অপ্রিয় শহরে আপনিটাই প্রিয় পর্ব-১১+১২

0
393

#অপ্রিয়_শহরে_আপনিটাই_প্রিয়
#লাবিবা_আল_তাসফি

১১.

সূউচ্চ প্রাচীরে ঘেরা বাড়িটা প্রিয়তার ভিষণ পছন্দ হলো। বাড়ির সদর দরজা পেরোতেই সামনে পিচদেওয়া সরু রাস্তা। যার দুধারে বাহারি গাছের সমারোহ। দুতলা বাড়িটার অধিকাংশ জায়গা থেকেই রং খসে পড়েছে। বাড়িটায় যে বহুদিন ধরে রঙের আচর পরেনি তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। প্রিয়তার বেশি পছন্দ হলো ছোট্ট শান বাঁধানো পুকুর ঘাটটা। টলমলে পানিতে তাকালে নিজের অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়। এতবড় বাড়িটা এই ভর দুপুরেও কেমন ঝিমিয়ে আছে। প্রিয়তা যখন এসবে বিভোর তখন আয়াজ কিছুটা রসিকতা করে বলল,

‘ আপনার নিজগৃহে আপনাকে স্বাগতম প্রিয়।’

‘হুম?’

‘কিছুনা। ভিতরে চলুন।’

আয়াজ হাসে। প্রিয়তা ছোট ছোট চোখে তাকায়। আয়াজ কেন হাসলো সে বুঝতে পারেনা। তবে তার এখন কেমন কেমন লাগছে। সেদিন রাতের ঘটনার পর দুদিন তার সাথে আয়াজের কোনো যোগাযোগ ছিল না। না আয়াজ তার খোঁজ নিয়েছছ আর না সে নিয়েছে। তবে হুটহাট করেই মন খারাপের মেঘ ছেয়ে যেত। চোখের জল ঝড়েছে কয়েকবার। কখনো বা ভিষণ রকম জেদ চেপে বসতো মাথায়। এই পিচ্চি অভদ্র ছেলের সাথে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই। পরক্ষনেই হু হু করে কেঁদে উঠত মন। তাকে ভুলে থাকাটা এত বেদনার কেন?
আজ প্রিয়তা দুটো ক্লাস করিয়ে ছুটি নিয়েছে। মনের সাথে সাথে শরীরটাও ভিষণ খারাপ। স্কুল থেকে বেরিয়ে বাসের জন্য দাড়াতেই সেখানে আয়াজের আগমন ঘটে। পরনে তার থ্রিকোটার প্যান্ট এবং হাফ হাতার টিশার্ট। প্রিয়তার বুকের ভেতর দামামা বেজে ওঠে। ছেলেটা এত আকর্ষণীয় কেন? এই যে তার কেমন ঘোর লেগে যাচ্ছে! তার ভেতর পুষে রাখা রাগ গলে যাচ্ছে। প্রিয়তা চোখ সরিয়ে নেয়। এই অভদ্র ছেলের দিকে দ্বিতীয়বার তাকাবেনা সে। আয়াজ এগিয়ে এলো। প্রিয়তার শাড়ির আঁচল তুলে মুখ মুছল। প্রিয়তা‌ হকচকাল। চোখ বড় করে বলল,

‘কি হচ্ছে আয়াজ! লোক দেখছে তো!’

আয়াজ আশপাশে তাকালো। তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন লোক কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে। আয়াজ মিষ্টি করে হাসলো। মুখে হাসি ধরে রেখেই বলল,

‘মুখের ঘাম মোছার জন্য বউয়ের আঁচল বেষ্ট। তাই না চাচা?’

লোক দুটো কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। প্রিয়তা চোখ গরম করে। তবে আয়াজ পাত্তা দেয় না। প্রিয়তার পিছু পিছু বাসে ওঠে। বাস থেকে নামার পর এক প্রকার হুমকি ধমকি দিয়েই সে প্রিয়তাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। যদিও প্রিয়তাকে এভাবে ধমকে আনা সহজ ছিল না আয়াজের পক্ষে। শাকিলা বেগম কল করে বলায় প্রিয়তা রাজি হয়েছে। তা দেখে আয়াজ প্রিয়তাকে খোঁচাতে বাদ রাখেনি। দুষ্টু হাসি দিয়ে ছোট ছোট করে বলেছিল,

‘কি ভেবেছিলেন? একা বাসায় আপনায় হরণ করতে নিয়ে যাচ্ছি? আপনার ভাবনাগুলোতো ভিষণ দুষ্টু প্রিয়! আপনাকে দেখে তো বোঝা যায় না এত দষ্টু চিন্তা নিয়ে ঘুরছেন!’

প্রিয়তা চোখ কপালে তুলে তাকায়। মুখের কি ভাষা ছেলের! একদম রসাতলে চলে গিয়েছে ছেলেটা!
__________

বর্তমানে আয়াজদের লিভিংরুমে বসে আছে প্রিয়তা। তার সামনের টেবিল জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন রকম খাবার। তার শরীরের তাপ বেড়েছে কিছুটা। কোনো কিছুই খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। খুব ছোট থেকেই অসুস্থ হলে সে খেতে পারে না। খাবার দেখলে বমি বমি পায়। এখনো তার ভিন্ন কিছু নয়। তবুও প্রিয়তা এক টুকরো আপেলে ছোট ছোট করে কামড় বসাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর শাকিলা তাকে তাড়া দিচ্ছে খাওয়ার জন্য। প্রিয়তা অসহায় চোখে আয়াজের দিকে তাকায়। কিন্তু আয়াজ তার দিকে নজর দিল না। সে তো সোফায় আধশোয়া হয়ে গেইম খেলায় ব্যস্ত।

‘আপনিই কি আমার হতে চলা ভাবী?’

কন্ঠস্বর অনুসরণ করে বা দিকে তাকায় প্রিয়তা। ছিমছাম গঠনের একটা ছেলে হাসিহাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফুটবল। পরনে জার্সি। মুখমন্ডল ঘর্মাক্ত। মাত্রই মাঠ থেকে খেলে ফিরেছে। প্রিয়তা ভিষুম খেল। খুকখুক করে কেশে উঠলো। শাকিলা বেগম ব্যস্ত হলেন। এগিয়ে এসে পানির গ্লাস মুখের সামনে ধরলেন। আয়ানকে চোখ রাঙালেন। আয়ান ঠোঁট উল্টে ভাইয়ের দিকে তাকালো। আয়াজ কপালে ভাঁজ ফেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান মুখ কালো করে বলল,

‘কি করেছি আমি? এভাবে কেন তাকাচ্ছো সবাই?’
কথা শেষ করে পরপর প্রিয়তার দিকে তাকালো আয়ান। মুখ ভার করে শুধাল,

‘নট ফেয়ার ভাবী। কতটা এক্সাইটেড ছিলাম আমি তা তোমার চিন্তা ধারণার বাহিরে। ভেবেছিলাম তুমি আমার পার্টনার হবে। আমরা দুজন মিলে এ বাড়িকে ছোটখাটো একটা সার্কাস বানাব। কিন্তু প্রথম দিনেই তুমি আমার শত্রু বনে গেলে! এটা সত্যিই বেদনাদায়ক।’

আয়ান অসহায় মুখ করে চলে গেল। প্রিয়তা গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল কেবল। শাকিলা হেসে জানালেন,

‘ওর কথায় কিছু মনে করো না। ও আয়াজের ছোট চাচ্চুর ছেলে। আয়ান। ভিষণ দুষ্টু।’

প্রিয়তা হাসলো। সে জানে না ঐই মুহূর্তে কি বলা উচিত তাই হাসিকেই উত্তর হিসেবে বেছে নিল সে। শাকিলা আবারো বললেন,

‘দেখো তোমায় ঢেকে এনে এখন নিজেই ব্যস্ততা দেখাচ্ছি। কিছু মনে করো না। আজ বাড়িতে কেউ নেই। রিতাও তার বাবার বাড়িতে।’

প্রিয়তা হেসে বলল,

‘কোনো ব্যাপার না আন্টি। আমি আপনাকে হেল্প করি? কাজ করতে করতে নাহয় গল্প হবে।’

শাকিলা বেগমের মুখ উজ্জ্বল হলো। মেয়েটার অমায়িক ব্যাবহার তাকে মুগ্ধ করেছে। কি ভিষণ মিষ্টি মেয়েটা! যেন কোন স্বর্গদূত! শাকিলা বেগমের ভিষণ আফসোস হলো। কি হতো যদি মেয়েটার বয়স আর একটু কম হতো? প্রিয়তাকে দেখলে তার বয়স বোঝা যায় না ঠিক। প্রিয়তাকে তার পছন্দ হয়েছে এটাও ঠিক। তবুও তার মনে একটু খচখচানি রয়েই গেলো। মেয়েটা যে তার ছেলের থেকে পাঁচ বছরের বড়! আয়াজের বাবা কি এই সম্পর্কে সম্মতি দিবেন?
__________

গ্রীষ্মের শেষ প্রায়। প্রকৃতি হুটহাট নিজের রূপ বদলে ফেলছে। কখনো ভিষণ রোদ কখনো বা ঝুপঝুপ করে বৃষ্টি। বর্তমানে আকাশে মেঘ করেছে। ভিষণ রকম অন্ধকার। বাতাস বইছে শো শো করে। ভাব এমন যেন এখনি বৃষ্টি নামবে। ভাসিয়ে দিবে এ ধরণীকে। কিন্তু প্রিয়তা জানে বৃষ্টি হবে না। থেমে যাবে কিছুক্ষণের মাঝে। মেঘ কেটে সূর্যি মামা উঁকি দিবে। হেসে বলবে,’হাভ সাম ফান?’

প্রিয়তার কথা সত্যি হলো। মেঘ কেটে গেছে। উজ্জ্বল আলোয় ছেয়ে গেছে সর্বত্র। প্রিয়তা সরল হাসলো। গুনগুন করে গান ধরলো। আজকাল তার খুব সুখ সুখ অনুভব হয়। মাজা অবদি ছড়ানো চুলগুলো হাতে পেঁচিয়ে খোপা বাঁধলো। মনে পড়লো আয়াজ তার চুল দেখে বলেছিল,

‘চুল সামলাতে নিশ্চই আপনার ভিষণ কষ্ট হয় প্রিয়? বিয়ের পর আপনার চুল সামলানোর দায়িত্বটা আমি নিয়ে নিলাম। এই সামান্য কটা দিন নাহয় একটু কষ্ট করে নিন।’

প্রিয়তার ঠোঁটের কোণে হাসি মিলল। আয়াজের কথা মনে পড়লে আজকাল তার ভিষণ লজ্জা লাগে। কেমন করে যেন তাকায় ছেলেটা। একদম বুকে এসে লাগে। প্রিয়তার ফোন বেজে উঠলো। প্রিয়তা ব্যস্ততা দেখালো না। ফের আয়নায় নিজেকে একবার দেখে উঠলো। ধীর পায়ে এগিয়ে বিছানা থেকে ফোন তুলে নিল। ফোনের ট্রেনে আজের নাম্বর ভেসে উঠেছে। প্রিয়তা আয়োজন নাম্বার সেভ করেনি। সেভ করার মতো উপযুক্ত কোনো নাম সে আয়াজকে দিতে পারেনি। তবে নম্বরটা তার ভিষণ পরিচিত।

‘এত দেরী কেন হলো প্রিয়তা?’

‘চুল বাঁধছিলাম।’

‘আচ্ছা।’

এরপর নিশ্চুপ। কিছুসময় পর আয়াজ আবার বলল,

‘একটু বের হতে পারবেন?’

‘যদি বলি না তবেকি বের হতে মানা করবে?’

‘দুঃখীত। না বলে কোনো অপশন আপনার বরাদ্দ নেই। রেডি হয়ে নিন। টাইম থার্টি মিনিট।’

কল কেটে গেছে। প্রিয়তা ফিচেল হাসলো। অতঃপর বসে গেলো পোশাক বাছাইয়ের জন্য। আজকের এই সুন্দর পরিবেশে তাকেও সুন্দর লাগা চাই।

চলবে……..

(ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন।)

#অপ্রিয়_শহরে_আপনিটাই_প্রিয়
#লাবিবা_আল_তাসফি

১২.

‘আয়াজ আমার কাছে কিছু ঠিক লাগছে না। প্লিজ পাগলামি করো না।’

‘আপনি আমায় ভালোবাসেন প্রিয়তা?’

প্রিয়তা আয়াজের চোখে তাকালো। ছলছল চোখে মাথা উপরনিচ করলো। আয়াজ জোরে শ্বাস নিলো। বলিষ্ঠ হাতে প্রিয়তার হাত আঁকড়ে ধরল। আশ্বাস দিয়ে বলল,

‘আমরা খারাপ কিছু করছি না প্রিয়। আমরা আমাদের সম্পর্ককে হালাল করছি। নিজেদের সম্পর্কের একটি পূর্ণতার রূপ দিচ্ছি। কেন অযথা ভয় পাচ্ছেন? আমিতো আছি।’

আয়াজের কথা শুনে প্রিয়তাহু হু হু করে কেঁদে ফেলল। ক্রন্দনরত অবস্থায় বলল,

‘আমি তোমাকে হারানোর ভয় পাচ্ছি আয়াজ। আমি তোমাকে হারাতে চাইনা। একদম চাই না।’

আয়াজ মুচকি হাসলো। আলতো হাতে মুছে দিল প্রিয়তার চোখ। ফিসফিস করে বলল,

‘আমাকে যেন না হারাতে হয় তার ব্যবস্থাইতো করছি।’

‘কিন্তু..’

‘হুসসহ। কোনো কিন্তু না। ভেতরে চলুন। যত লেইট করবেন আমাকে হারানোর সম্ভাবনা তত বাড়তে থাকবে। রিস্ক নিতে চান?’

প্রিয়তা ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে না জানালো। আয়াজ ঠোঁট টিপে হাসলো। কে বলবে এই মেয়ে পেশায় একজন শিক্ষিকা? আয়াজের মনে হচ্ছে প্রিয়তাকে একটা চকলেট দিলেই সে কান্না থামিয়ে ফিক করে হেসে ফেলবে। এত আদুরে কেন তার প্রিয়?
____________

কাজী অফিস থেকে আজ খুব হাসিখুশি মুখে বের হলে দেবো প্রিয়তার মুখটা থমথমে। সে এখনো বুঝতে পারছেনা কি থেকে কি হলো। আজ শুক্রবার হওয়ার সুবাদে সে বাসাতেই ছিল। আয়াজ কল করে ডাকায় সে ফুরফুরে মেজাজে দেখা করতে চলে আসে। কিন্তু আয়াজের বিদ্ধস্ত চেহারা দেখে সে থমকে যায়। কেমন এলোমেলো হয়ে আছে তার চুল। মুখটাও ফুলে আছে। প্রিয়তা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,

‘কি হয়েছে? এমন কেন লাগছে তোমায়?’

উত্তরে আয়াজ যা বলে তা প্রিয়তাকে আবারো কাঁপিয়ে দেয়।

‘আমায় বিয়ে করতে পারবেন প্রিয়?’

‘কি হয়েছে আয়াজ? এসব কেন বলছ?’

‘পারবেন?’

প্রিয়তা কাঁপা গলায় উত্তর দেয়।

‘অবশ্যই।’

এরপর আয়াজ আর কোনো কথা বলে না। একটা রিকশা ঠিক করে তাতে চড়ে বসে। সুপারমার্কেটের পাশের চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় কাজী অফিস। কাজী অফিসের সামনে এসে দাঁড়াতেই প্রিয়তা নড়েচড়ে ওঠে। বুকের ভেতর অজানা কারোনে ডিপডিপ করছে। নাকে ছোট ছোট ঘামকণা জমতে শুরু করেছে।

‘এখানে কেন আমরা আয়াজ?’

‘কাজী অফিসে যে কারণে আসে মানুষ সে কারণে।’

এরপর যা হওয়ার সেটাই হয়েছে। আপাতত প্রিয়তা শক্ত করে আয়াজের হাত ধরে আছে। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কত কিছু হয়ে গেল তার জীবনে। এখন সে বিবাহিত। তার একটা পিচ্চি বর আছে। প্রিয়তা কিছু একটা ভেবে প্রশ্ন করল,

‘এখন আমরা কোথায় যাব আয়াজ?’

আয়াজ সময় নষ্ট না করে সহজ গলায় বলে,

‘কুঠিবাড়ি।’

কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে প্রিয়তার ভাবতে। অতঃপর মনে পড়ে এটা আয়াজদের বাড়ির নাম। প্রিয়তার ভিষণ মন খারাপ হলো। আজ তার বিয়ে হলো অথচ তার কোনো পরিবার নেই। না আছে কোনো অভিভাবক। সে নিজেই নিজের সব। আজ মা থাকলে নিশ্চয়ই তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আয়াজের হাতে তুলে দিত। প্রিয়তার বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে পা বাড়ালো তার নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে। তার জানা নেই কি হতে চলছে। কিন্তু তবুও তার কোনো ভয় নেই। পাশের মানুষটার হাতে হাত রেখে সে ভয়হীন ভাবে মৃত্যুকেও বরণ করে নিতে পারবে।
____________

মাথার উপরের সিলিং ফ্যানটা ভনভন করে ঘুরছে। ভাবসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে আয়াজ। শাকিলা এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এগিয়ে দিলো ছেলের দিকে। তোরিকুল সাহেব বিরক্তি নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। পানি শেষ করে আয়াজ বাবার চোখে চোখ রাখল। শান্ত শীতল গলায় বলল,

‘এত জরুরি তলব কেন?’

তরিকুল সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। গমগমে সুরে বললেন,

‘তোমাকে কেন জরুরি তলব পাঠানো হয়েছে তার কারণ নিশ্চই আমাকে বলতে হবে না। যথেষ্ট বুদ্ধিমান তুমি।’

‘জি। আমার মনে হয় কারণটা আমি বুঝতে পেরেছি। আর এজন্যই আপনার মতামত শুনতে আগ্রহী আমি।’

তরিকুল সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। ছেলের এমন শান্ত শীতল কন্ঠ তাকে তার জায়গা থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে তিষি ভিষণ বিরক্ত বোধ করলেন। গলার স্বর কঠিন করে তিনি বললেন,

‘সমাজে আমার একটা সম্মান আছে। তোমার এটা ভুলে গেলে চলবেনা। পাঁচ বছরের বড় একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছ। এ কথা লোকে জানলে কি হবে বুঝতে পারছ? তোমার আমার রেপুটেশনের কথা একবার ভাবা উচিত ছিল।’

আয়াজ ধৈর্য হারালো না। তার ভাব-ভঙ্গি স্বাভাবিক। প্রগাঢ় শান্ত কন্ঠে বলল,

‘বিয়েটাতো আমি করেছি বাবা। রেপুটেশন কেন আপনার নষ্ট হবে? কেউ কিছু বলতে এলে তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিবেন। আমি বুঝে নিব। আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন।’

তরিকুল সাহেব খুক খুক করে কেশে উঠলেন। এই মুহূর্তে তার নিজের ছেলেকে চরম অসভ্য অভদ্র বলে মনে হচ্ছে। বাপের থেকে বেশি বুঝতে শিখে গেছে। এই ছেলেকে অসভ্য ছাড়া আর কি বলা যায়?
তরিকুল সাহেব থামলেন। গম্ভীর হয়ে ছেলেকে দেখলেন। তার ছেলের ভেতর আত্মবিশ্বাস জেদ সর্বদাই বেশি। ছেলে যা করছে সব তার জেদ। একবার জেদ থেকে বের হয়ে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রিয়তাকে তার দেখতে শুনতে খারাপ লাগছ না। কিন্তু তবুও কেন জেন মেয়েটাকে তার ভিষণ অপছন্দ। বয়সে বড় তাই? হয়তো। তরিকুল সাহেব পুনরায় আয়াজের দিকে মন দিলেন। ভিষন গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বললেন,

‘তোমার বউয়ের জন্য এ বাড়ির দরজা বন্ধ। আমার অফিসেও তোমার জায়গা হবেনা যদি তুমি তোমার কথায় অটল থাক। ভেবে দেখো কি করবে। আমার কথা শুনলে বাড়ি ফিউচার সব তোমার হাতের মুঠোয়। আর অন্যথায় সব থেকেও তোমার কিছুই নেই।’

তরিকুল সাহেব সন্তুষ্ট চিত্তে উঠে দাঁড়ালেন। তার ছেলে ভিষণ বুদ্ধিমান। সামান্য একটা মেয়র জন্য সব কিছু সেক্রিফাইস করে বোকামি নিশ্চই করবে না। তিনি আনন্দিত হয়ে শাকিলা বেগমকে ডাকলেন। আবদার করে বললেন,

‘এক কাপ গরম চা আর গরম গরম পাকোরা বানাও তো। তোমার হাতের পাকোরা মিস করছি।’

শাকিলা বেগম তরিকুল সাহেবের হাসি হাসি মুখ দেখে খুশি হলেন। নিশ্চই সব স্বাভাবিক হয়েছে! পরিবারে তাহলে সুখ নামলো বোধহয়!
কিন্তু তিনি জানতেন না পরিবারের শেষ সুখ টুকুও ধূলিস্যাৎ করেই আনন্দে মেতেছে তরিকুল সাহেব।
_________

প্রিয়তা ভিষণ মন খারাপ নিয়ে কাবার্ড থেকে আয়াজের কাপড় বের করে গোছাতে লাগলো। সে একটা পরিবার পাবে একটা মা পাবে এতসব ভাবনা নিয়েই এ বাড়িতে পা রেখেছিল সে। কিন্তু তার মেয়াদকাল এ বাড়িতে একটা রাত ও হলো না। সে কি এমন পোড়া কপাল নিয়েই জন্মেছে? প্রিয়তা আঁচলে চোখ মুছল। একবার ভালো করে আয়াজের রুমটা দেখে নিলো। এই রুমটায় ঢোকার পর তার ভিষণ আপন মনে হয়েছিল। কিন্তু কি হলো? প্রিয়তা উদাস মনে হেঁটে বারান্দায় গেল। আয়াজের রুমের বারান্দাটা বিশাল। জানা অজানা বিভিন্ন ফুলের গাছ আছে এখানে। এখানে বসে চন্দ্রবিলাস করা যেত। মাত্র কয়েক ঘন্টায় প্রিয়তা অনেক কিছুই ভেবে নিয়েছিল কিন্তু তার কিছুই হলোনা ভেবে মুখ কালো করলো সে। এরি মাঝে আজ এলো রুম। প্রিয়তাকে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে এসে দাঁড়ালো। পেছন থেকে আঁকড়ে ধরে কাঁধ থুতনি ছোয়াল। প্রিয়তা চমকে উঠে চোখ বন্ধ করে নিলো।

‘মন খারাপ কেন বউ?’

আয়াজের মুখে বউ ডাক শুনেই প্রিয়তা কেঁদে ফেলল। আয়াজ থতমত খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ব্যস্ত হয়ে বলল,

‘কাঁদছেন কেন?’

‘তুমি কথা রাখোনি আয়াজ। তোমার পরিবার আমায় মেনে নেয়নি।’

আয়াজ আলতো করে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তাকে। শান্ত করার গলায় বলল,

‘আমি আপনাকে মেনে নিয়েছি প্রিয়তা। এর থেকে বেশি কি চাই আপনার?’

চলবে……