#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৭
আশ্বিন পেরিয়ে কার্তিক গড়িয়ে পৌষের শুরু। সময় যেন নদীর স্রোতের মতো গড়িয়ে গেছে পীরপুর গ্রামের বুক দিয়ে।
এখন মরিয়মের গর্ভের বয়স পূর্ণ সাত মাস। তার শরীরে এসেছে এক মাতৃত্বের পরিপূর্ণ স্নিগ্ধতা, আর পেটের আকৃতি বেশ স্ফীত হয়ে উঠেছে। রফিক শেখ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেন না। শিউলিকে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছ। অনেক চেষ্টা করার পরও শিউলি মুখ খুলে নি তাই কি আর করার। সেই অঙ্গ পাচারকারী চক্রের রহস্য উদ্ঘাটনের পর থেকে রফিক গ্রামের পাহারায় আরও বেশি সতর্ক, তবে আজ রাতে যেন নিয়তি এক অদ্ভুত ও নির্মম পরীক্ষা নেওয়ার আয়োজন করে বসেছিল।
পৌষের কালরাত্রে পীরপুর গ্রামে কালবৈশাখীর মতো অসময়ে এক বিকট ঝড় আর ঝুমঝুম বৃষ্টি নেমে এসেছে। কড়কড় শব্দে বাজ পড়ছে চারদিকে। পুরো গ্রাম অন্ধকার, থমথমে।
কাকতালীয়ভাবে আজ রাতে শেখ বাড়িতে রফিক শেখ ছাড়া কোনো মানুষ নেই। জাহিদকে হাটের কাজের জন্য দুই দিন আগেই পাশের সদরে পাঠানো হয়েছে, আর শাশুড়ি রাবেয়া বেগমও পাশের বাড়িতে অসুস্থ এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়ে ঝড়ের তোড়ে আটকে পড়েছেন।
উত্তরের বড় ঘরের মেঝেই হারিকেনের মিটিমিটি আলো। ঘরের বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি আর বাতাসের মাতম।
রফিক ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ পেছনের বাঁশঝাড়ের দিক থেকে পাঁচ-ছয়জন কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা সশস্ত্র ডাকাত একযোগে শেখ বাড়িতে চড়াও হলো! এরা সেই অঙ্গ পাচারকারী চক্রের অবশিষ্টাংশ যাদের বিরুদ্ধে রফিক বেশ কিছুদিন ধরে আড়ালে প্রমাণ জোগাড় করছিল। আজ ঘর ফাঁকা পেয়ে তারা রফিককে চিরতরে শেষ করে দিতে এসেছে!
“আজ তোরে বাঁচানোর কেউ নাই রে রফিক শেখ!”
ডাকাতদের দলটা দরজায় সজোরে কোপ ম-ারল।
রফিক শেখ এক মুহূর্ত দেরি না করে ওর মোটা লাঠি আর ধারালো রামদাটা তুলে নিয়ে একা দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
শুরু হলো এক অসম, ভয়ংকর র*ক্তক্ষয়ী লড়াই!
ঝুম বৃষ্টির মাঝে উঠোনে আর বারান্দায় রফিক শেখ একাই সিংহের মতো গর্জে উঠল। কিন্তু ডাকাতরা ছিল সংখ্যায় বেশি এবং তাদের হাতে ছিল বিষাক্ত ধারালো অস্ত্র। রফিক তাদের একের পর এক আঘাত হেনে তাড়িয়ে দিচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু লড়াইয়ের এক পর্যায়ে এক ডাকাতের রামদার কোপ এসে বিঁধল রফিকের ডান পায়ের উরুতে!
“আহ্!”
রফিক শেখের মুখে এক যন্ত্রণার আর্তনাদ ফুটল, কিন্তু সে দমে গেল না। আঘাত পাওয়া র*ক্তাক্ত পা নিয়ে, এক পায়ে ভর দিয়ে লড়তে লড়তে সে লাঠির সজোরে আছাড়ে দুই ডাকাতকে উঠোনের কাদায় ফেলে দিল। রফিকের এমন তেজ আর মরিয়া রূপ দেখে বাকি ডাকাতরা ভয় পেয়ে র*ক্তাক্ত সঙ্গীদের টেনে নিয়ে বৃষ্টির অন্ধকারের দিকে চম্পট দিল।
ডাকাতদের তাড়াতে পারলেও রফিকের শরীর ততক্ষণে ধূলিসাৎ হতে বসেছে। ওর ডান পা থেকে তাজা র*ক্ত গড়িয়ে উঠোনের কাদাপানিতে মিশে যাচ্ছে। শরীরটা অবশ হয়ে আসছে, সে ঠিকমতো হাঁটতেই পারছে না! বাঁশের খুঁটি ধরে উনাকে কোনোমতে শরীরটা টানতে হচ্ছে।
“মরিয়ম,,,, মরিয়ম, তুমি ঠিক আছ তো?” রফিক ধুঁকতে ধুঁকতে, পা হেঁচড়ে বড় ঘরের দরজার দিকে এগোলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে এক চরম করুণ ও যন্ত্রণাদায়ক চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এল!
“আহ্,,,,, রফিক! ও রফিক রে,,,, মোরে বাঁচান!”
রফিক শেখের বুকের ভেতরটা এক নিমেষে বরফ হয়ে গেল! সে আঘাতপ্রাপ্ত পা সামলাতে না পেরে আছাড় খেয়ে ঘরের চৌকাঠে পড়ল, তারপর কনকন করা ব্যথায় পা ছেঁচড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে মরিয়ম! তার শরীর যন্ত্রণায় কোঁকড়া হয়ে যাচ্ছে, পরনের নীল শাড়িটা ভিজে একাকার। বাইরে ঝড়ের গর্জন আর ভেতরে মরিয়মের এই অকাল প্রসববেদনা! সাত মাসেই তার তীব্র ব্যথা শুরু হয়ে গেছে!
মরিয়ম দুই হাতে নিজের স্ফীত পেট জড়িয়ে ধরে ব্যথায় ছটফট করছিল। তার কপালে ঘেমে যাওয়া চুল লেপ্টে আছে, চোখ দিয়ে অঝোরে গড়াচ্ছে পানির নদী।
“রফিক,,,, আমার পেটে অসহ্য ব্যথা,,,, আমি আর সহ্য করতে পারছি না গো! আমাদের বাচ্চাটা বোধহয় আর বাঁচবে না,,,,” মরিয়ম ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে কেঁদে উঠল।
রফিক শেখ নিজের র-ক্তে ভেজা পা আর যন্ত্রণাকে এক মূহুর্তে ভুলে গেল। যে মানুষটি নিজের পা সোজা করে দাঁড় করাতে পারছিল না, সে ওর জীবনের সমস্ত শক্তি এক করে পা হেঁচড়ে মরিয়মের একদম কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল।
“মরিয়ম! চোখ খোলো মরিয়ম!” রফিকের গলার স্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওর শক্ত, র*ক্তমাখা হাত দুটি দিয়ে সে মরিয়মের দুই হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। “আমাদের বাচ্চার কিছু হবে না! রফিক শেখ বেঁচে থাকতে তোমায় আর আমাদের সন্তানকে কিছু হতে দেবে না!”
বাইরে তখন ঝুমঝুম বৃষ্টি আর বজ্রপাত। এই ঝড়বৃষ্টির রাতে গ্রামে কোনো ধাত্রী (দাই) আসার সুযোগ নেই, কোনো ডাক্তার নেই। রফিক বুঝতে পারল আজ যদি সে শক্ত না হয়, তবে ওর চোখের সামনেই ওর স্ত্রী আর সাত মাসের অনাগত সন্তান চিরতরে হারিয়ে যাবে!
রফিক শেখ নিজের ফতুয়ার খাঁজ ছিঁড়ে নিজের পায়ের ক্ষতটা কষে বাঁধল, যাতে র*ক্ত পড়া একটু কমে। তারপর পরম মমতায় হাঁটু গেড়ে বসল ওর সাত মাসের অন্তর্বর্তীকালীন যন্ত্রণায় ছটফট করা স্ত্রীর সামনে।
“মরিয়ম, আমার দিকে তাকাও,” রফিক মরিয়মের গালে হাত রেখে উনার চোখে চোখ রাখল। “তুমি তো পীরপুর গ্রামের সবচেয়ে সাহসি মেয়ে। যে মেয়ে একা পুরো সমাজের অপবাদ সয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে, সে কি সামান্য ব্যথার কাছে হেরে যাবে? তুমি একটু চেষ্টা করো মরিয়ম,,,, আমাদের বাচ্চার জন্য, আমার জন্য!”
মরিয়ম রফিকের চোখের দিকে তাকাল। রফিকের নিজের পা দিয়ে র*ক্ত ঝরছে, মুখে কালঘাম, অথচ ওর চোখে কেবল মরিয়মের প্রতি আকুলতা আর চিন্তা।এই পুরুষটির বুক ভরা ভালোবাসাই মরিয়মের শরীরের রন্ধে রন্ধে আবার এক অলৌকিক শক্তির সঞ্চার করল।
মরিয়ম রফিকের হাত দুটিকে নিজের জীবনের শেষ শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরল। ওর হাতের নখ রফিকের চামড়ায় দেবে গেল, কিন্তু রফিক এক চুলও সরল না।
“রফিক,,, আমি পারব না,,,,” মরিয়ম চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো ওর সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করে উঠল!
বাইরে তখন বিজলির এক প্রচণ্ড আলো পুরো আকাশটাকে উজ্জ্বল করে দিল। বৃষ্টির বিকট শব্দের মাঝেই বড় ঘরের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে এল এক শিশুর কচি কান্নার স্বর!
“ওয়া,,,, ওয়া,,,, ওয়া,,,,”
পৌষের সেই কালরাতের ঝোড়ো হাওয়ায়, ধাত্রী বা ডাক্তারের সাহায্য ছাড়াই, র*ক্তে ভেজা এক বাবার বাহুডোরে আর এক মায়ের অসীম কষ্টের বিনিময়ে পৃথিবীতে জন্ম নিল রফিক আর মরিয়মের সাত মাসের মিরাকল সন্তান!
রফিক শেখ কাঁপা কাঁপা হাতে, পরম আদরে ওর সেই ছোট্ট, অপরিপক্ক শিশুটিকে পরম মমতায় তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে বুকের সাথে জড়াল। ওর শক্ত চোখের কোণ দিয়ে আজ ঝরঝর করে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে শিশুটিকে মরিয়মের বুকের পাশে শুইয়ে দিল। মরিয়ম ক্লান্ত, অবসন্ন চোখে ওর সন্তানের দিকে তাকাল, আর অন্য হাতে জড়িয়ে ধরল রফিকের কাদা-র*ক্তে ভেজা হাত।
বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব তখনও থামেনি, রফিকের পায়ের ক্ষত তখনও জ্বলছে, কিন্তু বড় ঘরের ভেতরে ভালোবাসার এক পরম আলোয় তিনটে জীবন এক অনন্য মায়ায় বাধা পড়ে গেল।
চলবে,,,,,

