আরশি পর্ব-০৮

0
2813

#আরশি
#Part_08
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat

— মামা তুমি!

মামা ম্লান হেসে আমাকে হাতের ইশারায় তার কাছে আসার জন্য বললেন। তা দেখে আমি নিকাবটা খুলে তার দিকে অগ্রসর হই। তার সামনে আসতেই তিনি আমায় তার পাশে বলতে বললেন। আমি তার পাশে বসতেই তিনি আমার দিকে এক ধ্যানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেন,

— তুই ঠিক আছিস তো মা?

মামার কথাটা শুনেছি বুক চিঁরে কান্না বেড়িয়ে আসে। ঠোঁট উল্টে আসে।চোখ দুটি জ্বালা করে উঠে। বাবার পরে যদি কেউ আমায় বাবার মত করে ভালবেসেছে তা হচ্ছে মামা। যদি কখনো কোন কারণ বসত বাবা আমার পাশে থাকতে পারে নি বা আমার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারে নি, তখন তার জায়গায় আমি সর্বদা মামাকে আমার পাশে পেয়েছি। তিনি আমাকে বাবার ন্যায় কম স্নেহ করেন নি। বরং বেশি এই করেছেন। তার ছোঁয়ায় আমি সবসময়ই বাবার আদরটা উপলব্ধি করেছি। আর তা এখনো করছি। প্রায় নয় বছর পর তার স্নেহটা উপলব্ধি করতে পারছি। তিনি আমার মাথায় হাত রাখতেই মনে হলো আমার বাবা যেন আমার মাথায় হাত রেখেছেন। তার ছোঁয়ায় আমি ভরসা খুঁজে পেলাম। নিজের মনের মধ্যে থাকা কষ্টগুলো বেরিয়ে আসার পথ পেল। আমি এইবার ডুকরে কেঁদে উঠলাম। মনের কোনে জমিয়ে রাখা এতদিনের কান্নাগুলো প্লাবন হয়ে বেড়িয়ে আসে।

আমাকে এইভাবে কেঁদে উঠতে দেখতেই ভাবী হকচকিয়ে উঠে। গোল গোল চোখে আমাকে দেখতে থাকে। কি যেন বিরবির করতে থাকে। মামা পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরে বলে উঠেন,

— বউমা তুমি একটু আমার জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতো। বেশ খিদে পেয়েছে।

ভাবী মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। যাওয়ার সময় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আমাদেরকে দেখে নেয়। অতঃপর রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। আমি অস্ফুটস্বরে বলে উঠি,

— আমি ভালো নেই মামা। ভালো নেই।

মামা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

— তোর ভালো না থাকার কারণ আমি জানি কিন্তু তাও আমি আবার তোর মুখে সব শুরু থেকে শুনতে চাই। কি বলবি না আমায়?

আমি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাই। কান্নামিশ্রিত কন্ঠেই তাকে শুরু থেকে সব বলি। মামা আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। অতঃপর আমার মুখ পানে তাকিয়ে বলেন,

— এতটা বছর চুপ ছিলি কেন? কেন আমাদের আগে জানাস নি এইসব?

— আমি কেন জানাই নি তা তুমি ভালো করেই জানো। আমি কেমন তা তোমার জানা আছে। জানোই তো কার শিক্ষায় বড় হয়েছি আমি।

— হ্যাঁ জানি! নিজের মায়ের শিক্ষায় বড় হয়েছিস। তাই তো এই দূর্দশা। বাংলাদেশে এই এক সমস্যা আমরা কখনো নতুনত্বকে বরণ করে নিতে পারি না। যুগ যুগ থেকে চলে আসা সেই পুরোনো প্রথা ও রীতিনীতিকে আঁকড়ে ধরে রাখি আর সেইগুলোই নিজের সন্তানের উপর চাপিয়ে দেই। অতঃপর ওরা যত বড় সেই পুরনো দিনের মনমানসিকতা নিয়েই বড় হয়। যেমন, “মেয়েদের উঁচু গলায় কথা বলতে নেই।ছেলে বন্ধু থাকতে নেই।” যুগ যুগ ধরে এই কথাটাই মানুষ মনে প্রাণে বিশ্বাস করে আসছে আর এখনো করছে। সাথেই নিজের মেয়েদেরকেও এই একই শিক্ষায় বড় করছে।
এই যে তোর মা তোর মনে লোকভয় আর সমাজের তিক্ত বাস্তবতা দেখিয়ে দমিয়ে রেখেছিল সেটা এখনো রয়েই গিয়েছে। তোর মায়ের সেরা উক্তি ছিল, “বাঙালি মেয়েদের বিয়ে একবারই হয় আর স্বামীর সংসার ব্যতীত মেয়েদের থাকার দ্বিতীয় কোন স্থান নেই।” তুইও সেই উক্তিটি আঁকড়ে ধরে এতটা বছর সেইখানেই পড়ে ছিল। ওই যে ট্রিপিক্যাল বাঙ্গালী নারীদের মত।

আমি কথাটা শুনে মাথা নিচু করে ফেলি। কথাটা যে সত্য। মামা আমার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বলে,

— জানি বিয়ের পর তুই কারো সাথেই তেমন যোগাযোগ রাখতে পারিস নি। ফাহাদ তেমন রাখতে দেয় নি কিন্তু এট লিস্ট ডিভোর্সের পর তো আমায় একটা ফোন দিতে পারতি? দেশের বাইরে ছিলাম বলে তোর খবরটা আমার কাছে পৌঁছাতে এত সময় লাগে। তা একবার কি আমায় ফোন করে বলা যেত না? তোর মামা কি এতই ফেলনা নাকি?

— সরি মামা। আসলে নিজেকে কাউরো কাছে করুণার পাত্রী বানাতে চাই নি। সবকিছু থেকে দূরে থাকতে চাইছিলাম তাই নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে রেখেছিলাম।

— এত বছরে কি মামাকেও দূরে ঠেলে দিলি?

আমি করুণ চোখে মামার দিকে তাকাই। মামা আমার অবস্থা বুঝতে পেরে কথা ঘুরানোর জন্য বলে,

— বাইরে গিয়েছিলি বুঝি? তা এইসময় কোথা থেকে আসলি?

আমি শুকনো ঢোক গিলে বলি,

— ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম।

মামা আমার দিকে বিষ্ময়কর নয়নে তাকিয়ে বলে,

— ইন্টারভিউ কেন? তুই কি চাকরি করতে চাইছিস? কিন্তু কেন? আরিফ তো আছেই তাহলে?

— তা না নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে চাচ্ছি। নিজের খরচ নিজেই বহন করতে চাইছি। কতদিন আর অন্যের ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকবো বলো?

মামা আমার কথা শুনে সুরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। অতঃপর ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,

— মিথ্যা বলা তোর কাম্য নয় জানি। বাট এট লিস্ট যে সত্য দিয়ে আসল সত্যটা লুকাইতে চাইছিস তা তো ঠিক মত লুকা। দূরত্ব বেরেছে কিন্তু মানুষ তো আর বদলাই নি। সে যাই হোক বাকি যা কথা হবে আরিফ আসলেই হবে এই নিয়ে কোন কথা এখন হবে না।

আমি চট জলদি বলি,

— মামা তুমি যা বুঝছো আসলে তা না আ…

আমি কিছু বলার আগেই সে উঠে পড়ে। বেশ কিছু দূর গিয়ে বলে,

— কি রে নিজের মেয়ের সাথে কি পরিচয় করাবি না? নাকি একবারে আমাকে পর বানিয়ে দেওয়ার ধান্দায় আছিস?

আমি এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে বলি,

— চল পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

____________________________________________

ড্রয়িংরুমে বেশ থমথমে পরিবেশ। সামনের সোফায় ভাইয়া বসে আছে। পাশের সিঙ্গেল সোফাতেই মামা। মুখে তার গাম্ভীর্যপূর্ণ। আমি অপর পাশের সোফায় স্থির হয়ে বসে আছি। ভাবী নিচে বসে চায়ের পেয়ালায় চিনি মিশাচ্ছেন। আদ্র আর অহনা রুমে বসে ভিডিও গেম খেলছে। আমি আড়চোখে একবার মামার দিকে তাকাচ্ছি তো আরেকবার মামার দিকে। এর মাঝেই ভাইয়া বলে উঠে,

— কি যেন জরুরি কথা বলবে বলছিলে? বলো!

মামা স্থির চোখে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় সোজাসাপটা ভাবে জিজ্ঞেস করে বসে,

— তোর কি আরশি আর অহনাকে নিজের কাছে রাখতে কোন সমস্যা হচ্ছে? বোঝা মনে হচ্ছে তাদের?

#চলবে