#অন্য_পৃথিবীর
পর্বঃ৫(শেষ পর্ব)
লেখিকাঃদিশা মনি
‘আমি কি করে বিয়েটা আটকাবো?’
নীলার কথা শুনে রকি বলে,’পালিয়ে যাও।তাহলেই আর তোমায় এই বিয়ে করতে হবেনা।’
‘কোথায় যাব আমি? যাওয়ার তো কোন যায়গা নেই আমার।’
রকি আর কোন কথা না বলে সেখান থেকে চলে যায়।নীলা অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নেয় সে পালিয়ে যাবে।নীলা বুকে পাথর রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।এরপর চলে যায় রায়হানের কাছে।রায়হানের কাছে নীলা সাহায্য চায় পালানোর ব্যাপারে।রায়হান কারণ জানতে চাইলে নীলা বলে,’আমি বিয়ে করতে চাইনা।’
রায়হান জানতে চায় কেন? তখন নীলা বলে,’কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি।’
নীলার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রায়হান।নীলার তার দিকে তাকায়।দুজনের চোখাচোখি হতেই নীলা লজ্জা পায়।নীলা বলে, ‘আমি পড়াশোনা শেষ করে তারপর বিয়ের ব্যাপারে ভাবতে চাই।’
রায়হান বলে,’ঠিক আছে, তাহলে আমি তোমার থাকার জন্য একটা যায়গার ব্যবস্থা করছি।’
১১.
দেখতে দেখতে দুই সপ্তাহ চলে গেছে, নীলা এখন আবার তার বাড়িতে ফিরে গেছে।আমিনা নীলাকে আশ্বাস দিয়েছে সে আর নীলার বিয়ের কথা বলবে না।নীলা ও রায়হানের ভালোবাসা আরো গভীর হয়েছে।নীলা এখন আর চায়না এই অন্য পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে।সে চায় এখানে থেকে রায়হানের সাথে থাকতে।
আব্দুল খানের সাথে নীলা এই ব্যাপারে কথা বলতে যায়।নীলা বলে,’আমি জানি আমি যদি রায়হানকে বিয়ে করি তাহলে আমি এই পৃথিবীতে চিরকাল থাকতে পারব।তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রায়হানকে বিয়ে করব।’
‘তুমি এভাবে অন্য পৃথিবীতে থাকতে পারো না।সঠিক সময়ে নিজের পৃথিবীতে ফিরে না গেলে তোমার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।’
‘মৃত্যু হলে হোক।তবুও আমি রায়হানের সাথে থেকে ম’রতে চাই।আমি পারবোনা রায়হানকে ছেড়ে চলে যেতে।আমি যে ওকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছি।’
‘তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি নীলা কিন্তু,,,’
‘কোন কিন্তু না।আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।থাকতে হলে এই অন্য পৃথিবীতে থাকব আর ম’রতে হলেও এই অন্য পৃথিবীতেই মরব।’
আব্দুল খান আর কিছু বলেন না।
নীলা ফিরে গিয়ে রায়হানকে জানায় সে বিয়ে করতে চায়।নীলার কথা শুনে রায়হান অবাক হয়ে বলে,
‘তুমি তো বলেছিলে যে পড়াশোনা শেষ করে তারপর বিয়ে করতে চাও।’
‘হ্যাঁ বলেছিলাম কিন্তু এখন আমি চাই তোমাকে বিয়ে করতে।’
‘কিন্তু আমার পরিবার তো এটা কোনদিনও মেনে নেবে না।তাদের কিভাবে রাজি করাবো।’
‘সেই দায়িত্ব আমার।তুমি শুধু রাজি থাক।আমার তোমার সাহায্যের ভীষণ প্রয়োজন।নিজেকে বড্ড একা মনে হয়।’
‘আমি সবসময় তোমার পাশে থাকব নীলা।’
১২.
নীলা চৌধুরী বাড়িতে পা রাখে।রমিজ চৌধুরী ড্রইং রুমেই বসে ছিলেন।নীলাকে দেখে তিনি বিরক্ত এবং রাগান্বিত হন।নীলা রমিজ চৌধুরীর কাছে গিয়ে অনুরোধ করে বলে,
‘রায়হানের সাথে আমার বিয়ে দিন।’
রমিজ চৌধুরী কিছুতেই তার কথা শোনেনা।মনোয়ারা এসে অপমান করে নীলাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।এসব কথা শুনে রায়হানের অনেক রাগ হয়।সে সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে তোয়াক্কা না করেই সে নীলাকে বিয়ে করবে।
কিন্তু নীলা এটা চাইছিল না।নীলা বারবার চেষ্টা করতে থাকে।একসময় রমিজ চৌধুরীর মন গলে যায়।তিনি রায়হান ও নীলার বিয়ে দিতে রাজি হন।
কিছুদিনের মধ্যেই রায়হান ও নীলার বিয়ের আয়োজন করা হয়।চৌধুরী বাড়ি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়।মৌসুমি রেগে গিয়ে রাজীবকে বলে,
‘তুমি না এই বাড়ির বড় ছেলে।তোমার আগে তোমার ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে।আর তুমি চুপ করে আছ।’
‘বাবা মা যে সিদ্ধান্ত নেবে আমি তাই মেনে নেব।তাদের মুখের উপর তর্ক আমি কখনো করিনি আর করতে চাইওনা।’
রাজীবের উপর ভীষণ রাগ হয় মৌসুমীর।ইচ্ছে করে তাকে গলা টি’পে মা’রতে।
রিয়ানা নীলাকে দেখে বলে,
‘তোমাকে খুব ভালো লাগছে উডবি ভাবি।রায়হান ভাইয়া তোমার থেকে চোখই সরাতে পারবে না। ‘
রিয়ানার কথা শুনে নীলা খানিকটা লজ্জা পায়।সে মনে মনে খুব খুশি ছিল কিন্তু তার এই সুখ চিরস্থায়ী হয়না।
রায়হান হঠাৎ করে এসে বলে,’আমি এই বিয়ে করবোনা।’
নীলা কারণ জানতে চাইলে রায়হান বলে,’তোমার মতো একটা কাজের লোকের মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
রায়হানের এই আকস্মিক পরিবর্তন সবাইকে অবাক করে দেয়।রমিজ চৌধুরী খুব রেগে যান।প্রথমদিকে নীলাকে পছন্দ না করলেও এখন তিনি তাকে মেয়ের মতোই দেখেন।
রায়হান কাউকে কোন কৈফিয়ত না দিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে।এরপর পকেট থেকে নীলার একটা ছবি বের করে কাঁদতে থাকে।
‘কি করব বলো আমি? নিজের চোখের সামনে তোমাকে ম’রতে দেখতে পারব না নীলা।তার থেকে ভালো হবে তুমি তোমার নিজের পৃথিবীতে ফিরে যাও।তুমি তো কেউ না এই অন্য পৃথিবীর।’
রায়হান মনে করতে থাকে কিছুক্ষণ আগে রকি তার সাথে দেখা করে।এরপর তাকে নিয়ে বিজ্ঞানী আব্দুল খানের কাছে যায়।আব্দুল রায়হানকে নীলার ব্যাপারই সব খুলে বলে।
রায়হান প্রথমে কিছু বিশ্বাস না করলেও একটু গভীরভাবে চিন্তা করে সব বুঝতে পারে।£সে চিন্তা করে অনেক আগে থেকেই নীলাকে দেখছে।মেয়েটার সেরকম কথা বলত না,সবসময় চুপচাপ থাকত,অনেকটা বোকা টাইপ আর অনেক নিরীহ ছিল।কিন্তু এখন যে নীলা আসে সে অনেক চঞ্চল,বুদ্ধিমতী এবং মোটেই নিরীহ নয়।
সবটা রায়হানের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।তাই সে বুঝতে পারে আব্দুল ঠিক কথাই বলছে।এইজন্যই সে নীলাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।কারণ বিয়ে করলে নীলা নিজের পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না আর সে যেহেতু এই অন্য পৃথিবীর কেউ নয়।মানে তার কোন অস্তিত্ব নেই এই অন্য পৃথিবীতে তাই তার মৃত্যু অনিবার্য।
১৩.
নীলা রায়হানের ঘরের দরজায় নক করে তাকে ডাকতে থাকে।কিন্তু রায়হান বুকে পাথর রেখে তার ডাক অবজ্ঞা করে।
নীলা একপর্যায়ে আর সহ্য করতে না পেরে বলে,’তুমি যদি বেরিয়ে না আসো তাহলে কিন্তু আমি নিজেকে শেষ করে দেব।’
এই কথা শুনে রায়হান দরজা খুলে এসে নীলাকে জড়িয়ে ধরে।তাকে ধরে অনেকক্ষণ কান্না করে।নীলাকে সে সব সত্য জানায়।
এতকিছুর পরেও নীলা চাইছিল রায়হানকে বিয়ে করতে।কারণ সে নিজের পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে রায়হানকে ছাড়া কিছুতেই ভালো থাকবে না।রায়হানের স্মৃতিগুলো তাকে ভালোভাবে বাঁচতে দেবে না।তার থেকে মৃত্যুও ভালো।
কিন্তু রায়হান নীলার কোন কথা শোনে না।তবে সে কথা দেয় শেষ দিনগুলো তারা অনেক ভালোভাবে কা’টাবে।
রায়হান ও নীলা অনেক যায়গায় ঘোরাঘুরি করে,একসাথে মুভি দেখে,রেস্টুরেন্টে যায়,শপিং করে এভাবেই নিজের শেষ দিনগুলো উপভোগ করে।যাতে তাদের মধ্যে এই ভালো স্মৃতিগুলো থেকে যায়।
দেখতে দেখতে সেইদিন চলে আসে যেদিন নীলার চলে যাওয়ার কথা।সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নীলা আশেপাশের সবাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।কেউ তার এই পরিস্থিতি বুঝতে না পারলেও রায়হান বোঝে।
রাতে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায় নীলা।সে বলে,’এভাবেই আমাকে শক্ত করে ধরে রাখো।যাতে আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও না যেতে পারি।’
‘যদি সম্ভব হতো নিজের বুকে সারাজীবন আগলে রাখতাম তোমায়।নিজের থেকে একচুল পরিমাণ দূরেও যেতে দিতাম না।’
রায়হানের কথা শুনে নীলার চোখে জল চলে আসে।কিন্তু সে কাঁদেনা।কারণ তারা একে অপরকে কথা দিয়েছে শেষ অব্দি হাসিখুশি থাকবে।নীলা রায়হানকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে।সে শুধু চাইছিল কোন অলৌকিক কিছু ঘটুক কিন্তু সে যেন এই অন্য পৃথিবীতেই থাকে।
শেষাংশ
নীলা চোখ খুলেই নিজেকে চেনা পরিবেশে আবিষ্কার করে।ভালো ভাবে খেয়াল করে বুঝতে পারে সে নিজের পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।এটা বুঝতেই তার দুচোখের অশ্রুধারা আর কোন বাধা মানতে চায়না।ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে নীলা।রায়হান তার সত্যিকারের ভালোবাসাকে সে ছেড়ে এসেছে এটা কোনভাবেই মানতে পারছিল না।আমিনা দৌড়ে এসে বলে,
‘কি হয়েছে নীলা? তুই কাঁদছিস কেন?’
নাজিম উদ্দীনও ছুটে আসে।অন্য পৃথিবীর নাজিম উদ্দীন মারা গেলেও এই পৃথিবীর নীলার বাবা এখনো জীবিত।
এতদিন পর নিজের মা-বাবাকে দেখে নীলা খুশি হয়।কিন্তু রায়হানকে হারানোর বেদনা সে ভুলতে পারেনা।
আমিনার মুখে সে শোনে সে নাকি এখন অনেক বদলে গেছে।অনেক শান্তশিষ্ট হয়ে গেছে।মায়ের কথা শুনে নীলা বুঝতে পারে সে যেমন এতদিন অন্য পৃথিবীতে ছিল,তেমনি অন্য পৃথিবীর নীলাও এই পৃথিবীতে ছিল।
ক্যালেন্ডারে চোখ পড়তেই নীলা আঁতকে ওঠে আজ ১৪ তারিখ।রায়হানের বিয়ে! নীলা আর অপেক্ষা না করে দৌড়ে যায়।কিন্তু তার দেরি হয়ে যায় এই পৃথিবীর রায়হানের বিয়ে অলরেডি মৌসুমীর সাথে হয়ে যায়।
নীলা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসে।তবে একটু ভেবে সে শান্ত হয়,
‘এতো সেই রায়হান নয় যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম।আমি যেই রায়হানকে ভালোবেসেছিলাম সেতো অন্য পৃথিবীর!’
অন্যদিকে অন্য পৃথিবীতে সেই পৃথিবীর নীলা ফিরে গেছে।অন্য পৃথিবীর নীলা সকাল ঘুম থেকে উঠে এতদিন এখানে কি কি হয়েছে সব জানতে পারে নীলার লেখা ডায়েরি দেখে।
রায়হান বাইরে দাড়িয়ে ছিল।কষ্টে তার বুক ভারী হয়ে যাচ্ছিল।নীলা বাইরে আসে।নীলাকে দেখে রায়হান মুচকি হাসে।তারপর বলে,
‘আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম সে তো এই পৃথিবীর নয় অন্য পৃথিবীর।আর তাই আমাদের মিলও সম্ভব হয়নি।কিন্তু এই মন চিরকাল তার কাছেই থাকবে।অন্য কাউকে তার যায়গা কখনো দিতে পারব না।’
রায়হানের কথা শুনে অন্য পৃথিবীর নীলা কষ্ট পায়।কারণ সেও যে রায়হানকে ভালো বাসত।
ভালোবাসাটা পূর্ণতা পেলোনা।কারণ এই ভালোবাসা ছিল এমন দুজন মানুষের যারা ছিল অন্য পৃথিবীর।
The End