Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-১৭+১৮

আমার হয়ে থেকো পর্ব-১৭+১৮

0
489

#পর্ব_১৭
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

নিচে থেকে আসা খিলখিল হাসি আর উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার আওয়াজে আরভানের ঘুমটা চট করে ভেঙে গেল। বিরক্তি নিয়ে উঠে বসে কয়েক সেকেন্ড শব্দের উৎস বোঝার চেষ্টা করল সে। কপালে হাত দিয়ে বিরক্তিটা সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই আরভানের চোখ স্থির হয়ে গেল। নিচের কাউচে বসে আয়াত আর ফারহান হাসি-তামাশায় মত্ত, তাদের মাঝে একটা লুডু বোর্ড পাতা।যেন কোনো মহাযুদ্ধে নেমেছে দুজন।

​আরভান নিজেকে কোনোমতে সংযত করে নিচে নেমে এল। গলার স্বর যতটা সম্ভব গম্ভীর করে আয়াতকে বলল, “এখানে কী হচ্ছে এসব? তোমার কি আজ কলেজ নেই?”

​আয়াত ভ্রু কুঁচকে একবার আরভানের দিকে তাকিয়ে আবার লুডু বোর্ডে মনোযোগ দিয়ে বলল, “আজ কলেজে যাব না। আর চোখে দেখছেন না? আমরা লুডু খেলছি।”

​আরভানের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, “হঠাৎ কলেজে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কেন?”

​আয়াত কোনো উত্তর দিল না। আরভান এবার সোজা ফারহানের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল, “তোকে না বলেছি এই বাড়িতে যখন-তখন না চলে আসতে? এটা কি কোনো ক্লাবঘর পেয়েছিস?”

​ফারহান মুখ গম্ভীর করে নাটুকে ভঙ্গিতে লুডুর ছক্কাটা হাতবদল করে বলল, “তোর কাছে আসিনি আমি, আমি এসেছি আমার বনুর কাছে। ভাই হিসেবে কি বোনের সাথে লুডু খেলাও অপরাধ?”

“এই বনু-মনু এসব আদিখ্যেতা বন্ধ করে এখনই এখান থেকে বের হ। রাতে বিজনেস মিটিং আছে, তাই সব কাজ দিনে শেষ করতে হবে।”তুই এখন আসতে পারিস।”

ফারহান আয়াতকে বিদায় জানিয়ে একদম সিরিয়াস ভঙ্গিতে নাটক শুরু করল,

“বউ পেলে বন্ধু পর হয়ে যায়। এই কথাটা আগে বিশ্বাস করিনি, কিন্তু এখন হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। ছিঃ এভি, তোর মতো পাষাণ বন্ধু আমার কপালে ছিলরাতে যে ইম্পর্ট্যান্ট ফাইলটা চেয়েছিলি, সেটা টেবিলের ওপর রেখে গেলাম। আসছি আয়াত, পরে কথা হবে।”

​ আরভান ফারহানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “দাঁড়া, তোর এই ওভার-ড্রামার চূড়ান্ত ব্যবস্থা অফিসে গিয়ে করছি।”

ফারহান চলে যেতেই আয়াত বিরক্তিতে মুখ ঘুরিয়ে গুম মেরে বসে রইল। আরভান এগিয়ে এসে টি-টেবিলের ওপর আয়াতের সামনাসামনি হয়ে বসল। আয়াতের থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মুখটাকে এমন ‘অফুল’ করে রেখেছ কেন? সবার সামনে তোমার হিহি করে হাসি ফুটে ওঠে, আর শুধু আমার সামনে আসলেই মনে হয় যেন তিতা করলা চিবিয়েছ।”

​আয়াত তপ্ত স্বরে বলল, “যে হাসতে জানে না, তার সামনে আমারও হাসি আসে না।”

​”রিয়েলি? দেন আমিও হাসছি— হাহাহা! এবার খুশি? এখন হাসো।”

​আরভানের এমন কৃত্রিম আর অদ্ভুত হাসি দেখে আয়াতের পেটে ফেটে হাসি আসছিল, কিন্তু সে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে আটকে রাখল। তবে বেশিক্ষণ সে তা চেপে রাখতে পারবে বলে মনে হলো না। আরভান নিজের মুখ যে আদলে বানিয়ে রেখেছে, তা দেখে বেশিক্ষণ গাম্ভীর্য ধরে রাখা অসম্ভব। যেকোনো সময় তার হাসি ফেটে বের হয়ে যাবে। নিজের দুর্বলতা লুকাতে আয়াত হুট করে উঠে চলে যেতে চাইল।

​কিন্তু আরভান চট করে তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে আবার সোফায় বসিয়ে দিল। আরভান খুব কাছাকাছি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “পালাচ্ছ কেন আয়াত? অপরাধী যখন ধরা পড়ে তখন সে হয় হাসে, নয়তো কাঁদে। তোমার ঠোঁটের কোণ কাঁপছে, তার মানে তোমার ভেতরে হাসির সুনামি চলছে। আগে হেসে দেনা শোধ করো, তারপর যাবে।”

​আয়াত মুখটা শক্ত করে বলল, “আপনার এই জোড়াতালির হাসি দেখে আমার একটুও হাসি পাচ্ছে না, উল্টো ভয় লাগছে।”

​আরভান ভ্রু কুঁচকে বলল, “ভয়? মিস্টার আরভান চৌধুরীর এক একটা হাসির ছবি তোলার জন্য ফটোগ্রাফাররা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তুমি সেটা ফ্রিতে পেয়েও বলছো ভালো না? লিসেন, আমি হাসলে মানুষ প্রেমে পড়ে যায়, আর আমি চাইছি তুমি অন্তত একবার আমার এই হাসির প্রেমে পড়ো।”

​আয়াত হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে নাক কুঁচকে বলল, “আপনার প্রেমে পড়ার চেয়ে হিমালয় থেকে ঝাঁপ দেওয়া অনেক বেশি সহজ কাজ। আর আপনার আত্মবিশ্বাস তো মাশাআল্লাহ! একটু জমিনে পা নামিয়ে কথা বলুন।”

​আরভান হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম করে বলল, “আয়াত, আমার জন্য তোমার অনুভূতিটা আসলে ঠিক কী? ঘৃণা, মায়া, নাকি দয়া?”

​আরভানের এমন হঠাৎ বদলে যাওয়া স্বরে আয়াত অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে কী বলবে? সে চেয়েও ঘৃণা করতে পারছে না, উল্টো লোকটার প্রতি এক অদ্ভুত মায়া কাজ করছে। আর দয়া? এই সম্পর্কে দয়া শব্দটা বোধ হয় তার জন্যই প্রযোজ্য। তার নিজের তো নিজের প্রতি দয়া হয়। আয়াত মনে মনে ভাবল— কেন এই ছোট জীবনটা এমন একটা জটিল গোলকধাঁধা হলো? কেন একটু সুন্দর ভালোবাসাময় জীবন পাওয়া হলো না? কেন সব পাওয়া সত্ত্বেও এই মানুষটার মনে পৌঁছানো এত কঠিন?

​আয়াত কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কী চান? আমার কী করা উচিত? সেই শুরু থেকে আপনিই তো সব জট পাকিয়ে রেখেছেন।”

​আরভান খুব নিচু গলায় বলল, “ঘৃণা করো, মায়া করো কিংবা ভালোবাসো—সবকিছুতে আমার সায় আছে। শুধু দয়া করো না আমায়। ওটা আমি নিতে পারি না, বড্ড গায়ে লাগে।”

​আরভানের কণ্ঠের সেই বিষণ্ণতা আয়াতকে আবারও বিচলিত করে তুলল। প্রসঙ্গ ঘোরাতে সে বলল, “এসব বাজে প্যাঁচাল রাখুন তো! আগে বলুন— আমায় আপনি কী ফোন দিয়েছেন? কখনো হঠাৎ নিজে নিজে স্ক্রিন অন হয়, আবার ডেটা অফ থাকা সত্ত্বেও নোটিফিকেশন আসে। মনে হচ্ছে কেউ অ্যাক্সেস করেছে।”

​আরভান আয়াতের হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে আয়েশ করে বলল, “হয়তো তোমার ফোন হ্যাক হয়েছে। ফোনে পাসওয়ার্ড যদি নিজের নামে রাখো, তবে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। তোমার উচিত ছিল ‘আরভান দ্য গ্রেট হাজব্যান্ড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ এমন টাইপের পাসওয়ার্ড দেওয়া।”

​আয়াত অবাক হয়ে বলল, “আপনি আমার পাসওয়ার্ড জানলেন কীভাবে? তার মানে আপনিই আমার ফোন হ্যাক করেছেন?”

​আরভান একপাশে মাথা কাত করে হাসল। “গবেট! এটাকে আইকিউ নলেজ বলে। তোমার মতো বোকা মেয়ের পাসওয়ার্ড গেস করতে হ্যাকার হওয়া লাগে না।”

​আয়াত ফোনটা নিতে গেলে আরভান সেটা সরিয়ে ফেলল এবং স্ক্রিনে কী যেন টিপতে শুরু করল। আয়াতের বুকের ভেতর হঠাৎ ‘চোরের মন পুলিশ পুলিশ’ অবস্থা—যদি আরভানের অগোচরে তোলা সেই ছবিগুলো এখন সে দেখে ফেলে! বোকা আয়াত হয়তো ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারল না যে তার ফোন সত্যিই হ্যাকড এবং তার সামনে বসা হ্যাকারটি ওই ছবিগুলো অগোচরে তোলার সময়ই দেখে হেসে উঠেছিলো।

​আয়াত মরিয়া হয়ে বলল, “ফোন দিন! কারো ব্যক্তিগত জিনিস অনুমতি ছাড়া দেখা অন্যায়। তা ছাড়া আমি কি কখনো আপনার ফোন চেক করেছি?”

​ফোন নিয়ে দুজনের মধ্যে রীতিমতো টানাটানি শুরু হলো। এক পর্যায়ে ফোন কেড়ে নিতে গিয়ে আয়াত ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি আরভানের গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। আরভানের প্রশস্ত বুকের উষ্ণতা আর আয়াতের এলোমেলো নিঃশ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আয়াতের চুলগুলো আরভানের মুখের উপর এসে পড়ছিল। আয়াত দ্রুত সরে আসতে চাইল, কিন্তু আরভান শক্ত হাতে আয়াতের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে চেপে ধরল।

​আরভানের চোখের মণিতে তখন এক গভীর নেশা। সে আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, “চাইলে সব চেক করতে পারো—ফোন, এই হার্টবিট… এমনকি আমাকেও। ইউ ওয়ান্ট টু চেক মি, আয়াত? আমি কিন্তু ওপেন বুক, শুধু পড়ার মতো মন থাকা চাই।”

​আয়াতের হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল। সে ধকপক করা বুক নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “ক..কোন প্রয়োজন নেই! ছাড়ুন আমাকে।”

​আরভান আয়াতের চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে বলল, “আমি যদি ছেড়ে দেই, তবে তুমি চাইলেও কিন্তু আমাকে আর নিজের করে ধরে রাখতে পারবে না আয়াত। সময় বড্ড কম আয়াত, সুযোগ থাকতে আগলে নিতে শেখো।”

​এমন রহস্যময় কথার মানে বুঝতে না পেরে আয়াত কিছুক্ষণ আরভানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আরভানের ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটতে দেখে আয়াত জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। তার শ্বাস দ্রুত পড়ছে, গাল দুটো লজ্জায় রক্তিম হয়ে আছে। আরভান সোফায় হেলান দিয়ে বসে স্বাভাবিক গলায় বলল, “নেক্সট টাইম এভাবে কোনো পুরুষের সাথে বেশি ফ্রি হবে না, সেটা ফারহান হলেও নয়। এবার যাও কলেজের জন্য রেডি হও।”

​আয়াতের মেজাজ এবার বিগড়ে গেল। কিছুক্ষণ আগের আরভান আর এখনকার হুকুমদাতা আরভানের মিল খুঁজে পাওয়া ভার। সে দৃঢ় গলায় বলল, “আমি কলেজে যাব না।”

​আরভান এবার বেশ কড়া গলায় প্রশ্ন করল, “কেন যাবে না?”

​”আপনার জন্য! আপনি কলেজে দিয়ে আসার পর থেকে সবাই আমাকে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে।”

​”সবাই কী জানতে চায়?”

​”সবাই জানতে চায় আপনার সাথে আমার সম্পর্ক কী? আপনি আমার কে হন।”

​”হুম, তো সমস্যা কী? বলে দেবে আমি তোমার হাজব্যান্ড।”

​আয়াত জেদ ধরে বলল, “না আপনি আমার হাজব্যান্ড আর না আমি আপনার ওয়াইফ—তাহলে হাজব্যান্ড বলার প্রশ্নই আসে না!”

​আরভান এবার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “ওকে, নো প্রবলেম। তাহলে বলবে— লাভার!”

​কথাটা অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে বলে সে গম্ভীর ভঙ্গিতে উপরে চলে গেল। আয়াত কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই লোকের সাথে কথা বলা মানেই নিজের মাথা খারাপ করা। সে গজগজ করতে করতে রেডি হতে চলে গেল।

***-*

গাড়ির ভেতর আজ এক অসহ্য নীরবতা। সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা, হয়তো কোনো একসময় ধুম বৃষ্টি নামবে। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার চেয়েও গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন অনেক বেশি শীতল আর রহস্যময়। ​পুরোটা পথ আরভান আর আয়াতের মধ্যে একটি শব্দও বিনিময় হলো না। আয়াত আড়চোখে কয়েকবার আরভানের শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল আর স্টিয়ারিংয়ে রাখা ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে তাকালো। আরভান হয়তো আয়াতের অস্থিরতা বুঝতে পারছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল সামনের ধূসর রাস্তার দিকে নিবদ্ধ। দুজনের এই মৌনতা যেন হাজারো না বলা কথার পাহাড় হয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। আরভানের গম্ভীর মুখটা আজ কেন যেন আয়াতের মনে এক অজানা আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছিল।

গাড়ি কলেজের সামনে দাঁড়াতেই আয়াত কোনো কথা না বলে, এমনকি সৌজন্যমূলক বিদায়টুকু না জানিয়েই নেমে গেল। আরভান গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আয়াতের চলে যাওয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল।

​আয়াত দ্রুত পায়ে করিডোর দিয়ে ক্লাসের দিকে যেতেই তার চোখ পড়ল ক্যাম্পাসের ওপেন ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে বসে থাকা অ্যালানের ওপর। আজ যেন আয়াতের কাছে মেঘ না চাইতেই জল পাওয়ার মতো অবস্থা। সে চারপাশের কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সরাসরি অ্যালানের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তাকে দেখে অ্যালান কিছুটা অবাক হয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো।

​”হোয়াটসঅ্যাপ আয়াত! কেমন লাগছে আমাদের কলেজ? প্লিজ, বসো তুমি।”

​আয়াত সৌজন্যবোধের ধার না ধেরে সরাসরি একটা চেয়ার টেনে বসল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে গম্ভীর গলায় বলল, “ক্যান আই আস্ক ইউ এ কোয়েশ্চেন মিস্টার অ্যালান?”

​আয়াতের চোখের তীক্ষ্ণতা আর সরাসরি ভঙ্গি দেখে অ্যালান নড়েচড়ে বসল। নিজের শিরদাঁড়া সোজা করে সে বলল, “ইয়া সিওর! হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু নো?”

আয়াত কোনো ভনিতা ছাড়াই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিল।

​”আরভানের সাথে আপনার আসল সম্পর্কটা কী?”

​অ্যালান একটু চুপ থেকে ম্লান হাসল, তারপর বলল, “উই আর এক্স-ফ্রেন্ডস।”

​আয়াতের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। তার মনের ভেতর হাজারো নেতিবাচক চিন্তা উঁকি দিতে শুরু করল। আয়াতের এমন অভিব্যক্তি দেখে অ্যালান শব্দ করে হেসে উঠল। “ভয় পেয়ো না আয়াত! এক্স-বয়ফ্রেন্ড নয়; উই অয়্যার বেস্ট ফ্রেন্ডস।”

​আয়াত নিজের ভাবনার জন্য মনে মনে কিছুটা লজ্জিত হলো। যদিও বর্তমান যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে এসব খুব সাধারণ, তবুও আরভানের ক্ষেত্রে এমন চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। তবে কৌতূহল তাকে ছাড়ল না। সে প্রশ্ন করল, “তাহলে সেদিন আপনার সাথে ওমন রূঢ় ব্যবহার কেন করেছিল ও? কেন আপনাকে ফ্রড বলেছিল? আর আপনি কেন ফারহান ভাইকে বলেছিলেন যে আপনি যা করেছিলেন তা ওকে বাঁচাতেই করেছিলেন?”

​অ্যালান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখে পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে উঠল। “এভি আমার ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। সব ঠিক ছিল; ও একবার বাংলাদেশে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফেরার পর কেন জানি হঠাৎ খুব পাল্টে গিয়েছিল। নিজেকে গুটিয়ে নেয় সবার থেকে। তবুও আমাদের সম্পর্কটা অটুট ছিল। ফারহানও এ দেশে পড়তে আসার পর আমরা তিনজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপর আরভানের ব্যক্তিগত জীবনের এমন এক জটিলতা সামনে এল যা ও সামলাতে পারছিল না। আরভানের পারমিশন না নিয়ে আমি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যা আরভান সহজভাবে নিতে পারেনি।অথচ আমি শুধু চেয়েছিলাম ও যেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে।”

​আয়াতের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “সেটা কি কোনো মেয়েজনিত ব্যাপার ছিল? আরভান কি… আই মিন, ও কি কোনো মেয়ের সাথে খুব খারাপ কিছু করেছিল? কোনো অন্যায়?”

​আয়াতের ভাবনায় তখন আরভানের সেই রুক্ষ মেজাজ আর জেসিকার মতো মেয়েদের সাথে ওর দহরম-মহরমের চিত্র ভেসে উঠছিল। মন বলছিলো আরভান কোনো জঘন্য অতীত লুকিয়ে রেখেছে!

​কিন্তু আয়াতের ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে অ্যালান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “কেন? এভি তোমাকে কিছু বলেনি ওর ব্যাপারে?”

আয়াতের মুখ থমথমে হয়ে গেল। সে ম্লান স্বরে বলল, “না, সে তো কিছুই বলেনি। সব কথাই তো সে রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।”

​”দাঁড়াও আয়াত! তুমি বলতে চাইছো, তুমি এমন একজনকে বিয়ে করেছো যার জীবন সম্পর্কে তোমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই? তোমরা কি একে অপরকে চিনে বিয়ে করোনি?”

​আয়াত টেবিলের ওপর রাখা আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জড়াচ্ছিল। সে নিচু স্বরে বলল, “আরভানের সাথে আমার যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন আমার বয়স মাত্র ৮ বছর। তখন আমি বিয়ের অর্থটুকুও বুঝতাম না। বাবা-মা আর দাদাজান বলেছিলেন তাই ‘কবুল’ বলেছিলাম। এই অস্ট্রেলিয়া আসার আগ পর্যন্ত আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। সম্পর্কটা ছিল কেবল কাগজের।”

​অ্যালান যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিস্ময়ে তার মুখ হাঁ হয়ে গেল। “হোয়াট! ৮ বছর বয়সে বিয়ে? আর সেই বিয়েতে এভি রাজি হয়েছিল? দিস ইজ ইম্পসিবল! ও তো কোনোদিন আমাকে এসব বলেনি। তাছাড়া আরভান তো সবসময় চাইল্ড ম্যারেজের ঘোর বিরোধী ছিল। সেই মানুষটা নিজের জীবনে এরকম একটা কাজ করেছে, তাও…”

আয়াত আতঙ্কিত গলায় বলল, “তাও কী? অ্যালান, প্লিজ বলুন! আরভান কি অন্য কাউকে ভালোবাসত?”

******

আরভান কিছুটা দূরে যাওয়ার পর হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশের সিটে পড়ে থাকা আয়াতের নোটবুকের ওপর। মেয়েটাকে নিয়ে সে কী করবে ভেবে পায় না। মেয়েটার জেদ আর অভিমান দুটোই যেন আকাশছোঁয়া। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি ঘুরিয়ে সে আবারও কলেজের দিকে রওনা হলো।

​ক্যাম্পাসে আসতেই আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়ার কোণে অ্যালানের সাথে গভীর আলাপে মগ্ন আয়াত। মুহূর্তেই আরভানের মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। অ্যালান আরভানকে আসতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়াল।

​”এভি, প্লিজ কুল ডাউন! আমরা জাস্ট একটা নরমাল কনভারসেশন করছিলাম।”

​আরভান তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করল না। সে সোজা আয়াতের হাত শক্ত করে ধরে এক প্রকার টানতে টানতে পার্কিং লটের দিকে নিয়ে গেল…

চলবে…

#পর্ব_১৮
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

গাড়িটা কিছুটা দূরে আসার পর হঠাৎ আরভানের চোখ পড়ল পাশের সিটে পড়ে থাকা আয়াতের নোটবুকের ওপর। মেয়েটাকে নিয়ে সে কী করবে ভেবে পায় না। মেয়েটার জেদ আর অভিমান দুটোই যেন আকাশছোঁয়া। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি ঘুরিয়ে সে আবারও কলেজের দিকে রওনা হলো।

কিন্তু ​ক্যাম্পাসে আসতেই আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়ার কোণে অ্যালানের সাথে গভীর আলাপে মগ্ন আয়াত। মুহূর্তেই আরভানের মাথায় যেন রক্ত উঠে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। অ্যালান আরভানকে আসতে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়াল।

​”এভি, প্লিজ কুল ডাউন! আমরা জাস্ট একটা নরমাল কনভারসেশন করছিলাম।”

​আরভান তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করল না। সে সোজা আয়াতের হাত শক্ত করে ধরে এক প্রকার টানতে টানতে পার্কিং লটের দিকে নিয়ে গেল। ব্যথায় কুঁচকে গিয়ে আয়াত চিৎকার করে উঠল, “সমস্যা কী আপনার? মানুষের সাথে ব্যবহার করার নূন্যতম ভদ্রতাও কি আপনি জানে না?হাত ছাড়ুন আমার!”

​আয়াতকে গাড়ির সাথে একপ্রকার চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে আরভান দাঁতে দাঁত চিপে গর্জে উঠল।

​”এই মেয়ে, তোমার সমস্যা কী? কথা কি কানে যায় না? আমাকে নিয়ে তোমার এত কৌতূহল কেন? এখানে পড়াশোনা করতে এসেছো, পড়াশোনা করো! নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে খুঁড়ে খুঁড়ে জেনে তোমার কোনো লাভ হবে না। আমি তোমার জীবনের কেউ না, বুঝেছো তুমি? আমি স্রেফ একটা অতীত যা তোমার ভুলে যাওয়া উচিত।”তোমাকে শতবার বারণ করেছি অ্যালানের সাথে কথা বলবে না, তবুও তুমি আমার নিষেধ অমান্য করে একই কাজ করছো। কী প্রমাণ করতে চাইছো তুমি? অ্যানসার মি!”

আয়াত ব্যথায় নীল হয়েও আরভানের আগুনের মতো তপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বর্তমানে সামনে দাঁড়িয়ে অধিকার দেখিয়ে কথা বলছেন, অথচ মুখে বলছেন আমি আপনার জীবনের স্রেফ একটা অতীত! যদি অতীতই হন, তবে অতীতের মতো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যান না কেন? কেন বারবার আমার সামনে এসে দাঁড়ান? কেন ছায়ার মতো আমার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চান?”

​আয়াত রাগে কাঁপতে কাঁপতে আবারও বলল, “আপনি আসলে ভয় পাচ্ছেন, তাই না? ভয় পাচ্ছেন কারণ আপনার আসল রূপ বের হয়ে আসবে? আমি সব জেনে যাবো যে আপনি একজন সস্তা চরিত্রহীন লোক! আপনি বাইরে নিজেকে খুব পবিত্র আর নীতিবান দেখান, অথচ তলে তলে না জানি কত মেয়ের সাথে কী কী করেছেন তা লুকোতে চাচ্ছেন। আর এই জন্যই কি আমাকে জোর করে নিজের বাড়িতে রেখেছেন? আমাকে ভোগ করার পর যখন নতুন শরীরের নেশা চড়বে, তখন আমাকে ছুঁড়ে ফেলবেন, তাই না?”

আয়াতের কথাটা শেষ হতেই আরভানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল, চোয়াল শক্ত হয়ে কপালের নীল শিরাগুলো ক্রোধে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো। এমন জঘন্য অপবাদ শুনে আরভান যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল।সে সজোরে আয়াতের দুই গাল চেপে ধরল। তার হাতের আঙুলগুলো আয়াতের নরম গালে ডেবে গেল। হাতের চাপে পিষ্ট হয়ে ব্যথায় আয়াত চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।

​আরভান হিসহিস করে বলল, “আর একবার যদি এমন নোংরা অপবাদ দাও, তবে আমি আমার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব আয়াত! আরভান চৌধুরীর জীবনে কোনোদিন অন্য কোনো মেয়ে ছিল না। তোমাকে ছাড়া সে আজ পর্যন্ত কোনো পর-নারীকে স্পর্শ করেনি। ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু কোয়েশ্চেন মাই ক্যারেক্টার! যদি আমার চরিত্র এতটাই খারাপ হতো, তবে আজ তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সুযোগ পেতে না।এই কয়দিনে আমার লালসার চিহ্ন তোমার শরীরের প্রতি ইঞ্চিতে থাকত, তোমাকে আমি পশুপাখির মতো নিংড়ে নিতাম। কিন্তু আমি তোমাকে আগলে রেখেছি, সেটা কি তোমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে ঢোকে না?”

​ব্যথায় আয়াতের চোখের কোণ ঘেষে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে আরভানের হাতে পড়ল। পানির সেই উষ্ণতা স্পর্শ করতেই আরভানের হাতের বাঁধন যেন মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেল। সে আলগা করে দিল তার হাতের মুঠো। আয়াত নিজেকে সরিয়ে নিয়ে তেতে উঠে বলল,
“আপনি আসলে একজন অমানুষ! শুধু গায়ের জোর আর পেশিশক্তি প্রদর্শন করা ছাড়া আপনার আর কোনো ক্ষমতা নেই।আপনার ভেতরে কোনো আত্মা নেই, শুধু আছে একরাশ নিষ্ঠুরতা!”

​আয়াত নিজের ক্ষোভ ঝাড়তে থাকলেও হঠাৎ আরভান গাড়ির পাশ ঘেঁষে মাটিতে বসে পড়ল। আরভানের এমন আকস্মিক অবনতি দেখে আয়াত হকচকিয়ে গেল। আরভান জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। কিন্তু তার অসহ্য যন্ত্রণাকাতর মুখভঙ্গি দেখেও এখন আয়াতের মনে বিন্দুমাত্র মায়া কাজ করছে না।

​সে রাগের মাথায় বলল, “এখন আবার এখানে বসে নাটক করছেন? এই নাটকগুলো কি আগে থেকে মুখস্থ করা? নিজেকে অসহায় দেখিয়ে এখন সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন? আপনার এই অভিনয় আমি আর গলছি না মিস্টার আরভান!”

​তার তীক্ষ্ণ কথার মাঝেই আরভান টলতে টলতে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। আয়াতের দিকে শেষবারের মতো এক নজর তাকিয়েও দেখলো না সে। পাশ কাটিয়ে টলমল পায়ে গাড়িতে গিয়ে বসল এবং কোনো বাক্য ব্যয় না করে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেল। যেন হঠাৎ আসা কোনো ঝোড়ো হাওয়া সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে চলে গেল।

*****

আয়াত দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সেই জনশূন্য পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে রইল। কলেজের প্রতি সব আগ্রহ যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। তার মনের ভেতর এখন কেবল একটিই সুর বাজছে—মুক্তি।

এই বিভীষিকাময় অনিশ্চয়তা থেকে সে নিষ্কৃতি চায়। সে ঠিক করে নিয়েছে, আর এই দেশে ওই লোকটার ছত্রছায়ায় সে এক মুহূর্তও থাকবে না। নিজেকে সামলে নিয়ে গেটের দিকে এগোতেই একটি গাড়ি তার সামনে এসে থামল। কাঁচ নামিয়ে ফারহান উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“আয়াত, প্লিজ গাড়িতে উঠে বসো। বাইরে আবহাওয়া ভালো না।”

​রাগে আর অভিমানে কাঁপতে থাকা আয়াত তিক্ত স্বরে বলল, “আমি আপনার গাড়িতে উঠব না ফারহান ভাইয়া। কারণ আমি জানি, আপনার ওই নোংরা বন্ধুই আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে। আপনি নিজে থেকে আসেননি।”

​ফারহান একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আয়াত, জীবনের সবটা জেদ দিয়ে চলে না। আমি তোমার একজন বড় ভাই হয়ে বলছি, অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিটা বোঝো। আসো।”

​আয়াত ফারহানের দিকে আকুতিমাখা চোখে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, যদি সত্যিই আমাকে ছোট বোন মনে করেন, তবে দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমি আর এখানে থাকতে পারছি না। এই দমবন্ধ করা জীবন আমাকে মেরে ফেলছে।”

ফারহান অবাক হয়ে আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “এসব কী বলছো আয়াত? তুমি পড়াশোনা করছো, সামনে লয়ার হবে। সামনে তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তুমি কি জানো, আরভান কিছুদিন আগে ও তোমার নামে কোম্পানির বিশাল পার্সেন্টেজ শেয়ার কিনেছে? ও চায় ভবিষ্যতে তোমার নিজস্ব একটা পরিচয় থাকুক, যাতে জীবনে কখনো তোমাকে কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয়।”

​আয়াত এবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। “আমি কি চেয়েছি আপনার বন্ধুর ওই করুণার শেয়ার? সে নিজেকে কি খুব বড় দয়ালু মনে করে? টাকার পাহাড় দিয়ে কি সব ক্ষত ঢাকা যায়? দয়া করে আমাকে ওর গুনগান শোনাবেন না!”

​ফারহান হঠাৎ চুপ করে গেল। আয়াতের চোখের টলটলে জল দেখে সে আর কথা বাড়ালো না। ফারহান একপ্রকার জোর করেই আয়াতকে বাড়ির সামনে পৌঁছে দিয়ে পুনরায় আরভানের সন্ধানে বেরিয়ে গেল।

আজকে ​আয়াত বাড়ির ভেতর ঢুকল না। কয়েক সেকেন্ড নির্নিমেষ চোখে বিশাল অট্টালিকাটার দিকে তাকিয়ে রইল। আকস্মিক আকাশ চিরে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন আয়াতের তপ্ত হৃদয়ে আঘাত হানছে। সে তো জানে ওই মানুষটা তাকে স্ত্রী হিসেবে কোনোদিন স্বীকৃতি দেয়নি, তবুও আজ যখন আরভান নিজ মুখে বলল,—’আমি তোমার জীবনের কেউ না ‘, তখন এই তুচ্ছ শব্দটুকু কেন বুলেটের মতো কলিজায় বিঁধছে?

​জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যে নামটা তার অস্তিত্বের সাথে মিশে ছিল, আজ আজ সেই নামের মালিক তাকে স্রেফ এক টুকরো ‘অতীত’ বানিয়ে অবজ্ঞায় ফেলে দিল। আয়াতের পা বিপরীত দিকে ঘুরে গেল। যখন এই বাড়ির মালিক তার কেউই হয় না তাহলে এই বাড়িতে তার থাকার কোন অধিকার নেই। সে বাড়ির উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল। গন্তব্যহীন, উদ্দেশ্যহীন সেই পথ চলা। তার চোখের নোনা জল বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে যেতে শুরু করল। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন আয়াতের মনের আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়ে তার চোখের জলকে আড়াল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সম্ভবত এই জন্যই লোকে বলে— বৃষ্টির পানি চোখের পানির সবচেয়ে বড় গোপন সঙ্গী; কারণ আকাশ যখন কাঁদে, তখন মানুষের চোখের জলকে কেউ আলাদা করে চিনতে পারে না।

*****

শুরু হওয়া সেই বৃষ্টি সন্ধ্যায় ও আর থামার নাম নেই; আকাশ যেন আজ কোনো এক পুরনো শোকের গল্প শোনাতে বসেছে। অবিরাম জলধারা মেলবোর্নের রাজপথগুলোকে ক্রমশ নির্জন করে তুলছে।

সন্ধ্যার দিকে আরভান বাড়ি ফিরে এল। তার চোখ-মুখ অসম্ভব ফ্যাকাশে, শরীরের প্রতিটি শিরায় এক প্রবল দুর্বলতা আর যন্ত্রণার ছাপ। প্রতিটি পদক্ষেপে তার ভারসাম্য টলছে, কিন্তু দৃষ্টিতে ছিল তীব্র অনুসন্ধান।

​বাড়িটা আজকে যেন অন্য দিনের চেয়েও বেশি নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা যেন আরভানের বুকের ভেতর এক অজানা শঙ্কার জন্ম দিল। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা আয়াতের রুমের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু পুরো রুম ফাঁকা! বারান্দা, ওয়াশরুম—কোথাও কেউ নেই। আরভানের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো গভীর হতে শুরু করল। এক অদ্ভুত হাহাকার নিয়ে সে পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল, কিন্তু আয়াতের কোনো চিহ্ন নেই। শেষে সিসি ক্যামেরা চেক করতেই তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আয়াত গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে না ঢুকে উল্টো পথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গন্তব্যহীনভাবে হেঁটে চলে যাচ্ছে।

​আরভানের ভেতরে তখন প্রচণ্ড রাগ আর আশঙ্কার এক সংমিশ্রণ তৈরি হলো। আজ যদি এই মেয়েকে সে সামনে পায়, তবে বোধহয় চড়িয়ে গাল লাল করে দেবে! সবসময় এই অতিরিক্ত জেদ আর অবুঝপনা তাকে পাগল করে ছাড়ে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে আবারও বৃষ্টির সেই তোড় মাথায় নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। আয়াতের ফোন সুইচড অফ, তাই লোকেশন ট্র্যাক করাও সম্ভব হচ্ছে না। পুরো রাস্তা, অলিগলি খুঁজতে খুঁজতে সে অনেকটা দূরে চলে এল।

হঠাৎ রাস্তার মোড়ে একটা দোকানের শেডের নিচে কয়েকটা ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। তাদের হাতে অ্যালকোহল, চোখেমুখে নেশার ঘোর। আরভান তাদের পাশ কাটিয়ে যেতেই কানে ভেসে এল একটি জঘন্য মন্তব্য। তাদের মধ্যে একজন বিশ্রীভাবে হেসে বলে উঠল,
“আজকের মালটা কিন্তু সেই ছিল! কী তেজ! এমন কড়া জিনিস এর আগে আর একটাও হজম করিনি।”

​কথাটা শোনামাত্র আরভানের ধমনিতে রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। তার মনে হলো কেউ যেন তার কলিজায় গরম সিসা ঢেলে দিয়েছে। তার মনে এক মুহূর্তের জন্য শঙ্কা জাগল—তবে কি আয়াত এদের পাল্লায় পড়ল?

সে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। সোজা গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়াল। বজ্রকঠিন স্বরে গর্জে উঠল,
“সত্যি কথা বলবি, কোনো বাঙালি মেয়েকে কি তোরা এখানে হেনস্তা করেছিস? উত্তর দে, নইলে আজ তোদের একজনকেও অক্ষত অবস্থায় ফিরতে দেব না।”

​ছেলেগুলো প্রথমে থতমত খেলেও পরক্ষণেই আরভানের ভেজা আর বিপর্যস্ত রূপ দেখে একসাথে বিশ্রীভাবে হেসে উঠল। একজন বিদ্রূপ করে বলল,

“​ইউ মিন দ্যাট প্রিটি গার্ল? ওহ ব্রো, ইউ আর লেট! উই ডিডন্ট জাস্ট টাচ হার, উই টেস্টেড হার। হার কিসেস ওয়ার সো সুইট অ্যান্ড উই জাস্ট ফাকড…”

বাক্যটা শেষ করার সুযোগ আর সে পেল না।
শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথেই আরভানের ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটা বিস্ফোরিত হলো।সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ​আরভান তখন এক উন্মাদ দানবে পরিণত হলো। পাশ থেকে একটা লোহার রড তুলে নিয়ে সে ছেলেগুলোকে গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পেটাতে শুরু করল। তার প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে সে নিজের ভেতরের সবটুকু আক্রোশ ঝাড়ছিল। উন্মাদের মতো বিলাপ করতে করতে সে মারছিল আর বলছিল, “ইউ বাস্টার্ডস! আমার আয়াতকে স্পর্শ করার সাহস কোত্থেকে পেলি তোরা? কোথায় আমার আয়াত? কথা বল ব্লাডি বিচ!

আরভান পাশে রাখা একটি অ্যালকোহলের বোতল ভেঙে ভেঙে তার ধারালো অংশ একজনে গলায় চেপে ধরল। ​আরভানের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে ছেলেগুলো প্রাণভয়ে কেঁদে উঠল। আরভানের চোখ দিয়ে তখন যেন জলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে একজন আর্তনাদ করে উঠল,
“ব্রো! প্লিজ থামুন! আমরা মজা করে বলেছি। ‘মাল’ বলতে আমরা কোনো মেয়ের কথা বলিনি, সত্যি বলছি! আমরা এই নতুন ব্র্যান্ডের অ্যালকোহলটার কথা বলছিলাম। এটা একদম নতুন আর কড়া, ওটা নিয়েই কথা বলছিলাম! কোনো মেয়েকে আমরা টাচ করিনি। হ্যাঁ, একটা বাঙালি মেয়েকে ওই উল্টো দিকের গলি দিয়ে যেতে দেখেছি। আমরা কিছু করিনি ব্রো, প্লিজ মারবেন না!”

​আরভানের হাত থেকে ভাঙা বোতলটা খসে পড়ল।। বড় একটা শ্বাস নিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। নিজের বিজনেস কার্ড আর বেশ কিছু ডলার তাদের দিকে ছুড়ে দিয়ে শীতল গলায় বলল,
“চিকিৎসা করার জন্য রেখে দাও। আরও প্রয়োজন হলে এই ঠিকানায় যোগাযোগ করো। ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখিত।”

​ছেলেগুলো হতভম্ব হয়ে কার্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল। কী অদ্ভুত মানুষ! কয়েক মিনিট আগে যে উম্মাদ মতো পেটাল, সেই আবার চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে।

​আরভান তখন পাগলের মতো হন্যে হয়ে গলিটার দিকে দৌড়াতে শুরু করল। আজ প্রথমবার সে নিজেকে কোনো এক বড় ‘উন্মাদ’ বলে মনে করছিল। এই কয়েক দিনের ব্যবধানে এই জেদী মেয়েটা যে তার জীবনের প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে কতটা বিষাক্তভাবে জড়িয়ে গেছে, তা আজ এই বিচ্ছেদের আতঙ্কে সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা পরিত্যক্ত বাড়ির বারান্দার পাশে, যেখানে একটা ওড়নার অংশ দেখা যাচ্ছে।

​আরভান বুকভরা হাহাকার নিয়ে ধীর পায়ে সেদিকে এগোতেই দেখল— সেখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে আয়াত। বৃষ্টিতে ভিজে একদম জবুথবু অবস্থা। থেমে থেমে কাপছে।আরভান নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গিয়ে আয়াতকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। আরভানের নিজের শরীর ও তখন অজানা আশঙ্কায় কাঁপছে। আয়াতের গা আগুনের মতো গরম হয়ে আছে। জ্বরের তীব্রতায় সে প্রায় অচেতন, শুধু ঘোরের মাঝে প্রলাপ বকছে।

​শীতলতার মাঝে কারো উষ্ণ পরশ পেয়ে আয়াত পিটপিট করে চোখ মেলল। আবছা দৃষ্টিতে আরভানকে দেখে সে তার দুর্বল শরীর দিয়ে ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। ভাঙা গলায় বলল,
“আ…আপনি আমাকে ছোঁবেন না। আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আপনি তো বলেছিলেন আমি আপনার কেউ না… আপনার জীবনে আমার কোনো অধিকার নেই। তবে কেন এসেছেন?”

আরভান আয়াতের কপালে, গালে কয়েকটা উন্মাদের মতো চুমু খেয়ে পাগলের মতো বলতে লাগল, “ভুল করেছি, ভীষণ বড় ভুল করেছি! আই অ্যাম সরি আয়াত! রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি তুমি আমার জন্য কতটা অপরিহার্য। আমি তোমায় ছাড়া অসম্পূর্ণ আয়াত!”

​আয়াত ঘোরের মাঝেই জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল, “তাহলে এখন বলুন—আমি আপনার কে?”

​আরভান আয়াতকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টির মাঝে সে আয়াতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে বলল,
“ইউ আর মাইন, আমার দুনিয়া তুমি।তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ আয়াত। তোমাকে ছাড়া এই আরভান চৌধুরী কেবল একটা প্রাণহীন কাঠামো মাত্র।”

​আয়াতের দুর্বল শরীরে আর কোনো তর্ক করার শক্তি ছিল না। আরভানের কথাগুলো তার কানে ঢুকলেও অসুস্থ মস্তিষ্কে তার অর্থ পৌঁছাল কি না বোঝা গেল না। সে শুধু আরভানের কাঁধে মাথা রেখে ধীরে ধীরে চোখ বুজে নিল। আরভানের প্রশস্ত বুকটাই যেন আজ তার সব যন্ত্রণার শেষ আশ্রয়স্থল। আরভান তাকে বুকের সাথে আরও মিশিয়ে নিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

চলবে..