#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৫
আশ্বিনের হিমেল হাওয়া ভাদ্রমাসের প্রখর গরমকে ঠেলে সরিয়ে পুরো পীরপুর গ্রামে এক স্নিগ্ধ আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। তবে আবহাওয়ায় যতই স্নিগ্ধতা থাকুক না কেন, শেখ বাড়ির উত্তরের বড় ঘর আর দক্ষিণের ছোট ঘরের মাঝের অদৃশ্য দেওয়ালটা দিন দিন যেন আরও উঁচু আর শক্ত হয়ে উঠছিল।
রফিক হাটে যাওয়ার আগে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রাবেয়া বেগমকে দিয়ে মরিয়মকে গরম চা আর হাঁসের ডিমের সেদ্ধ খাওয়াচ্ছিলেন। মরিয়মের পায়ে সেই রফিকের নিজ হাতে পরিয়ে দেওয়া রূপার নুপুর প্রতিটি পদক্ষেপে ঝিনঝিন করে এক মিষ্টি সুর ছড়িয়ে পড়ছে উঠোনজুড়ে।
রফিক হাটের সুতির ফতুয়াটা গায়ে চড়াতে চড়াতে মরিয়মের দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় বলল, ” বউ, আজ রোদের তেজ একটু বেশি হবে। তুমি ঘরের কাজ কিছু করতে যাবে না। শিউলি আর করিমনকে আমি কাল রাতেই কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছি সংসারের যাবতীয় রান্না, থালাবাসন ধোয়া আর লেপ-তোশক ঝাড়া সব কাজ ওরাই সামলাবে।”
মরিয়ম কাসার থালাটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে একটু দ্বিধায় পড়ে বলল, ” শিউলি আপা আর করিমন আপা একা একা এত কাজ করবে? আমি যদি একটু সাহায্য করি,,,,”
“একদম না!” রফিক শেখের থমথমে গলার ধমকে মরিয়ম থেমে গেল। “ওরা এই সংসারে বহু চক্রান্ত করেছে, বহু মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছে। তাদের সাজা হিসেবে ঘরের কাজ করাটাই নিয়ম। তুমি শুধু নিজের শরীরের খেয়াল রাখবে আর আমাদের বাচ্চার জন্য বিশ্রাম নেবে।”
রফিক হাটের দিকে রওনা দেওয়ার সময় ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে একবার মরিয়মের মুখের দিকে তাকাল। ওর চোখে চোখ রেখে মরিয়ম আলতো করে আঁচল টেনে দিল। এই চোখের ভাষাটুকু এখন উনাদের রোজকার ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র বাহন।
অন্যদিকে, রান্নার ঘরের কোণে চুলার ছাই আর ধোঁয়ার মধ্যে বসে শিউলির চোখ দুটো যেন হিংসার বিষে লাল হয়ে উঠছিল।
একপাশে করিমন তরকারি কষাচ্ছিল, আর শিউলি ধানের তুষ ছাই দিয়ে ডেকচি মাজছিল। শিউলির হাতের নখগুলো কাদার কালিতে ছোপ ছোপ, গায়ে ময়লা শাড়ি। সে যতবার বড় ঘরের বারান্দার দিকে তাকাচ্ছিল, ততবার মরিয়মের কানের সেই নতুন রূপার ঝুমকা আর পায়ের নুপুরের আওয়াজ তার কানে চাবুকের মতো বিঁধছিল।
“বুকটা ফেটে যাচ্ছে বুবু!” শিউলি থালাটা একপাশে আছাড় মে-রে ফেলে ফিসফিস করে উঠে দাঁড়াল। “ঐ কুলটা মাইয়াটা রাজরানী হয়ে ঘরের পিঁড়িতে বসে দুলছে, আর আমরা এই ধোঁয়া-ছাইয়ের মধ্যে পচে ম-রছি! জাহিদ আমার দিকে ফিরেও তাকায় না, সারাদিন মরিয়মের ঘরের জানালার দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে থাকে।”
করিমন পান চিবোতে চিবোতে চোখ গোল গোল করে বলল, “তুই চিল্লাচিল্লি করিস না শিউলি! রফিক ভাইয়ের চোখ খুব খারাপ। এক চুল এদিক-ওদিক হলে সোজা বাপের বাড়ি তাড়িয়ে দেবে। মরিয়মের পেটে এখন বংশের প্রদীপ, ওরে ছোঁবে কার সাধ্যি?”
“ছোঁবে না মানে?” শিউলি একটা বিষাক্ত হাসি হাসল, তার চোখের কোণে চাতুরির এক শয়তানি রেখা ফুটে উঠল। “গা গায়ে এখন পৈশাচিক খু-নের ভয় ছড়াইয়া গেছে না? মানুষ এখন ডাকাত আর ওই অশ্বত্থ গাছের খ-ুনীর ভয়ে কাঁপে। আমি এমন এক চাল চালব বুবু,,,, যাতে মরিয়মের এই গর্ভের বাচ্চার সাথে সাথে রফিকের সেই অহংকারের পাহাড় এক রাতেই মাটির সাথে মিশে যায়! পীরপুর গ্রামের খু-নের দায় যদি রফিকের ঘরের ওপর পড়ে, তবে মাতব্বর আর পুলিশ এসে ওরে টেনে নিয়ে যাবে!”
করিমন আঁতকে উঠে শিউলির মুখ চেপে ধরল, “তুই প-াগল হয়েছিস শিউলি? রফিক ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবি? ধরা পড়লে জ্যান্ত পুড়িয়ে মা-রবে!”
“ধরা পড়ার কোনো চান্স নাই বুবু,” শিউলি দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল। “তুমি শুধু দেখে যাও, এই শেখ বাড়ির সুখ আমি কীভাবে শ্মশানের ছাই বানিয়ে দিই।”
দুপুরের পর গুমোট গরম কমে এক টুকরো মেঘলা আবহাওয়া নেমে এল গ্রামে।
জাহিদ তখন দক্ষিণ পাড়ার বটতলায় মাথা নিচু করে বসে ছিল। তার নিজের মনের ভেতর এক নরক যাতনা। শিউলির কর্কশ কথা, নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনা আর মরিয়মকে রফিকের পাশে হাসিমুখে দেখতে পাওয়ার আফসোস সব মিলে তাকে এক উন্মাদ বানিয়ে তুলছিল।
জাহিদ ধীরপায়ে শেখ বাড়ির দিকে ফিরছিল। তখন বড় বারান্দার জানালার পাশে মরিয়ম একা শুয়ে ছিল। শাশুড়ি রাবেয়া বেগম একটু পাশের পাড়ায় গেছেন।
জাহিদ নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আড়ালে ধীরপায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“মরিয়ম,,,,”
কন্ঠ শুনে মরিয়ম চমকে উঠে বিছানায় বসে পড়ল। জানালার কাঠের খিল ফাঁক করে সে জাহিদের দিকে তাকাল। জাহিদের চেহারা শুকিয়ে মেটে হয়ে গেছে, চোখের নিচে কালি।
মরিয়ম কড়া কিন্তু ধীরকন্ঠে বলল, “তুমি আবার এখানে কেন এসেছ জাহিদ? রফিক জানতে পারলে কিন্তু এবার আর তোমাকে মাফ করবেন না। সোজা ভিটে ছাড়া করবেন।”
জাহিদ আকুল চোখে মরিয়মের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, তবে ছুঁতে পারল না। তার গলায় আকুতি আর কান্নার সুর, “মরিয়ম,,,, আমারে একটা বার ক্ষমা করা যায় না? আমি জানি আমি তোরে লাথি মে-রে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম, তোর গায়ে অপবাদ দিয়েছিলিস। কিন্তু বিশ্বাস কর, আজ আমি প্রতিদিন তিলে তিলে ম-রছি! শিউলি মোরে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেয় না। তুই যখন আমার বউ ছিলিস, তুই আমারে দেবতার মতো পূজো করতিস,,,, আজ রফিক ভাইয়ের নুপুর আর ঝুমকা পড়ে তুই রানীর মতো আছিস, আর আমি,,,,”
“চুপ করো জাহিদ!” মরিয়ম সোজা হয়ে দাঁড়াল, তার চেহারায় আভিজাত্য আর সতীত্বের এক তেজ ফুটে উঠল। “তুমি যাকে অবহেলা করে পায়ে ঠেলে দিয়েছিলে, সে আজ রফিক শেখের সম্মানের তাজ। রফিক আমাকে শুধু ভালোবাসা দেননি, স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন, আমার সন্তানের পিতৃ পরিচয় ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এনে পুরো দুনিয়ার সামনে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তোমার ওপর আমার কোনো রাগ নাই জাহিদ, কেবল ঘৃণা আছে। তুমি তোমার চক্রান্তকারী বউকে নিয়ে নিজের ঘরে থাকো, আমার ঘরের আশেপাশে আর কোনোদিন আসবে না!”
মরিয়ম সজোরে জানালার কপাট দুটো আটকে দিল।
জাহিদ কাঠের জানালার গায়ে কপাল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ হাউহাউ করে কাঁদল। তারপর নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু সে জানত না তাদের এই কথোপকথন আর তার কেঁদে ফেলার দৃশ্যটি উঠোনের ঝোপের আড়াল থেকে শিউলি ক্যামেরা বন্দি করার মতো নিজের মগজে গেঁথে নিয়েছে। শিউলির বিষাক্ত মাথার চাল ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে।
রাত নামতেই পীরপুর গ্রাম আবার এক অজানা আতঙ্কের চাদরে ঢেকে গেল।
গতকালের সেই বীভৎস খ-ুনের পর আজ মাতব্বর সাহেব গ্রামে কড়া পাহারা বসিয়েছেন। কিন্তু রাত যত গভীর হতে লাগল, আকাশজুড়ে তত কালবৈশাখীর মতো ঘন কালো মেঘ জমে উঠল। বাতাস হু-হু করে বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে লাগল।
রাত আনুমানিক একটা।
রফিক শেখ ঘরের দরজায় মোটা কাঠের খিল আটকে দিয়ে ঘরে এল। মরিয়ম তখনও হারিকেনের সলতে বাড়িয়ে রফিকের জন্য পথ চেয়ে বসে ছিল।
রফিক ফতুয়াটা খুলে বারান্দার আলনায় রাখল। ওর শক্ত, চওড়া বুকে ঘামের ফোঁটা জমে আছে। সে ধীরপায়ে মরিয়মের পাশে বিছানায় এসে বসল।
মরিয়ম এক গ্লাস ঠান্ডা পানি রফিকের হাতে তুলে দিল। রফিক পানিটা খেয়ে গ্লাসটা একপাশে রাখল, তারপর খুব মায়ায় মরিয়মের ফর্সা মুখটার দিকে তাকাল।
“বউ,,,, আজ বাতাস খুব খারাপ। তুমি সাবধানে থাকবে। গ্রামের মুরুব্বিরা কাল সকালে বিচারে বসবে, নদীপাড়ের ওই ডাকাত আর খ-ুনিদের সন্ধান নাকি পুলিশে দেওয়ার কথা হচ্ছে।”
মরিয়ম রফিকের পাশে আরও একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। নিঝুম রাতে হারিকেনের আবছা আলোয় দুজন মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন যেন এক হয়ে যাচ্ছিল।
মরিয়ম নিজের একহাতে রফিকের শক্ত হাতের তালুটা ধরে নিজের স্ফীত পেটের ওপর রাখল।
“শুনুন,,,, আমাদের বাচ্চাটা আজ প্রথম নড়ে উঠেছে।” মরিয়মের চোখে এক স্বর্গীয় আনন্দের পানি।
রফিক শেখ চমকে উঠল! ওর হাতটা মরিয়মের পেটের ওপর স্থির হয়ে গেল। সত্যিই! চামড়ার নিচ দিয়ে আলতো এক জীবনের স্পন্দন ওর শক্ত হাতের তালুতে এসে ধাক্কা দিল!
রফিক শেখের মতো কঠোর পুরুষের চোখ দুটো এক মুহূর্তে ভিজে উঠল। ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অপার্থিব, পরম তৃপ্তির হাসি। সে ঝুঁকে এসে মরিয়মের কপালে পরম ভালোবাসায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।
“মরিয়ম,,,,,” রফিকের স্বর আবেগে কেঁপে উঠল, “তোমারে আর আমার এই সন্তানকে রক্ষা করার জন্য যদি আমার জানটাও দিতে হয়, আমি পিছপা হব না।”
মরিয়ম রফিকের চওড়া বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল। বাইরে তখন ঝড়ের গর্জন, কিন্তু বড় ঘরের ভেতরে কেবলই দুটি অভিন্ন আত্মিক ভালোবাসার পরম স্বর্গ।
ঠিক সেই মুহূর্তে উঠোনের সীমানার কাছে এক বিকট চিৎকারে চারদিক কেঁপে উঠল!
“আগুন! আগুন! রফিক শেখের পেছনের খড়গাদায় আগুন লাগছে রে! আর নদীতে জাহিদের ঘরের পেছনের ঘাটে র-ক্তমাখা লাশের সন্ধান পাওয়া গেছে!”
রফিক শেখ এক লাফে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল! ওর র-ক্তচক্ষু আবার আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল।
মরিয়ম আতঙ্কে উঠে দাঁড়িয়ে রফিকের হাত চেপে ধরল, “যাবেন না! বাইরে বড় বিপদ!”
কিন্তু ততক্ষণে বাইরে শিউলির কপাটের আওয়াজ আর চিল চিৎকার ভেসে আসছে “গ্রামের মানুষ দেখে যাও! রফিক শেখ কাল রাতে যেই শত্রুকে মা-রার হুমকি দিছিল, আজ সেই রামচরণ মাতব্বরের র-ক্তের জামা রফিকের ঘরের পেছনের সিন্দুকের নিচে লুকানো পাওয়া গেছে!”
শিউলির এই বিষাক্ত চালে রফিকের পরম শান্তির ঘরটা এক নিমেষে যেন আবার এক জঘন্য চক্রান্তের দাবানলে গিয়ে পড়ল!
চলবে,,,,,

