Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-১৫+১৬

আমার হয়ে থেকো পর্ব-১৫+১৬

0
599

#পর্ব_১৫
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

মেলবোর্নের বিখ্যাত মোনাশ ইউনিভার্সিটির সুবিশাল করিডোর আর অত্যাধুনিক ক্লাসরুমগুলো আজ যেন আয়াতের কাছে বড্ড একঘেয়ে ঠেকছে। লেকচার থিয়েটারে বসে প্রফেসরের প্রতিটি কথা শুনলেও তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন আর অস্বস্তির পাহাড়—যার কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল একজনই বিচরণ করছে, আরভান চৌধুরী।

​তবে সবচেয়ে বেশি যা তাকে দহন করছে, তা হলো ক্লাসের কিছু কৌতূহলী সহপাঠীর আচরণ। আরভান তাকে আজ সকালে নিজে ড্রপ করে দিয়ে গেছে। মেলবোর্নে আরভান চৌধুরী কোনো তারকার চেয়ে কম জনপ্রিয় নয়। অল্প সময়ে ব্যবসায়িক সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো এই তরুণ উদ্যোক্তাকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। আর সেই রহস্যময় মানুষটি যখন কোনো তরুণীকে নিজ হাতে ভার্সিটিতে পৌঁছে দেয়, তখন চারপাশের মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টির বাণ থেকে রেহাই পাওয়া দুষ্কর।

​সারাটা ক্লাস চলাকালীন এক মুহূর্তের জন্যও আয়াত শান্তিতে বসতে পারেনি। মেয়েদের নির্লজ্জ কৌতূহল তাকে চরম বিরক্তির সীমায় পৌঁছে দিয়েছে। তাদের হাজারো প্রশ্ন— ‘এভি ইন্টেল’-এর মালিক আরভান চৌধুরী তোমার কে হয়? তুমি কি ওর রিলেটিভ? ও কি আসলেই সিঙ্গেল?’
আয়াতের মেজাজ তখন তুঙ্গে। সে ধীরস্থিরভাবে বিরক্তি চেপে রাখলেও তার ধৈর্যের বাঁধ ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছিল। কোনোমতে ক্লাস শেষ করে সে দ্রুত বেরিয়ে এল।

​তার আজ অ্যালানের সাথে দেখা করা খুব জরুরি। আরভানের অতীত আর অ্যালানের সেই অসম্পূর্ণ কথাগুলোর মাঝে কী রহস্য লুকিয়ে আছে, তা তাকে জানতেই হবে। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক তরুণী ‘দাপ্পা!’ বলে সজোরে চিল্লিয়ে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করল। আয়াত চমকে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকাতেই দেখল ঝকঝকে হাসিমুখের একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটির পরনে জিন্স আর ওভারসাইজড হুডি। মেয়েটির নাম মাইরা—কলেজে সবাই তাকে সংক্ষেপে ‘মাই’ বলে ডাকে।

মাইরা হেসে বলল,
“সরি সরি! আসলে আমাদের ক্লাসে আমিই একমাত্র বাঙালি ছিলাম এতদিন। আজ তোমাকে দেখে আর থাকতে পারলাম না। সারাদিন সবার সাথে ইংরেজিতে কথা বলা যে কী বোরিং একটা ব্যাপার, তা বোঝাতে পারব না! বাই দ্য ওয়ে, আরভান চৌধুরী তোমার কে হয়? তুমি কি ওনার ছোট বোন?”

​মাইরার প্রশ্নে আয়াতের কপালে বিরক্তির রেখা আরও গাঢ় হলো। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “সেটা আরভান চৌধুরীকে গিয়েই জিজ্ঞেস করো।”

​আয়াত কথা না বাড়িয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু মাইরা নাছোড়বান্দা, সে দ্রুত পা চালিয়ে আয়াতের পাশাপাশি চলে এল। “আরে রাগ করছো কেন? আচ্ছা বাবা, আর প্রশ্ন করব না। কিন্তু তুমি এখন হন্যে হয়ে কাকে খুঁজছো?”

​”মিস্টার অ্যালানকে।” আয়াত জবাব দিল।

​”ওহ, অ্যালান স্যার! উনি তো আজ ক্যাম্পাসে আসেননি। ওনার কাজিনের বিয়ের জন্য তিন দিনের ছুটিতে আছেন।”

মাইরার কথায় আয়াত থমকে দাঁড়াল। তার মনের সংশয়গুলো দূর করার একমাত্র উপায়টিও আপাতত বন্ধ। আয়াতের চোখেমুখে নিরাশা ফুটে উঠল।
​মাইরা হঠাৎ আয়াতের হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
“চলো আমার সাথে! আজ আর কোনো ক্লাস নেই।”
​আয়াত অবাক হয়ে বলল, “আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?”

​মাইরা আবদারের সুরে বলল,
“একটু ঘুরতে! মেলবোর্নে এসে একা একা আমার ঠিকঠাক ঘোরাই হয়নি। আজ তোমাকে পেয়েছি যখন, না বলতে পারবে না। প্লিজ!”

​আয়াত অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাইরার সাথে চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে বুঝতে পারল মেয়েটি অসম্ভব বাচাল, তবে তার ভেতরে কোনো প্যাঁচ নেই। হাঁটতে হাঁটতে তারা শহরের মূল কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। হঠাৎ মাইরা থমকে দাঁড়িয়ে আয়াতের হাত টেনে থামিয়ে দিল। সামনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল— “আয়াত, ওটা এভি না?”

​আয়াত ভ্রু কুঁচকে সামনে তাকাতেই তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আরভান একটা হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসছে। তার হাতের কব্জিতে সাদা ব্যান্ডেজ করা, আর মুখটা বড্ড ফ্যাকাশে। আয়াত বুঝতে পারে না লোকটা কেন বারবার এমন কাটাকুটি করে নিজের শরীরের ওপর অত্যাচার চালায়। আয়াতের উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তা তখন চরমে।

​সে মাইরার হাত এক ঝটকায় ছাড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গলার স্বর যতটা সম্ভব নির্লিপ্ত করে বলল, “আমি ওনাকে চিনি না। সামনে চলো।”

​মাইরা এবার পুরো বোকা বনে গেল। যে মেয়েকে সকালে স্বয়ং আরভান চৌধুরী নিজ হাতে কলেজে নামিয়ে দিয়ে গেল, সে বলছে চেনে না! কৌতূহল সামলাতে না পেরে মাইরা বলল, “না চিনলে সকালে তার সাথে কলেজে আসলে কীভাবে?”

“রাস্তায় দেখা হয়েছিল, জাস্ট লিফট দিয়েছে।”

আয়াত মিথ্যেটা বলে দ্রুত পা চালাল। ​কিন্তু তাদের বেশিদূর যেতে হলো না। কালো রঙের সেই দানবীয় গাড়িটি হঠাৎ করেই তাদের সামনে এসে থামল। গাড়ির কাঁচ নেমে যেতেই আরভানের গম্ভীর স্বর ভেসে এল,

“গাড়িতে ওঠো।”

আয়াত রাস্তার মাঝে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরভানের কপালে ভাঁজ পড়ল, সে আবারও হুকুমের সুরে বলল, “আয়াত, আই সেড গেট ইন দ্য কার!”

​আজ কেন যেন আরভানের সাথে দ্বিমত করার শক্তি আয়াতের অবশিষ্ট ছিল না। তার ব্যান্ডেজ করা হাতটা দেখে মনের ভেতর কেমন যেন হাহাকার করে উঠছে। সে মাইরার দিকে তাকিয়ে ছোট করে বিদায় জানিয়ে সোজা গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসল। আরভান স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি স্টার্ট দিল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মাইরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে স্থাণুর মতো তাকিয়ে রইল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা রাস্তায় দেখা হওয়া লোক কি এভাবে অর্ডার দিয়ে মাঝরাস্তা থেকে গাড়িতে তোলে?

****

গাড়ির ভেতর এক থমথমে নীরবতা। আয়াত আড়চোখে আরভানের কব্জির দিকে তাকালো, যা শক্ত মুঠোয় স্টিয়ারিং ধরে আছে। ব্যান্ডেজটা সাদা হলেও সেখানে রক্তের হালকা ছোপ দেখা যাচ্ছে। আরভান আয়াতের অস্থিরতা লক্ষ্য করলেও কোনো কথা বলছে না, যেন সে এই নিঃশব্দ দহনটুকু উপভোগ করছে।
​নিজেকে আর সামলাতে না পেরে আয়াত ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“আজ আবার নিজের হাত কাটলেন কেন? শরীরটাকে কি কসাইয়ের দোকান মনে হয় আপনার? নাকি দিনশেষে একটু রক্তারক্তি না করলে আপনার পেটের ভাত হজম হয় না?”

​আরভান সামনের দিকে তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল,

“সবকিছু আমি নিজে করি না আয়াত। প্রজেক্টের সাইটে কাজ করার সময় একটা কাঁচের স্লাব ভেঙে হাতে ঢুকে গিয়েছিল। নিছকই দুর্ঘটনা।”

​আয়াতের রাগ কমলো না, বরং আরও বাড়ল। সে তপ্ত স্বরে বলল, “দুর্ঘটনা নাকি খামখেয়ালি? কাজ করতে গিয়ে কি চোখ বন্ধ করে রাখেন? আপনাকে না মাঝে মাঝে আমার জ্যান্ত খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে!

আরভান হঠাৎ ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। এক হাত দিয়ে ড্যাশবোর্ডের ড্রয়ারটা খুলে একটা ছোট রিভলবার বের করে আয়াতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “ইচ্ছে যখন হয়েছে, তখন সুযোগটা মিস করা ঠিক হবে না। নাও, শেষ করে দাও।”

​আয়াত থতমত খেয়ে গেল। মুখ কুঁচকে বলল, “খেলনা পিস্তল দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন? ভাবছেন আমি বাচ্চা মেয়ে যে এসব দেখে ভয় পাব?”

​চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার ভঙ্গিতে আয়াত পিস্তলটি হাতে নিতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ওজনে ভারি আর স্পর্শে হাড়কাঁপানো শীতলতা। সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“এটা এতো ভারি কেন? আর এমন ঠান্ডা লাগছে কেন?”

​”কারণ ওটা খেলনা নয় আয়াত, ওটা আসল।” আরভান নির্বিকার গলায় জবাব দিল।

​​আয়াত কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে কয়েক ইঞ্চি দূরে সরে বসল।

“আপনি… আপনি কি কোনো ক্রিমিনাল? কোনো গ্যাংস্টারের সাথে আপনার যোগসূত্র আছে? কোনো সাধারণ মানুষের কাছে তো এমন পিস্তল থাকার কথা না! সত্যি করে বলুন, আসলে কে আপনি?”

​আরভান ভ্রু কুঁচকে একবার তার দিকে তাকালো। তারপর সামনে তাকিয়ে বলল,”ইডিয়ট গার্ল! ওটা লাইসেন্সড পিস্তল। বড় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার থেকে পারমিশন দেওয়া হয়। আমি কারো পকেট মারি না যে গ্যাংস্টার হতে হবে। এখন ওটা সাবধানে ড্রয়ারে রেখে দাও।”

আয়াত কম্পিত হাতে পিস্তলটি ড্যাশবোর্ডে রাখতে গিয়েই থমকে গেল। ড্রয়ারের এক কোণে একটি মখমলের কাপড়ের ওপর পড়ে আছে একটি ছোট পুরনো আংটি। আংটিটি হাতে নিতেই আয়াতের স্মৃতিপটে বারো বছর আগের এক ঝাপসা বিকেল ভেসে উঠল।

​আরভান তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “এমন করে দেখার কী আছে? ওটা দেখে কি চিনতে পারছো না? মানুষ তো নিজের পাঁচ-ছয় বছর বয়সী স্মৃতিও মনে রাখে, আর তুমি? বারো বছর আগের এই সামান্য স্মৃতিটুকুও মনে রাখতে পারলে না?”

​”ভুলিনি কিছুই!” আয়াতের কণ্ঠ ধরে এল। “মা এটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিল আপনাকে পরিয়ে দিতে। এটা এখনো আপনার কাছে কেন? কেন ফেলে দেননি?”

​আরভান গম্ভীর স্বরে বলল, “ডিজাইনটা পছন্দ হয়েছিল, তাই স্মৃতি হিসেবে রাখা। ওটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দাও। অহেতুক ইমোশনাল হওয়ার দরকার নেই।”

​কিন্তু আয়াতের মনে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। পুরনো ক্ষোভগুলো সব একসাথে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শুরু থেকে এই লোকটা তাদের বিয়েটাকে ‘পুতুল খেলা’ বলেছে, তাকে ‘চরিত্রহীনার তকমা’ দিয়েছে— আজ তবে এই আংটি কোন মায়ায় সে এমন মখমলে মুড়িয়ে আগলে রেখেছে? আক্রোশে সে গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল। গাড়িটি তখন মেলবোর্নের একটি শান্ত লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আয়াত কোনো কিছু না ভেবেই আংটিটি জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল,

​”যে বিয়ের কোনো মর্যাদা আপনার কাছে নেই, সেই বিয়ের স্মৃতি আগলে রাখার কোনো মানে হয় না। এই পুতুল খেলার অবসান হওয়া উচিত!”

​আরভান সাথে সাথে কষে ব্রেক করল। টায়ারের ঘর্ষণে এক বিকট শব্দ হলো। আরভান দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল, “আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড, আয়াত?”

​বলেই আরভান গাড়ি থেকে নেমে সোজা বেরিকেট ডিঙিয়ে লেকের পানিতে নেমে গেল। আরভানের এমন হঠকারিতা দেখে আয়াতের কলিজা শুকিয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল বাংলাদেশে আরভান যখন পুকুরে পড়েছিল, সে ডুবতে বসেছিল! সে হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করতে করতে লেকের দিকে দৌড়ালো। আরভান তখন লেকের অনেকটা গভীরে চলে গেছে।

​”আরভান! কী করছেন আপনি? ফিরে আসুন! আপনি তো সাঁতার জানেন না! উঠে আসুন প্লিজ!”

​আয়াত চিৎকার করতে করতে নিজেও লেকের পানিতে নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তার পা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে দেখল। আরভান অত্যন্ত দক্ষভাবে সাঁতার কাটছে, ডুব দিচ্ছে আর পানির নিচে আংটিটা খুঁজছে।

​আয়াতের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। এই সেই লোক, যে বাংলাদেশে সাঁতার না জানায় পুকুরে ডুবে যাচ্ছিল! তার মানে সেদিনও সে ডুবে যাওয়ার অভিনয় করেছিল?

​কিছুক্ষণ পর আরভান পানির নিচ থেকে উঠে এল। তার হাতের মুঠোয় সেই আংটিটি শক্ত করে ধরা। সে পানি ভেঙে পাড়ে উঠে এসে দাঁতে দাঁত চেপে আয়াতের সামনে দাঁড়াল। তার ভেজা চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে হিমশীতল গলায় বলল, “আমার ব্যক্তিগত জিনিসে নেক্সট টাইম হাত দেবে না আয়াত। আই ডোন্ট লাইক ইট।”

​আয়াত কাঁপা গলায় বলল, “ওটা আপনার ব্যক্তিগত জিনিস হতে পারে না!”

​”একবার কোনো জিনিস আরভানের অধিকারে আসলে সেটা চিরকালের জন্য তার ব্যক্তিগত হয়ে যায়। এমনকি তুমিও আমার সেই অধিকারের বাইরে নও”

​বলে আরভান গটগট করে গিয়ে গাড়িতে উঠে হর্ন দিল। আয়াত ফুঁসতে ফুঁসতে গাড়িতে গিয়ে বসল। রাগে তার শরীর কাঁপছে। সে বলল, “আপনি আসলে কোনো সাধারণ মানুষ নন, আপনি একজন ধুরন্ধর অভিনেতা! সেদিন পুকুরে ডুবে যাওয়ার নাটক করেছিলেন কেন? আর আমিও কত বড় বোকা! একবারও মনে হলো না— এত বড় বিশাল একটা শরীর আমি এইটুকু মেয়ে কীভাবে একা টেনে পাড়ে তুলেছিলাম? কতটা বোকা আমি!”

​আরভান গাড়ি চালাতে চালাতে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, এটা তো নতুন করে বলার কিছু নেই। দুনিয়ার সবাই জানে তুমি ঠিক কত বড় বোকা!”

​আয়াত রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, একদম বাজে কথা বলবেন না! আপনার এই উদ্ধত আর দ্বিচারী দু-স্বভাব আমার আর সহ্য হচ্ছে না। ইচ্ছে করছে আপনাকে আস্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলি।”

আরভান নির্বিকার ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বলল,
“বেশ তো, খাও! আমি কি বারণ করেছি? বলো, কোথা থেকে শুরু করবে? কাঁধ নাকি গলা বরং চিবিয়ে খাওয়ার সুবিধার্থে আমি শার্টের বোতামগুলো একটু খুলেই দিচ্ছি, তোমার দাঁত বসাতে সুবিধা হবে।”

বলেই সে এক হাতে কলারের কাছের বোতামে হাত দিল।​আরভানের এমন লাগামহীন কথায় আয়াতের কান একদম গরম হয়ে গেল। সে ঝামটা দিয়ে বলল,
“আপনার মতো এই বিশাল দানবীয় শরীর যদি গিলে ফেলতে পারতাম, তবে বাংলাদেশ যেদিন পা রেখেছিলেন সেদিনই আপনাকে চিবিয়ে গিলে ফেলতাম! আপদ বিদায় হতো।”

আয়াতের রাগী চেহারায় এক অদ্ভুত মায়াবী সারল্য ফুটে উঠল। ​আরভান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ কণ্ঠস্বর একদম খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খুন করতে পারবে না, গিলতে পারবে না, যা পারবে না তা নিয়ে অহেতুক আস্ফালন কেন আয়াত? তার চেয়ে বরং এটা বলো- আমায় একটু ভালোবাসতে পারবে?”

​আয়াতের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে বলল, “প্রশ্নই আসে না! সেটা কক্ষনো সম্ভব না! আপনার মতো পাষাণকে ভালোবাসা আর জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া একই কথা।”

​আরভান বাঁকা হাসি হাসল।
“তুমি বড্ড বোকা আয়াত। একজন ট্যালেন্টেড হাজব্যান্ড-এর কদর তুমি বুঝতে পারছ না। পরে কিন্তু আফসোস করে বলবে— ইস! সেদিন যদি আরভানকে ভালোবেসে মেনে নিতাম, তাহলে জীবনটা আজ ধন্য হয়ে যেতো!”

​আয়াতও পাল্টা হেসে বলল, “ধন্য না ছাই! জীবনটা পুরো নরক হয়ে যেত। অলরেডি তো হয়েই আছে। আর আপনি এভাবে হাসবেন না তো, একদম ভালো দেখায় না।”

​আরভান একটু পাশ ফিরে ঝুঁকে আয়াতের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কেন? আমার হাসি দেখলে কি তোমার হৃদয়ে ‘কিছু কিছু’ হয় নাকি?”

​আয়াত দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিলো।মুখে না বললেও মনে মনে বলল,
‘হয়, অনেক কিছু হয়! হৃদয়ে এক অজানা স্পন্দনের সাথে এক অদ্ভুত ভয় হয়।”

কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ না করে সে গম্ভীরভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।

***

​গাড়ি এসে থামল আরভানের অফিসের সামনে। আয়াত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কেন এসেছি আমরা?”

​”অফিসে কিছু কাজ আছে তাই। নামো।” আরভান নেমে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়াল।

​”কাজ তো আপনি করবেন, আমার তো কোনো কাজ নেই। আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসুন।”

​আরভান শীতল চোখে তাকিয়ে বলল, ” তোমাকে একা বাড়িতে রাখার রিস্ক আমি নেবো না। কারণ তুমি তো আবার বড্ড দয়ালু, যেকোনো মুহূর্তে যে কাউকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিতে পারো।”

আয়াত চোখ পাকিয়ে বলল, “একই খোঁচা বারবার দেবেন না তো! বললাম তো ওটা ভুল ছিল।”

আয়াত মুখ কালো করে নেমে দাঁড়াল। ​আরভান আয়াতের হাত শক্ত করে ধরে হাঁটতে শুরু করল। অফিসের ভেতর ঢুকতেই সব কর্মীরা চমকে তাকিয়ে রইল। তাদের বসের সাথে এক সুন্দরী বাঙালি তরুণীকে দেখে সবার চোখে বিস্ময়। ফারহান দ্রুত এগিয়ে এসে বলল, “এভি! তোর এমন বেহাল দশা কেন? একদম কাকভেজা হয়ে আছিস যে!”

​আরভান হাঁটতে হাঁটতে নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “বউয়ের হাতের আদর খেয়েছি। আদরের চোটে লেকের পানিতে চুবানি খেতে হয়েছে।”

আয়াতের চোখ বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। ফারহানসহ অফিসের সবাই আরভানের মুখে এমন অকপট স্বীকারোক্তি শুনে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল।

***

​কেবিনের ভেতর ঢুকে আরভান পাশে থাকা একটি বিলাসবহুল বিশ্রাম কক্ষ দেখিয়ে বলল, “তুমি ওখানে রেস্ট নিতে পারো। মাত্র এক-দেড় ঘণ্টা লাগবে কাজ শেষ করতে।”

আরভান নিজের শার্ট চেঞ্জ করে ড্রয়ার থেকে একটি বক্স বের করে আয়াতের সামনে রাখল। “এটা তোমার জন্য।”

​আয়াত বক্সটি খুলে দেখল লেটেস্ট মডেলের একটি আইফোন। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমি তো আপনার কাছে ফোন চাইনি, শুধু একটা সিম চেয়েছিলাম। তাহলে …”

​”আয়াত, তুমি কি একটু কম কথা বলতে পারো না? ওটার মধ্যেই সিম আছে। আপাতত এটা ইউজ করো।”

​”আমি নেবো না।” আয়াত জেদ ধরল। আরভান নিঃশব্দে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল।

​কিছুক্ষণ পর আয়াত গুম মেরে বসে থেকে আড়চোখে ফোনটা হাতে তুলে নিলো। আয়াতের প্রতিটি মুভমেন্ট আরভানের চোখ এড়ালো না। সে নিজের ডেক্সটপের স্ক্রিনে তীক্ষ্ণ নজর রাখল। মূলত আয়াতের ফোনে হ্যাকিং সফটওয়্যার ইন্সটল করা আছে, যা আয়াত হয়তো বুঝতেও পারল না যে তার প্রতিটি ক্লিক কেউ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

​আয়াত কিছুক্ষণ ফোনটা টিপে কৌতূহলবশত ক্যামেরায় ঢুকল। তারপর খুব সাবধানে আরভানের দিকে তাকিয়ে তার অগোচরে একটা ছবি তুলল। ডেক্সটপে ডেটা লাইভ আসতেই আয়াতের এই চুরির মতো ছবি তোলার কাণ্ড দেখে আরভান সশব্দে হেসে উঠল। আয়াত অপ্রস্তুত হয়ে ফোনটা পাশে রেখে বসে রইল। আরভান মুচকি হাসি নিয়ে কাজে মন দিল, কিন্তু আয়াতকে বুঝতে দিলো না তার হাসির আসল কারণটা কী।

ঘণ্টা দেড়েক পার হয়ে গেলেও আরভানের কাজ শেষ হওয়ার নাম নেই। বিরক্ত হয়ে আয়াত উঠে দাঁড়াল। তার কোমরে ব্যথা হয়ে গেছে বসে থেকে। সে রাগত স্বরে বলল,
“আপনি এক-দেড় ঘণ্টার কথা বলে আমাকে বসিয়ে রেখেছেন। কাজ শেষই হচ্ছে না। আপনি আপনার কাজ করুন, আমি আসছি!”

​আয়াত দরজার হাতল ধরার আগেই সেটা বাইরে থেকে খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেসিকা। পেছন থেকে একজন স্টাফ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “স্যার, ওনাকে আটকে রাখতে পারিনি। কোনো কথা না শুনে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে চলে এলেন।”

​জেসিকা অগ্নিদৃষ্টিতে আয়াতের দিকে এগিয়ে এসে তিক্ত স্বরে বলল, “হাউ ইউ ডেয়ার! তুমি এখানে কী করছো? আমার এভিকে তুমি আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে কী মনে করেছো? তুমি কি ভাবছো তুমি ওর যোগ্য?”

​আয়াত বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, “আপনার আরভান ওই টেবিলে বসে আছে। তাকে কেউ নেয়নি। আর আমার তাকে নেওয়ার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা নেই। আপনার এভিকে আপনিই সামলে রাখুন।”

বলেই আয়াত গটগট করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। আরভান টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুহাতে বুক গুঁজে যেন কোনো সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দেখছিলো।

​জেসিকা এবার ন্যাকামি শুরু করল। সে গিয়ে আরভানের বাহু ধরে বলল, “এভি, তুমি আমার সাথে মোটেও ঠিক করোনি। এই সামান্য মেয়েটার জন্য তুমি…”

​আয়াতের পা থমকে গেল। সে তড়িৎবেগে পিছনে ঘুরে তাকালো। জেসিকাকে আরভানের বাহু ধরে থাকতে দেখে তার পিত্তি জ্বলে গেল। জেসিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ইউ নো জেসিকা? বাংলাদেশে যারা অন্যের স্বামীর দিকে এভাবে নির্লজ্জের মতো নজর দেয়, তাদের কী বলে? তাদের বলে দুশ্চরিত্রা, নষ্টা মেয়ে! ইন ইংলিশ— ‘আ হোম রেকার’!”

​কথাটা বলেই আয়াত আর এক মুহূর্ত থামল না। আরভানের ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। সে যেন এই প্রতিবাদটুকুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে জেসিকার হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“বারবার একই ভুল আমি ক্ষমা করি না জেসিকা। যদি চড় খাওয়ার প্রতিশোধ নিতে এসব সস্তা নাটক করে থাকো, তবে সেটা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। আমার সীমা অতিক্রম করো না, আদারওয়াইজ তোমার অবস্থা এমন বীভৎস হবে যে তোমার ওই তথাকথিত পাওয়ারফুল বাবাও তোমাকে খুঁজে পেতে হিমশিম খাবে!”

কথাটা বলে সে আয়াতের পিছু নিলো। কিন্তু ততক্ষণে আয়াত চোখের আড়ালে। আরভান ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে দেখল সে অন্য পথে চলে গেছে। বাইরে এসে চারপাশটা দেখে আয়াত ঘাবড়ে গেল। আয়াত রাগের মাথায় এসেছে ঠিকই, কিন্তু রাস্তাঘাট কিছুই চেনে না। যদি সে হারিয়ে যায়? যদি কোনো খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়ে তখন সে কী ইজ্জত নিয়ে বেঁচে ফিরবে? তার ওপর মাথায় ঘুরছে তখন ওখান থেকে বের হওয়া তার উচিত হয়নি, ওখানে দাঁড়িয়ে দেখা উচিত ছিল ফারহান ভাইয়ের সেই তথাকথিত নারীবিদ্বেষী বন্ধু কী করে!

​শত আফসোস নিয়ে হাঁটার গতি কমে গেল। সামনে কিছু উশৃঙ্খল পুরুষকে দেখে তার অবশিষ্ট সাহস মুহূর্তেই উবে গেল। তাদের হাতে নেশাদ্রব্য, তারা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া আয়াতের কানের কাছে আকস্মিক এক তপ্ত নিঃশ্বাস আর চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “এদিকে কেন এসেছেন ম্যাডাম?এই গলিতে কি আপনার জন্য লাল গালিচা বিছানো আছে?”

​আয়াতের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। কিন্তু সে তা বুঝতে না দিয়ে গলার স্বর উঁচিয়ে বলল, “বাড়ি যাবো তাই এসেছি!”

​”ভুল পথ দিয়ে আপনি বাড়ি যাবেন? কার বাড়ি? এই মাতালদের বাড়ি?”

​”যার বাড়িই যাই, আপনার বাড়ি আর কখনই যাবোই না!” আয়াত আবারও সামনে হাঁটতে গেলে আরভান এক হেঁচকা টানে তাকে নিজের কাঁধে তুলে নিল।

​আয়াত আর্তনাদ করে উঠল, “কি করছেন আপনি? নামান আমাকে! আমি আপনার সাথে কোথাও যাবো না। আপনি আপনার ফিউন্সের কাছে যান!”

​”চুপ! আর একটা কথা বললে সোজা ওই মাতালদের হাতে দিয়ে আসবো। তারপর ওরা তোমাকে নিয়ে যা করার করবে।”

আরভানের ধমকে আয়াত একদম চুপসে গেল। সে মিনমিন করে বলল, “আশেপাশের সব মানুষ দেখছে, নামান প্লিজ। লোকে আমাকে খারাপ ভাবছে!”

আরভান তাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে দরজা লক করে দিল। আয়াতের খুব কাছে ঝুঁকে এসে সে হাস্কি স্বরে বলল, “এদেশে সামান্য কাঁধে নেওয়া তো তুচ্ছ ব্যাপার আয়াত। কারণ এখানে মানুষ রাস্তার মাঝেই একে অপরকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। তুমি যদি চিৎকার বন্ধ না করো, তবে আমিও বাধ্য হবো ওই অস্ট্রেলিয়ানদের মতো তোমার ঠোঁট জোড়া নিজের দখলে নিয়ে তোমাকে চুপ করাতে। কি? ট্রায়াল দেবো একটা?”

​আয়াত ভয়ে আর লজ্জায় একদম পাথর হয়ে গেল। আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস তার গালে আছড়ে পড়ছে, যা তার হৃৎস্পন্দনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সিটের সাথে মিশে গিয়ে বিড়বিড় করল, “আস্তাগফিরুল্লাহ! আপনি অত্যন্ত নির্লজ্জ এবং লাগামহীন একটা মানুষ! “

​আরভান বাঁকা হেসে ড্রাইভিং সিটে ফিরে এল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে আপনমনেই বলল, “এই লাগামহীন মানুষটা নিজের পাগলামি কতটা নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা যদি তুমি বুঝতে, তাহলে নিজে থেকেই তার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে।”

​কথাটা আয়াতের কানে না পৌঁছালেও সে তখন নিজের হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক গতির সাথে লড়াই করতে ব্যস্ত।

​#তাসনিম_রিয়া_খান

চলবে….

#পর্ব_১৬
#আমার_হয়ে_থেকো
#তাসনিম_রিয়া_খান

​বাইরে মেলবোর্নের আকাশে মেঘের ঘনঘটা, ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে হাড়কাঁপানো শীত পড়েছে। ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যা আয়াতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারি করে তুলছে। আরভান নিজের স্টাডি রুমে ল্যাপটপে ডুবে আছে। কাজের চাপে তার কপালে স্পষ্ট ভাঁজ, মাঝে মাঝেই কাউকে কল দিয়ে গম্ভীর গলায় ইংরেজিতে ঝাড়ছে। মানুষটার কণ্ঠস্বরে এমন এক কর্তৃত্ব আর কাঠিন্য আছে যা শুনলে যে কেউ কেঁপে উঠবে।

​আয়াত কয়েকবার দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিলেও তার সাথে গিয়ে কথা বলার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই হলো না। সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল। সোফায় হেলান দিয়ে ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ বইটা হাতে নিল সে। যদিও বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মনটা বারবার উপরের ওই বদ্ধ দরজায় গিয়ে আছাড় খাচ্ছিল।

তার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।এই মানুষটা আদতে কেমন? কখনো বজ্রকঠিন, কখনো আবার বড্ড শিশুতোষ। । যে লোকটা তাকে ডিভোর্স দিতে বাংলাদেশে গিয়েছিল, আজ তার ব্যবহার দেখলে মনে হয় যেন আয়াতই তার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। একটা ছোট আংটি যে ১২ বছর ধরে হৃদয়ে আগলে রেখেছিল, যার জন্য লেকের বরফ শীতল পানিতে ঝাঁপ দিতে দুবার ভাবে না।সে মানুষটা কেন তাকে শুরুতে ওভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল? কেন তার সাথে এমন রুক্ষ ব্যবহার করেছিল?

​শত সংশয় আর দ্বিধা নিয়ে ​আয়াতের মন যখন বইয়ের পাতায় নিমগ্ন হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, ঠিক তখন একরাশ শীতলতা আর দামী পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ নিয়ে আরভান ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে ধপ করে আয়াতের কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। আকস্মিক এই স্পর্শে আয়াতের পুরো শরীর যেন জমে বরফ হয়ে গেল, শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেল তার। হাতের বইটা স্থির হয়ে রইল। সে নিজের অবাধ্য হৃদস্পন্দনকে কোনোমতে সামলে নিয়ে আড়ষ্ট গলায় বলল,
​”এটা কেমন বেয়াদবি আরভান? সভ্য মানুষের মতো উঠে বসুন।”

​আরভান চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেই এক চিলতে ম্লান হাসি হাসল। অত্যন্ত ক্লান্ত আর ভাঙা গলায় সে বলল, “তুমি বড্ড নিষ্ঠুর আয়াত! সেদিন বাংলাদেশের সেই পুকুরের পানির সামান্য ছোঁয়াতেই আমার গায়ে ধুম জ্বর উঠেছিল। তোমার কি একবারও মনে হলো না, আজ এই বরফ শীতল লেকের পানিতে পুরোপুরি ভিজে সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে? তোমার কি একটুও মায়া হয় না এই মানুষটার প্রতি?”

​আরভানের গলার সেই শান্ত অথচ গভীর অভিমান আয়াতের বুকের ঠিক মাঝখানে গিয়ে সজোরে বিঁধল। এমন নিবিড় আর সরাসরি অভিযোগ সে আগে কখনো শোনেনি। যেন কোনো অবুঝ বালক তার সবটুকু অধিকার নিয়ে প্রিয় মানুষের কাছে নালিশ করছে। আরভানের এই কোমল রূপটা আয়াতের কাছে একদমই অচেনা।

​আয়াতের ভেতরের সব জেদ মুহূর্তেই এক অদ্ভুত মায়ায় রূপ নিল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে আরভানের কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখার চেষ্টা করল। কপালটা সামান্য তপ্ত মনে হওয়ায় সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিতে চাইল, ঠিক তখনই আরভান চোখের পলকে তার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। সে আয়াতের আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো নিবিড়ভাবে গেঁথে দিয়ে হাতটা নিজের প্রশস্ত বুকের বাম পাশে ঠিক হৃৎপিণ্ডের ওপর চেপে ধরল।

​আয়াত স্তব্ধ হয়ে আরভানের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার হৃদস্পন্দন আজ বড্ড অস্বাভাবিক গতিতে ছুটছে। ঠিক তখনই আরভান চোখ না মেলেই ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল,
​”ওভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে কিন্তু প্রেমে পড়ে যাবেন ম্যাডাম! যাকে বলে একদম ‘হেড ওভার হিলস লাভ’।”

​আয়াত একদম থমত খেয়ে গেল। ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন! আপনার মতো দ্বিচারী লোকের প্রেমে পড়ার মতো রুচি আমার অন্তত নেই।”

​আরভান শুয়ে থেকেই আয়াতের মুখটা নিজের একদম কাছে টেনে আনল। ঝুকে পড়া আয়াতের অবাধ্য হয়ে ঝুলে থাকা চুলগুলো বড় যত্নে কানের পিছে গুজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমি আমার প্রেমে অলরেডি পড়ে গেছো আয়াত, শুধু এই জেদী মনটার কাছে হার স্বীকার করছো না। দেখো, একদিন এই জেদ ঠিকই ভেঙে যাবে, সেদিন হয়তো আমায় না দেখে এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না। তোমার এই কাজল কালো চোখের সবটুকু আকুতি শুধু এই আরভানের জন্যই বরাদ্দ থাকবে।”

আয়াত জেদ ধরে বলল, “কখনোই না! আপনার আত্মবিশ্বাসটা বড্ড বেশি। আপনি তো আমাকে ডিভোর্স দিতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন, কত নাটক করেছিলেন! তাহলে এখন সেই ডিভোর্সের কথা মুখে আনছেন না কেন? এখন এই প্রেমের অভিনয় করছেন কেন ? আমাকে মুক্তি দিয়ে আপনি নিজে কেন আপনার তথাকথিত স্বাধীন জীবনে ফিরে যাচ্ছেন না?”

আরভান উঠে বসে গাল চুলকাতে চুলকাতে খুব সিরিয়াস মুখে বলল, “আসলে কী হয়েছে জানো? ডিভোর্সের ডেট এখন এক্সপায়ার হয়ে গেছে!”

​আয়াত চোখ কপালে তুলে বলল, “কী ফালতু কথা! ডিভোর্সের ডেট আবার এক্সপায়ার হয় কীভাবে?”

​আরভান নিজের পা টা সোফার ওপর আয়াতের সামনে তুলে ধরে আক্ষেপের স্বরে বলল, “কেন হবে না? এই দেখো, তোমার চক্করে পড়ে আমার মোজাটার ডেট এক্সপায়ার হয়ে গেছে! সকাল থেকে জুতো পরে দৌড়ঝাঁপ করছি, মোজা চেঞ্জ করার কথা একদম ভুলেই গেছিলাম। দেখো কী বাজে গন্ধ আসছে!”

​আয়াত নাকে হাত দিয়ে ছিটকে দূরে সরে গেল। “ছিহ! আপনি এত নোংরা কেন? বাইরে থেকে নিজেকে তো খুব পারফেক্ট দেখান!”আর ভেতরে এই অবস্থা?”

​”ওহ হ্যালো ম্যাডাম! আমি যথেষ্ট হাইজেনিক পারসন। শুধুমাত্র তোমার পেছনে ঘুরতে ঘুরতে আমার এই বেহাল দশা হয়েছে। এখন বকবক বন্ধ করো, পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। এই অসুস্থ শরীরে কি নিজের হাতে খাওয়া যায়? একটু যদি নিজ দায়িত্বে খাইয়ে দিতে…”

​আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? আল্লাহ কি আপনাকে হাত দেননি যে আমি খাইয়ে দিতে যাবো? যত্তসব বাজে আবদার!”

​আরভান তার ব্যান্ডেজ করা ডান হাতটা করুণভাবে সামনে তুলে ধরল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুমি বোধহয় খুব বিরক্ত হলে। সরি! আসলে তোমার কাছে এমন আবদার করা আমার মোটেও ঠিক হয়নি। ভাবলাম… থাক, বাদ দাও। ইটস ওকে, আমি ম্যানেজ করে নেব। সম্ভবত বাঁ হাত দিয়ে খেতে গিয়ে সারা ঘরে খাবার ছড়াবো, ডেইজি এসে না হয় কাল পরিষ্কার করবে।”

​বলেই সে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে মুখ ভার করে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। আয়াত সেখানেই স্থাণু হয়ে বসে রইল।সে তো ভুলেই গিয়েছিল মানুষটার হাতটা ক্ষতবিক্ষত। লোকটা কি সত্যিই অভিমান করল? অভিমান, রাগ, ঘৃণা তো আয়াতের করার কথা ছিল।যে মানুষটা তাকে পদে পদে অবহেলা করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আয়াত তা করতে পারছে না। যখনই মনে পড়ে যায় সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো, তখনই আরভানের এই বিষণ্ণ চেহারাটা দেখলে আয়াতের মনে হয়— এই রুক্ষতার আড়ালে মানুষটার বুকে পাহাড় সমান কোনো যন্ত্রণা লুকানো আছে।

​আয়াত আর স্থির থাকতে পারল না। সে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।

******

ঘরের ভেতরের পরিবেশটা অত্যন্ত থমথমে, যেন এক অদৃশ্য বারুদের স্তূপের ওপর সবাই বসে আছে। জেসিকা উন্মাদের মতো একটার পর একটা ন্যাপকিন দিয়ে নাক মুছছে আর পাশের ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলছে; তার দুচোখ কান্নায় লাল হয়ে ফুলে গেছে। পাশে তার বাবা স্মিথ বসে আছেন, তিনি নির্বিকার মুখে মেয়ের এই ক্ষোভ অবলোকন করছেন। তাদের ঠিক সামনে অস্বস্তি নিয়ে বসে আছেন আরশাদ চৌধুরী। তার চোখেমুখে উদ্বেগের স্পষ্ট ছাপ।

আরভান যে আবার কোন নতুন কাণ্ড ঘটিয়েছে যার জন্য তাকে আজ স্মিথের দরবারে তলব করা হয়েছে, তা বুঝতে তার বাকি নেই। এই ছেলেটা তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেবে না; তার প্রতিটি নিখুঁত পরিকল্পনাকে সে যেন জাহান্নামে পাঠিয়েই তবে শান্ত হবে।

​​তাদের থেকে কিছুটা দূরে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লিওনার্ড নামের একজন সুঠামদেহী অস্ট্রেলিয়ান যুবক, যে মূলত স্মিথের ব্যক্তিগত কাজ দেখাশোনা করে। লিওনার্ডের দৃষ্টি জেসিকার ওপর স্থির। তার নীল চোখের মণিকোঠায় এক অদ্ভুত যন্ত্রণার প্রতিফলন; জেসিকার চোখের প্রতিটি ফোঁটা পানি যেন লিওনার্ডের হৃদয়ে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। লিওনার্ডের বুকটা এক অব্যক্ত হাহাকারে ভরে উঠলেও সে নিস্পন্দ পাথরের মতো নিরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

​জেসিকা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “আঙ্কেল, আরভান আজ আবারও আমাকে সবার সামনে চরম অপমান করেছে। এমনকি সে আমাকে হুমকি দিয়েছে যে সে আমার এমন অবস্থা করবে যাতে আমার ড্যাডও আমাকে খুঁজে পাবে না! আরশাদ আংকেল, আপনি বলেছিলেন আরভান আয়াতকে ডিভোর্স দিয়ে আমাকে বিয়ে করবে—তাহলে এখন কী হচ্ছে এসব? আরভান ওই তুচ্ছ মেয়েটার প্রতি দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে!”

​স্মিথ তার শীতল দৃষ্টি আরশাদ চৌধুরীর ওপর স্থির করে বললেন, “দেখো আরশাদ, আমাদের পুরোনো বন্ধুত্ব আর আমার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আরভানকে অনেক ছাড় দিয়েছি, কিন্তু আর নয়। তার কলিজা কত বড় যে সে আমার মেয়েকে হুমকি দেয়? আমি স্মিথ যদি একবার আঙুল ঘোরাই, তবে তোমার ছেলেকে পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার মেয়ের চোখের পানির দাম ওকে দিতেই হবে।”

​আরশাদ চৌধুরীর মস্তিষ্ক তখন দ্রুত কাজ করছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে সে শেষ চালটি চালল। সে জেসিকার দিকে তাকিয়ে ধূর্ততার সাথে বলল, “আরভান আমার ছেলে হলেও, সে চরম ভুল করছে। সে নিজের জেদের বশবর্তী হয়ে সত্যটা দেখতে চাইছে না। তবে জেসিকা, তুমি কি সত্যিই এমন একটা ছেলেকে নিজের করতে চাও যার জীবন ঝুঁকির মুখে?”

​জেসিকা আরশাদের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আরভান যতদিন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকবে, শুধু আমার হয়েই বাঁচবে। আমার নজর যখন ওকে একবার খুঁজে নিয়েছে, তখন আমার চোখের সামনে থেকে তখন অন্য কোনো মেয়ে ওকে কেড়ে নেবে—এটা আমি কক্ষনো হতে দেব না। প্রয়োজনে আমি যে কোনো সীমা অতিক্রম করতে পারি, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও আমার দ্বিধা নেই যদি সেটা আরভানকে পাওয়ার জন্য হয়।”

​আরশাদ চৌধুরী যেন এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে বললেন, “তাহলে এবার তোমাকে সরাসরি আয়াতের দিকে নজর দিতে হবে। আয়াতকে কেন্দ্র করে এমন এক জাল বুনতে হবে যাতে আরভান নিজেই তোমার কাছে ধরা দিতে বাধ্য হয়। একমাত্র আয়াতকে ব্যবহার করেই তুমি আরভানকে নিজের বশে আনতে পারবে। কারণ আরভানের দুর্বলতা এখন ওই মেয়েটাই।”

​আরশাদ চৌধুরীর এই চতুর ইশারা বুঝতে সেখানে বসা নিষ্ঠুর লোকগুলোর আর বাকি রইল না। সবার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। লিওনার্ডের এই কুচক্রী আলোচনা সহ্য করতে না পেরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

জেসিকা কিছুক্ষণ পর বিদায় নিয়ে রুম থেকে বের হতেই করিডোরে লিওনার্ড তার সামনে এসে দাঁড়াল। জেসিকা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বলল, “সামনে থেকে সরো লিওনার্ড! এভাবে পথ আটকে দাঁড়ানোর মানে কী?”

​লিওনার্ড হঠাৎ এক ঝটকায় জেসিকাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। জেসিকার ঘাড়ের কাছে মুখ গুজে দিয়ে এক গাঢ় তপ্ত স্বরে বলল, “এসব কেন করছো জেসি? কেন এতটা বেহায়া হচ্ছো? যে ছেলে তোমাকে সবার সামনে বারবার অপমান করে, এমনকি চড় মারতেও দ্বিধা করে না—তাকে পাওয়ার জন্য তোমার এত জেদ কেন? অথচ তোমার সামনে একজন বছরের পর বছর ধরে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেটা কি তোমার নজরে পড়ে না? আমার এই নীরব ভালোবাসা কি তোমার কাছে এতটাই মূল্যহীন?”

​মুহূর্তেই জেসিকার মুখের রঙ বদলে গেল। অপমানে তার শরীর কাঁপতে লাগল। সে সর্বশক্তি দিয়ে লিওনার্ডকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তার গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “একজন সামান্য কর্মচারী হয়ে মালিকের মেয়েকে নিয়ে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখছিস তুই? তোর দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি লিওনার্ড! আমি যদি ড্যাডকে তোর এই কুকীর্তির কথা বলি, তবে তোর জায়গা হবে কবরে। এখন থেকে প্রতিদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখবি, তারপর আমার সামনে দাঁড়াবি। মনে রাখিস, জেসিকা শুধু আরভানের মতো শক্তিশালী পুরুষের জন্যই বরাদ্দ, তোর মতো চাকরের জন্য নয়।”

জেসিকা ঝড়ের বেগে সেখান থেকে চলে গেল। লিওনার্ড গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। । সে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,, “এই অহংকারই একদিন তোমার পতনের মূল হবে জেসি। সেদিন দেখবে তুমি যাকে তুচ্ছ করলে, তার কাছেই তোমাকে শেষ আশ্রয় খুঁজতে আসতে হবে।”

*****

রান্নাঘর থেকে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে আরভানের রুমের সামনে থমকে দাঁড়াল আয়াত। মনের ভেতর দ্বিধার এক বিশাল পাহাড় নক করবে নাকি সরাসরি ঢুকে যাবে? নিজের সাথে একচিলতে নীরব যুদ্ধ করে গভীর একটা শ্বাস নিল সে। তারপর একপ্রকার জোর করেই পা বাড়াল ভেতরের দিকে। ঘরে ঢুকে দেখল আরভান এক হাত বুকের ওপর আর অন্য হাত চোখে ঠেকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার ঘন নিঃশ্বাসের সাথে সুঠাম বুকটা ওঠানামা করছে। আয়াত ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার একপাশে বসল।

​সে হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে আরভানকে ডাকার চেষ্টা করল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। আয়াত ভ্রু কুঁচকে ফেলল। মানুষটা কি এরমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল? সে এবার একটু জোরে কাশি দিল, তাতেও কাজ হলো না। অগত্যা সরাসরি ডাকতে শুরু করল, “এই যে শুনছেন? আরভান! আপনি কি জেগে আছেন?”

​আরভান কিছুটা নড়েচড়ে উঠল। একবার চোখ মেলে তাকিয়েই আবার বুজে ফেলল, যেন পৃথিবীর সব ক্লান্তি আজ তার চোখের পাতায় ভর করেছে। পরক্ষণেই কী মনে করে ঝট করে চোখ মেলল সে। সামনে খাবারের প্লেট হাতে আয়াতকে বসে থাকতে দেখে তার পাথরের মতো স্থির চোখের মণি একটু নড়ল। আরভান ধীরলয়ে উঠে বসে পিঠ ঠেকাল বিছানার হেডবোর্ডে। কণ্ঠস্বর কিছুটা বসা, কিন্তু গভীর। সে বলল, “তুমি এখানে কেন? এই অসময়ে?”

​আয়াত খাবারের প্লেটটা সযত্নে কোলের ওপর রেখে বলল, “অসময় না, এটা খাওয়ার সময়। আর খালি পেটে ওষুধ খেলে শরীর আরও বিগড়ে যাবে। এতটুকু বোঝার বয়স তো আপনার হয়েছে নিশ্চয়ই?”

​আরভান কোনো কথা না বলে অপলক দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই মায়াবী অথচ তীক্ষ্ণ চাহনি আয়াতকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে দিল। আয়াতের মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও তার হাতের আঙুলগুলো খুব যত্ন করে আরভানের জন্য ছোট ছোট ভাতের লোকমা তৈরি করছিল। আয়াত প্লেটটা উঁচিয়ে ধরে বলল, “আমি ভালো করে হাত ধুয়ে নিয়েছি, বিশ্বাস না হলে চেক করে নিতে পারেন। আপনারা তো চামচ ছাড়া খেতে পারেন না। কিন্তু আমি হাত ছাড়া নিজেও খেতে পারি না, কাউকে খাওয়াতেও পারি না। তাই, আমার হাত দিয়েই খেতে হবে। কোনো আপত্তি চলবে না।”

​আরভান বাধ্য ছেলের মতো হা করল। কয়েক লোকমা খাওয়ার পর সে হঠাৎ আড়চোখে তাকিয়ে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এর আগে কাউকে এভাবে খাইয়ে দিয়েছো নাকি?”

​আয়াত বেশ উদাস ভঙ্গিতে বলল, “হুম, খাইয়েছি তো। আরিয়ানকে প্রায়ই খাইয়ে দিতাম, মাঝে মাঝে শাহজাদীও আসত জোর করে খাওয়ার আবদার নিয়ে।”

​আরভান এক মুহূর্ত স্থির থেকে গম্ভীর মুখে বলল, “আরিয়ান কে? সেই পিচ্চি ছেলেটা? সে তো ততটাও বাচ্চা নয় যে তাকে খাইয়ে দিতে হবে।”

​আয়াতের ভ্রুও কুঁচকে গেল। “এটা কেমন কথা! ও ছোট হোক আর যাই হোক, ও আপনাদের বাড়ির আদরের ছেলে।”

​আরভান এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “যে যার যাই হোক না কেন, নেক্সট টাইম থেকে এই ‘আদর’ বিতরণ সেবাটা সবার জন্য বন্ধ। বিশেষ করে কোনো পুরুষের জন্য এই হাতের ছোঁয়া বরাদ্দ রাখা আমার একদমই পছন্দ নয়। সে ছোট ভাই হোক বা রক্তের আত্মীয়।

আয়াত থমত খেয়ে বলল, “তার মানে? আপনি কি এখন আমাকে আপনার সেবা থেকেও বরখাস্ত করছেন? আপনি চাইলে আমি এখনই চলে যেতে পারি।”

​আরভান আয়াতের কবজিটা আলতো করে ধরে নিজের দিকে টেনে বলল, “বরখাস্ত নয় আয়াত, আমি তোমাকে শুধু আমার জন্য সংরক্ষিত করতে চাইছি।”

​আয়াত আর কথা বাড়াল না। এই কয়েকদিনে এই মানুষটার অদ্ভুত অধিকারবোধ মাখানো কথাগুলো তার কানে সয়ে গেছে। খাবার শেষে আয়াত আরভানের দিকে পানি এগিয়ে দিল। পাশে রাখা ওষুধগুলো হাতে নিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। জানি না উত্তর পাবো কি না, তবুও করছি। আপনি কি সত্যিই আমাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলেন? নাকি সবটাই কোনো সাজানো নাটক ছিল?”

​আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরস্থির গলায় বলল, “হুম, সত্যিই চেয়েছিলাম। তোমাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম।”

আয়াত ব্যথিত হৃদয়ে জানতে চাইল, “কেন?”

“সব প্রশ্নের উত্তর এখন পাওয়ার চেষ্টা করো না আয়াত। কিছু সত্যের মুখোমুখি হতে গেলে উপযুক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়। অসময়ে কোনো সত্য জানলে সেটা হজম করার শক্তি তোমার নাও থাকতে পারে।”

​আয়াত রেগে গিয়ে বলল, “আপনার এই রহস্যময় কথাগুলো আমি একদম সহ্য করতে পারি না। মনে হয় সব সময় কোনো গোলকধাঁধায় ফেলে রাখছেন আমায়। তা… এখনো কি সেই ডিভোর্সটা দিতে চান?”

আরভান এবার আয়াতের চোখের গভীরে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, “না। এখন আর চাই না।”

“এখন কেন চান না?”

“কারণ আমি বড্ড স্বার্থপর হয়ে গেছি আয়াত। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এই জীবনে একটু আলোর ছোঁয়া পেলে কে-ই বা তাকে ছেড়ে দিতে চায় বলো?”

​আয়াত নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, “যদি বলি আমি এখনও সেই ডিভোর্স চাই?”

আরভান তখন টেবিল থেকে একটা ওষুধ তুলে নিচ্ছিল। আয়াতের কথায় তার হাত একটু স্থির হলো, তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “চাইলেই কি আর সব পাওয়া যায়? আমি যখন চেয়েছিলাম তুমি দিতে চাওনি—তেমনি তুমি চাইলে এখন আমি দিচ্ছি না। হিসাব সমান।”

​আয়াত কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে দেখল আরভান একটা ওষুধ হাতে নিচ্ছে। সে জিজ্ঞেস করল, “ওটা কিসের ওষুধ?”

আরভান ওষুধটা মুহূর্তেই মুখে দিয়ে গিলে ফেলল। “ব্যথার।”

“ডাক্তার আপনাকে ব্যথার জন্য এতগুলো ওষুধ দিয়েছে? সে কি আদেও ডাক্তার নাকি অন্য কিছু?”

আরভান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। “আপনি আপনার ডাক্তারিটা বন্ধ করে নিজের পড়ায় মন দিন ম্যাডাম! আমার ডাক্তার খুব ভালো করেই জানে আমার ব্যথাটা ঠিক কোথায়।”

​আয়াত রাগে গজগজ করে ট্রে গোছাতে শুরু করল। বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য লোক! যতই যার জন্য করি না কেন, শেষমেশ কোনো অধিকারই থাকে না।”

​আরভান বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি হাসি। সে বলল, “আমার ওপর তো তোমার অধিকার অনেক। যেমন ধরো—আমি যেহেতু এখন অসুস্থ, আর বাইরেও প্রচণ্ড শীত… তাই তুমি চাইলে আজ রাতে আমার এই বিশাল বিছানার একপাশে এক চিলতে জায়গা…

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আয়াত পাশের একটা বালিশ তুলে আরভানের মুখের ওপর সজোরে ছুড়ে মারল। রাগে আর লজ্জায় মুখ লাল করে সে বলল, “আপনি একটা আস্ত অসভ্য পিশাচ! অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে মতলব খোঁজা হচ্ছে? আপনাকে দয়া করতে আসাই আমার বড় ভুল হয়েছে, আমি বারবার একই ভুল করছি!”

​আয়াত দ্রুত প্লেট নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে শোনা গেল আরভানের হাসির শব্দ। করিডোরে দাঁড়িয়ে আয়াত নিজের উত্তপ্ত গালে হাত দিল। এই লোকটা কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে, নাকি কেবলই হৃদয়ের সাথে খেলা করছে? আয়াতের মনের ভেতরে এখন হাজারো প্রশ্নের মেলা, কিন্তু সেই ভরাট কণ্ঠের মায়াটা সে কোনোভাবেই এড়াতে পারছে না।

চলবে..

(রিচেক দেইনি তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ❤️)