#পর্ব_৪১
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
বিছানার এক কোণে কুঁকড়ে কাঁচুমাচু হয়ে বসে আছে আয়াত। তার শরীরটা এখনো দুর্বল, কিন্তু মনের ভেতর আছড়ে পড়ছে হাজারো চিন্তার ঢেউ। ঘরের এক কোণে আরভান দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতো। ওর দৃষ্টি আয়াতের ওপর নিবদ্ধ, কিন্তু সেই চোখে আজ এক বিন্দু মায়া নেই। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে লাল হয়ে আছে, যা দেখে আয়াতের বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আরভানের এই দৃষ্টির অর্থ আয়াত জানে—এটা প্রচণ্ড ক্রোধ আর হাহাকারের এক মিশ্রণ।
কিন্তু সেই রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে আয়াতে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসছে। এতক্ষণ যে জায়গাটা তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ছিল, আজ মনে হচ্ছে সেই আরভানিই তার জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম।
ডাক্তার হাসিমুখে খুশির খবরটা দিয়ে প্রেসক্রিপশন লেখা শেষ করে একবার ফারহানের দিকে বিরক্তিভরা চোখে তাকালেন। মাঝরাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে তাকে বাড়ি থেকে একপ্রকার তুলে আনা হয়েছে, তাই তার মেজাজটা খুব একটা সুবিধের নয়। আফজাল চৌধুরী পরম মমতায় আয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাক্তারের সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন বাকি কথা বলতে। তাদের পিছু পিছু ছোট চাচা আমজাদ চৌধুরীও বেরিয়ে গেলেন।
চাচি সুলতানা বেগমের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। তিনি আয়াতের কপালে চুমু খেয়ে বললেন, “এত বড় একটা খুশির সংবাদ দিলি আয়াত! কেন যে আগে কিছু বললি না? এখন থেকে তোকে একদম নড়াচড়া করতে দেব না, সব দায়িত্ব আমাদের।”
নিঝুম পাশে বসে আয়াতের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর মুখেও চওড়া হাসি। “আপু! আমি যে কত কত খুশি হয়েছি বলে বোঝাতে পারব না। আমার ভাতিজা বা ভাতিজি আসবে ভাবতেই কেমন লাগছে!”
আয়াত সবার কথায় মৃদু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু আরভানের দিকে তাকাতেই সেই হাসি উবে গেল। তার মনের গভীরে এক অজানা ভয় শিকড় গেড়েছে। আরভান সবসময় বলে এসেছে সে বাচ্চা পছন্দ করে না। সে চায়নি তার সন্তানদের জীবনও তার মতো কাটুক—যেখানে কোনো অসুস্থতা আর অন্ধকার পারিবারিক জটিলতায় ঘেরা। আরভানের সেই জেদি রূপটার কথা মনে পড়তেই আয়াতের বুকটা কেঁপে উঠল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে নাজমা বেগম রাগে ফুঁসছেন। নিজের মেয়ে শাহজাদির দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, এই মেয়েটা একদম অকর্মা হয়েছে। একদিকে ছেলে শাহরিয়ারের কোনো খবর নেই, আর এই আয়াত ঠিকই তার জায়গা পাকা করে নিচ্ছে।
আরভানের মতো বিত্তবান স্বামী, তার ওপর এখন আবার পেটে সন্তান! এখন তো নিশ্চিত আফজাল চৌধুরী তার সব সম্পত্তি এই অজাত শত্রুর নামেই লিখে দেবেন। নাজমা বেগম কোনোভাবেই এটা হতে দিতে পারেন না। তাকে দ্রুত কিছু একটা করতে হবে। হঠাৎ তার নজর পড়ল ফারহানের দিকে, যে এই খুশির খবর শুনে চওড়া হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাজমা বেগমের মাথায় মুহূর্তেই একটা কুবুদ্ধি খেলে গেল। ঠোঁটের কোনে বাকা হাসি ভেসে উঠলো।তিনি নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন নিজের চাল সাজাতে।
ঘর থেকে সবাই ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলে আরভান এগিয়ে এসে দরজাটা শব্দ করে বন্ধ করে দিল। তারপর একটা চেয়ার টেনে ধপ করে আয়াতের সামনে বসে পড়ল। আয়াত এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখলেও আর পারল না; ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
”কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?” আরভানের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল।
আয়াত ফুঁপিয়ে বলল, “আপনি রেগে আছেন আরভান। আমি আসলে… আমি জানতাম না…”
”তুমি এসব কিছুই ইচ্ছা করে করোনি, তাই তো?” আরভানের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল।
“তোমাকে বারবার বলেছিলাম আমি বাচ্চা চাই না। আমার জীবনটা যে সুতোর ওপর ঝুলে আছে, সেখানে আমি অন্য কোনো প্রাণকে জড়াতে চাই না। তারপরও… কীভাবে এটা হলো বলো আমাকে?”
আরভানের প্রতিটি কথা তীরের মতো আয়াতের বুকে বিঁধল। তার মনে এক নিদারুণ ভয় জেঁকে বসল। আরভান কি তাকে এখন বলবে যে এই সন্তানকে সে চায় না? সে কি বলবে এই প্রাণটিকে নষ্ট করে দিতে? না, আরভান নিশ্চয়ই এতটা নিচে নামবে না। সে মানুষটা রুক্ষ হতে পারে, কিন্তু সে খুনি নয়। কিন্তু মায়ের মন যে আজ অবুঝ হয়ে উঠেছে; তার মনে হচ্ছে আরভানকে জাপটে ধরে চিৎকার করে বলে, “এই সন্তান আমার একার নয়, এটা আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন।”কিন্তু আরভানের চোখের ওই কাঠিন্য দেখে তার জিভ অবশ হয়ে গেল।
আয়াত ক্ষীণ স্বরে বলল, “আরভান, ও..”
”আমার এখন ঘুমাতে হবে। তোমার কোনো কথা শোনার রুচি আমার নেই।” আরভান সপাটে উত্তর দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।
আয়াত বিছানায় স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। আরভান আজ তাকে জড়িয়ে ধরে শুলো না। প্রতিদিনের মতো আরভানের সেই উষ্ণ আলিঙ্গন আজ নেই। আয়াতের বুকের ভেতরটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। সে জানে এই সন্তানটি তার বড় প্রয়োজন ছিল। আরভান এখন একে অস্বীকার করলেও, একদিন এই ছোট্ট প্রাণের মায়ায় সে ঠিকই বাঁধা পড়বে। তখন সে মরতে নয়, বরং তাদের দুজনের জন্য বাঁচতে চাইবে।
আয়াত চোখের জল মুছে নিয়ে আরভানের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একরাশ অভিমান আর কষ্ট নিয়ে সে-ও অন্য পাশে ফিরে শুয়ে পড়ল। ঘরের নীরবতা যেন আজ তাদের দুজনের মাঝে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত, তাই তারাতারিই ঘুমের অতলে হারিয়ে গেলো।
*******
ঘরের মাঝে এক পিনপতন উত্তেজনা। তবে সেই উত্তেজনার কোনো শব্দ নেই, আছে শুধু এক জোড়া অস্থির পায়ের পায়চারি। আনোয়ার চৌধুরী ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করছেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
পাশে নাজমা বেগম পানের বাটা হাতে নিয়ে আয়েশ করে পান বানাচ্ছেন, কিন্তু তার চোখেমুখে পৈশাচিক এক তৃপ্তি। এক গাল পান মুখে পুরে তিনি চিবোতে শুরু করলেন, রাগে আর ক্ষোভে তার মুখ থমথমে হয়ে আছে।
আনোয়ার চৌধুরী তীক্ষ্ণ স্বরে ফেটে পড়লেন, “সব তোমার ওই গুণধর ছেলের জন্য হয়েছে! বলেছিলাম কয়েকটা মাস অন্যসব মেয়েদের থেকে দূরে থেকে, আয়াতের সামনে ভালো ছেলে সেজে ওকে পটিয়ে রাখতে। কিন্তু সে তা করল না। উল্টো আয়াতের সামনে গিয়েই জবরদস্তি শুরু করল! ওইসব না করলে এতদিনে বিয়েটা হয়ে যেত তাহলে আয়াতের পৈতৃক সম্পত্তি আমাদের হাতের মুঠোয় থাকতো। সাথে এই চৌধুরী বাড়ির ভাগ তো ছিলই। এখন সব ছাই হলো, আর ওদিকে তোমার গুণধর ছেলের দেখাই নেই!”
নাজমা বেগম পানের রস গিলে বিরক্ত মুখে বললেন, “আমার ছেলে তো ওই মেয়ের জন্যই অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিল। তার অপরাধটা কোথায়?আমার ছেলেটা এখন কোথায় আছে কে জানে। যারা জন্য বিদেশ পাড়ি দিলো সে এই দেশে এসে বসে আছে।”
“অপরাধ নয় তো কী?যখন আয়াতকে বশ করার কথা ছিল, তখন তো তোমার ছেলে কিছুই করতে পারেনি। শুধু গায়ের জোর খাটিয়ে সব পণ্ড করেছে!”
নাজমা বেগম এবার পান রেখে সোজা হয়ে বসলেন। “এখন তাহলে কী করব? আব্বা যদি সত্যিই সব সম্পত্তি লিখে দেয়? এমনিতেই তার আদরের নাত বউ আয়াতের ওপর বড্ড মায়া, তার ওপর আরভানও তার প্রিয়। এখন এই নতুন অতিথির আগমনে চৌধুরী বাড়ির কানাকড়িও কি আমাদের শাহজাদি আর শাহরিয়ারের কপালে জুটবে বলে মনে হয়? ছোট ভাইজান তো এসব নিয়ে মাথা ঘামাবে না, ও তো নিজের জগতেই ব্যস্ত।”
”সেটাই তো ভাবছি! কী করব এখন কিছুই মাথায় আসছে না।” আনোয়ার চৌধুরী কপালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন।
নাজমা বেগমের চোখে হঠাৎ এক কুটিল আভা খেলে গেল। তিনি স্বামীর কাছে এগিয়ে গিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তবে এটা করতে গেলে আমাদের অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে হতে পারে।”
স্ত্রীর রহস্যময় কথা শুনে আনোয়ার চৌধুরীর কপালে যেন বাজ পড়ল। তিনি অধৈর্য হয়ে বললেন, “ভণিতা করো না নাজমা! যা বলার সরাসরি বলো।”
নাজমা বেগম স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন। কথাগুলো শুনে আনোয়ার চৌধুরীর চোখ-মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এক পৈশাচিক তৃপ্তিতে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
তিনি নিচু স্বরে বললেন, “বুদ্ধিটা মন্দ নয় নাজমা। যদি কাজটা নিখুঁতভাবে করা যায়, তবে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে।
******
“আরভান, ছাড়ুন আমাকে! আমি যাব না… কিছুতেই না!”
আরাভান যেন রক্তবীজ হয়ে উঠেছে। আয়াতের হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছে সে। তার চোখেমুখে কোনো দয়া নেই, আছে শুধু এক পৈশাচিক জেদ।
”তোমাকে অ্যাবরশন করাতেই হবে আয়াত! আমি কোনো পিছুটান রাখতে চাই না। না আমি অপারেশন করব, আর না আমার কোনো চিহ্ন তোমার নামে থাকবে। আমি চাই না আমার পর তুমি একা একা এই পৃথিবীতে পড়ে থাকো… এই নিঃসন্তান অবস্থায়।”
আরভানের কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শক্ত।
”আরভান, এমন করবেন না প্লিজ! আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। এই বাচ্চা আমাদের… আপনি আমার আর ওর জন্যই বাঁচতে চাইবেন! আমাদের সাথে…” আয়াত আর্তনাদ করে উঠল।
”এর জন্যই তো ওকে চাই না আয়াত! ওর মায়া আমাকে দুর্বল করে দেবে!”
“আমাকে ছাড়ুন, আমি যাবো না”।
”আয়াত! আয়াত কী হয়েছে? এভাবে ঘামছ কেন? আয়াত!”
আয়াত ধড়ফড় করে চোখ মেলল। সামনে আরভান অত্যন্ত অস্থির হয়ে আয়াতের গালে আলতো চাপ দিয়ে ওকে ডেকে চলেছে। আয়াতের সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। দুঃস্বপ্ন! এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
আয়াত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
আরভানকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল সে। “আমাকে ছোঁবেন না! আমি কোথাও যাব না! আপনি বড্ড স্বার্থপর আরভান… আপনি আমার বাচ্চাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে চান? আমাদের ভালোবাসার কোনো প্রয়োজন নেই আপনার কাছে? আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চান? তবে চলে যান!”
আরভান থমকে গেল। আয়াতের এমন উন্মাদের মতো আচরণে সে বিচলিত। “কী বলছ এসব তুমি? স্বপ্ন দেখেছ বুঝি? কী দেখেছ?”
আয়াত আরভানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তারপর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আরভানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নার তোড়ে ওর শরীরটা কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর কিছুটা শান্ত হলে আয়াত ধরা গলায় বলল,
”আরভান, প্লিজ আমাকে অ্যাবরশন করাতে বলবেন না। আপনি ছাড়া আমার কেউ নেই আরভান। আমিও মা হতে চাই… আপনার বাচ্চার মা হতে চাই। ওকে কেড়ে নেবেন না আমার থেকে!”
আরভান আয়াতের মুখটা নিজের হাতের আঁজলায় তুলে নিল। সে বেশ বুঝতে পারছে ঘুমের ঘোরে আয়াত কী দেখেছে। আরভানের চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এল। “তুমি এসব কী বলছ আয়াত? আমি কি কখনো তোমাকে এমন জঘন্য কথা বলতে পারি? আমি কি অতটা নিচে নামতে পারি?”
আয়াত ঝাপসা চোখে আরভানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি বলবেন… আমি জানি! আপনি আমায় ছেড়ে একা চলে যাওয়ার জন্য, আমাকে নিঃস্ব করার জন্য এমনটাই করবেন। যাতে আমি শান্তিতে থাকতে না পারি…”
আরভান আয়াতকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। এক গভীর মমতায় জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি তোমাকে কখনো একা ফেলে কোথাও যাব না আয়াত। আর তুমি ভাবলে কী করে যে আমি তোমাকে অ্যাবরশন করতে বলব? ও আমার অংশ… আমি আমার নিজের অংশকে কীভাবে শেষ করে দেব বলতে পারো? তখন এমন অপ্রত্যাশিত খবরটাতে ঠিক কেন অনুভুতি হওয়া উচিত আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি।তাই ওভাবে রিয়াক্ট করে ফেলেছিলাম।সরি আয়াত।”
আয়াত অবিশ্বাস্য চোখে আরভানের দিকে তাকাল। আরভানের চোখের কোণেও তখন চিকচিক করছে জল। সে নিচু হয়ে আয়াতের পেটে আলতো করে হাত রাখল। পরম আবেশে চোখ বুজে বলল,
“আমি আমার জীবনে যা পাইনি আয়াত, আমি ওকে তার সবটুকু দেব। তোমাদের দুজনকে সবসময় আগলে রাখবো। ওকে একটা সুন্দর, সুখী জীবন আর পরিবার দেব। বাবার ভালোবাসা দেব… আমি ওর জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা হবো আয়াত। আমি আমার বাবার মতো কখনো হব না।”
আয়াতের বুক থেকে এক বিশাল পাথরের ভার নেমে গেল। সে দুই হাতে আরভানের পুরো মুখটা আগলে ধরে অজস্র চুমু খেল।
“ভালোবাসি! অনেক ভালোবাসি আপনাকে আরভান। আমাদের কখনো একা ফেলে চলে যাওয়ার কথা ভাববেন না। আমাদের আপনার সাথেই রাখবেন সবসময়।”
আরভান আয়াতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কোথাও যাব না কখনো। তোমাদের সবসময় ভালোবাসার চাদরে আগলে রাখবো। কারো বিষাক্ত ছায়া তোমাদের ওপর পড়তে দেব না। প্রয়োজনে সব শত্রু নাশ করে তোমাদের জন্য এক নিরাপদ স্বর্গ গড়ে দেব।”
চলবে….
#পর্ব_৪২
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
—
ঘরের ভেতর পা দিতেই আরভানের হৃৎপিণ্ডটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে আয়াত। আরভানের দৃষ্টি পড়ল বিছানার এক পাশে পড়ে থাকা সেই সাদা খামটার দিকে- যেটি দাদাজান তাকে প্রথম দিন দিয়েছিলেন। মুহূর্তেই আরভানের বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। শিট! ওটা ওখানেই রয়ে গেছে, সরানো হয়নি। আয়াতের চোখের দৃষ্টির গভীরতা দেখে আরভানের মনে শত ভয়ের আনাগোনা শুরু হলো। আয়াত কি তবে খামটা খুলে সবটা পড়ে ফেলেছে? কি জেনে গেছে সেই ধামাচাপা দেওয়া সত্যগুলো?
আরভান নিজেকে কিছুটা সংযত করে আয়াতের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ধীর স্বরে ডাকল,
“আয়াত… আসলে…”
আয়াত তপ্ত দৃষ্টিতে আরভানের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনি আমার সাথে লুকোচুরি খেলছেন কেন আরভান? আমার সাথে খেলুন, তাতে দুঃখ নেই; কিন্তু অন্তত নিজের অনাগত সন্তানের সাথে এই নিষ্ঠুর খেলাটা বন্ধ করুন!”
আরভান খানিকটা অবাক হলো। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। “আমি কখন লুকোচুরি খেললাম?”
আয়াত এবার নিজের মুঠোয় রাখা আরভানের ফোনটা সামনে তুলে ধরল। স্ক্রিনে জলজল করছে হাসপাতালের সেই মেসেজ—অপারেশনের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। আরভান এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল; যাক, তার মানে আয়াত ওই খামটা পড়েনি, সে শুধু অপারেশনের খবরটাই জেনেছে।
আরভান কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “ওটা আমি এখনো দেখিনি আয়াত।”
”হ্যাঁ, সেটা তো দেখবেনই না! কারন আপনি আমাকে আর এই সন্তানকে একা ফেলে চলে যেতে চান তাই না? আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি আরভান। আপনি সত্যি করে বলুন তো, আপনি ঠিক কী চান?
আয়াতের কণ্ঠে অভিমান ঝরে পড়ল।আরভান আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ হাসল। ওর দু-হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম স্বরে বলল,
“অবশ্যই আপনি যা চান, আমিও সেটাই চাই মিসেস। আপনার সুখের চেয়ে বড় কোনো চাওয়া আমার নেই।”
”মিথ্যা কথা! আপনার চোখেমুখে আমি ভয় দেখতে পাচ্ছি আরভান। আপনি অপারেশন নিয়ে লুকোচুরি করছেন। ” আয়াত মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল।
আরভান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে আয়াতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর আলতো করে কান পাতল আয়াতের পেটের ওপর। পরম মমতায় ফিসফিস করে বলল, “বেবি, শুনছেন? আপনার মাম্মা আমার ওপর খুব রাগ করেছে। ওনাকে বলুন রাগ ঝেড়ে ফেলতে। আমি ফারহানকে বলে দিয়েছি টিকিট কাটতে, তিনদিন পর আমরা আবার ফিরে যাব আমাদের ঠিকানায়। সেখানে গিয়েই সব ঠিক হবে।”
আয়াতের চোখ-মুখ মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও আরভানের এই পাগলামি দেখে একরাশ লজ্জা আর বিরক্তি দানা বাঁধল। সে আরভানের মাথার চুলে হাত দিয়ে কিছুটা সরিয়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ও এখন শুনতে পায় না আরভান! এখনো তো ওর শরীরের গঠনই ঠিকমতো শুরু হয়নি, আর আপনি ওর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছেন?”
আয়াতের বিরক্তিটুকু সে বেশ বুঝতে পারছে, কিন্তু এই লোকের পাগলামি যেন দিন দিন বাড়ছে। যেদিন থেকে শুনেছে আয়াত মা হতে চলেছে, সেদিন থেকে আরভান এক অন্য মানুষ। নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দেওয়া, হাত ধরে এমনভাবে হাঁটা যেন আয়াত আট মাসের অন্তসত্ত্বা নারী! তার ওপর মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে দেখা যায় আরভান ওর পেটের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে।
আরভান উঠে দাঁড়িয়ে জেদি গলায় বলল, “আমি জানি ও এখন কেবল একটা প্রাণের স্পন্দন, কিন্তু ও তো আছে! অস্তিত্ব তো মিথ্যে নয়, তাই না? তাহলে ওর সাথে কথা বলায় দোষ কোথায়?”
বলেই সে পেটের ওপর গভীর এক চুমু দিয়ে সোজা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আয়াত নিজের পেটে হাত দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আরভানের এই অকালপক্ক ভালোবাসা আর অপারেশনের ঝুঁকি ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এই লোকটার যদি সত্যিই কিছু হয়ে যায়, তবে ওর আর এই অনাগত সন্তানের কী হবে? আয়াত তো শুধু একটা সুন্দর সুখের সংসার চেয়েছিল, ভালোবাসার সংসার। সব পেয়েও যদি সব হারিয়ে যায়? মনের মধ্যে শত ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে আয়াত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে শুধু প্রার্থনা করল।
——-
রাত আর দিনের হিসেব মিলিয়ে সময় তার আপন গতিতে বয়ে চলে। গোধূলির রাঙা আলো মুছে গিয়ে আঁধার নামে, আবার ভোরের স্নিগ্ধতায় প্রকৃতি জেগে ওঠে। প্রকৃতির এই চিরন্তন নিয়মে দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গেল। বাংলাদেশের মাটির মায়া কাটিয়ে এবার ফেরার লগ্ন উপস্থিত। নিজের ছায়া কিংবা কায়া- কোনো কিছুর প্রতিই আরভানের তেমন মোহ নেই, কিন্তু আয়াতের মনটা বড্ড ভারী হয়ে আসছে। এক দিন পরেই তারা পাড়ি জমাবে সুদূর প্রবাসে। সব যখন গোছগাছ করে ঠিকঠাক চলছিল, ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
মাঝরাতে নাজমা বেগমের আকাশফাঁড়া চিৎকারে চৌধুরী বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে গেল। আতঙ্কিত হয়ে সবাই ছুটে গেল শাহজাদির ঘরের সামনে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল এক বীভৎস দৃশ্য। নাজমা বেগম নিজের মেয়ে শাহজাদিকে জড়িয়ে ধরে বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন। আর তার থেকে কিছুটা দূরে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। ভয়ে আর লজ্জায় তার চেহারা যেন রক্তশূন্য হয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
আরভান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ফারহানকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল- কী হয়েছে? ফারহান শুধু অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল। কী হচ্ছে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। শাহজাদির চোখের কোণেও বিস্ময় আর আতঙ্ক। সে নিজের মায়ের এমন রুদ্রমূর্তি দেখে পাথরের মতো জমে গেছে। বাড়ির পুরুষেরা ছুটে এসে যখন কারণ জানতে চাইলেন, তখন নাজমা বেগম হেঁচকি তুলতে তুলতে ফারহানের দিকে তর্জনী তুলে ধরলেন।
”এই অসভ্য ছেলে আমার মাইয়ার সর্বনাশ করছে গো! আমার ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।”
নাজমা বেগমের চিৎকারে বাড়ির ছাদ যেন ভেঙে পড়বে। “এই পোলায় মনে করছে এটা অস্ট্রেলিয়া! ও আমার মাইয়ার সব শেষ কইরা দিছে!”
ফারহানের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। শাহজাদি ছিটকে সরে এসে বলল, “আম্মা! কী বলছ এসব তুমি?”
”এই চুপ কর ছ্যামরি! তোর লজ্জা-শরম নেই? একটা পরপুরুষ তোর ঘরে ঢুইকা… ছি ছি! এমন মাইয়া আমি জন্ম দিছি? এসব জানলে সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে? আব্বা, এই কোন মেহমান আপনি বাড়িতে ঢুকাইলেন যে আমার মাইয়ার সর্বনাশ কইরা ছাড়ল!”
নাজমা বেগম বিলাপ করতে করতে মেঝেতে বসে পড়লেন।শাহজাদি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। এই কদিনে ফারহানের সাথে তার কয়েকবার দেখা হলেও বিশেষ কোনো কথা হয়নি। শাহজাদি সব সময় চোখ গরম করে চলে যেত, আর ফারহান মুখ বেঁকিয়ে পাশ কাটাত। কিন্তু আজ রাতে যা ঘটল তা অদ্ভুত।
ফারহান আসলে তেষ্টায় ছটফট করছিল। রান্নাঘরে পানি নিতে গিয়ে সে নাজমা বেগমের মুখোমুখি হয়। অত্যন্ত দয়ালু সেজে তিনি বললেন, “বাবা, ভেতরে পানি নেই। সামনের কলটা নষ্ট, কাল সকালে সারানো হবে। এই বাড়িতে আর যেখানে পানি আছে সেখান থেকে একটু কষ্ট করে নিয়ে নাও।”
ফারহান রাজি হলে নাজমা হাতের ইশারায় দোতলার একটি কক্ষ দেখিয়ে বলেছিলেন, “ওই ঘরে গিয়ে তোমার বোতল ভরে নাও। আমিই দিতাম, কিন্তু রাত বাড়লে আমার কোমরের ব্যথাটা বেড়ে যায়, সিঁড়ি বাইতে পারি না। ওই যে দুই ঘর পরেই যে ঘরটা দেখছ, ওইখানে জগ ভরা পানি পাবা। ”
মহিলার শারীরিক কষ্ট দেখে ফারহানের দয়া হয়েছিল। সেফারহান সরল মনে সেই ঘরটিতে প্রবেশ করল। ঘরের দরজা আগে থেকেই কিছুটা খোলা ছিল। টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে নিজের বোতলে পানি ভরে মাত্র এক চুমুক দিতেই ওপাশ থেকে নাজমা বেগম চিৎকার করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। বিছানায় ঘুমন্ত শাহজাদি ধড়ফড় করে উঠে বসল। ফারহান কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাজমা বেগম প্রচার শুরু করলেন যে ফারহান নাকি শাহজাদির শ্লীলতাহানি করতে এসেছে।
ফারহান এখন বুঝতে পারছে, সে কোনো বড় ফাঁদে পড়েছে। যে ঘরটা তাকে পানির ঘর হিসেবে দেখানো হয়েছিল, সেটাই আসলে শাহজাদির শোবার ঘর। সে আরভানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে সব ঘটনা খুলে বলল। কিন্তু আরভান কোনো বিচলিত ভাব দেখাল না। তার শান্ত শীতল চোখ দুটো শুধু নাজমা বেগমের সুনিপুণ নাটকের প্রতিটি দৃশ্য খুঁটিয়ে দেখছে। ওদিকে নাজমার স্বামী আনোয়ার চৌধুরীও লঙ্কাকাণ্ড শুরু করে দিয়েছেন। তিনি ফারহানকে মারার জন্য তেড়ে আসছিলেন, কিন্তু আমজাদ চৌধুরী কোনোভাবে বড় ভাইকে জাপটে ধরে রেখেছেন।
চৌধুরী বাড়ির শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তেই এক নোংরা ষড়যন্ত্রের বিষাক্ত বাতাসে ভারি হয়ে উঠল। আরভান জানে, এই নাটকের পরিচালক কে, কিন্তু সে এখন শুধু অপেক্ষা করছে- এই বিষের শেষটুকু কোথায় গিয়ে থামে তা দেখার জন্য।
এর মাঝে শাহজাদি রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলল, “আম্মা! আপনার এই নোংরা নাটক এবার বন্ধ করেন!”
নিজের মেয়ের মুখে এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাক্য শুনে আনোয়ার চৌধুরী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শাহজাদির গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিলেন। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন,
“নির্লজ্জ মেয়ে! রাতের বেলায় পরপুরুষকে ঘরে ঢুকিয়ে এখন আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস? কী আমার বংশের শিক্ষা-দীক্ষা সব তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিলি। সমাজে আমার মুখ চুনকালি দিয়েছিস। তোর মতো কলঙ্কিত মেয়েকে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া উচিত! লোক জানাজানি হলে সম্মান কোথায় থাকবে? দরজা কেন খোলা রেখেছিলি শুনি?”
শাহজাদি গালে হাত দিয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি কিচ্ছু করিনি আব্বাজান! ওই লোক কখন আমার ঘরে ঢুকেছে আমি জানি না। আম্মাই তো বলল রাতে সে আমার কাছে ঘুমাবে, তাই দরজা যেন না দিই। আমি তো আম্মার কথা শুনেই দরজা খোলা রেখেছিলাম!”
নাজমা বেগম ওপাশে বসে একের পর এক বিলাপ করেই যাচ্ছেন। এই সকল নাটকের মহড়া আরভান বেশ বুঝতে পারছে- এর আড়ালে কী ফন্দি আঁটা হয়েছে। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। এই দুনিয়ায় বোধহয় অধিকাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেষ আশ্রয় হতে পারে না; তারা স্বার্থের জন্য নিজ সন্তানকে বলি দিতেও প্রস্তুত। আর এটা যেন চৌধুরী বংশের এক অমোঘ সত্য।
আয়াত আর পারভীন সুলতানা শাহজাদিকে জড়িয়ে ধরে আছেন। আর শাহজাদি পাথরের মতো জমে গিয়ে শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। দাদাজান আফজাল চৌধুরী সকলকে শান্ত হতে বললেন। এমনিতে এই বয়স, তার ওপর মাঝরাতে এমন হুলস্থুল কাণ্ডে তার অসুস্থ শরীরটা যেন আরও ভেঙে পড়ছে। তিনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
“ফারহান, আমার কাছে আসো।”
নাজমা বেগম এবার একটু ভয় পেয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠলেন,
“আব্বা, আমি তো এই ছেলেকে পাশের ঘরে পানির খোঁজ করতে বলেছিলাম। সুযোগ পেয়ে ও যে আমার মেয়ের ঘরে ঢুকে এমন সর্বনাশ করবে, তা কি আমি জানতাম?”
আয়াত তখন মাথা তুলে শান্ত স্বরে বলল, “কিন্তু কাকিমণি, বাইরের পানির কল তো নষ্ট হয়নি। আর নিচেও পর্যাপ্ত পানি আছে। তাহলে আপনি ফারহান ভাইকে মিথ্যা বলে ওপরে পাঠালেন কেন?”
নাজমা বেগম এবার বড় বিপাকে পড়লেন। আয়াতকে তিনি পরে দেখে নেবেন, আগে পরিস্থিতি সামলানো দরকার। তিনি দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন, “আমি কী জানি গো! আরিয়ান আমাকে বলেছিল কল নষ্ট। ছোট মানুষ হয়তো ভুল বলেছে, কিন্তু আমি তো ওর কথা বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম।”
দাদাজান ফারহানের সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। ফারহানের চোখেমুখে কোনো ছলনা নেই, সেটা তিনি বুঝতে পারলেন। আর নিজের ছেলে ও ছেলের বউ ঠিক কতটা নিচ হতে পারে, সেটাও তার অজানা নয়। তিনি সবটা এখানেই মিটমাট করে দিতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই আরভান স্থির কণ্ঠে বলে উঠল,
“ফারহান শাহজাদিকে বিয়ে করবে, তাহলেই কি শাহজাদির গায়ে লাগা এই কলঙ্ক মুছে যাবে? যদি যায় তাহলে কাজি সাহেবকে খবর দিন, তাদের বিয়ে হবে।”
ফারহান হকচকিয়ে গেল। শাহজাদি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আরভানের দিকে তাকিয়ে প্রবলবেগে মাথা নাড়ল—সে এই বিয়ে করবে না। ফারহান আরভানের হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“ব্রো! কী বলছিস তুই এসব? আমি কোনো অপরাধ করিনি, তাহলে বিয়ে কেন করব? তাও এই নিচ মনের মানুষদের মেয়েকে? অসম্ভব!”
আরভান ফারহানের হাতের ওপর হাত রেখে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “রিলাক্স ফারহান। ওর বাবা-মা খারাপ হলেও মেয়েটা কিন্তু খারাপ নয়। আমি যতটুকু দেখেছি, ও অনেক ভালো মেয়ে। তুই ঠকবি না।”
নাজমা আর আনোয়ার চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে তখন পৈশাচিক হাসির রেখা ফুটে উঠল।
ফারহান আর কোনো কথা বলল না। রাত শেষ হওয়ার আগেই ফারহানের পরিবারকে খবর দিয়ে আনা হলো। শাহজাদিকে দেখে তাদের পছন্দ হলো, আর রাতের ঘটনাটা অত্যন্ত কৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হলো। বিয়ে শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু সারাদিন শাহজাদি নিজেকে নিজের ঘরে বন্দি করে রাখল। যে বাবা-মা মেয়ের নামে এত বড় অপবাদ দিয়ে তাকে সমাজের চোখে নামিয়ে দিতে পারে, তাদের প্রতি তার ঘেন্না ধরে গেছে।
আজ পেরিয়ে কাল ভোর হতেই তারা সবাই রওনা দিবে। শাহজাদিকে এখনই নেওয়া হবে না কারণ তার ভিসার কাজ বাকি। সব ঠিক হলে পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে।
রাতে ফারহানকে জোর করেই শাহজাদির ঘরে পাঠানো হলো। ঘরে ঢুকে শাহজাদিকে দেখে ফারহান থমকে গেল। পুরো ঘরটা ফুল দিয়ে সাজানো, বিছানায় লাল টুকটুকে শাড়িতে আবৃত হয়ে বসে আছে শাহজাদি। ফারহানের চোখে ভেসে উঠল সেই প্রথম দিনটির কথা, যেদিন সে শাহজাদিকে সাদা পোশাকে দেখেছিল—সেদিন মেয়েটাকে কতটা স্নিগ্ধ লাগছিল!। কিন্তু আজকের এই লাল শাড়ি যেন অপমানের রক্তিম আভা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফারহান দরজার ছিটকিনি দিতেই শাহজাদির ধ্যান ভাঙল। ফারহানকে দেখে তার রাগ যেন আকাশ ছোঁয়া হয়ে উঠল। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“আপনি! আপনি আবার কোন সাহসে আমার রুমে এসেছেন?”
ফারহান নিরুত্তাপ গলায় বলল,
“আপনার পরিবারের লোকজন জোর করে পাঠিয়েছে। আমার আসার একদম ইচ্ছে ছিল না।”
”নাটক করতে শুরু করেছেন আবার? আপনার কি মনে হয় আমি কিছু বুঝি না? সত্যি করে বলুন তো, আপনি আর আমার মা -বাবা প্ল্যান করে ইচ্ছে করে এসব করেছেন না? মাঝরাতে ঘরে ঢোকা, পানি চাওয়া-সবই আপনাদের নাটক! একজন মা কীভাবে নিজের মেয়ের সাথে এমন করতে পারে?”
শাহজাদির চোখের জল উপচে পড়ল। ফারহানের কেন জানি মেয়েটার জন্য খুব মায়া লাগল। পৃথিবীতে মায়েরা তো সন্তানদের আগলে রাখে, কিন্তু এই মেয়ের মা কীভাবে এমন কাজ করল? ফারহান আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। বলল,
“আমি কিচ্ছু করিনি। আমিও আপনার মতোই ফেঁসে গেছি। কালই আমি চলে যাব, চিন্তা নেই। তবে মেঝেতে শোয়ার অভ্যাস আমার নেই, তাই এখানেই শুলাম।”
শাহজাদি অশ্রুসজল চোখে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার আর সারারাত ঘুম হলো না, ওভাবেই বসে কাটাল।
——
ওদিকে ভোরের আলো ফোটার আগেই আবারও চিৎকার শুরু হলো।আরভানের বুকের মাঝে জড়িয়ে ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ এক বিকট আর্তনাদ আর চেঁচামেচি শুনতে পেল আয়াত। আয়াত আরভানের বাঁধন আলগা করে দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে বারান্দায় পা রাখতেই কানে এল এক বীভৎস খবর,
”বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে।আনোয়ার চৌধুরীকে কারা যেন রাতের আঁধারে কুপিয়েছে।চারদিকে রক্তারক্তি কাণ্ড।”
চলবে…

