Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-২৯+৩০

আমার হয়ে থেকো পর্ব-২৯+৩০

0
381

#পর্ব_২৯
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

খাবার টেবিলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। ওয়াশরুমের সেই কাণ্ডের পর থেকে আরভানের সাথে আয়াতের একটি শব্দও বিনিময় হয়নি। আরভান নিবিষ্ট মনে খেয়ে যাচ্ছে, যেন তার আশেপাশে আয়াতের কোনো অস্তিত্বই নেই। ওর দৃষ্টি কেবল নিজের প্লেটে নিবদ্ধ। আয়াত আড়চোখে বারবার তাকে পড়ার চেষ্টা করছে। লোকটা আজ একটু বেশিই গম্ভীর। আরভানকে সব রূপেই মানায়—কখনো তপ্ত আগুন, কখনো শীতল বরফ; কিন্তু এই নিস্তব্ধ গাম্ভীর্য কেন যেন আয়াতের সহ্য হচ্ছে না। সে ভেবেছিল আরভান রাগ করবে, বকবে কিংবা সেই তোয়ালে চুরির অপরাধে কড়া কোনো মিষ্টি শাস্তি দেবে। কিন্তু তার বদলে এই মৌনতা যেন হাজারটা চড়-থাপ্পড়ের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

​আয়াত আর থাকতে পারল না। ঠোঁট কামড়ে কিছু বলতে চাইল, ঠিক তখনই আরভান প্লেট থেকে মুখ না তুলেই শীতল গলায় বলে উঠল,
” ঘুরঘুর করে আমার দিকে না তাকিয়ে নিজের খাবারে মন দাও আয়াত।”

আয়াত থমকে গেল। সে নিচু স্বরে অপরাধীর মতো আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি… আপনি কি আমার ওপর খুব রেগে আছেন?”

​”না। কেন? রাগের মতো বিশেষ কিছু হয়েছে নাকি?” আরভানের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

কিন্তু আরভানের এই কৃত্রিম নিরাসক্তি আর অভিমানী কণ্ঠস্বর শুনে আয়াতের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে, আরভান নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কাঁপা গলায় সে বলল, “আমি… আমি নেক্সট টাইম আর এমন কিছু করব না। প্রমিজ করছি।”

​”কেমন কিছু করবে না?” আরভান প্লেট সরিয়ে শান্ত চোখে তাকালো।

​”আর আপনার সাথে এমন বাজে আচরণ করব না। আপনার বিরক্তির কারণ হব না।” আয়াত মাথা নিচু করে বলল।

​”আচ্ছা।” আরভান আবারও গ্লাসের পানিতে চুমুক দিল।

​আরভানের এই নিস্পৃহতা যেন বিষের মতো তপ্ত হয়ে আয়াতের হৃদয়ে লাগছে। হঠাৎ করে ওর বুক ফেটে কান্না এল। কোনো কারণ ছাড়াই চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে গালের ওপর পড়ল। আরভান খাওয়া থামিয়ে অবাক হয়ে তাকাল।
“কাঁদছো কেন? আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? বকেছি নাকি মেরেছি?”

​আয়াতের ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ বাড়ল। আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। সে আয়াতের চেয়ারের পাশে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। আয়াতের বিষণ্ণ মুখটা নিজের দুই হাতের উষ্ণ আঁজলায় তুলে নিয়ে অত্যন্ত কোমল স্বরে বলল, “কাঁদছো কেন আয়াত? আমি তো কিছুই বলিনি। পাগলামি তো তুমিই করলে, এখন কাঁদছোও তুমি?”

​আয়াত ভেজা চোখে অভিমানী গলায় বলল, “আপনি এভাবে কেন কথা বলছেন? আপনি অনেক বেশি রেগে আছেন।”

​”আমি রেগে নেই জান।” আরভান ওর কপালে নিজের কপাল ঠেকাল।

​”আছেন! আমি জানি, আপনি যখন আমার ওপর অনেক খুশি থাকেন, তখন ‘মিসেস’ এবং ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেন। কিন্তু যখন আমি আপনার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যাই কিংবা আমাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চান, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনি শুধু ‘আয়াত’ বলে ডাকেন। আমি আপনার এই বদলে যাওয়া সহ্য করতে পারছি না আরভান। দয়া করে এমন করবেন না।”

​আরভান আয়াতের চোখের পানি নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে দিল। ওর হাতের পিঠে আলতো করে একটা চুমু এঁকে গাঢ় স্বরে বলল,
“এতটা জানো আমাকে? রাগ করিনি সত্যিই বলছি। শুধু একটু অন্যমনা হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার স্ত্রী বোধহয় আমার কাছে আসতে চায় না, সে হয়তো আমাকে এখনো মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি। আমি তো পাথর নই আয়াত, আমারও তো আকাঙ্ক্ষা জাগে তোমাকে ঘিরে। কিন্তু তোমার বারবার দূরে সরে যাওয়া দেখে মনে হয়, আমি হয়তো জোর করছি তোমার ওপর।”

​আয়াত আরভানের হাতের মুঠোয় নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল। “এমনটা নয় আরভান… একদমই এমনটা নয়। আমি শুধু… আমি শুধু একটু সময় নিচ্ছিলাম।”

​আরভান ম্লান হাসল। “আমিও জানি সেটা। এর জন্যই তো আমার অভিমান বেশিক্ষণ টেকে না। এবার চোখ মোছো তো লক্ষ্মীটি। একটা কথা শোনো,

আরভান আয়াতের কপালে গভীর এক চুমু এঁকে নিম্নস্বরে বলল,”আজ ফিরতে আমার অনেকটা রাত হবে। আমি একটা বিজনেস ডিল আর মিটিংয়ের জন্য শহরের বাইরে যাচ্ছি।”

​আরভানের কথা শেষ হবার আগেই আয়াত চঞ্চল হয়ে উঠল। “আমি একা এখানে ঘরে আটকা পড়ে থাকব না। আমিও আপনার সাথে যাবো।”

​আরভান অবাক হয়ে তাকাল। “আমি মিটিংয়ে যাচ্ছি আয়াত, তাও মাউন্ট বুলার তে। এই হাড়কাঁপানো শীতে ওই পাহাড়ে তোমাকে আমি নিতে পারছি না। আবহাওয়া খুব খারাপ হতে পারে”।”

“কী! আপনি মাউন্ট বুলারে যাচ্ছেন? তাহলে তো আমি নিশ্চিত যাবো।আমি শুনেছি ওখানে এখন প্রচুর তুষারপাত হয়। আমি জীবনেও সামনাসামনি বরফ পড়া দেখিনি। প্লিজ আরভান, আমাকে সাথে নিন! আমি কোনো ডিস্টার্ব করব না, একদম প্রমিজ।”

​আরভান কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই আয়াত হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল। “আপনি এখানে একদম নড়বেন না, এখানেই দাঁড়ান। আমি ঠিক ৩ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসছি। জাস্ট থ্রি মিনিটস! এক সেকেন্ডও বেশি লাগবে না।।”

​বলেই আয়াত এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমের দিকে ছুটল। আরভান পেছনের সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। ওর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফিরে এল। এই মেয়েটার সরলতা, জেদ আর অবুঝ পাগলামির কাছে আরভান চৌধুরী বরাবরই বড় অসহায়।

*****

আয়াত ৩ মিনিট সময় চেয়ে রুমে গেলেও তার নামগন্ধ নেই। আরভান নিচে সোফায় বসে একের পর এক ফাইল চেক করছে আর অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। একে তো জরুরি মিটিং, তার ওপর এই মেয়ে! দশবার নক করার পর ভেতর থেকে শুধু উত্তর আসে,
“এই তো হয়ে গেছে, আপনি নিচে দাঁড়ান আমি আসছি।”

​আরভানের মাথায় আসছে না সামান্য তৈরি হতে একটা মানুষের এত সময় কেন লাগে। সে বিরক্তি নিয়ে ফোনটা বের করল। বারবার ফারহানের কল আসছে।সে রিসিভ করে গম্ভীর গলায় বলল,
” ক্লায়েন্টদের বলো মিটিংয়ের সময়টা আর আধা ঘণ্টা পিছিয়ে দিতে। আমি বের হতে দেরি করছি।”

​কথা বলতে বলতে আরভান যখন রাগে গজগজ করতে করতে আয়াতের রুমের দিকে পা বাড়ালো, ঠিক তখনই দরজা খুলে আয়াত বেরিয়ে এল। আরভানের তীক্ষ্ণ ভ্রু মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। সে আপাদমস্তক আয়াতকে পর্যবেক্ষণ করে বলল, “আবার শাড়ি পরেছ কেন?”

​আয়াত এক হাতে আঁচল ঠিক করতে করতে আড়চোখে তাকালো। “বাহ রে! ঘুরতে যাবো, শাড়ি পরব না? জানে না, বাঙালি মেয়েদের শাড়ি ছাড়া ঘোরাঘুরি একদম অসম্পূর্ণ।”

“​মাউন্ট বুলারে যাচ্ছো আয়াত, ওখানে কোনো বিয়ের দাওয়াত নয়। শাড়ি পাল্টে কোনো গরম কাপড় পরে এসো। ওখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে।”

​”লাগবে না, আমি এভাবেই যাবো। কার কাছে যেন শুনেছিলাম মেয়েদের নাকি শীত কম লাগে! আর ওখানে গিয়ে আমি একটা শাড়ির আঁচল উড়িয়ে পোজ দেব, একদম হিরোইনদের মতো।আপনি বুঝবেন না।”

​আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন এই শাড়ি পাল্টাতে পাঠালে পাঠালে নির্ঘাত আরও এক ঘণ্টা দেরি হবে। সে কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করল, “রিডিকিউলাস! যা খুশি করো, পরে ঠান্ডায় কুঁকড়ে মরলে আমায় দোষ দিও না।”

তারপর সে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। আয়াতও মুখ ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে আরভানের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে তার পিছু নিল।

*****

একটি রিসোর্টে মিটিং চলছে। তার এক কোণে বসিয়ে রাখা হয়েছে আয়াতকে। যাওয়ার আগে কড়া হুকুম দিয়ে গেল,”মিটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে এক চুলও নড়বে না।”

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাচ্ছে। আয়াত দেখল আরভান তার ক্লায়েন্টদের সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন। এই মানুষটা কাজ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না।মাঝে মাঝে আরভান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে আয়াতের দিকে তাকাচ্ছে,যেন নিশ্চিত হতে চাইছে সে পালায়নি তো।

​​ঘণ্টা দুয়েক পার হয়ে গেছে। আয়াত এখন রীতিমতো কাঁপছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শাড়ি পরা যে কতটা বোকামি হয়েছে, তা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।বরফ দেখার শখ পূরণ করতে এসে এখন শীতে জমে যাওয়ার অবস্থা।

কিন্তু এখন যদি আরভানের সামনে কাঁপাকাঁপি করে, তবে ওই দাম্ভিক স্বামীটা তাকে নির্ঘাত একটা লেকচার দেবে। ​আয়াত আর সহ্য করতে না পেরে উঠে দাঁড়াল। সে কারো হুকুমের গোলাম নয় যে তাকে যেখানে বসিয়ে রাখা হবে সেখানেই বসে থাকবে। সে গটগট করে বাইরের বারান্দার দিকে হাঁটা দিল। ফারহান আরভানকে একটা পেপার এগিয়ে দিচ্ছিল সই করার জন্য, ঠিক তখনই আরভানের চোখে পড়ল আয়াতের অবাধ্যতা। আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

​সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোর বোনের কলিজা দেখে আমি অবাক হচ্ছি ফারহান! আমার পারমিশন ছাড়া সে কোথায় যাচ্ছে?”

​ফারহান বেখেয়ালে কফি কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “আমার বোন তার স্বামীর কাছেই তো আছে, তোর সমস্যা কী? “আরভানের খুনে চাউনি দেখে ফারহানের টনক নড়ল। সে ঢোক গিলে বলল,”আরে আমি আয়াতের কথা বলছি না, আমি তো অন্য… আমি এক্ষুনি দেখে আসছি ও কোথায় গেল!” বলে সে আয়াতের পিছু ছুটল।

​আয়াত তখন রিসোর্টের বিশাল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভেতরে ঠান্ডা না থাকলেও বাইরের বাতাস যেন তলোয়ারের মতো বিঁধছে। ফারহান পেছন থেকে ডাকল, “আয়াত!”

​আয়াত ম্লান হেসে বলল, “জি ভাইয়া?”

​”ভেতরে চলো, আরভান কিন্তু রেগে আগুন হয়ে আছে।”
​”যাবো না ভাইয়া। ওখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার ওপর কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে থাকতে থাকতে আমার কোমর শেষ।”

​ফারহান হাসল। “তাহলে এসেছিলে কেন? জানো না তোমার র হাজব্যান্ড আস্ত একটা ওয়ার্কহোলিক? কাজ ছাড়া সে কিছুই বোঝে না।”

​”এখন বুঝেছি তখন বুঝি নি, কিন্তু এই কাজ কি সন্ধ্যার আগে শেষ হবে না? আর তুষারপাত? বরফ তো এক ফোঁটাও আকাশ থেকে পড়তে দেখলাম না।”

​ফারহান আকাশটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “এভি মনে হয় না তোমাকে সময় দিতে পারবে। আজকের আবহাওয়াও ভালো না, তুষারপাত হবে নাকি বৃষ্টি তা বোঝা যাচ্ছে না। আর আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যেতে পারব না, তোমার ওই হিটলার স্বামী জানলে আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি শুরু করে দেবে। আমি বরং ওকে ফ্রি হতে বলছি।”

​ফারহান চলে যাওয়ার পর আয়াত দূর দিগন্তে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইল। আজ বড্ড বাংলাদেশের কথা মনে পড়ছে তার। এমন সময় পাশ থেকে আরভানের গম্ভীর আর ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “কী হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে কী করছো?”

​আয়াত অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধরা গলায় বলল, “কিছু না। আমি বাড়ি যাবো। আপনার দেরি হলে আমাকে একটা ট্যাক্সি বুক করে দিন, আমি একাই চলে যেতে পারব।”

​আরভান ওর একদম কাছে এসে দাঁড়ালো। “কেন? আসার সময় তো খুব লাফাচ্ছিলে! এখন পালাচ্ছো কেন? আর এত কাঁপছো কেন? তোমার না শীত কম লাগে? শাড়ির আঁচল উড়িয়ে পোজ দেওয়ার কথা ছিল না?”

​আয়াত কোনো উত্তর দিল না। ওর কান্না পাচ্ছে। আরভান কি বোঝে না যে সে শুধু তুষার দেখতে নয়, আরভানের সাথে একটু সময় কাটাতে এসেছে?

আয়াত রাগী স্বরে বলল, “আপনার তো অনেক কাজ ছিল না? যান, আপনার ক্লায়েন্টদের সাথে গিয়ে হাসাহাসি করুন।আমাকে না দেখলেও চলবে।”

​”কাজ করতে দিচ্ছেন কোথায়?” আরভান হঠাৎ আয়াতের কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বলিষ্ঠ শরীরের সাথে নিবিড়ভাবে মিশিয়ে নিল।

​”কেন? আমি কি আপনাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছি?”

আয়াত নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করল। আরভান আয়াতের কোমরের উন্মুক্ত ভাঁজে হাত দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ, রেখেছ তো! তোমার ওই মায়াবী চোখ দুটো দিয়ে আমায় অদৃশ্য শিকলে বেঁধে রেখেছ। কয়েক ঘণ্টা ধরে সিরিয়াস মিটিংয়ের মাঝেও তোমার ওই শাড়ির আঁচল বারবার আমার নজর কাড়ছিল। কখনো আঁচলটা অবাধ্য হয়ে উড়ে যাচ্ছিল, আবার কখনো তুমি তা বুকে টেনে নিচ্ছিলে,আবার কখনো কোমরের ভাঁজ ঢাকছিলে।আমার সমস্ত কনসেনট্রেশন তো তোমার ওই উন্মুক্ত কোমরেই আটকে ছিল আয়াত। কাজটা করব কী করে?”

আয়াত এক ঝটকায় আরভানের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, “সবসময় গায়ে পড়ে কথা কেন বলেন? একটু দূরত্ব রেখে কথা বলা যায় না?”

​আরভান এবার সেই চিরচেনা নেশালো স্বরে আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “না, স্পর্শ না করলে তোমাকে বোঝাবো কীভাবে আমি তোমার শরীরের ঠিক কোন কোন জাদুকরী জায়গার কথা বলছি?”

​সে রেগে গিয়ে বলল, “অসভ্য! আপনার সাথে আসাই আমার ভুল হয়েছে!” বলে সে গটগট করে সামনে হাঁটতে শুরু করল।

​হঠাৎ আয়াত অনুভব করল সে মাটি থেকে শূন্যে ভাসছে। আরভান তাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়েছে। আয়াত হকচকিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, “নিচে নামান! মানুষ দেখছে তো! কী করছেন আপনি?”

​আরভান কোনো কথা না বলে তাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিল। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। মাউন্ট বুলারের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল রাস্তার ধারে পুরনো বরফ জমে আছে, কিন্তু নতুন করে আকাশ থেকে তুষারপাত হচ্ছে না। আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লান মুখে বলল, “আফসোস, তুষারপাত দেখা আর হলো না।”

​”দেখা তো হয়েছে, ওই তো চারদিকে শুভ্র বরফ।” আরভান বাইরের দিকে ইশারা করল।

​”এটা তো জমাট বাঁধা বরফ, আমি তুষারপাত হওয়া দেখতে চেয়েছিলাম।” আয়াত গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা দিল।

​”এখন আবার কোথায় যাচ্ছো?” আরভান গাড়ি থেকে নেমে পেছন থেকে ডাকল।

​”অপেক্ষা করতে।”

​”সিরিয়াসলি? তুমি অপেক্ষা করলেই তুষার বুঝি তোমার প্রেমে পড়ে নাচতে নাচতে আকাশ থেকে নেমে আসবে?”

​আয়াত ঘুরে দাঁড়িয়ে আরভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার অপেক্ষাতেই তো আপনিও একদিন এসেছিলেন, তাহলে তুষার কেন আসবে না?”

আয়াত কিছিটা দূরে দাঁড়িয়ে তুষারের অপেক্ষায় আকাশপানে তাকিয়ে ছিল। আরভান ওর ঠিক পাশে এসে দাঁড়ালো, চোখে একরাশি বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে। আয়াতের সেই অটল বিশ্বাসের উত্তরে সে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই প্রকৃতির মেজাজ বদলে গেল। কিন্তু তুষার নয়, আকাশ ভেঙে প্রবল ধারায় বৃষ্টি নামলো। মাউন্ট বুলারের এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বৃষ্টি মানেই শরীর জমে যাওয়ার উপক্রম।

​আরভান এক মুহূর্ত দেরি না করে আয়াতের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে গাড়ির কাছে নিয়ে এল। দ্রুত ওকে ভেতরে তুলে দিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসল। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে; আয়াতের শখের শাড়ি আর আরভানের শার্ট ভিজে একাকার। আরভানের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। একে তো সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, তার ওপর এখান থেকে ফিরতে প্রায় চার ঘণ্টার পথ। এই ভেজা শরীরে ওকে এতক্ষণ গাড়িতে রাখা মানেই নিশ্চিত নিউমোনিয়া।

​আরভান পাশ ফিরে আয়াতের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “এবার কী হবে? নিজের জেদ মেটাতে গিয়ে তো ভিজলে, সাথে কোনো বাড়তি পোশাকও আনোনি। এখন এই বরফঠাণ্ডা শরীরে চার ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকবে কীভাবে?”

​আয়াত অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল। ওর ঠোঁট দুটো ঠান্ডায় নীল হয়ে কাঁপছে।

আরভান আয়াতের এই অসহায় অবস্থা দেখে নিজের রাগটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। পেছনের সিট থেকে নিজের এক্সটা পোশাকের একটা প্যাকেট বের করে আয়াতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “শাড়িটা খুলে এর ভেতরের শার্টটা পরে নাও আয়াত। আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।”

​আয়াত বড় বড় চোখে আরভানের দিকে তাকালো। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আয়াত মাথা নেড়ে তীব্র প্রতিবাদ করল, “অসম্ভব! এই বৃষ্টির মধ্যে আপনি বাইরে দাঁড়াবেন? আর আমি গাড়ির ভেতর পোশাক পাল্টাবো? কক্ষনো না!”

“আয়াত, জেদ করো না।তুমি শীতে জমে যাচ্ছো।”

“মরলে মরবো, কিন্তু আপনাকে আমি এই বৃষ্টিতে বাইরে বের হতে দিবো না। আর আমি গাড়িতে ড্রেস চেঞ্জ করতে পারবো না।”

আরভান বুঝল এই মেয়ের সাথে তর্কে জেতা অসম্ভব। সে আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুদূর যেতেই পাহাড়ের কোলে অবস্থিত একটি অভিজাত রিসোর্ট দেখতে পেয়ে সে গাড়িটা সেখানে থামাল। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় গাড়ি চালানো এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। আরভান রিসোর্টের রিসেপশনে গিয়ে একটি ‘ডিল্যাক্স ডাবল বেড’ রুম বুক করল। আয়াত যখন আরভানের পিছু পিছু রুমে ঢুকল, ওর গলা শুকিয়ে কাঠ। আবারও সেই এক রুম, এক রাত আর তারা দুজন।

চলবে

#পর্ব_৩০
#আমার_হয়ে_থেকো
#Tasnim_Riya_khan

মাউন্ট বুলারের সেই নির্জন রিসোর্ট। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর হাড়কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা বাতাসের দাপট। রিসোর্টের সেই রাজকীয় ডাবল বেডের রুমে ঢুকেই আয়াত একরাশ অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেল। ঘরটা রুম হিটারের কল্যাণে উষ্ণ হলেও আরভানের উপস্থিতিতে এক অদ্ভুত উত্তাপ যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

আরভান ব্যাগ থেকে নিজের একটি ধবধবে সাদা কটন শার্ট বের করে আয়াতের হাতে ধরিয়ে দিল।
​গম্ভীর গলায় আরভান বলল, “ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত এই ভেজা শাড়িটা ছেড়ে শার্টটা পরে নাও। আপাতত লজ্জা পাওয়ার চেয়ে সুস্থ থাকাটা বেশি জরুরি। এই শীতে নিউমোনিয়া বাধিয়ে বসলে সামলানো কঠিন হবে।আমার রিস্ক নেওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই।”

​আয়াত শার্টটা হাতে নিয়ে ইতস্তত করে নিচু স্বরে বলল, “কিন্তু… আপনি? আপনিও তো ভিজে একাকার হয়ে গেছেন।”

​আরভান গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “আমার চিন্তা তোমাকে করতে হবে না ‘ইডিয়ট’। বারবার বলেছিলাম পাহাড়ে শাড়ি পরে মুভির নায়িকা সাজার দরকার নেই, এখন সামলাও নিজের শখ! যাও, জলদি চেঞ্জ করো।”

​আয়াত আর দ্বিরুক্তি না করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। আয়াতের পাতলা শাড়ি আর ব্লাউজ বৃষ্টির পানিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সে বাধ্য হয়েই ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে আরভানের সেই বিশাল শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিল। আরভানের সুঠাম দেহের তুলনায় শার্টটা আয়াতের কাছে অনেকটা লম্বা; যা ওর হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে। শার্টের হাতাগুলো কবজি ছাড়িয়ে অনেক দূর ঝুলে আছে। আয়াতের নাকে আরভানের ব্যবহার করা সেই কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ ঝাপটা মারল, যা মুহূর্তেই ওর স্নায়ুকে অবশ করে দিল। যেন ওর শরীরের প্রতিটি ভাঁজে আরভানের গায়ের সেই পুরুষালি ঘ্রাণ মাখামাখি হয়ে আছে।

​সব ঠিক থাকলেও আয়াত এক মহাবিপাকে পড়ল। সে কীভাবে একটা মাত্র শার্ট পরে আরভানের সামনে যাবে? অসম্ভব লজ্জায় সে যেন মরেই যাচ্ছে। তার ভেতরে এত দেরি দেখে আরভান উৎকণ্ঠায় কয়েকবার দরজায় কড়া নাড়ল। “আয়াত! ভেতরে ঢুকে বসে আছো কেন? আর ইউ অলরাইট? কোনো প্রবলেম হলে আমাকে বলো প্লিজ!”

​আয়াত নিজেকে কোনোমতে সামলে ওপাশ থেকে বলল, “আপনি… আপনি প্লিজ রুম থেকে একটু বাইরে যান।”

​”কেন?”

​”এমনিই… আপনি বাইরে গেলে আমি বের হবো।”

​”পারব না এই শীতে বাইরে যেতে। আমার গায়ের চামড়া কি গন্ডারের চামড়া মনে হয় তোমার?” আরভানের কণ্ঠে বিরক্তি।

​আয়াতের এবার টনক নড়ল। আরভানও তো ভিজে আছে, সে বাইরে যাবেই বা কেন? আয়াত চুলগুলো দুপাশে সরিয়ে নিয়ে নিজেকে স্থির করল। পেটিকোটের ওপর আরভানের শার্টটা পরে সে আয়নায় নিজেকে একবার দেখল; তারপর তার ভেজা শাড়িগুলো হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দিল শুকানোর জন্য, যাতে সকালে অন্তত সেগুলো পরে বের হওয়া যায়।

​ওয়াশরুম থেকে রুমে আসতেই দেখল আরভান নিজের ভেজা শার্টটা খুলে উদাম শরীরে দাঁড়িয়ে আছে। আয়াতের বুকটা ধক করে উঠল। আরভানের সুঠাম পেশিবহুল বুক আর চওড়া কাঁধ বেয়ে তখনো দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। আয়াতের আজ যেন কী হয়েছে! সকাল থেকে এই মানুষটার দিকে তাকালেই ওর মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হচ্ছে। সে দেখতে চাইছে না, কিন্তু ওর অবাধ্য চোখ দুটো বারবার আরভানের সেই জিম করা নিখুঁত শরীরের দিকে আটকে যাচ্ছে। আরভানের সেই ‘সিক্স প্যাক’ ওয়ালা শরীরটা যেকোনো নারীর জন্যই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, আর আয়াত তো রক্ত-মাংসের মানুষ। একবার হাত বাড়িয়ে আরভানের বুকের সেই শক্ত পেশিগুলো ছুঁয়ে দেখার তীব্র ইচ্ছা জাগলেও সে তা প্রবল লজ্জায় চেপে ধরল।

​আরভান কিছুক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকল। ফোনের কাজ শেষ করে সে আয়াতের দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন? ঘুমাচ্ছ না কেন?”

​আয়াত আমতা আমতা করে বলল, “কোথায় ঘুমাবো?”

​”বিছানায়। আর কোথায় ঘুমাবে?”

​”আমি বিছানায় শোব না।”

​”কেন, বিছানায় কি কাঁটা বিছানো আছে?” আরভান ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

​”আপনি কোথায় ঘুমাবেন?” আয়াতের কণ্ঠে দ্বিধা।

​আরভান এবার আয়াতের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আয়াত, প্লিজ।এই শীতের মাঝে অন্তত সেদিনের জঙ্গল বাড়িতে কাটানো রাতের মতো নাটক কোরো না। ‘আমি নিচে শোব’ অথবা ‘আপনি নিচে শোন’—এইসব আদিখ্যেতা করবে না। বিছানা যথেষ্ট বড়।”

​আয়াত আর তর্কে গেল না। সে সোফার এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে রইল। আরভান এটা দেখেও আজ কিছু বলল না। আরভানের আচরণটা আজ কেন যেন একটু অদ্ভুত লাগছে।যেন সে নিজের ভেতরে কোনো এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সাথে লড়াই করছে। আয়াত থম মেরে আরভানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরভান নিজের হাতের ফোনটা বিছানায় রেখে আয়াতের কাছে এসে দাঁড়ালো। আয়াত হকচকিয়ে গেল। আরভানের শরীরের তপ্ত উষ্ণতা সে অনুভব করতে পারছে। আরভান কোনো কথা না বলে ঝুঁকে এসে আয়াতের শার্টের হাতাগুলো সুন্দর করে ফোল্ড করে দিতে লাগল। ওর আঙুলের স্পর্শ আয়াতের চামড়ায় বিদ্যুৎ খেলিয়ে দিচ্ছে।

​আরভান নিচু স্বরে বলল, “নিজের শরীরের যত্ন নিতে শেখো আয়াত।সবসময় আমাকে তোমার পাশে পাবে না।”

“কেন?”

আরঋান কোন উওর দিলো না। অতি সন্তর্পণে আয়াতের শার্টের কলারটা ঠিক করে ভাঁজ করে দিল। আরভানের আঙুল যখন আয়াতের গলার ত্বক স্পর্শ করল, আয়াতের মনে হলো ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। আরভানের নেশালো চোখ দুটো তখন আয়াতের মুখমণ্ডলে নিবদ্ধ।

​”আপনি… আপনার কাজ করুন না। আমাকে এভাবে কেন দেখছেন?” আয়াত কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল।

​আরভান সত্যি সত্যিই চলে গেলো বিছানায়। আরভানের আচরণে আজ এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছে আয়াত। অন্য সময় হলে আরভান এতক্ষণে সুযোগ বুঝে তাকে জ্বালাতন করত বা কাছে টানত, কিন্তু আজ সে কেমন যেন গম্ভীর আর নিস্পৃহ। আয়াতের মনটা বড্ড উসখুস করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে আয়াত আবিষ্কার করল আরভান পাশ ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার শ্বাস ভারী, হয়তো ঘুমিয়েও গেছে।

​আয়াত ধীরে ধীরে আরভানের পাশে গিয়ে বসল। সে বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলতে লাগল, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আরভান। আপনি আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলছেন না। যদি সকালের ওই ঘটনার জন্য এমন করেন, তবে আই অ্যাম সরি। আসলে আমি… আসলে আমি আপনাকে ঠিক বুঝতে পারছি না।”

​আয়াতের কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই ওর চোখের কোণ দিয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ঠিক সেই সময় ওর নজর গেল আরভানের ফোনের দিকে, যা আরভানের বালিশের পাশেই রাখা। সকালের সেই কৌতূহলটা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আয়াত আরভানের শরীরের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ফোনটা নিতে গেলেই ঘটল বিপত্তি। আরভান যেন জেগেই ছিল!
​হঠাৎ এক জোড়া শক্ত হাত আয়াতের কোমর জড়িয়ে ধরল। আয়াত আতঙ্কে জমে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই আরভান ওকে নিজের কাছে টেনে নিল। আয়াতের পিঠ এখন আরভানের অনাবৃত প্রশস্ত বুকের সাথে মিশে আছে। আরভানের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি আয়াত স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। আয়াতের হৃদপিণ্ড তখন পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

আরভান ঘুম জড়ানো নেশালো কণ্ঠে ডাকল, “মিসেস আরভান…”

​এই একটি ডাকেই যেন আয়াত কুপোকাত।
আরভানের সেই গভীর আর মাদকতাভরা কণ্ঠস্বর আয়াতের স্নায়ুতে ঝিলিক দিয়ে গেল।

আরভান আয়াতের পিঠের ওপর থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে শার্টের কলারটা কিছুটা নিচে নামিয়ে দিল। আয়াত ভয়ে আর উত্তেজনায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে। আয়াতের শ্বেতশুভ্র কাঁধ আর ঘাড় উন্মুক্ত হতেই আরভান সেখানে নিজের নাক ঘষে এক গভীর শ্বাস নিল।

​”আমার ফোনে এমন কী গুপ্ত তথ্য আছে যার জন্য সকাল থেকে এটাকে হাতানোর ধান্দায় আছো তুমি?”

​আয়াত কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করলেও লাভ হলো না। “ছাড়ুন! আমাকে যেতে দিন!”

​”আমি নিজেকে যথেষ্ট কন্ট্রোল করে রেখেছিলাম মিসেস, আপনি তা হতে দিলেন কই? এখন এভাবেই থাকুন।”

​আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “একটু আপনার দিকে ঘুরতে দিন, আপনাকে একটু দেখতে দিন।”

​আরভান আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুত এক শব্দ করে বলল, “উম-হু! আমার বড্ড লজ্জা করে মিসেস!”

​”লজ্জা? তাও আপনার মতো অসভ্য লোকের আছে? আমার তো তা জানাই ছিল না।”

​আরভান আয়াতের চুলে মুখ গুঁজে দিলো। আয়াত নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল। সে তোতলানো কণ্ঠে বলল, “ওই… ওই মেয়েটা কে ছিল? রেস্টুরেন্টে আপনার ফোন যার হাতে ছিল?”

​আরভান এবার থামল। প্রথমে ভ্রু কুঁচকে পরে কিছুক্ষণ ভেবে কিছু একটা বুঝে নিয়ে হেসে ফেলল। আয়াতের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আপনি জানলেন কীভাবে? আমার পেছনে কি ডিটেকটিভ লাগিয়েছিলেন নাকি মিসেস?”

​”লাগালেও লাভ নেই। আপনার সবকিছুই তো ধরাছোঁয়ার বাইরে।” আয়াত গাল ফুলিয়ে বলল।

​”কেন, আমি আবার কী করলাম?” আরভানের চোখ এবার আয়াতের ঠোঁটে নিবদ্ধ।

​”কিছু না, যা করার সব আমিই করছি!”

আয়াত উঠে যেতে চাইলে আরভান এক হেঁচকা টানে ওকে বিছানায় ফেলে ওর ওপর ঝুঁকে পড়ল।

​আরভানের শরীরের ভারে আয়াতের দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে। তড়িঘড়ি করে শার্ট পরতে গিয়ে আয়াত খেয়াল করেনি যে সে কয়েকটা বোতাম উল্টাপাল্টা লাগিয়েছে। আরভান যখন বোতামের দিকে হাত বাড়াল, আয়াত চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল।

​”কী… কী করছেন আপনি?” আয়াতের গলা কাঁপছে।
​আরভান আয়াতের এই অস্বাভাবিক নিঃশ্বাস আর হৃদস্পন্দনের ছন্দ পতনে আজ যেন নিজেকে সামলাতে পারল না। সে আয়াতের মুখের ওপর থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“সরি মিসেস! ভেবেছিলাম পারমিশন ছাড়া আপনাকে ছোঁব না, কিন্তু আপনার এই রূপ আর এই মায়াবী রাতের কাছে আরভান চৌধুরী আজ বড় অসহায়। আমার পক্ষে আর নিজেকে সামলানো সম্ভব না। আপনার ওই ‘না’ শব্দটা শুনতে বড্ড ঘৃণা লাগছে আজ।”

​আয়াত অবাক হয়ে তাকাল। “মানে?”

​”নাউ, ইন দিস মোমেন্ট আই নিড ইউ আয়াত… ডোন্ট সে নো, অ্যান্ড ডোন্ট হেট মি। আই ডেসপারেটলি নিড ইউ!”

​আয়াতের অন্তরাত্মা যেন শুকিয়ে গেল। সে আবারও আরভানকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু এবার আর লাভ হলো না। আরভান আয়াতের দু-হাত মাথার ওপর চেপে ধরে ওকে নিজের দেহের বাঁধনে সম্পূর্ণ পিষ্ট করে দিল। “আপনি… আপনি আমার গায়ের ওপর থেকে সরুন! নিজের হাতি মার্কা শরীরটা কি দেখছেন না? আমার দম আটকে যাচ্ছে তো!”
আয়াত মরিয়া হয়ে বলল।
​আরভান একটা বাঁকা হাসি দিয়ে আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “কী করব? বউ আমার পিঁপড়া। পিঁপড়া হলেও বউ তো বউ-ই—ওজন তো একটু বইতেই হবে।”

​আয়াত থতমত খেয়ে বলল, “তো পিঁপড়া না হয়ে কী আপনার মতো হাতি হব? যাতে আপনি এই বাহানা দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে আনেন?”

​আরভান হো হো করে হেসে উঠল। “তুমি হাতি হলেও আমার সমস্যা নেই। তখন আমি বিছানা না খুঁজে আপনার ওপরই ঘুমিয়ে পড়ব।”

বলেই আরভান আয়াতের কথা কেড়ে নিল এক নিবিড় চুম্বনে।

​ছেড়ে দিতেই আয়াত হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “শুনুন…”

​”নো… আজ আর শোনাশুনি নয়। অনলি অ্যাকশন।”

​কথাটা শেষ করেই আরভান আবারও আয়াতের ওষ্ঠদ্বয় নিজের দখলে নিয়ে নিল। আয়াত বুঝল আজ আর তার রক্ষা নেই। পাহাড়ের চূড়ায় বৃষ্টির শব্দ আর তাদের নিবিড় প্রেম একাকার হয়ে এক নতুন ইতিহাস লিখতে শুরু করল। আরভানের প্রতিটি ছোঁয়া ওকে অবশ করে দিচ্ছে। এই পাহাড়ি রিসোর্টের নির্জনতায় তারা দুজনে মিলে আজ এক নতুন কাব্য রচনার দ্বারপ্রান্তে। দুটি শরীর আজ এক উষ্ণ ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে যেতে শুরু করল। আয়াতের মনের সব দ্বিধা আর ভয় আরভানের নিবিড় সান্নিধ্যে যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

চলবে..