Home "ধারাবাহিক গল্প এক ফালি রোদ্দুর এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-০৭

এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-০৭

0
732

#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৭_

” আম্মু ভাইয়া বাবা হবে।”

ড্রইংরুমে শব্দটা পড়তেই ফারহান আর ফারিহা পারভিন থমকে যায়। ফারহান, ফারিহা পারভিন আর ফাহিম, তিনজনই তখন বসার ঘরে ছিল। টিভিতে কী চলছে, সেটা আর কারও মনেই নেই। ফাহিম সোফায় আধশোয়া হয়ে রিমোট হাতে নিয়ে ছিল, হঠাৎ করেই এমন একটা কথা বলে ফেলেছে, যেন এটা কোনো সাধারণ খবর। ফারিহা পারভিন কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
” মানে?”

ফাহিম এবার একটু সোজা হয়ে বসে।
” হ্যাঁ আম্মু, ভাইয়া বাবা হবে।”

ফারহান মাথা ঘুরিয়ে ফাহিমের দিকে তাকায়। চোখ দুটো মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
” এক থাপ্পড় দিয়ে তোর চোয়াল ভেঙে দিবো আমি। উল্টো পাল্টা কথা বলছিস কেন?”

ফাহিম ফোঁস করে উঠে।
” আমি উল্টাপাল্টা বলছি? আম্মু, আমি সেইদিন নিজে দেখেছি। ভাইয়া মাদারস হরলিকস কিনছে। প্রেগন্যান্সির সময় কী কী করা প্রয়োজন সেইসব ভিডিও দেখছে।”

ফারহানের মুখে প্রথমে একটা অস্বস্তি, তারপর দ্রুত নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা। কিন্তু ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ফারিহা পারভিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফারহান হালকা কেঁপে উঠে এমন দৃষ্টিতে। ফাহিমের কথার পর ফারিহা পারভিন কিছু বলার আগেই ফারহান দ্রুত গলা তুলে ফেলে।
” আম্মু! এই গবেটের কথা শুনে তুমি কোনো কিছু ভাবনায় এনো না।”

ফাহিম সঙ্গে সঙ্গে সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠে।
” গবেট মানে কী?”

ফারহান একবারও তার দিকে না তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলে,
” তুই চুপ থাক।”

তারপর ফারিহা পারভিনের দিকে ঘুরে তাকায় ফারহান। গলায় জোর এনে যোগ করে,
” আম্মু! মাদারস হরলিকস, এইসব আমার এক বান্ধবীর জন্য। সে প্রেগন্যান্ট, তাই। নাথিং এলস।”

ফাহিম চোখ ছোট করে তাকায়।
” বান্ধবীর জন্য তুমি ফলমূল নিয়ে যাবা, মাদারস হরলিকস কেন নিবা? আর ভিডিওই বা কেন দেখবা?”

ফারহানের মুখ শক্ত হয়ে যায়।
” তোর জবান অফ কর। নাহলে কিন্তু তোকে আমি মে’রে ফেলবো।”

ফাহিম কাঁধ ঝাঁকায়, একেবারে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সোফায় আবার হেলান দেয়। তার চোখে স্পষ্ট ডোন্ট কেয়ার ভাব। ফারহান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে ভাবে, এই ছেলেটা এতোটা পাকনা কেন? ফারিহা পারভিন এবার কণ্ঠে কঠোরতা আনে।
” তোমরা চুপ করো। কী শুরু করেছো তোমরা?ফারহান! কাহিনি কী?”

ফারহান এবার মায়ের দিকে তাকায়। ফাহিমের দিকে একবার চোখ গরম করে তাকালেও ছেলেটা নির্বিকার। যেন কিছুই যায় আসে না। সে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে, গলায় কিছুটা নরমতা এনে বলে,
” সত্যি বলছি, আম্মু! এসব আমার বান্ধবীর জন্য। তোমার কি প্রভার কথা মনে আছে?”

” প্রভা?”

” হ্যাঁ আম্মু, প্রভা! আমার কলেজ লাইফের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী।”

ফারিহা ধীরে মাথা নাড়ে।
” হ্যাঁ, মনে আছে।”

” এইসব কিছুই তার জন্য। এখনই আমি তোমাকে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবো না। সময় আসলে বলবো। কিন্তু ব্যাপারটা ওটা না, যেটা এই টিউবলাইট ভাবছে।”

শেষ কথাটা ফাহিমের দিকে ইঙ্গিত করে বলতেই ফাহিম ঠোঁট বাঁকায়, কিন্তু কিছু বলে না। ফারিহা পারভিন আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এতো বছর ধরে ছেলেটাকে দেখে তিনি জানেন, সময় হলে ফারহান নিজেই সব বলবে।

নিজের রুম থেকে বের হয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে ড্রইংরুমের দিকে যেতেই অনন্যার মুখোমুখি হতে হলো মারফুয়া বেগমের। অনন্যাকে দেখা মাত্রই তাঁর দৃষ্টি পা থেকে মাথা পর্যন্ত বুলিয়ে গেল। আজ অনন্যার পরনে একটি হালকা রঙের শার্ট আর নীল জিন্স। লম্বা চুলগুলো খোলা, কাঁধ ছুঁয়ে পিঠে নেমে এসেছে। এইসব দেখে মারফুয়া বেগমের মুখমণ্ডল মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠে। ঠোঁট বাঁকিয়ে এমনভাবে তাকালেন, যেন চোখের সামনে অত্যন্ত অপছন্দের কিছু দেখতে পেয়েছেন।
” তুমি একটা বাড়ির বউ, তাই না?”

হঠাৎ প্রশ্ন শুনে অনন্যা থমকে দাঁড়ায়। ভ্রু সামান্য কুঁচকে যায় তার। মারফুয়া বেগম আবার বললেন,
” তাও যে সে বাড়ির বউ নও, রহমান বাড়ির বউ। সেই বাড়ির বউ হয়ে এইসব কী পোশাক পরে বাইরে যাও তুমি? কোনো লজ্জা শরম বলতে কিছু নেই?”

অনন্যার চোখ দুটো মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে। সে সরাসরি শাশুড়ির চোখে চোখ রেখে দাঁড়ায়।
” আমি এইসব পোশাক পরেই অভ্যস্ত, শাশুড়ি আম্মা! আপনিও চোখের দেখায় অভ্যস্ত হতে শিখুন।”

মারফুয়া বেগমের মুখ আরও শক্ত হয়ে যায়।
” আদব লেহাজের বড্ড অভাব তোমার। বাবা মা কি এতোটুকু শিক্ষাও ঠিকমতো দেয়নি?”

কথাটা শুনে অনন্যার মুখের রঙ বদলে যায়। এক পা এগিয়ে এসে সে কড়া গলায় বললো,
” আম্মা! ভাষাকে সংযত করুন।”

দুজন নারী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, কারও চোখে এক বিন্দু নরমতা নেই। অনন্যার কথা শুনে মারফুয়া বেগমের ঠোঁটের কোণে একটি ক্রুর হাসি ফুটে উঠে। সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল, অবজ্ঞা ছিল, আর ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাপ।তিনি ধীরে ধীরে অনন্যার দিকে এক পা এগিয়ে এলেন।
” কাকে চোখ রাঙাচ্ছো তুমি? কাকে ভাষা সংযত করতে বলছো? আমাকে?”

কণ্ঠস্বরটা খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু তার ভেতরে এমন এক কঠোরতা ছিল, যা শুনে সাধারণ মানুষ সহজেই পিছিয়ে যেতো। তবে অনন্যা পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ নয়। মারফুয়া বেগম আবার বললেন,
” ভুলে যেও না, আমি এই বাড়ির কর্তী। আর আমার স্বামী এখনও জীবিত। আর হ্যাঁ, তোমার স্বামী কিন্তু আমারই গর্ভে ধরা সন্তান। তাই তার প্রতি আমার সফট কর্নার আছে। কিন্তু, তোমার প্রতি আমার এক রত্তি কোমলতাও নেই, অনন্যা! তাই তোমাকে আমি এক চুল পরিমাণও ছেড়ে কথা বলবো না। তোমার জন্য আমার বাড়ির সবচেয়ে বড় শান্তি, আমার মেয়ের মতো বউমাকে এই সংসার ছাড়তে হয়েছে। অবশ্য আমার ছেলে নিজেও দোষী। সে কী হারিয়েছে, একদিন ঠিকই বুঝবে। সে পস্তাবে, আমি জানি। শুধু তার সেই করুণ সময়ে মা হিসেবে তাকে আগলে নেওয়ার জন্যই তোমার এইসব রঙ্গলীলা সহ্য করে যাচ্ছি।”

অনন্যার মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠে। মারফুয়া বেগম থামলেন না।
” তুমি কোন দিক দিয়ে ভালো, বলতে পারো? আমি তো তোমার মাঝে কোনো ভালো দেখি না। একটা মেয়ের সংসার ভেঙেছো তুমি। তুমি লোভী। কেন আমার ছেলের গলায় ঝুলে আছো, সেটা আমি বুঝি না, এমনটা ভেবো না। সবই বুঝি। খুব ভালো করেই বুঝি। কিন্তু, তোমার এইসব আমি সফল হতে দেবো না।”

কথাগুলো শুনে কয়েক মুহূর্ত নীরব দাঁড়িয়ে রইল অনন্যা। তারপরই তার ঠোঁটে একটি ক্রুর হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসি দেখে মারফুয়া বেগমের ভ্রু কুঁচকে যায়। অনন্যা ধীরে ধীরে বলে,
” আচ্ছা তাই? আপনি আসলেই অনেক চালাক মহিলা। আপনার মতো নারীর গর্ভে রাজের মতো বোকা ছেলে জন্ম নিলো কী করে, সেটাই তো আমার কাছে অবাক করার বিষয়। তাহলে আপনি কী করবেন? আপনার ছেলের সামনে সবটা প্রমাণ করবেন? করবেন কীভাবে?”

মারফুয়া বেগমের চোখ মুহূর্তেই জ্বলে উঠে।
” সুযোগ ঠিকই চলে আসবে। বারো ঘাটের পানি খাওয়া মেয়ে তুমি। সংসারের এক পুরুষ দিয়ে তোমার পোষাবে না। তোমার আসল রূপ কি কোনোদিন সামনে আসবে না বলে মনে করো?”

অনন্যার হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।
” আসবে বুঝি?”

” অবশ্যই আসবে। আল্লাহ ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। মানুষের কর্মের হিসাব একদিন না একদিন সামনে আসেই।”

কথা শেষ করে মারফুয়া বেগম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ঘুরে সোজা নিজের কক্ষের দিকে হাঁটা দিলেন। অনন্যা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতর রাগ আর অপমানের আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছে। হাত দুটো অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে। মারফুয়া বেগম দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পরও সে কয়েক সেকেন্ড সেই দিকেই তাকিয়ে রইলো। চোখদুটো রাগে লাল হয়ে আছে। অবশেষে গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নেয় সে। তারপর ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায়।

মাজার কাছে হাত রেখে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে প্রভা। আজ সকাল থেকেই তলপেটের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছিলো সে। প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এমন ছোটখাটো অস্বস্তি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় বলেই ভেবেছিলো। তাই কাউকে কিছু জানায়নি। কিন্তু, বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। একটু হাঁটাহাঁটি করলে হয়তো কমবে, এই আশায় বিকেলে বাড়ির ভেতরেই কিছুক্ষণ হেঁটেছিলো সে। নয় মাসের ভারী পেট নিয়ে হাঁটাটা সহজ ছিলো না। তবুও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, তাতে কোনো লাভ হয়নি। বরং, এখন ব্যথাটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ঘরের একপাশে স্টাডি টেবিলের সামনে বসে আছে ফারহান। সন্ধ্যার একটু পরই অফিস থেকে সরাসরি এখানে এসেছে সে। সঙ্গে করে এনেছে প্রভার প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ। টেবিলের ওপর প্রেসক্রিপশন ছড়িয়ে রাখা। সেগুলো দেখে দেখে ওষুধগুলো আলাদা করে একটি বক্সে গুছিয়ে রাখছে সে। পাশেই ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। ফারহানের চোখেমুখে সারাদিনের ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও প্রতিদিনের মতোই প্রভার ওষুধ, রিপোর্ট আর ডাক্তারের নির্দেশনাগুলো সে নিজেই মিলিয়ে দেখে নিচ্ছে।

বিছানায় বসে থাকা প্রভা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। হঠাৎ করেই তলপেটের ভেতর তীব্র একটা মোচড় অনুভব করে সে। প্রভা কেঁপে উঠলো। ব্যথাটা এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি। সে দুই হাতের একটি দিয়ে বিছানার চাদর শক্ত করে চেপে ধরলো।অন্য হাতটা গিয়ে থামে তার ফুলে থাকা পেটের ওপর।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন পেটের ভেতরটা শক্ত হয়ে আসছে। চোখের কোণে পানি জমে উঠলো।সে ঠোঁট কামড়ে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করলো। কিন্তু, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই চেষ্টা ভেঙে গেল। এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগে। প্রভা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায়। ফারহান তখনও প্রেসক্রিপশনের দিকে মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা মিলিয়ে দেখছে। প্রভার বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা এক আতঙ্ক চেপে বসে। কাঁপা কাঁপা গলায় সে ডাকে,
” ফারহান!”

শব্দটা খুব জোরে ছিলো না। তবুও সেই ভাঙা স্বর কানে আসতেই ফারহানের হাত থেমে যায়। সে চট করে মুখ তুলে তাকায়। পরের মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে যায়। প্রভার চোখ দিয়ে টলটল করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মুখটা যন্ত্রণায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।এক হাত দিয়ে সে তার নয় মাসের ফুলে থাকা পেট চেপে ধরে আছে, আর অন্য হাতটা বিছানার চাদর মুঠো করে ধরে রেখেছে। ফারহানের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।

ফারহানের হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করে না। চেয়ারটা ঠেলে উঠে এক প্রকার দৌড়ে চলে এলো প্রভার কাছে। প্রভার মুখটা যন্ত্রণায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কপাল জুড়ে ঘাম জমেছে। এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে আছে, আর অন্য হাতটা বিছানার চাদর শক্ত করে মুঠো করে রেখেছে। চোখ বেয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। ফারহানের বুকের ভেতরটা করেই কেঁপে উঠলো।
” প্রভা! কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”

কাঁপতে কাঁপতে শ্বাস নিলো প্রভা। তারপর ভাঙা গলায় বললো,
” আমার, আমার প্রচণ্ড পেটে ব্যথা করছে। সহ্য করতে পারতেছি না আমি, ফারহান!”

কথা শেষ করতেই আবারও তীব্র একটা ব্যথার ঢেউ এসে আঘাত করলো তাকে। প্রভা চিৎকার করে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললো। ফারহান ভয়ে চমকে উঠে। এতোদিন ধরে প্রেগন্যান্সির প্রতিটা ধাপ নিয়ে পড়াশোনা করেছে সে, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে, প্রয়োজনীয় সবকিছু জেনেছে। তাই রহস্য বুঝতে তার বেশি সময় লাগলো না। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মাঝের রুমে চলে এলো। সেখানে অরশি সোফার উপর বসে পিয়াসকে পড়াচ্ছে। ইকবাল শিকদার আর রহিমা ইয়াসমিনও কাছেই বসে টুকটাক কথা বলছিলেন। হঠাৎ ফারহানকে এমন অস্থির অবস্থায় দেখে সবাই চমকে উঠলেন। ফারহান প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
” আঙ্কেল! আন্টি! প্রভার খুব পেটে ব্যথা করছে।”

কথাটা শুনেই সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। রহিমা ইয়াসমিনের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল।
” কী বলছো?”

” অনেক বেশি ব্যথা করছে। কান্না করছে।”

আর কিছু শোনার অপেক্ষা করলেন না তিনি। দ্রুত পায়ে প্রভার রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকিরাও তার পিছু পিছু গেলেন। ঘরে ঢুকেই রহিমা ইয়াসমিন এক নজর মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর অভিজ্ঞ চোখে সবকিছু বুঝে নিতে খুব বেশি সময় লাগলো না। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন,
” ওর তো লেবার পেইন উঠেছে। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।”

কথাটা শুনে ঘরের ভেতর যেন মুহূর্তেই তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে গেলো। অরশি দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর ব্যাগ গুছিয়ে দেয়। ইকবাল শিকদার ফোন হাতে নিয়ে হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেন। আর ফারহান? সে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে পারছে না। প্রভার কষ্টে ছটফট করা মুখটা দেখেই তার বুকের ভেতর ভয় জমে উঠে। একটাও কথা না বলে সে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর খুব সাবধানে এক হাত প্রভার হাঁটুর নিচে আর আরেক হাত পিঠের নিচে দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো। হঠাৎ শরীর ভেসে উঠতেই প্রভা কষ্টে চোখ মেলে তাকায়। ব্যথার মাঝেও ফারহানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক সেকেন্ড। সেই মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ, ভয় আর অসহায়ত্বের ছাপ।

প্রভা আবার ব্যথায় কেঁপে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললো। ফারহান তাকে শক্ত করে আগলে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসে গাড়ির ব্যাকসিটে খুব সাবধানে প্রভাকে বসিয়ে দেয়। রহিমা ইয়াসমিনও দ্রুত গিয়ে মেয়ের পাশে বসে পড়লেন। ইকবাল শিকদার সামনের সিটে গিয়ে বসলেন। সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে কিনা একবার দেখে নিয়ে ফারহান ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো। ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার আগেও একবার পিছনে তাকায় সে। প্রভা তখনও পেট চেপে ধরে কাঁদছে। ফারহানের হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে উঠলো। পরের মুহূর্তেই গাড়িটা দ্রুত হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে চললো।

এদিকে অরশি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে গাড়িটাকে দূরে মিলিয়ে যেতে দেখলো। ইমন এখনো বাসায় ফেরেনি। পিয়াস আর ছোট্ট অলিকে রেখে এই মুহূর্তে তার পক্ষে হাসপাতাল যাওয়া সম্ভব নয়। উদ্বিগ্ন মনে দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নিলো সে। কাঁপা আঙুলে ইমনের নাম্বারে কল দেয়। তারও ভয় লাগছে এখন। সে আত্নকেন্দ্রীক কিন্তু এতোটাও নিষ্ঠুর নয়।

হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। করিডোরজুড়ে উৎকণ্ঠার এক অদৃশ্য ছায়া ছড়িয়ে আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান, ইকবাল শিকদার, রহিমা ইয়াসমিন আর ইমন। প্রত্যেকের মুখেই উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটা অনন্ত সময়ের মতো মনে হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজার দিকে বারবার তাকাচ্ছে সবাই, অথচ সেই দরজা কোনো উত্তর দিচ্ছে না।

রহিমা ইয়াসমিনের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ।মেয়ের জন্য বুকটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে তাঁর। আঁচলে মুখ চেপে তিনি বারবার চোখের পানি মুছে নিচ্ছেন, কিন্তু কান্না থামাতে পারছেন না। একজন মা যতোই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করুক, সন্তানের কষ্টের সামনে সেই শক্তি খুব সহজেই ভেঙে পড়ে।

কিছুক্ষণ পর দ্রুত পায়ে সেখানে এসে পৌঁছালেন মারফুয়া বেগম। রহিমা ইয়াসমিনের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা এখনো বিদ্যমান। আতঙ্ক আর অসহায়ত্বে ভেঙে পড়া রহিমা ইয়াসমিনই কিছুক্ষণ আগে তাঁকে ফোন করেছিলেন। ফোনের ওপাশে কান্নাজড়ানো কণ্ঠ শুনেই তিনি আর দেরি করেননি। রনক রহমান দেশের বাইরে থাকায় এই মুহূর্তে উপস্থিত হতে পারেননি।কাজের প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থান করছেন তিনি।তবে প্রভার সঙ্গে যে এখনও তাঁর এবং মারফুয়া বেগমের যোগাযোগ রয়েছে, সেই বিষয়টি রাজ কিংবা অনন্যা, কেউই জানে না। মারফুয়া বেগমকে দেখামাত্র রহিমা ইয়াসমিন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। বুকভাঙা কান্না বেরিয়ে এলো তাঁর ভেতর থেকে। মারফুয়া বেগম এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। এই মুহূর্তে কোনো সান্ত্বনার বাক্যই যথেষ্ট ছিল না, তবুও একজন মায়ের পাশে আরেকজন মা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন।

অন্যদিকে, ফারহান দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো বন্ধ। বাইরে থেকে তাকে স্থির দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে যেন ভেঙে পড়ছে। গত নয় মাসের প্রতিটি স্মৃতি বারবার ভেসে উঠছে তার সামনে। প্রভার ভয়, কান্না, সংগ্রাম, একা লড়ে যাওয়ার সাহস, সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে ভিড় করছে তার মনে।

ঠিক তখনি, হাসপাতালের মসজিদ থেকে এশার আজানের ধ্বনি ভেসে এলো। সেই পবিত্র ধ্বনি করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পরের মুহূর্তেই বাতাসে মিশে গেলো আরেকটি শব্দ। একটি নবজাতক শিশুর কান্না। প্রথম কান্না। পৃথিবীতে নিজের আগমনের ঘোষণা। ছোট্ট, কাঁপা কাঁপা অথচ জীবন্ত সেই কান্না যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশ বদলে দিলো। জীবনের অস্তিত্বের চেয়ে বড় কোনো ঘোষণা হয়তো নেই। এই শিশুটিকে পৃথিবীতে আনার পথটা সহজ ছিলো না। যে সন্তানকে ঘিরে শুরু থেকেই এতো বিতর্ক, এতো ঘৃণা, এতো নিষ্ঠুরতা ছিল, সেই সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য একজন মা একা দাঁড়িয়ে ছিল সবার বিরুদ্ধে। কতো মানুষ তাকে থামাতে চেয়েছে, কতো মানুষ এই অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চেয়েছে। এমনকি যে মানুষটির সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব ছিল তাকে রক্ষা করার, তার পিতা, সেও এই শিশুর অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়ার কথা বলেছিলো। কিন্তু, মাতৃত্বের কাছে সেইসব ভয়, অপমান আর প্রতিকূলতা হার মেনেছে। প্রভার অদম্য জেদ, নিজের সন্তানের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা আর তাকে পৃথিবীর আলো বাতাস অনুভব করানোর আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে।

ফারহানের বুকের ভেতর ধক করে উঠে। চোখ খুলে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ থেমে গেছে। শুধু সেই কান্নার আওয়াজই ভেসে আসছে বারবার। একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলো সে। তারপর অজান্তেই গলা বুজে এলো। মাথাটা সামান্য নিচু করে চোখ বন্ধ করলো ফারহান। গভীর কৃতজ্ঞতায় তার বুক ভরে উঠলো। ঠোঁট নড়ে উঠলো ধীরে,
” আলহামদুলিল্লাহ!”

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹