#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪
শ্রাবণের শেষ বিকেলের হালকা রোদ ছড়িয়ে পড়েছে পীরপুর গ্রামের আঁকাবাঁকা মাটির পথে। কাঁঠাল গাছের পাতা চুইয়ে ঝরে পড়া পানির ফোঁটাগুলোতে রোদের আলো লেগে হীরের টুকরোর মতো চমকাচ্ছে। কিন্তু রফিক শেখের বিশাল ঢেউটিনের দোচালা ঘরের চত্বরে থমথমে ভাবটা যেন কাটতেই চাইছে না।
যে সংসারে এতদিন মরিয়ম ছিল অবহেলিত, নীরবে চোখের পানি ফেলা এক কনিষ্ঠ বউ, সেই সংসারের পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেছে। আজ সে এই বাড়ির বড় বউ রফিক শেখের অর্ধাঙ্গিনী।
ঘরের উত্তরের বারান্দায় বসে মরিয়ম কুলোয় করে ধান ঝাড়ছিল। তার গায়ে একটি সাদা জমিনের ওপর লাল পাড়ের সাধারণ সুতির শাড়ি, চুলে আলতো করে খোঁপা বাঁধা। মুখে কালকের সেই হাহাকার আর ভয় একদম নেই; বরং এক ধরনের শান্ত, গভীর স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এল রফিক। পরনে সুতির ফতুয়া আর সাদা সুতির ধুতি-লুঙ্গি। চোখে-মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য, কিন্তু মরিয়মের দিকে তাকাতেই ওর সেই কঠিন চাহনি এক লহমায় যেন মিলিয়ে গেল। রফিক ধীরপায়ে বারান্দার কাঠের খুঁটিটার পাশে এসে দাঁড়াল।
“ধান ঝাড়ার কাজটা কি এখনই করতে হবে, মরিয়ম? কাল রাত থেকে তোমার শরীরে তো জলজ্যান্ত জ্বরটা কমেনি। একটু জিড়িয়ে নিলে হতো না?”
রফিক শেখের গলার স্বর অত্যন্ত নিচু এবং ভারী, কিন্তু তাতে ছিল এক অপরিসীম যত্ন ও সম্মান।
মরিয়ম হাত থামাল। চোখ তুলে রফিকের দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল যে হাসিতে ছিল এক ধরনের কৃতজ্ঞতা।
“না গো, জ্বরটা আর নেই। আর ঘরের কাজ ফেলে রাখলে ভালো লাগে না। আপনি হাটে যাবেন না? আপনার গায়ের চাদরটা গোছানো আছে, নিয়ে যান।”
রফিক কাছে এগিয়ে এল, তবে এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল। সে খুব ভালো করেই জানে, মরিয়ম স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত লজ্জাবতী ও নরম স্বভাবের মেয়ে। জোর করে উনার ওপর স্বামীত্বের কোনো অন্যায্য দাবি সে কোনোদিন চাপিয়ে দেবে না। তাদের মধ্যে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছে, তা শুধু সমাজের মুখে চাবুক মারার জন্য নয় বরং পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস আর এক অদৃশ্য মায়ার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।
পকেট থেকে কয়েকটি লাল রঙের কাঁচের চুড়ি বের করে বারান্দার কোণে রাখা কাঠের জলচৌকির ওপর রাখল রফিক।
“হাটের মোড়ে আসতেই করিম মিয়ার দোকানে দেখলাম। মনে হলো তোমার হাতে ভালো মানাবে। রেখে দিলাম, হাত ধুয়ে পরে নিও।”
কথাটি বলে রফিক আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে, চাদরটা গায়ে জড়িয়ে উঠোন পেরিয়ে রাস্তার দিকে পা বাড়াল।
মরিয়ম জলচৌকির দিকে তাকাল। লাল কাঁচের চুড়িগুলো বিকেলের আবছা আলোয় চকচক করছে। চারটে বছরের সংসারে জাহিদ কোনোদিন তার পছন্দের তো দূর, একটা সুতোও নিজের ভালোবাসায় কিনে দেয়নি। আর আজ রফিক শেখ, যাকে পুরো গ্রাম এক নামে ভয় পায়, সেই পুরুষটি কত যত্ন করে তার জন্য চুড়ি কিনে এনেছে! মরিয়মের চোখের কোণে একফোঁটা শিশিরের মতো পানি জমে উঠল, তবে তা আনন্দের, এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তির।
অন্যদিকে, বাড়ির দক্ষিণের ছোট বাঁশঝাড়ের পেছনে, চালতা গাছের ছায়ায় এক বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাক খাচ্ছিল।
সেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল জাহিদ আর শিউলি। সাথে যোগ দিয়েছে তাদের পাশের বাড়ির চাচাতো ভাইয়ের বউ, তার নাম করিমন। গ্রামে দুই জাওয়ের কুটিল সম্পর্কের চক্রান্ত তো নতুন কিছু নয়! সেখানে শিউলি আর করিমন দুই জাও মিলে যেন এক নতুন বিষের হাড়ি জ্বালিয়ে বসেছিল।
করিমন পানের পিক ফেলে শিউলির কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “ও শিউলি বুবু, তুমি তো এই ঘরের আগের বড় বউ ছিলা। আর আজ ওই ছুড়ি মরিয়ম এসে তোমার মাথার ওপর চেপে বসল? রফিক ভাই যেভাবে হুকুম দিল, তাতে তো মনে হয় কাল থেকে তোমারে দিয়ে ঘরের ধান ভানাবে!”
শিউলির মুখখানা রাগে ও হিংসায় লাল হয়ে উঠল। সে হাতের নখ দিয়ে চালতা গাছের ছাল উপড়াতে উপড়াতে বলল, “আমার মাথার ওপর চাপবে ওই ভিখারির বেটি? ভাবতেও আমার রগ চটচট করে! জাহিদ তো এক্কেবারে ভেড়া বনে গেছে। ভাইয়ের এক ধমকেই প্যান্টে পানি ছেড়ে দেয়!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাহিদ দাতঁ কিড়মিড় করে উঠল, “মুখ সামলে কথা বল শিউলি! রফিক ভাইয়ের গায়ের জোর আর টাকার গরম কত, তা তোর জানা নাই? কাজী ডেকে এক রাতেই আমার হাত থেকে ওরে কেড়ে নিল, আর আমি কিছুই করতে পারলাম না! গ্রামবাসীও তো এখন রফিক ভাইয়ের শক্ত হাতের ভয়ে কিছু বলতে পারছে না।”
করিমন মুচকি হেসে জাহিদের দিকে তাকাল, “আহা রে জাহিদ ভাই, গায়ের জোর দিয়ে কি সব কাজ হয়? রফিক শেখ যত বড় বাঘই হোক না কেন, জঙ্গলে ফান্দ পাতলে বাঘও কিন্তু খাঁচায় বন্দি হয়! তোমরা তো খালি চেঁচামেচি করতে জানো, বুদ্ধি তো মাথায় নাই।”
শিউলি উন্মুখ হয়ে করিমনের হাত চেপে ধরল, “কী বুদ্ধি আছে তোর মাথায় করিমন? খুলে বল তো! যেভাবেই হোক, ওই মরিয়ম আর রফিক ভাইয়ের এই সাজানো সংসার আমার ছারখার করা চাই! যে সতীন আমারে দাসী বানাতে চায়, উনারে আমি গ্রামছাড়া করবই!”
করিমন চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। বাঁশঝাড়ের পাতা বাতাসের দোলায় খসখস করে উঠছে। কেউ কোথাও নেই নিশ্চিত হয়ে সে শিউলি আর জাহিদের গা-ঘেঁষে দাঁড়াল।
“শোনো,” করিমন কণ্ঠস্বর একদম নামিয়ে আনল, যেন মাটির পোকাও শুনতে না পায়। “রফিক শেখের অহংকার উনার ইজ্জত আর ক্ষমতা নিয়ে, তাই না? আর মরিয়মের শক্তি কোনটা? উনার ওই সতীপনা আর নরম স্বভাব! আমরা যদি এমন একটা চাল চালি, যেখানে রফিক শেখ নিজের হাতেই মরিয়মকে এই ঘর থেকে তাড়িয়ে দেবে? কোনো র-ক্তপাত হবে না, কোনো চেঁচামেচি হবে না। রফিক ভাই নিজেই মরিয়মের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে, আর গ্রামবাসী থুথু দেবে উনার মুখের ওপর!”
জাহিদের চোখে এক অদ্ভুত ধূর্ত আলো জ্বলে উঠল, “কী চাল বল তো? কীভাবে কী করবি?”
করিমন এক বিষাক্ত হাসি হাসল, “এখনই সবটা বলা যাবে না। দেওয়ালে কান থাকে, আর বাতাসেরও চোখ থাকে! তোমরা শুধু প্রস্তুত থেকো। হাট থেকে রফিক ভাই ফিরুক, আর শাশুড়ি মা যখন কাল সকালেই পাশের গ্রামে যাবে ঠিক তখনই আমরা প্রথম কদমটা ফেলব। আমি আর শিউলি বুবু মিলে এমন এক জাল বুনব, যা এই দুই জা-এর হাত ধরে রফিক আর মরিয়মের সংসারটাকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দেবে!”
শিউলি বাঁকা হেসে বলল, “তবে তাই হোক! আমিও দেখব, কতদিন ওই মরিয়ম বড় বউয়ের তকমা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়!”
তিনজনে মিলে ফিসফিস করে আরও কিছুক্ষণ গোপন শলা-পরামর্শ করল। কী সেই কুৎসিত চক্রান্ত, কী সেই জালের ফাঁদ তা কেউ জানতে পারল না, কিন্তু বাতাসে যেন এক আশঙ্কাজনক ঝড়ের আলামত ফুটে উঠল।
সন্ধ্যা নামার মুখে বৃষ্টি আবার হালকা গুড়িগুড়ি হয়ে নামল।
রফিক হাট থেকে ফিরে এল। ওর এক হাতে বাজারের থলি, আর অন্য হাতে একটা কাঠের তৈরি সুন্দর সুগন্ধি তেলের কৌটো। ছাতাটা বারান্দার কোণে রেখে সে সটান ঘরের দিকে হেঁটে গেল।
মরিয়ম তখন বারান্দায় ঢুকছিল। রফিককে ভেজা ফতুয়ায় দেখে সে ব্যস্ত হয়ে উঠল।
“একটু দাঁড়ান, আমি শুকনো তোয়ালে নিয়ে আসছি। এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে আপনারও তো ঠান্ডা লেগে যাবে!”
মরিয়ম ঘরের ভেতর থেকে পরিষ্কার একটি গামছা এনে রফিকের হাতে দিল। রফিক গামছাটা নিল, কিন্তু ওর চোখ রয়ে গেল মরিয়মের হাতের দিকে। মরিয়মের ফর্সা কব্জিতে জ্বলজ্বল করছে সেই লাল কাঁচের চুড়িগুলো।
রফিক শেখের গম্ভীর মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ওার গলার আওয়াজ আরও নরম হয়ে এল।
“চুড়িগুলো ভালো লেগেছে?”
মরিয়ম একটু মাথা নিচু করে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। ধীরকন্ঠে বলল, “খুব সুন্দর হয়েছে। কিন্তু আপনি প্রতিদিন এভাবে আমার জন্য জিনিস আনেন… আমার কেমন যেন অপরাধবোধ হয়।”
রফিক গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে একটু এগিয়ে এল, তবে কোনো অনুচিত স্পর্শ ছাড়া। উনার চোখে ছিল এক অগাধ সম্মানের ছায়া।
“অপরাধবোধ কিসের, মরিয়ম? তুমি এই ঘরের লক্ষ্মী। এতদিন যে সংসার তোমারে শুধু অবহেলা আর অপবাদ দিয়েছে, সেই সংসারে তোমারে হাসিমুখে রাখা আমার দায়িত্ব। আমি কোনো দয়া করছি না, এটা তোমার প্রাপ্য সম্মান।”
কথাগুলো শুনে মরিয়মের মনটা এক অদেখা অনুভূতিতে ভরে গেল। সে মৃদু স্বরে বলল, “আপনার চা করে নিয়ে আসি? বৃষ্টির দিনে একটু গরম চা খেলে শরীরটা ভালো লাগবে।”
“হ্যাঁ, আনো,” রফিক ধীরপায়ে ঘরে গিয়ে বসল।
মরিয়ম রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সে টের পেল না, অন্ধকার উঠোনের ওপাশ থেকে দুটি জোড়া বিষাক্ত চোখ তাকে গিলে খাওয়ার মতো করে দেখছে।
শিউলি বারান্দার অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চাপছিল। সে মনে মনে বলল, “হাসো মরিয়ম, যত পারো হেসে নাও। রফিক শেখের ভালোবাসার সাগরে সাঁতার কেটে নাও। কিন্তু কালকের পর… কালকের পর এই রফিক শেখই যখন তোমারে ছাইয়ের মতো ছুড়ে ফেলবে, তখন তোমারে বাঁচানোর মতো এই দুনিয়ায় কেউ থাকবে না!”
রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এল পীরপুর গ্রামে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর চালতা পাতার ওপর বৃষ্টির টুপটুপ শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। এক ছাদের নিচে দুই মেরুর জীবন শুরু হয়ে গেছে একদিকে রফিক আর মরিয়মের সম্মান ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এক নতুন বন্ধন, আর অন্যদিকে জাহিদ, শিউলি ও করিমনের বুনে যাওয়া এক কুটিল চক্রান্তের গোপন ফন্দি।
ঝড় আসছে, আর সেই ঝড়ে কার ঘর ভাঙবে, আর কে ধূলিসাৎ হবে তা শুধু সময়ের অপেক্ষাতেই জমা হয়ে রইল।
চলবে.

