#পর্ব_১১
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
দরজার সামনে ফারহান এবং তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এলিনা চৌধুরী। অনেক দিন পর নিজের জন্মদাত্রী মাকে চোখের সামনে দেখে আরভানের ভেতরে চাপা এক ভালোলাগা কাজ করলেও তার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটল না। আরভানের ব্যক্তিত্বের বরফঢাকা আবরণে সেই কোমলতার কোনো স্থান নেই; সেখানে কেবল এক জমাটবদ্ধ অভিমান রাজত্ব করে।
এলিনা চৌধুরী ছেলের পাথুরে মুখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন। শান্ত গলায় বললেন,
“কী রে? ভেতরে আসতে দিবি না নাকি দরজা থেকেই তাড়িয়ে দিবি?”
আরভান নিরুত্তাপ মুখে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে জায়গা দিলে ফারহান এবং এলিনা ভেতরে প্রবেশ করলেন। এলিনা ধীরপায়ে ড্রয়িংরুমে পা রাখলেন। তার দৃষ্টি ঘুরে ফিরে ছেলের ওপরই থমকে যাচ্ছিল। ছেলের অভিমান আজও পাহাড় সমান। তার মনে পড়ে গেল সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা, যেদিন তিনি এক চরম ভুল বুঝাবুঝির জেরে আরভানকে বলেছিলেন,
“এই বাড়ি থেকে তুমি এখনই বের হয়ে যাও! তোমার মতো স্বার্থপর ছেলের মুখ আমি আর দেখতে চাই না!”
মায়ের মুখে সেই কঠিন বাক্যগুলো শুনে আরভান সেদিন এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়েছিল। তারপর কত বছর কেটে গেল, মা-ছেলের দেখা হয়নি ঠিকভাবে। কিছুদিন আগে আরশাদ চৌধুরী যখন আরভানকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করে বাংলাদেশে পাঠালেন আয়াতকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য, সেদিন শেষবারের মতো কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা হয়েছিল তাদের। তাও কেবল বাড়ির লনে দাঁড়িয়ে; এলিনা তখন ছেলের পথ আটকে শুধু একটি আর্জি জানিয়েছিলেন,
“আরভান, আয়াতকে ডিভোর্স দিস না। ওকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। ওকে তুই আমার কাছে এনে দে!”
এলিনা জানতেন, আরভানের এই অবাধ্য হৃদয়কে যদি কেউ মায়া দিয়ে শাসন করতে পারে, তবে সে একমাত্র আয়াত। কিন্তু সেদিন আরভান কোনো উত্তর দেয়নি, এমনকি মায়ের দিকে ফিরেও তাকায়নি।
এলিনা চৌধুরী ধীরপায়ে ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিষ্পলক ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মাতৃত্বের চিরন্তন তৃষ্ণা নিয়ে অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে আরভানের বুকের বাঁ-পাশে স্পর্শ করতে চাইলেন—যেখানে আরভানের সেই অবাধ্য হৃদপিণ্ডটা সজোরে স্পন্দিত হচ্ছে।
মায়ের এই ছোঁয়া আরভানকে বিচলিত করল। সে ঝট করে মায়ের হাতটা ধরে সরিয়ে দিয়ে শীতল গলায় বলল,
“অপ্রয়োজনীয় মায়া দেখাবেন না মিসেস চৌধুরী। এই হৃদপিণ্ডটা সচল আছে কি না, তা নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা করার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। ”
এলিনার চোখ দুটো মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল। অতীতের সেই মুহূর্তের রাগের মাথায় বলা কথার মাসুল আজও দিতে হচ্ছে তাকে। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বাড়ির আধুনিক অন্দরসজ্জা দেখতে দেখতে বললেন,
“অবশেষে আমার ছেলে কোথায় থাকে সেই জায়গাটা দেখার সৌভাগ্য হলো আমার। তো কী মনে করে আমাকে এখানে আনলি? আবার বলিস না যেন তুই কিছুই জানিস না আর ফারহান নিজ ইচ্ছায় আমাকে নিয়ে এসেছে। ওসব বলে লাভ নেই, কারণ আমি ভালো করে জানি ফারহানের এতটা সাহস নেই যে তোর অনুমতি ছাড়া ও আমাকে এখানে আনবে।”
আরভানের ঠোঁটের কোণে একটা বিষণ্ণ অথচ বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে যাওয়ার সময় সে বরফশীতল গলায় বলল,
“আপনি যাকে চেয়েছিলেন তাকে আমি এনে দিয়েছি। এবার আপনার আমানত আপনি বুঝে নিন। আই অ্যাম ডান উইথ দিস রেসপনসিবিলিটি।”
কথাটি বলেই আরভান উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে উপরে চলে গেল। ফারহান এতক্ষণ হাঁ করে সব দেখছিল। সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“আপনি কাকে চেয়েছিলেন আন্টি? মানে এভি কাকে এনে দিয়েছে?”
এলিনা সরাসরি উত্তর দিলেন না, শুধু রহস্যময় হাসি হেসে আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে ফারহানকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ফারহান, এ বাড়িতে কি নতুন কেউ এসেছে?”
ফারহান বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
“না তো! এই বাড়িতে আর কে আসবে? আপনার ছেলে তো একটা জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি, তার বাড়ির ত্রিসীমানায় মানুষ আসতে ভয় পায়। আপনি তো জানেনই ও কতটা অসামাজিক আর একরোখা।”
কথাটা বলেই ফারহানের মাথায় সকালের সেই দৃশ্যটা খেলে গেল। দোতলার গেস্ট রুম থেকে সেই মায়াবী মেয়েটার বেরিয়ে আসার দৃশ্য। সে চোখ বড় বড় করে এলিনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্টি! আরভান নির্ঘাত বড় কোনো কাহিনী ঘটাচ্ছে। ওর বাড়ির আশেপাশে কোনো মেয়ে দেখা যায় না, অথচ আজ সকালে আমি ওই পাশের রুমটা থেকে একটা অসম্ভব কিউট মেয়েকে বের হতে দেখেছি। আপনার কি মনে হয় না ব্যাপারটা কেমন খাপছাড়া?”
এলিনা মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন। “না ফারহান, আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেও খাপছাড়া লাগছে না।”
ফারহান আরও অবাক হয়ে বলল, “কেন লাগছে না আন্টি? আরভানের মতো একটা হিটলারের ঘরে একদম আনকোরা একটা মেয়ে!”
এলিনা সহজ গলায় উত্তর দিলেন, “লাগছে না কারণ—স্বামীর বাড়িতে তো স্ত্রীই থাকবে, তাই না? এতে অবাক হওয়ার কী আছে?”
ফারহান যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। “মানে? ”
”মানে ওটা আরভানের আইনসম্মত স্ত্রী, আয়াত।”
বলেই এলিনা ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
ফারহানের মাথায় তখন যেন বিনামেঘে বজ্রপাত হলো। এটা কীভাবে সম্ভব? আরভান বিয়ে করেছে অথচ তার মতো প্রাণের বন্ধু, যে গত ৯ বছর ধরে ছায়ার মতো সাথে আছে, সে কিচ্ছু জানে না? তারা একই সাথে পড়াশোনা শেষ করেছে, ব্যবসায়িক লড়াই লড়ছে—তাহলে এই বিয়েটা সে কখন সারল? ফারহান মনে মনে গজগজ করতে লাগল,
“এর জন্যই তাহলে তখন ওই মেয়ের সাথে হাত মেলাতে দেয়নি! খচ্চর ব্যাটা, বউ পেয়ে এবার নির্ঘাত বন্ধুকে ভুলে যাবে?”
*****
আরভানের রুক্ষ ব্যবহারের পর দরজায় কলিং বেলের শব্দ শুনে আয়াত আর সেখানে এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেনি। সে দ্রুত পায়ে নিজের জন্য বরাদ্দ রুমে চলে এসেছিল। বিছানায় বসে নিজের দুই হাঁটু জাপ্টে ধরে সে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। স্মৃতিগুলো যেন বিষাক্ত তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধছে। আজ তার জীবনের এই চরম অনিশ্চয়তার জন্য কি সে নিজেই দায়ী?
শৈশবে বাবা-মায়ের সেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, তারপর দাদাজান মনসুর আলী মোর্শেদ ছেলের শোকে স্ট্রোক করে মারা যান। চারদিকে তখন শুধু ঘন অন্ধকার। সেই দুঃসময়ে আরভানের দাদা আফজাল চৌধুরী তাকে নিজের বুকে আগলে নিয়ে বলেছিলেন,
“আয়াত, তুই হচ্ছিস চৌধুরী বাড়ির বড় আমানত। আমার আরভানের আমানত তুই। আমি নিজে তোর ইজ্জত আর সম্মান রক্ষা করব।”
অথচ সেই দাদাজানই তাকে এমন এক মানুষের সাথে বেঁধে দিলেন, যার কাছে সম্মানের বদলে আজ তার কপালে জুটছে কেবল অবহেলা আর ঘৃণা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আয়াতের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে কৌতূহলে ভ্রু কুঁচকালো। ভাবল আবারও সেই বদ লোকটা হয়তো নতুন কোনো তিক্ত কথা শোনাতে এসেছে। এত অপমান করার পরও কি শান্তি হয় না লোকটার? আয়াত নিজেকে শক্ত করল, এবার সে-ও ছেড়ে কথা বলবে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, “আসুন।”
দরজা খুলে ভেতরে পা রাখলেন এলিনা চৌধুরী। আয়াত ওনাকে দেখে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলল। কোনো মানুষের চেহারা এতটা মায়াবী আর উজ্জ্বল হতে পারে, তা তার জানা ছিল না। গায়ের রং পুরোপুরি বিদেশিদের মতো শ্বেতশুভ্র, অথচ পরনে অত্যন্ত মার্জিত বাঙালি ঢঙের থ্রিপিস। একপাশে ওড়না ঝুলছে, কাঁধ সমান চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি করে আঁচড়ানো। মনে হচ্ছে এই পোশাকটা যেন শুধুই ওনার আভিজাত্যের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
এলিনা কাছে এসে স্নিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করলেন, “কেমন আছো আয়াত?”
আয়াতের বিস্ময় এবার চরমে উঠল। মানুষটা দেখতে পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক হলেও তার মুখের বাংলা ভাষা একদম নিখুঁত। কোনো বিদেশি টান নেই। এলিনা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমি কি তোমার পাশে বসতে পারি?”
আয়াতের এবার হুঁশ ফিরল। কী লজ্জার ব্যাপার! একজন মানুষ তার রুমে এসে দাঁড়িয়ে আছে আর সে কিনা হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই মানুষটা তাকে বেয়াদব ভাবছে। অত্যন্ত লজ্জার সাথে সে আমতা আমতা করে বলল, “জি জি আসুন। আমি আসলে একটু… আপনি…”
”থাক থাক, এত অস্থির হতে হবে না তোমাকে। মাশাআল্লাহ, তুমি তো বড্ড মায়াবী!” এলিনা আয়াতের পাশে বসে তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। “এবার বুঝলাম আমার ছেলে কেন বাংলাদেশ থেকে ফেরার পরে সারাক্ষণ আমার পিছু পিছু ঘুরত আর বলত— ‘মম জানো, আমার সেই ছোট বউটা না ডলের মতো সুন্দর! ওর হাসিটা একদম অ্যাডোরাবল!’ প্রথম প্রথম সহ্য করলেও সারাটাদিন একই কথা শুনে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে যেতাম। কিন্তু আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ও সেদিন এতটুকুও বাড়িয়ে বলেনি।”
বলেই তিনি হেসে ফেললেন। আয়াত লজ্জায় আর বিস্ময়ে মাথা নিচু করে রইল। এলিনা আবার বললেন,
“দেখেছ, আমি এখনো তোমাকে নিজের পরিচয় দিইনি। আমি আরভানের মা, এলিনা চৌধুরী।”
নামটা শুনেই আয়াত চট করে তাকাল।তার মানে আরভান যার কথা বলেছিল সে এই নারী! আরভান তাকে এই মানুষটার সাথেই তুলনা করেছিল। আরভানের সেই বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর মনে পড়ে গেল আয়াতের। যদিও এলিনাকে দেখে কোনোভাবেই এত বড় ছেলের মা বলে মনে হয় না। বয়স যেন তাঁর ছোঁয়া এড়িয়ে গেছে। তবে আরভানের মুখাবয়বের সঙ্গে ওনার আশ্চর্যরকম মিল—চোখের দৃষ্টি, মুখের গড়ন, এমনকি সেই আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতিটুকুও। আয়াতের তখন আর বুঝতে বাকি রইল না—আরভান যে এত আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন, আসলে কোথায় লুকিয়ে আছে।আয়াত কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এত সুন্দর করে বাংলা বলতে পারেন কীভাবে?”
এলিনা মুচকি হেসে বললেন,
“বাঙালির বউ হলে বাংলা তো জানতেই হবে, তাই না? তবে সত্যিটা হলো বিয়ের আগে আরশাদের সাথে পরিচয়ের পর থেকেই ভাষাটা ভালো লেগেছিল, তাই শিখেছিলাম।”
আয়াত ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “একটা প্রশ্ন করতে পারি আপনাকে?”
”অবশ্যই করতে পারো।”
“দাদাজান আপনাকে অপছন্দ করেন কেন? শুধু আরশাদ আঙ্কেল আপনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন বলে? এমনকি আপনার ছেলেও আপনার ব্যপারে অদ্ভুত সব কথা বলে…
এলিনার মুখে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে উঠল।
“তোমার দাদাজান আমাকে এখনো অপছন্দ করেন বলে আমার অন্তত মনে হয় না। তবে সত্যি বলতে, আমার আর আমার ছেলের সম্পর্কের এই পরিণতির জন্য তুমি এবং তোমার পরিবার পরোক্ষভাবে হলেও কিছুটা দায়ী আয়াত।”
আয়াত হকচকিয়ে গেল। তার চোখমুখের ভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গিয়ে একরাশ বিস্ময় উপচে পড়ল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “আমার পরিবার? কিন্তু আমাদের সাথে আপনাদের কোনো শত্রুতা তো ছিল না, তবে আমরা কেন আপনাদের সম্পর্কের মাঝখানে আসব?”
“কিছু জিনিস সঠিক সময়ে জানাই ভালো আয়াত। তবে সত্যি বলছি, আমি ভাবিনি আরভান তোমাকে ডিভোর্স না দিয়ে এখানে নিয়ে আসবে। আমি ভেবেছিলাম ও জেদ করে সব শেষ করে দেবে।”
আয়াত নিচু স্বরে বলল, “আপনিও আপনার ছেলের মতো বড্ড রহস্যময়। সত্যি তো এটা যে, আপনার ছেলে আমাকে ডিভোর্স পেপার দিয়ে সই করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দাদাজান সব ওলটপালট করে দিলেন।”
এলিনা মুচকি হেসে আয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। “আরভান নিজেকে সবার সামনে যেমন দেখায় ও আসলে তেমন নয় আয়াত। ওর তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন। একবার ওকে বোঝার চেষ্টা করো। ওর শক্ত খোলসের আড়ালে লুকানো সেই ধ্বংসস্তূপটা খুঁজে দেখো—সেটা কতটা ভঙ্গুর! আর সেই ভাঙা মানুষটার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় হতে পারো শুধু তুমি আয়াত।”
আয়াত শুধু এলিনার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মা আর ছেলের সমীকরণটা সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। এলিনা আয়াতের চিবুক ছুঁয়ে ম্লান হেসে বললেন,
“তোমাকে দেখার পর নিজের কাছে আগলে রাখার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে আয়াত। কিন্তু আরভান বোধহয় তার অনুমতি দেবে না। তবে মাঝে মাঝে ওকে না বলে লুকিয়ে আমার কাছে চলে আসবে, আমি তোমাকে ঠিকানা দিয়ে দেবো।”
আয়াত ম্লান হেসে নিচু স্বরে বলল, “আপনার ছেলে আমাকে সহ্য করতে পারে না আন্টি। সে আমাকে শুধুই তার ওপর অর্পিত একটা আপদ মনে করে। সম্ভবত কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই সে আমাকে এই বন্দিশালায় আটকে রেখেছে।”
এলিনা শব্দ করে হেসে উঠলেন। “বোকা মেয়ে! সবসময় মানুষের মুখের কথা বিশ্বাস করতে নেই। মাঝে মাঝে চোখের ভাষা পড়তে শেখো, দেখবে অনেক অজানা গোপন সত্যি সামনে চলে আসবে। আরভান কোনোদিন কাউকে নিজের জীবনে ন্যূনতম জায়গা দেয়নি, অথচ তোমার জন্য ও নিজের গড়া সব নিয়ম ভেঙেছে। এটাই কি বড় প্রমাণ নয়?”
আয়াতের হৃৎপিণ্ড যেন একটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে কিছু বলতে মুখ খুলবে, ঠিক তখনই আরভান দরজায় এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত গম্ভীর ও শীতল গলায় সে বলল,
“আশা করি আপনার সময় কাটানো শেষ হয়েছে, মিস এলিনা চৌধুরী। আপনি এখন আসতে পারেন।”
নিজের ছেলের মুখে এমন আনুষ্ঠানিক সম্বোধন শুনে এলিনার মুখে কোনো দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠল না। বহু বছর ধরে এসব অবহেলা সহ্য করতে করতে তিনি যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তিনি শান্ত গলায় শুধু বললেন, “তোর সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে আরভান।”
”বলুন।”
“এখানে না, নিচে চল। আয়াত, আজ আসছি। আবার আসবো, তখন দুজন মিলে অনেক গল্প করব।”
এলিনা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আরভান একবার আয়াতের বিভ্রান্ত চোখের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে মায়ের পিছু পিছু নিচে নেমে এল। আয়াত হতভম্ব হয়ে গেলো।বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্বস্তি জমে উঠল। মনে মনে ভাবল—লোকটা সত্যিই অদ্ভুত। নাহলে কোন ছেলে নিজের মায়ের নাম ধরে ডাকে! এমন অদ্ভুত সন্তান সে জীবনে দেখেনি।
নিচে আসতেই আরভান নির্লিপ্ত মুখে বলল, “কী বলতে চান জলদি বলুন। আমার হাতে সময় কম।”
এলিনা থমকে দাঁড়িয়ে ছেলের চোখের দিকে তাকালেন। ধীর, চাপা কণ্ঠে বললেন, “আমাকে কি একবারও ‘মা’ বলে ডাকা যায় না আরভান? অন্তত যখন কেউ আশেপাশে নেই?”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি টেনে আরভান বলল, “আপনার স্মৃতিশক্তি কি খুব দুর্বল হয়ে গেছে মিসেস চৌধুরী? আপনি নিজেই তো আমাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন। আপনার মনে নেই?”
কথাটা ধারালো ছুরির মতো এলিনার বুকে বিঁধল। সেই মুহূর্তের ভুল বোঝাবুঝির মাশুল যে এভাবে দিতে হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। এলিনা কণ্ঠের আর্দ্রতা চেপে রেখে বললেন,
“আমি ভুল ছিলাম আরভান। না জেনে না বুঝে সব করেছিলাম। আমি জানতাম না আরশাদ আড়ালে এতটা নিচ হতে পারেন। ও তোর সাথে যা করেছেন, তা কোনো বাবার কল্পনাতেও আসা অসম্ভব। স্ত্রীর দায়িত্ব স্বামীকে বিশ্বাস করা, কিন্তু আমি অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে গিয়ে আজ নিজের সন্তানকেই হারাতে বসেছি! আমাকে কি একটিবার ক্ষমা করা যায় না আরভান?”
আরভান চোয়াল শক্ত করে অবজ্ঞার সুরে বলল, “এত সত্য জানার পরেও আপনি এখনো সেই মানুষের সাথেই একই ছাদের নিচে বসবাস করছেন? ধিক্কার জানাই আপনার এই তথাকথিত মাতৃত্বকে!”
এলিনা ব্যথিত স্বরে ডাকলেন, “আরভান…”
“আপনি যদি এসবই বলতে চান, তাহলে শুনে রাখুন—আপনার এই অপ্রাসঙ্গিক এবং অর্থহীন মায়া কান্না শোনার ধৈর্য আমার নেই।”
আরভানের কণ্ঠস্বর বরফশীতল। এলিনার চোখ ছলছল করে উঠল। মুহূর্তের জন্য তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন নিজেকে সামলাতে। পরক্ষণেই ধরা গলায় বললেন, “তুই বলেছিলি আয়াতকে তুই আমার জন্য এনেছিস। যদি তাই হয়, তবে আয়াতকে আমাকে দিয়ে দে।”
আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। “আয়াতকে দিয়ে আপনার কাজ কী?”
এলিনা ম্লান হেসে বললেন, “ওকে আমি আগলে রাখব। তুই তো নিজেকে একা করে দিয়ে নিঃসঙ্গতার মাঝে ধুঁকে ধুঁকে মরতে চাস! আয়াতকে অন্তত আমার কাছে থাকতে দে। তাছাড়া তোর তো বাঁচার কোনো মোহ নেই, নিজের শরীরটার ওপর যে অত্যাচার শুরু করেছিস, তাতে এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে তোর আশেপাশে রাখা মানে ওকে এক অনিশ্চিত কষ্টের মুখে ঠেলে দেওয়া।কিছুক্ষন আগে বলেছিস, আয়াতকে এ দেশে আনা তোর কেবল একটা রেসপন্সিবিলিটি মাত্র। সেই দায়িত্ব তো শেষ! তাই আমি ওকে সাথে নিয়ে যাব। তুই তোর এই বিষাক্ত একাকীত্ব নিয়ে সুখে থাক।”
মায়ের মুখে নিজের রূঢ় বাস্তবতার এমন নির্মোহ বিশ্লেষণ শুনে আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। বুকের ভেতরটা তীব্র এক হাহাকারে দুলে উঠলেও সে তা প্রকাশ হতে দিল না। বরং রুক্ষ গলায় উত্তর দিল,
“তখন যা বলেছিলাম তা আমি ভুলে গেছি, এখন আপনিও ভুলে যান। ও কোথাও যাবে না। এই বাড়িতেই থাকবে।”
ছেলের এমন অস্থিরতা আর অধিকারবোধ দেখে এলিনার ভেতরে এক চিলতে হাসি পেল। এই ছেলে মুখে যাই বলুক, হৃদয়ে যে ঝড়ের শুরু হয়েছে তা লুকানোর সাধ্য তার নেই। আরভান নিজেকে সংযত করে জোরে ডাক দিল,
“ফারহান! উনাকে পৌঁছে দিয়ে আয়। আর একটা রিকোয়েস্ট মিসেস চৌধুরী—বাড়ি চিনে গেছেন বলে যখন তখন এখানে চলে আসবেন না। এই বাড়িতে আপনি বা আপনার হাজবেন্ড না আসলে আমি বেশি খুশি হব। আর ফারহান, আজ থেকে তোরও আমার বাড়িতে যখন তখন আসা বন্ধ!”
বলেই সে কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে গটগট করে উপরে চলে গেল। ফারহান এবং এলিনা দুজনেই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এলিনার চোখ ছলছল করে উঠল। ছেলের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের জেদ আর পরিস্থিতির কারণে ছেলেটা তার থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছে। সে চাইলেই এখন আর এই দূরত্ব মেটানো সম্ভব না, কারণ এই দূরত্ব মেটানোর সময় হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে
****
ক্ষুধায় আয়াতের পেটে তখন রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার ক্লান্তি আর মানসিক অস্থিরতা তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। পেটের তাগিদে সব দ্বিধা কাটিয়ে নিচে নামতেই সে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। কিচেনে আরভান অ্যাপ্রন পরে নিপুণ হাতে কী যেন তৈরি করছে। আয়াতের বিস্ময় যেন আকাশ ছুঁল। এই লোকটাকে কিছুক্ষণ আগেই সে নিজের হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছিল, অথচ লোকটা সেই ব্যান্ডেজ ভেজানোর তোয়াক্কা না করে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছে! আয়াতের মেজাজ বিগড়ে গেল; এই জেদি মানুষটা নিজের ভালো যে একদমই বোঝে না, তা এই ক’দিনেই সে হাড়হাঁড়ে টের পেয়েছে।
কিচেনের সামনে আসতেই আরভান মুখ না তুলেই গম্ভীর গলায় বলল, “অকারণে দাঁড়িয়ে না থেকে ওই চেয়ারটাতে গিয়ে বসো।”
আয়াত কিছুটা চমকাল। লোকটার কি পেছনেও চোখ আছে? সে নড়ল না, বরং সেখানেই অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরভান এবার হাতের কাজ থামিয়ে আয়াতের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকে মেপে নিয়ে বলল, “এভাবে অবাক হয়ে দেখার কিছু নেই। আজ প্রথম এবং শেষবারের মতো আমি রান্না করছি। কাল থেকে এই দায়িত্ব পুরোটাই তোমার।”
আয়াত তড়পিয়ে উঠে বলল, “আজকেও আপনাকে আমার জন্য কষ্ট করতে হবে না। আমি নিজের খাবার নিজেই বানিয়ে নিতে পারব। ”
আয়াত কিচেনের দিকে এগোতে নিলে আরভান ঝট করে তার ডান হাতটা ধরে ফেলল। মুহূর্তেই আরভানের গভীর দৃষ্টি আয়াতের হাতের তালুর দিকে নিবদ্ধ হলো। আরভানের তীক্ষ্ণ ভ্রু কুঁচকে গেল। আয়াত অস্বস্তিতে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতেই আরভান এক ধাপ এগিয়ে এল।
আরভানকে নিজের দিকে ওভাবে এগিয়ে আসতে দেখে আয়াত হড়বড়িয়ে পিছু হটতে হটতে ডাইনিংয়ের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল।আরভান কোন কথা না বলে গিয়ে তার সামনে একটি প্লেট রাখল। আয়াত প্লেটের দিকে তাকিয়েই নাক কুঁচকে বলল, “এসব কী! ঘাস-পাতা? এসব আমি খাই না। আমাকে আমার মতো খাবার বানাতে দিন।”
আরভান নির্বিকার চিত্তে বলল, “আজ তোমাকে এটাই খেতে হবে। চুপচাপ খাওয়া শুরু করো আয়াত, কোনো কথা নয়।”
আয়াত বুঝল—নিশ্চয়ই কফিতে অতিরিক্ত পাউডার দেওয়ার প্রতিশোধ এই অখাদ্য খাইয়ে নিতে চাইছে লোকটা। তীব্র ক্ষুধায় কোনো উপায় না পেয়ে সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে খাবার মুখে দিল। মুখ কুঁচকে কোনোমতে খাবার গিলে সে দ্রুত প্লেটগুলো হাতে নিতেই আরভান বাধা দিল।
“বলেছি না, আজ রিল্যাক্স থাকো। কাল থেকে তো সব তোমাকেই করতে হবে।”
আয়াতের রাগ এবার চরমে পৌঁছাল। সে প্লেটটা না ছেড়ে জেদি গলায় বলল, “কাল থেকে যদি সব করতে পারি, তবে এখনো পারব। হাত সরান বলছি!”
আরভানও নাছোড়বান্দা।সে ছাড়লো না শুরু হলো দুজনের প্লেট নিয়ে টানাটানি এক পর্যায়ে আয়াত আকস্মিক ভারসাম্য হারিয়ে আরভানের শক্ত বুকের ওপর গিয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল। আয়াত ছিটকে সরে আসতে চাইলেও আরভান তা হতে দিল না। সে দুই হাত দিয়ে আয়াতকে ডাইনিং টেবিলের সাথে চেপে ধরল। একদম আয়াতের চোখের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে এসে বলল,
“তোমাকে না বলেছিলাম আমার থেকে দূরে থাকতে?
আয়াত ছটফট করে বলল, “দূরে থাকতে বলে তো নিজেই বারবার গায়ের ওপর এসে পড়ছেন! ছাড়ুন আমাকে!”
আরভান কোনো উত্তর দিল না। সে মুখটা আয়াতের মুখের খুব কাছে নামিয়ে আনল। টেবিলের সাথে আয়াতের পিঠ ঠেকে আছে, পালানোর কোনো পথ নেই। আয়াত দুই হাত দিয়ে আরভানের ইস্পাতকঠিন বুক ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেই চেষ্টা বৃথা। আরভান চোখ বন্ধ করে আয়াতের গলার কাছে মুখ নামিয়ে নিল। আয়াতের সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত বৈদ্যুতিক শিহরণ বয়ে গেল।
হঠাৎ আরভানের কথায় আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। আরভান ফিসফিস করে বলল, “এটা কোন পারফিউম আয়াত? ঘ্রাণটা বড্ড মাদকতাময়, আমার সব চিন্তা এলোমেলো করে দিচ্ছে।”
আয়াত তোতলামি করে বলল, “আ… আমি কোনো পারফিউম ব্যবহার করি না। সরুন আপনি!”
”সিরিয়াসলি? তার মানে তুমি নিজেই আস্ত একটা পারফিউম? তাহলে তো এখন থেকে বাইরে যাওয়ার আগে পারফিউমের দরকার নেই, শুধু তোমার গায়ের সাথে একটু ঘষা দিয়ে নিলেই চলবে!”
কথাটা বলেই আরভান আচমকা আয়াতের গালে নিজের রুক্ষ গালটা আলতো করে ঘষে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এরপর কোনো কথা না বলে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। আয়াত সেখানেই পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার গালে এখনো আরভানের সেই পুরুষালি দাড়ি আর তপ্ত স্পর্শের অনুভূতি দহন সৃষ্টি করছে। হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় পাগলের মতো আছাড় খাচ্ছে।
এই লোকটার আচরণ কেন দিন দিন এত অবাধ্য আর রহস্যময় হয়ে উঠছে? আয়াত মনে মনে নিজেকে কঠোরভাবে শাসন করল—না, এই লোকটার মায়াবী জালে জড়ানো যাবে না। এই মানুষটা বড্ড অদ্ভুত, বড্ড বিপজ্জনক!
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….
#পর্ব_১২
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
মুখের ওপর উষ্ণ নিঃশ্বাসের উপস্থিতি টের পেতেই মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা পাতলা হয়ে এল আয়াতের। কারো তপ্ত নিশ্বাস তার গালের খুব কাছে আছড়ে পড়ছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আয়াতের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। ঘুমের ঘোরেই সে অনুভব করল, কেউ একজন তার খুব কাছে বসে আছে। কারো দীর্ঘ আঙুলগুলো অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তার কপালে ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে। সেই স্পর্শে কোনো লোলুপতা নেই, নেই কোনো আদিম কামনা; বরংআছে এক অপার্থিব মায়া আর সুরক্ষার ছোঁয়া। তবে সেই ছোঁয়ায় মিশে ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
আয়াতের গালদুটো খুব আলতো করে ছুঁয়ে গেল সেই হাত, যেন মোমের তৈরি কোনো দামি জিনিস ভাঙার ভয়ে সে একটু বেশিই সতর্ক।আয়াতের অবচেতন মন চাইল চোখ মেলে তাকাতে, কিন্তু ঘুমের আচ্ছন্নতা তাকে গভীর অতলে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কানে এক তপ্ত ফিসফিসানি ভেসে এল, যেন সুদূর কোনো জগত থেকে আসা এক সতর্কবাণী:
”তোমার এই জঘন্য স্বামীটা বড্ড স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে আয়াত। তার নিজেকে সামলানো এখন বড্ড কঠিন হয়ে পড়ছে। নিজের স্বার্থে তোমার সাথে কোনো অন্যায় করে বসলে সেটা কি খুব বড় ক্ষতি হবে? নিজেকে দেওয়া কথা আমি রাখতে পারলাম না আয়াত, তোমার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন আমার সাধ্যের বাইরে। নাউ প্রিপেয়ার ইয়োরসেলফ। ইন ফিউচার, এই মানুষটাকে হ্যান্ডেল করতে তোমার খুব বেশি অসুবিধে হতে পারে। এই মনের ভেতরকার ঝড় সামলানোর জন্য আগে থেকেই সাবধান হওয়া শুরু করো।”
কথাগুলো কানে পৌঁছালেও আয়াতের অসাড় মস্তিষ্কের গহীনে প্রবেশ করতে পারল না। সে শুধু একবার আধবোজা চোখে তাকানোর চেষ্টা করল। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল সামনে কেউ একজন ছায়ার মতো বসে আছে, যার অবয়ব এই অন্ধকারেও এক অদ্ভুত আভিজাত্য ছড়াচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল। সে একটু নড়েচড়ে পাশ ফিরে আবারও অতল ঘুমে তলিয়ে গেল।
সকালে দরজায় তীব্র করাঘাতের শব্দে আয়াতের ঘুম ভাঙল। এলোমেলো চুলে কোনোমতে দরজা খুলতেই দেখল সামনে আরভান দাঁড়িয়ে।
তার পরনে কালো টি-শার্ট আর বাঁ-পাশে ‘অ্যাডিডাস’ লেখা কালো ট্রাউজার। কিন্তু মেজাজটা যেন সকালের আকাশের মতোই গুমোট। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখের মণি শীতল। আয়াতের ঘুম-জড়ানো চোখ আর এলোমেলো চুলের বন্য সৌন্দর্য দেখে আরভান মুহূর্তের জন্য থমকাল, একপলক তাকিয়ে সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
”গেট আপ! এত বেলা করে ঘুমালে বাড়ির কাজ করবে কে? তোমাকে পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখতে এ বাড়িতে আমি আনিনি। ফাইভ মিনিটস সময় দিচ্ছি, রেডি হয়ে তোমার সকল স্টাডি পেপারস আর ভর্তির ফাইল নিয়ে নিচে আমার জন্য ওয়েট করবে। কুইক!”
কথাটা বলেই আরভান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, গটগট করে চলে গেল। আয়াত কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দরজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরভানের কথাগুলো তার মস্তিষ্কে আলোড়ন তুলতে কিছুটা সময় নিল। মুহূর্তেই তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে কি তবে সত্যিই আবার কলেজে যেতে পারবে? এই লোকটা কি সত্যিই অতটা খারাপ যতটা সে নিজেকে দেখায়? নাকি এলিনা চৌধুরীর বলা সেই কথাটাই সত্যি—এই কর্কশ খোলসটা তার ভেতরের কোনো চরম একাকীত্বকে আড়াল করার একটি মাধ্যম মাত্র?
আয়াত দ্রুত ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হতে গিয়ে বেসিনে হাত রাখতেই তার চোখ পড়ল বাঁ-হাতের ওপর।
কালকের সেই ছ্যঁকা লাগার জায়গাটায় কেউ খুব যত্ন নিয়ে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। আয়াতের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে তো মলম লাগায়নি, এমনকি তার হাতে যে ছ্যাঁকা লেগেছে সেটা সে কাউকে বলেওনি। তবে কি ওই বদ লোকটা এসেছিল? না, অসম্ভব! সে তো শুধু ক্ষত দিতে জানে, মলম লাগানো তার ধাতে নেই। তাছাড়া ঘর তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। তাহলে কি রাতের সেই ছায়াটা সত্যি ছিল? এই ব্যাপারটা লোকটাকে একবার জিজ্ঞেস করবে ভাবল, কিন্তু পরক্ষণেই দমে গেল। যদি সে সোজাসুজি অস্বীকার করে, তবে এই অপমানের পাহাড় সে কোথায় লুকাবে? এক অজানা দ্বিধা আয়াতের মনে দোলা দিলেও কলেজের কথা ভেবে সে আর বেশি ভাবল না। দ্রুত রেডি হয়ে সকল কাগজপত্র ফাইলে ভরে নিজের ছোট পার্স ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিচে নামল।
নিচে এসে দেখল আরভান এখনো নামেনি। আয়াতের মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হলো। তাকে পাঁচ মিনিট সময় দিয়ে এই লোক নিজেই দশ মিনিট দেরি করছে! মেয়েদের মতো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সুদর্শন বানানো ছাড়া এই লোকের আর কোনো কাজ নেই।
মনে মনে সে সহস্র গালি দিল আরভানকে। ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে আরভান নেমে এল। আজও তার গায়ে সাদা শার্ট, যার উপরের দুটো বোতাম খোলা। কোমরে বেল্ট দিয়ে আটকানো ফরমাল কালো প্যান্ট, শার্টের স্লিভ দুটো বরাবরের মতো গুটানো। তবে আজকের চুলগুলো খুব একটা পরিপাটি নয়, কিছুটা অগোছালো হয়ে কপালের ওপর আছড়ে পড়ছে। আরভানের এই বন্য আভিজাত্যের মিশেল রূপটা আয়াতের পাঁজরের তলায় এক অসহ্য ধুকপুকানি তুলে দিল। কী এক বিচিত্র যন্ত্রণা! সে যত চায় এই লোকটার থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে, লোকটা যেন ঠিক ততবারই নতুন কোনো রূপে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আয়াতের সব প্রতিরোধ তছনছ করে দেয়।
আয়াতের ধ্যান ভাঙল আরভানের বিদ্রূপাত্মক কথায়,
“ওভাবে হাঁ করে থেকে তোমার মুখের জীবাণু বাতাসে মিশিয়ে নতুন ভাইরাস ছড়াতে চাইছো? তুমি তো দেখছি চীনের থেকেও বেশি ডেঞ্জারাস মিসেস আয়াত।আই নো আই অ্যাম টু হ্যান্ডসাম, বাট ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম।”
আয়াত প্রথমে একটু থতমত খেয়ে গেল। নির্লজ্জের মতো ওভাবে তাকিয়ে থাকায় সে নিজেও খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করছিল। লজ্জায় সে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে পাল্টা জবাব দিল,
“মিস্টার আরভান, আপনি সুদর্শন হতে পারেন কিন্তু আপনার শব্দ চয়ন আর মানসিকতা বড্ড কদর্য। আমি আপনার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাচ্ছিলাম না, বরং ভাবছিলাম স্রষ্টা কেন কিছু মানুষকে চেহারায় আলো দিলেও মনে অন্ধকার পুষে রাখার সুযোগ দেন। আর আমি হাঁ করে ছিলাম না, শুধু আপনার দেওয়া সময় আর আপনার কাজের অমিল দেখে অবাক হচ্ছিলাম।”
আরভান আয়াতের এই তীক্ষ্ণ পালটা জবাবে কোনো পাত্তা দিল না, যেন তার কানে কোনো কথাই প্রবেশ করেনি। সে গটগট করে বাইরের দিকে হাঁটা দিল। দরজার কাছে পৌঁছাতেই আয়াত পেছন থেকে বলে উঠল,
“আপনি কি কাল রাতে আমার রুমে ঢুকেছিলেন?”
আরভান একদম নিদ্বিধায় বলে দিল, “হুম, ঢুকেছিলাম।”
আয়াত চিৎকার করে উঠল, “কিহ! আপনি একটা মেয়ের পারমিশন ছাড়া তার রুমে কীভাবে ঢুকলেন? আপনি তো শুধু জঘন্য নন, সাথে ভীষণ অসভ্যও! তাছাড়া দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল!”
আরভান পেছন ফিরে আয়াতের খুব কাছে এগিয়ে এল। সে একটু ঝুঁকে আয়াতের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আয়াত, তোমার রুমে একটা হিডেন ডোর আছে যা কেবল আমি জানি। এরপর থেকে নিজেকে সাবধানে রেখো, কারণ আমি কখন ঢুকে পড়ে কী দেখে ফেলি তার গ্যারান্টি নেই। তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না।”
কথাগুলো অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বলে আরভান বাইরে চলে গেল। আয়াত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরভানের এই নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি আর রহস্যময় কথায় আয়াতের চোখ দুটো বিস্ময়ে আর রাগে বড় বড় হয়ে উঠল।
বাইরে বেরিয়ে দেখল সেই দানবের মতো কালো ‘রোলস রয়েস ক্যালিনান’ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। আয়াতকে আসতে দেখে ফারহান হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, “কেমন আছো কৃষ্ণনয়নী?”
বলেই অভ্যাসবশত সে হাত মেলানোর জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল গতদিনের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। সেদিন না জেনে হাত বাড়িয়েছিল বলে হাতটা কোনোমতে বেঁচে গিয়েছিল, আজ আর সেই ঝুঁকি নিতে চাইল না। সে আরভানের দিকে আড়চোখে তাকাল। আরভানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন তলোয়ারের মতো বিঁধছে, যা নিঃশব্দে বলে দিচ্ছে, ‘হাত মেলালেই আজ তোর ওই হাত শরীর থেকে আলাদা করে দেব।’ ফারহান ভয়ে ঢোক গিলে দ্রুত হাত নামিয়ে নিজের জুতোর দিকে ঝুঁকে পড়ল। জুতো ঝাড়ার নাটক করতে করতে বলল,
“জুতায় অনেক ময়লা জমেছে, ইস কী ময়লা! হ্যাঁ… আমি তো অনেক ভালো আছি।”
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে আবার বলল, “তো কৃষ্ণনয়নী, নতুন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে যাচ্ছো, কেমন ফিল হচ্ছে?”
ফারহানের কথা মাঝপথেই থমকে গেল আরভানের বজ্রকঠিন কণ্ঠের প্রশ্নে, “কী নাম ধরে ডাকলি ওকে?”
ফারহান প্রমাদ গুনল। আজ যেন আরভানকে আস্ত এক জাঁদরেল স্বামী মনে হচ্ছে। ফারহানের মনে মনে হাসি পেল। সেদিন নিজের স্ত্রীকে ডেইজির ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বানিয়ে পরিচয় দিচ্ছিল আর আজ বউয়ের নাম ধরে ডাকলেও তার সহ্য হচ্ছে না! মানুষটা সত্যিই বিচিত্র। ফারহান আমতা আমতা করে বলল, “বনু বলেছি এভি, বনু! আয়াত তো আমার বোনের মতো, তাই না আয়াত?”
আরভান কোনো কথা বলল না। একটা শীতল এবং গম্ভীর চাউনি দিয়ে সে সজোরে গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ল। আয়াত থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। এই দেশে আসার পর থেকে এই লোকটা এমন অদ্ভুত ও রক্ষণশীল আচরণ কেন করছে, তা তার বোধগম্য হলো না।
****
গাড়ি চলছে মেলবোর্নের মসৃণ হাইওয়ে দিয়ে। আরভান নিবিষ্ট মনে স্টিয়ারিং ধরে থাকলেও তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছে ড্যাশবোর্ডের লুকিং গ্লাসে। সেখানে পেছনের সিটে বসা আয়াতের প্রতিচ্ছবি ভাসছে। আয়াত জানলার কাঁচের ওপাশে দ্রুতবেগে পিছিয়ে যাওয়া বিদেশের অচেনা পরিবেশ দেখছে। তার মনে এক অদ্ভুত হাহাকার; এই শহরটা সুন্দর, কিন্তু বড্ড বেশি পর। তার খুব ইচ্ছা করছে জানলার কাঁচটা নামিয়ে একটু খোলা হাওয়া গায়ে মাখতে, কিন্তু সামনের চালকের আসনে বসা মানুষটার রক্তচক্ষু তাকে সেই সাহস দিচ্ছে না।
ফারহান নীরবতা ভেঙে বলল, “আয়াত, তোমার তো দেখছি আইইএলটিএস (IELTS) করা আছে, স্কোরও বেশ ভালো।”
আয়াত নিচু স্বরে জবাব দিল, “হুম, দাদাজান জোর করে করিয়েছিলেন। ”
ফারহান অবাক হয়ে বলল, “তোমার দাদাজান কি কোনো গণক ছিলেন নাকি? সে কীভাবে জানলো তুমি ফিউচারে অস্ট্রেলিয়া আসবে? তার দূরদর্শিতা তো জবরদস্ত!”
আয়াত কোনো কথা বলল না। এই প্রশ্ন তার মাথায়ও ঘুরপাক খাচ্ছে। তার পাসপোর্ট থেকে শুরু করে সবকিছু দাদাজান অনেক আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছিলেন, যেন তিনি জানতেন আরভান একদিন তাকে এই প্রবাসেই টেনে আনবে।
হঠাৎ করেই আরভান ড্যাশবোর্ডের একটি সুইচ টিপতেই আয়াতের পাশের কাঁচটি নিচে নেমে গেল। আয়াত চমকে সামনে তাকাতেই লুকিং গ্লাসে দুজনের চোখাচোখি হলো। আরভানের সেই গভীর, রহস্যময় চোখের দৃষ্টিতে কী যেন এক আদিম দাবি ছিল, যা আয়াতকে মুহূর্তেই অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে দ্রুত নজর সরিয়ে নিল।কিন্তু আরভান যেন নাছোড়বান্দা; সে এক পলকও দৃষ্টি সরাল না।
পাশে বসা ফারহান এই নীরব যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে ঘামছিল। সে ভয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল,
“ব্রো, আমার বয়স সবে মাত্র ঊনত্রিশ। এখনো একটা বউয়ের মুখ দেখা হয়নি আমার। প্লিজ, তুই সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালা নাহলে আমি আর তুই দুজনেই আজরাইলের সাথে মিট করব। তোর বউ তো পেছনেই আছে, বাসায় গিয়ে সারাদিন দেখিস, এখন দয়া করে সামনের রাস্তার দিকে তাকা। না হলে স্টিয়ারিং আমাকে দে!”
আরভান ভ্রু কুঁচকে একবার ফারহানের দিকে এমনভাবে তাকালো যেন ফারহান এখনই ভস্ম হয়ে যাবে। সে কোনো জবাব না দিয়ে আবারও সামনে তাকিয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।
গাড়ি এসে থামল মেলবোর্নের বিখ্যাত ‘মোনাশ ইউনিভার্সিটি’-এর বিশাল ক্যাম্পাসে। চারিদিকে সুউচ্চ ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের দালান আর সবুজ লন। শত শত শিক্ষার্থী ব্যস্ত পায়ে এদিক সেদিক ঘুরছে। আয়াতের চোখে এই বিশালতা দেখে ভয় আর বিস্ময় দুটোই জেগে উঠল। গাড়ি থেকে আরভান নামতেই যেন পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গেল। ক্যাম্পাসের মেয়েরা হাঁ করে আরভানের দিকে তাকিয়ে আছে।আয়াত পাশে আরভানকে দেখে বুঝতে আর বাকি রইল না তারা কেন তাকিয়ে আছে।
আয়াতের মনে এক অজানা অস্বস্তি দানা বাঁধল। কেন সবাই এই পাষাণ লোকটার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে? নিশ্চয়ই তারা জানে না এই লোকটা কতটা নির্দয়! তবে তার প্রচণ্ড ইচ্ছা করল আরভানের ওই পরিপাটি অথচ সামান্য অগোছালো চুলগুলো আরও বেশি এলোমেলো করে দিতে, ইস্ত্রি করা সাদা শার্টটা দুমড়ে-মুচড়ে দিতে, এমনকি সম্ভব হলে মুখে খানিকটা কালি মেখে দিতে—যাতে আর কেউ ওর দিকে তাকাতে না চায়। আয়াত নিজের এই অদ্ভুত ভাবনায় নিজেই অবাক হয়ে গেল। কী সব আবোলতাবোল ভাবছে সে!
আরভান পেছনে ফিরে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “কোন ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট ছিলে তুমি?”
আয়াত একটু ঘাবড়ে গিয়ে নরম গলায় বলল, “ল’ (Law) এর।”
আরভান আর কোনো কথা না বলে তাকে নিয়ে অ্যাডমিশন অফিসের দিকে এগিয়ে গেল। আরভানের উপস্থিতিতে কাজটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেল। অফিস থেকে বের হতেই আরভানের ফোনে একটি জরুরি কল এল। সে ইশারায় ফারহানকে আয়াতকে নিয়ে একটু এগিয়ে যেতে বলে পেছনে রয়ে গেল।
ফারহান আর আয়াত যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছে, হঠাৎ পাশ থেকে একজন লম্বা এবং অত্যন্ত সুদর্শন অস্ট্রেলিয়ান যুবক ফারহানকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার নাম অ্যালান। সে এগিয়ে এসে বলল, “ফারহান! হোয়াট আর ইউ ডুইং হিয়ার?”
ফারহান অ্যালানকে দেখে কিছুটা চমকে গিয়ে বলল, “অ্যালান! তুই এখানে কী করিস?”
অ্যালান আয়াতের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমি এখানকার একজন লেকচারার।বাট তুই এখানে কি করছিস এন্ড হু ইজ শি?”
ফারহান দ্বিধায় পড়ে গেল। আরভানের স্ত্রী বললে যদি আরভান রেগে যায়? আবার অন্য কিছু বলাও বিপজ্জনক। সে আমতা আমতা করে বলল, “শি ইজ এভি’স ওয়াইফ—আয়াত। এখানে ল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে।”!”
অ্যালান আয়াতের দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হলো, তারপর হেসে বলল,
“নাইস টু মিট ইউ, লিটল সিস্টার আয়াত। আই অ্যাম দ্য লেকচারার অফ ল ডিপার্টমেন্ট। হোপ টু সি ইউ ইন মাই ক্লাস।”
আয়াত সৌজন্যমূলকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “ইয়া, সিওর।”
কথার মাঝেই অ্যালান একটু বিষণ্ণ স্বরে ফারহানকে উদ্দেশ্য করে নিচু স্বরে বলল, “এভির কী খবর? ও কি এখনো আমাকে ভুল বুঝে আছে? ওকে বাঁচানোর জন্যই আমি সেদিন ওই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম।”
ফারহান আতঙ্কে আশেপাশে তাকালো। অ্যালান ফারহানের ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখে সব বুঝতে পারল, তাই কথা না বাড়িয়ে ফরমালিটি বজায় রেখে হাত বাড়িয়ে বলল, “ওয়েলকাম টু দ্য ইউনিভার্সিটি, আয়াত।”
আয়াত হাত মেলাতে যাবে, ঠিক তখনই আরভান এসে বাজপাখির মতো আয়াতের নরম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। তার চোখের সাদা অংশ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে অ্যালানের দিকে তাকিয়ে হিমশীতল গলায় বলল,
“কারো ব্যক্তিগত জীবনের দিকে নজর দেওয়ার আগে নিজের সীমা মনে রাখা উচিত অ্যালান। বিশেষ করে যখন তুমি জানো আমি ঘৃণাটা কত যত্ন করে পুষে রাখি।”
আর কোনো কথা না বলে সে আয়াতের হাত ধরে হিড়হিড় করে সামনে টানতে শুরু করল। আয়াত যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে বলল,
“আমি হাতে ব্যথা পাচ্ছি! হাত ছাড়ুন! সবসময় অসভ্যতা না করলে কি আপনার পেটের ভাত হজম হয় না?”
আরভান তাকে সোজা গাড়িতে তুলে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল। ড্রাইভিং সিটে বসে ফারহানকে কল দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ওখানে ওই ফ্রড অ্যালানের সাথে আর এক মিনিটও দাঁড়াবি না। সোজা অফিসে যা।”
পুরো রাস্তায় আরভান একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। গাড়িটা অবশেষে বাড়ির সামনে বিকট শব্দে ব্রেক কষল। আয়াত কোনো কথা না বলে দ্রুত নেমে পড়ল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই আরভানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল,”তোমার ওই ভার্সিটিতে ভর্তি ক্যানসেল। আমি অন্য কোনো ভার্সিটিতে এডমিশন করিয়ে দেব।”
আয়াত প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে আরভানের দিকে ফিরে তাকালো।
“কিন্তু আমি ওই ভার্সিটিতেই পড়ব মিস্টার আরভান। আপনার কথায় আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না। আপনার যখন তখন অধিকার খাটানোটা আমি মেনে নেব না।”
আরভান এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আয়াত, তুমি আমার ওপর জেদ দেখাচ্ছো। আমি বলেছি তুমি ওখানে পড়বে না, দ্যাটস ইট।”
“আমি বলেছি মানে আমি ওখানেই পড়ব, না হলে পড়বই না। ওই অ্যালান সাহেবের সাথে আপনার পুরনো কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকতেই পারে, সেটা আমার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। ”
আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল “আয়াত, তুমি আমার অবাধ্য হচ্ছ। তোমার কোনো আইডিয়া নেই যে আমার অবাধ্য হওয়ার ফল কী হতে পারে।”
আয়াত জেদ ধরে বলল, “কী করবেন? বড়জোর বাড়ি থেকে বের করে দেবেন? দিন বের করে! আমি তো সেটাই চাই!”
আরভান এবার কোনো প্রতিউত্তর করল না। সে শুধু অদ্ভুতভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে এক রহস্যময় হাসি দিল। তারপর প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিস দিতে দিতে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল। আয়াত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওই শয়তানি হাসির মানে কী? লোকটা এমন করে হাসল কেন? তার মাথায় এখন কী নিষ্ঠুর পরিকল্পনা চলছে?…
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….

