অলসো লুকিং লাইক এ প্রিন্স। দ্যাটস্ হুয়াই মাম্মা সোড কিস মি। ‘
পাকনা ছেলের কথা কর্ণকোহরে যেতেই শাহেদ আওয়াজ করে হেসে ফেলল। তারপর বুকে জড়িয়ে ছেলের সারা মুখে স্নেহের আদর দিলো। পাশ থেকে সাদিদ আর শায়লা রহমানও হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। সাদিদ ভাইয়ের কোল থেকেই ভাতিজাকে ঝাপটে ধরে চুমু খেল।
— ‘ বাবা, পাপু গাল খেয়ে ফেলছে। ‘
ছোট্ট শাদমানের অবুঝ বিচারে উপস্থিত সবাই আবারও একদফা হাসল। তাদের হাসাহাসির মধ্যেই শাদমান হঠাৎ জোরে চেঁচিয়ে উঠল,
— ‘ মা এসেছে, মা এসেছে। ‘
তার কথায় সবাই পিছনে ফিরল। নিধি-নীলাসহ গুটিকয়েক রমনী গাড়ি থেকে নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে। এ যেন একঝাঁক কালো পরীদের মিলনমেলা। কেননা কালো ড্রেসে সবাইকেই ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। শায়লা রহমানসহ শাহেদ তাদের দিকে এগিয়ে গেল। শাদমান মাকে পেয়েই মায়ের কোলে ঝাপ দিলো।
— ‘ মাম্মা, ইউ লুক সো বিউটিফুল। ‘
নিধি ছেলের কথায় হাসল। ছেলের কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল।
— ‘ আমার আব্বুটাকেও ভীষণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে। ‘
— ‘ প্রিন্স, প্রিন্স। ‘
ছোট্ট শাদমান সুটের কলার টেনে বড়দের মতো কথাটা বলেছে। নিধি হেসে দিয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। প্রাণটা যেন এতক্ষণে শীতল হলো তার। বাচ্চাটাকে ছাড়া নিধির কাছে সবকিছুই পানসে মনে হয়। মা-ছেলের আদরঘন মুহূর্ত দেখে শাহেদ এসে পাশে দাঁড়াল। সবাইকে একপলক দেখে নিয়ে নিধির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
— ‘ শুধু ছেলেকেই আদর করলে হবে? ছেলের বাবাকে কি কম হ্যান্ডসাম লাগছে? আদরতো আমারও পাওনা। ‘
নিধি চোখ বাঁকিয়ে শাহেদের দিকে তাকাতেই শাহেদও ঠোঁট বাঁকিয়ে চুমু দেখাল। নিধি লজ্জা পেয়ে শাহেদের বুকে আস্তে করে কিল বসাল।
— ‘ অসভ্য। ‘
শাহেদ নিধির নিচুস্বরের লাজুক কন্ঠস্বর শুনে হেসে ফেলল।
রমনীদের দেখে আরও কয়েকজনের দৃষ্টিও স্থির হয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে সাদিদও একজন।
সে কেবল নিষ্পলকভাবে সামনের মেয়েটাকে দেখছে। যে কি-না সাদিদের হৃদয়ের খুব কাছের। সাদিদের অস্তিত্বে মিশে যাওয়া এই মেয়েটার প্রেমে যেন সাদিদ বারবার পড়ে। যেমনটা এখনও হচ্ছে। আবারও যেন এই মেয়েটার প্রেমে সে পড়ে গেল।
কে বলে পুরুষ মানুষ কখনও এক নারীতে সন্তুষ্ট হতে পারে না? এমনটা চিন্তা করা একদম ঠিক নয়। কেননা যে পুরুষ মন থেকে কোনো নারীর প্রতি আসক্ত হয় তার চোখে বাকিসব অর্থহীন। হাজারও সৌন্দর্যের মধ্যে তার চোখে কেবল একজনের জন্যই মুগ্ধতা বিরাজ করে। আর যারা ভালোলাগাকে ভালোবাসার নাম দিয়ে চলে তাদের জন্য এগুলো নয়। সত্যিকার অর্থে কাউকে ভালোবাসলে কখনও অন্যদিকে চোখ দেওয়া যায় না। ইনফেক্ট আপনি হাজার চাইলেও অন্যদিকে চোখ ফেরাতে পারবেন না। বারবার সেই নারী-ই কেবল আপনার শয়নেস্বপনে চলে আসবে। তার কাছেই ছুটে যেতে চাইবেন। শুধু একবার নয় বারবার, প্রতিবার।
সাদিদও নিঃসন্দেহে সেই সকল ছুটে যাওয়া পুরুষদের মধ্যেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে। নতুবা এতএত রমণীদের মধ্যে সাদিদের চোখ কেবলমাত্র একজনের দিকেই কেন স্থির? কেন সে চেয়েও নিজের দৃষ্টি ফিরাতে পাড়ছে না?
সাদিদ শুকনো ঢুল গিলল। এতক্ষণ মুগ্ধতায় ঘিরে থাকলেও এখন সে ক্রমশ নীলার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। ভয়ংকর এক নেশা। যে নেশার মায়াজাল থেকে নীলা ব্যতিত আর কেউ সাদিদকে উদ্ধার করতে পারবে না।
সাদিদ পরপর কয়েকটা ঢুক গিলে আবারও নীলাকে উপর থেকে নিচ পরখ করতে লাগল।
নীলার পরনে ব্ল্যাক এন্ড সিলভার কালার কম্বিনেশনর গর্জিয়াস লং স্লিভের একটা লেহেঙ্গা। তাদের এনগেজমেন্ট পার্টির জন্য কালার থিম ব্ল্যাক এন্ড সিলভার করা হয়েছে। সেইজন্য সাদিদ নিজে নীলার জন্য ব্ল্যাক এন্ড সিলভারের মিক্সড কম্বিনেশনের ড্রেস পছন্দ করেছে। যখন সে ড্রেসটা নিয়েছিল কল্পনাতেই ভেবেছিল নীলাকে এতে বেশ সুন্দর মানাবে। তার মিষ্টি বউটাকে আরও মিষ্টি লাগবে।
কিন্তু এখনতো তাকে প্রাণঘাতী মনে হচ্ছে সাদিদের কাছে। ভয়ংকর প্রাণনাশী এক রমনী। যে কি-না সাদিদকে পুরোপুরি জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
সাদিদ নিজের লাল চক্ষু নিয়েই নীলার দিকে এগিয়ে গেল। সাদিদকে এগিয়ে আসতে দেখে নীলাও মাথা উঁচু করে তাকালো। কিন্তু একপলক দেখেই সে লজ্জা পেয়ে আবারও মাথা নিচু করল।
ইশশ তার বরটা এতো কিউট কেন? নিজের মনে এসব ভেবে নীলা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে হাসল। তার অবাধ্য মনের ভীষণ ইচ্ছে সাদিদকে প্রাণভরে দেখার। সে নিজের মনের কথা-ই শেষমেষ শুনল। মাথা তোলে সাদিদের দিকে তাকালো।
স্টাইলিস ফ্রুল ব্ল্যাক সুটে সাদিদকে বড্ড হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে। নীলার কাছে তো হ্যান্ডসামের চেয়ে কিউট বেশি মনে হচ্ছে। ফর্সা শরীরের সাথে কালো রঙটা যেন ঝলমল করছে। সাথে পায়ে ব্ল্যাক সু, চোপার্ডের ব্ল্যাক ওয়াচ। গলায় আর কোটের ইনসার্টের সিলভার ছাড়া সাদিদ পুরো ব্ল্যাকে নিজেকে তৈরি করেছে। সাথে যোগ করেছে স্টাইলিস হেয়ার। নিজের সিল্কি চুলগুলোকে জেল দিয়ে পুরো সেট করে রেখেছে।
নীলার চোখে-মুখে মুহূর্তেই একঝাঁক মুগ্ধতা এসে ভিড় করল। সে ভাবতেই পুলকিত হচ্ছে যে এই সুদর্শন যুবকটি তার একান্ত ব্যক্তিগত। তার সবচেয়ে কাছের সত্তা। নীলার এতক্ষণের মুগ্ধতায় সাদিদের নিচু কন্ঠস্বরটা যেন আলোড়ন সৃষ্টি করল।
— ‘ সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর। এককথায় প্রাণনাশী। সাদিদের জন্য ভয়ংকর প্রাণঘাতী রমনী৷ ‘
নীলা লজ্জায় থুতনি একেবারে গলার সাথে মিশিয়ে নিলো। সাদিদের তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো-ই বলে দিচ্ছে সাদিদের নেশা ধরেছে। ভয়ংকর নেশা।
পাশ থেকে কাশির আওয়াজে সাদিদ সোজা হয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণ দিন-ক্ষণ ভুলে প্রেমে মত্ত ছিল দুইজন। এখন সবার ঠোঁট টিপে হাসা দেখে সাদিদও নীলার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। অপরদিকে নীলার সম্ভব হলে এখান থেকে দৌড়ে পালাতো। ইশশ কি লজ্জা!
এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ধাপের জন্য সাদিদ এবার নীলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। নীলা একপলক তাকিয়ে তার হাতে নিজের হাত রাখল। আর সাথে সাথেই সাদিদ নীলার হাতে শক্ত করে চাপ দিলো। নীলা ঘাড় ঘুরিয়ে অপরদিকে তাকিয়ে লাজুক হাসল।
সাদিদ তাকে নিয়ে সোজা স্টেজে গেল। এতক্ষণে নীলা আশেপাশে খেয়াল করতে পাড়ছে। এককথায় মনোমুগ্ধকর। নীলাকে বলে দিতে হবে না এর পিছনে কার হাত রয়েছে। এতদিনে সে এতটুকু অবশ্যই বুঝে নিতে পেড়েছে। সবকিছুতেই নীলার চোখে সাদিদের পছন্দটা সমানে লাগছে।
অর্কিড আর সাদা গোলাপে সবকিছু ডেকোরেশন করা হয়েছে। কালো আর সিলভার কালার থিমের সাদা আর এই ভিন্ন রঙের অর্কিডগুলো যেন পরিবেশটাকে আরও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ করছে। আর তার সাথে তো আছেই নানারকম উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে মুগ্ধতায় নীলার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। সে মুগ্ধতায় ভরা দৃষ্টি নিয়ে পাশে থাকা সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদ তার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। নীলা কিছু বলতে চেয়েও সাদিদের এই দৃষ্টির সামনে কিছু বলতে পাড়ল না।
একেএকে সবাই স্টেজে চলে আসলো। নিধি সাদিদের দিকে রিং বক্সটা তোলে দিলো। সাদিদ একপলক নীলার দিকে তাকিয়ে তার অনামিকা আঙ্গুলে খুব যত্নে রিংটা পরিয়ে দিলো। সাথে সাথেই চারপাশ থেকে করতালির আওয়াজ কানে আসতে লাগল। নীলা নিজের আঙ্গুলে জায়গা করে নেওয়া আংটিটার দিকে তাকালো। পরমুহূর্তেই লজ্জা ভুলে অশ্রুসিক্ত চোখে সে সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদ মিষ্টি হাসছে।
নীলা এবার ডানহাতটা দিয়ে বামহাতটা বুকে জড়িয়ে ধরল। আর গাল বেয়ে তার গড়িয়ে পড়ছে সুখের অশ্রুজল।
আংটির সৌন্দর্যে নয়, বরং সাদিদের ছোট্ট ছোট্ট বিষয়গুলোতে এতটা খেয়াল দেখেই নীলার চোখে এই অশ্রুজল।
সাদিদ নিজের এবং নীলার নামের প্রথম অক্ষরের ডিজাইনের আধলে নীলার হাতের আংটিটা তৈরি করিয়েছে। নীলা আবারও অশ্রুসিক্ত চোখে নিজের হাতের দিকে তাকালো।
হিরের আংটিটা রাতের খানিকটা অন্ধকার আভায় ঝলঝল করছে। সাথে ঝলঝল করছে এসের মধ্যে এন। মানে সাদিদের এস অক্ষরের মাঝে নীলার এন ডিজাইন করা হয়েছে। আর তাদেরকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছে একটা লাভ শেপের ডিজাইন।
এই ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে নীলাকে ইমোশনাল হতে দেখে সাদিদ হাসল। উপস্থিত সবার সামনেই নীলার গালে সে একহাত রাখল। আর সবকিছু ভুলে প্রিয়তমার কপালে আঁকল ভালোবাসার চুম্বন।
তাদেরকে এই অবস্থায় দেখে বন্ধু-বান্ধবগুলো মুহূর্তেই সিটি বাজাতে শুরু করল। আর বড়রা এবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিঃশব্দে হাসছে।
আর এদিকে নীলার অবস্থা সবদিক দিয়েই কাহিল।
— ‘ পিচ্চু এবারতো সাদিদকে রিংটা পরা। বেচারাকে আর কত অপেক্ষা করাবি? ‘
— ‘ হ্যাঁ ভাবীমণি কেবলমাত্র তুমি-ই আমার দুঃখটা বুঝলে। তোমার লজ্জাবতী লাজুকলতা বোনের জন্য আমার হাত ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। ‘
নীলা সাদিদের দুষ্টুমিতে নিঃশব্দে হাসল। তারপর তার ডানহাতে আস্তে ধীরে রিংটা পরিয়ে দিলো। নির্লজ্জ সাদিদ নীলার দিকে তাকিয়ে হাতের আংটিতে চুমু খেল। আবারও একবার চারপাশ থেকে যুবসমাজের হাসির রুল পড়ে গেল। আর বরাবরের মতোই লজ্জাবতী নীলা চুপসে গেল।
— ‘ ম্যাম, আপনার হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। ‘
ওয়েটার ছেলেটার বিচলিত কন্ঠস্বর শোনে তানহা বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিজের হাতের দিকে তাকালো। এমন একটা ভাব যেন এটা কিছুই না। হাত গড়িয়ে রক্ত পড়ছে অথচ তানহার ব্যাথায় কুঁকড়ে যাবার কোনো নামনিশানা নেই। সে রক্তমাখা হাতেই আরেকটা ডিক্সের গ্লাস তোলে নিলো।
ফ্যামিলি পার্টি, তাই কোনোরকম হার্ড ডিক্সের ব্যবস্থা সাদিদ করতে দেয়নি৷ তাই তানহার হাতে কেবল সর্ফট ডিক্স-ই রয়েছে। সে পুরো গ্লাসটা খালি করে আবারও স্টেজের দিকে তাকালো। যেখানে মুগ্ধতা থাকার কথা সেখানে তানহার চোখগুলো জ্বলছে। মনে হচ্ছে তার চোখে আগুন জ্বলছে। লাল টকটকে চোখজোড়া নিয়ে তানহা একদৃষ্টিতে এই হাসিমাখা কাপলযুগলে পরখ করছে। এ যেন মৃত্যু প্রায় কোনো প্রাণীর দিকে এক শকুনের দৃষ্টি। যে কি-না কেবলমাত্র প্রাণীটির শেষ নিঃশ্বাসের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রাণটা একবার বেড়িয়ে গেলেই যে নিজের তৃপ্তি নিয়ে তার আহার করবে। সম্পূর্ণ রাজভোজের তৃপ্তি।
___________________
সমবয়সীদের চিল্লাচিল্লিতে সাদিদ-নীলাকেও মাস্ক পার্টিতে সামিল হতে হয়েছে। এটা এনগেজমেন্ট পার্টির-ই একটা অংশ হিসেবে সেট করা হয়েছিল। কথা ছিল সাদিদ-নীলা শুধু এনজয় করবে। এখন সবগুলো দুষ্টুর চাপে তাদেরকেও জয়েন করতে হয়েছে। বড়রা আপাতত খাবারের সাইডে বিজি। এমন ইয়াংদের দুষ্টুমির মাঝে নিজেরা থেকে অযথা লজ্জা পাবার মানে হয়?
তাই তারাও নিজেদের অজুহাতে কেটে পড়েছে।
সবার মুখেই ব্ল্যাকের বিভিন্ন ডিজাইনের ফ্যান্সি মাস্ক।
সাদিদ নীলার পিছনে দাঁড়িয়ে তার মুখে মাস্কটা বেঁধে দিলো। তারপর নীলার হালকা এলেমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করতে লাগল। নীলা বরাবরের মতোই মাথা নিচু করে লাজুল হাসছে।
শান্ত মাস্ক লাগিয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে কাপল ডান্সের এনাউন্সমেন্ট করা হয়েছে। শান্তর নিজেকে এখন বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে। নিজের সিঙ্গেল লাইফকে সে এখন মনে মনে অভিশাপ দিচ্ছে। যা মুখে আসছে তাই অকপটে নিজের মনের জন্য বরাদ্দ করছে।
শান্ত আবারও ডান্স ফ্লোরের দিকে তাকালো। যে যার পার্টনার নিয়ে হাজির। দূর থেকে অর্ণব আর প্রিয়তীর ফিসফিসিয়ে প্রেমআলাপও দেখা যাচ্ছে। শাহেদ-নিধিও রয়েছে। তাদের যে একটা পাকনা ছেলে রয়েছে এই কাপলযুগলকে দেখে সেটা বুঝার উপায় নেই। এখনও সদ্য বিবাহিত দম্পতির ন্যায় প্রেম জমাচ্ছে তারা। শাহেদ বারবার দুষ্টুমি করছে আর নিধি চোখ গরম করে তাকাচ্ছে। আর পরমুহূর্তেই শাহেদের অসভ্য চাহনির সামনে টিকতে না পেরে তার বুকেই মুখ গোঁজছে।
শান্ত এসব দেখে হতাশাজনক একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বিরক্তি নিয়ে মুখের মাস্কটা খোলতে গেলেই তার হাতগুলো থেমে গেল।
সবার ড্রেস-ই কালো আর সিলভারের। তাই এমন মাস্ক পরাতে আলাদাভাবে কাউকে চেনা মুশকিল। তারউপর ছেলেদের চেনাতো আরও টাফ। মেয়ে হলে তারপরও ড্রেসের ডিজাইনে আন্দাজ করা যাচ্ছে। যেটা ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা হচ্ছে। শান্তরও একি অবস্থা। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে সে চিনতে পাড়ছে না।
মুখে মাস্ক থাকাতে কেবলমাত্র চোখগুলো-ই দেখা যাচ্ছে। শান্তর মনে হচ্ছে এই চোখের মালিক তার পরিচিত। খুব বেশি-ই পরিচিত।
শান্ত কিছু বলবে তার আগেই সামনের ছেলেটি বিনাবাক্য তার দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলো। শান্ত চমকিত দৃষ্টিতে একবার সেই ছেলের মুখের দিকে আরেকবার তার এগিয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকাচ্ছে।
শান্তকে ভাবনায় দেখে বাড়িয়ে দেওয়া হাতটি এবার শান্তর ডানহাত চেপে ধরল। এবং খুব অধিকার নিয়ে নিজের সাথে তাকে ডান্স ফ্লোরে হাজির করল।
— ‘ কে আপনি? ‘
কিন্তু না। এবারও কোনো উত্তর আসলো না। শান্ত এতক্ষণ শকে থাকলেও এবার বিরক্ত। বিরক্তি নিয়ে সে চলে যেতে ধরতেই তার গাউনের উপর দিয়ে কোমড়ে শক্ত হাতের ছোঁয়া পেল। শান্ত কেঁপে উঠে মাস্ক পরা ছেলের চোখের দিকে তাকালো। এই স্পর্শটাও শান্তর নিকট পরিচিত। এমনকি সামনে দাঁড়ানো ছেলেটির শরীরের ঘ্রাণও শান্তর নিকট ভীষণ পরিচিত। শান্ত তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তির চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কন্ঠে বলল,
— ‘ আপনি? ‘
তানবীর এবার নিঃশব্দে মৃদু হাসল। মাস্কের আড়ালে তানবীরের ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসিটা শান্তর চোখ এড়ালো না। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণাতেও দেখা মিলল মিষ্টি হাসি। সামনের মানুষটির সামনে প্রকাশ না করলেও শান্তর মনের কোণায় কোথাও একটু আশার বাসা বেঁধেছিল৷ তার অবাধ্য মন না চাইতেও তানবীরকে এতক্ষণ খোঁজেছে৷ আর এখন নিজের এতটা কাছে দেখে শান্তর খুশিরা যেন বাঁধ ভেঙেছে।
আচমকা কোমড়ে আরও জোরে চাপ অনুভব হতেই শান্ত কেঁপে উঠে তানবীরের কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
তানবীরও চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস টানল। নিজেকে তার কেমন মাতাল মাতাল লাগছে। শান্তকে এইরূপে দেখে না চাইতেও তার পুরুষ মনটা শান্তকে কাছে চাইছে। নিজের একান্ত কাছে।
নিজের এমন চিন্তায় তানবীর নিজেই বিরক্ত। সে শুরু থেকে শান্তকে খেয়াল করেছে। হাজার চেয়েও নিজেকে তার থেকে দূরে রাখতে পাড়ল না৷ অবশেষে শান্তর কাছে আসতে বাধ্য হলো৷ নিজের অবাধ্য মনকে হাজার বুঝিয়েও লাভ হলো না৷ অবশেষে ধরা তাকে দিতেই হলো।
You’re the light, you’re the night
You’re the color of my blood
You’re the cure, you’re the pain
You’re the only thing I wanna touch
Never knew that it could mean so much, so much
সাদিদ নীলাকে কাছে টেনে তার কোমড় জড়িয়ে নিজের সাথে মিশাল। নীলা মাথা নিচু করতেই সাদিদ থুতনিতে ধরে তার মুখটা উঁচু করে, তাকে ঘুরিয়ে ডান্সের স্টেপ করে নিলো।
অপরদিকে প্রত্যেক কাপলযুগলও নিজেদের একান্ত রোমান্টিক মোমেন্ট কাটাতে ব্যস্ত। তানহাকে একা বসে থাকতে দেখে একজন সুদর্শন যুবক তার দিকে এগিয়ে গেল। ডান্সের জন্য তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই তানহা ক্ষিপ্ত চোখে তাকালো। ছেলেটি দুইকদম পিছিয়ে গেল। মেয়েটা দূর থেকে দেখতে রূপসি হলেও কাছ থেকে ভয়ংকর। তার এই চোখে যেন সবকিছু পুড়িয়ে দেবার নেশা। সে দ্রুত তানহার সামনে থেকে চলে গেল। তানহা তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
— ‘ তোকে আমার প্রয়োজন নেই৷ যাকে প্রয়োাজন সে এখন অন্য কারও উষ্ণতা পেতে মগ্ন। ‘
কথাটা মুখে হাসি নিয়ে বলা শুরু করলেও তানহা সেটা শেষ করল পুরোপুরি বিষিয়ে যাওয়া কন্ঠে।
অপরদিকে সাদিদ আবারও নীলাকে নিজের কাছে টানল। নীলা কাপল ডান্সে পারদর্শী না হলেও সাদিদের জন্য একেবারেই অসুবিধা হচ্ছে না৷ মানে সাদিদ তাকে সেটা অনুভব করতেই দিচ্ছে না৷ সে খুব ভালোভাবেই নিজেরটাসহ নীলাকেও সমানে সামলে নিচ্ছে।
You’re the fear, I don’t care
‘Cause I’ve never been so high
Follow me through the dark
Let me take you past our satellites
You can see the world you brought to life, to life
So love me like you do, lo-lo-love me like you do
Love me like you do, lo-lo-love me like you do
Touch me like you do, to-to-touch me like you do
What are you waiting for?
Fading in, fading out
On the edge of paradise
Every inch of your skin, is a Holy Grail I’ve gotta find
Only you can set my heart on fire, on fire
Yeah, I’ll let you set the pace
‘Cause I’m not thinking straight
My head’s spinning around, I can’t see clear no more
Oh, what are you waiting for?
সাদিদ এবার আচমকাই নীলার কোমড়ের একটু উপরে নিজের দুইহাত দিয়ে তাকে উপরে তোলে নিলো। নীলা আচমকা একটু ভয় পেলেও পরমুহূর্তেই সাদিদের গলায় হাত জড়িয়ে ধরল।
সাদিদ তাকে নিয়ে ঘুরতেই সে প্রজাপতির ডানার ন্যায় নিজের দুইহাত প্রসারিত করে দিলো।
Love me like you do, lo-lo-love me like you do
Love me like you do, lo-lo-love me like you do
Touch me like you do, to-to-touch me like you do, oh
What are you, what are you waiting for?
What are you waiting for?
কয়েক মুহূর্ত অতিবাহিত হবার পর সাদিদ তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নামাল।
নীলা সাদিদের চোখে চোখ রাখতেই কেঁপে উঠল। অসম্ভব।
সে দ্রুত সরে যেতে চাইলেই সাদিদ তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে নিলো।
ডান্সের সময় উজ্জ্বল আলোগুলো সব নিবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু জ্বলছিল মৃদু আলোর কিছু মাতালকরা আলো। সেই আলোতে খুব একটা খেয়াল না করলে অপরপাশের লোকের কর্মকান্ড স্পষ্ট দেখা যাবে না। সাদিদ সেটা জানে। এবং সে এটার-ই সুযোগটা নিলো। সে নীলাকে হেঁচকা টানে বুকের সাথে মিশালো। লেহেঙ্গার ওড়না বেঁধ করে সাদিদের বলিষ্ঠ হাতের চাপ উন্মুক্ত পেটে অনুভব করতেই নীলা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। ভয়ে তার কলিজা পর্যন্ত কাঁপছে।
সাদিদের চোখে যে নেশা দেখেছে নীলা। আর এই নেশার অর্থও নীলার অজানা নয়। ভয়টা এখানেই। এই নেশাক্ত প্রেমিক না আবার সবার সামনেই উল্টো-পাল্টা কিছু করে বসে!
Oh, I’ll let you set the pace
Oh, ’cause I’m not thinking straight
Though my head’s spinning around, I can’t see clear no more
What are you waiting for?
Love me like you do, lo-lo-love me like you do (Like you do, oh)
Oh, love me like you do
Touch me like you do, to-to-touch me like you do, oh
Oh, what are you waiting for?
Love me like you do, lo-lo-love me like you do (Like you do)
Lo-lo-love me like you do
Touch me like you do, to-to-touch me like you do, oh
What are you, what are you waiting for?
নীলার ভয়টাই অবশেষে সত্যি হলো। সাদিদ এভাবেই নীলাকে ছাড়ল না। নীলা গলার পাশে হাত দিয়ে রাগী চোখে সাদিদের দিকে তাকালো। কিন্তু বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখতে পাড়ল না সাদিদের ঐ নেশাক্ত চোখের সামনে। নীলা মাথা নিচু করেই গলায় হাত বুলাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত আগেই সাদিদ এখানে নিজের প্রেমের বিষ ঢেলেছে। নীলার অবস্থা দেখে সাদিদ এগিয়ে গেল। নীলা লোকচক্ষুর ভয়ে আবারও কিছুটা পিছিয়ে যেতে নিলেই সাদিদ হেঁচকা টানে তাকে বুকে আনলো। একপলক মায়াবিনীর দিকে তাকিয়ে তার গালে হাত রাখল। নীলা ভয়ে অনবরত কাঁপছে। সাদিদ প্রাণপাখির ভয়াতুর মুখশ্রী দেখে নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে হাসল। কিন্তু নীলাকে ছাড়ল না। এগিয়ে গেল ব্যাথাযুক্ত জায়গায় ভালোবাসার মলম লাগিয়ে দিতে।
নীলার গলাতে নিজের কামড়ের জায়গাটাতে সাদিদ সময় নিয়ে গুটিকয়েক চুমু খেল। তার ভিজে যাওয়া ওষ্ঠের ক্রমাগত শীতলতায় নীলা আবেশে চোখ বন্ধ করল। খামচে ধরল সাদিদের পিঠ।
হঠাৎ অগণিত উজ্জ্বল আলোর সমাগমে দ্রুত সবাই নিজেদের জায়গায় এলো। শুধু সাদিদ-নীলা দম্পতি নয়, অগণিত প্রেমিকযুগলও এই মুহূর্তটার ফায়দা নিজেদের মতো করে তোলে নিয়েছে।
সবার মুখেই মিষ্টি হাসি। শান্তও ঘাড় ফিরিয়ে লাজুক হাসছে। তার কাছে এই মুহূর্তটা স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। তানবীরের এতটা কাছে থাকাতে তার অস্বস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু এমনটা হচ্ছে না। বরং অজানা এক ভালোলাগায় শরীর-মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। শান্ত আড়চোখে তানবীরের দিকে তাকালো। তানবীর এতক্ষণ তার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু শান্তর সাথে দৃষ্টি মিলিত হতেই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো। তানবীরের বাচ্চাদের মতো এমন লুকোচুরি দেখে শান্ত আবারও নিঃশব্দে হাসল।
#চলবে…
গল্পঃ #অন্তরালের_অনুরাগ
লেখনীতেঃ #নাহিদা_নীলা
#পর্বঃ ২৫ ♥🌹♥ (বর্ধিতাংশ)
সাদিদের সকল বন্ধু-বান্ধবসহ সমবয়সী সকলে তারা এখন একসাথে ডিনারের জন্য বসেছে। কিন্তু মাঝদিয়ে পিচ্চি শাদমানও নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। সবার দেখাদেখি সেও চামচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খাবার খাওয়ার অনবরত চেষ্টা করে চলেছে। নিধি পাশে বসে ঠোঁট টিপে হাসছে। সে ইতিমধ্যে অনেকবার তাকে বলেছে। কিন্তু ছেলে তার নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। সে নিজে খাবে মানে নিজেই খাবে।
— ‘ আব্বু মাকে দিয়ে দাও। মা খাইয়ে দিচ্ছি। ‘
— ‘ নো মাম্মা। আমি নিজে খাব। ‘
— ‘ ছেড়ে দাও চাচ্চু। তোমার খালামণিই-তো এখনও ঠিকঠাকভাবে খেতে পারে না। তার তুলনায় তুমি অনেক উপরে আছ। ‘
নীলা সাদিদের দিকে চোখ বাঁকিয়ে তাকালো। অতঃপর থমথমে গলায় বলল,
— ‘ আপনাকে কে বলল আমি ঠিকভাবে খেতে পারি না? এগুলো কি আপনার পেটে যাচ্ছে? ‘
— ‘ তুমিতো…
— ‘ এই সাদি খা-তো। সবসময় আমার নম্র-ভদ্র শালিকাটার পিছনে লেগে থাকিস। ‘
— ‘ ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন তোমার এই নম্র-ভদ্র শালিকাটা এখন সাদিদ ইবনে শাহরিয়ারের বউ। আমি কি তার পিছনে না পড়ে তোমার এক্সের পিছনে পড়ব? ‘
সাদিদের কথা শেষ হতেই শাহেদ খাবার মুখে বিষম খেল। সে সম্ভব হলে সাদিদকে এখন-ই তোলে একটা আছাড় দিবে।
সে ভয়াতুর দৃষ্টিতে আড়চোখে নিধির দিকে তাকালো। নিধি কাঁটাচামচ হাতে কটমটে দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। শাহেদ জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল। কিন্তু তাতেও নিধির দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন না দেখে সে শুকনো ঢুক গিলল। তার পিছনে যে শনি রয়েছে এটা সে পুরোপুরি নিশ্চিত।
তাদের সবার দৃষ্টির ব্যাঘাত ঘটে তানহার তীক্ষ্ণ স্বরে।
— ‘ বউ? ভুলে যাচ্ছিস কেন? এখনও অব্দি বিয়েটা হয়নি। বিয়ে পর্যন্ত অনেক দূর। তাই এতো বউ বউ করার কোনো মানে হয় না। ‘
সাদিদের রাগ উঠলেও আপাতত নিজেকে সে দমন করল। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি?
সাদিদ নিজের রাগ চেপে রাখলেও নীলার চোখে সেটা নজর এড়ালো না। সে টেবিলের নিচে সাদিদের হাতটার উপর নিজের হাত রেখে তার দিকে মিষ্টি হেসে তাকালো। নীলার স্পর্শ পেয়ে সাদিদও তাকালো। নীলাকে বড় মানুষের ন্যায় সান্ত্বনা দিতে দেখে সাদিদ নিঃশব্দে হাসল। তারপর দুষ্টুমি করে নীলার হাতটা জোরে চেপে ধরল। নীলা আর্তনাদ দিতে গিয়েও কোনোভাবে মানসম্মানের কথা ভেবে শব্দ নিজের ভিতরে রাখল। নীলা চোখ বাঁকিয়ে রাগী চোখে সাদিদের দিকে তাকালো। অপরদিকে সে ঠোঁট টিপে হাসছে।
এইজন্যই লোকে বলে কারও উপকার বা ভালো করতে নেই৷
এই যেমন নীলা এখন ভালো করতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গিয়েছে। কেননা তার বজ্জাত বরটা এখন নীলার হাতটাই ছাড়ছে না। নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখে, সাদিদ বেশ আরামশে ডিনার করছে। ভাবটা এমন যে খাবার ব্যতিত তার আর কোনো কিছুর উপর এইমুহূর্তে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।
নীলা নিজের মনেই আওড়াল,
— ‘ বজ্জাত একটা। ‘
সাদিদের কানে কথাটা না পৌঁছালেও নীলার জন্য শাস্তি মিস হলো না। হাতে আবারও সাদিদের শক্ত হাতের চাপ পড়ল। নীলা চমকিত চোখে সাদিদের পানে তাকালো। এখন কি এই ছেলে তার মনের উপরও দখলদারি করে নাকি?
নতুবা টের পেল কিভাবে?
নীলাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাদিদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। নীলাকে একপলক দেখে নিয়ে বিনিময়ে মিষ্টি হাসি উপহার দিলো। যার অর্থ কাটাগায়ে নোনের ছিটা দিয়ে দিলাম।
.
সবার দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটির মধ্যেই তাদের ডিনারের পর্বটা শেষ হলো। রাত বেশ হয়েছে। শাদমান বেচারা আর জেগে থাকতে পাড়ল না৷ বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। আপাতত ছেলেকে নিয়েই নিধি-শাহেদ আড্ডায় রয়েছে। শাহেদের কোলে শাদমান, আর নিধি ঘুমন্ত ছেলের একটা হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে। মা-বাবা দুইজনের-ই যেন এই ছোট্ট প্রাণটার মধ্যে নিজেদের প্রাণটা লুকিয়ে থাকে। সাদিদকে এখনও নীলার পাশে দেখে তানবীর এবার বাঁকা হেসে তার দিকে এগিয়ে গেল৷ সাথে করে অর্ণবকেও প্রিয়তীর বাহুবন্ধন থেকে আলাদা করল। অর্থটা এমন যে, ভাই তোদের এত ভালোবাসা আমার মতো সিঙ্গেল মানুষের আর সহ্য হচ্ছে না।
— ‘ আরে কোথায় নিয়ে চললি? ‘
— ‘ সারাদিন ঐ মেকাপের গোডাউনের পাশে থাকতে তোর বমির টেন্ডেন্সি হয় না? ‘
— ‘ ফালতু কথা ছাড়। ‘
— ‘ সত্য কইলেই ফালতু? তোর ঐ প্রিয়ু কোনো অংশ গোডাউনের থেকে কম? পাড়লে আরও বেশি৷ ‘
— ‘ হইলে হইছে। তোর টাকায় তো আর গোডাউন তৈরি করেনি৷ ‘
— ‘ এই হইলো পুরুষজাতি। বিয়ের পর-ই বউয়ের আঁচলের নিচে জায়গা করে। কিন্তু তুইতো বিয়ের আগেই বউয়ের আঁচল জড়িয়ে বসে আছিস।
অবশেষে সব পুরুষকে পিছনে ফেলে এওয়ার্ড বিজয়ী হলো আমাদের অর্ণব ওরফে মেকাপওয়ালির বাবু। ‘
— ‘ তানবীর, উষ্টা খাইস না। ‘
— ‘ ইচ্ছাও নাই। ‘
তানবীর মিনমিন করতে করতে এগিয়ে চলল। কিন্তু মুখেমুখে দুই বন্ধু এতো তর্ক করলেও তানবীর তাকে ছাড়ল না। তাকে নিয়ে সোজা গিয়ে সাদিদের সামনে দাঁড়াল।
দুই বান্দরকে একসাথে দেখে সাদিদ ভ্রুজোড়া নাচিয়ে জানতে চাইল,
— ‘ কি চায়? ‘
তানবীর ঠোঁট বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসল। তারপর বেশ রসিয়ে বলল,
— ‘ বিবাহিত ব্যাচেলর আপনাকেই চাইছি। আপনার দর্শন পাওয়া তো রীতিমতো দুষ্কর। এখন কেউ জানতে চাইলে বলতে হবে নীলা যেখানে সাদিদ সেখানে। ‘
বলেই সে আবারও নিজেই হাসল। এবার পাশে দাঁড়ানো অর্ণবও হাসছে। এই নির্লজ্জ ঠোঁটকাটা ছেলেদের সামনে নীলার থাকা আর সম্ভব নয়। তাই সে দ্রুত অযুহাত দেখিয়ে জায়গা ত্যাগ করল।
— ‘ সমস্যা কি তোর? ‘
— ‘ মাই প্রবলেম ইস আ’ম এ সিঙ্গেল পার্সন। দেটস্ হোয়াই লোকসম্মুখে তোদের এতো ভালোবাসা-টালোবাসা দেখলে আমার ঘা জ্বলে। ‘
— ‘ সত্যি-ই সিঙ্গেল? ‘
— ‘ তা নয়তো আর কি?
তানবীর দ্রুত কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নিলো। সাদিদ অর্ণবের দিকে তাকাতেই সেও তার দিকে দৃষ্টি দিলো। ইশারায় কথা আদান-প্রদান করে তারা দুইজনই হাসল।
_______________
নীলা বারবার না করছে। তার এককথা গান-টান তার দ্বারা হবে না। পাশে বসা সাদিদ নিঃশব্দে হাসছে। অবশেষে যখন নীলা কোনোভাবেই রাজি হতে নারাজ তখন সাদিদ নীলার বামহাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। নীলা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকালো। সাদিদ ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করছে।
এবার নীলার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফোটে উঠল। সে মাথা নিচু করে লাজুক হেসে সকলের উদ্দেশ্য নিজের হ্যাঁবোধক মতামত জানালো। সবাই আরেকদফা নীলা-সাদিদকে একত্রে পিন্চ করতে লাগল। নীলা লজ্জায় আরও নতজানু হলো।
কিন্তু এতক্ষণের গান নিয়ে যে ভয়টা নীলার মধ্যে ছিল আপাতত তার বিন্দু পরিমাণও নেই। কেননা সাদিদের চোখের জাদু নীলার সকল ভয় দূর করে দিয়েছে। নীলা পুরোপুরি নিশ্চিত সাদিদ সবটাই সামলে নিবে৷ নীলাকে কেবলমাত্র তার সহযোগী হতে হবে।
সাদিদ নীলার হাসিমুখটা দেখে নিজেও হাসল। অতঃপর গিটার হাতে তোলে নিয়ে নীলার দিকে তাকিয়েই সুর তুলল,
Tere bin jeena hai aise
Dil dhadka naa ho jaise
Yeh ishq hai kya duniya ko
Hum samjhaaye kaise
Ab dilon ki raahon mein
Hum kuch aisa kar jayein
Ik dooje se bichhde toh
Saans liye bin marr jayein
O Khuda.
Bata de kya lakreeron mein likha
Humne toh.
Humne toh bas ishq hai kiya (2x)
Pyaar ki inn raahon mein
Milte hain kitne dariya
Laakh toofaano mein bhi dil ko
Mil jaata hai zariya
নীলা এতক্ষণ সাদিদের দিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল। তার চক্ষুগুলো প্রিয়মানুষটার চোখে নিজের জন্য এতটা ভালোবাসা দেখে ম্লান হয়ে গিয়েছে। সাদিদ মিষ্টি হেসে ভ্রুজোড়া নাচাতেই নীলাও অশ্রুমাখা সিক্ত চোখে হাসল। ম্লান চক্ষু নিয়েই গলায় সুর তুলল,
Iss dil ke irraadon mein hai itna asar
Lehron se kinaaron pe karta hai safar
O Khuda.
Bata de kya lakreeron mein likha.
Humne toh.
Humne toh bas ishq hai kiya (2x)
Aaj apne rangon se bichhdi hain yeh tasveerein
Haathon mein kahin toot rahin hain
Mil kar do taqdeerein
Duniya yeh jeet gayi dil haar gaya.
Nahi socha tha mil kar kabhi honge judaa.
O Khuda.
Bata de kya lakreeron mein likha
Humne toh.
Humne toh bas ishq hai kiya(×2)
গান শেষ হতেই একসাথে করতালির আওয়াজ ভাসতে লাগল। ফ্রেন্ডগুলো জোরে জোরে সিটি বাজিয়ে কাপলযুগলকে উৎসাহ দিচ্ছে। নীলা বেশ লজ্জা পাচ্ছে। তার লজ্জার পরিমাণটা আরও বাড়িয়ে দিতে সাদিদ এগিয়ে আসলো। হাতের গিটারটা পাশে থেকে একহাতে নীলাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো। সবকিছু ভুলে গিয়ে প্রিয়তমার মাথায় দীর্ঘ ভালোবাসার চুমু খেল।
নীলা লজ্জায় এবার পুরোপুরি মিইয়ে গেল। সাদিদের কান্ডে দুষ্টুগুলো এবার আরও ফাজলামি শুরু করেছে। নানারকম দুষ্টুকথা বলে মুহূর্তেই পরিবেশটাকে উৎসবমুখর অবস্থানে নিয়ে আসলো।
নীলা লজ্জামিশ্রিত চোখে মাথা উঠিয়ে সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদের চোখে-মুখে উপচে পড়া হাসি। এমন একটা ভাব যেন নীলা-ই পুরো গানটা গেয়েছে। অথচ নীলা হাতেগোনা গানের কয়েকটা কলিতে সুর মিলিয়েছে। কিন্তু সাদিদ এতেই মারাত্মক খুশি এবং সাথে মুগ্ধও। নীলাও হাসল। একমাত্র সাদিদের জন্য হলেও নীলা পুরোপুরি গানের রেওয়াজ তুলতেই রাজি। যে এতটা ভালোবাসতে পারে তারজন্য একটু কষ্ট করলে সমস্যা কোথায়?
উপস্থিত সবার মুখে হাসির রেখা থাকলেও একজনের মুখে সেটা অনুপস্থিত। তানহা নিজের ভিজে যাওয়া গালগুলো হাতের তালুর সাহায্য মুছিয়ে নিলো। সবার মতো সেও এখন ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ঝুলিয়ে নিলো। কিন্তু সেটাতে মুগ্ধতা বিরাজমান নয়। নয় কোনো খুশিও। বরং তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে তাচ্ছিল্য হাসি।
সবার হাসিহাসির মধ্যে-ই নিধির চোখ পড়ল তানহার উপর। সে একেবারে সবার থেকে বিছিন্ন হয়ে এককোণায় বসে রয়েছে। দূর থেকে হলেও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে তার মুখটা বেশ মলিন।
নিধি শাদমানের হাতটা ছেড়ে তানহার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
— ‘ কি হয়েছে তানহা, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আর সবার থেকে কেমন যেন বিছিন্ন হয়েও আছ। ‘
— ‘ না ভাবী তেমন কিছু না। আমি ঠিক আছি। এমনিতেই এখানে বসে রয়েছি। ‘
— ‘ তাহলে আমার সাথে চলো। সবার সাথে একসাথে বসবে। ‘
— ‘ না ভাবী আমি…
— ‘ কোনো কথা নয়। চলো তো। ‘
নিধি একপ্রকার জোরপূর্বক টেনেই তানহাকে সবার মাঝে নিয়ে গেল। তাকে নিজের পাশে বসাতেই শাহেদ বলে উঠল,
— ‘ কিরে, কোথায় থাকিস তুই? তোকে তো দেখা-ই যায় না। ‘
তানহা কোনো উত্তর দিলো। মলিন মুখে মৃদু হাসি দিয়ে নিজের উত্তর জানালো। শাহেদ-ই আবার বলল,
— ‘ আমাদের তানহাও কিন্তু মারাত্মক গান করে। সে তো আলাদাভাবে গান শিখেছে পর্যন্ত। ‘
— ‘ তাই নাকি আপু? তাহলে তুমিও একটা গান শোনাও। ‘
তানহা শান্তর কৌতূহলমূলক চাহনি দেখে সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদের অবশ্য সেই দিকে কোনো খেয়াল নেই। সে নীলার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে তার নরম আঙ্গুলগুলো অনবরত নাড়াচাড়া করছে।
তানহা আবারও তাচ্ছিল্যভরা হাসি দিলো।
সাদিদের গান বরাবরই পছন্দের তালিকায়। সে নিজেও বেশ ভালো গান গাইতে পারে। কন্ঠও সুমধুর। কেবল সেই জন্যই তানহা গানের অনুশীলন করেছে। এককথায় সাদিদের ভালোবাসা পাবার জন্য নিজের থেকে কোনো কমতি রাখেনি। নিজেকে যতটা শিক্ষিত-গুণের অধিকারীনি তৈরি করা যায় সবসময় সেটার-ই চেষ্টায় লেগে থাকত। কিন্তু তারপরও সাদিদের মনে নিজের জন্য জায়গা করতে পারেনি। সাদিদ নিজের হৃদয়ের মণিকোঠায় নীলার নামটাই খোঁদায় করেছে। তানহার দৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটিয়ে শাহেদ এনাউন্সমেন্ট করে দিলো,
— ‘ বাহ্ শালিকা বেশ বলেছ। তাহলে এই কথায় রইল। তানহা শুরু কর। ‘
— ‘ না ভাই। তোমরা করো আমার ভালো লাগছে না৷ ‘
— ‘ ভাইয়ের হাতের মাইর না খেতে চাইলে শীঘ্রই শুরু কর। ‘
নিধি-শাহেদসহ সবার আবদারে তানহা অবশেষে রাজি হলো। হৃদয়টা ভেতর থেকে তার টুকরো টুকরো হচ্ছে, অথচ সে সেটা প্রকাশ করতে পাড়ছে না।
তানহা নিজের ক্ষেত্রে মারাত্মক জেদি। বাড়ির ছোট্ট মেয়ে বিধায় আদরে আটখানা। নিজেরটা আদায় করতে সে সদা মরিয়া।
কিন্তু এইক্ষেত্রে সে নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় মনে করছে। কেননা বিষয়টা সাদিদকে ঘিরে জড়িত। তানহার মতো সেও ভীষণ জেদি। আর রাগলে তো মাশাল্লাহ সামনের জনকে পাড়লে তুলে আছাড় দেবার অবস্থা। এসব তানহার থেকে ভালো আর কে জানে? সে সাদিদের ছোট্টবেলার খেলার সাথী। তাই সাদিদের আচরণ সম্পর্কে সে ভালো-ই অবগত। এইজন্য এতদিন যাবত সাদিদের উপর জোর খাটাতে পারেনি। শুধু নিজের রূপ-গুণ দিয়ে সাদিদকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছে। সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু জোর করে নিজের ভালোবাসাটা আদায় করতে পারেনি। ইনফেক্ট সাদিদ তাকে সেই সুযোগটা দেয়নি। নিজের প্রতি তানহার অনুভূতি জানার পর থেকেই সবক্ষেত্রে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। তানহা হাজার চেষ্টা করলেও সে নিজের জায়গায় অনড় ছিল।
তানহা সবার থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবারও সেই নির্দয় ব্যক্তির পানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। নীলা-সাদিদকে আবারও একসাথে হাসিখুশি দেখে তার কলিজাটায় বোধহয় কেউ ক্রমাগত ছুরিকাঘাত করছে। নতুবা এত অসহ্যনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে কেন?
তানবীর গিটার হাতে নিতে গেলেই তানহা বলে উঠল,
— ‘ লাগবেনা। তুই বস। ‘
তানবীর তার কথায় গিটারটা রেখে দিলো। তানহা চোখ বন্ধ করে খালি গলায়-ই সুর তুলল,
তুমি যাকে ভালোবাসো
স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো
তার জীবনে ঝড়।
তুমি যাকে ভালোবাসো
স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো
তার জীবনে ঝড়।
তোমার কথার শব্দদূষণ, তোমার গলার স্বর
আমার দরজায় খিল দিয়েছি, আমার দারুণ জ্বর।
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তোমার নৌকোর মুখোমুখি আমার সৈন্যদল
বাঁচার লড়াই।
আমার মন্ত্রী খোয়া গেছে, একটা চালের ভুল
কোথায় দাঁড়াই?
কথার ওপর কেবল কথা সিলিং ছুঁতে চায়।
নিজের মুখের আয়না আদল লাগছে অসহায়।
তুমি অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান
তুমি অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান
বুকের ভেতর ফুটছে যেন মাছের কানকোর লাল
এত নরম।
শাড়ির সুতো বুনছে যেন সেই লালের কঙ্কাল
বিপদ বড়।
তানহা নিজের বন্ধ আখিঁদ্বয় খোলল। আর সাথে সাথেই টপটপ করে অশ্রুকণাগুলো গাল বেয়ে পড়ে আবারও গালগুলো ভিজিয়ে দিলো। তার দৃষ্টি সাদিদের দিকে স্থির। হাসিখুশি পরিবেশটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধতায় রূপান্তর হলো।
তানহার গলায় সুর আটকে যাচ্ছে। তারপরও সে নিষ্পলক সাদিদের মুখপানে তাকিয়েই গাইতে লাগল,
কথার ওপর কেবল কথা সিলিং ছুঁতে চায়
নিজের মুখের আয়না আদল লাগছে অসহায়
তুমি অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান
তুমি অন্য কারোর ছন্দে বেঁধো গান
তুমি যাকে ভালোবাসো
স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো
তার জীবনে ঝড়।
তুমি যাকে ভালোবাসো
স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো
তার জীবনে ঝড়।
তোমার কথার শব্দদূষণ, তোমার গলার স্বর
আমার দরজায় খিল দিয়েছি, আমার দারুণ জ্বর।
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর
তানহার দুইচোখ জ্বলে টইটম্বুর। ফর্সা মুখটা অশ্রুজলে পুরো লাল হয়ে রয়েছে।
সাদিদ এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখশ্রীতে স্পষ্টত অসহায়ত্বের ছাপ। কেননা এখানে তার কিছু করার নেই। তার পাগলামিতে সাদিদ বিরক্ত অনুভব করলেও ছোট্ট বেলার খেলার সাথী, ভালো বন্ধু আর বোন হিসেবে সাদিদের বরাবরই তার জন্য খারাপ লাগত। কিন্তু তার করার কিছু ছিল না৷
কিছু জিনিস থাকে যেখানে জোর খাটানো যায় না। না গায়ের জোরে পাওয়া যায়, না গায়ের জোরে দেওয়া যায়।
ভালোবাসাও নিঃসন্দেহে তার মধ্যেই পড়ে। ভালোবাসা হৃদয়ের অনুভূতির মিশ্রণে তৈরি। এখানে নেই কোনো বাঁধা ধরা নিয়ম।
সাদিদের মতো উপস্থিত সবার মুখও গম্ভীর। এখানে সবাই-ই প্রাপ্তবয়স্ক। তাই তানহার এমন করে চোখের জল আর অপলক দৃষ্টিতে সাদিদের দিকেই তাকানো দেখে কারও আর বুঝার বাকি নেই বিষয়টা আসলে কি?
তারাও নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করছে। কি করার আছে এখানে? সাদিদ-নীলা একে অপরকে ভালোবাসে। আর অপরদিকে তানহা যে সাদিদকে ভীষণ ভালোবাসে এটাও তাদের চোখের সামনে। বিষয়টা বড্ড জটিল হয়ে পড়েছে।
তানহা অশ্রুসিক্ত চোখ আর গালগুলো হাতে মুছিয়ে নিয়ে সাদিদের দিকে তাকিয়েই জোরপূর্বক মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর বিনাবাক্য নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কাউকে আর কিছু না বলে এলোমলো পায়ে বাড়ির ভিতরে চলতে লাগল। এই অসহ্যকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে তার এখন নিন্দ্রা প্রয়োজন। কিন্তু আজকাল সেও তানহার সঙ্গ দিচ্ছে না। সাদিদের মতো ঘুমও তাকে এড়িয়ে চলছে। তানহার জীবনটা পুরো মূল্যহীন লাগছে তার কাছে।
কি মূল্য আর এই জীবনের? যে জীবনে তার ভালোবাসা সাদিদ তার পাশে নেই?
তানহার গমনপথের দিকে তাকিয়ে থেকে শাহেদ এবার সাদিদের দিকে তাকালো। সাদিদ মাথা খানিকটা নিচু করে রয়েছে। শাহেদ একটা হতাশাজনক নিঃশ্বাস ফেলল।
তানহার সাদিদকে নিয়ে অতিরিক্ত পাগলামি বরাবরই তার চোখে পড়েছে। কিন্তু শাহেদ এটা নেগেটিভভাবে নেয়নি। ভেবেছে দু’জনই সমবয়সী। আর তাদের মধ্যেকার বন্ডিংটাও সবার জানা ছিল। কিন্তু যত বড় হচ্ছিল ততই যেন তাদের দুরত্বটা বেড়ে গিয়েছিল। শাহেদ তখনও ভেবেছিল হয়তো বয়সের গতিটা তারাও বুঝতে শিখেছে। কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে যে দুইজনের মধ্যে এসব চলছে শাহেদ সেটা চিন্তা পর্যন্ত করেনি। তার চোখে-মুখেও অসহায়ত্ব। কেননা সাদিদ, নীলা, এবং তানহা এই তিনজনই তার হৃদয়ের খুব কাছের। এই ছোট্ট প্রাণগুলোর জন্য তার স্নেহের সীমা নেয়।
সাদিদ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর কণ্ঠকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে বলল,
— ‘ সরি টু ছে গাইস, কিন্তু আমি আর এখানে থাকতে পাড়ছি না। মাথাটা বড্ড ধরেছে। গুড নাইট এভরিওয়ান। ‘
তাকে আর কেউ বাধা দিলো না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা এখনও বাকরুদ্ধ। সাদিদ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে আচমকা থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়ল নীলার মলিন মুখখানা। সাদিদ ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে নীলার কাছে এগিয়ে আসলো। তাকে কাছে আসতে দেখে নীলা দ্রুত চোখ নিচে নামিয়ে নিলো৷ সাদিদকে নিজের চোখের জল নীলা দেখাতে চায় না। সেই জন্যই এত লুকাচুরি।
সাদিদ নীলার সামনে এসে হাঁটু ভাজ করে নিচে বসল। নীলার কোলের উপর রাখা দুইটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। হালকা চেপে ধরে মিহি কন্ঠে বলল,
— ‘ বাসায় পৌঁছে আমাকে টেক্স করে দিবে। সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে। তাই রাতে আর কল দিব না। তাই রাত জাগবে না। লক্ষ্মি মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়বে। ‘
নীলা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁবোধক উত্তর জানাল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পাড়ল না। সাদিদও আর তাকে ঘাটলো না। সে নিজেও এখন ভীষণ ক্লান্ত। শারীরিক নয় বরং সেটা মানসিক। তাই নিঃশব্দে মৃদু হেসে নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে সেখান থেকে চলে আসলো। নীলা মাথা উঠিয়ে সাদিদের গমনপথে তাকালো। তাকে যতক্ষণ পিছন থেকে দেখা গিয়েছে নীলা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। অশ্রুসিক্ত চোখগুলো থেকে এতক্ষণের চেপে রাখা নোনাজলটা এবার নিজ স্বাধীনে গড়িয়ে পড়ল।
___________________
রুমের টেম্পারেচারটা একেবারে কমিয়ে ফেলা হয়েছে। লাইটগুলোও আপাতত নিবিয়ে রাখা আছে। পুরো বাড়িতে এতএত লাইটিং করা হয়েছে যে সেগুলোর উজ্জ্বল আলো ব্যক্তির চাওয়াটাকে পূর্ণ করল না। অন্ধকার রুমটাতে জানালার থাই গ্লাস ভেদ করে কিছুটা হলেও আলো চলে এসেছে। সেই আলোতে বিছানায় সটান হয়ে শুয়ে থাকা সাদিদের অবয়ব আবছা। বালিশ ছাড়া মেঝেতে হাটু দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে সে। কিছুক্ষণ আগের গুছানো ছেলেটাকে এখন বড্ড এলোমলো লাগছে। এনগেজমেন্টের পরনের কাপড়গুলো এখনও তার শরীরে-ই রয়ে গিয়েছে। শুধু গলার টাইটা লুজ করে রাখা। সাথে সুটের বোতামগুলো খোলে দেওয়া।
হঠাৎ পায়ে কারও স্পর্শ পেতেই সাদিদ চোখ খোলে মাথা উঁচিয়ে তাকালো। আবছা অন্ধকার হলেও তার বুঝতে অসুবিধা হলো না সেই মানুষটি কে। সাদিদ জলদি শোয়া থেকে উঠে বসল,
— ‘ এই পাখি, পায়ে হাত দিচ্ছ কেন? ‘
নীলা সাদিদের প্রতিউত্তর দিলো না। আবারও জুতায় হাত দিতে গেলেই সাদিদ দ্রুত পা সরাল।
— ‘ এই মেয়ে সমস্যা কি? এসব করছ কেন? ‘
— ‘ কেন? করলে সমস্যা কোথায়? ‘
— ‘ একদম চুপ। আর কখনও যেন এসব না দেখি। ‘
— ‘ আপনার জুতায় হাত দিলে বুঝি আমি ছোট হয়ে যাব? ‘
— ‘ তেমনটা নয়। কিন্তু আমি চাই না তুমি আমার এসব কাজ করো। অন্ততপক্ষে যতদিন আমি সুস্থসবল রয়েছি৷ অসুস্থ থাকলে না হয়…
নীলা সাদিদকে কথা শেষ করতে দিলো না। তার মুখের উপর নিজের হাত রেখে বাধা দিলো। সাদিদের কথাতে মুহূর্তেই তার চোখজোড়া আবারও অশ্রুসিক্ত হলো। তার অবস্থা দেখে সাদিদ মৃদু হাসল। নীলার হাতে চুমু দিয়ে তাকে নিজের পাশে বসাল।
তার মন ভালো করতে প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল,
— ‘ এখনও এখানে যে? বাসায় যাওনি কেন? ‘
— ‘ আব্বু আঙ্কেলের সাথে কথা বলছে। ‘
সাদিদের অগোচরে এই ছোট্ট মিথ্যা কথাটা বলে নীলা হাসল। নতুবা কি করে বলবে সে ইচ্ছে করে যেতে চায়নি। আম্মু-আব্বুকে বলেছে তার কাজ আছে। উনারা যেন নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। আর উনাদেরকে ব্যস্ত করে সে এখন সাদিদের কাছে। তার অবাধ্য মনটা সাদিদকে এই অবস্থায় একা ফেলে যেতে চায়নি। কিছু করতে পারুক আর নাই-বা পারুক সঙ্গী হিসেবে তার পাশে থাকতে চায়।
সাদিদও নীলার কথায় হাসল। মুখে স্বীকার না করলেও সাদিদের মনটাও যে এখন নীলার সান্নিধ্যে চায়। শারীরিক-মানসিক উভয়ক্ষেত্রকে স্বাভাবিক আনতে প্রাণপাখিকে একটু একান্তভাবে তার এখন প্রয়োজন।
সাদিদ কিছু না বলে নীলাকে বুকে টেনে আনল। নিজের বুকের সাথে নীলাকে জড়িয়েই বালিশে মাথা রাখল।
নীলাও চুপচাপ রয়েছে। সাদিদকে কোনো প্রশ্ন করছে না। সাদিদ নীলাকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করল।
নীলার মনটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বড্ড খচখচ করছে। কিন্তু মুখে বলতে সংকোচ। সে লেগে যাওয়া কন্ঠে বলল,
— ‘ আসলে না মানে…
— ‘ তুমি যেটা ভাবছ বিষয়টা তেমন-ই। ‘
নীলাকে মাঝপথে আটকে দিয়ে সাদিদের বলা কথাটা নীলার কর্ণকোহরে যেতেই সে মাথা উঁচু করে তাকালো। সাদিদও বন্ধ আখিঁদ্বয় খোলে নীলার দিকে তাকালো। নিষ্পলক চেয়ে থেকে সে নীলার গালে নিজের ডানহাত রাখল।
— ‘ হ্যাঁ সত্য এইটাই যে তানহা আমাকে পছন্দ করে। ইনফেক্ট ভালোবাসে বলতে পারো। ‘
নীলা দ্রুত চোখ নামালো। সাদিদের এভাবে অকপটে এই কথাটা বলা নীলার বুকে গিয়ে বিঁধছে। সাদিদ নীলার মুখটা দুইহাতে উঁচু করে ধরল। তার অবস্থা পরিলক্ষিত হতেই সে মাথা নিচু করে প্রিয়তমার মাথায় চুমু খেল। সাদিদের একটু ভালোবাসার সোহাগেই যেন নীলার অবুঝ মনটা আরও নেতিয়ে গেল৷ সে সাদিদের বুকে মুখ গোঁজে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে লাগল।
নিঃশব্দের হলেও সাদিদ সেটা অনুভব করতে পারল। তাই নীলাকে মুহূর্তের মধ্যে বিছানায় শুইয়ে দিলো। তার উপর নিজে আধশোয়া হয়ে বলল,
— ‘ এইটুকুতেই চোখে জল? ‘
নীলা উত্তর দিলো না। সাদিদ নিঃশব্দে হেসে নিজেই বলল,
— ‘ কিন্তু আমি কখনও তাকে অন্য রকম কিছু ভাবতে পারিনি। বন্ধু-বোন ব্যতিত আর কোনো অনুভূতি তার জন্য আমার কাজ করেনি। ‘
— ‘ আপনি আমাকে ভুল ভাবছেন। আমি আপনার উপর সন্দেহ করছি না। ‘
— ‘ সেটা তুমি না বললেও আমি জানি। যেহেতু বিষয়টা সামনে চলেই এসেছে তাই আমি সবটা ক্লিয়ার করে দিচ্ছি। তোমারতো জানার অধিকার রয়েছে। আমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার এখন তোমার-ই। ‘
সাদিদের এমন আদরমাখা কন্ঠে নীলা এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলল। আচমকা নীলার এমন কান্নায় সাদিদ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। অস্থির কন্ঠে বলল,
— ‘ এই পাখি, আবার কাঁদছ কেন? ‘
— ‘ আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। নিজেকে বড্ড স্বার্থপর মনে হচ্ছে। ‘
নীলা কান্নামিশ্রিত গলায় কথাটা বলেই আবারও নিজেই বলতে লাগল,
— ‘ আমি তানহা আপুর চোখে আপনার জন্য গভীর ভালোবাসা দেখেছি৷ উনি আপনাকে খুব খুব ভালোবাসে। আমি কি কোনোভাবে আপনাদের মধ্যে চলে এসেছি? আমি কি…
সাদিদ ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে দিয়ে তাকে আঁটকে দিলো। নীলার গাল বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। সাদিদ সেগুলো আলতো হাতে মুছিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
— ‘ আজকেই শেষ। আর কখনও যেন এমনটা না শুনি। আর নিজেকে ছোট মনে করারও কিছু নেই। এখানে তোমার বিন্দুমাত্র দোষ নেই। তাই নিজেকে কখনও এর জন্য দোষারোপ করবে না। ‘
— ‘ কিন্তু আমার এমনটা মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সবটা…
সাদিদ এবার আর আঙ্গুল চেপে তাকে বাধা দিলো না। নীলা অনবরত কাঁদছে। তাকে এইমুহূর্তে শান্ত করা প্রয়োজন৷ তাই সাদিদ সরাসরি তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
নীলার কান্না ধীরে ধীরে বন্ধ হতে লাগল। সাদিদ তার একহাত নীলার গলায় আর অপরহাত কানের পিছনে রেখে নিজের উষ্ণতায় তাকে বেঁধে ফেলল।
কয়েক মুহূর্ত পর নিজের ভেজা ঠোঁট দিয়ে নীলার কপালেও চুমু খেল। অতঃপর দুইগালেসহ প্রিয়তমা স্ত্রীর পুরো মুখে ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসাময় আদর দিলো। অবশেষে ভ্রুযুগলের মাঝখানে দীর্ঘ চুমু দিয়ে সাদিদ তাকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। নীলার কাঁপা হাতগুলো নিজেদের মতো সাদিদের পিঠে জায়গা করল। নিজেও তাকে নিজের সাথে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
কতসময় এভাবেই কেটে গেল তার হিসাব রাখা গেল না। দুইজন কেবল একে অপরকে অনুভব করেছে। আর করেছে একে অপরের জন্য সীমাহীন ভালোবাসাও। নীরবতার চাদর ভেদ করে অবশেষে সাদিদ আবেগমাখা কন্ঠে বলল,
— ‘ পাখি, ভালোবাসা অনুভূতিতে জন্ম হয়। অনুভূতি ব্যতিত ভালোবাসা তৈরি করা অসম্ভব। তানহার প্রতি আমার কখনও ভালোবাসাময় অনুভূতি কাজ করেনি৷ আর না ভবিষ্যতে কোনোদিন করবে।
আমার অনুভূতিগুলো কেবলমাত্র তোমার জন্য বউ। তুমিহীনা অন্য কারও জন্য এই অনুভূতি বরাদ্দ নয়। আমি ভালোবাসি তোমাকে। নিজের সবটা দিয়ে কেবলমাত্র তোমাকেই ভালোবেসেছি, আর এখনও তোমাতেই আমার ভালোবাসা স্থির। তাই নিজেকে কখনও এর জন্য দায়ি মনে করবে না। ‘
— ‘ এতটা ভালোবাসতে আপনাকে কে বলেছে? এখন যে আমার ভয় হয়। আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয়গুলো আমাকে অনবরত তাড়া করে বেড়ায়। নিজের সাথে এতটা কেন জড়ালেন? ‘
নীলার কান্নামিশ্রিত কন্ঠে নিজের জন্য মিষ্টি অভিযোগ শুনে সাদিদ নিঃশব্দে হাসল। পাখিটাকে পাড়লে সে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে। যেহেতু সেটা সম্ভব নয় তাই আরও শক্ত করে তাকে আঁকড়ে ধরল। ভালোবাসার অধিকার নিয়ে তার নির্লিপ্ত উত্তর,
— ‘ সব প্রশ্নের এক উত্তর, ভালোবাসা। তোমার সব অভিযোগের এক সমাধান, ভালোবাসা। পাখি, বড্ড বেশি ভালোবাসি। ‘
নীলার কানগুলো যেন নিজেদের স্বার্থক মনে করছে। এই মধুর শব্দটা এতটা মধুরভাবে শুনতে পাড়ছে বলে সে কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ সে নিজের অস্তিত্বের উপর। কৃতজ্ঞ সে, সেই মহান সৃষ্টিকর্তার উপর। যিনি নীলার ভাগ্যে এই জীবনসঙ্গীর নামটা লিখেছেন। যার পাঁজরের হাড়ে নীলাকে তিনি তৈরি করেছেন। সাদিদের অস্তিত্বে নিজেকে জড়াতে পেয়ে নীলা সত্যিই কৃতজ্ঞ।
#চলবে…
[ প্রিয়পাঠক আজকের পর্বের জন্য ব্যবহৃত গানগুলো হচ্ছে,
Song Name: “O Khuda”
Movie: Hero
Singers: Amaal Mallik & Palak Muchchal
Song Name: Tumi Jake Bhalobaso
Movie: Praktan (প্রাক্তন)
Singer: Iman Chakraborty-Female version ]