Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-৩১+৩২

আমার হয়ে থেকো পর্ব-৩১+৩২

0
381

#পর্ব_৩১
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

​ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি, জানালার কাঁচ ভেদ করে আবছা নীলাভ আলো রুমে প্রবেশ করছে।চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আরভানের প্রশস্ত বলিষ্ঠ বুকের মাঝে মুখ গুঁজে অনবরত ফুঁপিয়ে যাচ্ছে আয়াত। আরভান তাকে নিজের বাহুবন্ধনে নিবিড়ভাবে মিশিয়ে রেখেছে। আরভানের উন্মুক্ত বক্ষস্থল আয়াতের চোখের নোনা পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। আয়াতের চোখের পানি সবসময় আরভানের কষ্টের কারণ হলেও, আজকের এই স্নিগ্ধ ভোরের কান্নার মাঝে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে আরভানের মনে। কেন যেন মনে হচ্ছে, অধিকারের এই কান্নার মাত্রাটা আরও একটু বাড়িয়ে দিতে।​আরভান আয়াতের অনাবৃত কোমল দেহটাকে কমফোর্টার দিয়ে পরম আবেশে আবৃত করে দিল। ওর কপালে একটি দীর্ঘ ও উষ্ণ চুমু দিয়ে গভীর মায়ায় জড়ানো স্বরে বলল,
“সরি মিসেস! বুঝতে পারিনি আপনার এতটা কষ্ট হবে। আসলে নিজেকে ঠিক ধরে রাখতে পারিনি, একদম নিজের মধ্যে ছিলাম না আমি… সরি।”

​আয়াত কোনো প্রতিউত্তর দিল না। অভিমানে সে নিজেকে আরভানের বুকের ভাঁজে আরও বেশি করে গুঁজিয়ে দিল। জানালার কাঁচের ওপাশে তখন ধবধবে সাদা তুষার ঝরছে। বাইরের সেই স্বর্গীয় রূপ রুমের ভেতর থেকেও স্পষ্ট। আরভান আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“মিসেস, তুষারপাত দেখবে না? তাকিয়ে দেখো, বাইরে কী সুন্দর সাদা তুলোর মতো তুষার পড়ছে!”

​আয়াতের ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দটা আরও বাড়ল। সে অস্ফুট স্বরে কেবল একটি শব্দই উচ্চারণ করল— “নাহ..

​আরভান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, শব্দ করেই হেসে দিল। আয়াত মুখ তুলে আরভানের দিকে তাকাতেই দেখল আরভানের চোখে একরাশ দুষ্টুমি। কান্নায় আর লজ্জায় আয়াতের গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। আরভান ওর গাল টিপে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “এতটুকুতেই এই অবস্থা? আপনার তো পুরো বাকি জীবনটা আমার সাথে পড়ে আছে মিসেস, তখন কী করবেন শুনি?”

আয়াত রাগে আর অভিমানে গাল ফোলালো। আরভান আর কোনো কথা না বলে কমফোর্টার পেঁচানো অবস্থাতেই আয়াতকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। বারান্দার স্লাইডিং ডোরটা খুলে সে আয়াতকে নিয়ে কনকনে ঠান্ডার মাঝে দাঁড়াল। হিমেল বাতাস আর তুষারের স্পর্শে আয়াত চোখ তুলে তাকাল। এতক্ষণের শরীরের সকল ক্লান্তি আর জড়তা যেন এই মোহময় দৃশ্যের কাছে হার মানল। পাহাড়ি উপত্যকার বুক চিরে শুভ্র তুষার ঝরছে। আয়াতের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে তুষার ছোঁয়ার নেশায় মগ্ন হয়ে পড়ল।

আরভান মুগ্ধ হয়ে আয়াতের ওই নিষ্পাপ হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। গাঢ় স্বরে বলল, “মিসেস, আপনাকে এখন প্রচণ্ড মায়াবী লাগছে। বিশ্বাস করুন, নিজেকে সামলানো বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার জন্য… আর একবার কি…”

​আয়াত চোখ বড় বড় করে তাকাল। “অসভ্য একটা লোক আপনি! আমাকে যেমন দেখাক তাতে আপনার কী? আর কখনো আপনি ওভাবে আমার দিকে তাকাবেন না, একদম না!”

​আরভান তার চিরচেনা সেই ‘ডেভিল স্মাইল’ দিয়ে বলল, “ওকে মিসেস, আপনার হুকুম শিরোধার্য। এখন তাহলে আজকের মতো একবার প্রাণভরে দেখে নিই, বাকিটা না হয় তোলা থাকল আগামীর জন্য!”

​আয়াত থমত খেয়ে বলল, “মা… মানে?”

​”মানেটা খুব সহজ মিসেস—ভালোবাসবো, ভীষণভাবে ভালোবাসবো!”

​আরভানের গলার স্বর অনেক বেশি গম্ভীর আর নেশালো শোনাল। আয়াত কিছু বুঝে ওঠার আগেই চিৎকার করে উঠল— “নাহ!”

​কিন্তু আরভান আয়াতের সেই পাতলা চিৎকার আর মিথ্যে অসম্মতির তোয়াক্কা করল না। তাকে আবারও পাঁজাকোলা করে বিছানায় ফিরিয়ে নিয়ে এল এবং পুনরায় এক নিবিড় আদরের প্রলেপে তাকে ভরিয়ে দিল।

​দেখতে দেখতে আরও কিছুদিন কেটে গেল। সেই রাতের পর থেকে আয়াত আর আরভানের মধ্যের সম্পর্কের অদৃশ্য দেয়াল যেন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এখন তাদের মধ্যে এক গভীর নির্ভরতা আর না বলা টানের রাজত্ব। যেখানে মায়া আর অধিকারের ভাগটা বড্ড বেশি।

​আয়াতের কলেজে এতদিন এক্সাম চলছিল, আজ তার শেষ পরীক্ষা। সে স্টাডি রুমে চুপচাপ বসে আছে আরভানের অপেক্ষায়, কিন্তু আরভানের নিচে নামার নামই নেই। দিন দিন আয়াত বড্ড বেশি হিংসুটে আর অধিকারপ্রবণ হয়ে যাচ্ছে। এই যে আরভানকে সে তার কলেজের আশেপাশেও ঘেঁষতে দিতে চায় না—কারণটা খুব সাধারণ। বারবার বাইরের মেয়েদের নজর লেগে যায় ওর ওপর। আরভানের ব্যক্তিত্বটাই এমন যে যেকোনো নারী ওকে দেখে দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হয়।

​আয়াত এর আগে কখনো আরভানের এই বিশেষ ব্যক্তিগত লাইব্রেরি রুমে আসেনি। আজ বিরক্তি আর কৌতূহলবশত এসেই সে চমকে গেল। চারদিকে বিশাল সব বইয়ের সমারোহ। প্রথমে ভেবেছিল ওর স্বামীর হয়তো সাহিত্য বা দর্শনের ওপর দারুণ শখ, কিন্তু বইগুলোর নাম দেখে ওর সেই ভালো লাগার রেশ বেশিক্ষণ টিকল না।

​বইগুলো মোটেও সাধারণ কিছু নয়। অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর সব বিষয়বস্তু। ‘দ্য আর্ট অফ ম্যানিপুলেশন’, ‘ডার্ক সাইকোলজি’, ‘হাউ টু ব্রেক এ পারসন ইন্টারনালি’—সবই যেন মানুষের মন নিয়ে খেলার ভয়ঙ্কর সব হাতিয়ার। আয়াত যখন এই বইগুলোর রহস্য নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুব দিচ্ছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত হাত ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। আরভান ওর কাঁধে থুতনি রেখে গালে ঠোঁট চেপে ধরল। আয়াত শিউরে উঠলেও পরক্ষণেই হেসে ফেলল। এই মানুষটা ওকে দেখলেই এভাবে আদরে ভরিয়ে দেয়।

​আয়াতের মাঝে মাঝে খুব সন্দেহ হয়, আরভান এমন কেন? অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া আর বেড়ে ওঠা একজন পুরুষ, যাকে সে কখনো অ্যালকোহল ছুঁতে দেখেনি, না কখনো অন্য মেয়েদের সাথে অপ্রয়োজনে মিশতে দেখেছে। অথচ এই দেশের কালচারে এগুলো তো খুবই সাধারণ। তাহলে সে কি সবার চেয়ে আলাদা? নাকি সে নিজের আসল সত্তাকে আড়াল করে রাখে?

​আরভান আয়াতের গালে নিজের গাল ঘষে দিয়ে ফিসফিস করল, “কী ভাবছেন এত নিবিষ্ট মনে, মিসেস?”

​ওর খোঁচা খোঁচা দাড়ির ঘর্ষণে আয়াত আলতো ব্যথা পেয়ে বলল, “উফ! ব্যথা পাচ্ছি আরভান, ছাড়ুন!”

​”ডোন্ট মেক দ্যাট ব্যাড সাউন্ড মিসেস, আদারওয়াইজ আই উইল লুজ মাই কন্ট্রোল।” আরভানের তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের কানে এক অজানা কাঁপন ধরিয়ে দিল।

​আয়াত হেসে বলল, “আপনি তো সারাদিনই কন্ট্রোল হারিয়ে বসে থাকেন, নতুন কিছু বলুন যা আমি জানি না।”

​”অপবাদ দিচ্ছেন আমাকে? মোটেও কন্ট্রোললেস নই আমি, যথেষ্ট ধৈর্যশীল মানুষ!” আরভান আয়াতের ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজল।

​আয়াত বইগুলোর দিকে ইশারা করে বলল, “আপনার এই স্টাডি রুমে এত ম্যানিপুলেশন আর ডার্ক সাইকোলজির বই কেন? আপনি কি মানুষকে ম্যানিপুলেট করা শিখছেন?”

​আরভান বাঁকা হেসে বলল, “তোমার কী মনে হয়?”

​আয়াত চোখ টিপ দিয়ে দুষ্টুমি করে বলল, “আমার তো মনে হয় আপনি আমাকেও ম্যানিপুলেট করেই নিজের মায়ার জালে ফাঁসিয়েছেন। আমি তো আগে এমন ছিলাম না!”

​আরভান আয়াতের ঠোঁটে একটা নিবিড় চুমু দিয়ে গাঢ় স্বরে বলল, “সত্যিই আপনাকে ম্যানিপুলেট করেছি মিসেস। আপনাকে এতটাই কবজা করেছি যে, আপনি আমার জন্য একদিন হয়তো মানুষকে খুনও করে ফেলতে পারবেন।”

​আয়াত প্রথমে ভ্রু কুঁচকালেও পরে আরভানের রসিকতা ভেবে শব্দ করে হেসে ফেলল। “এমনটা কখনো আপনার শান্ত মিসেসের দ্বারা সম্ভব নয় মিস্টার! আপনি বড্ড বেশি ভেবে ফেলেছেন।”

​আরভান অদ্ভুত এক রহস্যময় হাসি হাসল। আয়াত সেই হাসির গূঢ় অর্থ বোঝার চেষ্টা করল না। আরভান বলল, “চলুন ম্যাডাম, এবার যাওয়া যাক।

গাড়িতে বসে থাকার সময় আয়াতের মনে জমে থাকা সেই পুরনো প্রশ্নটি আবারও উঁকি দিল। সে নিজেকে সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, “আরভান, আপনি অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েও কোনোদিন নেশা করেননি কেন? এটা তো আপনার পারিপার্শ্বিকতায় খুব স্বাভাবিক ছিল।”

​”তুমি কি চাও আমি নেশা করি?” আরভান শান্ত গলায় পালটা প্রশ্ন করল।

​”আমি চাইলেই কি আপনি করবেন?”


​আরভানের চোখে মুহূর্তেই ভেসে উঠল সেই পুরনো অন্ধকার দিনগুলো। যখন তার পুরো দুনিয়া ছিল তার নিষ্ঠুর বাবা।এবং সে ছিল কেবল একটা ‘এক্সপেরিমেন্ট’ এর সরঞ্জাম। যার শরীরে দিনের পর দিন বিষাক্ত ড্রাগের ইনজেকশন ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। একটা পর্যায়ে সে এতটাই আসক্ত আর উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল যে তাকে যন্ত্রণাদায়ক রিহ্যাব সেশন পার করতে হয়েছিল। আরভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে গম্ভীর স্বরে বলল, “উঁহু, কখনোই না । বিকজ অ্যালকোহল ইজ ইনজুরিয়াস ফর হেলথ সুইটি।”

আয়াত কিছুটা অবাক হয়ে বলল, “বাব্বাহ! আপনি এতটা স্বাস্থ্য সচেতন? আগে তো জানতাম না। আর শুনুন, এসব বাজে নামে আমাকে আর ডাকবেন না। শুরু থেকেই অদ্ভুত সব নামে ডেকে যাচ্ছেন।”

​আরভান গাড়িটা কলেজের কিছুটা দূরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করাল। আয়াতের একটা হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে বুকের সাথে চেপে ধরে বলল, “সুচনায় শাহরিয়ারের জানপাখি,সুইটি—যাই বলি না কেন, অন্তিমে তুমি শুধু আমার আয়াত, কেবল আমার মিসেস। ”

একরাশ ভালো লাগা আয়াতকে আষ্টেপৃষ্ঠে আচ্ছন্ন করে ফেলল। বুকের ভেতরটা কেন যেন এক অজানা সুখে তোলপাড় করছে। সে নির্বাক হয়ে আরভানের সেই গভীর আর নেশালো চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই মানুষটার চোখের মায়ায় সে আজীবন বন্দি হয়ে থাকতে পারে। হঠাৎ আরভানের আঙুলের তুড়ি বাজানোর শব্দে ওর ঘোর ভাঙল।

​”কী ম্যাডাম? আপনি কি নামতে চান না? তাহলে বাড়ি ফিরে চলি চলেন। আজকে না হয় একটু বেশি সময় নিয়ে আমাদের সেই অসমাপ্ত গল্পটা…” আরভান দুষ্টুমি করে চোখ টিপ দিল।

​”অ…অসভ্য একটা লোক আপনি! সারাক্ষণ মাথায় ওইসব চিন্তা ঘোরে?” বলে আয়াত লজ্জায় লাল হয়ে হাত ছাড়িয়ে গাড়ি থেকে এক দৌড় দিল।

​আরভান গাড়ির কাঁচ নামিয়ে আয়েশ করে চিৎকার করে বলল, “আস্তে যাও! তোমাকে কেউ ধাওয়া করছে না, অন্তত আমি তো আপাতত করছি না। উল্টে পড়ে গেলে কিন্তু সামলানোর জন্য আমাকেই লাগবে।”

আয়াত পেছন ফিরে একবার রাগী চোখে তাকিয়ে হনহন করে কলেজের ভেতরে ঢুকে গেল। আরভান

​দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরভান অফিসের দিকে গাড়ি ছোটাল। আজ তার একটা বিরাট ডিল আছে। মজার বিষয় হলো, ডিলটা তার বাবার ছদ্মবেশী কোম্পানির সাথেই হতে যাচ্ছে। তার বাবা ভেবেছে অন্য কোম্পানিকে ঢাল বানিয়ে সে আরভানকে ধোঁকা দিতে পারবে। আরভান মুচকি হাসল। লোকটার বিন্দুমাত্র আইডিয়া নেই যে তার এই গুণধর পুত্রের নেটওয়ার্ক আর বুদ্ধির সীমা আসলে কতটা শক্তিশালী

তারা যখন একটা ছোট পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আয়াতের নজর গেল এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যে। একটি ছোট ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে। বাচ্চাটার আধো-আধো বোল কানে আসতেই আয়াত থমকে দাঁড়াল।

একটি ছোট সুখী পরিবার তাদের ফুটফুটে সন্তানকে নিয়ে পার্কে এসেছে। বাচ্চাটা আধো আধো বোল ফুটিয়ে বলছে, “পাপা… পাপা দেখু… পাকি! আমি পাকি ধরবু!”

​বাচ্চার বাবার হাসিমাখা মুখ আর মায়ের সস্নেহ শাসন দেখে আয়াতের বুকটা হু হু করে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আজ যদি তার পরিবার বেঁচে থাকতো, তবে তার জীবনটাও হয়তো এমন আহ্লাদে কাটত। তাহলে আজকের মতো তার জীবনে এই আরভান চৌধুরী আসতো? নাকি সে অন্য কোনো সাধারণ স্রোতে ভেসে যেত?

​ভাবনার ইতি ঘটল হঠাৎ এক করুণ কান্নার শব্দে। তানিয়াও অবাক হয়ে তাকাল। পার্কের একদম পেছনের নির্জন এক কোণা থেকে ভেসে আসছে এক শিশুর বুকফাটা কান্নার আওয়াজ। কেউ যেন খুব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আয়াত কোনো কথা না বলে সেদিকে দৌড় দিল। ঝোপের আড়ালে এক কোণায় চোখ যেতেই আয়াতের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। সে দেখল…

চলবে..

#পর্ব_৩২
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

পার্কের একদম পেছনের নির্জন এক কোণা থেকে ভেসে আসছে এক শিশুর বুকফাটা কান্নার আওয়াজ। কেউ যেন খুব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। আয়াত কোনো কথা না বলে সেদিকে দৌড় দিল। ঝোপের আড়ালে এক কোণায় চোখ যেতেই আয়াতের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। সে দেখল—ঘাসের ওপর কুঁকড়ে বসে আছে ছোট একটা বাচ্চা। বয়স বড়জোর পাঁচ কি সাড়ে পাঁচ বছর হবে; গায়ে ময়লা, পুরাতন ছেঁড়া জামা পরা। সে তার ছোট ছোট হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

​আয়াত ধীরপায়ে বাচ্চাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তানিয়াও ওর পিছু পিছু এল। আয়াতের ছায়া বাচ্চাটার ওপর পড়তেই সে ভয়ার্ত চোখে মুখ তুলে তাকাল। ফর্সা গোলগাল মুখটা কান্নায় লাল হয়ে ফুলে গেছে, বড় বড় টানা চোখে অশ্রু টলমল করছে।

​তানিয়া নরম স্বরে ঝুঁকে পড়ে বলল, “কী হয়েছে বাবু? এখানে একা বসে কাঁদছ কেন? তোমার নাম কী?”

​বাচ্চাটা আধো আধো বোল ফুটিয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠল। চোখ বুজে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ছোট হাতটা দেখিয়ে বলল, “লি.. লিয়াম। আমাল… আমাল হাত ব্যাতা! খুব ব্যাতা!”

​আয়াত এক মুহূর্ত দেরি না করে বাচ্চাটার পাশে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। ওর হাতটা আলতো করে ধরতেই শিউরে উঠল আয়াত। লিয়ামের নরম হাতে রক্তের ছোপ, অনেকটা জায়গা জুড়ে গভীর কাটার দাগ। বাচ্চাটা যেন যন্ত্রণায় নীল হয়ে এক হাত দিয়ে অন্য হাত চেপে ধরে আছে। আয়াত আঁতকে উঠে বলল, “লিয়াম! এই তোমার হাতে এটা কীভাবে হলো? পড়ে গিয়েছিলে? তোমার মা-বাবা কোথায়? কেউ নেই সাথে?”

​লিয়াম হিক্কা তুলে ভেজা গলায় বলল, “নেই..।”

​আয়াতের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে অবাক হয়ে শুধালো, “মা-বাবা নেই মানে?”

লিয়াম ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আমাল পাপা… মলে গেচে। মাম্মা নতুন পাপা’কে বিয়ে কলছে। সেই নতুন পাপা আমাকে মাম্মা’ল সাতে থাকতে দেয় না। আমাল মাম্মা আমাকে মামাদেল সাতে লেখে গেচে।”

বাচ্চাটার কথা শুনে আয়াতের বুকের ভেতরটা এক বিশাল দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে এল। পৃথিবীটা বড্ড অদ্ভুত, বড্ড নিষ্ঠুর। সে এই একরত্তি বাচ্চার জন্মদাত্রী মাকে দোষ দেবে নাকি সেই নতুন বাবাকে? নারী জীবনটাই বোধহয় এমন—কখনো কখনো সমাজ বা পরিস্থিতির চাপে না চাইতেও নিজের কলিজার টুকরোকে অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

​আয়াত আবারও মায়াবী স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এখানে একা কীভাবে আসলে বাবু?”

​লিয়াম চোখ মুছে ধরা গলায় বলল, “মামাদেল ওখান থেকে পালিয়ে এসিচি। ওরা সবাই আমাকে মলে। আমি আবাল পাপা’র কাছে যাবু!”

আয়াতের চোখ ভিজে এল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাচ্চাটাকে নিয়ে দ্রুত কাছের একটা ক্লিনিকে গেল ওর ড্রেসিং করানোর জন্য। তানিয়াও সাথে ছিল। ড্রেসিং ইউনিটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় তানিয়া হঠাৎ আয়াতের কনুইতে ধাক্কা দিয়ে ইশারা করল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আয়াত, ওই মেয়েটাকে দেখ তো! একেই আমি সেদিন আরভানের সাথে রেস্টুরেন্টে দেখেছিলাম। দুজনে ফোনে কিছু একটা নিয়ে খুব গভীর আলোচনায় ছিল।”

​আয়াত তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে তাকালো। মেয়েটি পেশায় একজন ডাক্তার; পরনে ধবধবে সাদা অ্যাপ্রন, গলায় স্টেথোস্কোপ। অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে সে ফাইল হাতে ওদিকের ওটি-র দিকে চলে যাচ্ছে। আয়াত কিছু একটা জিজ্ঞেস করার জন্য এগোতে চাইল, কিন্তু একজন নার্স তাকে বাধা দিয়ে বলল, “সরি ম্যাম, দিস এরিয়া ইজ রেস্ট্রিক্টেড। নো ওয়ান অ্যালাউড উইদাউট পারমিশন।”

​আয়াত নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “উনি কে?”

​নার্সটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “উনি ডক্টর দিবা। কার্ডিয়াক সার্জন হিসেবে নতুন জয়েন করেছেন।”

নার্সটি চলে যাওয়ার পর আয়াত স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ‘দিবা’—নামটা মনে গেঁথে গেল ওর। এই মেয়ের সাথে আরভানের কী সম্পর্ক? আরভান কি তবে সত্যিই তাকে আড়াল করে অন্য কারো সাথে কোনো গোপন সূত্রে বাধা? না, আরভান এমনটা করতে পারে না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, বিদেশের কালচারে বড় হওয়া আরভানের কাছে তো এসব বন্ধুত্ব বা মেলামেশা খুবই সাধারণ বিষয়। একরাশ অস্বস্তি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে লিয়ামের কাছে ফিরে গেল।

​লিয়ামের ঠিকানা বা পরিচয় জানতে চাইলেও সে কিছুই বলতে পারল না। কেবল এক কথাই বারবার বলছে, “আমি যাব না! গেলে ওরা আমাকে মলে দিবে!”

আয়াতের ভীষণ মায়া হলো। সেসে নিজে অনাথ হয়ে বড় হয়েছে। যদিও আরভানের বাড়িতে দাদাজানের অঢেল ভালোবাসা পেয়েছে, তবুও মেজো চাচির তিতকুটে কথা তাকে অনেক সইতে হয়েছে। সে জানে আশ্রয়ের অভাব আর অবহেলার যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ। আয়াত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, সে লিয়ামকে নিজের কাছে রাখবে। আরভানের সাথে কথা বলে একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করা যাবে।

তানিয়াকে বিদায় দিয়ে সে লিয়ামকে নিয়ে বাড়িতে এল। লিয়ামের সাথে গল্প করতে করতে আয়াত যেন নিজের মাঝেই এক অন্য আয়াতকে খুঁজে পেল। সারা দুপুর তারা দুজনে মিলে মেতে রইল। সারা দুপুর তারা দুজনে মিলে মেতে রইল। রান্না করার সময় লিয়ামের ছোট ছোট হাতগুলো আয়াতকে রান্নার কাজে সাহায্য করার ভান করছিল। যদিও সে সব কিছু ওলটপালট করে দিচ্ছিল, কিন্তু আয়াত আজ বিরক্ত হলো না; বরং প্রাণ খুলে হাসল। আজ কেন যেন আয়াতের নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ মা মনে হচ্ছিল।

লিয়ামকে খাইয়ে দাইয়ে আয়াত নিজের কোলে নিয়ে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ালো।

লিয়ামের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে, আয়াত খেয়াল করেনি। আরভান কাজ সেরে বাড়ি ফিরে নিজের বেডরুমে আয়াতকে না দেখে অবাক হলো। সে সোজা পাশের গেস্ট রুমে এসে হাজির হলো এবং দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—

“হ্যালো মিসেস আরভান!

আপনি এখানে কী করছেন?”

আয়াত চমকে উঠে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারা করল চুপ থাকতে। আরভান প্রথমে লক্ষ্য করেনি, কিন্তু আয়াতের কোলে ছোট বাচ্চাটাকে দেখে ওর দুই ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। আরভান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে চাপা রাগী স্বরে বলল, “এটা কে? আর এই বাচ্চা আমাদের বাড়িতে কেন?”

আয়াত নিচু স্বরে উত্তর দিল, “লিয়াম।”

​”আমি ওর নাম জানতে চাইনি আয়াত। আমি ওর পরিচয় জানতে চেয়েছি। কোথা থেকে এল ও?”

“জানি না ও কে। পার্কে একা বসে কাঁদছিল, হাত কেটে রক্ত পড়ছিল—তাই নিয়ে এসেছি।”

​”হোয়াট! রাস্তায় কেউ কান্না করছিল বলে তুমি তাকে সটান তুলে বাড়িতে নিয়ে এলে? আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড, আয়াত? এটা কোনো চ্যারিটি হোম বা এতিমখানা নয় যে যাকে খুশি নিয়ে আসবে!”

​আয়াত মিনতি করে করুণ চোখে তাকালো। “প্লিজ চিৎকার করবেন না আরভান, ওর ঘুম ভেঙে যাবে। ও একটা ছোট নিষ্পাপ বাচ্চা! ওর মা ওকে নিতে চায় না, মামারা ওকে অমানুষের মতো মারে। এই দেখুন ওর হাতের ব্যান্ডেজটা, কত কষ্ট পেয়েছে ও!”

আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপালে হাত দিল। সে জানে আয়াত বড্ড বেশি আবেগী আর জেদি। “আয়াত, ও একটা বাচ্চা আর ও যা বলল তুমি সেটাই ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করে নিলে? ওর ফ্যামিলি হয়তো এখন হন্যে হয়ে ওকে খুঁজছে, পুলিশে রিপোর্ট করেছে!”

​আয়াত কথা না বলে মুখ ফুলিয়ে জেদ ধরে বসে রইল। আরভান আজ আর কথা বাড়াল না। সারাদিন অফিসের সেই জটিল ডিল আর বাবার সাথে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই সামলে সে প্রচণ্ড ক্লান্ত। তক্কাতক্কি করার মতো বিন্দুমাত্র মানসিক শক্তিটুকুও তার অবশিষ্ট নেই।

​আরভান শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “রাতের খাবার খেয়েছ?”

​”হুম।”

​”আচ্ছা।” বলেই আরভান দরজার দিকে হাঁটা দিল।

​আয়াত অবাক হয়ে পেছন থেকে ডাকল, “আপনি খাবেন না? ”

​”নাহ, খিদে নেই আমার।”

বলেই আরভান গটগট করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তার চোয়ালের শক্ত ভাঁজ আর নির্লিপ্ত ভঙ্গি বলে দিচ্ছিল, লিয়ামের এই আকস্মিক উপস্থিতি সে মোটেও সহজভাবে নিতে পারছে না। আয়াত দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত চোখে ঘুমন্ত লিয়ামের দিকে তাকাল। বাচ্চাটার নিষ্পাপ মুখখানা দেখে ওর মায়া আরও বেড়ে গেল। লিয়ামকে ধীরে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, গায়ে পাতলা কমফোর্টার টেনে দিয়ে সে আরভানের রুমের দিকে পা বাড়ালো।

​​আরভান তখন সবেমাত্র ড্রাস চেঞ্জ করে বাথরুম থেকে বের হয়েছে। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে সে জানলার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। আয়াত ঘরে ঢুকে ওর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দ্বিধা কাটিয়ে বলে উঠল, “আরভান, আমি লিয়ামকে অ্যাডপ্ট নিতে চাই। প্লিজ, না বলবেন না।”

​আরভানের বিরক্তিমাখা মুখটা আবারও কুঁচকে গেল। সে থেমে গিয়ে আয়াতের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল, “আয়াত, তোমাকে বাচ্চা দেওয়ার মতো পুরুষালি ক্ষমতা তোমার স্বামীর যথেষ্ট আছে। তার জন্য রাস্তা থেকে কাউকে তুলে আনার প্রয়োজন আমি দেখি না। তাছাড়া, বাচ্চা আমার মোটেও পছন্দ নয়। আমি চাই না আমার বাবা-মায়ের মতো কোনো অসুখী বাচ্চার জন্ম দিতে, যে পরবর্তীতে কেবল যন্ত্রণাই পাবে।”

আরভানের এই রূঢ় কথার পেছনের ক্ষতটা আয়াত বুঝতে পারল না। সে শুধু দেখল আরভান বাচ্চা নেওয়ার প্রসঙ্গ আসতেই কতটা কঠোর হয়ে উঠেছে।

​আয়াতের জেদ যেন আরও বেড়ে গেল। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “একজন অনাথকে দত্তক নিয়ে তাকে সুন্দর জীবন দিতে চাওয়াটা কি খুব অপরাধ?। এখানে সক্ষমতার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে? ও এই মানসিকতা কেন আপনার?”

​আরভান ক্লান্তিতে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। দুই হাতের তালুতে মাথা চেপে ধরে মেঝের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল, “আয়াত, আমার প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছে। এই মুহূর্তে আমার কিছু সময় একা থাকা প্রয়োজন। তোমার এই তক্কাতক্কি শেষ হলে তুমি অন্য ঘরে যেতে পারো।”

​আরভান নিচু হয়ে বসে ছিল, আয়াতের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভাবল আয়াত হয়তো রাগে ঘর থেকে চলে গেছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া নরম হাত ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। আয়াত আরভানের কাঁধে মুখ গুঁজে ওর কপালে আলতো করে মালিশ করে দিতে লাগল। ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সরি…”

​আরভান চোখ বুজে শান্ত হয়ে রইল। বিড়বিড় করে বলল, “কিসের জন্য?”

​”আপনার সাথে ওভাবে তর্ক করার জন্য। প্রমিজ করছি, আর কখনো এমন করব না।” আয়াত আরভানের কানে ঠোট ছুয়িয়প বলল “বড্ড ভালোবাসি আপনাকে আরভান।”

মুহূর্তের মধ্যে আরভানের সব রাগ জল হয়ে গেল

​আরভান এক ঝটকায় আয়াতকে নিজের সামনে টেনে এনে কোলে বসিয়ে দিল। আয়াতের গাল জড়িয়ে ধরে ওর ওষ্ঠদ্বয় নিজের দখলে নিল।এক নিবিড় তৃষ্ণার্ত চুম্বনে সে বুঝিয়ে দিল আয়াতের প্রতি তার টান কতটা গভীর। আয়াত এই নিবিড় স্পর্শে সাড়া দিলেও মনের কোণে এক সূক্ষ্ম সংশয় যেন থেকেই যায়। আরভান আজ পর্যন্ত মুখে তাকে কখনো ‘ভালোবাসি’ শব্দটা বলেনি। যদিও আয়াত জানে ভালোবাসা মুখে বলার চেয়েও আচার-ব্যবহার আর চোখের ভাষায় বেশি প্রকাশ পায়, তবুও মাঝেমধ্যে অবুঝ মনটা তো একবার সেই অমোঘ স্বীকারোক্তি শুনতে চায়। আরভান যা আজ অবধি কখনোই বলেনি।

​আরভান ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে গভীর দৃষ্টিতে আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি অনেক ভালো একজন স্ত্রী আয়াত।”

​আয়াত ম্লান হেসে আরভানের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল, “আর আপনি তার চেয়েও অনেক বেশি ভালো একজন স্বামী।”

​আরভান হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আয়াত, হঠাৎ একদিন যদি আমাকে কোথাও খুঁজে না পাও… তবে কী করবে?”

​আয়াত চমকে উঠল। ওভাবে কেন বলছে লোকটা? আয়াতের বুকটা কেঁপে উঠল। সে আরভানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “আপনাকে কোথাও যেতে দেব না আরভান! এই বুকের পাঁজরে সারাজীবনের মতো বন্দি করে রেখে দেব।”

​”যদি তারপরও আমাকে আগলে না রাখতে পারো? তখন?”

​আয়াত ছলছল চোখে আর অভিমানে ফেটে পড়ে বলল, “তবে তাকেই আমি নিজ হাতে খুন করে ফেলব যে আপনাকে আমার থেকে দূরে সরাতে চাইবে! এমনকি সেই ব্যক্তি আপনি নিজে হলেও আমি ছাড়ব না আরভান। আপনাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই।”

​আরভান আয়াতকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে ম্লান হাসল। “পাগলী একটা! কাঁদছো কেন? আমি তো শুধু মজা করছিলাম। তবে তুমি আজ ধরা পড়ে গেলে—আমার ভালোবাসায় তুমি আজ পুরোপুরি ম্যানিপুলেট হয়ে গেছো।”

​আয়াত ধরা গলায় বলল, “হয়েছি। আপনার জন্য প্রয়োজনে আমি আরও অনেক কিছু হবো… যা হওয়ার কল্পনাও কোনোদিন করিনি।”

​আরভান আয়াতের গালে হাত বুলিয়ে ধীরস্বরে বলল, “কাউকে এতটা ভালোবাসতে নেই মিসেস। যদি তার অনুপস্থিতি কোনোদিন আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়?”

​আরভান হাসল—সেই পরিচিত মায়াবী হাসি। আয়াতের হাত আগলে নিয়ে সে বাচ্চার মতো আবদার করে বলল, “আই নিড ইউ আয়াত… ক্যান আই?”

​আয়াত একটু ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু… ওপাশে বাচ্চাটাকে একা রেখে?”

​”সমস্যা নেই, ও তো বাড়িতেই থাকবে। কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। বাট আমার এখন তোমাকে প্রচণ্ডভাবে লাগবে আয়াত, না হলে আমি ঠিক থাকতে পারবো না।” আরভানের গলার স্বরে এক অদম্য তৃষ্ণা।

​আয়াত আর না করতে পারল না। আরভানের গালে নিজের গাল ঘষে অনুযোগের সুরে বলল, “এভাবে বাচ্চাদের মতো আবদার করলে আমি ফিরব কীভাবে বলুন তো? আপনি দিন দিন আস্ত একটা আদুরে বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন।”আরভান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

“হুম, আরভান চৌধুরী তো তার আয়াতেরই আদুরে বাচ্চা!” বলেই আরভান আয়াতকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। বাইরের অন্ধকার রাতের স্তব্ধতা ছাপিয়ে দুটি হৃদয়ের স্পন্দন এক হয়ে মিশে গেল।

চলবে….