#পর্ব_৩৩
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
সকালের স্নিগ্ধ আলোটা আজ আয়াতের চোখে বড্ড বিষাক্ত লাগছে। গেটের সামনে লিয়ামের মা দাঁড়িয়ে আছে, পাশে তার সেই নতুন স্বামী। বাচ্চাটাকে নিতে এসেছে তারা। আয়াতের বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো করাত দিয়ে চিরে দিচ্ছে। মাত্র একটা দিন, অথচ এই কয়েকটা ঘণ্টাতেই লিয়াম নামের ওই ছোট্ট প্রাণটা আয়াতের অস্তিত্বের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছিল। কাল সারা দুপুর লিয়ামের সেই আধো আধো বোল, ওর ছোট্ট নরম হাতের স্পর্শ আর নিষ্পাপ হাসিতে আয়াত নিজের মাতৃত্বের এক অপূর্ণ স্বাদ খুঁজে পেয়েছিল। আজ ওকে এভাবে এক অনিচ্ছুক মায়ের হাতে তুলে দিতে হবে—এটা ভাবতেই ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে।
আরভান একটু দূরে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সে আয়াতের মেঘাচ্ছন্ন মুখটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আরভানের তীক্ষ্ণ চোখ যেন এক পলকেই আয়াতের মনের গভীরে জমে থাকা নীল পাহাড়ের সমান কষ্টটা পড়ে ফেলল। লিয়াম যেতে চাচ্ছিল না, সে বারবার আয়াতের আঁচল খামচে ধরছিল। কিন্তু তার মা নিচু স্বরে কানে কানে কী যেন বলতেই বাচ্চাটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল এবং যন্ত্রের মতো যেতে রাজি হলো। লিয়ামের ওই ভয়াতুর চাউনি আয়াতের কলিজায় বিঁধছে।
লিয়াম চলে যাওয়ার পরও আয়াত অনেকক্ষণ সেই ধূসর পথের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। ওর দু-চোখ বেয়ে অবাধ্য নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। আরভান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে আয়াতকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। ওর কাঁধে মুখ রেখে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে বলল,
“কাঁদছো কেন জান? ও তো ওর নিজের মায়ের কাছেই গেল। পরদেশি একজনের চেয়ে মায়ের কোল ওর জন্য বেশি নিরাপদ।”
আয়াত এক ঝটকায় আরভানের শক্ত বাঁধন আলগা করে ঘুরে দাঁড়াল। অভিমানে ওর কণ্ঠ বুজে আসছে, চোখ দুটো টকটকে লাল।
“নিরাপদ? আপনি কি ওর হাতের ওই ক্ষতগুলো দেখেননি আরভান? মা হয়ে যে নিজের সন্তানকে অন্যের মার খেতে দেখে মুখ বুজে থাকে, তার কাছে লিয়াম নিরাপদ? আপনি এটা কেন করলেন? আমি তো লিয়ামকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলাম। আমি আপনাকে বারবার বলেছিলাম ওকে আমরা দত্তক নেব। কেন ওকে জোর করে ফিরিয়ে দিলেন?”
আরভান আয়াতের কপালে গভীর এক চুমু দিয়ে শান্ত স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“আয়াত, ইমোশন দিয়ে পৃথিবী চলে না। লিয়ামের মা জীবিত আছে, সে আইনিভাবে ওর অভিভাবক। মা-বাবা যতই খারাপ হোক না কেন, সন্তানের কাছে তাদের অভাব যে কতটা যন্ত্রণার, তা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে বলো? আমি চাইনি ও আমাদের আশ্রয়ে থেকে বড় হয়ে একদিন ওর শেকড় খুঁজুক আর নিজেকে পরগাছা ভাবুক।”
আয়াত আরভানের আদর মাখা শাসন এবার সহ্য করতে পারল না। সে আরভানের হাত সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আমার ভালো লাগছে না আরভান! ছাড়ুন আমাকে, আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই। আপনার এই লজিকগুলো আজ আমার কাছে বিষ মনে হচ্ছে!”
আরভানের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে কিছুটা বিরক্ত আর অবাক হয়েই বলল,
“আয়াত, এটা কেমন ধরনের বিহেভিয়ার? একটা অজানা-অচেনা বাচ্চার জন্য তুমি আমার সাথে এভাবে রাগ দেখাচ্ছো? আমি কি তোমার পর?”
”আমি আপনার ওপর রাগ দেখানোর কে আরভান চৌধুরী? আমার নিজের কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করার অধিকার কি এই বাড়িতে আছে নাকি নেই? আমার কোনো চাওয়া-পাওয়ার কি আপনার কাছে কোনো মূল্য নেই? আমার কোনো কথাই কি আপনার কাছে মানে রাখে না? আমি কি কখনো আপনার সাথে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করতে পারব না? আমার সেই নূন্যতম অধিকারটুকুও কি আপনি আমাকে দেবেন না?” আয়াত ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আরভান আয়াতের মুখটা নিজের দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে অত্যন্ত নরম ও আকুতিভরা স্বরে বলল, “বাজে কথা বলবে না আয়াত! নিজেকে ছোট কোরো না। তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমার এই বিস্বাদ জীবনে তুমিই সবচেয়ে বেশি মানে রাখো। আমার নিশ্বাস থেকে শুরু করে হৃদস্পন্দন—সবটুকু জুড়ে শুধু তুমি।”
”মিথ্যে কথা! সব মিথ্যে!” আয়াত ওর বুক থেকে আরভানকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
“এগুলো শুধু আপনার সাজানো মুখের কথা। আসলে আপনার কাছে আমার আবেগের চেয়ে আপনার জেদ আর অহংকার অনেক বেশি প্রায়োরিটি পায়। আর এই জেদের জন্যই আপনি আজ আমার কোল খালি করে দিলেন।”
আরভান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আয়াতের প্রতিটি কথা তীরের মতো ওর বুকে বিঁধছে। সে শান্ত গলায় শুধালো, “এখনো সেই একই তিতকুটে জায়গায় আটকে আছো তুমি?”
”হ্যাঁ, আছি! কারণ আমার জীবনে আপনার কোনো পজিটিভ প্রভাব নেই। আপনি শুধু আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন, দাপট দেখাতে জানেন—ভালোবাসতে নয়।”
আয়াত রাগে কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে চরম নিষ্ঠুর সত্যটা বলে ফেলল,
“কাল অবধি হয়তো আপনার জন্য মায়া হতো, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমার জীবনে আপনি না আসলেই ভালো হতো! আপনাকে পাওয়ার চেয়ে ওই অনাথ জীবনটাই অনেক ভালো ছিল! একা থাকা অনেক শান্তির ছিল!”
আয়াতের মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ তীরের মতো আরভানের তপ্ত বুকে বিঁধল। আরভান অপলক দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখের মণি দুটো যেন স্থির হয়ে গেছে। আয়াত আর এক মুহূর্ত সেখানে না দাঁড়িয়ে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল এবং ভেতর থেকে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল।
আরভান সেখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, হাতের মুঠি পাকানো—যেন নিজের ভেতরের প্রবল কষ্টটাকে পিষে ফেলতে চাইছে। ফারহান বাইরে গাড়িতে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে জরুরি মিটিংয়ের জন্য। আরভান নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আয়াতের সাথে কথা বলার মতো বা ওকে বোঝানোর মতো মানসিক অবস্থা এখন তার নেই। সে নিজের ভেতরের জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিটাকে সুকৌশলে চেপে ধরল। আরভান আয়াতের রুমের বন্ধ দরজার দিকে শেষবারের মতো করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গটগট করে বাইরে বেরিয়ে গেল।।
–
রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই আয়াতের বাঁধভাঙা কান্না শুরু হলো। যদিও এই কান্নার মূল কারণ আরভানের সাথে করা তার সেই রূঢ় আচরণ। সে কেন, কীভাবে এসব কথা বলল? সে তো তাকে কষ্ট দিতে চায়নি, তবুও কেন বিষাক্ত শব্দগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে এলো? যে মানুষটা তার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা আগলে রাখে, তাকে কীভাবে বলল যে তার জীবনে না আসলেই ভালো হতো? আয়াতের বুক ফেটে যাচ্ছে অপরাধবোধে। সে তো তাকে কষ্ট দিতে চায়নি, তবুও কেন ওই মুহূর্তের জেদ তার হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিল? তবে আরভানের ওপর তার প্রচণ্ড অভিমানও হচ্ছে—লোকটা কি একবারও তার রাগ ভাঙাতে পারল না? সে-ও কি এতটাই রেগে গেল যে একটা কথা না বলে চলে গেল?
পুরোটা সময় অস্থিরতায় ছটফট করার পর আয়াত আর থাকতে পারল না। কাঁপাকাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে আরভানকে কল দিল। প্রথম কয়েকবার রিং হলো, কিন্তু আরভান কল ধরল না। আয়াতের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। আরভান কি তবে সত্যিই তাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে? তার ভাবনার মাঝেই ওপাশ থেকে কল ব্যাক এলো। আয়াত তাড়াহুড়ো করে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আরভানের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হুম বলুন, কেন কল করেছেন?”
আয়াত ধরা গলায় ফুঁপিয়ে বলল, “সরি… আপনার সাথে ওমন করে কথা বলা আমার একদম উচিত হয়নি। আমি খুব বাজে মেয়ে, তাই না? কথা দিচ্ছি, আর কখনো এমন করব না।”
ওপাশ থেকে আরভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু আর্দ্র স্বরে বলল, “কেন বলবে না? অবশ্যই বলবে। তুমি ছাড়া আমাকে শাসন করার আর কে আছে এই পৃথিবীতে? তবে আয়াত, তোমার যদি কখনো মনে হয় আমাকে আর সহ্য হচ্ছে না, আমার থেকে দূরে গেলেই তুমি সুখী হবে, তবে আমায় বলতে পারো। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার শান্তির পথে আমি কক্ষনো বাধা হবো না।”
আয়াত এবার ডুকরে কেঁদে উঠল, “আপনি এখনো কেন ওসব বলছেন? বললাম তো রাগে মুখ ফসকে বলে ফেলেছি। আপনার থেকে দূরে থাকার কথা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি না আরভান!”
”তুমি কাঁদছো কেন আয়াত? প্লিজ শান্ত হও।” আরভানের গলায় এখন স্পষ্ট উদ্বেগ।
আয়াত ভেজা গলায় আবদার করল, “আপনি কি একটু আমার কাছে আসবেন আরভান? খুব ইচ্ছে করছে আপনাকে ছুঁতে, আপনার বুকে মাথা রাখতে।”
আরভান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তারপর নিচু স্বরে নেশালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কেন? হঠাৎ এই অধমকে ছোঁয়ার এত ইচ্ছে জাগল যে?”
আয়াত চোখের পানি মুছে ঠোঁট কামড়ে হাসল। “ভালোবাসবো আপনাকে। আজ খুব করে ভালোবাসবো।”
ওপাশ থেকে আরভানের হালকা হাসির শব্দ শোনা গেল। “তাহলে তো আপনার আরভান ডানা লাগিয়ে উড়ে চলে আসবে মিসেস! জাস্ট ওয়েট ফর মি।”
আয়াতও হেসে ফেলল। কল কেটে দিয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ সে নিজেকে আরভানের জন্য বিশেষ করে সাজাবে। লোকটার জন্য একটা সারপ্রাইজ রাখা চাই। যেই ভাবা সেই কাজ; আলমারি থেকে নিজের পছন্দের নীল রঙের শাড়িটা বের করে পরে নিল। শাড়িতে পিন লাগাতে গিয়ে অসাবধানতায় আঙুলে পিনের খোঁচা লেগে রক্ত বের হলো।
আয়াত বিরক্ত হয়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে আরভানের ফার্স্ট এইড বক্স খুঁজতে লাগল। বক্সটা টান দিতেই ড্রয়ারের একদম নিচে রাখা একটি পুরনো ফাইলের দিকে ওর চোখ পড়ল।যার নিচে একটা সাদা পেপার।
এটি সেই কাগজ যা সে প্রথম আরভানের রক্তাক্ত হাতে ব্যান্ডেজ করার সময় দেখেছিলো , কিন্তু আরভানের বাধায় দেখা হয়নি সেদিন। কৌতূহলী হয়ে সে কাগজটি হাতে নিতেই ওর ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। বাংলাদেশ থেকে শাহজাদীর মেসেজ। মেসেজটা পড়তেই আয়াতের সারা শরীর জমে বরফ হয়ে গেল।
”আপু, দাদাজান খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলেছে হয়তো সময় বেশি নেই। তোকে শেষবারের মতো দেখতে চাইছে। আমি আরভান ভাইকে বলেছিলাম, কিন্তু সে বলল তোকে যেন না জানাই। সে হয়তো তোকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে দিতে চায় না। কিন্তু আমি রিকোয়েস্ট করছি আপু, দাদাজানের জন্য একবার আয়। আজ রাতের ফ্লাইটে চলে আয়। আরভান ভাইকে জানানোর দরকার নেই, সে জানলে তোকে আসতে দেবে না।”
আয়াত বিশ্বাস করতে পারছিল না আরভান এমন কঠোর হতে পারে! যে দাদাজান তাকে শৈশব থেকে আগলে রেখেছেন, আজ তার শেষ সময়ে আরভান তাকে বাধা দিচ্ছে? ঠিক সেই মুহূর্তেই শাহজাদীর আরও একটি মেসেজ এল—একটি ই-টিকিটের কপি। বাংলাদেশগামী ফ্লাইটের টিকিট, তাও মাত্র এক ঘণ্টা পরের।
প্রথমে আবাক হলেও আয়াত আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। আরভানকে বারবার ফোন দিয়েও না পেয়ে সে দিশেহারা হয়ে পড়ল। মনে হলো আরভান তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে চাইছে। সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পাসপোর্ট আর অসচেতন ভাবে ব্যাগে সেই পুরনো সেই কাগজটা ভরে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলো।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে আয়াত এক কোণে বসে অস্থিরভাবে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। আরভানকে বারবার কল করেও পাচ্ছে না একদিকে যেমন বিরক্তি কাজ করছে, অন্যদিকে বুকের ভেতর অজানা এক ভয়।কাগজটার কথা মনে পড়তেই ব্যাগ থেকে সেটা বের করলো।হঠাৎ এয়ারপোর্টের বড় বড় স্ক্রিনে নিউজ টেলিকাস্টের দিকে নজর পড়তেই আয়াতের পৃথিবীটা থমকে গেল। হেডলাইন জ্বলজ্বল করছে,
“অস্ট্রেলিয়ার তরুণ শিল্পপতি আরভান চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি।”
স্ক্রিনে দেখাচ্ছে একটি স্ট্রেচারে করে কাউকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হচ্ছে। আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। ওটা তার আরভান! অসম্ভব, কয়েক ঘন্টা আগেও তো মানুষটা তার সামনে থেকে সুস্থ শরীরে গেল। ওর চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল। এক মুহূর্তে মনে হলো সব মিথ্যে! ওটা তার আরভান হতে পারে না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “না! এটা হতে পারে না! এটা মিথ্যে খবর!”
সে হন্যে হয়ে ফারহান আর আরভানকে আবার কল দিতে লাগল, কিন্তু কেউ কল তুলল না। এয়ারপোর্টে উপস্থিত মানুষজন ওর কান্নায় হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আয়াত পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল। পুলিশ এবং সিকিউরিটি গার্ডরা ওর দিকে ছুটে এল। আয়াত তাদের হাত চেপে ধরে আর্তনাদ করে বলল, “প্লিজ! এটা মিথ্যে বলুন! আমার আরভান ঠিক আছে। আমার স্বামীর কিছু হয়নি।প্লিজ আমাকে একটু ওর কাছে নিয়ে চলুন।
আয়াতের অবস্থা দেখে পুলিশ কর্মকর্তারা ওকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় আয়াতের হাতে থাকা সেই কুঁচকানো কাগজটার দিকে নজর পড়ল। ঝাপসা চোখে সে কাগজটা খুলে দেখতেই তার চোখ থমকে গেলো। এটা কোনো সাধারণ কাগজ নয়, এটা ছিল আরভানের একটি অত্যন্ত গোপন মেডিকেল রিপোর্ট।
প্রেসক্রিপশনের পাতায় বড় বড় অক্ষরে লেখা রোগটির নাম দেখে আয়াতের হূৎপিণ্ড যেন থমকে গেল— “অ্যার্টিক অ্যানিউরিজম”
আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরলেও কান্নার শব্দ থেমে গেল। কানের কাছে ভেসে উঠতে লাগল আরভানের সেই দিনগুলোর কথা, যেদিন সে আয়াতকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল।
সেই পুরনো কথা— “তোমাট ভালোর জন্য তোমাকে মুক্তি দিতে চাইছি।”
তখন সেই কথাগুলো শুনে আরভানের প্রতি ঘৃণায় মন ভরে গিয়েছিল, অথচ সেই মানুষটা নিজের জীবনের এত বড় মরণব্যাধির কথা তার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।আজ সেই মানুষটা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
আয়াতের পাগলামি যেন আরও বেড়ে গেল।পিছনে রয়ে গেলো এয়ারপোর্টের সেই কর্মব্যস্ত বিকেলে মানুষজন। যারা এক অদেখা বেদনার সাক্ষী হয়ে দেখল।
একটি মেয়ে তার অস্তিত্বের খোঁজে কীভাবে পাগলের মতো হাসপাতালের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
চলবে…..
#পর্ব_৩৪
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
হাসপাতালের করিডোরটা যেন এক অনন্ত দীর্ঘ পথ। সাদা দেয়াল আর ফিনাইল মেশানো উৎকট গন্ধ আয়াতে নাকে এসে আছড়ে পড়ছে।তবুও সে দৌড়াচ্ছে, তার অবাধ্য পা দুটো বারবার হোঁচট খাচ্ছে, কিন্তু তার কোনো হুঁশ নেই। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথার ভেতরে হাতুড়ির মতো বাজছে আরভানের সেই রহস্যময় কথাগুলো,
‘আয়াত, আমাকে কোথাও খুঁজে না পেলে কী করবে?’, ‘আমি চাই না আমার বাবা-মায়ের মতো কোনো অসুখী বাচ্চার জন্ম দিতে’। কিংবা সেই বিদ্রূপাত্মক হাসি দিয়ে বলা,
“তোমার মঙ্গলের জন্যই তোমাকে মুক্তি দিতে চাইছি।”
আয়াত এখন হাড়ভাঙা যন্ত্রণায় বুঝতে পারছে, কেন দীর্ঘ বারো বছর পর আরভান তাকে ডিভোর্স দিতে চেয়েছিল। কেন সে আয়াতকে পাগলের মতো ভালোবাসলেও আঁকড়ে ধরতে ভয় পেত। কেন সে নিজেকে সবসময় এক অদৃশ্য দেয়ালের ওপাশে সরিয়ে রাখত। সে জানত, তার শরীরের ভেতরে এক মরণব্যাধি শিকড় গেড়ে বসেছে। সে জানত, তার আয়ু ফুরিয়ে আসছে। সে চায়নি তার চলে যাওয়ার পর আয়াত বিধবা হওয়ার দহন নিয়ে বেঁচে থাকুক, কিংবা তার দেওয়া ছোট্ট প্রাণটি পৃথিবীর আলো দেখার আগেই পিতৃহীন হওয়ার অভিশাপ নিয়ে বড় হোক। সে চেয়েছিল আয়াতের চোখে ঘৃণা হয়ে বেঁচে থাকতে, যাতে তার মৃত্যুতে আয়াতের চোখে জল না আসে।
আইসিইউ-এর সামনে পৌঁছাতেই আয়াত দেখল ফারহান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এলিনা চৌধুরী বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে আছেন, দু-হাতে মুখ ঢাকা।
আয়াতকে দেখেই ফারহান চমকে উঠল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “আয়াত… তুমি এখানে কীভাবে?”
ফারহানের চোখের কোণে অপরাধবোধের স্পষ্ট ছাপ।
আয়াত টলতে টলতে ফারহানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর বুজে আসছে, তবুও সে চিৎকার করে বলতে চাইল, “ফারহান ভাইয়া, আমার… আমার আরভান কোথায়? কোথায় রেখেছেন ওনাকে?”
ফারহান কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে রইল। আয়াতের ভেতরের বাঁধ ভেঙে গেল। সে ফারহানের জামার কলার খামচে ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলতে লাগল, “কথা বলছেন না কেন? ও তো বলেছিল ও উড়ে উড়ে চলে আসবে আমার কাছে! কই? কেন আসছে না? সকালে তো ও সুস্থ ছিল! ও তো বলল ও আসবে! আমার স্বামী কোথায় ফারহান ভাইয়া? কথা বলছেন না কেন? প্লিজ… কিছু একটা বলুন!”
আয়াত ডুকরে কেঁদে উঠল। ফারহান ওকে ধরার চেষ্টা করে বলল, “আয়াত, শান্ত হও। আরভানের কিছু হয়নি, ও ঠিক হয়ে যাবে…”
“শান্ত হবো?” আয়াত চিৎকার করে উঠল,
“কিসের জন্য শান্ত হবো? আপনারা সবাই মিলে আমাকে ঠকিয়েছেন! ও জানত ও কতটা অসুস্থ, অথচ আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও বুঝতে দেয়নি! ও হাসত, আমাকে রাগাত, আদর করত—সবই কি তবে চিরবিদায়ের প্রস্তুতি ছিল? আপনারা কীভাবে পারলেন আমার কাছ থেকে এটা লুকাতে?”
আয়াত নিজের চোখ মুছে উন্মত্তের মতো প্রতিটি আইসিইউ-এর কাঁচের দরজায় উঁকি দিতে লাগল। হঠাৎ একটি দরজার সামনে গিয়ে ওর পা থমকে গেল। ওপাশে শুয়ে আছে আরভান। সেই দীর্ঘদেহী, শক্তিশালী মানুষটা আজ সাদা চাদরের নিচে নিথর হয়ে পড়ে আছে। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকের ওপর অসংখ্য তার আর মেশিনের বিচিত্র শব্দ। পাশের মনিটরে তার হৃদস্পন্দনের গ্রাফটা ধীরলয়ে ওঠানামা করছে। আরভানের সেই প্রশস্ত বুক, যেখানে মাথা রেখে আয়াত পৃথিবীর সব নিশ্চিন্তে ঘুমাত, আজ সেখানে কেবল কৃত্রিম বাতাসের আনাগোনা।
আরভান কি বুঝতে পারছে তাকে এভাবে দেখে তার আয়াত বাইরে দাঁড়িয়ে ডুকরে মরছে?
আয়াত পাগলের মতো দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। “দরজাটা খুলুন।ফারহান ভাইয়া, প্লিজ দরজাটা খুলতে বলুন। আমার আরভান একা থাকতে পারবে না, ওর খুব ভয় করছে। আমাকে ওর কাছে যেতে দিন! ফারহান ভাইয়া, ওদের বলুন আমাকে ভেতরে যেতে দিতে! ওর খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি জানি ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি কিচ্ছু বলব না, একদম চুপ করে ওর পাশে বসে থাকব। আমাকে একটু ওর হাতটা ধরতে দিন, ও ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে!”
আয়াতের আহাজারিতে হাসপাতালের শান্ত পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। সে দরজার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বিলাপ করতে লাগল, “আমার স্বামীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন! আমি ওকে ঠিক করে দেব। ওর কিচ্ছু হবে না, আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। আরভান… আরভান শুনতে পাচ্ছেন? আপনি না বলেছিলেন আপনার মিসেস ডাকলে আপনি ডানা মেলে উড়ে আসবেন? তাহলে এখন কেন চুপ করে শুয়ে আছেন? একবার তাকান আমার দিকে! একবার মুখ ফুটে কিছু বলুন!আমার কাছে একবার আসুন আরভান। আমি আর আপনার সাথে কোনোদিন তর্ক করব না, কোনোদিন কোনো জেদ ধরব না। শুধু একবার আমার কাছে ফিরে আসুন আরভান… আমার বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে!”
এলিনা চৌধুরী উঠে এসে আয়াতকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলেন। “আয়াত, শান্ত হও ! আরভানের কিছু হয়নি। ওকে শুধু কয়েক ঘণ্টা অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে, ও আবার আগের মতো তোমার কাছে ফিরে আসবে।”
আয়াত ঝটকায় এলিনা চৌধুরীকে সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন আগুনের ফুলকি আর জল একাকার। সে তিক্ত স্বরে বলে উঠল, “শান্ত হব? আপনি আমাকে শান্ত হতে বলছেন? যে ছেলেটাকে আপনারা তিলে তিলে অবহেলায় শেষ করে দিয়েছেন, আজ তার এই অবস্থায় আপনি সান্ত্বনা দিতে এসেছেন? লোকদেখানো মায়া করবেন না!”
এলিনা চৌধুরী কেঁদে বললেন, “আয়াত, আমি আরভানের মা! আমার ছেলের জন্য আমারও বুক ফাটছে…”
”মিথ্যে কথা!” আয়াত চিৎকার করে উঠল। “সব মিথ্যে! আমার স্বামীর এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই! কেউ কোনোদিন ওকে ভালোবাসেনি। প্রথম যেদিন ও আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল, ওর চোখের গভীরে যে পাহাড়প্রমাণ কষ্ট ছিল, আমি তা বুঝতে পারিনি। আজ বুঝতে পারছি, আপনারা কেউ ওকে আপন করেননি। ও একাকী লড়াই করেছে নিজের অস্তিত্বের সাথে, আর এখন যখন ও মৃত্যুর সাথে লড়ছে, তখনও আপনারা অভিনয়ের মুখোশ পরে আছেন!”
ঠিক সেই সময় আইসিইউ-এর ভেতর থেকে সেই মেয়েটি বের হয়ে এল—ডক্টর দিবা সাজান। তাকে দেখে আয়াতের মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। দিবা সাজান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার মনে হয় এভির এবার খুব শীঘ্রই অপারেশনটা করে ফেলা উচিত।যেকোনো মুহূর্তে অ্যার্টিক ডিসেকশন হয়ে যেতে পারে। ওকে একটু বোঝান, ও যেন এবার অন্তত অপারেশনে রাজি হয়।এভাবে অবহেলা করলে সত্যিই এবার চিরতরে কিছু একটা ঘটে যাবে…তখন আমরা ওকে আর ফেরাতে পারব না।”
কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন, কিন্তু আয়াত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে কাঁচের ওপাশে আরভানের বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ স্বরে ফারহানকে জিজ্ঞেস করল, “কেন আমাকে কিছু জানানো হয়নি ফারহান ভাইয়া? এতগুলো মাস কেন আমাকে অন্ধকারে রাখা হলো?
ফারহান অপরাধী স্বরে বলল, “আরভান কড়াভাবে নিষেধ করেছিল আয়াত। ও বলেছিল, তুমি যদি ওর অসুস্থতার কথা জানো, তবে তুমি ভালোবাসার বদলে দয়া করে ওর সাথে থাকবে। ও তোমার চোখে দয়া দেখতে চায়নি আয়াত, ও শুরুতে চেয়েছিল তুমি ওকে ঘৃণা করে দূরে চলে যাও, যাতে ওর চলে যাওয়ার পর তোমার কষ্ট কম হয়।কিন্তু ও না চাইতেও তোমার মায়ায় এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে তোমাকে ছাড়তে পারেনি। ওর জীবনে কোনো পিছুটান ছিল না, একমাত্র তুমিই ওর শেষ অবলম্বন হয়ে এসেছ, যা ওকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দিয়েছিল।”
আয়াতের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। দয়া? আরভান ভেবেছিল আয়াত তাকে দয়া করবে? সে কি জানত না আরভানের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে আয়াতের প্রতিটি রক্তবিন্দু জড়িয়ে আছে?
”দয়া?” আয়াত অস্ফুট স্বরে বলল। “ও কি আমার আজীবনের সাধনাকে দয়া ভেবেছিল? ও কি জানত না আরভান চৌধুরী ছাড়া এই আয়াতের কোনো অস্তিত্ব নেই?”
আয়াত আবার আইসিইউ-এর দরজায় নিস্পৃহ চোখে ওপাশে তাকাল। “আপনি বড় স্বার্থপর আরভান! আমাকে দয়া দেখানোর সুযোগ দিলেন না, কিন্তু নিজেকে তিলে তিলে শেষ করার সুযোগ ঠিকই নিলেন? আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না! যদি আপনি ফিরে না আসেন, আমি পরকালেও আপনাকে ক্ষমা করব না!”
আয়াতের আর্তনাদ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এল। তার মাথা ঘুরছে, চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। “আরভান… আমি পারছি না… আমাকে একা ফেলে যাবেন না..আমার কাছে ফিরে আসুন.” বলতে বলতে আয়াতের শরীরটা এলিয়ে পড়ল হাসপাতালের ঠান্ডা মেঝেতে। সেন্স হারানোর ঠিক আগমুহূর্তে তার কানে বাজল সেই যান্ত্রিক হৃদস্পন্দনের শব্দ—যা তার পৃথিবীটা থামিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে।
****
আয়াতের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন জানলার বাইরে গোধূলির ম্লান আলো। সে নিজেকে এক অপরিচিত বিলাসিতায় ঘেরা বিছানায় আবিষ্কার করল। চারপাশের আসবাবপত্র আর আভিজাত্য দেখে সে কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। মুহূর্তেই হাসপাতালের সেই বীভৎস দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। এলিনা চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এলেন। তার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার কালো ছাপ স্পষ্ট।
”আর ইউ ওকে আয়াত?
আয়াত তার হাত সরিয়ে দিয়ে ব্যাকুল হয়ে ডুকরে উঠল, “আমি এখানে কেন? আরভান কোথায়? আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন।
এলিনা চৌধুরী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপরাধীর মতো বললেন, “আরভান হাসপাতালেই আছে। তুমি জ্ঞান হারিয়েছিলে, আমার মনে হয়েছিল সেই মুহূর্তে তোমার হাসপাতালে থাকাটা ঠিক হবে না, তাই তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছি।”
আয়াত কোনো কথা না বলে বিছানা ছেড়ে দ্রুত নামতে গেল। অস্থিরতায় তার পা কাঁপছিল, শরীর যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই হঠাৎ ড্রেসিং টেবিলের কোণায় রাখা একটি দামী কাঁচের শোপিস তার গায়ের ধাক্কায় নিচে পড়ে চুরমার হয়ে গেল। আয়াত আঁতকে উঠে নিচু হয়ে কাঁচের টুকরোগুলো সরাতে গেল। এলিনা চৌধুরী বাধা দিয়ে বললেন, “ইটস ওকে আয়াত! কাঁচ ধরো না, হাতে ফুটে যাবে।”
কাঁচ সরাতে গিয়েই হঠাৎ মেঝের এক কোণায় পড়ে থাকা দুটি ভাঁজ করা চিঠির দিকে আয়াতের নজর গেল। কৌতূহলবশত সে কাগজগুলো হাতে নিয়ে মেলে ধরল। কিন্তু লেখাগুলো দেখামাত্রই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। এ যে তার দাদাজানের হাতের চেনা লেখা! কয়েক মাস আগের একটি চিঠিতে লেখা আছে:
”তোমার ভরসায় আয়াতকে ওখানে পাঠালাম। আশা করি তুমি আমার বিশ্বাস ভাঙবে না। ওদের দুজনকে দেখে রাখবে সবসময়।”
তার নিচে আরেকটি জীর্ণ চিঠি, যার তারিখ বলছে চার বছর আগের। সেখানে লেখা:
”তুমি কোনোভাবে আরভানকে এখানে পাঠিয়ে দাও, বাকিটা আমি সামলে নেব। আমাদের পরিকল্পনা সফল হতেই হবে।”
আয়াত নিস্পৃহ ও পাথরের মতো চোখে এলিনা চৌধুরীর দিকে তাকাল। এলিনা চৌধুরী তখন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
হয়তো এই চিঠিগুলো যে এখানে রয়ে গেছে, তা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।
আয়াত ভাঙা গলায় বলল, “এসব কী? আপনার সাথে দাদজানের যোগাযোগ ছিল? এখনো আছে? তাহলে দাদজান আপনাকে অপছন্দ করার নাটক কেন করতেন? এতটা নিষ্ঠুর কেন আপনারা সবাই? আমাকে আর আরভানকে নিয়ে আপনারা কী জঘন্য খেলা খেলছেন? ”
এলিনা চৌধুরী বিছানায় বসে আয়াতকে পাশে বসার ইশারা করলেন, কিন্তু আয়াত সরু চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়েই রইল। এলিনা চৌধুরীর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করল। তিনি রুদ্ধস্বরে বলতে শুরু করলেন, “কোনো খেলা খেলছি না আয়াত, শুধু তোমাদের দুজনকে ভালো রাখতে চেয়েছিলাম। পরিস্থিতির শিকার আমরা সবাই।”
তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করলেন, “আরভানের এই মরণব্যাধি আজ নতুন নয় আয়াত, বছরের পর বছর ধরে ও এই বিষ নিজের শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে।”
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ছোটবেলা থেকে আরভান ছিল তার বাবার অন্ধ ভক্ত। আরশাদ যা বলত, ও চোখ বন্ধ করে তা-ই বিশ্বাস করত। আরশাদ আমাকে বা আমার ছেলেকে কোনোদিন ভালোবাসেনি। সে অন্য এক নারীকে ভালোবাসত। আর সেই নারী কে জানো আয়াত? সে ছিল তোমার মা।”
আয়াতের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। এলিনা চৌধুরী বলে চললেন, “আরশাদ আমাকে শুধু সম্পত্তির লোভে বিয়ে করেছিল, যা আমি বুঝতে পারিনি। আরভান যখন তোমাকে বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া ফিরল, আরশাদ একদিন নেশার ঘোরে সব বলে ফেলেছিল। আমি প্রথমবার তোমার মায়ের পরিচয় জেনেছিলাম। তখন থেকেই আরভানের মুখে তোমার নাম শুনলে আমার প্রচণ্ড রাগ হতো, আমি সহ্য করতে পারতাম না। আরভানকে নিজের ইগো আর আরশাদের অংশ ভেবে আমিও তাকে চরম অবহেলা করতে শুরু করলাম। অথচ ছেলেটা তখন ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।”
তিনি আরও বললেন, “আরভানের বাবা নিজের ছেলেকে কেবল একটা ‘রিসোর্স’ বা পরীক্ষার বস্তু বানিয়েছিল। সে আরভানকে নিয়মিত ড্রাগ দিত যাতে আরভান ওর হাতের পুতুল হয়ে থাকে এবং ও ড্রাগের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। সেই ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আরভানের ‘অ্যার্টা’ ফুলে যেতে শুরু করে, যা আমার অজানাই ছিল। বাবা-ভক্ত ছেলেটি কোনোদিন আমাকে কিচ্ছু বলেনি। এরপর একদিন আরভানকে তার বাবার সাথে ভীষণ খারাপ ব্যবহার করতে দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমি ওকে চড় মেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম। আমার জেদি ছেলেটা সত্যিই সেদিন বেরিয়ে গিয়েছিল, আর কোনোদিন আমার সামনে আসেনি। পরে জানতে পারলাম, ও প্রচণ্ড ড্রাগ অ্যাডিক্টেড হয়ে গিয়েছিল এবং ওকে রিহ্যাবেও থাকতে হয়েছিল।”
আয়াত ডুকরে কেঁদে উঠল। আরভানের ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় বয়ে গেছে অথচ সে কিছুই জানত না।
এলিনা বললেন, “সব ঠিক হতে শুরু করলে একদিন ওর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হলো—হাসপাতালে নিলে জানতে পারলাম ও’ এওর্টিক অ্যানিউরিজম’ আক্রান্ত। আরভানের বাঁচার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। ও চেয়েছিল এই তিক্ত পৃথিবী থেকে মুক্তি পেতে। তাই ও অপারেশন করাতে রাজি হতো না। তখন আমি বাধ্য হয়ে তোমার দাদাজানকে প্রথমবার চিঠি লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম উনি আমাকে অপছন্দ করেন বলে পাত্তা দেবেন না, কিন্তু উনি দিয়েছিলেন। এই চিঠিগুলো তারই প্রমাণ।”
আয়াত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল। এলিনা চৌধুরী বললেন,
“আরশাদ ওর ট্রাভেল ব্যান করে দিয়েছিল যাতে ও অস্ট্রেলিয়ার বাইরে যেতে না পারে। সব পাসপোর্ট-কাগজ ওর বাবার কাছে ছিল। এরপর একদিন আরশাদ ওকে ডেকে বলল বাংলাদেশে গিয়ে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে আসতে। আমি তখন ওকে হাতজোড় করে বলেছিলাম—আমার জন্য হলেও তুমি ওকে নিয়ে আসো। আরভান কথা না বলে বেরিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে আবার ফিরে আসল এবং তার বাবার সব শর্ত মেনে নিল। হয়তো ওর অবচেতনে তোমাকে শেষবার দেখার তীব্র ইচ্ছা ছিল।
জানো আয়াত, ও সেই ছোটবেলায় তোমাকে বিয়ে করে আসার পর এই দেশে কোনো মেয়ের সাথে মিশত না। যখন তোমাকে নিয়ে ফিরল, আমি ওর চোখে প্রথমবার প্রাণের স্পন্দন দেখেছিলাম।তোমার দাদাজানও চেয়েছিলেন আরভান যেন তোমার ভালোবাসায় নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পায়। তাই তিনি জোর করে তোমাকে পাঠিয়েছিলেন।”
সব শুনে আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। কোনো বাবা কীভাবে তার নিজের ছেলেকে কোনো বাবা কীভাবে তার নিজের ছেলেকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে? কোনো মা কীভাবে নিজের সন্তানকে স্বামীর প্রতি ঘৃণার কারণে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে? এলিনা চৌধুরী এক গ্লাস পানি আনতে গেলে আয়াত আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। সে ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। এলিনা চৌধুরী ফিরে এসে দেখলেন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি পেছন থেকে ডাকলেও আয়াত তখন ট্যাক্সিতে উঠে পড়েছে।কিন্তু বিধি বাম! মাঝপথে ট্যাক্সিটি বিকল হয়ে গেল। আয়াত দিশেহারা হয়ে জনশূন্য রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
এলিনা চৌধুরি ফারহানকে ফোন করে সব জানালেন।ফারহান ততটা গুরত্ব দিলো না। আয়াত যখন একবার হাসপিটালে এসেছে সে ঠিকই চিনি আসতে পারবে।
ওদিকে হাসপাতালের আইসিইউতে আরভানের জ্ঞান ফিরল। ফারহান দ্রুত এলিনা চৌধুরীকে কল দিয়ে জানাল। এলিনা চৌধুরী ভিডিও কলে আরভানের মুখটা এক পলক দেখলেন। আরভান অক্সিজেন মাস্কের ভেতর দিয়ে খুব কষ্টে অস্ফুট স্বরে প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করল, তা হলো— “আয়াত… আয়াত কোথায়?”
ফারহান এই অবস্থায় ওকে দুশ্চিন্তা দেওয়া ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না। তবুও সে বলল,
“আসলে… আয়াত কীভাবে যেন সব জেনে গিয়েছিল। ও হাসপাতালে এসে প্রচণ্ড পাগলামি করেছে, তারপর জ্ঞান হারায়। এলিনা আন্টি ওকে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ও সেখান থেকেও কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে এসেছে। ও বোধহয় হাসপাতালের পথটা ঠিকমতো চেনে, তাই চিন্তা করিস না, ও ঠিক চলে আসবে।”
আরভান চোখ বুজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার অবশ শরীরে যেন এক অদ্ভুত হাহাকার খেলে গেল।
চলবে…

