#পর্ব_৯
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘Av ইন্টেল’ কোম্পানির প্রধান কার্যালয়। মিটিং রুমটি তখন এক থমথমে নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। কাঁচের দেয়াল ভেদ করে দুপুরের নিস্তেজ রোদ এসে পড়েছে বিশাল ওক কাঠের টেবিলটার ওপর। আরভান তার দামী লেদার চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে নিবিষ্ট মনে কতগুলো ফাইল উল্টেপাল্টে দেখছে এবং ফারহান সামনে প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রেজেন্টেশন পরিচালনা করছে।
প্রতিদিনের মতো আজও আরভান ফরমাল কালো শার্ট পরেছে, যার স্লিভ দুটো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। বাঁ হাতের কবজিতে ঝকঝক করছে ‘রোল্যাক্স ডেটোনা’র কালো রঙের ঘড়িটি। তার তীক্ষ্ণ নাক, হালকা ট্রিম করা স্টাবল বিয়ার্ড এবং কুঁচকে থাকা কালো ভ্রু জোড়া আর চোয়ালের কঠোর ভাঁজ বলে দিচ্ছে। এই মুহুত্বে তার সামনে কথা বলা মানেই আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা।
তার ঠিক ডান পাশের সারিতে ‘ব্লু-স্টোন টেক’ কোম্পানির প্রতিনিধিরা বসে আছে। তাদের প্রত্যেকের মুখে আতঙ্কের ছাপ, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। যেন আরভানের এই উপস্থিতি এক অদৃশ্য শীতল স্রোত ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো কক্ষে। আরভানের ঠিক ডানেপাশে বসা আধুনিক সজ্জায় সজ্জিত এক সুন্দরী তরুণী, নাম তার ইসাবেলা। সে ‘ব্লু-স্টোন টেক কোম্পানির পিএ-। কিন্তু এই মুহূর্তে সে ফাইল বা প্রেজেন্টেশনের দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। তৃষ্ণার্ত চোখে ঠোঁট কামড়ে ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আরভানের দিকে। আরভানের ওই গম্ভীর চেহারা আর পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব ইসাবেলাকে যেন এক অজানা ঘোরে ফেলে দিচ্ছে। এমন আকর্ষণীয় পুরুষ এর আগে সে কখনো দেখেনি। মিটিংয়ে আসার আগেই নিজের অফিসের মেয়েদের ফিসফাসে ভরা প্রশংসা শুনেছে—কেউ বলেছে সে বরফের মতো ঠান্ডা, কেউ বলেছে আগুনের মতো ভয়ংকর, আবার কেউ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, ‘হি ইজ আনরিয়েল।’ তখন এসবকে অতিরঞ্জন মনে হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে—সবই ছিল ভয়ংকরভাবে সত্য। ইসাবেলা মনে মনে ভাবছে, যদি একবার তার সামনের এই সুদর্শন যুবকটার ওই স্টাবল বিয়ার্ডে হাত রাখা যেত!
আরভান ঠিকই বুঝতে পারছিল, তার পাশের নারীটি মুগ্ধতা আর কামনার মিশ্র চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এটা তার কাছে নতুন কিছু নয়। অভ্যস্ত বলেই সে সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করলো না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভীষন বিরক্ত। অদ্ভুত এক অস্থিরতা তার বুকের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মন বারবার কেন যেন বাড়িতে ফেলে আসা ওই ছোট্ট মুখটাকে খুঁজছে? এমন অস্থিরতা তো সচরাচর তার হয় না।
তখনি হঠাৎ উপস্থিত প্রতিনিধিদের একজনের ফোন বেজে উঠল। এই সামান্য শব্দটিও আরভানের মেজাজের পারদ এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দিল। সে লোকটির দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকাল। লোকটা দ্রুত ফোনটা কেটে দিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আই এম সরি স্যার।”
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ফোনটা আবারও বেজে উঠল। আরভানের মেজাজ সকাল থেকেই তুঙ্গে। এমনিতেই বাড়িতে এক জেদি আপদ রেখে এসেছে, যার চিন্তায় সে কাজে মন দিতে পারছে না। সে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল এমনভাবে, যেন দৃষ্টি দিয়েই তাকে ভস্মীভূত করে ফেলবে। আরভান তো কোনো মানবহিতৈষী নয় যে ভুল বারবার ক্ষমা করবে।
আরভান ফারহানকে উদ্দেশ্য করে শীতল গলায় বলল,
“ফারহান, ক্যানসেল দিস মিটিং। ক্যানসেল দ্য ডিল টু। অন্য ক্লায়েন্টকে এক ঘন্টার মধ্যে প্রেজেন্টেশন দিতে বল, না হলে সেটাও ক্যানসেল।”
সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রস্থানের আগে ইসাবেলার দিকে ফিরে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আই থিঙ্ক ইউ শুড ফোকাস অন ইওর ক্যারিয়ার মোর দ্যান মাই ফেস, মিস ইসাবেলা। অতিরিক্ত উজ্জ্বল জিনিসের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা চোখের জন্য ক্ষতিকর। টেক কেয়ার।”
ইসাবেলা অপমানে আর বিস্ময়ে স্থবির হয়ে বসে রইল। আরভান গটগট করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে আসতেই তার চোখ পড়ল ওয়েটিং এরিয়াতে বসা এক ব্যক্তির ওপর। আরশাদ চৌধুরী। নিজের বাবাকে দেখে আরভানের জমানো রাগটুকু যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো ফুটতে লাগল।
আরভান নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়াল। তার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্রোধ বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সে সত্যিই বুঝতে পারে না, এই লোকটা কোন অধিকারে আজও তার কাছে জবাবদিহি চায়? আরশাদ চৌধুরী – যিনি কেবল জন্মসূত্রে পিতা, কিন্তু কর্মে একজন একজন ধূর্ত ও নীতিহীন ব্যবসায়ী। এই লোক নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরিবারকেও দাবার ঘুঁটি বানাতে দ্বিধা করেন না। কিছুদিন আগে এই লোকই তাকে ব্ল্যাকমেইল করে দেশে পাঠিয়েছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে আজ আয়াতের মতো এক নিষ্পাপ মেয়ের জীবন এক অনিশ্চিত আর অন্ধকার ভবিষ্যতের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে।
আরভান নিজের কেবিনে ঢুকতেই আরশাদ চৌধুরী পেছন থেকে ঝড়ের বেগে ঢুকলেন। দরজাটা সজোরে আটকে তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন,
“তুমি কি আমার সাথে এখন গেম খেলা শিখছ আরভান?”
আরভান নির্বিকার চিত্তে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল। কোনো রকম উত্তেজনা ছাড়াই বলল,
“আপনার কাছেই তো শেখা মিস্টার চৌধুরী। তবে আমি আপনার মতো নোংরা গেম খেলি না।”
আরশাদ চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“তোমাকে কতবার বোঝালাম, একটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট করো না। তুমি যখন নিজেই বাঁচতে চাও না, তখন একটা মেয়ের ভবিষ্যৎ তোমার নামের সাথে জড়িয়ে রেখে লাভ কী? তাকে মুক্তি দাও। তোমার জন্য ওই মেয়েকে সারাজীবন বৈধব্যের আগুনে পুড়তে হবে। তুমি তখন আমার সব শর্ত মেনে নিয়েছিলে, অথচ ডিভোর্স দেওয়া তো দূরের কথা, ওই মেয়েকে সাথে করেই নিয়ে আসলে! এমনকি জেসিকাকে একা বাংলাদেশে ফেলে এসেছ। তুমি আমাকে কথা দিয়ে ডিল ব্রেক করেছ আরভান!”
আরভান অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল,
“ভুল বলছেন মিস্টার চৌধুরী। আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি বাংলাদেশে যাব, কিন্তু ডিভোর্স দেব এমন কোনো লিখিত বা মৌখিক প্রতিশ্রুতি আমি দেইনি। আর জেসিকাকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার কথা হয়েছিল, কিন্তু তাকে সাথে করে নিয়ে আসব এমন কোনো ‘ডিল’ আপনার সাথে আমার হয়নি। সো, টেকনিক্যালি, আই হ্যাভ নট ব্রোকেন মাই ডিল।”
আরশাদ চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ছেলের এই যুক্তিপূর্ণ তর্কের সামনে তিনি ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেন। পরক্ষণেই তিনি কুটিল হাসলেন।
“আমার সাথে শব্দের কারসাজি করছ? ভুলে যেও না, তোমার ওপর যে ‘ট্রাভেল ব্যান’ ছিল, তা আমি তুলে নিয়েছিলাম বলেই তুমি দেশের বাইরে পা রাখতে পেরেছিলে। যেখানে আইনি জটিলতায় ৫-৭ বছর লাগত, সেখানে মাত্র কয়েক দিনেই আমি সব ক্লিয়ার করেছিলাম শুধু আমার পাওয়ার ব্যবহার করে। এসব না হয় বাদ দিলাম, তুমি আমার সাথে কত বড় বেইমানি করেছ জানো? তুমি বলেছিলে বর্ডার পার করার সময় আমার পার্সেলগুলো সাবধানে পাঠাতে সাহায্য করবে। কিন্তু আমার ক্লায়েন্টরা এখন রিক্ত হস্ত! কী করেছ তুমি ওগুলোর সাথে?”
আরভান শান্তভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সেগুলোর কথা ভুলে যাওয়াটাই আপনার জন্য মঙ্গলজনক।কারন আপনার সেই পার্সেলগুলোতে নিষিদ্ধ পণ্য পাওয়া গেছে। সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করুন যে আপনি এখনো জেলের বাইরে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছেন।”
আরশাদ চৌধুরী বিদ্রূপের হাসি হাসলেন।
“আমাকে নৈতিকতার পাঠ দিচ্ছ? তুমি তো নিজেই বেশিদিন বাঁচতে চাও না, তাহলে নৈতিক আর অনৈতিক বিচার করে তোমার লাভ কী? মরার আগে একটু বৈষয়িক হও।”
আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে বাঁকা হেসে বলল,
“আমি ঠিক কবে মরব জানি না, তবে কেন জানি মনে হচ্ছে আমার টিকিট কনফার্ম হওয়ার আগেই আপনার ওপারে যাওয়ার টিকিট কাটা হয়ে যাবে।”
আরশাদ চৌধুরী রাগে কাঁপতে কাঁপতে হো হো করে হেসে উঠলেন।
“তাই নাকি, নিজেকে দেখছি জ্যোতিষী ভাবতে শুরু করেছো। বাবার সাথে বেইমানি করছো, আর বড় বড় কথা বলছো? ভুলে যেও না, আরভান— তোমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এই আরশাদ চৌধুরীর রক্ত বইছে। তোমার ওই দুর্বল হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে আমার হাতে বের করে দিলেও আমার রক্তের ঋণ শোধ করার মুরোদ তোমার এই জন্মে হবে না।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরভান ড্রয়ার থেকে একটা ধারালো ছুরিটা বের করল। আরশাদ চৌধুরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরভান সজোরে নিজের বাঁ হাতের কবজির ওপর এক দীর্ঘ পোঁচ দিল। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত বেরিয়ে এল।
আরভান সেই রক্তাক্ত হাতটা আরশাদ চৌধুরীর সামনে ধরল। তারপর অত্যন্ত ঘৃণার সাথে তার দামী সাদা শার্টে নিজের রক্ত মাখিয়ে দিতে দিতে বলল,
”রক্তের দাম? এই নিন আপনার নোংরা রক্ত! চিন্তা করুন আপনার রক্ত কতটা বিষাক্ত যে আমি নিজের শরীর থেকে তা বের করে দিতে এক মুহূর্ত ভাবি না। এই রক্ত ঝরতে ঝরতে শরীরটা শূন্য হয়ে যাক, তবুও ভালো। কিন্তু আপনার অংশ আমার শরীরে বইছে ভাবলেই আমি নিজের প্রতি চরম ঘৃণা অনুভব করি। এমনকি এই অস্তিত্বকেও আমি অস্বীকার করি!”
আরভান আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে চায় না তার ব্যক্তিগত জীবনের এই কদর্য দিকগুলো তার স্টাফদের সামনে আসুক, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তার জীবনের তিক্ততা বারবার জনসমক্ষে চলে আসে। সে গটগট করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছনে আরশাদ চৌধুরী রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ডেস্কে রাখা দামি কম্পিউটার মনিটরটা সজোরে আছাড় মারলেন।
*****
আরভানের মেলবোর্নের সেই আলিশান বাড়িতে আয়াত এক অন্যরকম মানসিক অস্থিরতায় দিন পার করছে। সকাল থেকে সে অন্তত দশবার চেষ্টা করেছে ডেইজির কাছ থেকে নিস্তার পেয়ে বাড়ির বাইরে যাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পেতে। কিন্তু ডেইজি তাকে আগলে রাখা তো দূরের কথা, নিজের ব্যক্তিগত কাজটুকুও করতে দিচ্ছে না। এমনকি আয়াত যখন নিজের খাবারটা নিজে তৈরি করার জন্য রান্নাঘরের ছুরিটা নিতে চায়, ডেইজি আলতো করে সেটা সরিয়ে নিয়ে বলে,
“ইউ আর জাস্ট লাইক আ ডল—সো স্মল, সো কিউট, মেড টু বি অ্যাডোর্ড। হু মেকস আ ডল ওয়ার্ক? জাস্ট সিট অ্যান্ড রিল্যাক্স।”
আয়াত গজগজ করে বলল, “ডল মানে তো পুতুল! আমি কি সাজানো পুতুল হয়ে বসে থাকব নাকি? আমায় নিজের কাজটুকু করতে দিন, নয়তো দয়া করে দরজাটা খুলে দিন।
ডেইজি কোনো কথা না বলে কেবল মুচকি হাসল। তার সেই রহস্যময় হাসি দেখে আয়াত বুঝতে পারল না সে আয়াতের ভাষা বুঝতে পারছে না নাকি আরভানের কড়া নির্দেশ পালন করছে। আয়াত ডেইজিকে রাগিয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করল, যাতে সে বিরক্ত হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সে রান্নাঘরের গুছিয়ে রাখা জিনিস অগোছালো করল, পানির গ্লাস উল্টে দিল। কিন্তু এই নারীর ধৈর্যের সীমা যেন আকাশচুম্বী। সে প্রতিবারই মিষ্টি হেসে পরম মমতায় আবার সবকিছু পরিষ্কার করে ফেলে। এই দেশের মানুষগুলো কি আসলেই এত শান্ত নাকি এটা ডেইজির বিশেষ কোনো গুণ, তা আয়াতের কাছে বোধগম্য হলো না।
এদিকে সে ডেইজির অনেক কথাই ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। গ্রামের সরকারি কলেজে পড়া আয়াত যতটুকু ইংরেজি জানে, তাতে ডেইজির অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণের সব কথা সূক্ষ্মভাবে বোঝা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে অনার্সের প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে পরীক্ষাটাই দেওয়া হয়নি। পড়াশোনাটা আর কোনোদিন হবে কি না, তা নিয়ে তার মনে এক গভীর সংশয় আর হাহাকার কাজ করছে। আয়াতের ভীষণ রাগ হচ্ছে। এভাবে খাঁচাবন্দি জীবন সে কখনো কাটায়নি। মেইন দরজার কাছে গিয়ে সে বারবার ফিরে আসছে। ওখানে ডিজিটাল লক, ফিঙ্গারপ্রিন্ট কিংবা পাসওয়ার্ড ছাড়া দরজা খোলা অসম্ভব।
ডেইজিকে সে অনেক অনুনয় করেছে তাকে একবার বাইরে নিয়ে যেতে, কিন্তু ডেইজি বারবারই বলেছে সে নিজেও পাসওয়ার্ড জানে না। এটা আয়াতের কাছে মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। ডেইজি এখানে কাজ করে অথচ সে দরজা খোলার পাসওয়ার্ড জানবে না তা কী করে হয়? নিশ্চয়ই ওই ‘খ্যাকশিয়াল মার্কা’ লোকটার চাল এটি। ওই বদ লোকটা নিশ্চয়ই বলে রেখেছে তাকে বন্দি করে রাখতে।
নিরুপায় হয়ে সে পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখল। আলিশান অন্দরসজ্জা, মার্বেল পাথরের মেঝে আর বহুমূল্য সব আসবাবপত্র। তার থাকার ঘরের ঠিক উল্টো দিকে কোণের রুমটার দিকে আয়াতের চোখ পড়ল। অথচ রুমটা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। আয়াতের ভীষণ কৌতূহল হলো—ওই লোকটার রুমে এমন কী আছে যার জন্য তালা মেরে যেতে হবে? লোকটা নিশ্চয়ই আয়াতের পাসপোর্ট ওখানে লুকিয়ে রেখেছে যাতে সে পালাতে না পারে। শত রকমের শঙ্কা আর কৌতুহল তার মনে ভিড় করতে লাগল।
বিরক্ত হয়ে সে গোসলটা সেরে নিয়ে টেরেসে উঠে গেল। তার কাছে বিদেশ মানে ছিল বড় বড় দালান আর ব্যস্ততা। কিন্তু এ বাড়িটা একদম নিরিবিলি জায়গায়। আশেপাশে কোনো ঘরবাড়ি নেই। টেরেসে দাঁড়াতেই স্নিগ্ধ বাতাসে তার লম্বা সদ্য স্নান করা ভেজা চুলগুলো মুক্ত হয়ে উড়তে শুরু করল। সে ওড়নাটা দু-হাত আড়াআড়ি রেখে বুকের ওপর জাপ্টে ধরে চারপাশে চোখ বুলালো। সামনের দৃশ্যটা এক কথায় নয়নাভিরাম। পাশে নীল পানির একটি বিশাল সুইমিং পুল, তার স্বচ্ছ পানি বাতাসে মৃদু ঢেউয়ের রেখা এঁকে দিচ্ছে। শেষ বিকেলের আলো তার মুখে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই একটি বিকট শব্দে আয়াতের ধ্যান ভাঙল। বাড়ির মেইন গেট দিয়ে রাজকীয়ভাবে প্রবেশ করল একটি কালো ‘রোলস রয়েস ক্যালিনান’। গাড়িটা থামার একটু পরে গাড়ি থেকে নেমে এল আরভান। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে, কপালে এসে পড়ছে সিল্কি চুলের গোছা। আয়াত ছাদ থেকে মোহবিষ্ট হয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। মানুষটা মানুষ হিসেবে যতটা নিষ্ঠুর, দেখতে ততটাই মোহনীয়। আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবল—এই সুন্দর চেহারাটার মতো তার চরিত্র আর মনটাও যদি সুন্দর হতো, তবে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত? নাকি পুরো পৃথিবী ঘূর্ণিপাক বন্ধ হয়ে যেত?স্রষ্টা কি তাকে নিখুঁত রূপ দিয়ে কেবল একটি পাথুরে হৃদয়ের অধিকারী করে পাঠিয়েছেন?
আরভান দরজার দিকে এগোতেই আয়াতের হুঁশ ফিরল। সে ভাবল, এটাই সুযোগ। আরভান যখন ভেতরে ঢুকবে, সেই ফাঁকে সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তারপর আর কোনোদিন এই মায়াবী অথচ বিষাক্ত লোকটার মুখোমুখি হবে না। সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই আরভানের চোখ মুহূর্তে সরু হয়ে গেল।
আয়াত দরজার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। পালানোর তীব্র বাসনা থাকলেও তার পা দুটো যেন বেইমানি শুরু করল। আরভানের তীব্র উপস্থিতিতে সে এক পা-ও নড়তে পারল না। । সে বুঝতে পারে না, এই লোকটাকে দেখলেই তার শরীরের স্নায়ুগুলো কেন এভাবে অবশ হয়ে যায়। আয়াত অস্বস্তি লুকাতে কিচেনের দিকে তাকাল। ওখান থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না। সে মনে মনে চাইছে এখনই ডেইজি আসুক আর এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে তাকে বাঁচাক।
আরভান তার রক্তাক্ত হাতটা শার্টের হাতার নিচে আড়াল করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “হোয়াই স্ট্যান্ডিং হেয়ার লাইক আ স্টুপিড?”
আয়াত ঢোক গিলে মিথ্যে করে বলল, “ডেইজি… ডেইজি বলেছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে।”
”কোথায় ডেইজি?”
আয়াত আমতা আমতা করে জবাব দিল।
”রান্না করছে,”
আরভান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে এক কদম এগিয়ে এল। ডান হাত দিয়ে নিজের শার্টের ওপরের বোতামগুলো আলগা করতে করতে সে বলল,
“বাট ডেইজি তো চলে গেছে আয়াত। সে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসে এবং কাজ শেষ হলে বিদায় নেয়। শি ইজ গন ফর দ্য ডে।”
আয়াত এক অজানা আশঙ্কায় সিঁটিয়ে গিয়ে বলল,
“কী! চলে গেছে মানে? তা… তাহলে এই বাড়িতে এখন …”
আরভান ধীরলয়ে আয়াতের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“ইয়েস। শাহরিয়ারের ‘জানপাখি’, নাউ ইন দিস হাউস ইটস অনলি ইউ অ্যান্ড মি।”
নামটা শুনেই যেন আয়াতের পিত্তি জ্বলে উঠল। সে রাগে চেঁচিয়ে বলল,
“দেখুন, আমাকে ওই সব আজেবাজে নামে ডাকবেন না। এর পরেও যদি আমাকে ওই নামে ডাকেন, তবে আমিও আপনাকে পালটা এমন নামে ডাকব যে আপনি সহ্য করতে পারবেন না!”
আরভান ভ্রু কুঁচকে একটু কৌতূহলী হওয়ার ভান করল।
“ওহ্ রিয়ালি? তা কী নামে ডাকবে আমায়?”
আয়াত ঝট করে বলে ফেলল।
”বেবি!”
আয়াতের মুখ থেকে শব্দটা বেরোতেই আরভানের ঠোঁটে এক দুষ্টু ও মোহনীয় হাসি ফুটে উঠল। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“ইয়েস বেবি?”
আয়াত এবার চরম থতমত খেয়ে গেল। নিজের বোকামিতে সে নিজেই কুঁকড়ে গিয়ে বলল,
“আমি… আমি জেসিকার কথা বুঝিয়েছি। ও আপনাকে যেভাবে ডাকে সেটা বলেছি! আপনাকে ডাকার জন্য বলিনি!”
আরভান এবার মোটেও বিচলিত হলো না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে বেবি। অ্যাজ ইউ উইশ।”
”দেখুন! ”
আরভান ঠান্ডা হেসে এক ধাপ আরও কাছে এসে বলল,
“দেখতেই তো চাইছি আয়াত, সীমার বাইরে গেলে তুমি ঠিক কী করতে পারো। দেখাও ”
”কা… কাছে আসবেন না একদম! কাছে আসলে কিন্তু আমি—”
আয়াতের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক চরম উত্তেজনার মুহূর্তে সে সজোরে আরভানের গালে একটি চড় বসিয়ে দিল। চড়ের শব্দে লিভিং রুমের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। আরভানের চোখে তখন রাগের চেয়ে এক ধরণের নেশালো আভা বেশি স্পষ্ট। সে বিদ্যুৎগতিতে তার ওদুই হাত দিয়ে আয়াতের দু-পাশে দেয়াল চেপে ধরল। সে আয়াতের এত কাছে যে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ছে। আরভান নেশালো কণ্ঠে, হুকুমের সুরে বলল,
“এত সাহস কোথায় পাও আয়াত? এখন এই চড়ের শোধ যদি আমি অন্যভাবে নেই, সামলাতে পারবে তো?”
আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের মুখে আছড়ে পড়ছে। আয়াতের নারীসত্তা কেঁপে উঠল এক অজানা শিহরণে। আরভানের চোখ দুটো গভীর অন্ধকার সমুদ্রের মতো নেশালো হয়ে উঠছে। এই ছোট মেয়েটা, যে তার কাঁধ সমানও হবে না, সে কেন তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে? আরভানের বুকের বাঁ-পাশে এক অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। সারাদিনের সেই বিষাক্ত ক্লান্তি এবং আরশাদ চৌধুরির সাথে কাটানো সেই বীভৎস মুহূর্তগুলোর পর আয়াতের এই অবুঝ উপস্থিতি যেন তার ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে প্রশান্তি দিচ্ছে। পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসা মানুষটার কেন যেন মনে হলো, এই এক চিলতে মায়ার আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দেওয়া খুব একটা ভুল হবে না।আরভান এক ঘোরের মাঝে আয়াতের ঠোঁটের দিকে আগাতে শুরু করলো।
ঠিক তখনই আরভানের ফোনটা সজোরে বেজে উঠল। মোহভঙ্গ হলো তার। সে ঝট করে আয়াতের কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। চোখের সেই নেশালো ভাবটা মুছে ফেলে শীতল গলায় বলল,
“আমার জন্য এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে আনো। উইদাউট সুগার।”
আয়াত নিজের কম্পিত স্বর লুকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল।
”আমি কেন আপনার জন্য কফি বানাবো?”
“আদেশ নয় আয়াত, অনুরোধ করছি। আজ শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না।”
বলেই সে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আয়াত হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটার শেষ কথাটায় কী যেন এক অসহায়ত্ব ছিল। আয়াতের হৃৎপিণ্ড এখনো পাগলের মতো লাফাচ্ছে। সে তো চাইলে আরভানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পারত, কিন্তু কেন পারল না? শাহরিয়ার তাকে ছুঁতে আসলে তার প্রচণ্ড ঘৃণা হতো, কিন্তু আরভানের এই সান্নিধ্যে ঘৃণা নয় বরং এক অবশ করা টান অনুভব করছে সে। এই ভাবনার মাঝেই তার হুঁশ ফিরল। কফি! সে তো কফি বানাতেই জানে না। তবে পরক্ষণেই তার মাথায় এক শয়তানি বুদ্ধি এল। জানে না যখন, তখন এমন কফি বানাবে যা খেয়ে ওই লোকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়! এই তিতকুটে কফিই হবে আজ তাকে দেওয়া যন্ত্রণার এক মোক্ষম জবাব।
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে
#পর্ব_১০
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
আয়াত রান্নাঘরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে রাখা অত্যাধুনিক কফি মেকার, গ্রাইন্ডার আর বিচিত্র সব ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। কিন্তু এগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে জানে না। আজ সকালে ডেইজিকে এসব দিয়েই কাজ করতে দেখেছিল ঠিকই, কিন্তু তখন পালানোর চিন্তায় আয়াত এতটাই বিভোর ছিল যে যন্ত্রগুলোর কারিকুরি খেয়াল করার অবকাশ পায়নি সে। সে মোটেও আরভানের কোনো আদেশ পালন করতে চায় না, কিন্তু তার কানে আরভানের সেই গাঢ় কণ্ঠস্বরটি বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— “আদেশ নয় আয়াত, অনুরোধ করছি।” কী ছিল সেই কণ্ঠে? কোনো এক অজানা আর্তি নাকি এক গভীর ক্লান্তি?
আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে শুধু চা বানাতে জানে; কফি তো তার জীবনের অভিজ্ঞতায় নেই।
চায়ের কথা মনে পড়তেই আয়াতের ঝাপসা স্মৃতির দুয়ার হুড়মুড় করে খুলে গেল।
শৈশবে মায়ের কাছে সেই এক কাপ চায়ের আবদার করা আর মায়ের বকুনি খাওয়া।
ছোট্ট আয়াত বায়না ধরে বলেছিল,
“মা, আমি একটু চা খাব।”
মা কড়া গলায় উত্তর দিয়েছিলেন,
“একদম না! বাচ্চাদের চা খাওয়া উচিত নয়। চা হলো এক ধরণের নেশার মতো, একবার অভ্যাস হয়ে গেলে তা ছাড়া জীবনভর অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
কিন্তু আয়াত ছিল নাছোড়বান্দা। মায়ের আঁচল ধরে সে এমন বায়না শুরু করল যে শেষমেশ মা হার মানলেন। ছোট্ট একটা কাপে আধা কাপ চা ঢেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কপাল মন্দ! চায়ের কাপ হাতে নিতেই গরম চা চলকে পড়ে গেল ছোট আয়াতের নরম হাতে। আয়াতের আকাশফাটানো চিৎকারে বাবা হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে ছুটে এসেছিলেন। আয়াতকে পরম মমতায় আগলে নিয়ে তিনি ব্যাকুল হয়ে বলেছিলেন,
“কী হয়েছে আমার রাজকন্যাটার? কোথায় ব্যথা? এসো দেখি… এতখানি পুড়ে গেছে! এই আয়াতের মা, দ্রুত বরফ নিয়ে আসো!”
বাবা তখন মাকে অনুযোগের সুরে বলেছিলেন,
“আদৌ কি তোমার কোনোদিন কাণ্ডজ্ঞান হবে না? এতটুকু মেয়ের হাতে কেউ গরম চায়ের কাপ ধরিয়ে দেয়?”
মা তখন তেজ নিয়ে ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলতেন,
“সব দোষ কি শুধু আমার? তোমার মেয়ে চায়ের জন্য আমাকে পাগল করে দিয়েছিল, তাই তো দিলাম। মেয়েকে তো শাসন করতে পারো না, শুধু রাজকন্যা রাজকন্যা করে মাথায় তোলো!”
”আহ!” স্মৃতির ঘোর কাটল হাতের তীব্র জ্বালায়। কফি বানানোর ব্যর্থ চেষ্টায় আনমনা হয়েই হাতে গরম পানির পাত্রের ছ্যাঁকা লেগেছে।তার চোখ দুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠল।আজ তার সেই পোড়া হাতে ফুঁ দেওয়ার জন্য বাবা পাশে নেই। কেউ তাকে বুকে আগলে নিয়ে বলছে না ‘কী হয়েছে আমার রাজকন্যার?’ আজ কেউ বরফ আনতে দিগ্বিদিক দৌড়াবে না। রাজকন্যার তকমাটা তো অনেক আগেই ফিকে হয়ে মুছে গেছে। আজ সে একা, সাত সমুদ্র দূরে এক অচেনা মানুষের নির্দয় ঘেরাটোপে বন্দি। তার বাবা যদি জানতেন মেয়ের ভাগ্যে এতটা একাকীত্ব আর অসহায়ত্ব লেখা আছে, তবে হয়তো সেদিন ওভাবে তাকে আদরে আগলে রাখতেন না। রূঢ় বাস্তবতার সাথে লড়াই করার শিক্ষাটা হয়তো শৈশবেই দিয়ে দিতেন।
এই নিষ্ঠুর ধ্রুব সত্যটা পনেরো বছর বয়সী আয়াতের সামনে এসে প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন নাজমা বেগম। তিনি গলা উঁচিয়ে বলেছিলেন,
“এই যে পটের বিবি! আপনি কি মনে করছেন আপনার বিদেশি স্বামী এসে আপনাকে রাজরানী করে রাখবে? আসবে না সে, আর আসবে না। বিয়ে করে তো সেই কবে রেখে গেছে, কোনো যোগাযোগই রাখেনি। কতদিন অন্যের ঘাড়ে বসে অন্ন ধ্বংস করবে? এবার দয়া করে একটু গতরটা নাড়ান। চুলোর কাছে যান, কাজ শিখুন। বিদেশে জন্মানো ছেলে আপনাকে নিয়ে ঘর করতে যাবে না। গিয়ে দেখুন সে কত মেয়েমানুষের সাথে ফস্টিনস্টি করে বেড়াচ্ছে! তাই নিজের চিন্তা নিজেই করুন।”
নাজমা বেগম সেদিন আয়াতকে এক প্রকার টেনেই রান্নাঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার সামনে প্রায় এক কেজি ওজনের একটা বিশাল মাছ ধরিয়ে দিয়ে কর্কশ গলায় বলেছিলেন, “কাটো এটা!”
আয়াত সেদিনের আগে কোনোদিন মাছ কাটেনি। ছোট হাত দুটো দিয়ে মাছটা ধরলেও সে পুরোপুরি বাগে আনতে পারছিল না। কোনোভাবে ধরে পিঠ বরাবর কাটতে গিয়ে মাছের ধারালো পাখনা তার হাতের তালুতে সজোরে গেঁথে গিয়েছিল। সেই রক্ত আর অসহ্য স্মৃতিগুলো আজ এই দূর প্রবাসে এসেও যেন নতুন করে জেগে উঠছে।কিন্তু অতীত তাকে কষ্ট দিলেও বর্তমানে সে আর দুর্বল হতে চায় না।
*****
আরভান নিজের রুমে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে ব্যস্ত। তার চোখ দুটো নিস্তেজ হয়ে আছে, অবসাদে পাতা দুটো বুজে আসতে চাইছে বারবার। কিন্তু কাজগুলো দ্রুত শেষ করা প্রয়োজন। অফিসের সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে মিটিং ফেলে চলে এসেছিল সে, এখন ভার্চুয়ালি সেই ত্রুটিগুলোই সংশোধন করে দিচ্ছে। ভিডিও কনফারেন্স শেষ করে ল্যাপটপ বন্ধ করে আরভান সোফায় মাথা এলিয়ে দিতেই ফারহানের কল আসলো।
ফোনের ওপাশ থেকে ফারহান রীতিমতো চিৎকার করে উঠল,
“তুই একটা আস্ত অমানুষ এভি! আমাকে কিছু না বলে মিটিং ক্যানসেল করে চলে এলি? এখানে সবাই আমাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ছেড়েছিল। তাদের যা মেজাজ, পারলে আমাকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিত!”
আরভান ক্লান্ত গলায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“নাটক কম কর ফারহান। আমি কাউকে বেবিসিটার বানিয়ে রাখিনি যে সবকিছুর কৈফিয়ত দিয়ে আসতে হবে। আমার মাথা তখন ঠিক ছিল না, তাই চলে এসেছিলাম। নাউ এভরিথিং ইজ অল সেট।”
ফারহান এবার বিদ্রূপের সুরে বলল,
“বাহ! মেজাজ ঠিক ছিল না বলে সব মাঝপথে ছেড়ে চলে গেলি, আর আমি হয়ে গেলাম সার্কাসের জোকার। দারুণ ব্যবস্থা! তা বাড়িতে গিয়ে কার ওপর মেজাজ ঠান্ডা করছিস? যে আরভানের ডিকশনারিতে ‘নারী’ শব্দটা ছিল অ্যালার্জি, সেই আরভানের দুনিয়ায় কে এই রহস্যময়ী যে সোজা বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে?”
আরভান চোয়াল শক্ত করে বলল,
“বাজে বকা বন্ধ কর ফারহান।”
ফারহান হাসল, তবে দমল না।
“হ্যাঁ, এখন তো আমার কথাই বাজে লাগবে!তবে তোর ওপর থেকে এত সহজে রাগ পড়বে না। একটা শর্তে তোকে মাফ করতে পারি।আজ তুই আমাকে ট্রিট দিবি। আমি এখনই তোর বাসায় আসছি। ফোন রাখলাম।”
“একদম আমার বাসায় আসবি না!”
আরভান চেঁচিয়ে বলে উঠলেও বিশেষ লাভ হলো না, তার আগেই কল কেটে দিয়েছে ফারহান। বিরক্ত হয়ে ফোনটা পাশে রাখল সে। এই লোকগুলো তার কোন কথা শোনে না! এই যে কতক্ষণ আগে ওই মেয়েটাকে কফি বানাতে পাঠাল, অথচ এখনো কোনো খবর নেই। সে কি সত্যিই কফি বানাতে গেছে নাকি তেজ দেখিয়ে নিজের রুমে গিয়ে বসে আছে কে জানে। আরভান সোফায় গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করল।
****
এদিকে আয়াত কফিতে ইচ্ছেমতো কফি পাউডার মিশিয়ে একটা তিতকুটে পানীয় তৈরি করেছে। আরভানের রুমের দিকে যাওয়ার সময় সিঁড়ির সেই জায়গাটায় তার চোখ পড়ল, যেখানে কিছুক্ষণ আগে আরভান তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরেছিল। আয়াত লক্ষ করল সাদা দেওয়ালে হালকা লালচে রক্তের ছাপ লেগে আছে। এই দাগ এখানে কীভাবে এল, তা ভেবে আয়াতের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
সিঁড়ি বেয়ে সে আরভানের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খোলাই ছিল। আয়াত ভেতরে পা রাখল।বিশাল রুমটি গাঢ় ধূসর আর কালো রঙে সজ্জিত, যা চারদিকে এক ধরণের গাম্ভীর্য আর বিষণ্ণতা ছড়িয়ে রেখেছে। সোফায় চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে পড়ে আছে আরভান। আকস্মিক আয়াতের চোখ গেল আরভানের বাম হাতের দিকে। শার্টের হাতা গুটানো, হাতের তালু থেকে লম্বা কবজি পর্যন্ত তাজা রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। ক্ষতটা বেশ গভীর। সম্ভবত দেওয়ালের সাথে সজোরে হাত চেপে ধরার কারণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত চুঁইয়ে আবারও তাজা রক্ত বের হয়েছে।
আয়াতের বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে ধীর পায়ে আরভানের সামনে গিয়ে কফিটা টেবিলের ওপর রাখল। চলে যেতে চেয়েও তার পা সরল না। কারো প্রতি ঘৃণা থাকলেও তার রক্তমাখা ক্ষত দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মতো কঠিন হৃদয় আয়াতের নয়। মানুষটা কি পাথর? অন্যের কষ্টের কথা না হয় সে বাদ দিল, নিজের শরীরের ব্যথার প্রতিও কি তার কোনো অনুভূতি নেই?
আয়াত আশেপাশে তাকিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স খুঁজতে লাগল। বুকশেলফের পাশে নজর পড়লো একটি সাদা বক্স এবং তার পাশে কতগুলো ছড়ানো ওষুধ দেখতে পেল। তার পাশেই পড়ে আছে একটি মেডিকেল রিপোর্ট, যাতে বড় বড় অক্ষরে কিছু একটা লেখা। কৌতূহলবশত আয়াত হাত বাড়িয়ে সেই রিপোর্টটি ধরতে যাবে, ঠিক তখনই আরভান ঘরে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ মেলল। আয়াতকে বুকশেলফের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে কর্কশ গলায় বলল, “ওখানে কী করছো তুমি?”
আয়াত চমকে উঠল, কিন্তু এবার সে ভয় পেল না। সে দ্রুত ফার্স্ট-এইড বক্সটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে আরভানের পাশে গিয়ে বসল। কোনো রকম বাক্যব্যয় ছাড়াই সে আরভানের রক্তাক্ত হাতটা নিজের হাতের ওপর তুলে নিল। আরভান অবাক চোখে তার সামনে বসা এই অবাধ্য মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে এবার হাতটা সরিয়ে নিল না।
আয়াত তুলা দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করতে করতে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“আমি জানতাম আপনি অত্যন্ত নিচ মনের মানুষ, তবে এখন মনে হচ্ছে আপনি একজন কাপুরুষও বটে! নিশ্চয়ই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন? না হলে এভাবে কারো হাত কাটে না। সামান্য আর একটু গভীরে গেলেই তো রগটা কেটে যেত, মিস্টেক করে ফেললেন বোধহয়? এখন কি অস্বীকার করবেন যে এটা আপনি নিজে করেননি?”
তার কথায় আরভান ম্লান হাসল। অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল, “তুমি ভুল বুঝছো আয়াত। আত্মহত্যার মতো সস্তা কাজ আরভান চৌধুরী করে না। আমি শুধু আমার শরীর থেকে ওই বিষাক্ত রক্তটুকু বের করে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হই; তোমার মতো কেউ না কেউ এসে রক্ত ঝরা থামিয়ে দেয়।”
আয়াতের হাত থমকে গেল। এই মানুষটার প্রতিটি কথা যেন একেকটি দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা। মানুষের রক্ত আবার বিষাক্ত হয় কীভাবে? আর চাইলেই কি শরীর থেকে রক্ত বের করে দেওয়া যায়? হাজারো প্রশ্ন মনের কোণে উঁকি দিলেও সে তা ঠোঁটের আগায় আসতে দিল না। একবার আরভানের দিকে তাকিয়ে আবারও ব্যান্ডেজ করায় মন দিল।
আরভান তার নিস্পৃহ চাউনি আয়াতের মুখে স্থির রেখে বলল,
“তুমি বড্ড বোকা শাহরিয়ারের জানপাখি। বারবার নিজের ইচ্ছায় আমার নিষিদ্ধ সীমানায় চলে আসছো। ভুল করেও যদি আমার প্রেমে পড়ে যাও, তবে ধ্বংস তোমার জন্য অনিবার্য।”
আয়াত মুখ না তুলেই অবজ্ঞার সাথে উত্তর দিল,
“আপনার মতো জঘন্য লোকের প্রেমে আয়াত মরে গেলেও পড়বে না। নিজের ওপর আপনার আত্মবিশ্বাস একটু বেশিই মনে হচ্ছে!”
আরভান শব্দ করে হেসে উঠল। কিছুটা ঝুঁকে আয়াতের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এল। আয়াতের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে আরভানের এই চাউনি অত্যন্ত প্রখর এবং অবাধ্য। আয়াত অস্বস্তিতে আর বিরক্তি নিয়ে বলল, ” “আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকবেন না।”
আরভান আয়াতের অস্বস্তি দেখেও চাউনি সরাল না। বরং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার হার্টবিট বোধহয় খুব ফাস্ট হচ্ছে আয়াত? মনে হচ্ছে এখনই সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। অবশ্য দোষ তোমার নয়; তোমায় পাগল করে দেওয়ার জন্য আমার এক পলক দৃষ্টিই যথেষ্ট। তাই যদি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাও, তবে সাবধান হও। কারণ আমার এই চোখের নেশায় একবার ডুব দিলে ফেরার কোনো রাস্তা খুঁজে পাবে না। বিষাক্ত সাপের যেমন মায়াবী রূপ থাকে, আমিও ঠিক তাই। সময় থাকতে আমার থেকে দূরে থাকো।”
কথাটা শেষ করে আরভান ঝট করে হাত সরিয়ে নিল। টেবিল থেকে কফির কাপটা তুলে এক চুমুক দিতেই তার পুরো মুখ কুঁচকে গেল প্রচণ্ড তিতকুটে স্বাদে। আয়াত ভেবেছিল আরভান হয়তো এখন রেগে চিৎকার করবে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সে হেসে ফেলল। ম্লান হেসেই বলল,
“এক্সাক্টলি! এই মুহূর্তের ঠিক এই তিতকুটে জিনিসটারই প্রয়োজন ছিল আমার। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে আয়াত।”
আরভানের এই খামখেয়ালি আচরণ আয়াতের সহ্য হলো না। বাংলাদেশে দেখা সেই নিষ্ঠুর আরভান আর অস্ট্রেলিয়ার এই আরভানের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এই মানুষটার চারিত্রিক বৈপরীত্য আয়াতকে বারবার বিভ্রান্ত করছে। আয়াত রাগে আরভানের হাত থেকে মগটা টেনে নিতে গেলেই বিপত্তি ঘটল। আরভান ঝট করে আয়াতের হাত ধরে নিজের দিকে টান দিল। টান সামলাতে না পেরে ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগ উল্টে পড়ল আরভানের গায়ের ওপর।
আয়াত আঁতকে উঠে দিশেহারা হয়ে নিজের ওড়না দিয়ে আরভানের বুক মুছতে শুরু করল। সে ভয়ে আর উৎকণ্ঠায় কাঁপা গলায় বলল,
“আমি… আমি বুঝতে পারিনি! আমি জাস্ট মগটা সরাতে চেয়েছিলাম।”
সে আবারও বরফ আনতে ছুটতে গেলে আরভান তাকে হ্যাঁচকা টানে একদম নিজের নিবিড় সান্নিধ্যে নিয়ে এল। দুই হাতের বেষ্টনীতে তাকে আটকে নিল সে। আয়াত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করে বলল, “কী করছেন! ছাড়ুন আমাকে! বরফ দিতে হবে, নয়তো ফোস্কা পড়ে যাবে!”
আরভান ওকে আরও শক্ত করে ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর আয়াতের ছটফটানি যখন ক্লান্তিতে থেমে গেল, আরভান আয়াতের কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। আয়াতের কম্পিত নারীসত্তা টের পেল এই মানুষটা যেন তার দুর্বলতাগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে পড়তে পারছে।
আয়াতের চোখ ভিজে উঠল। আরভান আলতো স্বরে বলল,
“কাঁদছো কেন আয়াত? পুড়ছে তো আমার শরীর, তোমার চোখে পানি কেন?”
আয়াত লাল চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে কান্নাসিক্ত কণ্ঠে বলল
“আপনি আমার জীবনে এক দমকা ঝড়ো হাওয়া, যা নিমিষেই আমার সাজানো স্বপ্নগুলোকে তছনছ করে দিয়েছে। শান্তি কেড়ে নিয়েছেন, নিঃশ্বাসের ছন্দ এলোমেলো করে দিয়েছেন। আপনি একদিকে অপমানের বিষে আমার নীল হওয়া দেখছেন, আবার অন্যদিকে আপনার ওই বরফশীতল চাহনি দিয়ে আমায় পাথর বানিয়ে দিচ্ছেন। বলতে পারেন, ঠিক কোন অপরাধে আমাকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করছেন? এ কেমন অদ্ভুত খেলা খেলছেন আপনি?”
আরভান বিষণ্ণ চোখে আয়াতের দিকে তাকাল। তার ভেতরেও তখন এক প্রলয় চলছে। সে আয়াতের চোখের পানি মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলল,
“তোমার ওই চোখের পানি আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আয়াত। অথচ একদিন এমন আসবে যেদিন তুমি কাঁদবে, যন্ত্রণায় বুক ভেঙে আসবে তোমার, অথচ সেদিন তোমার চোখের পানি আমায় কষ্ট দিবে না। বরং তা তৃপ্তি হয়ে আমার ঠোঁটে হাসির কারণ হবে। সেদিনই হবে আমাদের চূড়ান্ত পরিণতি।”
আয়াত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আরভান কি তাকে কোন অভিশাপ দিচ্ছে? নাকি কোনো ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
আরভান আয়াতের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। মুহূর্তেই আরভানের সুর বদলে গেল। ক্ষণিকের জন্য তার কণ্ঠে এক গভীর আকাঙ্ক্ষা ঝরে পড়ল,
“চলো না আয়াত, এই মিথ্যে রাগ-ঘৃণা ভুলে তোমার ধূসর জীবনটা খুশিতে ভরিয়ে দিই। আমার এই ক্ষণিকের বাস্তবতায় তুমি কি আমার সঙ্গী হবে? আমার এই শক্ত আঙুলগুলোর ভাঁজে তোমার ছোট নরম আঙুলগুলো কি একবার গেঁথে দেবে ?আমার এই শক্ত রূঢ় আঙুলগুলোর ভাঁজে পরম নির্ভরতায় থাকুক তোমার ওই ছোট নরম আঙুলগুলো। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আমরা কেবল জীবনের শেষ সূর্যাস্তটা দেখব। যাবে আমার সাথে সেই অনিশ্চিত পথে? যেখানে কোনো পিছুটান নেই, কেবল নিস্তব্ধতা আছে?”
আয়াত বিস্ময়ে আরভানের দিকে তাকিয়ে রইল। এই আরভান তার কাছে বড্ড অচেনা। সে এমন করে কথা কেন বলছে?
কিন্তু পরক্ষণেই আরভান যেন নিজের ঘোরে ফিরে এল। সে আয়াতের বাঁধন আলগা করে দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,
“আমার থেকে দূরে থাকবে আয়াত। এটাই শেষবার। এরপর আমাকে যদি তোমার সামনে মরণ যন্ত্রণায় কাতরাতেও দেখো, তাহলেও দয়া দেখিয়ে আমার আশেপাশে আসবে না। এখনই আমার রুম থেকে বের হও!”
আয়াতের শরীর মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। এক তীব্র অভিমানে তার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। কত বড় বোকা সে! কেন বারবার এই দু-মুখো মানুষের মায়ায় সে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে?যার চোখ এবং ঠোঁট সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে বাস করে। এই তো কয়েক মুহূর্ত আগে লোকটার চোখদুটো যেন নিঃশব্দে তাকে কাছে আসার এক করুণ আকুতি জানাচ্ছিল, অথচ এখন তার বিষাক্ত ও কর্কশ স্বর তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই মানুষটার দৃষ্টির ভাষা আর মুখের ভাষা কেন কখনও এক হয় না? কেন তার ঠোঁট যা অস্বীকার করে, তার চোখের মণি ঠিক তার উল্টোটা বলে ওঠে? আয়াতের মনে হলো, এই রহস্যময় গোলকধাঁধায় পড়ে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। ঠিক তখনই দরজায় ডোরবেলের কর্কশ আওয়াজ হলো, যা রুমের গুমোট নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল।
আরভান আয়াতের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা খুলতেই দেখা গেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান এবং তার ঠিক পেছনে এক নারী……
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে.

