৩১.
তখন রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিট।
অতিথিঘরের দুয়ারে ক্ষীণ শব্দ হল। খুট খুট।
রাহাত জানালার কাছে বসে সবে মাত্র সস্তা বিড়ি জ্বালিয়েছে। ফিল্টারে বুক ভরে একটি টান দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো সে। আলগোছে ছিটকিনি খুলে দিতেই দেখল ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে। ইশারায় রাহাতকে বাইরে বেরিয়ে আসতে বলল সে। রাহাত লুঙ্গি আর হাট থেকে কেনা সস্তা গেঞ্জি পরে ছিল। ফাহিম ভ্রুঁ কুঁচকে ফিসফিস করে বলল,
– চাদর নাই?
রাহাতও যতটুকু সম্ভব নিমজ্জিত গলায় শুধালো,
– চাদর দিয়া কি হবে?
– মুখ ঢাইকা যাবেন।
রাহাত সবকিছু বুঝে ফেলেছে এমন ভঙ্গিমায় বলে উঠল ‘ওহ’। পরক্ষণেই মাথা চুলকে উত্তর দিল,
– কিন্তু ভাই আমি তো চাদর আনি নাই!
ফাহিমও বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। সে কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বলল,
– প্রস্তুতি নিয়া আসেন নাই ক্যান?
– এবাড়িতে হ্যা/ডার গাড়িতে চড়ে আসতে হবে তার জন্যই তো প্রস্তুত ছিলাম না। আবার নতুন বউ সেজে প্রজেক্টে যাইতে হবে তা তো বদ্দা আমার মাথায় ঢুকে নাই! আসলে আমি হইলাম গিয়া অজিত কুমারের পাংখা। তারে কখনো দেখি নাই মুখ লুকিয়ে আকাম করতে। লুকোচুরি আমার রক্তে নাই।
ফাহিমের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অস্পষ্ট কিছু শব্দ বেরিয়ে এল। বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ।
– উফ মিয়া! আপনি তো বেশি কথা বলেন দেখা যায়।
রাহাত সন্তপর্ণে জিভে কামড় দিল। তার দুই কানের লতি ধরে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
– সরি বদ্দা। আঁয় আর কথা না কয়তাম।
– আপনি আমার চাদরখানা নেন। নাক চোখ মুখ ঢাইকা তারপর চলেন।
রাহাত অনুনয়ের স্বরে বলল,
– চোখটা খোলা রাখি, বদ্দা? আমি আবার চোখ ছাড়া দেখতে পারি না।
ফাহিমের আপাদমস্তক রাগে জ্বলে উঠল। আগুনের লেলিহান শিখা ঝরে পড়তে লাগল দুচোখ দিয়ে। রাহাতের সীমাহীন আনন্দ হচ্ছে।
বহু কষ্টে মুখে একটি দুঃখ দুঃখ ভাব এনে তা ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় মগ্ন সে।
ফাহিম রাহাতকে ইশারায় বলল তাকে অনুসরণ করতে। রাহাতও বাধ্য ছেলের মত তার প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে তাল মিলালো।
বাড়ির পেছোনের আঙিনায় এসে পৌঁছাতেই
ফাহিম দাঁড়িয়ে গেল। থমকে দাঁড়াল রাহাতও। জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল ফাহিমের দিকে।
ফাহিম তার মলীন পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি মাঝারি সাইজের কাপড় বের করল। এরপর বলল,
– আসেন আপনার চোখ বাঁইধা দেই।
রাহাতের চোখজোড়ায় বিস্ময়েরা ভর করল। কণ্ঠে খানিকটা জড়তা নিয়ে শুধাল,
– চোখ বাঁধতে হবে কেন?
– চাচাজানের হুকুম। তার হুকুম আমরা শুধুমাত্র মান্য করি। কোনো প্রশ্ন করি না। আপনিও কইরেন না।
কথাগুলো বলে ফাহিম সামান্য হাসল। তার চাহনিতে আনুগত্য ঠিকরে বেরুচ্ছে। রাহাত কথা বাড়াল না। অক্ষিজোড়া বুজল।
মনে মনে ভাবতে লাগল, তালুকদারকে সে বেশ অবমূল্যায়ন করে ফেলেছে। এই মানুষটা প্রচন্ড ধূর্ত এবং ধুরন্ধর। রাহাতকে নিয়ে তার মাঝে এখনো সন্দেহের বীজ রয়েছে। আর এই বীজ যতদিন থাকবে, রাহাত কিচ্ছু করতে পারবে না। অত্যন্ত আজ সে ভেবে রেখেছিল প্রজেক্টের স্থান সম্পর্কে জানতে পারবে। তা আর হচ্ছে কই?
চোখ বাঁধা অবস্থায় রাহাতকে নিয়ে ভ্যানে উঠল ফাহিম। এরপর যাত্রা শুরু হল। রাহাত ঠিক করল উক্ত স্থানে পৌঁছাতে তার কতক্ষণ সময় লাগে এই হিসেবটা করে নিবে। তাতে, কাজ কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকবে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ভ্যানটি একটি নির্জন স্থানে এসে থামল। যাত্রাপথে রাহাত দুটো জিনিস পর্যবেক্ষণ করল। প্রথমত, প্রজেক্টের স্থানে যাওয়ার সময়কাল। দ্বিতীয়ত, ভ্যানটি দীর্ঘসময় হাওরের তীর ঘেঁষে চলেছে।
ভ্যানে থাকা অবস্থাতেই রাহাত মেয়েদের ক্ষ্মীণ কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। তার চোখ খুলে দেওয়া হল টিনের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর।
রাহাত দেখতে পেল মেঝেতে চৌদ্দ জন মেয়ে বসে আছে। কারো গায়ে এক টুকরো কাপড় নেই। উলঙ্গ অবস্থায় উন্মাদের মত নিজেদের শরীর হাত দিয়ে জাপ্টে ধরে রেখেছে তারা। হয়ত সম্মান বাঁচানোর শেষ লড়াইটুকু লড়ে যাচ্ছে এভাবেই।
রাহাত এর আগেও আন্ডারকভার অফিসার হিসেবে দুটো বড় বড় মিশন সাফল্যের সহিত সম্পন্ন করেছে। মনের জোর কখনো নড়বড়ে হয় নি। কিন্তু আজ তার হৃদয় কেঁপে উঠছে বার বার। এতগুলো মেয়েকে ভারতে পাচার করে দেওয়া হবে?
রাহাত চারিপাশে তাকিয়ে দেখল আরোও দুইজন অল্পবয়স্ক যুবক রয়েছে এখানে তদারকির জন্য। ফাহিম রাহাতকে বসতে বলল। রাহাত মাথা নিচু করে একটি অর্ধ ভাঙ্গা চেয়ারে বসল।
ফাহিম বলল,
– চাচাজান আসতেছে।
– উনি কই?
রাহাত মনের গহীনে সন্দেহ লুকিয়ে প্রশ্ন করল।
ফাহিম কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই তালুকদার মশাই খুক খুক করে কাশতে কাশতে সে ঘরে প্রবেশ করলেন। তার পরিহিত পাঞ্জাবি এলোমেলো। লুঙ্গিও অনেকটা উঠে আছে।
রাহাতের বুঝতে বাকি রইল না কি ঘটেছে! শরীরের রক্ত টগবগিয়ে ফুটতে লাগল তার। বুকের মাঝে জ্বলন্ত স্ফূলিঙ্গ দপদপ করছে। চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখেও নিজেকে দমিয়ে রাখতে হচ্ছে তার।
তালুকদার মশাই রাহাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। শীতল সে হাসিতে মিশে আছে গুরুতর অপরাধ। মুখে সেই বিকৃত হাসি ঝুলিয়েই বললেন,
– তুমি ভাবতে পারো রাহাত আমার বয়স হইছে। কিন্তু মন থেকে আমি এখনো জোয়ান। আমারো আনন্দ করতে মন চায়। বাঁচমুই আর কয়দিন? তাই কোনো কিছু মনে চাইলে আমি আবার তার বিরোধিতা করি না।
রাহাত কৃত্রিমভাবে হাসল। বলল,
– তা ঠিক, মশাই। শখ আহ্লাদ পুরণ করার জন্য বসে থাকতে হয় না। একথা আমিও মানি।
তালুকদার মশাই তৃপ্তির হাসি হাসলেন। এরপর ফাহিমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– লা/শ/টা সরায়া ফেল রে, ফাহিম।
রাহাত আঁতকে উঠল। যদিও তার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না। সে ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,
– লাশ? কার লাশ?
– এই লটে মালের সংখ্যা ছিল পনেরো। একটা ছিল অতিরিক্ত কচি। ভাবলাম ছোট মানুষ ওরেই আদর করি। বে/শ্যা/টা মইরাই গেল।
তালুকদার মশাই কথাগুলো বললেন একরাশ বিরক্তি নিয়ে। এরপর ফাহিমের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বললেন,
– চাদরও পাল্টায়া ফেলিস। রক্তে ভাইসা গেছে।
– লা/শ কি করুম, চাচাজান? কা/ইটা হাওরে ভাসায়া দেই নাকি?
– হ তাই কর। ভেজাল মিটুক।
রাহাতের বুঝতে বাকি রইল না মেয়েটা অতিরিক্ত র/ক্ত/ক্ষরণে মারা গিয়েছে। যদি সে অচেতন অবস্থাতেও থাকে এবার তাকে মেরে ফেলা হবে। রাহাত সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগল।
তালুকদার মশাই এবার প্রশ্ন করলেন,
– রাহাত, তোমার বয়স কম। লজ্জা পাইয়ো না। মস্তি করার ইচ্ছা হইলে ওই পাশের ঘরটায় নিয়া যাও। কেই বাধা দিবে না।
রাহাত লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিমায় বলল,
– দুঃখের কথা আর কি বলব, মশাই। ইচ্ছা তো আমারও করে কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
– কি সমস্যা?
– সবার সামনে কি সব বলা যায় নাকি? আপনারে কানে কানে বলি?
তালুকদার মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তার চোখেমুখে কৌতূহল। রাহাত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তালুকদার মশাইয়ের কাছে গিয়ে খানিকটা ঝুঁকে বলল,
– টুনটুনি তো আমার কথা শুনে না মশাই। সারাদিন রাত খালি ঘুমায়।
তালুকদার মশাই হো হো করে হেসে ফেললেন। বললেন,
– এই বয়সে এই অঘটন কিভাবে ঘটাইলা?
– দুঃখের কথা আর কি বলব। একবার শখ কইরা বড়লোকদের জিনস পরছিলাম। হঠাৎ বেগ আসল। তাড়াহুড়ো করে প্যান্টস এর চেন খুলতে গিয়া টুনটুনি গেল আটকায়ে। শত চেষ্টার পর টুনটুনিরে কোনোভাবে মুক্ত করলাম। কিন্তু সেই থেকে পাখি খাকি ঘুমায়। জাগার নাম গন্ধ নাই ওর মায়েরে বাপ!
তালুকদার মশাই হাসতে হাসতে আধমরা হয়ে গেলেন। রাহাত মন খারাপ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তালুকদার বললেন,
– আমার পরিচিত এক বৈদ্য আছেন। তোমার সাথে পরিচয় করায়া দিব নি। আশা করি, সমাধান পাবা।
যাজ্ঞে! এবার কাজ শুরু করা যাক। তবে একটা দুঃসংবাদ আছে।
– কি দুঃসংবাদ?
– শুনলাম বর্ডারে নাকি কয়েকদিন বেশ কড়াকড়ি নজর চলব। উপর মহল থিকা কোনো ক্লিয়ারেন্স না আসলে এদের পাঠানো যাব না।
তালুকদারের কণ্ঠস্বর বেশ চিন্তিত শুনালো।
– তাহলে এখন উপায়?
রাহাত সন্তপর্ণে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শুধালো।
– উপায় আর কি? আপদগুলারে পালতে হবে ততদিন। শোনো রাহাত, আমি প্রতিদিন আসতে পারব না। কেন পারব না, তা আশা করি তোমারে ভাইঙ্গা বলতে হবে না। এখন থেকে এই ফুলগুলার দায়িত্ব তোমার। তবে একটা কথা, আমারে অসন্তোষ কইরো না। ফলাফল খুব খারাপ হবে।
– আরে মশাই, আপনি চিন্তা কইরেন না তো! ফুলগুলা আমার কাছে নিরাপদেই থাকবে।
রাহাত আশ্বস্ত করল তাকে।
তালুকদার মশাই তৃপ্তির হাসি হাসলেন। এরপর ফাহিমকে বললেন,
– আমি বাড়ি ফিরতেছি। আধা ঘন্টার মধ্যে লা/শটার বন্দোবস্ত করিস। আজকে যেহেতু ওদের ভারতে পাঠানো হইতেছে না তাই তোদেরও এইখানে থাকার দরকার নাই। কাজ শেষ কইরা ওরে নিয়া ফিরা আসিস।
ফাহিম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
তালুকদার মশাই হাই তুলে বেরিয়ে গেলেন। ফাহিম রাহাতকে বলল,
– আসেন ওই ঘরে যাই। লা/শটার বন্দোবস্ত করা লাগবে।
রাহাত ফাহিমের পিছু পিছু পরের ঘরটায় ঢুকল। প্রবেশ করা মাত্রই তার চোখদুটো আটকে গেল বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা নগ্ন নিথর দেহটির দিকে। তেরো কিংবা চৌদ্দ বছর বয়সী একটি মেয়ে হবে৷ দৃষ্টি সিলিং এর দিকে স্থির। বক্ষযুগল সবে মাত্র স্ফীত হতে শুরু করেছে। এই পবিত্র কোমল শরীরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়েছে তালুকদার নামক হিংস্র জানোয়ার!
রাহাতের দম আটকে আসছিল বার বার। এই ছোট্ট দেহটিকে এবার টুকরো টুকরো করে কাটা হবে। ভাসিয়ে দেওয়া হবে হাওরের জলে।
আজকের এই রাত, আকাশভরা তারা, একটি অমৃতাংশু, হাওরের বাতাস, প্রকৃতির প্রতিটি মৌল সাক্ষী হয়ে থাকবে এই অপরাধের। রাহাত হাত মুষ্টিবদ্ধ করে মনে মনে বলল,
কাউকে ছাড়ব না। কাউকে না। টুঁটি ছিঁড়ে ফেলব তোদের আমি।
রাহাতের সামনেই আয়োজন করে লা/শ কাটা শুরু হল। ফাহিমের কথানুযায়ী আরেকজন যুবক দক্ষ হাতে কাজটি সম্পন্ন করছে। নিজের কম্পমান শরীরকে সামলানোর চেষ্টায় পাগলপ্রায় রাহাত তখন এক মুঠো বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য নিঃশব্দ আর্তনাদে ব্যস্ত।
———————————–
রাতের শেষ প্রহরে তারা বাড়ি ফিরল। রাহাতকে একইভাবে চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে। নিজের ঘরে ঢোকা মাত্র সে এতক্ষণ বন্দি করে রাখা অনুভূতিগুলো মুক্ত করে দিল। ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল তার চোখ দিয়ে। জীবনে প্রথমবার তার নিজেকে অকাজের বলে মনে হচ্ছে। তার সামনে একটি সদ্য ফোটা ফুলকে কেটেকুটে ভাসিয়ে দেওয়া হল। অথচ সে কিচ্ছুটি করতে পারে নি। এই অপরাধবোধ তাকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে দিবে বোধহয়!
অনুতাপের রাজ্যে যখন সে বিচরণ করছিল ঠিক তখন তার দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। রাহাত দ্রুততার সাথে চোখ মুছে ফেলল। আবার ফাহিম এলো কিনা?
সে ভারিক্কি ভাব নিয়ে দরজা খুলল। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে বোকা বনে গেল। চারুলতা দাঁড়িয়ে আছে!
– আপনি? এই সময়?
অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল রাহাত।
চারুলতা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। হনহন করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। রাহাতও আশেপাশে তাকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। বিস্মিত স্বরে পুনরায় জানতে চাইল,
– আপনি এত রাতে এ ঘরে এলেন যে?
এবারো কোনো প্রত্যুত্তর নেই। চারুলতার গোটা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সহসা রাহাত লণ্ঠনের আলোয় দেখল চারুলতার আঁচলের নিচ থেকে বৃহৎ একটি ছুড়ি বেরিয়ে আসছে। মেয়েটির চাহনিও বড় অদ্ভুত। প্রতিটি পদক্ষেপে জড়তা নিয়ে চারুলতা রাহাতের দিকে এগিয়ে আসল। কম্পমান হাতেই শক্ত করে ছুড়ি ধরে বজ্রকণ্ঠে শুধাল,
– আপনার গায়ে রক্ত কেন?
চারুলতার কথায় রাহাত নিজের শরীরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। আসলেই তার লুঙ্গি এবং গেঞ্জিতে রক্তের ছিঁটেফোটা লেগে আছে। লা/শ কাটার সময় বার কয়েক ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। তখন হয়ত তার গায়ে এসে লেগেছে। টের পায়নি সে।
চারুলতা পুনরায় মৃদু হুংকার ছাড়ল,
– কে আপনি? কেন আসছেন এইখানে?
রাহাত এবারো চুপ করে রইল। চারুলতার আচরণে সে বেশ মজা পাচ্ছে। সাথে মুগ্ধতাও ছড়িয়ে যাচ্ছে মনের আনাচে কানাচে। এই এক রত্তি মেয়ের মাঝে এত তেজ?
– কথা কন না ক্যান? আপনিও তালুকদারের লোক তাই না?
রাহাত এবার জবাব দিল,
– আমার পরিচয় আমি মানুষ। আমি কারো লোক না।
– না। আপনে মানুষ না। আপনে তালুকদারের লোক। হের লোক মানুষের জাতের মধ্যে পড়ে না। আপনে অবশ্যই নিরীহ কাউরে খুন কইরা আসছেন। আসছেন না? এইবার আমিও আপনারে খুন করুম। এবাড়ির সবাইরে খুন করুম। শুরু করুম আপনারে দিয়া।
চারুলতা ক্ষিপ্রগতিতে রাহাতের দিকে এগিয়ে এলো। ছুড়ি দিয়ে আঘাত করার ঠিক আগ মুহুর্তে সে খপ করে চারুলতার হাত ধরে ফেলল। হাত মুড়িয়ে চারুলতাকে উলটো করে ধরে ফেলল। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
– অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে ওঠা ঠিক আছে। কিন্তু সে আগুন নিভানোর প্রক্রিয়াতে ভুল করলে চলবে না। ভাগ্যিস ছুড়িটা নিয়ে আমার ঘরেই ঢুকেছিলেন!
চারুলতা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। তার ছটফটানি দৃষ্টিগোচর হতেই রাহাত হাতের বাধন খানিকটা হালকা করল। এরপর ছোঁ মেরে চারুলতার কাছ থেকে ছুড়ি কেড়ে নিয়ে বলল,
– আমার ওপর আপনার এই বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেছেন ঠিক আছে। অন্যদের ওপর করতে যাবেন না অনুগ্রহ করে। মেরে হাওরের জলে ভাসিয়ে দিবে। বুঝেছেন?
চারুলতার চোখে এবার পানি চলে এলো। ভাঙ্গা গলায় পুনরায় প্রশ্ন করল,
– আপনি কে?
রাহাত চারুলতাকে বসতে বলল। চারুলতা তার কথা অগ্রাহ্য করল না। কঠিন গলায় বলল,
– আমি বসতে আসি নাই এইখানে।
রাহাত মুচকি হাসল। বলল,
– আসছিলেন খু/ন করতে। সেটাও তো পারলেন না। তাহলে এবার বসেন?
চারুলতা বসল না। চোখে আগুন নিয়ে তাকিয়ে রইল। রাহাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– আচ্ছা, আমাকে নিয়ে আপনার এত আগ্রহ কেন?
চারুলতা মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইল। আচমকা তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল। নিস্তেজ কণ্ঠে বলে উঠল,
– আমি জানি না, আমি কি করতাছি! ক্যান করতাছি। আপনারে মারতে ক্যান আসছি! আমি মনে হয় পাগল হইয়া যাইতেছি। আপনি আমারে মাইরা ফেলেন। আমি আর বাঁচতে চাই না।
চারুলতা শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। রাহাত ভড়কে গেল। এত রাতে তার ঘর থেকে এ বাড়ির বড় ছেলের বউ এর কান্নার শব্দ শুনলে তালুকদার মশাই অবশ্যই বিষয়টিকে ভালোভাবে নিবেন না। রাহাত দ্রুত চারুলতার কাছে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। চারুলতা অশ্রুসিক্ত নয়নে রাহাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
রাতের শেষ প্রহরের সৌন্দর্যে তখন মুখরিত চারিপাশ। হাওয়ের শুদ্ধ বাতাস আছড়ে পড়ছে চারিদিকে। আলোড়ন তুলেছে গাছের প্রতিটি পাতায়। ঝিরিঝিরি সুরে মেতে উঠেছে প্রকৃতি। জ্যোস্নাও তার সমস্ত আলো যেন ঢেলে দিচ্ছে ভূতলে। লণ্ঠনের টিমটিমে আলোয় রাহাত একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চারুলতার দিকে। তার অশ্রুসজল চোখে অনির্দেশ্য যন্ত্রণা। ক্রোধের কারাগারে এতদিন যেন বন্দী ছিল সে।
চারুলতা। এক পঞ্চাদশী কণ্যা, যার মাঝে সদ্য জেগে উঠেছে প্রতিশোধের আগুন। দিকহারা নাবিকের ন্যায় বিবেচনা বিহীন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে। তবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তো? এটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল ‘হায়দার আলম রাহাত’ এর মত একজন সৎ অফিসারের মনে প্রণয়ের বীজ বুনতে। এ কয়দিন চারুলতার প্রতি তার চাহনিতে শুধুমাত্র মায়া কিংবা করুণা মিশে থাকলেও আজ রাহাত নিজের অনুভূতি বোধহয় সীমা অতিক্রমে ব্যস্ত!
রাহাত ফিসফিস করে বলল,
– আপনি এরকম পাগলামি আর দ্বিতীয়বার করবেন না। আমি তালুকদারের লোক নই। আমি কে তা অনুগ্রহ করে জিজ্ঞেস করবেন না। আমি বলতে পারব না। শুধু এটুকু বলতে পারি। আমার ওপর ভরসা রাখুন। এ বাড়ির প্রতিটি অন্যায়ের দরজা বন্ধ করব আমি।
চারুলতা বিস্মিত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল রাহাতের দিকে। সে রাহাতকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার পুরোপুরি যে অবিশ্বাস করছে তাও নয়।
রাহাত চারুলতাকে ছেড়ে দিল। বলল,
– ঘরে চলে যান। আর ভুলেও কোনোদিন এমন সিদ্ধান্ত নিবেন না।
চারুলতা ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।
(চলবে…)
উপন্যাসঃ #অবাঞ্ছিতা
লেখনীতে, #আতিয়া_আদিবা
৩২.
তালুকদার বাড়ির আঙিনায় আজ কোনো জনসমাগম নেই। যে বাড়ির মূল ফটক কোনোদিনও গ্রামের মানুষদের জন্য বন্ধ হয় নি, সে ফটক আজ উন্মুক্ত নয়।
তালুকদার মশাই বারান্দায় বসে আছেন। তার সামনে বসে আছে তুর্জয়। উষ্কখুষ্ক চুল, শঙ্কাগ্রস্ত চাহনি। খানিকটা অন্যমনস্কও দেখাচ্ছে তাকে। ক্ষণিককাল আগে এসে চারুলতা দুকাপ চা দিয়ে গিয়েছে। তালুকদার মশাই আয়েশ করে চা খেলেও তুর্জয়ের কাপ পড়ে আছে অযত্নে, অবহেলায়। দু একটি মাছি ভনভন করছে তার ওপর।
তালুকদার মশাইয়ের কপালে ভাঁজ পড়ল। বিরক্তি ছাপিয়ে তিনি সহজ গলায় বললেন,
– চা তো ঠান্ডা বিষ হইয়া গেল। খাবি না?
তুর্জয় মাথা ঝাঁকাল। বলল,
– খাইতে ইচ্ছা করে না, আব্বা। স্বাদ পাই না কোনোকিছু তেই।
তালুকদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কাঠের ছোট্ট টেবিলের ওপর চায়ের কাপটি রাখলেন। এরপর বড় ছেলের উদাস মুখপানে চেয়ে শুধালেন,
– তোর কি হইছে রে তুর্জয়? আমারে সত্যি কইরা বল তো? তুই তো এমন ছিলি না রে বাপ!
তুর্জয় মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল। এ বিষয়ে তার বলার কিছু নেই। একা ঘরে থাকলেই সে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায়। মরা মানুষ দেখতে পায়। গতকাল রাতে সে মায়াকে দেখতে পেয়েছে। মুদি দোকানের মালিক রফিক মিয়ার সেই মৃত মেয়ে ‘মায়া’। যার সদ্য প্রস্ফুটিত দেহ তুর্জয় রসিয়ে রসিয়ে ভোগ করেছিল। কলঙ্কের ভার সইতে না পেরে মা মরা মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল।
সোনালতা, মায়া দুজনেই তুর্জয়কে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। তুর্জয়ের বোধগম্য হচ্ছে না কেন তার সাথে ঘটে চলেছে এমন অলৌকিক সব কাণ্ড? এ সকল অলীকত্বে কেই বা বিশ্বাস স্থাপন করবে?
ছেলের নিস্তব্ধতায় আরোও বেশি বিরক্ত হলেন তালুকদার মশাই। কথার মাঝে ব্যক্ত করলেন তা।
– চুপ কইরা আছস কেন? কথা বল। কি হইছে তোর?
– বললে বিশ্বাস করবেন না, আব্বা।
শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী শোনলো তুর্জয়ের।
– আবার সেই মরা মানুষের কিচ্ছা-কাহিনী?
তালুকদার মশাই নারাজ গলায় শুধালেন।
তুর্জয় সামান্য হাসল। বলল,
– আপনি ধইরাই নিছেন আমি কিচ্ছা শুনাইতেছি। এজন্যই কাউরে কিছু বলতে চাই না আমি। চুপ কইরা থাকি।
তালুকদার মশাইয়ের চোখজোড়ায় যেন অগ্নিবর্ষণ হচ্ছে। লাভ ক্ষতির অংক যতবার কষছেন, উত্তরে ক্ষতিই মিলছে।
তুর্জয়ের ছোটবেলা থেকেই ওর পেছনে তালুকদার অফুরন্ত সময় এবং শ্রম দিয়েছেন। নিজের আদর্শে গড়ে তুলেছেন। বড় ছেলেকে নিয়ে তার শখ আহ্লাদের পরিধি অতি বিস্তৃত। এত বছরের লগ্নি, অর্পণ সব বৃথা যাবে? তুর্জয় দিন দিন পাগলে পরিণত হবে? এ কি মানা যায়?
তালুকদার মশাই বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করলেন। বললেন,
– তুই আবার ঢাকা যা। ডাক্তার দেখাইয়া আয়।
তুর্জয় বিস্মিত চোখে তাকাল তালুকদার মশাইয়ের দিকে।
– ডাক্তার ক্যান দেখামু?
– তুই মাথায় আঘাত পাইছিলি, তুর্জয়। অনেক সময় সেকারণেও মানুষ ভ্রম দেখে।
– আপনি আমারে বিশ্বাস করতাছেন না, আব্বা!
তালুকদার মশাই তুর্জয়ের হাত কোলের ওপর নিলেন। ওর বাহুতে নিজের হাত আদুরে ভঙ্গিতে বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
– আমি তোরে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি তুর্জয়। এজন্যই বলতেছি ডাক্তার দেখা। হইতেও তো পারে কোনো সমস্যা হইছে। এছাড়া তোর মায়ের সাথে এ বিষয়ে চারুলতার কথা হইছে। ডাক্তার নাকি আগেই সাবধান কইরা দিছিল।
– কোন বিষয়ে?
অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল তুর্জয়।
– ভ্রম দেখার বিষয়ে। যদিও বিস্তারিত বলতে পারে নাই। আমি দুর্জয়ের সাথে যোগাযোগ করার জন্য লোক পাঠাইছি। ওরে নিয়া বাড়ি ফিরবে। ও আসলে বিস্তারিত বলতে পারবে। সেই যে ইলেকশনের সময় বাড়ি ছাড়ল আর আসল না! পোলাডারে মাজেদা নষ্ট কইরা ফেলছে। বেজন্মা একটা।
দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠল তালুকদার মশাইয়ের শরীর।
– আমাদের কাজকর্মের জন্য দুর্জয় লজ্জা পায়, আব্বা।
– লজ্জা ক্যান পাব?
– ওর কাছে আমরা অপরাধী।
তালুকদার মশাই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। বললেন,
– ওর আদর্শ অনুযায়ী চললে আমাদের এতদিন মাঠে গরু চড়াইয়া খাওয়া লাগত। ওর বয়স কম। আরোও কয়েকদিন যাক। তখন বুঝব। দুনিয়াটা এত সোজা না। এই দুনিয়াতে টাকাই সব। পাওয়ারই সব।
তুর্জয় চুপচাপ কথাগুলো শুনল। কোনো প্রতিক্রিয়া জানাল না। একসময় বাবার কথাগুলো এক বাক্যে বিশ্বাস করে ফেললেও এখন তা পারে না। নিজের মাঝে গুপ্ত লড়াই শুরু হয়।
হেমন্তের রোদ তালুকদার বাড়ির বারান্দায় এসে পড়েছে। সে নরম রোদের আলোয় পা ভিজিয়ে বসে আছে পিতা-পুত্র৷ রান্নাঘরের দরজা সামান্য ভিড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছে চারুলতা।
মাজেদা উননের সামনে দাঁড়িয়ে তরকারি নাড়ছিল। আজ বহুদিন পর তালুকদার বাড়িতে সুনামগঞ্জের সেই প্রভাবশালী নেতারা আসবেন। তাদের জন্যই ঘটা করে রান্নার আয়োজন চলছে।
সকাল থেকেই শুরু হয়েছে এই আয়োজন। ক্ষণিককাল আগে রান্নাঘরে নাহিদা এবং জোহরাও উপস্থিত ছিল। টুকটাক সাহায্য করেছে বলে কাজ দ্রুত এগিয়েছে।
মাজেদা আজকাল রান্নাঘরে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। কোমড় থেকে পায়ের পাতা অব্দি ব্যাথায় ছিঁড়ে যায়। এখনও একই বেদনা অনুভব করছেন তিনি৷
‘ও চারু, চুলার কাছে আইসা তরকারিটা দেখ তো মা। আমি ঘরে যাই। শরীরটা একটু বিছানায় ঠেকাইয়া আসি।’
চারুলতার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মাজেদা মুখ তুলে চাইল। দেখল, চারুলতা দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে একমনে তাকিয়ে আছে বারান্দার পানে। সরু রোদ আছড়ে পড়েছে তার মুখে। সে আলোয় জ্বলজ্বল করছে চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু।
– চারু?
এবার চারুলতার শরীর সামান্য কেঁপে উঠল। দ্রুত চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,
– জ্বি আম্মা?
– তরকারিটা একটু দেখবি? আমি ঘরে যাইতাম। আর শরীরে কুলাইতেছে না।
চারুলতা ব্যস্ত ভঙ্গিতে উননের কাছে এলো। মাজেদার হাত থেকে খুন্তি নিয়ে বলল,
– আপনি যান, আম্মা। বাকিটা আমি সামলাইয়া নিতে পারব।
মাজেদা আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন। এরপর ধীরপায়ে রান্নাঘরের দুয়ারের দিকে এগিয়ে গেলেন। বের হওয়ার আগ মুহুর্তে চারুলতাকে খুব অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করলেন তিনি।
– তোর কি এখনো আমার খারাপ পোলাডার লিগা মন পুড়ে?
সহসা এমন প্রশ্নে যেন হতবুদ্ধি চারুলতা। কি উত্তর দিবে ঠাহর করতে পারে না সে। মাজেদা চারুলতাকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন,
– উত্তর দাওয়া লাগব না রে মা। শুধু তুই নিজের ওপর জুলুম করিস না। মাংস প্রায় সিদ্ধ হইয়া আসছে। বেশিক্ষণ জাল দাওয়া লাগব না। এখন বেগুন গুলা ভাইজা ফেল।
মাজেদা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। চারুলতাও রান্নায় মন দিল।
তালুকদার মশাই আর তুর্জয়ের কথপোকথন তখন তুঙ্গে। আজ দুপুরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর নিয়ে নেতারা বাড়ি আসবেন। এই বিষয়েই তুর্জয়কে অবহিত করছিলেন তালুকদার। এমনসময় ব্যাগ-বোচকা হাতে তাজমহল বেগম বেরিয়ে এলেন। তার সাথে রূপাও দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট।
তাজমহল বেগম ভাইকে দেখে নাকিকান্না জুড়ে দিলেন।
– আমি আর তোর বাড়িতে থাকব না, ভাই। এ বাড়িতে আমার কোনো সম্মান নাই।
তালুকদার মশাই ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালেন,
– কি হইছে?
তাজমহল বেগম ভেংচি কেটে বললেন,
– তোর বউরে ডাইকা জিজ্ঞাস কর কি হইছে।
– আহা! তোর বলতে কি সমস্যা?
– সমস্যা হবে ক্যান? বলতে তো সমস্যা নাই। কিন্তু সমাধান কি পামু?
তালুকদার মশাই খানিকটা বিরক্ত হলেন।
– ঘ্যান ঘ্যান না কইরা কি হইছে বললেই ল্যাটা চুকে যায়।
তাজমহল বেগম পুনরায় ঘুরিয়ে পেচিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্চিল। রূপা তার মুখের কথা ছোঁ মেরে বলল,
– মা চা খাইতে চাইছে। মামী বলছে এখন বানিয়ে দিতে পারবে না। বিকালে যখন সবার জন্য চা বানাবে তখন দিবে। মামীর শরীরটা বোধহয় ভালো না।
আর মা, তোমারও বা এই অবেলায় চা খেতে হবে কেন?
– তুই চুপ থাক! এত কথা বলস ক্যান?
হুংকার দিয়ে উঠলেন তাজমহল বেগম। পুনরায় কুমিড়ের কান্নায় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
তালুকদার স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন,
– ও… এই কথা? তা বাড়িতে এতগুলা বউ থাকতে তোরে চা বানাইয়া দেওয়ার মানুষের অভাব হব নাকি? রূপা, রান্নাঘরে যাইয়া দেখ তো কে আছে? তোর মায়ের জন্য চা বানাইতে বল।
রূপা বলল,
– মনে হয় চারু ভাবী আছে। জোহরা ভাবী আর নাহিদা ভাবীকে তো ঘরের ভেতর দেখলাম। আমি গিয়ে বলে আসি তাহলে।
তুর্জয় রূপাকে আটকালো। বলল,
– তোর যাইতে হব না। আমি যাইতাছি। তুই ফুফুরে নিয়া ঘরে যা। যাও ফুফু ঘরে যাও। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা পাবা। চিন্তা কইর না।
– আমার সোনা আব্বা। কলিজার ধন।
খুশিতে গদগদ হয়ে তাজমহল বেগম ঝড়ের গতিতে ব্যাগ-বোচকা নিয়ে পুনরায় ঘরে প্রবেশ করলেন। রূপাও তাকে অনুসরণ করল।
তুর্জয় উঠে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে লাগল। তালুকদার মশাইয়ের বিষয়টি পছন্দ হল না। তবুও তিনি চুপচাপ তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তুর্জয়ের হাঁটার গতি।
– ‘চারু?’
স্বামীর কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল চারুলতা। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারি হল তার। হৃদস্পন্দন প্রচন্ডভাবে বৃদ্ধি পেল। যেন বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
পেছন ফিরে চাইল সে।
তুর্জয় দেখল চারুলতার ঘর্মাক্ত মুখ। উননের আঁচেই বোধহয় তার গালজোড়ায় সামান্য লালচে আভা। ওষ্ঠজোড়ার ওপরে ঘামের প্রলেপ।
– দুই কাপ চা বানাইতে পারবি?
চারুলতা কোনো উত্তর দিল না। ব্যস্ত ভঙ্গিতে চুলা থেকে মাংসের তারকারি নামিয়ে পানি আর দুধের মিশ্রণ উননে বসিয়ে দিল। তুর্জয় তখনও দুয়ার ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে। শুধুমাত্র চায়ের কথা বলতে সে রান্নাঘরে আসে নি। তার অব্যক্ত অনুশোচনা তাকে পৌঁছে দিয়েছে চারুলতার দ্বারপ্রান্তে।
– তোর সাথে একটু কথা ছিল, চারু।
চারুলতার মাঝে কোনো আগ্রহের দেখা মিলল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে কাজ করতে লাগল। তুর্জয় পুনরায় ডাকল।
– বাইলা মাছ..
এবার চারুলতা চমকে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল তার। সে পুনরায় পেছন ফিরে চাইল।
তুর্জয় মাথা নিচু করে বলল,
– তোরে অনেক উলটা পালটা বলছি। গালি দিছি। তার জন্য মাফ চাইতে আসছি।
চারুলতা এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল। বলল,
– কয়ডা পাপের জন্য মাফ চাবেন আপনে? আর কতবার মাফ করুম আপনারে? আপনে একজন খু/নি, দুঃশ্চ/রিত্র লোক। তারপরেও আপনারে আমি ভালোবাসছিলাম। আপনারে নিয়া নতুন কইরা সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু আপনার মত নিকৃষ্ট, দেহলোভী মানুষের সাথে সংসার করা এহন আমার কাছে নরকবাস।
তুর্জয় মাথা নিচু করে মৃদু হাসল। বলল,
– তা তুই ঠিকই বলছস। আমি খু/নি, দুশ্চ/রিত্র লোক। মা/গী মানুষের শরীর পাইলে আমার হুঁশ থাকে না। আমারে নিয়া তোর সব ধারণাই সত্য, বাইলা মাছ। কিঞ্চিৎ পরিমাণ অসত্য নাই। কিন্তু সব সত্যির সাথে এই সত্যিটাও তো তুই জানস তাই না?
– কোন সত্যি?
তিরতির করে কম্পমান ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অস্ফুটে প্রশ্ন ছুঁড়ল চারুলতা।
– তোর প্রতি আমার ভালোবাসায় কোনো মিথ্যা নাই রে!
চারুলতা পুনরায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। বলল,
– যে ভালোবাসা নারীর শরীরের সামনে হাইরা যায়, সেই ভালোবাসার জন্য আমার মন আর পুড়ে না। একজন স্ত্রী তার স্বামীর সব অন্যায় মাইনা নিতে পারে। তার দাওয়া সব কষ্ট সইতে পারে। কিন্তু স্বামীরে অন্য নারীর সাথে ভাগ কইরা নিতে পারে না।
তুর্জয় খানিকটা উগ্র স্বরে বলল,
– তো তুই কি চাস? আমি নাহিদারে তালাক দেই?
– আরেক নারীর জীবন আমি ক্যান নষ্ট করুম? আমি চাই আপনে আমারে তালাক দেন। আপনার মত লোকের সাথে আমি সংসার করতে চাই না।
– তোর পেটে আমার সন্তান, চারু। ভুইলা যাইস না। আমি তোরে কোনোদিন তালাক দিমু না। সংসার তোর আমার সাথেই করা লাগব।
দৃঢ় গলায় কথাগুলো বলল তুর্জয়।
চারুলতা অতি রাগণ্বিত অবস্থায় থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
– আপনি একজন অপরাধী। আমার বোনরেও আপনি খুন করছেন। এরপরেও ভাবলেন ক্যামনে আপনার সাথে আমি সংসার করুম?
তুর্জয় এবার চারুলতার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। চারুলতা এক পা দু পা করে পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,
– খবরদার! আমারে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবেন না। আপনারে আমি আর মন থিকা স্বামী হিসাবে মানি না।
তুর্জয় খপ করে চারুলতার হাত ধরে ফেলল। আকুল স্বরে বলল,
– বাইলা মাছ, আমি নিকৃষ্ট পাপী। অপরাধী। কিন্তু মিথ্যাবাদী না। তোর বোনরে খু/ন করা হইছে। কিন্তু সেই খু/নী আমি না।
চারুলতা অবাক চোখে তুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বেয়ে ঝর্ণায় ন্যায় অশ্রুস্রোত বইতে লাগল, নিঃশব্দে। তুর্জয় চারুলতার চোখ মুছে দিয়ে বলল,
– আমি জানি, তোর মনে অনেক প্রশ্ন। কিন্ত আমারে সেই প্রশ্নগুলা করিস না। আমি উত্তর দিতে পারুম না। আমি চাই না তুই আমার থিকা দূরে সইরা যা। এই দূরত্ব আমি আর সহ্য করতে পারতেছি না।
তুর্জয় চারুলতাকে নিজের বুকের সাথে জাপ্টে ধরল। কিন্তু চারুলতা দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মত। কোনো আবেগ নেই। অনুভূতি নেই। নিষ্ক্রিয় গলায় সে বলল,
– আপনার সাথে আমার মিলন আর সম্ভব না। এই জীবনে আর না।
তুর্জয় চারুলতার গাল ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসল। চারুলতার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে ডুবে ক্রোধিত স্বরে শুধালো,
– এইভাবে আমাদের গল্প শেষ করবি তুই, বাইলা মাছ? কোনো ইতি থাকব না?
চারুলতা স্বামীর মোহ থেকে নিজের পোষা মনকে মুক্ত করে বলল,
– কে কইছে আপনারে আমাগো গল্পের কোনো ইতি থাকব না? মানুষের গল্প থাকে পূর্ণতা পাওয়ার। আমাদের গল্প হব বিচ্ছেদের।
তুর্জয় কম্পিত হাতে চারুলতার গাল চেপে ধরল। তার অভ্যন্তরীণ ক্রোধ, ক্ষোভ, হাহাকার একসঙ্গে জেগে উঠেছে। সে অনমনীয় স্বরে বলল,
– তোর কাছে আমি কোনোদিন ভালো সাজতে চাই নাই। না আমি কোনোদিন মিথ্যা বলছি। আজকেও একটা সত্য বইলা রাখি। আমি তুর্জয় তালুকদার যতদিন বাঁইচা আছি তুই অন্য কারো হইতে পারবি না। আমি হইতে দিব না। তোরে আমি কোনোদিনও তালাক দিব না, চারু। এই নিকৃষ্ট পাপীর সংসারই তোর কইরা যাইতে হবে।
চারুলতার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলল তুর্জয়। তুর্জয়ের প্রতিটি স্পর্শে বৈধ অধিকারের শক্তির বিচরণ।
চুলায় বসিয়ে রাখা দুধে বলক এসেছে। হালকা উতরিয়ে পড়ল চারিপাশে। ফোঁস করে শব্দ হল কয়েকবার। এরপর পুনরায় শান্ত হয়ে গেল সব।
‘আপনারে আব্বা ডাকে।’
নাহিদার গলার স্বরে চমকে উঠল দুজন। তুর্জয় হাতের বাধন হালকা করল। চারুলতা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
নাহিদার শরীরের মৃদু কম্পন দৃশ্যমান। তুর্জয় আর এক মুহুর্ত অপেক্ষা করল না। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
উপন্যাসঃ #অবাঞ্ছিতা
লেখিকাঃ #আতিয়া_আদিবা

