#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৮
বাইরে রাতের ঝুমঝুম বৃষ্টি তখন অনেকটাই ঝিমিয়ে এসেছে। ভোরের স্নিগ্ধ, হিমেল হাওয়া পীরপুর গ্রামের ভিটে ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শেখ বাড়ির বড় কামরার ভেতরের পরিবেশটি ছিল এক অলৌকিক শান্তি আর অপার্থিব আনন্দের জোয়ারে ভাস্বর।
কাদার আর নিজের পায়ের তাজা র*ক্তে ভেজা শরীরে হাঁটু গেড়ে বসেছিল রফিক শেখ। ওর দুই হাতের ওপর শুয়ে আছে সাত মাসে পৃথিবীতে আসা এক নিষ্পাপ শিশু। শিশুর লালচে কচি গায়ের ত্বক, ছোট্ট দুটি হাত-পা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
রফিক শেখের মতো শক্ত, গম্ভীর পুরুষটির চোখের কোণ বেয়ে অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে আনন্দের পানি। সপ কাঁপা কাঁপা হাতে সন্তানকে তোয়ালে দিয়ে আরও একটু সযত্নে পেঁচিয়ে নিল।
মরিয়ম ঘরের খাটে ধুঁকতে ধুঁকতে শুয়ে ছিল। শরীরটা চরম ক্লান্তিতে অবশ হয়ে এলেও তার মুখে ছিল এক জয়ী হাসি। মরিয়ম ফিসফিস করে বলল, “রফিক,,,, আমাদের ছেলে তো,,,, উনাকে একটু কাছে আনেন না?”
রফিক ধীরপায়ে, নিজের ডান পায়ের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে হেঁটে এসে খাটের পাশে বসল। শিশুটিকে মরিয়মের বুকের কাছে এনে রাখল। শিশুটির কচি কান্না থমকে গেল যেন মায়ের গায়ের পরিচিত সুবাস পেয়ে।
“বউজান,,,,” রফিকের গলা কান্নায় বুজে আসছিল, “আজ আল্লাহ আমাদের এই অসীম বিপদ থিকা রক্ষা করেছেন। আমার পা কেটে র*ক্ত গড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু উনি আমার কুলটা বানাতে চাওয়া সংসারকে এক সুখ দিয়ে ভরিয়ে দিলেন।”
রফিক শেখ ঘরের এক কোণে থাকা হারিকেনটার আলো আরও একটু বাড়িয়ে দিল। তারপর সন্তানকে নিজের ডান বাহুতে তুলে নিয়ে ওর মুখটা শিশুর কচি কানটার কাছে নিয়ে গেল।
নিঝুম ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগের মুহূর্তে, বড় কামরার কাঠের সিলিং কাঁপিয়ে রফিক শেখ ওর গম্ভীর, সুমধুর কণ্ঠে উচ্চারণ করল সবচেয়ে মধুর শব্দ—আজান।
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার,,,,,”
রফিকের আজানের ধ্বনিতে ঘরের বাতাস যেন এক পবিত্র সুবাসে ভরে উঠল। মরিয়ম দুই চোখ বন্ধ করে অশ্রুসজল চোখে ওর স্বামীর সেই গম্ভীর আজান শুনল। রফিকের আজান শেষ হতেই শিশুটি আবার এক ছোট্ট মিহি শব্দ করে কেঁদে উঠল, যেন নিজের জীবনের প্রথম সাক্ষী দিল।
আজান দেওয়া শেষ করে রফিক শিশুটিকে সযত্নে মরিয়মের কোলে শুইয়ে দিল। ওর পায়ের ক্ষত থেকে তখনও র*ক্ত ঝরছিল সেই ব্যথা উপেক্ষা করে ঘরের উত্তর কোণে পাতা কাঠের পিঁড়ির ওপর ওর জয়নামাজ বিছিয়ে দিল।
অঙ্গ পাচারকারী ডাকাতদের তাড়াতে গিয়ে পাওয়া মারাত্মক আঘাত আর র*ক্তে ভেজা কাপড় বদলে, একখানা পরিষ্কার সাদা তোয়ালে পেঁচিয়ে রফিক শেখ দাঁড়িয়ে গেল ওর রবের সামনে।
দুই রাকাত নফল নামাজ।
রুকুর পর যখন তিনি সেজদায় গেল, রফিকের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে জয়নামাজের মাটির অংশটা ভিজে গেল। পরম করুণাময়ের দরবারে নিজের স্ত্রী, নিজের অনাগত সন্তানকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে নেওয়ার জন্য সে দীর্ঘ সময় সেজদায় পড়ে রইল।
নামাজ শেষ করে রফিক মোনাজাত তুলল। ওর দুই হাত কাঁপছিল আবেগে। মোনাজাত শেষে সে উঠে এল বিছানার পাশে।
মরিয়মের কপালে পরম আদরে হাত রেখে রফিক বলল, “বউ,,,, আমি আমাদের ছেলের নাম রাখলাম ‘রাফি’। রফিক শেখের রাফি। যে আমার জীবনের কঠিন সময়ে আলো হয়ে এল, সে আমার রাফি।”
মরিয়মের চোখ আবার ভিজে উঠল, “অনেক সুন্দর নাম রফিক,,, রাফি শেখ। আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
রফিক মোনাজাতের সেই পবিত্র হাত দুটো মরিয়ম আর ছোট্ট রাফির গায়ের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিল। দুরুদ শরিফ পড়ে পরম স্নেহে বউ আর নতুন জন্ম নেওয়া ছেলের গায়ে ফু দিল। সেই ফু-এর পরশ যেন সারা রাতের সমস্ত ভয়, ক্লান্তি আর যন্ত্রণাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিল।
সকাল গড়াতেই যখন আশ্বিনের মিষ্টি রোদ শেখ বাড়ির উঠোনে এসে পড়ল, তখন উঠোনের চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
রাতের সেই ঝড়বৃষ্টির তোড় থামতেই জাহিদ শহর থেকে সদরের কাজ সেরে এক দৌড়ে বাড়িতে ফিরে এল। আর পাশের বাড়ি থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল শাশুড়ি রাবেয়া বেগম। রাতে ডাকাতদের আক্রমণ আর মরিয়মের এই অকাল প্রসববেদনার খবর শুনে উনাদের বুকের ভিতর আতঙ্কে হিম হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু ঘরে ঢুকেই যখন রাবেয়া বেগম দেখলেন খাটের ওপর পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে লাল সুতির কাঁথায় মোড়া তাঁর নাতি ‘রাফি’, আর রফিক পা বেঁধে মুখে এক তৃপ্তির হাসি নিয়ে বসে আছে–তখন বুড়ির চোখ দিয়ে আর বাধা মানল না।
” আমার নাতি! ওরে আমার রফিকের র*ক্ত রে!”
রাবেয়া বেগম দৌড়ে গিয়ে বিছানার পাশে বসে পড়লেন। পরম মমতায় নাতির মুখটা দেখে দুই হাত তুলে দোয়া করতে লাগলেন, “আল্লাহ! তুমি আমার ঘর আলো করে নাতি পাঠাইলা! আমার বড় বউরে তুমি বাচাইয়া রাখছো!”
জাহিদ দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ওর চোখ দুটো কান্নায় ছলোছলো। সে ধীরপায়ে ভেতরে এসে রফিকের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল।
“রফিক ভাই,,,,” জাহিদের গলার স্বর কান্নায় অবরুদ্ধ, “আমার পা কাটা পড়লেও এই পাপের প্রাশ্চিত্ত হবে না ভাই। আমি আপনার আর মরিয়মের ওপর কত অন্যায় করেছি! কিন্তু আজ,,,, আজ ওকে দেখে আমার বুকের ভেতর সব হিংসা ধুয়ে গেছে ভাই। আমারে একটা বার ক্ষমা করে দেন রফিক ভাই!”
রফিক জাহিদের দিকে তাকাল। ওর চোখে আর আগের সেই তীব্র আক্রোশ ছিল না। সে জাহিদের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর কিন্তু পরম দরদী কণ্ঠে বলল, “জাহিদ, অতীতকে আমি রাতের ঝড়ের সাথে ভাসিয়ে দিয়েছি। তুই আমার ছোট ভাই। এখন থিকা নিজের ঘর আর দায়িত্ব সামলা। রাফি তো শুধু আমার ছেলে না, তোরও ভাইপো। তারে ভালো মানুষ বানানোর দায়িত্ব আমাদের দুজনেরই।”
জাহিদ রফিকের হাতে মুখ রেখে কেঁদে ফেলল। পুরো ঘরে যেন এতদিন পর এক পারিবারিক মেলবন্ধন ও শান্তির হাওয়া বয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ বাড়ির বাইরের বাঁশের ফটক ঠেলে এক চকচকে সুতির ছাপা শাড়ি পরা, হাতে মেহেন্দির রঙ লাগানো এক চটপটে তরুণী ভেতরে পা দিল।
মেয়েটির বয়স আনুমানিক বাইশ-তেইশ। গায়ের রঙ দুধে-আলতায়, চোখেমায়াবী মিষ্টি চাহনি। সে হলো রফিক আর জাহিদের একমাত্র ছোট বোন ‘সুরাইয়া’।
সুরাইয়া পাশের গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকত। সকালে শেখ বাড়ির ডাকাত আক্রমণ আর মরিয়মের বাচ্চা হওয়ার খবর পেয়ে সে আর এক মুহূর্তও শ্বশুরবাড়িতে স্থির থাকতে পারেনি। গায়ে সুতির চাদর জড়িয়ে এক ছুটে বাপের ভিটেয় হাজির হয়েছে!
“ও মা! ও রফিক ভাই! কই তোমরা?” সুরাইয়ার কোকিলকণ্ঠী ডাকে পুরো উঠোন গমগম করে উঠল।
সুরাইয়া বারান্দায় জুতো খুলে এক লাফে বড় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। ঘরে এত লোক আর খাটজুড়ে এত আনন্দের হাওয়া দেখে সুরাইয়ার চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল।
“ও বাবা রে! আমি তো শুনে আইছিলাম রাতে বাড়িতে ডাকাত আইছে, আর আইসা দেখি ঘরে তো চাঁদের টুকরো নেমে আসছে!” সুরাইয়া এক এক করে উঁকি দিয়ে খাট আর মেঝের সবাইকে দেখে বলল।
রাবেয়া বেগম হেসে উঠে বললেন, “আহা রে আমার সুরাইয়া আইছে! আয় রে বাছা, দেখ তোর রফিক ভাইয়ের কোল আলো করে তোর ভাইপো আইছে।”
সুরাইয়া আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চটপট পায়ে হেঁটে খাটের পাশে এসে বসল। মরিয়ম লজ্জা পেয়ে একটু শাড়ির আঁচল সোজা করার চেষ্টা করতেই সুরাইয়া মরিয়মের হাত দুটি দুটো হাতে ধরে ফেলল।
“ভাবী! একদম উঠবা না কিন্তু!” সুরাইয়ার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আপনপন আর দুষ্টুমি মাখানো মিষ্টি হাসি। “আমি সুরাইয়া, এই শেখ বাড়ির একমাত্র মেয়ে। এতদিন শ্বশুরবাড়িতে বসে বসে তোমার রূপ আর তোমার ধৈর্যের গল্প রফিক ভাইয়ের কাছে শুনতাম। আজ সচক্ষে দেখলাম—আমার ভাইটা একটা বাস্তবের হীরা কুড়িয়ে এনে ঘরে তুলছে!”
মরিয়ম সুরাইয়ার এই আন্তরিকতায় আপ্লুত হয়ে গেল।
সুরাইয়া আলতো করে কাঁথার কোণা সরিয়ে ছোট রাফির দিকে তাকাল। রাফি তখন কচি কচি হাত দুটো মুখের সামনে এনে হাই তুলছিল।
“ও মাগো! কী মিষ্টি রে দেখতে! একদম রফিক ভাইয়ের মতো নাক আর ভাবীর মতো তুলতুলে গাল পাইছে!” সুরাইয়া রফিকের দিকে ফিরে একগাল হেসে বলল, “রফিক ভাই, তুমি তো গম্ভীর মানুষ, তা এত সুন্দর বাচ্চা বানাইলা কীভাবে গো?”
সুরাইয়ার এমন সোজা আর রসাত্মক কথায় ঘরে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল! রফিক শেখও তার গম্ভীর ভাব বজায় রাখতে না পেরে মুখ টিপে মৃদু হাসল।
সুরাইয়া সাথে সাথে বলে উঠল, “আজ এই শেখ বাড়িতে মহোৎসব হবে! ভাইপো হইছে বলে কথা! আমি নিজে হাতে খাসির মাংসের রেজালা রান্না করব আর পাড়ার সবাইকে পোলাও খাওয়াব! শিউলি ভাবীর বিষাক্ত চেহারা আর এই ভিটেয় দেখতে চাই না, আজ থিকা এই বড় ঘর শুধু আমার মরিয়ম ভাবী আর রাফির রাজত্ব!”
ঘরের মধ্যে এখন শুধু হাসির কলরোল আর সুখের আবহ। রাবেয়া বেগম নাতিকে কোলে নিয়ে দোয়ার দোয়া পড়ছেন, জাহিদ উঠোনে মিষ্টি বিতরণের তদারকি করছে, আর সুরাইয়া মরিয়মের পাশে বসে ভাবীর দেখভাল করতে লেগে গেছে।
রফিক শেখ ঘরের বারান্দার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তার পায়ে ক্ষত থাকলেও বুকের ভেতরে আজ এক অপরিসীম প্রশান্তি।
উনার জীবনের সেই অবহেলার মুক্ত মরিয়ম, আজ কেবল উনার স্ত্রীর মর্যাদাই পায়নি, উনার বংশের প্রদীপকে জন্ম দিয়ে শেখ বাড়ির হৃদয়ে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চলবে,,,,

