#অপ্রিয়_প্রাক্তন
২১তম_পর্ব
~মিহি
তিরার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা নিরসভাবেই শুরু হলো। রাজশাহীতে এসে তেমন কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি। তারান্নুম বেগমের এক কলিগের মেয়ে এ ভার্সিটিতেই পড়ে। তার সাথে থাকার ব্যবস্থা হলো তিরার। প্রথম বছরটা হলে থাকতে নিষেধ করেছে সবাই। তিরা যে আপুর সাথে থাকে তার নাম ঐশি। বড্ড মিশুক স্বভাবের সে, এবার থার্ড ইয়ারে পড়ছে। তিরা ইন্ট্রোভার্ট হলেও অল্প সময়েই বন্ধুত্ব জমেছে দুজনের। তিরা খুব একটা ক্লাস এটেন্ড করেনা এখন, গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকলে একটু মনোযোগ দেয়। মাত্র এসেছে তাই এখনো মানিয়ে নিতে পারেনি। ঐশি আবার এদিক থেকে তার বিপরীত। ভার্সিটি মিস দেওয়া তার স্বভাবে নাই তবে ক্লাস করার জন্য না। ঐশির ফ্রেন্ড সার্কেলটা বিশাল বড়, তাদের আড্ডাই জমে ভার্সিটির মাঠে। এই আড্ডাই ঐশির ভার্সিটি যাওয়ার কারণ। তাছাড়া বিভিন্ন প্রোগ্রাম এটেন্ড করার বেলাতে তো তারা এক পায়ে খাঁড়া। আজও তিরার গুরুত্বপূর্ণ কোনো ক্লাস নেই। সকাল থেকে ঘরেই বন্দী সে, বাইরের হাওয়ায় অস্বস্তিবোধ হয় তার। এখন কারো সাথে ঠিকমতো কথাও হয়না, বাড়িতে যোগাযোগ অনেকাংশ কমিয়ে দিয়েছে। নিশাতের সাথেও কথা কম বলার চেষ্টা করছে সে আর অর্ণব? তার সাথে তো সেদিনের পর আর কথাই হয়নি। তিরা চায়নি যোগাযোগ করতে। অর্ণবের সেদিনের অদ্ভুত ব্যবহারটা তিরার মনে দাগ কেটেছে। অর্ণবকে একমুহূর্তের জন্য খুব পজেসিভ মনে হয়েছে তিরার। ভাবনার বাক্সটা মেলে নানান কথা চিন্তা করছিল তিরা। এরই মধ্যে কলিং বেল বেজে উঠলো। ঐশি এসেছে বুঝতে পেরে তিরা দরজাটা খুলে দিল। ঐশি ক্লান্ত ভঙ্গিতে এসে সোফায় হেলান দিল।
-“তুই ভার্সিটিতে যাস না কেন? বাড়ি থেকে এসেছিস বুঝতে পারছি কিন্তু এখন অভ্যেস না করলে তো তোর বন্ধু হবেই না। এটলিস্ট আমার সাথে তো ঘুরতে পারিস।”
-“তোমার যতবড় ফ্রেন্ড সার্কেল, তার মধ্যে আমি চাপা পড়ে যাবো।”
-“তাহলে ক্যাম্পাসে যা, বন্ধু বানা। একা কতদিন? আচ্ছা শোন, আজ সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে একটা প্রোগ্রাম আছে। একটা গ্রুপ আসছে কালচারাল ফেস্টিভের জন্য। তুই তো যাসনা ক্যাম্পাসে, খোঁজও রাখিস না। আজ সন্ধ্যায় আমার সাথে যাবি। দুইজন শাড়ি পড়ে যাবো।”
-“আমার শরীরটা …”
-“এই বাহানা রোজ দেস তুই, আজ যদি না যাস তাহলে আমি রান্নাবান্না কিছু করবো না। তারপর রোজ নুডলস খেয়ো।”
-“আরে আপু রাগ কোরো না, আমি তো শাড়িটাড়ি পড়িনা। আনিওনি এখানে। এমনি ড্রেস পড়ে যাই?”
-“আমার শাড়ির অভাব? অনেক শাড়ি আছে, তুই পছন্দ কর কোনটা পড়বি। দেখ এখন আড়াইটা বাজতেছে, তিনটার মধ্যে আমাকে ফাইনাল কর।”
-“কিন্তু …”
-“তুই কিন্তু মার খাবি তিরা।”
-“আচ্ছা আচ্ছা দেখতেছি।”
ঐশি বেশ কয়েকটা শাড়ি তিরাকে ধরিয়ে দিয়ে গেল। এতগুলো শাড়ির মধ্যে কোনটা পড়বে বুঝে উঠতে পারলো না তিরা। শেষমেশ একটা নেভি-ব্লু ধরনের রঙ ছিল যেটা বেশ ভালো লাগলো তিরার। পরক্ষণেই মনটা খারাপ হয়ে এলো। এত গাঢ় রঙ নিশ্চয়ই তাকে মানাবে না! হালকা কিছু দেখা উচিত।
-“কী রে তোর পছন্দ হলো কোনোটা?”
-“এই নেভি ব্লুটা পছন্দ হয়েছিল কিন্তু এটা আমাকে মানাবে না আপু। অন্য কোনোটা দেখতেছি।”
-“মানাবে না কেন? ভালোই তো লাগতেছে!”
-“শ্যামবর্ণাদের হালকা রঙে মানায়। এসব গাঢ় রঙে ক্যাটক্যাটে লাগে।”
-“পাগল! তোর যেটা ভালো লেগেছে সেটাই পড়। এটা পড়লে তোকে সুন্দর লাগবে। মানাবে না ভেবে যেটা বাদ দিবি, সেটাতেই তোকে বেশি মানাবে কারণ জিনিসটা তোর পছন্দের।”
তিরা মাথা নাড়লো। নিয়নের কথা মনে পড়লো হঠাৎ। বাড়িতে মানবে না এই ভয়টা ঠিক কী পরিমাণ তিরাকে আহত করেছে একসময় তা সে কাউকে বোঝাতে পারেনি। এখন তো পছন্দের জিনিসটাও নেই। তিরা আর এসব নিয়ে স্ট্রাগল করতে চায়না। পরিবারের ইচ্ছেতেই বিয়ে করবে সে যদি কখনো বিয়ে করতেই হয়। কারো প্রেমে পড়ে বাড়িতে মানবে কিনা এ দুশ্চিন্তায় আর নিজেকে তিলে তিলে শেষ করার দুঃসাহস তার নেই।
_______________________
সন্ধ্যা নাগাদ ঐশি তিরাকে নিয়ে বেরোলো। শাড়ি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তিরা, অভ্যেস নেই বলে কথা!
-“আপু, শাড়ি পড়ার কোনো দরকার ছিল?”
-“অবশ্যই! দেখ কী সুন্দর সাজানো সবকিছু। চল তোর কয়েকটা ছবি তুলবো।”
-“আমার ইচ্ছে করছে না। এমনি ঘুরি চলো।”
-“আমার বন্ধুদের সাথে পরিচয় করাতাম তোকে কিন্তু ওরা ওদের হাউজ পার্টি নিয়ে ব্যস্ত।”
-“তুমি যাওনি কেন?”
-“ভার্সিটি লাইফের বন্ধুত্ব খুব অদ্ভুত হয় তিরা। এখানে তুই স্কুললাইফের মতো সেলফলেস বন্ধু পাবি না। পুরো ফ্রেন্ডসার্কেলটাকে হয়তো আমি পরিবার ভাবি কিন্তু ওদের কাছে আমি একরকম আউটসাইডার। এসব জেনেও ওদের ছাড়া থাকতে ইচ্ছে করেনা, মায়া পড়ে গেছে।”
-“মায়া খুব ভয়ঙ্কর জিনিস আপু, সব তছনছ করতে পারে।”
-“ভালো বলেছিস। চল স্টেজের আশেপাশে থেকে ঘুরে আসি।”
তিরা সামনে হাঁটতে হাঁটতে বারবার নিচের দিকে তাকাচ্ছিল। শাড়ির কুঁচি ঠিকঠাক আছে কিনা এ ভয় কিছুক্ষণ পরপর তাকে জ্বালাচ্ছে। শাড়ির কুঁচির দিকে ধ্যান দিতে দিতে হঠাৎ সামনে তাকিয়ে তিরা দেখলো ঐশি আশেপাশে নেই। ভীড়ের মাঝে একা ঐশিকে কী করে খুঁজবে বুঝতে পারলো না তিরা। প্রচণ্ড নার্ভাস লাগছে তার। করুণ দৃষ্টিতে আশেপাশে চোখ ঘোরাতেই এক পরিচিত মুখে দৃষ্টি আটকালো তার। নিয়ন! তিরা চোখ কচলালো। নিয়নের হ্যালুসিনেশন আবার হচ্ছে? চোখ কচলে তিরা বুঝতে পারলো এটা হ্যালুসিনেশন না, এটা সত্যি। নিয়ন সত্যিই এখানে এসেছে। কিন্তু কেন? নিয়নের হাতে ক্যামেরা। নিয়ন কি সিনেম্যাটোগ্রাফির জন্য এসেছে? অসহায় ভঙ্গিতে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল তিরা। আচমকা ঐশি এসে তার হাত টেনে ধরলো।
-“কী রে তুই ওখানে মূর্তির মতো কেন দাঁড়িয়েছিলি?”
-“তোমায় খুঁজছিলাম।”
-“ওহ আচ্ছা।”
-“আপু, স্টেজের সামনে ক্যামেরা হাতে ওনারা কারা? ভার্সিটির?”
-“আরে নাহ। ওনারা এই পুরো অনুষ্ঠানের ডেকোরেশন এবং ভিডিওগ্রাফির দায়িত্বে আছেন। ওনাদের অফিসের নামটা ভুলে গেছি। অফিসটার সুনাম শুনেছিলাম।”
-“ওহ আচ্ছা।”
-“তুই এখানেই দাঁড়া, আমি আসছি।”
তিরাকে কিছু বলতে না দিয়ে ঐশি সামনে ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। তিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করলো।
-“ভালো আছো তিরা?”
নিয়নের কণ্ঠ পেয়ে মাথা তুললো তিরা। নিয়নের প্রশ্নে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। প্রচণ্ড কষ্ট দেওয়ার পর যখন কেউ প্রশ্ন করে ভালো আছো, তখন তাকে কী জবাব দেওয়া উচিত? তিরা নিজের মনের দহন নিয়নকে বোঝাতে চাইলো না। ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝোলালো সুনিপুণভাবে।
-“আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। আপনার খবর কী?”
-“আমি প্রচণ্ড খারাপ আছি তিরা। তোমায় ছাড়া আমি সত্যিই ভালো নেই। আব্বু আম্মুর সাথে যোগাযোগ নেই, ওরা আমার সাথে কেন এরকম করছে জানিনা।”
-“ওহ!”
-“কোথাও বসি? চা খাবে?”
-“না! আমার এক আপু আসবে, এখানে অপেক্ষা করতে বলেছে।”
-“চা এখানে আনি? কিছুক্ষণ কথাও বলা যাবে না?”
-“আমাদের মধ্যে কথার বাকি আছে কিছু? বোধহয় নেই। থাকলে আমি যখন বেহায়ার মতো একটু কথা বলার জন্য আপনার পেছনে পাগলের মতো পড়েছিলাম তখন আপনি আমাকে চিনতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ভাববেন না এটা নিয়ে আমার মনে ক্ষোভ আছে, যেটুকু রাগ ছিল তা জমে পাথর হয়ে গেছে। সে পাথরে আর আঘাত করার চেষ্টা করে লাভ নেই।”
-“তুমি ভুলতে পেরেছো আমাকে?”
-“আপনি ভুলে যেতে পারলে আমি কেন পারবো না? আমি কি মানুষ না? অবশ্যই ভুলতে পেরেছি!”
ভীড়ের মাঝে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল দুজন। আচমকা পেছন থেকে সামান্য ধাক্কাতে তিরা ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললো। শাড়ি সামলানোর প্রচেষ্টা করতে গিয়ে পা ফসকে গেল। নিয়ন তৎক্ষণাৎ তিরার দু’বাহু শক্ত করে ধরে তিরাকে ধরে রাখলো। তিরার প্রচণ্ড অস্বস্তি হলো নিয়নের স্পর্শে। সারা শরীরে অঙ্গারের তেজ উপলব্ধি করলো যেন সে।
চলবে…
#অপ্রিয়_প্রাক্তন
২২তম_পর্ব
~মিহি
নিয়নকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করলেও নিয়নের শক্ত হাতের কাছে অসহায় তিরার দুর্বল শরীরটা। নিয়ন তিরার হাতটা টেনে একটু আড়ালে নিয়ে গেল। এখানটাতে হৈচৈ কম। নিয়ন কোনো কথা না বলে কেবল ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তিরার দিকে তাকিয়ে আছে।
-“কিছু বলবেন আপনি?”
-“তিরা আমি যা করেছি তোমার ভালোর জন্য। ঐ সময়ে ব্রেকাপ করাটা দরকার ছিল। তোমার এডমিশন ফেইজে আমি কোনো বাধা হতে চাইনি।”
-“মজা করছেন? আমার কলেজ লাইফ শুরুও হয়নি তখন ব্রেকাপ করছেন আমার সাথে উইদাউট এনি ভ্যালিড রিজন। আমার এই ট্রমা থেকে বের হতে কত সময় লাগছে ধারণা আছে আপনার? হুট করে দূরে সরে গেলেই সব সর্ট আউট হয়ে যায়? এত সহজ?”
-“তিরা তোমার মনে আছে এই শাড়ি পড়ে তুমি একদিন আমাকে ভিডিও কল করেছিলে? আমি বলেছিলাম তোমায় এ রঙে মানায়।”
-“অপ্রাসঙ্গিক কথা বন্ধ করেন।”
নিয়ন কোনো কথা না বলে তিরার দু’বাহু শক্ত করে ধরে। তিরা রাগে নিয়নকে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। একসময় ধৈর্য হারিয়ে কান্না করে ফেলে, দীর্ঘ তিন বছরের জমানো অভিমান অশ্রুকণা হয়ে ঝরে পড়ে। নিয়ন আলতো করে তিরাকে জড়িয়ে ধরে। দুর্বল চিত্তে তিরা অনুভব করে নিয়নের স্পর্শ, উপলব্ধি করে নিজের নমনীয়তাও। তৎক্ষণাৎ সরে যায় সে।
-“দয়া করে মিথ্যে আশা আর দিয়েন না প্লিজ! আমি আপনাকে চাই না আর, ঘৃণা করি আমি আপনাকে। দয়া করে আমার সামনে আর আসবেন না প্লিজ।”
-“আচ্ছা ঠিক আছে।”
নিয়ন সোজা হেঁটে চলে যায়। তিরা মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। একটু আগের এ নিয়ন আর এ নিয়নের মধ্যে যেন বিস্তর ফারাক। তিরার মনে হচ্ছে মুহূর্তেই যেন সমস্ত প্রেক্ষাপট বদলে গেল। আশেপাশে ঐশিকে খোঁজার প্রচেষ্টা করলো তিরা কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। এক মুহুর্তে বুকে জড়িয়ে নিয়ে পরক্ষণেই সরিয়ে দেওয়ার পায়তারা বোধহয় নিয়ন ছাড়া কেউ ভালো জানেনা। তিরা এগোতে যাবে এমন সময় নিয়নের টিমের একজন পথ আটকালো তিরার। লোকটার হাতে মাইক। সে তিরার সামনে এসে দাঁড়ালো।
-“আপু, আমরা প্রোগ্রাম নিয়ে একটু মতামত নিতে পারি?”
-“নাহ!”
তিরা নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে প্রত্যুত্তর করে পেছনে ফিরতেই লোকটা বলে উঠলো,”আরে নিয়ন ভাইয়ের বউ যে, খবর কী তেহযীব ভাবী?” তিরার পা উক্ত স্থানেই থেমে গেল। অশ্রুসিক্ত চোখে পেছনে ফিরতেই দেখলো সে নারীকে যার প্রতি তিরার মনে রাজ্যের হিংসে জন্মেছে। আবৃত শরীরে অনাবৃত কেবল চোখজোড়া। তিরা সেদিকেও ধ্যান দিতে পারলো না। যতদ্রুত সম্ভব সেখান থেকে সরে যেতে চাইলো। গিরগিটি যত দ্রুত রঙ বদলায় তার চেয়েও দ্রুত নিয়নের রূপ বদলে। আবার সে রূপের মোহে ভিড়তে চায় না তিরা। এলোমেলো পা চালাতে চালাতে আচমকা একজোড়া হাত তার হাত ধরলো।
-“কতক্ষণ ধরে খুঁজতেছি তোকে! কোথায় হারাইছিলি হুট করে?”
-“আপু আমি বাসায় যাবো।”
-“অনুষ্ঠান অনেকটা বাকি তো, এখনি যাবি কেন? থাক আরেকটু!”
-“আ..আপু..আমার আ..আসলে….”
তিরা কিছু বলার আগেই মাথা ঘুরে পড়ে গেল সেখানে। চোখের সামনে আকস্মিক অন্ধকার ছাড়া নিয়নের চেহারাটাও শেষবার ভাসলো না তার।
__________________________________
-“ওষুধ আনা লাগবে কোনো?”
-“একটু অপেক্ষা কর, জ্ঞান ফেরে কিনা দেখি আগে। আমার মনে হচ্ছে ভীড়ের কারণে সেন্সলেস হয়েছে।”
-“আধা মণের শাড়ি পড়িস কেন তোরা? তাছাড়া ঐটুকু একটা বাচ্চা মেয়েকে প্যাকেট করে ফাংশনে নিয়ে গেছিস কেন তুই?”
-“তূর্যর বাচ্চা! কথা বেশি বলতেছিস, তিরাকে এখানে আনতে হেল্প করছিস মানে আমারে অযথা ব্লেম দিবি ঐটা মানবো না। তুই যা বাইরে, আমি আছি ওর কাছে।”
-“মেডিসিন লাগলে আমায় কল দিস।”
তূর্য দরজা পেরোনোর আগে একবার পেছনে ফিরে তাকালো। তিরার ম্লান মুখে অশ্রুর আস্তরণ খানিকটা নিকট থেকেই উপলব্ধির করেছে সে তাই বোধহয় ক্ষীণ এক মায়া জন্মেছে তিরার উপর।
তিরার জ্ঞান ফিরলো আধঘণ্টা পর। লাফ দিয়ে উঠে আশেপাশে পর্বকে করতে লাগলো তিরা। ঘরে আছে বুঝতে পেরে খানিকটা ধাতস্থ হলো সে।
-“তোর হঠাৎ কী হলো বল তো। অসুস্থ হলি কেন? শাড়ির জন্য তো সেন্সলেস হসনি তুই! কাহিনী কী?”
-“গরমের কারণে আপু। তাছাড়া আমার বাড়ির কথা খুব মনে পড়তেছে। বাড়িতে যাবো কিছুদিনের জন্য। তুমি একটু কাল বা পরশুর বাসের টিকিট ম্যানেজ করে দিতে পারবা?”
-“তিরা তোর কী হয়েছে? সকালেও সব ঠিক ছিল। অনুষ্ঠানে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকে তোর মধ্যে এই সাডেন সেঞ্জ! কেন বল তো। তিরা কিছু হয়েছে তোর সাথে? কেউ মিসবিহেভ করেছে? একবার শুধু বল আমাকে।”
-“কিচ্ছু হয়নি আপু, রিল্যাক্স। আব্বু আম্মুর কথা মনে পড়তেছে। এখন তো ভার্সিটিতে ফেস্টিভাল চলতেছে! ততদিন আমিও ঘুরে আসি। তুমি কালকের টিকিট করে আমাকে দিও।”
-“আচ্ছা আমি খাবার বাড়ছি, তুই ফ্রেশ হ।”
তিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ঐশির সামনে নিয়নের কথা তোলার দুঃসাহস দেখাতে পারলো না সে। নিয়ন নামটা জীবন থেকে মুছে ফেলাটাই তার জন্য প্রত্যয় হয়ে উঠেছে। এখন আর তিরার জানতেও ইচ্ছে করে না কেন তাদের বিচ্ছেদ হয়েছিল বরং নিয়নের এ ঈঅষমে ক্ষণে বদলে যাওয়া তিরাকে উপলব্ধি করায় বিচ্ছেদটাই তার জন্য মঙ্গলজনক।
সকালবেলা কাপড় চোপড় সব গুছিয়ে রেখেছে তিরা। ব্যস টিকিটটা হাতে পাওয়ার দেরি। ঐশি বলেছে ভার্সিটির পর গিয়ে টিকিট কেটে আনবে। তিরা অপেক্ষা করছে ঐশি আসার। ঐশি এলো তবে মলিন মুখে নত চাহনিতে। তিরার মনে ভয় ঢুকলো। ঐশির মুখে বিষণ্ণতার আগমন কেন?
-“আপু কী হয়েছে?”
-“টিকিট পেলাম না রে। টিকিট শেষ সব, আরেকটু আগে যেতে হতো। স্যরি রে।”
-“ব্যাপার না আপু।”
-“তুই সব গুছিয়েছিস! আচ্ছা দাঁড়া, আমি একটু দেখি কী করা যায়।”
ঐশি তৎক্ষণাৎ তূর্যর নম্বরে কল দিল। বন্ধুদের মধ্যে এই ছেলেটাই একটু পরোপকারী স্বভাবের। টিকিট ম্যানেজ করা টাইপ কাজে তার জুড়ি মেলা ভার। তূর্য কল রিসিভ করলো বেশ দেরিতে।
-“কী রাজকার্য করছিলি যে কল ধরিস না?”
-“আরে আমার মেজো খালার সাথে কথা বলতেছিলাম, খালার বাসায় যাচ্ছি আজ।”
-“তোর খালার বাড়ি তো বগুড়া।”
-“হ্যাঁ! ওখানেই যাবো। বাসের দুটো টিকিট কেটেছি, পুরো রাস্তা পায়ের উপর পা তুলে যাবো।”
-“দোস্ত শোন তো! আমার না একটা টিকিট লাগবে। তিরার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে খুব, প্যাকিংও করে ফেলছে মেয়েটা। একটা টিকিট ম্যানেজ কর না।”
-“আমার শান্তিতেই নজর দেওয়া লাগে তোর? চারটের বাস, তিনটা চল্লিশের আগে স্ট্যান্ডে আনিস ওনারে। বাই!”
রগচটা স্বরে বিদায় জানালেও তূর্য মোটেও বিরক্ত নয়। তিরার সাথে সময় কাটানোর একটু সময় দরকার ছিল তার। তিরার চোখে লেপ্টে থাকা অশ্রুকণার রহস্য জানার তীব্র বাসনা তূর্যকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে। তিরা কি আদৌ বলবে তূর্যকে? তূর্য তো অপরিচিত, ফাংশনের দিনও দেখেনি। তারা তো বন্ধুও নয়, কথা শুরু করবে কিভাবে এমন নানা প্রশ্ন তূর্যর মাথায় ঘুরপাক খায় । তূর্য নিজেই অবাক হয় তিরার সম্পর্কে নিজের এক কল্পনার জগতের সন্নিবেশ থেকে। একটা কথোপকথন তো শুরু হওয়া প্রয়োজন। এখন কেবল বিকেল হওয়ার অপেক্ষা …
চলবে …