Home "ধারাবাহিক গল্প আমার হয়ে থেকো আমার হয়ে থেকো পর্ব-৪৩+৪৪

আমার হয়ে থেকো পর্ব-৪৩+৪৪

0
325

#পর্ব_৪৩
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan


আনোয়ার চৌধুরীর নিথর ও রক্তাক্ত দেহটা নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটেছে স্বজনেরা। নৃশংসভাবে তার হাত ও পায়ের রগ, জিব্বাহ কেটে দেওয়া হয়েছে। নাজমা বেগম স্বামীর এই বীভৎস পরিণতি দেখে পাগলের মতো বিলাপ করে যাচ্ছেন। যে বাড়িতে সারাদিন মেয়ের বিয়ে নিয়ে ধুমধাম আর উৎসবের আমেজ ছিল, রাত ফুরোতে না ফুরোতেই সেখানে কোন জানোয়ার এমন তাণ্ডব চালিয়ে গেল, তা ভেবে কারো কূলকিনারা মিলছে না। চৌধুরী বাড়ির দীর্ঘদিনের আভিজাত্য যেন আজ রক্তের স্রোতে মিশে একাকার হয়ে গেছে।

​আয়াত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে নাজমার বিলাপ শুনছে। ফারহানও খবর পেয়ে ওপর থেকে নেমে এসেছে। গত দুদিন দুচোখের পাতা এক না হওয়ায় শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে, তা সে আর সইতে পারছে না। তবে শাহজাদি নিজের ঘর থেকে বের হলো না। বাবার এমন মর্মান্তিক খবর শুনেও তার মনের জমাট বাঁধা ঘৃণাটুকু টলল না। বাবা-মায়ের প্রতি তার বিতৃষ্ণা অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু গতরাতের সেই নোংরা নাটক তার ভেতরের শেষ মমতাটুকুও গ্রাস করে নিয়েছে।

​নাজমাকে আগলে ধরে রেখেছেন পারভীন সুলতানা। তার স্বামী মেজো ভাই আনোয়ারকে নিয়ে হাসপাতালে গেছেন। বুড়ো দাদাজান দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছেন। তার সাজানো সোনার সংসার যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। অবশ্য তার সংসার যে কোনোদিনই সোনা-সোহাগা ছিল না, সেটা তিনি নিজের চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না।

​আয়াত বারান্দার পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও আনোয়ার চৌধুরী ও নাজমা বেগমের প্রতি তার মনে বিন্দুমাত্র দয়া কাজ করার কথা নয়, তবুও আজ আয়াতের চোখের জল বাঁধ মানছে না। একজন স্ত্রী তার স্বামীর জন্য আর্তনাদ করছে—এই দৃশ্যটা তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। আয়াত নিজেও তো আরভানকে হাসপাতালের বিছানায় দেখে এমন পাগল হয়ে গিয়েছিল। যদি তার স্বামীর কিছু হতো? ভালোবাসা বা দয়া থেকে না হলেও, একজন নারীর আর্তনাদ আজ অন্য এক নারীর মনকে বিষিয়ে তুলছে।

​হঠাৎ নিজের কোমরে কারো বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ পেয়ে শিউরে উঠল আয়াত। তবে সে নড়ল না; সে জানে এই স্পর্শ কার। আরভান তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এখানে কী করছেন মিসেস? আর এত রাতে এই মরাকান্নার আসর বসেছে কেন?”

​আয়াতের চোখ থেকে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল।
“বড় চাচাজানকে কারা যেন কুপিয়েছে আরভান। উনাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাত-পা নাকি কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে!”

​”ওহ, আচ্ছা।”

আরভানের কণ্ঠস্বরে কোনো ভাবান্তর নেই, যেন অতি সাধারণ কোনো খবর শুনছে।​আরভানের এমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে আয়াতের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে আরভানের দিকে ফিরে তাকাল। আরভান আয়াতের চোখের পানি নিজের আঙুলে মুছে দিয়ে বলল,
“তুমি কাঁদছো কেন? সবার জন্য কাঁদতে নেই আয়াত। তোমার হাসির কারণ যেমন আমি হব, তেমনি তোমার চোখের পানিও হবে কেবল আমার জন্য।”

​আয়াত কিছু না বলে আরভানের বুকে নিজেকে গুঁজে দিল। কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আফজাল চৌধুরীর দৃষ্টি তখন আরভানের ওপর স্থির। সেই দৃষ্টিতে হাজারো আকুতি, হাজারো প্রশ্ন। যেন হৃদয়ে পুষে রাখা সব মায়া আজ তার মোজো ছেলের জন্য চুইয়ে পড়ছে।

​একজন বাবার কাছে নিজের সন্তানকে এমন মৃত্যুপথযাত্রী অবস্থায় দেখা নিশ্চয়ই অসহনীয় কষ্টের। আরভানেরও তো বাবা আছে। যাকে সে একসময় নিজের পুরো পৃথিবী মনে করত; অথচ তার সেই পৃথিবীই তো তাকে দিনের পর দিন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে।

—-

পুরো বাড়িটা এক গভীর নিস্তব্ধতায় ডুবে রইল। আগের মতো কোনো হইহুল্লোড় নেই, নেই কোনো কোলাহল। এমনকি নাজমা বেগমের সেই গগনবিদারী চিৎকারও যেন এখন এক অদ্ভুত নীরবতায় রূপ নিয়েছে। আনোয়ার চৌধুরী মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন হাসপাতালের বিছানায়, আর নাজমা বেগম বিলাপ করতে করতে সেখানেই পড়ে আছেন।

​সকলকে বিদায় জানিয়ে আয়াত, আরভান আর ফারহান বিমানবন্দরের দিকে রওনা দিল। শাহজাদির পাসপোর্টের কাজ এখনো বাকি, তাই সব ঠিক হলে তাকে পরে নিয়ে আসা হবে। আরভান চেয়েছিল শাহজাদিকে একসাথেই নিয়ে যেতে, তবে ফারহান আর আয়াত তার কথায় সায় দেয়নি। কারণ, আর মাত্র দুদিন বাদেই আরভানের অপারেশন। আয়াত আরভানের এমন প্রস্তাবে প্রথমে রেগেও উঠেছিল; নির্ঘাত এই লোকটা মাথায় অপারেশন এড়ানোর কোনো ফন্দি আঁটছিল। এদিকে ফারহানের আসার সময় শাহজাদির সাথে দেখা হয়নি। অদ্ভুতভাবে কেন যেন মনে হচ্ছে, মেয়েটাকে অন্তত একবার দেখা উচিত ছিল। ওই মুখটা তাকে বড্ড টানছে। একটাবার কিছুক্ষণ মন ভরে দেখে আসলে ক্ষতি কী হতো? ও তো এখন তারই অর্ধাঙ্গিনী।

​বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন পৌঁছাতে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে (ট্রানজিটসহ)। দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল আর ক্লান্তিতে শরীর আর চলছিল না। ফারহান নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে যেতে চাইল, কিন্তু আরভান তাকে যেতে দিল না। একে তো আয়াত অন্তঃসত্ত্বা, আরভান তো ওকে রান্নাঘরের ত্রিসীমানায় আসতে দিবে না; তার ওপর তাড়াহুড়ো করে আসায় ডেইজিকে জানানো হয়নি। ডেইজি শুধু প্রতিদিন এসে বাড়িটা পরিষ্কার করে দিয়ে যেত, ব্যস এতটুকুই।

অগত্যা দুই মূর্তিমান পুরুষ কোমর বেঁধে রান্নাঘরে ঢুকল। আয়াত সোফায় বসে তাদের কাণ্ড দেখছে। আরভান আর ফারহানের রান্নার দৃশ্যটা সিনেমার কমেডির চেয়ে কম কিছু নয়।

​ফারহান একটা বড় আলু নিয়ে গম্ভীর মুখে কাটতে গিয়ে সজোরে আঙ্গুল কেটে ফেলার উপক্রম করল। আরভান মুখ কুঁচকে বলল,
“ফারহান! তুই কি আলু কাটছিস নাকি আলুর সাথে নিজের আঙ্গুলের অপারেশন করছিস? দে ওটা আমাকে!”

​ফারহান কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“ব্রো, আমি তো ভেবেছিলাম কাজটা সহজ। আচ্ছা, এই যে সবুজ পাতাগুলো, এগুলো কি ধুয়ে তেলের ওপর ছেড়ে দেব?”

​আরভান কপালে হাত দিয়ে বলল,
“ওগুলো ধনেপাতা ফারহান! ওগুলো রান্নার শেষে দিতে হয়। তুই বরং ডালটা বসানোর চেষ্টা কর।”

​ফারহান ডাল ধুতে গিয়ে অর্ধেক ডালই বেসিনে ভাসিয়ে দিল। আয়াত দূর থেকে এসব দেখে হেসে কুটিপাটি। সে কাছে এসে বলল, “আপনাদের এই সার্কাস বন্ধ করুন তো। আমিই রান্না করছি।”

​আরভান সাথে সাথে বাঁধা দিয়ে বলল, “একদম না আয়াত! তুমি এখন বিশ্রাম নেবে। আমি সব সামলে নেব।”

​আয়াত ঠোঁট উল্টে বলল, “আপনার ওই সিদ্ধ শাক-পাতা আমি খেতে পারব না। ওদিন যা রেঁধেছিলেন, ওটাই যথেষ্ট ছিল!”

​আরভান গম্ভীর মুখে বলল, “ওটা শাক-পাতা ছিল না আয়াত, ওটা হেলদি ডায়েট ছিল। তাছাড়া ওটা এখন তোমার শরীরের জন্য জরুরি।”

​”আগে মন ঠিক করতে ভালো খাবার খেতে হয়, তারপর শরীর ঠিক হবে। নিজের শরীর নিয়ে যার খেয়াল নেই, সে অন্যের শরীর নিয়ে জ্ঞান দিতে আসে কিভাবে? সরুন বলছি!” আয়াত এক প্রকার জোর করেই আরভানকে সরিয়ে দিল।

আরভান বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফারহান মুখ টিপে হাসছে দেখে আরভান ফিসফিস করে বলল, “হাসছিস কেন?সামনে তোরও এমন পাল্লায় পড়ার সময় আসছে… কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর। শাহজাদিকে এমন ট্রেনিং দিয়ে দেব যে তখন বুঝবি মজা!”

——

​মেলবোর্নের নীল আকাশ আর বিকেলের মায়াবী রোদ প্রকৃতিকে এক অন্যরকম সজীবতায় ভরিয়ে দিয়েছে। ঝিরঝিরে ঠান্ডা বাতাস আর ইউক্যালিপটাস গাছের সারির মাঝ দিয়ে মেলবোর্নের পথগুলো যেন এক শান্ত স্থির চিত্রের মতো।

​নিজ দেশে ফিরতেই আরভানের যেন এক ভিন্ন রূপ। বাড়িতে আয়াতের দেখাশোনার জন্য ডেইজি ছাড়াও আরও দুজন লোক রেখেছে সে, যা নিয়ে আয়াতের বিরক্তির শেষ নেই। অথচ এই মানুষটাই এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হিসেবে কাজে মনোনিবেশ করেছে। কিন্তু আরভানের এই কৃত্রিম ব্যস্ততা দেখে আয়াতের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। সে জানে, আরভান নিজেকে ব্যস্ত রেখে আসলে ওই আসন্ন অপারেশনটার কথা ভুলতে চাইছে।

​রাস্তার একপাশে কালো রঙের দানবীয় গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে একা বসে আছে আরভান। তার হাতে দাদাজানের দেওয়া সেই রহস্যময় খামটা। পকেট থেকে লাইটার বের করে সে খামটার এক কোণে আগুন ধরিয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে দাদাজানের সেই লেখাগুলো, যা আরভানের মগজে চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে,

​”আমার সাথে তোমার কোনোদিন তেমন সখ্যতা গড়ে ওঠেনি আরভান। তবুও আমার কাছে তুমি অনেক প্রিয়। জানি না ভবিষ্যতে তোমার সাথে আর দেখা হবে কি না, তাই কিছু সত্য লিখে রাখলাম।

​আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর মেয়ে, অর্থাৎ আয়াতের মা আর তোমার বাবার বিয়ে ঠিক করেছিলাম তাদের ছোটবেলায়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তোমার বাবাকে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফিরেছিল একজন অস্ট্রেলিয়ান মেয়েকে সাথে নিয়ে। এটা আমার আদর্শে ত্বরী আঘাত করেছিল, তাই তাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলাম। আমার এই সিদ্ধান্ত তোমার দাদিমা মেনে নিতে পারেননি। ছেলের শোকে তিনি বছরের পর বছর বুকে পাথর চেপে রেখে শুধু ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন। অসুস্থ হওয়ার পর তিনি শেষ আবদার করলেন ছেলেকে একবার দেখার।

​খবর পেয়ে তোমার বাবা এলেন, সাথে নিয়ে এলেন সতেরো বছর বয়সি এক কিশোরকে—তোমাকে। তোমার দাদিমা নিজের শেষ ইচ্ছা হিসেবে তোমার সাথে আয়াতের বিয়ে দেওয়ার কথা বললেন। মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর শেষ আবদার আমি ফেলতে পারিনি। তোমাদের বিয়ে হলো। তোমার দাদিমা মারা গেলেন তার পরের দিনই। তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে আবার চলে গেলেন। এদিকে তোমার ফিরে যাওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় আয়াতের বাবা-মা মারা গেলেন। নিজের সন্তান আর ছেলের বউয়ের শোক সইতে পারলেন না মনসুর খবর শোনা মাত্রই তিনি স্ট্রোক করলেন। আয়াত একদম একা হয়ে গেল। বাচ্চা মেয়েটাকে আমি নিজের কাছে নিয়ে এলাম।
​তোমার বাবাও এদিকে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। সব ছিন্ন হয়ে গেল সেদিন। “বারোটি বছর এভাবেই কেটে গেল আরভান… আমাদের সমাজে একটা মেয়ের আঠারো বছর পার হওয়া মানেই তার জীবন কতটা অনিশ্চয়তার মুখে পড়া, তা তুমি নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছো। আয়াতের বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর হঠাৎ একদিন এক লোক আমার কাছে এসে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বলল—আমার মেজো ছেলে আনোয়ার নাকি আয়াতের বাবা-মায়ের হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে এবং তাকেও মেরে ফেলবে। প্রথমে বিশ্বাস করিনি, কারণ আনোয়ার বরাবরই মনসুরের ভক্ত ছিল। আমাকে বিশ্বাস করাতে না পেরে সেই লোক ফিরে গেলেও আর ফিরতে পারেনি, পথেই তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়। সেদিন মনে খটকা লেগেছিল; সত্যিই কি আয়াতের বাবা-মায়কে কেউ খুন করেছে? আর তার কিছুদিন পর থেকেই ছোট আয়াতের ওপর একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আসতে শুরু করল।

​একদিন তোমার মা চিঠি দিলেন, তোমার অসুস্থতার কথা জানালেন। বললেন, তোমার বাবা এই সবকিছুর জন্য দায়ী। এবং বলেন আমি নাকি তোমাদের বিয়ে দিয়ে ভুল করেছি। কারন

তোমার জীবন নিয়ে কোনো আশা নেই দেখে আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, আমি তোমার বাঁচার ওষুধ দেব। তোমার মা ঠিকই বুঝে গিয়েছিলেন সেই ওষুধের নাম ‘আয়াত’। তাই তাকে বলেছিলাম তোমাকে একবার বাংলাদেশে পাঠাতে। আমি আয়াতের পাসপোর্ট-ভিসা সব তৈরি রেখেছিলাম গোপনে, যাতে কেউ জানতে না পারে। কিন্তু বছরের পর বছর গেল, তুমি এলে না।

হঠাৎ একদিন আয়াতের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, সেদিন শাহরিয়ার তাকে বাঁচায়। শাহরিয়ারের চোখে আয়াতের জন্য এক উন্মাদনা দেখে আমি ভয় পেলাম। আমি চেয়েছিলাম আয়াতকে এসব থেকে বাঁচাতে। কিন্তু যদি অন্য কোনো ভালো ছেলের সাথে বিয়ে দিই, তবে আয়াতকে অচিরেই বিধবা হতে হবে—কারণ শাহরিয়ার তাকে ছাড়বে না। যখন সব পথ রুদ্ধ হয়ে আসছিল, তখন ভাবলাম—যদি সত্যিই আনোয়ার এসবের পেছনে থাকে, তবে তার ছেলের বউ করে দিলে হয়তো আয়াত রক্ষা পাবে। আমি চেয়েছিলাম আয়াতকে এই নরক থেকে বাঁচাতে, কিন্তু তোমার কোনো খবর ছিল না। আমি ভাবলাম, তুমি বোধহয় আর কোনোদিন ফিরবে না। অগত্যা আয়াতের সুরক্ষার খাতিরেই ওকে শাহরিয়ারের সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।

বিয়ের আয়োজন শুরু করলাম, কিন্তু তুমি আকস্মিকভাবে উদয় হলে।খুশিতে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম কিন্তু সেই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না – যখন শুনলাম জেসিকা তোমার ফিয়েন্সে, আর তুমি আয়াতকে ডিবোর্স দিতে এসেছো।আমার সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।

তবে সেদিন রাতে যখন তুমি শাহরিয়ারের গলায় তার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করতে গেলে, তখন আমি বুঝেছিলাম তোমার ভেতরে কীসের আগুন জ্বলছে। তুমি রাতের আকাশে নিস্পলক তাকিয়ে থাকতে, আমি সব বুঝতে পারতাম। তাই তো এত ঝামেলা করেও আয়াতকে তোমার কাছে পাঠিয়েছিলাম, যাতে তোমার আমানত তোমার হাতে তুলে দিতে পারি।”

​আরভান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ছাই হয়ে যাওয়া কাগজটার দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, “আপনিও অনেক কিছু জানেন না দাদাজান, যা আমি জানি। সময় হলে সব সত্যই সামনে আসবে।”

সে লাইটার দিয়ে অবশিষ্টাংশটুকুও পুড়িয়ে দিল। সে চায় না এই সত্য কোনোদিন আয়াতের সামনে আসুক। যদি আয়াত জানতে পারে যে তার জীবনের এত চড়াই-উতরাই, তার বাবা-মায়ের মৃত্যু—সবই আরভানের পরিবারের কারণে, তবে কি সে আরভানকে ক্ষমা করতে পারবে? আরভান সেটা হতে দেবে না। সে থাকতে আয়াতের গায়ে আঁচ লাগতে দেবে না। আর যারা আয়াতের ক্ষতি করতে চেয়েছে, তাদের শাস্তি তো আরভান নিজের হাতেই দিচ্ছে; যেমনটা সে নিজের রক্তজ সম্পর্কের সাথে করেছে।

​হঠাৎ ফোনের কম্পনে আরভানের চিন্তায় ছেদ পড়ল। স্ক্রিনে আয়াতের নাম দেখে ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে খ্যাপাটে কণ্ঠ ভেসে এল।

​”কোথায় আপনি? আপনাকে কখন বলেছি বাড়িতে আসতে?”

​আরভান একটু আয়েশ করে বলল, “মাঝরাস্তায় আছি। এত তাড়া কেন মিসেস? কোনো বিশেষ আপ্যায়ন করবেন নাকি?”

​”আপ্যায়ন ছাড়া উপায় কী বলুন! একবার শুধু বাড়িতে আসুন, তারপর দিচ্ছি আপ্যায়ন!”

​”তোমার গলার স্বর শুনে তো আমার বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছাই মরে গেছে। বুঝতে পারছি কপালে ভালো কিছু নেই।”

​”খবরদার আরভান! যদি গাড়ি ঘুরিয়েছেন তো খবর আছে আপনার!”

​আরভান এবার একটু দুষ্টুমি করে বলল, “সরি মিসেস, শুনতে পাচ্ছ না… নেটওয়ার্কে সমস্যা… হ্যালো?”

​”আহ্ আরভান! আরভান!” আয়াত ওপাশ থেকে চিৎকার করছে।
​আরভানের মুখের হাসিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। ফোনের ওপাশে ওটা কিসের শব্দ? সে অস্থির হয়ে উঠল। “আয়াত.. কী হয়েছে আয়াত? হ্যালো? এই আয়াত! আমি আসছি আয়াত, প্লিজ কথা বলো!”

ওপাশ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে আরভান আতঙ্কিত হয়ে উঠল।​আরভান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।সে পাগলের মতো গাড়ি চালিয়ে বাড়ির সামনে এসে ব্রেক কষল। ভয়ে বুকটা ঢিপঢিপ করছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই দেখল আয়াত সোফায় বসে মিটিমিটি হাসছে।

​আরভানের পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে, আতঙ্কে হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। আয়াতকে সুস্থ দেখে সে এক ছুটে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আয়াতও জাপটে ধরল আরভানকে।

​”এটা কী ছিল আয়াত? তুমি জানো আমার কী অবস্থা হয়েছিল?” আরভান হাঁপাচ্ছে।

​আয়াত ওর বুক থেকে মুখ তুলে হেসে বলল, “আপনাকে কাছে আনার নিজস্ব টেকনিক!”

​আরভান আয়াতের গাল দুটো শক্ত করে ধরে ধরা গলায় বলল, “এমনটা আর কখনো করবে না আয়াত। আর একটু হলে আমার জান বেরিয়ে যেত!”

​আয়াত আরভানের হাত দুটো নিজের পেটের ওপর রাখল। স্নিগ্ধ স্বরে বলল, “আপনার জান যেন বের না হয়, তাই তো আপনার হাতে আর একটা জান তুলে দিচ্ছি। ভুলে গেছেন? আমাদের কথা ভাবুন আরভান, আপনাকে সুস্থ হয়ে ফিরতেই হবে।”

​আরভান পরম আবেশে আয়াতের কপালে মাথা ঠেকালো। এক অসীম প্রশান্তি যেন মুহূর্তেই তার সব ভয় ধুয়ে মুছে দিল

চলবে…

#পর্ব_৪৪
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan

মেডিকেল সায়েন্সে ‘এওর্টিক অ্যানিউরিজম’ এক নীরব ঘাতকের নাম। মহাধমনীর এই বিপজ্জনক স্ফীতি যখন প্রায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে। রোগীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে শল্য চিকিৎসকেরা ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’ কিংবা ‘অ্যান্ডোভাসকুলার অ্যানিউরিজম রিপেয়ার’ -এর প্রস্তুতি নেন। রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে কৃত্রিম হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে রক্তসঞ্চালন সচল রাখা হয়, আর বুক চিরে সেই স্ফীত ধমনী কেটে সেখানে কৃত্রিম গ্রাফ্ট বসিয়ে দেওয়া হয়। বিজ্ঞান যেখানে সবটুকু প্রযুক্তি ঢেলে দেয়, মানুষের প্রাণ সেখানে ঝুলতে থাকে এক সুতোর ব্যবধানে।

​সাদা ধবধবে হাসপাতালের বেডে নিথর শুয়ে আছে আরভান। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে অ্যানেশথেসিয়া দিয়ে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হবে। ফারহান দরজার পাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আরভানের শান্ত মুখের দিকে। এই সেই মানুষ, যে কোনোদিন কারো সামনে মাথা নোয়ায়নি, যার ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে সকল ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র ধুলোয় মিশে গেছে। মানুষের জীবনটা আসলেই বড় অদ্ভুত; যে মানুষটা পুরো পৃথিবীর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা রাখে, আজ সে নিজেই নিজের শরীরের ভেতরকার এক অদৃশ্য শত্রুর কাছে কতটা অসহায়। নিয়তির এই বাস্তবতার সামনে মানুষ কতটা নগণ্য।

​আয়াত আরভানের হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আরভান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, “কাঁদছো কেন বোকা? এই যে দেখো, তোমার আর আমাদের লিটল ওয়ানের জন্য আরভান চৌধুরী এখন অপারেশন থিয়েটারে ঢুকছে। ক্যান ইউ ইমাজিন?”

​আয়াতের কান্নার বেগ আরও বাড়ল। আরভান ওকে হালকা টানে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরতেই আয়াত হেঁচকি তুলতে শুরু করল। আয়াতের কান্নায় তার পুরো শরীর কাঁপছে।

​সে আরভানের বুকে মুখ রেখেই রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “আমি আপনাকে এর আগেও একদিন হাসপাতাল থেকে বের হতে দেখেছি, কিন্তু তখনও বুঝিনি আপনার ভেতরে এত বড় ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেদিন আপনার হাত কাটা দেখে আমি ভেবেছিলাম লোকটা বোধহয় এমনই বেপরোয়া। আমি কেন বুঝতে পারলাম না আরভান? কেন আমি আপনার চোখের আড়ালে থাকা সেই অসহ্য যন্ত্রণাটা অনুভব করতে পারলাম না?”

​আরভান আয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “কারণ আমি চাইনি তুমি জানো। আমি চেয়েছিলাম আমার সবটুকু অন্ধকার আমি একাই বয়ে বেড়াই, যাতে তোমার আকাশটা সবসময় পরিষ্কার থাকে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন আয়াত। আজ আমি লড়াই করছি কেবল তোমার জন্য।”

​আয়াত চোখ মুছে আরভানের চোখের দিকে তাকাল। আরভানের চোখ দুটো আজ বড্ড গভীর দেখাচ্ছে। সে আয়াতের চিবুকটা ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল, ” “আয়াত…, যদি কোনো কারণে আমি আর ফিরে না আসি,আমাকে কখনো ভুলে যাবে না। তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো। আমার অস্তিত্বটুকুকে নিজের মাঝে বাঁচিয়ে রেখো।

​আপনি দয়া করে এভাবে বলবেন না! আয়াত আরভানের মুখ চেপে ধরল। “আপনি ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকব না। আপনিই তো বলেছিলেন—’তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো আয়াত, আমি পুরো পৃথিবীর মানুষের সাথে লড়ে যাব’। তাহলে এখন কেন আমার জন্য মৃত্যুর সাথে লড়তে পারবেন না?কেন মৃত্যুর কথা বলছেন?আপনি তো আমার সাথে সারাজীবন থাকার কথা বলেছিলেন?বলেছিলেন বৃদ্ধ হয়বেন একটা সুন্দর পরিবার দিবেন?

​আরভান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়াতের হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেল। “তুমি বড্ড বোকা আয়াত। মানুষ মানুষের সাথে লড়তে জানে, কিন্তু অবধারিত মৃত্যুর সাথে নয়। সেখানে আমরা সবাই বড় অসহায়।”

​​আয়াত আর কিছুই বলল না। এক অদ্ভুত নীরবতা ঘরটাকে গ্রাস করল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে আরভানের বুকের স্পন্দন শুনল। তারপর আচমকা মুখ তুলে অদ্ভুত এক আবদার নিয়ে বলল, “আপনার বুকের বাম পাশটা তো আমার জায়গা, তাই না? অপারেশন করার সময় ওটা কাটা হলে আমাকে সেখান থেকে বের করে দেবেন না তো?”

আয়াত এমন অদ্ভুত বোকা কথায় ​আরভান হেসে ফেলল। আয়াতের চিবুক ছুঁয়ে বলল, “তোমার জায়গা কখনো বুকের বাম পাশে ছিল না আয়াত। তুমি ছিলে আমার হৃদয়ের ডান পাশে, যা পুরোটা ফাঁকা হয়ে ছিল। তুমি আসার পর সেই শূন্যস্থানটা পূর্ণ হয়েছে।”

​আয়াতের কান্নাভেজা চোখ জোড়া মুহূর্তেই কুঁচকে গেল। সে অভিমানী গলায় বলল, “ভালোবাসলে হৃদয়ের টানে মানুষকে বাম পাশে রাখতে হয়, আপনি জানেন না? আমি আর ডান পাশে থাকতে রাজি নই। অপারেশনের পর আমায় বাম পাশে ট্রান্সফার করবেন কিন্তু!”
​আরভান হো হো করে হেসে উঠল। এই করুণ মুহূর্তেও আয়াতের এমন পাগলামি, এই নিষ্পাপ আবদারে তার সমস্ত ভয় যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আয়াতের কপালে গভীর একটা চুম্বন এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো আয়াত। একটু শক্ত করে।”

​আয়াত আর দেরি করল না, আরভানের বুকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে জড়িয়ে ধরল। যেন এই আলিঙ্গন দিয়েই সে আরভানকে নিজের কাছে রেখে দিবে না হলে তার আরভান কোথাও হারিয়ে যাবে।

​ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে করিডোর দিয়ে এলিনা চৌধুরী ছুটে এলেন। এতগুলো বছর ছেলেকে এই অপারেশনের কথা কতবার বলেছেন, কিন্তু আরভান কান দেয়নি। এমনকি তার সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলো। আজ যে সে নিজের ইচ্ছায় এই মৃত্যুর মুখে লড়াই করতে রাজি হয়েছে, তা কেবল আয়াতের ভালোবাসার জোরে—এলিনা তা ভালো করেই জানেন। একজন মায়ের মন খুশিতে আর আশঙ্কায় ভরে উঠল। তার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পড়ছে। আরশাদ চৌধুরী এই মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে পারলেন না; বিজনেজ ডিলের প্রয়োজনে তাকে এক মাসের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থাকতে হচ্ছে।হয়তো আরভান এর জন্যই এই সময়টা বেছে নিয়েছিলো। কারন জানলে সে এই অপারেশন এতটা সহজ বোদ হয় হতো না।

​আরভান তার মাকে দেখে মুচকি হাসল। এলিনার চোখের পানি বাঁধ মানছে না। এত বছর মায়ের সাথে ঠিকমতো কথা না বলা সেই কঠোর আরভান আজ অদ্ভুতভাবে নিজের একটি হাত বাড়িয়ে দিল মায়ের দিকে। তাকে কাছে ডাকল।

​ছোটবেলায় মা যেমন করতেন, ঠিক সেভাবেই আজ আরভান তার মায়ের হাতটা নিয়ে নিজের হৃদয়ের ওপর রাখল। এলিনা চৌধুরী সবসময় এভাবেই তার ছেলের হৃদস্পন্দন শুনতেন। আজও হাত রাখতেই তিনি বুঝতে পারলেন, তার ছেলের হৃদপিণ্ডটা আজ কেবল বাঁচার জন্য নয়, বরং তার ভালোবাসার আমানতকে রক্ষা করার জন্য তীব্ৰবেগে স্পন্দিত হচ্ছে।

—–

তবে আরভানের কথার ধরন আজ বড্ড সহজ, বড্ড স্বাভাবিক। তার মতো একরোখা আর কঠোর একজন পুরুষ যে এভাবেও কথা বলতে পারে, তা যেন এলিনা চৌধুরীর ভাবনার অতীত ছিল। আরভান গলা পরিষ্কার করে মৃদু স্বরে বলল, “যদি কোনো কারণে ফিরে না আসি… তবে এ যাবৎকাল আপনার সাথে যত খারাপ ব্যবহার করেছি, তা ভুলে গিয়ে আমায় মাফ করে দেবেন ।”

​এলিনা চৌধুরী ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আতঙ্কে শিউরে উঠলেন। তিনি আরভানের মুখটা নিজের দুই হাতের আঁজলায় চেপে ধরে আকুল হয়ে বললেন, “এসব কথা মুখেও এনো না আরভান! তুমি কখনো ভুল করোনি বাবা। তুমি সবসময় সঠিক ছিলে, ভুল তো আমি করেছিলাম। এমনকি একটা বিশাল অন্যায় করে তোমার কাছে সত্য লুকিয়ে মিথ্যাও বলেছি। সেই সবকিছুর জন্য তুমি আমায় ক্ষমা করো!”

​আরভান মায়ের আকুলতার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “হুম, অপরাধ করলে তো শাস্তি পেতেই হয় মম। ওটার জন্য আসলে কোনো মাফ হয় না।”

​ঠিক তখনই আরভানকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার জন্য হাসপাতালের কর্মীরা প্রবেশ করল। ট্রলিটা যখন আরভানের বেডের পাশে এসে দাঁড়াল, তখন চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। অনেক কষ্টে, এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে আরভানের শক্ত মুঠো থেকে আয়াতের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়া হলো। আয়াত যেন নিজের প্রাণটাকেই হারিয়ে ফেলছে। তবে ট্রলিতে ওঠার আগে আরভান খুব নিচু স্বরে আয়াতের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল, “সময়মতো খাবার খেয়ে নিও। আর এত কান্নাকাটি কোরো না; নিজের যত্ন নাও, পেটে যে আছে তার কথাটাও তো ভাবতে হবে,?আপনার আদুরে বাচ্চা আপনার কাছেই ফিরে আসবে,,মিসেস।”, ”

​কিন্তু আয়াতের কানে তখন কোনো কথাই ঢুকছিল না। সে শুধু ঝাপসা চোখে আরভানের চলে যাওয়া দেখছিল। ওদিকে এলিনা চৌধুরী এক জায়গায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আরভানের শেষ কথাগুলো তার মাথায় অনবরত বাজছিল। এতগুলো বছর পর, এই প্রথমবার তার ছেলে তাকে ‘মম’ বলে ডেকেছে। এই একটা শব্দ শোনার জন্য তার মাতৃহৃদয় কতটা চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিল, তা শুধু তিনিই জানেন।
​অপারেশন থিয়েটারের বাইরে করিডোরে এক অস্থির নীরবতা। ফারহান পকেটে হাত দিয়ে পায়চারি করছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল এল। এই সংকটময় মুহূর্তে কে ফোন করতে পারে, তা সে প্রথমে কিছুতেই আন্দাজ করতে পারল না। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটি মিষ্টি মেয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

​”ভাইয়াকে কি অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে?”

​ফারহানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্লান্ত হাসি ফুটে উঠল। শাহজাদির কণ্ঠ চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগেনি। সে নরম সুরে বলল, “হুম, এইমাত্র নেওয়া হয়েছে।”

​”আচ্ছা। ভাইয়ার অপারেশন শেষ হলে আমায় একটু জানিয়ে দেবেন ? দাদাজান ওনাকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা করছেন।” ওপাশের কণ্ঠে একরাশ উদ্বেগ।

​”আচ্ছা, জানাব।” ফারহান একটু থামল। তার মনে এক তীব্র কৌতুহল জেগে উঠল। সে গলা খাকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তা… আমার নাম্বারটা কোথায় পেলেন আপনি?”

​”দাদাজান দিয়েছেন।” মেয়েটি সংক্ষেপে উত্তর দিল।
​”ও আচ্ছা। তা আপনার বাবার কী খবর এখন?”

ফারহান একটু বাড়িয়েই জিজ্ঞেস করল।
​ওপাশ থেকে মেয়েটির কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। সে বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলল, “আপনার যদি এতই জানার ইচ্ছে থাকে, তবে এখানে এসে নিজেই তাদের দেখে যান। প্রয়োজনে তাদের সাথে করে নিয়েও যান!”

​কথাটা বলেই মেয়েটি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে খট করে ফোনটা কেটে দিল। ফারহান ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খানিকটা থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই মৃদু হাসল। এই মেয়ের রাগ সবসময় নাকের ডগায় চড়ে থাকে।

—–

ওটি-র বাইরে প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি যুগের মতো কাটছিল। জায়নামাজে বসে অবিরত মোনাজাতের হাত বাড়িয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসাল সে। এলিনা চৌধুরী কয়েকবার এগিয়ে এসেছিলেন আয়াতকে সান্ত্বনা দিতে, তাকে একটু ছুঁয়ে দিতে; কিন্তু আয়াত তাকে কঠোরভাবে এড়িয়ে গেছে, নিজের কাছে ঘেঁষতেও দেয়নি। কেন যেন আরভানের বাবা-মা উভয়ের প্রতিই এক তীব্র ক্ষোভ কাজ করছে আয়াতের মনে, আর এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেমন বাবা-মা এরা? যাদের নোংরা অতীত আর কর্মফলের জন্য আজ তার নিষ্পাপ স্বামীকে জীবনের এমন চরম ঝুঁকিতে পড়তে হলো!

ফারহান বেশ কয়েকবার খাবার নিয়ে এসে অনুনয়-বিনয় করল, কিন্তু আয়াত এক ফোঁটা পানিও মুখে তুলল না। পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
​কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ ও জটিল অপারেশন শেষে অবশেষে ওটি-র লাল বাতিটা নিভে গেল। ক্লান্ত মুখে ডাক্তার বের হয়ে এলেন। আরভানের অবস্থা তখনো পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নয়; জটিল সার্জারির পর রোগীর জ্ঞান ফিরতে বেশ কিছুটা সময় লাগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল নিবিড় পর্যবেক্ষণে। অবশেষে যখন আরভানের শরীরে একটু সাড় এল,, তখন নিয়মমাফিক আইসিইউ-র বিশেষ স্টেরাইল গাউন ও মাস্ক পরে আয়াতকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো।

​ ভেতরে ঢুকে আরভানের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে আয়াতের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আরভানের কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরতেই আয়াতের চোখ ভেঙে জল এল।

আরভান ধীর গতিতে চোখ মেলল। কথা বলার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি তার শরীরে নেই, অবশ ভাবটা তখনো কাটেনি; শুধু অর্ধনিমীলিত চোখ জোড়া দিয়ে সে আয়াতকে দেখল। আয়াত আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না, তার চোখের জল আরভানের হাতের ওপর টপটপ করে পড়তে লাগল। ঠিক তখনই ডিউটি নার্স এসে আয়াতকে বলল, “প্লিজ ম্যাম, ওনাকে এখন একদম উত্তেজিত করা যাবে না। আপনি এখন বাইরে আসুন।”

নার্স তাকে এক প্রকার জোর করেই বাইরে বের করে দিল। এরপর ফারহান ও এলিনা চৌধুরীও একে একে ভেতরে গিয়ে আরভানকে দেখে এলেন।

​ধীরে ধীরে সমস্ত শারীরিক জটিলতা কাটিয়ে ওঠার পর আরভানকে নরমাল কেবিনে শিফট করা হলো। আয়াত সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো তার পাশে বসে রইল। আরভানের শরীর এখনো দুর্বল, তাই ডাক্তার তাকে বেশি কথা বলতে বারণ করেছেন। আরভান বিছানায় শুয়েই আয়াতের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, চেহারাটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত।

​আরভান খুব নিচু স্বরে বলল, “অপারেশন থিয়েটারে ঢুকলাম আমি… অথচ আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আইসিইউ থেকে মাত্র আপনিই বের হয়ে এলেন, মিসেস।”

​আয়াত চোখ রাঙিয়ে ধরা গলায় বলল, “বাজে কথা বলবেন না একদম। আমার মনের ভেতর তখন কী ঝড় চলছিল, তা কি আপনার জানা আছে?”

​আরভান আলতো করে মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই ফারহান কেবিনে ঢুকে বলল, “ব্রো, তোর এই বউ কিন্তু কাল থেকে মুখে একটা দানাও তোলেনি। এবার তুই একে শাসন কর।”

​আরভানের চিবুক শক্ত হয়ে গেল। সে আয়াতের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “মিথ্যা কথা বলবে না আয়াত। তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন যে তোমার পেটে এখন আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠছে? নিজের জন্য না হোক, অন্তত ওর কথা ভেবেও তো কিছু খেতে পারতে!”

​আয়াত মুখ নামিয়ে অভিমানী সুরে বলল, “আমার গলা দিয়ে কোনো খাবার নামছিল না।”

​আরভান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়েকে কিছু বলা আর নিজের মাথায় কুড়াল মারা একদম সমান।
​এরপরের দিনগুলো বেশ দ্রুতই কাটল। এলিনা চৌধুরীর সাথেও আরভান কিছুটা স্বাভাবিকভাবে কথা বলল, যা সেই মায়ের হৃদয়ে শান্তি এনে দিল। কয়েকদিন পর হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়ে আরভানকে বাড়িতে আনা হলো। বাড়িতে আসার পর আরভানের সবটুকু সেবা যত্ন আয়াত নিজেই করল। আর আরভানের দিনলিপির প্রধান রুটিন হয়ে দাঁড়াল—একমনে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকা। আরভান কি কখনো ভেবেছিল, যে একাকীত্ব আর অভিশপ্ত জীবন থেকে বাঁচতে সে একদিন মৃত্যুকে একমাত্র অস্ত্র ভেবেছিল, সেই জীবনেই একদিন বেঁচে থাকার চরম আকুতি নিয়ে আসবে দুটি প্রাণ?যাকে সে ডিবোর্স দিতে বাংলাদেশে গিয়েছিলো আজ সেই মেয়েটা তার পুরো পৃথিবী। তার পেটে আজ তাদের অনাগত সন্তান তার বেঁচে থাকার।

​একটু সুস্থ হতেই আরভানের একটা প্রিয় অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল—আয়াতকে নিজের পাশে বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর পেটে কান পেতে রাখা। অনাগত সন্তানের প্রতিটা সূক্ষ্ম নড়াচড়া যেন সে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করতে পারে। মাঝরাতে যখন আয়াত গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, আরভান তখন পরম মমতায় সেই পেটে অসংখ্য চুমু এঁকে দেয়। ফিসফিস করে প্রতিজ্ঞা করে বলে —”সে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা হবে; নিজের জীবনের কোনো অন্ধকার বা বিষাক্ত ছায়া সে কখনোই তার সন্তানদের ওপর পড়তে দেবে না।”

​আরভান পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে দাদাজানের সাথে দেখা করতে তারা আবারও বাংলাদেশে যায়। সেখানে মাত্র দুদিন থেকে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শাহজাদিকে সাথে নিয়ে মেলবোর্নে ফিরে আসে।

​আয়াতের প্রেগন্যান্সির কারণে শাহজাদি ও ফারহানকে সাময়িকভাবে আরভানের বাড়িতেই রাখা হয়। বাংলাদেশে বিয়ের প্রথম রাতটা শাহজাদি যেভাবে সারা রাত নিঘুম কাটিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন পরিবেশে এসে প্রথম রাতে তারা দুজনে কী করবে, তা ভেবে পাচ্ছিল না। ঘরের মাঝে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। ফারহান ঘরে ঢুকলেও বেশিক্ষণ থাকল না, এক বুক অস্বস্তি নিয়ে সে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে চলে গেল। শাহজাদি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

​গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে সে টের পেল, কেউ অত্যন্ত সযত্নে তার গায়ের ওপর কাঁথা টেনে দিচ্ছে। চোখ না খুলেই সে বুঝল এটা ফারহান। কাঁথাটা দিয়ে ফারহান আবারও নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অন্ধকারেই শাহজাদির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী হাসি ভেসে উঠল। আসার আগে আয়াত তাকে ফারহানের ব্যাপারে অনেক কথা বলেছিল; ছেলেটা যে বাইরে যতটা উদাসীন, ভেতরে ততটাই কেয়ারিং আর নরম মনের-সেটা শাহজাদি এখন একটু একটু করে বুঝতে পারছে। এখন তার মনে হচ্ছে, মানুষটা খুব একটা খারাপ না; এর সাথে অনায়াসে একটা সংসার করা যায়।

​তার এই ভাবনার মাঝেই ফারহান ঘরে ফিরে এল। সে লাইট অফ করে দিয়ে বিছানার অন্য পাশে এসে শুয়ে পড়ল। শাহজাদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল, একটা অদ্ভুত হাঁসফাঁস অনুভূতি হতে লাগল তার। ফারহান পাশে তার এমন অস্বস্তিকর উপস্থিতি টের পেয়ে অন্ধকারে চোখ রেখেই শান্ত সুরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি ঘুমাননি?”

​শাহজাদি একটু সময় চুপ থেকে বলল, “না।”

​ফারহান ছাদের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল, “আপনার কী মনে হয়? আমার সাথে আদেও সংসার করবেন, নাকি সম্পর্কটা এভাবেই…”

​তার কথা শেষ হওয়ার আগেই শাহজাদি সটান উত্তর দিল, “বিয়ে যখন করেছি, তখন সংসার কেন করব না?”

​ফারহান আর কিছু বলল না। অন্ধকারের বুকেই তার ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে ওপাশ ফিরে নিশ্চিন্তে চোখ বুজল।দেখতে দেখতে কয়েকটা মাস এভাবেই বেশ শান্তিতে আর টিকটাক কেটে গেল। কিন্তু নিয়তির খেলা তো অন্যরকম ছিল; যখন সব কিছু মাত্র গুছিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ঘটল সেই ভয়ানক অঘটনটা…

চলবে…