#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৪_
বাড়িতে ঢুকেই ফাহিমকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যায় ফারহান। এক হাতে অফিস ব্যাগ, অন্য হাতে গাড়ির চাবি। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে মাত্র বাসায় ফিরেছে সে। কিন্তু ড্রয়িংরুমের মাঝখানে ছোট ভাইকে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে যায়।
ফাহিম মুখ ফুলিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথাটা নিচু, ঠোঁট উল্টানো। দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে অবিচার তার সাথেই হয়েছে। ফারহান কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো তার দিকে।
” তোর এই অবস্থা কেন? কান ধরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
ফাহিম করুণ মুখ করে তাকালো বড় ভাইয়ের দিকে। ” ” আম্মু পানিশমেন্ট দিছে।”
ফারহান ভ্রু কুঁচকে ফেলে।
” কেন?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
” তোমার আদরের ভাই কি করেছে জানো?”
ফারহান ঘুরে তাকায়। ফারিহা পারভিন এগিয়ে আসছেন তাদের দিকে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। মনে হচ্ছে, এখনও রাগ কমেনি তার। ফারহান হালকা অবাক স্বরে বললো,
” কি করেছে?”
ফারিহা পারভিন কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন,
” এতো বড় হয়ে গেছে, তাও বাদ’রামি যায় না।”
ফারহান বলে,
” কি হয়েছে? সেইটা তো বলবে।”
ফারিহা পারভিন এবার রাগী চোখে তাকালেন ফাহিমের দিকে।
” ছাদের উপর থেকে ইচ্ছে করে সেলিম ভাইয়ের উপর হিসু করে দিয়েছে।”
কথাটা শুনে ফারহানের চোখ কপালে উঠে যায়।
” কিহ!”
ফারহান অবিশ্বাস নিয়ে তাকায় ফাহিমের দিকে।ফাহিম এখনও কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এবার মুখটা আরও বেশি ফুলে গেছে। যেন তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। ফারহান কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে।
” তুই, তুই সিরিয়াসলি?”
ফাহিম এবার প্রতিবাদী গলায় বলে উঠলো,
” আমি ইচ্ছে করে করি নাই।”
ফারিহা পারভিন সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙালেন।
” চুপ! একদম চুপ! এখনও মিথ্যা কথা বলছো?”
ফাহিম কাঁচুমাচু মুখে বললো,
” আমি তো শুধু দেখতেছিলাম নিচে পড়ে কিনা।”
” ফাহিম!”
ফারিহা পারভিন এমনভাবে ডাক দিলেন যে ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে ফেললো। ফারহান হাসি সামলানোর আপ্রান চেষ্টায় আছে। অফিসের টেনশন, সারাদিনের ক্লান্তি, প্রভার ভেজা চোখ, সবকিছু মিলিয়ে মাথাটা ভার হয়ে ছিলো। কিন্তু, এই মুহূর্তে ছোট ভাইয়ের কাণ্ডকারখানা দেখে হালকা লাগছে।ফারিহা পারভিন বিরক্ত চোখে তাকালেন বড় ছেলের দিকে।
” তোমার ভাইয়ের কারণে আজ আমি মানুষের সামনে লজ্জায় শেষ।”
ফারহান কোনরকমে বলে ওঠে,
” আচ্ছা আচ্ছা, সরি! কিন্তু, সেলিম আঙ্কেল তখন কি করছিলো?”
ফাহিম এবার মুখ টিপে হাসলো।
” চিল্লাইতেছিলো।”
ফারহান হেসে ফেলে। ফারিহা পারভিন হতাশ গলায় বললেন,
” এই দুই ভাই মিলে একদিন আমাকে পাগল বানাবে।”
তারপর ফাহিমের দিকে তাকিয়ে ফারিহা পারভিন বললেন,
” আর দশ মিনিট এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবি। তারপর রুমে গিয়ে পড়তে বসবি।”
ফাহিম অসহায় মুখে এবার ফারহানের দিকে তাকায়।
” ভাইয়া! একটু বলে দাও না।”
ফারহান নাটকীয় ভঙ্গিতে গলা খাঁকারি দেয়।
” দেখ, অপরাধ অনেক বড়। আইন সবার জন্য সমান।”
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে মুখ কালো করে ফেললো।
” বেইমান!”
ফারহান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। হেসে উঠে ছোট ভাইয়ের মাথায় আলতো চাপড় দিলো। ফারহান হালকা কেশে মায়ের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে এখনও চাপা হাসির রেখা লেগে আছে। অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো,
” আচ্ছা, আম্মু! এইবারের মতো ছেড়ে দাও। ছোট মানুষ, বুঝতে পারেনি।”
ফারিহা পারভিন সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকালেন।
” ও ছোট মানুষ? নাইনে উঠে গেছে, ও ছোট হয় কিভাবে? এই তোমার আস্কারা পেয়ে পেয়ে দিন দিন আস্ত বদ তৈরি হচ্ছে। ভাইকে একটু বোঝাও। দুষ্টু তো তুমিও ছিলে, কিন্তু ওর মতো এরকম দুষ্টু তো না। সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারছে আমাকে।”
ফাহিম মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বড় ভাই তার পক্ষ নিয়েছে দেখে চোখেমুখে একটু স্বস্তির আভা ফুটে উঠেছে। ফারহান এবার মায়ের দিকে শান্ত গলায় বললো,
” আচ্ছা, বুঝিয়ে বলবো।”
ফারিহা পারভিন বিরক্ত মুখে আর কিছু না বলে গজগজ করতে করতে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। মা চোখের আড়াল হতেই ফারহান এগিয়ে এসে ফাহিমের কান থেকে হাত সরিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ফাহিম এমন ভঙ্গিতে তার উপর ঢলে পড়লো যেন বহু বছরের অত্যাচার সহ্য করে এসেছে। ফারহান হেসে ফেলে। ছোট ভাইটাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে মাথায় আলতো টোকা দিলো। তারপর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
” বড় হয়েছিস না? এইসব বাদরামি ছাড়তে পারিস না?”
ফাহিম এবার একটু সরে দাঁড়ায়। মুখটা এখনও গম্ভীর।
” আমার একটুও দোষ নাই, ভাইয়া! এইটা সেলিম চাচার পাওনা ছিলো।”
ফারহান ভ্রু তুলে তাকায়।
” কি করেছে সে?”
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগের সুরে বললো,
” গতকাল আম্মুর কাছে আমার নামে বিচার দিছে। তাই আমি পানিশমেন্ট দিছি।”
” কি এমন বিচার দিছে যে তুই এরকম করলি?”
ফাহিম বিরক্ত মুখে বলে ওঠে,
” আম্মু দুপুরে ঘুমাইলে পাশের মাঠে খেলতে গেছিলাম। আম্মু উঠার আগেই চলে আসছিলাম। কিন্তু, সেলিম চাচা আম্মুকে বলে দিছে।”
কথাটা বলেই ফাহিম ঠোঁট উল্টে ফেললো। যেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্বাস’ঘা’ত’কতার শিকার সে নিজেই। ফারহান আর নিজেকে সামলাতে পারে না। ফিক করে হেসে উঠলো। ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুঁচকে বললো,
” তুমি হাসতেছো কেন?”
ফারহান হাসতে হাসতেই বলে,
” তাই বলে তুই ছাদ থেকে হিসু, এইরকম প্রতিশোধ নিবি?”
” অন্যায় করলে শাস্তি পেতেই হবে।”
কথাটা এমন ভাব নিয়ে বললো যে ফারহান আবারও হেসে ফেললো। বহুদিন পর এভাবে প্রাণ খুলে হাসছে সে। ছোট ভাইটার দুষ্টুমিগুলো মাঝে মাঝে অসহ্য লাগলেও, এই বাড়িটার সবচেয়ে জীবন্ত অংশ যে এই ছেলেটাই, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফারহান ছোট ভাইয়ের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে হালকা হাসে। তারপর বলে ওঠে,
” তাও, সেলিম চাচা কিন্তু তার ডিউটি পালন করেছে।”
ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেললো।
” ডিউটি আবার কি? কেমন ডিউটি এইটা?”
ফারহান শান্ত স্বরে বললো,
” আম্মু তোকে কতোবার বলেছে, পাড়ার ওই লোকাল ছেলেগুলোর সাথে মিশতে না। ওরা ভালো না। সারাদিন মারামারি, গালাগালি করে বেড়ায়। তুই ওদের সাথে ঘুরলে একসময় তোরও অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে।”
ফাহিম ঠোঁট ফুলিয়ে নিচের দিকে তাকায়। তারপর ছোট্ট গলায় বলে ওঠে,
” আমি তো শুধু একটু খেলতে যাই।”
ছোট ভাইটার কণ্ঠে এমন অসহায় ভাব ছিল যে ফারহানের মায়া লেগে গেল। সে আলতো করে ফাহিমের গাল টিপে দেয়।
” আচ্ছা, ঠিক আছে! তুই খেলবি, সমস্যা নাই। আমি তোকে ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দিবো। ওখানে খেলবি, নতুন ফ্রেন্ডও হবে। কিন্তু, এইসব ছেলেপেলের সাথে আর মিশবি না। ঠিক আছে?”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই ফাহিমের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। চোখদুটো চকচক করে উঠেছে উত্তেজনায়।
” সত্যি ভাইয়া?”
ফারহান মুচকি হেসে মাথা নাড়ে।
” হুম! সত্যি।”
ফাহিম আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠলো।
” তুমি বেস্ট বেস্ট ভাইয়া!”
বলেই হঠাৎ দুই হাতে ফারহানের মুখটা নিজের দিকে টেনে নামালো। তারপর টপাটপ কয়েকটা চুমু বসিয়ে দিলো গালে। পুরো ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটলো যে ফারহান কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। তারপর হেসে ফেলে।
” পাগল একটা।”
হাসতে হাসতেই সে ছোট ভাইটার কপালে আলতো করে একটা চুমু দোয়। ফাহিম তখনও খুশিতে গদগদ হয়ে আছে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখবরটা সে এইমাত্র পেয়েছে। হঠাৎ কি মনে হতেই একটু ইতস্তত করে বললো,
” ভাইয়া!”
” হুম!”
” তোমার ফোনটা একটু দিবা? একটু গেম খেলবো।”
ফারহান পকেট থেকে ফোন বের করলো। ফোনটা হাতে দিতে দিতেই বললো,
” মাত্র এক ঘণ্টা। তারপর পড়তে বসবি।”
” ওকে, ভাইয়া!”
ফোন হাতে পেয়েই ফাহিম দ্রুত সোফার উপর গিয়ে বসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো মনোযোগ চলে গেলো গেমে। মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেমেছে সে। ফারহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছোট ভাইটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠোঁটের কোণে কোমল একটা হাসি ফুটে উঠে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায় নিজের রুমের দিকে।
…
বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় কলিং বেলের আওয়াজ ভেসে আসতেই সবাই কিছুটা অবাক হয়ে যায়। বাইরে তখন ঝড়ো হাওয়ার সাথে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। এমন আবহাওয়ায় সাধারণত কেউ বাসা থেকে বের হয় না। তাই হঠাৎ করে কলিং বেলের শব্দে সবাই একবার করে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। একটু আগেই ইমন অফিস থেকে ফিরেছে। ভেজা চুলে এখনও পানির ফোঁটা লেগে আছে। ফ্রেশ হয়ে এসে এখন ড্রইংরুমের সোফায় বসে ছোট্ট মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। মেয়েটা বাবার শার্টের বোতাম নিয়ে খেলছে মগ্ন হয়ে। আর ইমন ক্লান্ত চোখে ওর দুষ্টুমিগুলো দেখছে।
ড্রইংরুমের মাঝখানে রাখা কাচের টেবিলের উপর ধোঁয়া ওঠা বেগুনি, আলুর চপ আর পেয়াজু সাজানো। বৃষ্টির দিনে রহিমা ইয়াসমিন নিজ হাতে বানিয়েছেন সব। পিয়াস তো খেয়েই চলেছে একের পর এক। ইকবাল শিকদার চা খেতে খেতে পেয়াজু মুখে দিচ্ছেন। রহিমা ইয়াসমিনও পাশে বসে আছেন। অরশি চুপচাপ সোফার এক কোণে বসে আছে। আর প্রভা নিজের রুমেই আছে। আজকাল খুব একটা বের হয় না সে। প্রয়োজন ছাড়া কারও সাথে কথাও বলে না। আবারও কলিং বেল বেজে উঠলো। অরশি ভ্রু কুঁচকে দরজার দিকে তাকায়।
” এই ঝড়ের মধ্যে আবার কে এলো?”
অরশি উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ দুজনকে দেখে সে স্পষ্ট অবাক হয়ে যায়।
” আরে প্রিতি তুমি?”
দরজার বাইরে ভেজা ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে প্রিতি। পাশে ছোট্ট রুমি স্কুলব্যাগের মতো একটা ছোট ব্যাগ বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার গোলাপি ফ্রকটা হালকা ভিজে গেছে। অরশি বিস্মিত স্বরে বললো,
” কই মা তো কিছু বললো না।”
প্রিতি ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বললো,
” আমি কাউকে জানিয়ে আসিনি, ভাবি!”
অরশি আর কিছু না বলে দ্রুত সরে দাঁড়ায়।
” এসো এসো, ভেতরে আসো। রুমি! কেমন আছো, মামনি?”
রুমি মিষ্টি করে হেসে বললো,
” ভালো, মামি! তুমি কেমন আছো?”
” ভালো আছি, মামনি! এসো ভেতরে এসো।”
প্রিতি নিজের লাগেজটা ভেতরে টেনে আনলো। তারপর ঘরে ঢুকলো। রুমি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে ইমনের পাশে দাঁড়ায়।
” মামা!”
ইমন তাকিয়ে ছোট্ট মেয়েটাকে দেখেই হেসে ফেলে।
” আরে আমার রুমি এসেছে!”
সে হাত বাড়াতেই রুমি দৌড়ে গিয়ে ইমনের কোলে উঠে বসলো। ড্রইংরুমে বসে থাকা সবাই প্রিতিকে দেখে অবাক হলেও চোখেমুখে খুশির ছাপ ফুটে উঠে।ড্রইংরুমে সবার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করার পর প্রিতির মনটা বারবার অস্থির হয়ে উঠছে। ঘরের ভেতর সবাই কথা বললেও প্রিতির মন পড়ে আছে অন্য কোথাও, প্রভার কাছে। এই ঝামেলার পর বোনটার সঙ্গে আর সরাসরি দেখা হয়নি তার। শুধু মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। তাও খুব বেশি না। কথার মাঝখানেও কেমন একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে থাকতো দুই জনেরই। কতোবার আসতে চেয়েছে প্রিতি। কিন্তু, সংসার কি এতো সহজ? নিজের সংসার, সন্তান, দায়িত্ব, সব মিলিয়ে চাইলেই তো আর সবকিছু ফেলে ছুটে আসা যায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে প্রভার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আলতো করে দরজায় টোকা দেয় সে। ভেতর থেকে শান্ত, ক্লান্ত একটা কণ্ঠ ভেসে আসে,
” ভেতরে এসো।”
প্রিতির বুকটা কেমন করে ওঠে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ গিয়ে আটকে যায় প্রভার উপর। মেয়েটাকে আরও শুকনো লাগছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। তবুও প্রিতিকে দেখামাত্রই প্রভার চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে তাড়াতাড়ি উঠে এসে প্রিতিকে জড়িয়ে ধরে।
” আপা! তুই এসেছিস।”
কণ্ঠটা কেঁপে ওঠে প্রভার। প্রিতির চোখও মুহূর্তেই ছলছল করে ওঠে। সে প্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কতোদিন পর এভাবে বোনটাকে কাছে পেলো সে।
প্রভার চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে। প্রিতিও আর নিজেকে সামলাতে পারে না। কিছুক্ষণ পর প্রভা নিজেই প্রিতির হাত ধরে তাকে বিছানায় বসায়। দুই জনেই কিছু সময় চুপচাপ বসে থাকে। নীরবতার মাঝেও কতো কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিতি নিচের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,
” আপাকে মাফ করে দিস, বোন! আপা এতোদিনে আসতে পারেনি।”
প্রভা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে,
” এভাবে বলো না, আপা! তুমি আমাকে যে সাপোর্টটা দিয়েছো, এখনও দিচ্ছো, সেখানে সরাসরি এসে দেখার ফর্মালিটিস না করলেও চলবে।”
প্রিতি হালকা করে হাসার চেষ্টা করে। তারপর আলতো করে প্রভার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর প্রিতি ধীরে ধীরে বললো,
” হ্যারে, গতকাল যে ইন্টারভিউ দিতে গেলি, তোর বন্ধু ফারহান মালিক, কোনো ম্যাসেজ এসেছিলো?”
প্রভার চোখে হালকা এক ঝিলিক ফুটে উঠে।অনেকদিন পর যেন ভালো কোনো খবরের কথা বলতে পারবে সে। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি এনে বলে ওঠে,
” হ্যাঁ! গতকাল রাতেই ম্যাসেজ এসেছে। আগামীকাল জয়েনিং ডেট দিয়েছে।”
প্রিতির মুখেও স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠে।
” তাই নাকি? স্যালারি কতো দিচ্ছে?”
” আপাততো ত্রিশ হাজার। পরে পদোন্নতি হলে আরও বাড়বে। আর, আরও কিছু ইনকামের সুযোগও আছে মাঝে।”
” যাক, ভালোই তো!”
প্রভা নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলে।
” ভালো মানে অনেক ভালো, আপা! এটা আমার জন্য অনেক কিছু। আমি তো সত্যিই ভেঙে যাচ্ছিলাম। আল্লাহ, ফারহানের মাধ্যমে একটা গতি করে দিয়েছে আমার।”
কথাগুলো বলতে বলতেই তার গলাটা ভারী হয়ে আসে। গত কয়েক দিনে কতোটা অসহায় সময় পার করেছে, সেটা হয়তো কাউকে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব না। চারপাশের মানুষ, সমাজের কথা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে নিজেকে প্রায় হারিয়েই ফেলছিল সে। প্রিতি আলতো করে প্রভার হাত চেপে ধরে।
” সবাইকে জানিয়েছিস?”
প্রভা মাথা নাড়িয়ে বললো,
” না! এখনো জানানো হয়নি। আজ বলবো সবাইকে।”
প্রিতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করলো,
” শরীর কেমন এখন?”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা বিছানার হেডবোর্ডে ঠেকালো।
” বড্ড গা গোলায়। খাবারও ঠিকমতো খেতে পারছি না। মুখে নিতে গেলেই বমি আসে।”
” এই অবস্থায় অফিস করবি কী করে?”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
” করতে হবে, আপা! আমার তো আর কোনো অপশন নেই।”
কথাটা শুনে প্রিতির বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ছোট বেলা থেকে আদরে বড় হওয়া মেয়েটা আজ কতো কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। জীবন মানুষকে কতো দ্রুত বদলে দেয়। এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রিতি আবার প্রভাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলে ওঠে,
” সব ঠিক হয়ে যাবে।”
…
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে, তবুও বৃষ্টির দম কমেনি। টুপটাপ শব্দে চারপাশ ভরে আছে। মাঝেমধ্যে ঝোড়ো হাওয়া এসে বারান্দার গ্রিল ভিজিয়ে দিচ্ছে। আকাশে বিদ্যুতের ক্ষীণ ঝলক দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। রাজ নিজের রুমে বিছানার উপর হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনে খোলা ল্যাপটপ। ঠিক তখনই দরজাটা আস্তে করে খুলে ভেতরে ঢুকলেন মারফুয়া বেগম। তিনি এগিয়ে এসে বিছানার একপাশে বসে পড়লেন। রাজ একবার চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকায়। তারপর আবার স্ক্রিনের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো।
মারফুয়া বেগম কিছুক্ষণ চুপচাপ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিভাবে কথাটা শুরু করবেন বুঝতে পারছিলেন না। অবশেষে ধীর গলায় বললেন,
” তুই কি খুব বেশি বিজি? একটু কথা ছিলো।”
রাজ চোখ না তুলেই শান্ত স্বরে বললো,
” বলো, সমস্যা নেই।”
মারফুয়া বেগমের বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে অবশেষে বললেন,
” তুই কি সত্যিই প্রভাকে ডিভোর্স দিবি?”
কথাটা শুনে রাজের আঙুল থেমে যায়। কিবোর্ডের উপর স্থির হয়ে থাকে হাত দুটো। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে ল্যাপটপটা পাশে সরিয়ে রাখে।তারপর সোজা হয়ে বসে মায়ের দিকে তাকায়। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
” কি বলতে চাচ্ছো তুমি?”
মারফুয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর নিচু গলায় বললেন,
” অনন্যাকে আমার পছন্দ না। আমি আমার মতো করে খবর নিয়েছি। মেয়েটা ভালো না।”
কথাটা শেষ হতেই রাজের মুখ শক্ত হয়ে যায়। চোখদুটো কেমন রাগে গাঢ় হয়ে ওঠে।
” মা, প্লিজ! অনন্যাকে নিয়ে আমি কোনো বাজে কথা শুনতে চাই না। আর তুমিও বলবে না।”
মারফুয়া বেগম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।রাজ এবার আরও দৃঢ় গলায় বলে উঠলো,
” আমি অনন্যাকেই বিয়ে করবো। আর প্রভাকে খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্স দিয়ে দিবো। সামনের সপ্তাহে অনন্যার সাথে আমার এনগেজমেন্ট। সেইভাবে প্রস্তুতি নাও।”
কথাগুলো এতটাই নির্দয় ভঙ্গিতে বললো যে মারফুয়া বেগমের বুকটা হুহু করে উঠলো। নিজের ছেলেকে আজ কেমন অচেনা লাগছে তার। এই ছেলেটাই একসময় ছোট ছোট বিষয়ে তার মতামত ছাড়া কিছু ভাবতো না। আর আজ, নিজের অন্যায় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছে, যেন কারও অনুভূতির কোনো মূল্যই নেই। রাজ আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকলো না। বিছানা থেকে ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। তারপর সোজা বারান্দার দিকে চলে যায়।
রুমের ভেতরে বসে রইলেন মারফুয়া বেগম। নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুকের ভেতর থেকে। চোখেমুখে ক্লান্ত অসহায়তা স্পষ্ট। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে থেকে তিনি আস্তে করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ভারী পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

