#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১
ভাসুরের সাথে পরকীয়ার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে বউ ঘরে নিয়ে আসল মরিয়মের স্বামী। তাও আবার মরিয়মের ভাসুরের ১ বছর আগে ছেড়ে যাওয়া বউকেই।
শ্রাবণের আকাশে মেঘের ভার, যেন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে পুরো পাড়ার ওপর। কিন্তু আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘের চেয়েও ভারী হয়ে আছে মরিয়মের বুকের ভেতরটা। চারটে বছর সে এই সংসারে নিজের র-ক্ত পানি করেছে, হাঁড়ির ধোঁয়া থেকে শুরু করে শাশুড়ির পায়ের সেবা কিছু বাদ দেয়নি। অথচ আজ? আজ সেই ঘরেই উঠেছে নতুন বউ।
নতুন বউ কে, তা জেনে পুরো গ্রামের মানুষের চোখ কপালে উঠেছে। ভাসুর রফিকের বছরখানেক আগে ছেড়ে দেওয়া বউ শিউলি!
বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মরিয়ম। তার চোখ দুটো র-ক্তজবা ফুলের মতো লাল, কিন্তু পানি গড়াচ্ছে না। বুকের মধ্যে আগুন জ্বললে বুঝি চোখের পানি শুকিয়ে যায়। উঠোনে তখন নতুন কনের আলতা পরা পায়ের ছাপ পড়ছে। মরিয়মের স্বামী জাহিদ নতুন বউয়ের হাত ধরে ঘরে তুলছে, মুখে বিজয়ের হাসি।
উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল মরিয়মের শাশুড়ি রাবেয়া বেগম। মুখটা কুঁচকে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও মনে মনে হয়তো ছেলেই জিতে গেছে ভেবে এক ধরনের সূক্ষ্ম তৃপ্তি পাচ্ছেন। মরিয়মকে দেখেই জাহিদ থমকে দাঁড়াল। থমকে দাঁড়াল শিউলিও তার মুখে এক চিলতে বিজয়ী ও বাঁকা হাসি।
জাহিদ শিউলির হাতটা ছেড়ে দিয়ে দুই ধাপ সামনে এগিয়ে এল। মরিয়মের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “এমনে সাপের মতো চ্যায়া আছোস ক্যা? ঘরের মাল ঘরে আইছে, তোর পেট জ্বলতাছে নাকি?”
মরিয়ম কড়া চোখে জাহিদের দিকে তাকাল। তার গলায় কোনো কাঁপুনি ছিল না, ছিল চরম বিষের ধার।
“ঘরের মাল? ভাসুরের ছেড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট এখন তোর ঘরের মাল হইল জাহিদ? তোর লজ্জা করে না? নিজের ভাই যেটারে দূর দূর কইরা তাড়াইয়া দিল, তুই সেটারে আবার গলায় ঝুলাইয়া আনলি?”
জাহিদের মুখ এক মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল। রাগ সামলাতে না পেরে সে হাত উঁচিয়ে মরিয়মের দিকে তেড়ে এল, “মুখ সামলা মরিয়ম! একদম মুখ সামলাবি! তোর মতো অসতী, কুলটা মাইয়ার মুখে শিউলির নামে এসব কথা মানায় না! তুই আর রফিক ভাই কী করছোস, আমি কি জানি না ভাবছোস?”
মরিয়মের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ভাসুর রফিকের সাথে তার সম্পর্ক? মিথ্যা! একবারে জলজ্যান্ত মিথ্যা!
“জাহিদ!” মরিয়ম চিৎকার করে উঠল, “আল্লাহরে ভয় কর! নিজের ভাই আর নিজের বউয়ের নামে এমন জঘন্য মিথ্যা অপবাদ দিতে তোর জিব খসে পড়ে না? রফিক ভাই আমার ভাইয়ের বয়সী! আর তুই… তুই নিজের পাপ ঢাকতে আমার গায়ে এই কলঙ্ক ছিটাইলি?”
শিউলি এবার তার ঘোমটাটা একটু সরিয়ে সামনে এল। তার গলার আওয়াজ মিষ্টি, কিন্তু বিষে ভরা।
“ও মরিয়ম বুবু, এত চিল্লাচিল্লি করতাছ ক্যা? নিজের পাপ কি আর চিল্লাইলে ধোয়া যায়? তুমি আর রফিক ভাই রাইত বিরাইতে রান্নাঘরে কী করতা, আমি নিজের চোখে দেখি নাই? তুমি তো দুধের মাছি না, একদম ধোয়া তুলসী পাতা! জাহিদ তোমারে এতদিন মাথায় তুলিয়া রাখছিল, তাই তুমি তারে চোখ ঠাইরা ভাসুরের সাথে পিরীত চালাইছ!”
মরিয়ম স্তম্ভিত হয়ে গেল। শিউলির দিকে পা বাড়াতেই শাশুড়ি রাবেয়া বেগম মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।
“থাম মরিয়ম! একদম পা বাড়াবি না! তুই নাকি সতীi! শিউলি যখন কইতাছে, তখন কি অমনি অমনি কইতাছে? রফিকের কপাল ভালো, সে তোরে ছাইড়া দিয়ে এই সংসার থিকা বাইর হয়া গেছে। আর তুই আমার ছোট পোলাটারে বলদ বানাইয়া এই ঘরে রাজত্ব করবি ভাবছিলি?”
মরিয়ম এবার হেসেই ফেলল। এক করুণ, ভয়ার্ত হাসি।
“ওহ, বুজছি! সব বুঝতে পারছি!” মরিয়ম জাহিদের দিকে আঙুল তুলল, “তোর সাথে শিউলির তলে তলে কতদিনের পিরীত, জাহিদ? রফিক ভাই যখন শিউলিরে তালাক দিয়া চইলা গেল, তখন থিকাই তোদের এই নাটক শুরু, তাই না? তোরা দুইজন মিলে আমার আর রফিক ভাইয়ের নামে এই নোংরা অপবাদ সাজাইছিস, যাতে সমাজ তোদের এই অকামরে ভালো চোখে দেখে! যাতে তুই মোড়ের মাথায় গিয়া বলতে পারিস ‘বউ আমারে ঠকাইছে, তাই আমি ভাইয়ের ছেড়ে দেওয়া বউরে উদ্ধার করছি!’ ধিক্কার তোদের!”
জাহিদ যেন মরিয়মের এই সোজা কথায় ধাক্কা খেল। তার চেহারার চাতুরি ধরা পড়ে যাওয়ার এক ধরনের ভীতি ফুটে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই সে হিংস্র হয়ে উঠল।
“একদম ফাজিলপনা করবি না মরিয়ম! তোর এই মুখে অনেক কথা ফুটছে, না? তুই ভাবছোস তোর এই নাটক দেইখা আমি গল্যা যামু? শিউলি এই ঘরের আসল বউ ছিল, আবার আসল বউ হইয়াই ফিরছে। তুই এখন এই ঘরের দাসী! থাকলে থাক, না থাকলে বাপের বাড়ি কাইটা পড়!”
মরিয়মের চোখ দিয়ে এতক্ষণে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। তবে তা কষ্টের নয়, চরম ঘৃণার। সে চারপাশটা দেখল। এই ঘর, এই বারান্দা, এই উঠোন যেখানে সে রক্ত জল করা খাটুনি খেটেছে। আজ সেখানে তাকে বানানো হয়েছে ব্যভিচারী, আর আসল পাপীরা বিজয়ের হাসি হাসছে।
শিউলি মুচকি হেসে জাহিদের বাহু চেপে ধরল, “ছাড়ো তো জাহিদ … ওনাকে বলে লাভ নাই। চলো ঘরে চলো। আমি ক্লান্ত।”
“জাহিদ ?” মরিয়ম হঠাৎ গর্জে উঠল, “বাহ শিউলি, বাহ! যে স্বামী তোরে এক বছর আগে দূর দূর কইরা তাড়াইয়া দিছে, তার ছোট ভাইরে এখন তুই ‘জাহিদ’ বইলা ডাকতাছিস, আবার তার সাথে এক বিছানায় শুইতে আইছিস? তোর লজ্জা-শরমের লেশমাত্রও নাই!”
শিউলি চোখ মুখ বাঁকিয়ে বলল, “জাহিদ আমারে সম্মান দিছে, মর্যাদা দিছে। তোমার মতো ভাসুরের লগে পরকীয়া তো করি নাই! বেশি কথা বললে জাহিদ তোমারে এহনি এক কাপড়ে বাইর কইরা দিব।”
“বাইর করার তুই কে রে শিউলি?” মরিয়ম এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে এখন আগুনের শিখা। “তুই ভাবছিস তুই জিতে গেছিস? অপবাদ দিয়া, নোংরামি কইরা তুই এক পুরুষরে পাইছিস। কিন্তু মনে রাখিস, যে পুরুষ নিজের বউরে কাদা ছিটাইয়া আরেকজনরে ঘরে তোলে, সে পুরুষ কোনোদিন কারো আপন হয় না। আজ আমার সাথে যা করল, কাল তোর সাথেও তা-ই করব।”
জাহিদ মরিয়মের দিকে তেড়ে এসে তার জামার হাতা চেপে ধরল, “তুই বেশি কথা বলতাছোস মরিয়ম! তোরে আমি তালাক দেই নাই, এইটাই তোর ভাগ্য। এই ঘরেই তুই থাকবি, শিউলির দাসী হইয়া থাকবি। জুটলে খাবি, না জুটলে না খায়া থাকবি!”
মরিয়ম হেঁচকা টানে জাহিদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চেহারায় এখন আর কোনো অসহায়ত্ব নেই, আছে এক কঠিন আত্মপ্রত্যয়।
“তোর তালাকের আশায় আমি বইসা নাই জাহিদ। তোদের এই নোংরা, পচা ডোবায় আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না। যে সংসারে চরিত্রের কোনো দাম নাই, যে সংসারে নিজের পাপ ঢাকতে ভাসুর আর বউয়ের গায়ে কলঙ্ক মাখানো হয়, সেই সংসারকে আমি পায়ে ঠেলি!”
শাশুড়ি রাবেয়া বেগম আঁতকে উঠলেন, “কী কইলি তুই? ঘর ছাইড়া যাবি? বাপের বাড়ি গিয়া কী কবি? সতীপনা দেখাইয়া লাভ নাই, গ্রামে মুখ দেখাইতে পারবি না!”
মরিয়ম শাশুড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। “মা, এতদিন তোমারে নিজের মায়ের মতো মানছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, তুমিও এই পাপের অংশীদার। গ্রামে মুখ কে দেখাইতে পারবে আর কে পারবে না, তা সময় বুজাইয়া দিব। আমি সত্যের ওপর আছি, আল্লাহ আমার সাথে আছে। কিন্তু তোরা… তোরা তো জীবন্ত লাশ! শিউলি, তুই যেই সতীপনার ঢোল বাজাইতাছিস, সেই ঢোল একদিন তোর মাথায়ই ভাঙব।”
মরিয়ম আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তার ঘরে গিয়ে নিজের দুটো শাড়ি আর বাপের দেওয়া এক জোড়া রূপার চুড়ি একটা ছোট পোটলায় বাঁধল। কোনো কাঁদানাকা নেই, কোনো অনুনয়-বিনয় নেই। সে বাইরে বেরিয়ে এল।
শিউলি আর জাহিদ তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। জাহিদের মুখে এক ধরনের অপরাধবোধ আর অস্বস্তি স্পষ্ট, কিন্তু শিউলির চোখে জিতের অহংকার।
মরিয়ম বারান্দার সামনে এসে থামল। জাহিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ তীব্র গলায় বলল, “তোর সাথে চার বছরের সংসার আছিল জাহিদ। আজ তোর আসল চেহারা দেখে গেলাম। তুই শুধু আমারেই ঠকাউ নাই, তুই তোর ভাই রফিক ভাইরেও কালঙ্কিত করলি। কিন্তু মনে রাখিস, আল্লাহর বিচার খুব সূক্ষ্ম। আজ তুই হাসি মুখে শিউলিরে ঘরে তুললি, কাল এই শিউলিই তোর গলার ফাঁস হইব।”
জাহিদ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
মরিয়ম পা বাড়াল উঠোনের দিকে। শ্রাবণের মেঘ ভেঙে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। সেই ধারাস্নানে মরিয়ম যেন চার বছরের সব নোংরা স্মৃতি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল। সে মাথা উঁচু করে সোজা রাস্তার দিকে হেঁটে চলল।
পেছনে পড়ে রইল একটি মিথ্যা অপবাদের সংসার, একজন ভীরু ও প্রতারক স্বামী, আর এক বিষাক্ত নারী। মরিয়ম জানে, তার সামনের পথ কঠিন, কিন্তু এই পাপাচারের চেয়ে সেই পথ অনেক বেশি পবিত্র। সে হেঁটে চলল এক নতুন ভোরের সন্ধানে, যেখানে অপবাদের কোনো স্থান নেই, আছে শুধু নিজের আত্মসম্মান।
চলবে????

